ফিলিস্তিনের চিঠি- ঘাসান কানাফানি

ফিলিস্তিনের চিঠি
ফিলিস্তিনের চিঠি

ফিলিস্তিনের চিঠি
ঘাসান কানাফানি
অনুবাদ: মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রিয় মুস্তাফা
এক্ষুনি তোর চিঠি পেলাম। তাতে তুই আমায় লিখেছিস যে, তোর ওখানে থাকবার জন্য যা যা করা জরুরি ছিল, সব তুই করে ফেলেছিস। আমি এই খবরও পেয়েছি যে, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইনজিনিয়ারিং বিভাগে আমাকে নেওয়া হয়েছে। তুই আমার জন্যে যা করেছিস, দোস্ত, সবকিছুর জন্যে তোকে ধন্যবাদ, শুকরিয়া। তবে এটা নিশ্চয়ই তোর কাছে একটু অদ্ভুত ঠেকবে যখন আমি এ খবরটা দেবো-না দোস্ত, আমি আমার মত পালটেছি। আমি তোকে অনুসরণ করে সেই দেশে যাব না, যে দেশ 'শ্যামল, সজল আর সুশ্রী সুন্দর সব মুখে ভরা'-যেমন তুই লিখেছিস। না, আমি এখানেই থাকব। কোনোদিন এদেশ ছেড়ে যাব না।

আমি কিন্তু সত্যি বড্ড অস্বস্তিতে আছি, মুস্তাফা। আমাদের জীবন আর কখনোই এক খাতে বয়ে যাবে না। অস্বস্তির কারণ, আমি যেন শুনতে পাচ্ছি তুই আমায় মনে করিয়ে দিচ্ছিস-কী রে, আমরা না কথা দিয়েছিলাম সব সময় একসঙ্গে থাকব, যেমন আমরা চিরকাল একসঙ্গে বলে উঠতাম, 'আমরা বড়োলোক হবোই! আমাদের অনেক টাকা হবে!' কিন্তু দোস্ত, কিছুই আর আমার করার নেই। হ্যাঁ, আমার এখনও সেদিনটা মনে পড়ে যেদিন কায়রোর বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আমি তোর হাত চেপে ধরেছিলাম।

তুই বলছিলি, 'উড়োজাহাজ ছাড়বার আগে আরো পনেরো মিনিট সময় আছে হাতে। অমনভাবে হা করে আকাশে তাকিয়ে থাকিস না। শোন। পরের বছর তুই কুয়েত যাবি। মাইনে যা পাবি তা থেকে যথেষ্ট টাকা বাঁচাতে পারবি। ফিলিস্তিনের মাটি থেকে শেকড় ওপড়াতে তাই যথেষ্ট। তারপর ক্যালিফোর্নিয়া গিয়ে নতুন করে শেকড় পুঁতবি। আমরা একসঙ্গে সব শুরু করেছি, আর একসঙ্গেই চালিয়ে যেতে হবে আমাদের...'

সেই মুহূর্তে আমি তোর ঠোঁটের দ্রুত নড়াচড়া দেখছিলাম, মুস্তাফা। তোর কথা বলবার ধরনটাই ছিল ওরকম, দাঁড়ি-কমা বাদ দিয়ে হড়বড় করে তোড়ে বলে চলা। কিন্তু আবছাভাবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল তোর এই পালানোতে তুই পুরোপুরি সুখী না। পালাবার তিনটে ভালো কারণ তুই দেখাতে পারিসনি। আমিও সর্বক্ষণ এই আক্ষেপে ভুগেছি। কিন্তু সবচেয়ে স্পষ্ট চিন্তাটা ছিল-এই গাজাকে ছেড়ে সবাই মিলে পালিয়ে যাই না কেন আমরা? কেন যাই না? কেন পারি না? তোর অবস্থা অবশ্য ভালো হতে শুরু করেছিল। কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তোকে কনট্রাক্ট দিয়েছিল, যদিও আমাকে দেয়নি। যে দুরবস্থার দাবনার মধ্যে আমি গড়াগড়ি যাচ্ছিলাম, সেটা যেন আর পালটাবেই না। তুই মাঝে মাঝে আমাকে কিছু টাকা পাঠাতিস। তুই চেয়েছিলি আমি যেন ঋণ হিসেবেই তা গ্রহণ করি, কারণ তোর ভয় ছিল নয়তো আমি অপমানিত বোধ করব। আমার বাড়ির হালচাল তো তুই জানতিস। তুই জানতিস, স্কুলের চাকরিতে আমি যে সামান্য মাইনে পেতাম, তাতে আমার আম্মা, আমার ভাবি, আর তার ছেলেমেয়েসহ সংসারটা চালানোই অসম্ভব ছিল।

পরে কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাকেও কনট্রাক্ট দিয়েছিল। আমি তোকে সবকিছু জানিয়েই চিঠি লিখতাম। সেখানে আমার বেঁচে থাকাটা ছিল কেমন একটা চটচটে ফাঁকা দমবন্ধ দশা। আমার গোটা জীবনটাই কেমন যেন পিচ্ছিল হয়ে গেছে, মাসের গোড়া থেকেই পরের মাস পয়লার জন্যে একটা উগ্র বাসনা আমায় কুরে কুরে খায়। সেই বছরটার মাঝামাঝি, ফিলিস্তিনে বোমা হামলা হয়। ঘটনাটা আমার রুটিন খানিকটা পালটে দিয়ে থাকবে-তবে সেদিকে নজর দেবার খুব একটা ফুরসত বা উপায় আমার ছিল না। এই ফিলিস্তিন পেছনে ফেলে রেখে আমি চলে যাব ক্যালিফোর্নিয়া, নিজেকে নিয়ে নিজে বাঁচব, আমার এই হতভাগা বেচারি জীবন কত ভুগেছে, কত সয়েছে!

আম্মা, ভাবি আর তার বাচ্চাদের জন্যে সামান্য টাকা পাঠাতাম আমি, যাতে তারা কোনোক্রমে টিকে থাকতে পারে। তবে এই শেষ বন্ধনটাও আমি ছিঁড়ে ফেলে নিজেকে মুক্ত করে ফেলব-সবুজ ক্যালিফোর্নিয়ায়। এই হার, এই পরাজয়ের পচা গন্ধ থেকে বাঁচাব নিজেকে। যে সহানুভূতি, যে সমব্যথা আমাকে আমার ভাইজানের বাচ্চা-কাচ্চাদের সঙ্গে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল, তাদের আম্মা আর আমারও আম্মা-এরা কেউই কোনোকালে এই খাড়াই থেকে আমার উড়াল ঝাঁপকে কোনো মানে দিতে পারবে না। অনেক দিন কেটেছে-আর এই পিছুটান টানাহেঁচড়া চলবে না। আমাকে পালাতে হবে। এসব অনুভূতি তোর চেনা, মুস্তাফা, কারণ তোরও তো সত্যি এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

যখন আমি জুন মাসে ছুটিতে গেলাম। আমার যাবতীয় পার্থিব সম্পত্তি জড়ো করলাম এক জায়গায়। মধুর পলায়নের জন্যে উদ্বেল হয়ে উঠলাম। কিন্তু কী সেই অস্পষ্ট আবছায়া যা কোনো লোককে তার পরিবারের কাছে টেনে নিয়ে আসে? মুস্তাফা, আমি জানি না। আমি শুধু জানি-আমি আম্মার কাছে গিয়েছি, আমাদের বাড়িতে সেদিন সকালবেলায়। আমি যখন গিয়ে পৌঁছেছি, আমার ভাবি, আমার মরহুম ভাইজানের স্ত্রী, আমার সঙ্গে দেখা করল। আর ফুঁপিয়ে বলল, তার মেয়ে নাদিয়া জখম হয়ে গাজার হাসপাতালে আছে, আমাকে দেখতে চায়। আমি কি তাকে দেখতে যাব সেদিন সন্ধ্যাবেলা? তোর মনে আছে নাদিয়াকে, তেরো বছর বয়েস, আমার ভাইয়ের মেয়ে?

সেদিন সন্ধ্যেয় আমি এক পাউন্ড আপেল কিনে নিয়ে নাদিয়াকে দেখতে হাসপাতালের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। আমি জানতাম কিছু একটা রহস্য আছে। আমার আম্মা আর আমার ভাবি আমার কাছে যা চেপে গিয়েছে, এমন একটা কিছু যা তারা মুখ ফুটে বলতে পারছে না। নাদিয়াকে আমি ভালোবাসতাম নিছক অভ্যাসবশেই, সেই একই অভ্যাস যা আমাকে ভালোবাসিয়েছে তাদের প্রজন্মের সবকিছুকে। সেই যে প্রজন্ম বড়ো হয়ে উঠেছে পরাজয়, হতাশায় আর বাস্তুহীনতায়।

কী ঘটেছিল সেই মুহূর্তে? আমি জানি না মুস্তাফা। খুব শান্তভাবেই আমি ঢুকেছিলাম ধবধবে সাদা ঘরটায়। নাদিয়া শুয়ে আছে তার বিছানায় একটা মস্ত বালিশে পিঠ দিয়ে, যার ওপর তার চুল কালো এক ঘন পশলার মতো ছড়িয়ে আছে। তার ডাগর চোখ দুটোয় কী রকম একটা ছমছমে গভীর স্তব্ধতা। তার কালো চোখের তারায় টলমল করছে পানি। তার মুখখানি শান্ত নিশ্চল। এখনো বড্ড ছেলেমানুষ আছে নাদিয়া, কিন্তু তাকে দেখাচ্ছে কোনো বাচ্চার চেয়েও বেশি, আরো বেশি, কোনো বাচ্চার চেয়ে বড়ো, অনেক বড়ো।

‘নাদিয়া!’

সে তার চোখ তুলে তাকিয়েছিল আমার দিকে। তার ক্ষীণ, মৃদু হাসির সঙ্গে আমি তার গলা শুনতে পেলাম।

‘চাচা! তুমি কি এক্ষুনি কুয়েত থেকে এলে?’

তার কণ্ঠস্বর কী রকম যেন ভেঙে গেল তার গলায়। দুই হাতে ভর দিয়ে কোনোমতে সে উঠে বসল। গলাটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। আমি হালকাভাবে তার পিঠ চাপড়ে তার পাশে বসে পড়লাম।

‘নাদিয়া! আমি তোর জন্যে কুয়েত থেকে উপহার নিয়ে এসেছি, অনেক উপহার। বিছানা ছেড়ে উঠবি যখন, একেবারে সেরে যেতে হবে কিন্তু, ততদিন আমি সবুর করব। তারপর তুই আমার বাড়ি আসবি আর এক এক করে সব আমি তোকে দেব। তুই যে লাল সালোয়ারগুলো আনতে লিখেছিলি সেগুলো এনেছি। একটা নয়-অনেক।’ মিথ্যে কথা। আমি এমনভাবে কথাগুলো বললাম যেন জীবনে এই প্রথম আমি কোনো পরম সত্য কথা বলছি। নাদিয়া কেঁপে উঠল, ভয়ংকর এক স্তব্ধতার মধ্যে সে তার মাথা নোয়াল। আমি টের পেলাম, তার চোখের জল আমার হাতের পিঠ ভিজিয়ে দিচ্ছে।

‘কিছু বল, নাদিয়া। লাল সালোয়ারগুলো তোর চাই না?’

সে তার ডাগর চোখ দুটি তুলে আমার দিকে তাকাল। কিছু একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ থতমত খেয়ে থেমে গেল। তারপর দাঁতে দাঁত চাপল। আমি তার গলা শুনতে পেলাম আবার। অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে।

‘চাচা!’

সে তার হাত বাড়িয়ে দিল। আঙুল দিয়ে তুলে ধরল গায়ের সাদা চাদর। আঙুল তুলে দেখাল তার পা, উরুর কাছ থেকে কেটে বাদ দেওয়া। দোস্ত, মুস্তাফা... আমি কোনোদিন নাদিয়ার পা দুটো ভুলব না-উরুর কাছ থেকে কাটা। না! হাসপাতাল থেকে সেদিন আমি বেরিয়ে গিয়েছিলাম। হাতের মধ্যে মুঠো করা দুটি পাউন্ড, নাদিয়াকে দেব বলে এনেছিলাম। জ্বলজ্বলে সূর্য রাস্তা ভরিয়ে দিয়েছে টকটকে রক্তের রঙে। এই ফিলিস্তিনে সবকিছু দপদপ করছে বিষাদে, মনস্তাপে, যা শুধুই কোনো রোদনের মধ্যে আবদ্ধ নয়। যুদ্ধের আহ্বান এই বিষাদ। তারও বেশি, এ যেন কাটা পা ফিরে পাবার জন্যে একটা প্রচণ্ড দাবি!

গাজার রাস্তায় রাস্তায় আমি হেঁটে বেড়ালাম। চোখ ধাঁধানো আলোয় ভরা সব রাস্তা। ওরা আমাকে বলেছে- নাদিয়া তার পা হারিয়েছে, যখন সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার ছোটো ছোটো ভাইবোনদের ওপর, তাদের ঢেকে দিয়েছিল নিজের ছোট্ট শরীরটা দিয়ে। বোমা আর আগুন থেকে তাদের বাঁচাতে, যে-আগুনের হিংস্র থাবা তখন বাড়িটায় পড়েছিল। নাদিয়া নিজেকে বাঁচাতে পারত, সহজেই সে ছুটে পালিয়ে যেত পারত লম্বা লম্বা পা ফেলে, রক্ষা করতে পারত তার পা। কিন্তু সে তা করেনি।

কেন?

না, মুস্তাফা, দোস্ত আমার, আমি ক্যালিফোর্নিয়া যাব না-আর তাতে আমার কোনো খেদ নেই। ছেলেবেলায় এক সঙ্গে আমরা যা শুরু করেছিলাম, তাও আমরা শেষ করব না। সেই আবছা মতো অনুভূতি যা তুই গাজা ছেড়ে যাবার সময় অনুভব করেছিলি, সেই ছোট্ট বোধটাকে বিশাল হয়ে গড়ে উঠতে দিতে হবে তোর ভেতর। ছড়িয়ে পড়তে দিতে হবে তাকে, নিজেকে ফিরে পাবার জন্যে হাতড়াতে হবে তোকে, তন্নতন্ন করে তোকে নিজেকে খুঁজতে হবে পরাজয়ের এই ধ্বংসস্তূপে।

আমি তোর কাছে যাব না মুস্তাফা। বরং তুই, তুই আমাদের কাছে ফিরে আয়। ফিরে আয়, মুস্তাফা, নাদিয়ার কাটা পা দুটি থেকে শিখতে, ফিরে আয় জানতে কাকে বলে জীবন, অস্তিত্বের মূল্য কী আর কতটা!

ফিরে আয়, মুস্তাফা, দোস্ত আমার, ফিরে আয়! আমরা সবাই তোর জন্যে অধীর অপেক্ষা করে আছি।

উৎস নির্দেশ:
--

শব্দার্থ ও টীকা:
➠ ফিলিস্তিন- ইসরায়েল কর্তৃক দখলকৃত, স্বাধীনতাকামী দেশ।
➠ ক্যালিফোর্নিয়া- আমেরিকার একটি অঙ্গরাজ্য।
➠ শুকরিয়া- কৃতজ্ঞতা, উপকারীর উপকার স্বীকার।
➠ কুয়েত- মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ।
➠ মাইনে- বেতন।
➠ কনট্রাক্ট- চুক্তি। ইংরেজি Contract.
➠ দাবনা- উরুর ভেতরের দিকের মাংসের অংশ।
➠ হালচাল- অবস্থা, দশা।
➠ আগাপাশতলা- আগাগোড়া, আপাদমস্তক।
➠ খুঁটিনাটি- সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সকল বিষয়।
➠ আষ্টেপৃষ্ঠে- সর্বাঙ্গে।
➠ পিছুটান- পিছনে ফেলে আসা কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ।
➠ পার্থিব- পৃথিবী সংক্রান্ত।
➠ উদ্বেল- উচ্ছলিত, আকুল হওয়া।
➠ ধবধবে- অতিশয় উজ্জ্বল।
➠ পশলা- বর্ষণ। এখানে ‘অল্প পরিমাণ’ অর্থে।
➠ আর্তস্বরে- কাতর স্বরে, ব্যাকুল কণ্ঠে।
➠ খেদ- দুঃখ, অনুতাপ, আক্ষেপ।
➠ তন্নতন্ন- পুঙ্খানুপুঙ্খ, সমস্ত কিছু, আঁতিপাতি।
➠ দপদপ- বেদনার ভাবপ্রকাশক শব্দ।

পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব:
‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ এটি পত্রের ভাষায় রচিত একটি অনুবাদমূলক গল্প। এতে ইসরায়েলের আক্রমণে বিপর্যন্ত ফিলিস্তিনের মর্মান্তিক চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। বন্ধু মুস্তাফাকে সম্বোধন করে লেখা এই চিঠিতে দেখা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিন ছেড়ে সুন্দর ও সুখী জীবনের প্রত্যাশায় মুস্তাফা প্রথমে কুয়েত ও পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যায়। চিঠির লেখককেও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমন্ত্রণ জানায় মুস্তাফা। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর বিপন্ন ফিলিস্তিন ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন পত্রলেখক। কিন্তু করুণ এক অভিজ্ঞতা তাকে আমূল বদলে দেয়। সে ফিলিস্তিন ছাড়ার পূর্বে নিজের মা-ভাবির সঙ্গে দেখা করতে এসে জানতে পারে, তার নিহত ভাইয়ের মেয়ে নাদিয়া বোমার আক্রমণে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। লেখক তাকে দেখতে যায়। নাদিয়ার মনকে প্রফুল্ল করার জন্য বলে, তার চাওয়া অনেকগুলো লাল সালোয়ার সে নিয়ে এসেছে। সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরলেই নাদিয়া সেগুলো দেখতে পাবে। একথা শুনে নাদিয়ার চোখ ভিজে যায়। সাদা চাদর তুলে দেখায়, তার দুই পা কেটে ফেলা হয়েছে। এই দৃশ্য লেখকের মনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, ফিলিস্তিন ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। বন্ধুকেও আহ্বান করে দেশে ফিরে আসার।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও সংকটাপন্ন স্বজনদের ফেলে রেখে স্বার্থপরের মতো অন্যদেশে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে কোনো মহত্ত্ব নেই। এই গল্পের ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে দেশ ও স্বজনের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব।

লেখক পরিচিতি:
ঘাসান কানাফানি প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি কথাসাহিত্যিক। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে, আক্রায়। লেখাপড়া শেষ করে তিনি প্রথমে সিরিয়ার রাজধানী এবং পরে কুয়েতে শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতার কাজে যোগ দেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘আল-হাদাফ’ নামের সাপ্তাহিক পত্র। যা ছিল ‘পপুলার ফ্রন্ট ফর দি লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন’-এর মুখপত্র। তিনি উপন্যাস ছাড়াও লিখেছেন ছোটোগল্প, নাটক, প্রবন্ধ। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে ইসরায়েলি বাহিনির গোপন বোমা হামলায় তিনি নিহত হন।

অনুবাদক-পরিচিতি:
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় একজন কবি, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর জন্ম ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটে। লাতিন আমেরিকান সাহিত্য অনুবাদের জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে হুয়ান রুলফো, গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেজ প্রমুখের গল্প-উপন্যাস। অনুবাদ সাহিত্যের জন্য তিনি ভারতের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।

‘নয়া পত্তন’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. লেখক কেন মনে করেন যে, মুস্তাফা ক্যালিফোর্নিয়া চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল? আলোচনা করো।
খ. লেখকের কাছে কোন বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি নাদিয়াকে হাসপাতালে দেখতে যান? বিশ্লেষণ করো।

ক. লেখক মনে করেন যে, মুস্তাফা ক্যালিফোর্নিয়া চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং দায়বদ্ধতা পালানোতে নয়, দেশের জন্য সংগ্রামে রয়েছে। মুস্তাফা ফিলিস্তিনের দুঃখ-কষ্ট থেকে পালিয়ে একটি উন্নত জীবন গড়ার জন্য ক্যালিফোর্নিয়া চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু লেখক তাকে বোঝান, যে পরিস্থিতি সে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, সেই দেশের প্রতি তার দায়িত্ব ও সম্পর্ককে অস্বীকার করা হবে। লেখক জানতেন, মুস্তাফা এমন একটি পৃথিবীতে যেতে চায় যেখানে যুদ্ধ, দারিদ্র‍্য এবং সংগ্রাম নেই, তবে সেখানে গিয়ে সে প্রকৃত শান্তি বা পরিপূর্ণতা পাবে না, কারণ জীবনের অর্থ শুধুমাত্র সুখে নয়, নিজের দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ব পালন করেই পাওয়া যায়। ফিলিস্তিনের মাটির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে নিজের জীবন গড়ে তোলা, লেখকের মতে, এভাবে পালিয়ে যাওয়ার কোনো সমাধান হতে পারে না। লেখক মনে করেন, ফিলিস্তিনের প্রতি তার দেশের দায়িত্ব এবং জনগণের পাশে দাঁড়ানোই তাকে প্রকৃত শান্তি এনে দেবে, যা ক্যালিফোর্নিয়ার মাটি তাকে কখনোই দিতে পারবে না।
এছাড়া, লেখক মুস্তাফাকে ফিলিস্তিনের পেছনে থাকা সত্যিকার সংগ্রাম, পরাজয় ও বেদনার সম্মুখীন হওয়ার জন্য আহ্বান করেন, যাতে সে তার নিজের জীবনকে শুধু নিজের স্বার্থে না, বরং তার দেশের এবং জনগণের জন্য নিবেদিত করতে পারে।

খ. লেখক যখন নাদিয়াকে হাসপাতালে দেখতে যান, তখন তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে, তার দেশের দুর্দশা এবং সংগ্রামের সঙ্গে তার নিজেকে সংযুক্ত করার এক গভীর দায়িত্ব রয়েছে। নাদিয়া, একজন তরুণী, তার জীবনকে বাঁচানোর জন্য এক অপরিহার্য ত্যাগ স্বীকার করেছে। তার পা কেটে ফেলা হয়েছে, কারণ সে তার ছোট ভাইবোনদের রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন বাজি রেখেছিল। নাদিয়া তার পরিবারের জন্য যে আত্মত্যাগ করেছে, তা লেখককে একটি বড় শিক্ষার মুখোমুখি করে।
নাদিয়ার অবস্থা লেখকের সামনে ফিলিস্তিনের যুদ্ধের বাস্তবতা তুলে ধরে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, তার দেশ শুধু যুদ্ধের কবলে পড়েনি, এখানে মানুষের জীবনকে অল্পে হারাতে হচ্ছে এবং একে অপরের জন্য ত্যাগ করতে হচ্ছে। লেখককে এই দৃশ্য দেখিয়ে দেয় যে, ফিলিস্তিনে জীবন কাটানোর মানে শুধু দারিদ্র‍্য, নির্যাতন এবং সহানুভূতির অভাব নয়; এর সঙ্গে রয়েছে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ, একে অপরের জন্য ত্যাগের একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।
এখানে লেখক বুঝতে পারেন, যে দেশের মানুষের জন্য কিছু করা না গিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে নিজের জীবন গড়তে চাওয়া কতটা আত্মকেন্দ্রিক এবং নিষ্ক্রিয়। নাদিয়ার পা কাটা হওয়ার ঘটনা তার কাছে একটি সজাগতা নিয়ে আসে-যে ত্যাগ, যে সংগ্রাম, যে জাতির পাশে দাঁড়ানো, সেই সবই তাকে ফিরিয়ে আনে তার দেশ, তার জনগণের পাশে।
নাদিয়ার পা কাটা যাওয়ার পর, লেখক অনুভব করেন যে, তার দেশের জন্য তার কর্তব্যটা স্পষ্ট হয়েছে। সে ক্যালিফোর্নিয়া চলে না গিয়ে, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সংগ্রামের অংশ হবে। নাদিয়ার অবস্থা দেখিয়ে লেখক বুঝতে পারেন, এই দেশের যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্যেও জীবনের প্রকৃত অর্থ ও মূল্য নিহিত রয়েছে, এবং তিনি আর নিজের জীবনকে পালিয়ে একা কাটাতে চান না। এই উপলব্ধি তাকে আরও দৃঢ়ভাবে তার দেশের প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলে এবং তাকে দেশের সংগ্রামের অংশ হতে অনুপ্রাণিত করে।


‘নয়া পত্তন’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্পে নাদিয়ার পা কাটার ঘটনা লেখকের জীবনে কী প্রভাব ফেলেছিল? ব্যাখ্যা করো।
খ. লেখকের ‘নিজেকে মুক্ত করতে হবে’ ধারণাটির প্রতি নাদিয়ার পা কাটার ঘটনা কীভাবে প্রভাবিত করে? বিশ্লেষণ করো।

ক. নাদিয়ার পা কাটার ঘটনা লেখকের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে আসে। যখন লেখক নাদিয়াকে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে, তখন সে জানায় যে, সে তার ছোট ভাইবোনদের রক্ষা করতে গিয়ে তার পা কেটেছে। এ ঘটনা লেখককে গভীরভাবে আলোড়িত করে এবং তার মনের মধ্যে এক ধরনের কাঁপন সৃষ্টি করে। এই দৃশ্য তাকে বুঝিয়ে দেয় যে, ফিলিস্তিনে মানুষের জীবন শুধু যুদ্ধ, দারিদ্র‍্য এবং দুর্দশায় আটকে নেই, বরং এই সংগ্রামে তাদের আত্মত্যাগ, সাহস এবং মানবিকতা রয়েছে।
লেখক অনুভব করেন যে, নাদিয়া তার জীবন, তার শরীর এবং তার পা দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার মধ্যে প্রকৃত শান্তি এবং সংগ্রামের মর্ম নিহিত রয়েছে। এই ঘটনা লেখককে তার নিজের দেশ, তার নিজের জাতির প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি পুনরায় ভাবতে বাধ্য করে।
নাদিয়ার পা কাটার ঘটনা লেখককে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়, যে সে যে "নিজেকে মুক্ত করতে হবে" বলে যে ধারণা নিয়ে চলছিল, সেটি আসলে ভুল ছিল। পালিয়ে গিয়ে নিজের জীবন গড়ার মধ্যেই মুক্তি নেই। প্রকৃত মুক্তি আসে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের সংগ্রামে অংশ নিয়ে। এর মাধ্যমে লেখক উপলব্ধি করেন যে, তার "মুক্তি" আসলে পালানোর মধ্য দিয়ে নয়, বরং দেশের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা এবং সংগ্রামের অংশ হওয়ার মধ্যে নিহিত।

খ. লেখকের ‘নিজেকে মুক্ত করতে হবে’ ধারণাটি ছিল একটি মানসিক অবস্থা, যা তার ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং দুঃখের বিরুদ্ধে পালানোর ইচ্ছা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। তিনি ভাবতেন যে, ফিলিস্তিনের সংঘাত এবং দারিদ্র‍্য থেকে মুক্তি পেতে তাকে ক্যালিফোর্নিয়া চলে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে নতুন জীবন গড়ে তিনি নিজেকে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান করবেন। তাঁর মনে হচ্ছিল যে, দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেলে, তিনি নিজের হতাশা, পরাজয় এবং সংগ্রামের দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে পারবেন। কিন্তু নাদিয়ার পা কাটার ঘটনা এই ধারণাটির মধ্যে একটি গভীর প্রশ্নবোধক চিহ্ন চিহ্নিত করে।
নাদিয়া তার পা হারিয়েছে, যখন সে তার ভাইবোনদের রক্ষা করতে গিয়ে তার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ত্যাগ করেছে। সে নিজের জীবনকে বাঁচানোর চেয়ে অন্যদের জীবন বাঁচাতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, যা তাকে একজন ত্যাগী এবং সাহসী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। এই ঘটনা লেখককে মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত মুক্তি আসলে কোনো জায়গায় পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়, বরং দেশের মানুষের সঙ্গে থাকতে এবং তাদের সংগ্রামের অংশ হতে। নাদিয়ার পা কাটার ঘটনা লেখকের জীবনের দৃষ্টিকোণকে পরিবর্তন করে।
লেখক বুঝতে পারেন, পালিয়ে গিয়ে নতুন জীবনের সন্ধানে যাওয়ার মধ্যে কোন মুক্তি নেই। প্রকৃত মুক্তি আসে যখন আপনি নিজের জাতি, আপনার দেশের মানুষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে তাদের দুঃখ এবং সংগ্রাম সহ্য করেন এবং তার মধ্যে একটি শক্তিশালী মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি আবিষ্কার করেন যে, যেভাবে নাদিয়া তার শরীরের অংশ ত্যাগ করেছে নিজের পরিবারের জন্য, সেভাবে তাকে নিজের দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তাই, তাঁর “মুক্তি” ধারণাটি পরিবর্তিত হয়ে যায়; পালিয়ে গিয়ে নিজেকে মুক্ত করার পরিবর্তে, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করা এবং তার সংগ্রামে অংশ নেওয়াই হবে তার প্রকৃত মুক্তি।
নাদিয়ার পা কাটার ঘটনাটি লেখকের মধ্যে এক গভীর পরিবর্তন নিয়ে আসে, যার মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করেন যে, জীবন শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, বরং আপনি যেখানকার সদস্য, সেখানকার মানুষের জন্য আপনাকে কাজ করতে হবে। পালিয়ে গিয়ে নিজেকে নিরাপদে রাখা আসলে এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিকতা, কিন্তু নিজের দেশের মানুষের সাথে একত্রিত হয়ে তাদের জীবনের সংগ্রামকে বুঝে নেওয়াই আসল মুক্তি এবং জীবনের প্রকৃত অর্থ।


‘নয়া পত্তন’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৩:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. লেখক মুস্তাফাকে দেশে ফিরে আসার জন্য কেন অনুরোধ করেন? তার সিদ্ধান্তের পেছনে কী যুক্তি রয়েছে?
খ. ‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্পের মাধ্যমে লেখক কী বার্তা দিতে চেয়েছেন? আলোচনা করো।

ক. লেখক মুস্তাফাকে দেশে ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করেন কারণ, তিনি বুঝতে পারেন যে মুস্তাফার ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। মুস্তাফা দেশ ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়া চলে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবন গড়তে চেয়েছিল, যেখানে তার মনের শান্তি, নিরাপত্তা এবং সচ্ছলতা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু লেখক উপলব্ধি করেন যে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে কোনো প্রকৃত মুক্তি বা শান্তি নেই। দেশে ফিরে আসার জন্য তার অনুরোধের পেছনে রয়েছে একটি গভীর মানবিক যুক্তি।
লেখক অনুভব করেন যে, ফিলিস্তিনের জনগণের সংগ্রাম এবং তাদের দুঃখের সঙ্গে একাত্ম না হলে, কোনো ব্যক্তি তার জীবনকে সত্যিকারের অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে না। লেখক, নাদিয়ার মতো সাহসী এবং ত্যাগী মানুষের কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দিয়ে দেখান যে, নিজেদের পরিসর ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে জীবন গড়ার মধ্যে প্রকৃত মুক্তি নেই। বরং, যারা তাদের দেশ ও জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করে, তারাই প্রকৃত মুক্তি এবং শান্তি লাভ করতে পারে। এভাবেই লেখক মুস্তাফাকে দেশে ফিরে এসে তার দেশের সংগ্রামের অংশ হতে আহ্বান করেন, কারণ দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সহানুভূতি তাদের জীবনকে এক নতুন অর্থ দেবে।

খ. ‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্পের মাধ্যমে লেখক এক গভীর মানবিক ও রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছেন। এই গল্পের মূল বার্তা হল-নিজস্ব সুখের পেছনে ছুটে গিয়ে দেশের মানুষের সংগ্রাম এবং দুঃখকে উপেক্ষা করা কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। লেখক ফিলিস্তিনের দুর্দশা ও যুদ্ধের পটভূমিতে দেখিয়েছেন যে, একজন ব্যক্তির জীবনের প্রকৃত অর্থ তখনই আসে যখন সে নিজের দেশের জন্য কিছু করতে প্রস্তুত হয় এবং জনগণের সংগ্রামে অংশ নেয়।
লেখক গল্পের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন যে, একমাত্র নিজের আর্থিক বা মানসিক শান্তি অনুসরণের মাধ্যমে মানুষ প্রকৃত মুক্তি বা শান্তি লাভ করতে পারে না। ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি, সেখানে থাকা মানুষের সংগ্রাম এবং বিশেষত নাদিয়ার আত্মত্যাগের মাধ্যমে লেখক এই বার্তা দিয়েছেন যে, দেশের মানুষদের সহায়তা ও তাদের জন্য সংগ্রাম করাই হলো মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব। গল্পে, নাদিয়া তার ছোট ভাইবোনদের রক্ষা করতে গিয়ে নিজের পা হারায়, যা একটি অত্যন্ত ত্যাগের উদাহরণ। নাদিয়ার এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে লেখক বলেন যে, যখন একজন ব্যক্তি নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্যদের জন্য কিছু করে, তখন তার জীবন সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পায়।
লেখকের মতে, মুক্তি আসবে না যদি আমরা শুধু নিজেদের সুখ এবং নিরাপত্তার কথা ভাবি। ক্যালিফোর্নিয়া চলে গিয়ে নিজের জীবন শুরু করতে চাওয়া মুস্তাফার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে লেখক দেখান, কিভাবে ব্যক্তি এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিকতা অবলম্বন করে, তবে সেই পথ কখনো তাকে প্রকৃত শান্তি বা সন্তুষ্টি এনে দিতে পারে না। সমাজের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং তাদের সংগ্রামে অংশগ্রহণই সত্যিকার মুক্তি।
গল্পের মাধ্যমে লেখক আরো বলছেন, জাতির প্রতি সহানুভূতি এবং দায়বদ্ধতা শুদ্ধ মানবিক গুণ, যা ব্যক্তির জীবনকে শুধুমাত্র স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত করে না, বরং তাকে সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করে। লেখকের মতে, শুধু নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা করে, নিজেকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে কখনোই মুক্তি আসবে না। একজন মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসে তার দেশের জন্য, তার জনগণের জন্য, তাদের দুর্দশা, সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের মধ্যে। তাই, ‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্পের মাধ্যমে লেখক দেশপ্রেম, সহানুভূতি, ত্যাগ এবং সংগ্রামের গুরুত্বকে তুলে ধরেছেন।


‘নয়া পত্তন’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৪:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ‘আমি জানতাম কিছু একটা রহস্য আছে।”—এখানে কোন রহস্যের কথা বলা হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
খ. লেখক তাঁর বন্ধু মুস্তাফাকে দেশে ফিরে আসতে বলেছেন কেন? বিশ্লেষণ করো।

ক. এখানে রহস্য বলতে লেখক বুঝাতে চেয়েছেন, তার পরিবারের পক্ষ থেকে যে কিছু চেপে রাখা হচ্ছে, তা। যখন লেখক তার ভাবির কাছে গিয়ে জানতে পারেন যে নাদিয়া গাজার হাসপাতালে জখম অবস্থায় আছে, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে এর মধ্যে কিছু গোপন বিষয় রয়েছে, যা তার পরিবার তার কাছে প্রকাশ করছে না। পরে হাসপাতালে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে নাদিয়া তার ছোট ভাইবোনদের বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল এবং সেই কারণেই তার পা দুটি হারিয়েছে। এটি ছিল একটি বড়ো রহস্য, যা লেখক শুরুর দিকে অনুভব করেছিল, কিন্তু পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি যতক্ষণ না তিনি নাদিয়ার সাথে দেখা করেন।

খ. লেখক তাঁর বন্ধু মুস্তাফাকে দেশে ফিরে আসতে বলেছেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে মুস্তাফা যদি ক্যালিফোর্নিয়া গিয়ে নিজের জীবন পুনর্গঠন করতে থাকে, তবে সে কখনও দেশ, জাতি এবং মানবতার প্রতি তার দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্ববোধ অনুভব করতে পারবে না। লেখক এই চিঠির মাধ্যমে মুস্তাফাকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, পালিয়ে গিয়ে নিজেকে সুরক্ষিত করে বাঁচা, যদিও তা শান্তি এবং আরাম দিতে পারে, তবুও তা আসল জীবনকে মুল্যায়ন করতে শেখায় না। লেখক তার অভিজ্ঞতা থেকে জানেন যে, ফিলিস্তিনের জনগণের জীবনযাপন, তাদের সংগ্রাম, এবং পরাজয়ের সঙ্গে কাটানো সময়ের মধ্যে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে জীবন চালিয়ে যাওয়া এবং দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে মানবিক মূল্যবোধ এবং সংগ্রামের শক্তি অর্জন করা।
লেখক বুঝতে পারেন যে, মুস্তাফা কুয়েতে গিয়ে ভাল অবস্থায় থাকলেও, সে এক ধরনের শারীরিক এবং মানসিক নিরাপত্তা পেয়েছে, যা তার দেশের বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। মুস্তাফার কাছে ‘বছরের পর বছর অপেক্ষা করা’, ‘পালানোর স্বপ্ন’ আর 'অর্থ উপার্জন' হয়ে উঠেছে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, কিন্তু এ থেকে জাতির পক্ষে কোনো ভালো কিছু আসবে না। লেখক বলেন, "আমি ক্যালিফোর্নিয়া যাব না", অর্থাৎ তিনি দেশকে ছেড়ে পালাবেন না, এমনকি তাঁর নিজের পিছুটান এবং হতাশা সত্ত্বেও। তাঁর মতে, মুস্তাফার ক্যালিফোর্নিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি গোপন প্রশ্ন ছিল, যা লেখক খোলসা করতে চান। যে প্রজন্ম যুদ্ধ, পরাজয় ও হতাশায় বড় হয়েছে, তাদের জন্য এটি অতি জরুরি যে তারা তাদের শেকড়ের দিকে ফিরে যায় এবং জীবনের প্রকৃত মূল্য বুঝে ওঠে।
লেখক মুস্তাফাকে নাদিয়ার কাটা পা দুটি থেকে শিখতে বলেছেন। এখানে লেখক নাদিয়ার আত্মত্যাগ এবং তার সাহসিকতা তুলে ধরেছেন, যা সত্যিকার মানবিকতা ও জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়। নাদিয়া, একটি ছোট বাচ্চা, তার জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও, নিজের ভাই-বোনদের বাঁচানোর জন্য নিজের পা দুটি হারায়। এটি হল ত্যাগ, সহানুভূতি, এবং মানুষের প্রতি নিষ্ঠা। লেখক চান মুস্তাফা, যে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং বিপর্যয়কে উপেক্ষা করে বিদেশে যেতে চায়, তার নিজের দেশ ও পরিবারকে বুঝুক এবং তার পূর্বের আকাক্সক্ষাগুলো থেকে বেরিয়ে এসে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করুক।
লেখক তাঁর বন্ধু মুস্তাফাকে দেশে ফিরে আসতে বলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে, ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে শারীরিকভাবে ভালো থাকা সম্ভব হলেও, সেই জীবনের মধ্যে প্রকৃত শান্তি এবং আত্মিক তৃপ্তি পাওয়া কঠিন। তাঁর মতে, দেশের শোক ও দুঃখের সাথে থেকে, নিজের জনগণের সঙ্গে একসঙ্গে থাকার মধ্যেই প্রকৃত মানবিক মূল্য ও জীবনযাত্রার সার্থকতা পাওয়া সম্ভব। মুস্তাফা যদি ফিরে আসে, তবে তার নিজের এবং অন্যদের জন্য জীবনকে আরও অর্থবোধক এবং সার্থক করতে পারবে। লেখক মনে করেন, দেশের প্রতি এক গভীর সম্পর্ক এবং মনোবল তাকে সত্যিকারের "জীবন" উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে, যা ক্যালিফোর্নিয়ার সরল জীবন তাকে কখনও দিতে পারবে না।
এইভাবে, লেখক মুস্তাফাকে কেবল দেশে ফিরে আসতে নয়, বরং তার শেকড়ে ফিরে এসে সঠিক অর্থে "জীবন" এবং "অস্তিত্ব" সম্পর্কে উপলব্ধি করতে বলেছেন।


‘নয়া পত্তন’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৫:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. মুস্তাফা কেন ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে গিয়েছিল? আলোচনা করো।
খ. “দেশ ও স্বজনের পাশে দাঁড়ানোই মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব।”— ‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্প অবলম্বনে আলোচনা করো।

ক. মুস্তাফা ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে গিয়েছিল জীবনের একটা ভালো সুযোগের খোঁজে, যেখানে সে শারীরিক ও মানসিক শান্তি পাবে এবং নিজের জীবন পুনর্গঠন করতে পারবে। ফিলিস্তিনে তার জীবন ছিল এক অস্থিরতা, পরাজয়, এবং অবর্ণনীয় দুঃখের মধ্যে। যুদ্ধের কারণে তার দেশে শান্তি ছিল না, এবং ফিলিস্তিনের মানুষদের মধ্যে তীব্র দারিদ্র‍্য ও অবস্থা ছিল। মুস্তাফার জন্য কুয়েত থেকে চাকরি পাওয়ার পর তার জীবন কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, সে জানত যে সেখানে পুরোটাই অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সুরক্ষা ছিল, কিন্তু জাতিগত ও সাংস্কৃতিকভাবে তিনি যে শেকড়ে মিশে থাকতে চান, তা সেখানে সম্ভব নয়। এরপর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইনজিনিয়ারিং বিভাগের জন্য তার ভর্তি হওয়ার খবর আসে, যা তাকে আরো একটি দিক থেকে স্বচ্ছল ও নিরাপদ জীবন যাপনের সম্ভাবনা দেয়। তার প্রেরণা ছিল, ফিলিস্তিন থেকে পালিয়ে গিয়ে উন্নত জীবনের সন্ধান পাওয়া, যেখানে তাকে তার দেশ এবং জাতির দুঃখের ভার থেকে মুক্তি মিলবে।
মুস্তাফার এই সিদ্ধান্তের পেছনে তার দুর্দশা এবং নিজের জীবনকে একটি নতুন দৃষ্টিতে শুরু করার আকাক্সক্ষা কাজ করেছিল। যদিও তার জন্য এই সিদ্ধান্ত ছিল একটি সুযোগ, লেখক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে এটি তার আসল কর্তব্য ছিল না, কারণ মুস্তাফা তার দেশ এবং জাতির প্রতি যে দায়বদ্ধতা অনুভব করেছিল, তা পরাজিত হয়েও সে ভুলতে পারছিল না। তবে সে দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কারণ সে মনে করেছিল, এখানে আর কিছু করার নেই এবং তাকে তার ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ ও আর্থিকভাবে সচ্ছল জীবনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।

খ. গল্পের এই বাক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি লেখকের মূল বার্তা প্রকাশ করে। লেখক এখানে নিজেকে এবং মুস্তাফাকে প্রশ্ন করেছেন, কেন দেশ এবং মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জীবন কাটানো উচিত, যখন নিজের নিরাপত্তা এবং স্বার্থের প্রশ্ন আসে? “ফিলিস্তিনের চিঠি” গল্পে লেখক তার বন্ধু মুস্তাফাকে দেশে ফিরে আসতে বলেছেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, যে কোনো দেশের মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব হলো তাদের দেশ, পরিবার এবং জাতির পাশে দাঁড়িয়ে জীবন সংগ্রাম করা। লেখক উপলব্ধি করেন, গাজা বা ফিলিস্তিনের পরিস্থিতিতে পালিয়ে গিয়ে সুস্থ, নিরাপদ জীবনে বসবাস করা কোনো সমাধান নয়, বরং সেই দেশের কষ্ট, দুঃখ ও সংগ্রামের মাঝে থেকে মানবিক দায়িত্ব পালন করা উচিত।
ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি এমন যে, লেখক এবং তার পরিবারসহ সবাই পরাজিত, যুদ্ধের ধ্বংসের মধ্যে থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। তবে এই দুঃখ, হতাশা এবং পরাজয়ের মাঝেও, তাদের একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ও একে অপরকে সহায়তা করার তাগিদই মানবিক জীবনকে সার্থক করে। লেখক মনে করেন, যেখানেই মানুষ থাকে, তাকে তার দেশের পাশে দাঁড়াতে হবে, সেখানকার মানুষের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন লেখক মুস্তাফাকে বলে, “আমরা বড়োলোক হবোই! আমাদের অনেক টাকা হবে!” এই কথাগুলি ছিল তাদের একসাথে ভবিষ্যৎ তৈরির স্বপ্ন, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে লেখক বুঝতে পারেন যে, দেশের এবং মানুষের পাশে থাকার অনুভূতি সেই সব স্বপ্নের থেকে অনেক বড়ো। অন্যদিকে, নাদিয়ার আত্মত্যাগ, যে নিজের ভাই-বোনদের রক্ষা করতে গিয়ে পা হারিয়েছে, লেখকের কাছে এটি এক দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়ায় যে, সত্যিকার জীবনকে জীবিত রাখা ও মানবিকতা বজায় রাখা শুধুমাত্র আর্থিক বা শারীরিক সুরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সুতরাং, “দেশ ও স্বজনের পাশে দাঁড়ানোই মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব” এই বক্তব্যের মাধ্যমে লেখক বলতে চেয়েছেন যে, মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব হলো তার দেশ ও জাতির জন্য সংগ্রাম করা, তাদের কষ্টের মধ্যে সহানুভূতি দেখানো, এবং কখনও নিজের সংকটের মাঝে থেকেও তার শেকড় ও সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে গিয়ে মুস্তাফা তার দায়িত্ব থেকে পলায়ন করছিল, যা লেখক মেনে নিতে পারছিলেন না। লেখক চান যে মুস্তাফা তার দেশের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করে ফিরে আসুক এবং দেশ ও স্বজনের পাশে দাঁড়াক, তাদের দুর্দশার অংশ হতে যেন সে অজানা না থাকে।


‘নয়া পত্তন’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৬:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. লেখকের কেন মনে হয়েছিল তিনি প্রথমবারের মতো পরম সত্য কথা বলেছেন?
খ. ‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্পের মূলভাব আলোচনা করো।

ক. লেখক যখন নাদিয়াকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর কাছে একটি লাল সালোয়ার নিয়ে কথা বলেন, যা নাদিয়া তাকে চেয়ে ছিল। কিন্তু, যখন নাদিয়া তাকে তার পা দুটি দেখায়, যেগুলি কাটা হয়েছিল, তখন লেখক অনুভব করেন যে, এই মুহূর্তে তিনি আসলে তার জীবনের সবচেয়ে সত্য কথা বলছেন। তার ওই কথাগুলি, "আমি তোর জন্যে কুয়েত থেকে উপহার নিয়ে এসেছি, অনেক উপহার। বিছানা ছেড়ে উঠবি যখন, একেবারে সেরে যেতে হবে কিন্তু, ততদিন আমি সবুর করব," ছিল মিথ্যে কথা, কারণ তিনি জানতেন যে, নাদিয়ার পা দুটি কেটে ফেলা হয়েছে, এবং তার উপহার কোনোভাবেই তাকে ঠিক করতে বা শান্তি দিতে পারবে না।
এটা ছিল লেখকের ভেতরের এক অস্বস্তি, যে তিনি কিভাবে সত্য বলতে পারবেন যখন তার চারপাশে এত বড়ো বিপর্যয় চলছে। নাদিয়ার সঙ্গে দেখা করার পর, তার ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি হয়ে, লেখক উপলব্ধি করেন যে, তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো সত্য হচ্ছে-এই পৃথিবীতে যে অন্যায়, দুঃখ, সংগ্রাম এবং পরাজয় চলছে, তা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এই অনুভূতি থেকে, লেখক বুঝতে পারেন যে, নাদিয়া এবং তার দেশের পরিস্থিতি ছিল মানবিক সত্য যা তাকে অবলম্বন করতে হবে। সে কারণেই তিনি মনে করেন, এটি ছিল তার জীবনের প্রথম "পরম সত্য কথা," কারণ সে জানতো যে নাদিয়া যেটা ভুগছে, তা তাকে শুধুমাত্র ভোগান্তি এবং সহানুভূতির মাধ্যমে বুঝতে হবে, আর সেই সত্য ছিল তার কাছে অস্বীকারযোগ্য।

খ. ‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ একটি হৃদয়বিদারক গল্প, যা ফিলিস্তিনের যুদ্ধ এবং তার ফলে ফিলিস্তিনিদের জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্দশা ও সংকটের চিত্র তুলে ধরে। গল্পের প্রধান চরিত্র একজন যুবক, যার নাম মুস্তাফা, যে ফিলিস্তিন ছেড়ে কুয়েত এবং পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যায়, একটি উন্নত জীবনের আশায়। তার বন্ধু, লেখক, এই চিঠি লিখে তাকে জানায় তার নিজের জীবনের অস্থিরতা ও দুঃখের কথা।
লেখক তার বন্ধুকে জানায় যে, যদিও মুস্তাফা তাকে ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে সুখী জীবনের কথা বলেছে, সে নিজে সেখানে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা পোষণ করে না। লেখক দেশের জন্য তার দায়বদ্ধতার কথা বলেন এবং মনে করেন যে, ফিলিস্তিন ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গিয়ে সুখী হওয়া সম্ভব নয়। তিনি তার দেশের প্রতি তার দায়িত্ব অনুভব করেন এবং জাতির যন্ত্রণার সঙ্গেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
লেখক তার বন্ধু মুস্তাফাকে দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানান, যাতে তারা একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করতে পারে এবং নিজেদের হারানো পরিচয় ও মূল্য ফিরে পেতে পারে। গল্পের শেষে, লেখক তাঁর ভগ্নস্বাস্থ্যভোগী আত্মীয় নাদিয়ার পা কাটা হওয়ার বেদনা অনুভব করে, এবং সে উপলব্ধি করে, যে শুধু নিজেকে বাঁচানোর জন্য পালিয়ে যাওয়া জীবনকে পূর্ণতা দিতে পারে না।


‘নয়া পত্তন’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৭:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. কোন দৃশ্য লেখকের মনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়? ব্যাখ্যা করো।
খ. যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ও সংকটপন্ন স্বজনদের ফেলে রেড স্বার্থপরের মতো অন্য দেশে যাওয়ার মধ্যে কোনো মন্ত্র নেই—মুস্তাফা চরিত্রের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

ক. নাদিয়ার কাটা পায়ের দৃশ্য লেখকের মনকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়।
আলোচ্য গল্পে পত্রলেখকের নিহত ভাইয়ের তের বছরের মে নাদিয়া। নাদিয়া একটি দেশপ্রেমিক চরিত্র হিসেবে প্রতিফলি হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনে ইসরাইলি সেনারা নিয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। গল্পে দেখা যায়, নাদিয়া ছোটো শিশুদে বাঁচানোর জন্য নিজের শরীর দিয়ে তাদের ঘা ঢেকে দেয়। বোমা আগুন থেকে বাঁচাতে তার নিজের শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। আ নাদিয়া চাইলেই বাঁচাতে পারতো তাঁর নিজের পা, সহজেই ছোটো ছোটো পা ফেলে সে চলে যেতে পারতো, নিজের পা-কে রক্ষা করতে পারতো। কিন্তু নাদিয়া তা করেনি। ফলে নাদিয়ার পা দুটো উরুর কাছ থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। এ দৃশ্য দেখার পর লেখক খুবই মর্মাহত হন। এমনকি গাঁজার রাস্তায়ও নাদিয়ার হারানো পায়ের প্রেক্ষাটপ যেনো দেখা যাচ্ছে। তাই লেখক নাদিয়ার এই কাটাপায়ের দৃশ্য দেখে নিজের মনকে সম্পূর্ণরূপে বদলে ফেলে।

খ. যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ ও সংকটাপন্ন স্বজনদের ফেলে রেখে স্বার্থপরের মতো অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে তো কোনো মহত্ত্ব নেই, বরং তা দেশদ্রোহিতার শামিল। মাতৃভূমি মায়ের মতো, মা যেমন তার সন্তানকে আদর-স্নেহ করে লালন করেন তেমনি মাতৃভূমিও তার সন্তানকে বা জনগণকে আলো-বাতাসে সমৃদ্ধ করে তোলে। তাই দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব অপরিসীম। দেশ মাতৃকাকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। দেশের সাথে প্রতারণা করা মানে নিজের মায়ের সাথে প্রতারণা করা। যার মধ্যে কোনো মহত্ত্ব প্রতিফলিত হয় না,ম বরং দেশদ্রোহিতার দৃষ্টান্ত লক্ষ করা যায়।
‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্পটিতে দেখা যায়, মুস্তাফা নামের লেখকের এক বন্ধু ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান এবং সেখানে সুখে দিন-যাপন করেন। এক পর্যায়ে পত্রলেখকও সেখানে যাওয়ার জন্য আহবান জানান। লেখক অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর ক্যালিফোর্নিয়া যাওয়ার জন্য রাজি হন। কিন্তু পরক্ষণে তিনি দেশমাতৃকা ও সংকটাপন্ন নিকট আত্মীয়দেরকে ফেলে রেখে ক্যালিফোর্নিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নাকোচ করে দেন। তিনি ফিলিস্তিন ছেড়ে কোথাও না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এমনকি বন্ধু মুস্তাফাকেও আহবান করে দেশে ফিরে আসায় জন্য। গল্পে লেখকের এই দৃঢ় মনোবাসনার মূলে কাজ করেছে তীব্র দেশপ্রেম। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ ও সংকটাপন্ন স্বজনদের ছেড়ে চোরের মতো পালিয়ে গেলে তিনি হয়তো ক্যালিফোর্নিয়া চলে গেলে সুখে দিনাতিপাত করতে পারবেন কিন্তু সেটা হবে দেশ মাতৃকার সাথে প্রতারণার শামিল। এই ধারণাটি লেখক পুরোপুরিভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এজন্য ক্যালিফোর্নিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণজীবন, সুবজ গাছপালা কোনো কিছুই তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তাঁর মাথায় শুধুই ঘুরপাক খাচ্ছিল দেশমাতৃকার কথা। কিন্তু মুস্তাফার চরিত্রে তা প্রতিফলিত হয় না। মুস্তাফা এসব কিছু না ভেবে ক্যালিফোর্নিয়ায় সুখে দিনযাপন করে। যা মুস্তাফাকে দেশমাতৃকা সম্পর্কে যথারীতি উদাসীন করে তুলেছে। মুস্তাফা চরিত্রকে দেশপ্রেমিক হিসেবে নয়, বরং দেশদ্রোহী চরিত্র হিসেবে প্রতিফলিত করেছে। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত উক্তিটি মুস্তাফা চরিত্রে যথাযথভাবে ফুটে উঠেছে বলে প্রতীয়মান হয়।


‘নয়া পত্তন’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৮:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. গল্পকথক লেখক বন্ধু মুস্তাফাকে কীসের আহবান করেন? ব্যাখ্যা করো।
খ. “দেশ ও স্বজনদের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই মানুষের প্রকৃত দায়িত”— ‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

ক. গল্পকথক লেখক বন্ধু মুস্তাফাকে দেশে ফিরে আসার আহবান করেন।
আলোচ্য গন্ধে মুস্তাফা যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিন ছেড়ে সুন্দর ও সুখী জীবনের প্রত্যাশায় প্রথমে কুয়েত ও পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যায়। চিঠির লেখককেও ক্যালিফোর্নিয়া যাওয়ার জন্য আহবান জানায় মুস্তাফা। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর লেখকও বিপন্ন ফিলিস্তিন ছেড়ে যাওয়ারর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু পরক্ষণেই। মা ও নিহত ভাইয়ের সত্রীর মুখে তার ভাইয়ের মেয়ে নাদিয়ার পা হারানোর বিষয়টি জানতে পারেন। যা তার ক্যালিফোর্নিয়া যাওয়ার জন্য বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন তিনি সংকটাপন্ন দেশ ছেড়ে সবুজ-শ্যামল ক্যালিফোর্নিয়া যাওয়ার জন্য কিছুতেই রাজী নন। যেখানে তার ভাইয়ের মেয়ে নাদিয়ার পা হারানোর বেদনা, সংকটাপন্ন আত্মীয়স্বজন, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ সেসব ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় সুখে দিনযাপন করার প্রত্যাশা তার কাছে বিলালিসতা মনে হয়েছে। ফলে তিনি নিজে তো যাবেনই না।
উপরন্ত বন্ধু মুস্তাফাকেও আহ্বান জানান দেশে ফিরে আসার জন্য। সংকটাপন্ন দেশ ও স্বজনদের পাশে দায়িত্বের সঙ্গে দাঁড়ানোর জন্য। তাই বলা যায় লেখক তার বন্ধুকে দেশের মানুষের বিপদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই ফিরে আসতে আহ্বান জানান।

খ. দেশ ও স্বজনদের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই মানুষের প্রকৃত দায়িতু ‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্পের আলোকে মন্তব্যটির সত্যতা ফুটে ওঠে। প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের কাছে দেশমাতৃকা মায়ের সমতুল্য। তাই দেশের ও স্বজনের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব। ‘কীর্তিমানের মৃত্যু নেই’—আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহিদ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে নিহত শহিদ, কিংবা জুলাই আন্দোলনে প্রায় দুই হাজার শহিদের কথা জাতি আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। কেননা তাঁরা দেশের সংকটকালে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে পিছুপা হয়নি। তাঁরা দেশ ও স্বজনদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এজন্য মৃত্যুর পরও তাঁদের কথা জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
‘ফিলিস্তিনের চিঠি’ গল্পেও দেখা যায়, নাদিয়ার আত্মত্যাগ যার কারণে তাকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। এছাড়া লেখকের ক্যালিফোর্নিয়া না যাওয়ার সিদ্ধান্ত এসবের মূলে কাজ করেছে তীব্র দেশপ্রেম। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও সংকটাপন্ন স্বজনদের জন্য লেখক বিদেশযাত্রায় রাজি না হয়ে দেশপ্রেমের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা সত্যিই বিরল। মায়ের মতো দেশমাতৃকা যে আমাদের আলো-বাতাসে সমৃদ্ধ করেন আমাদেরও উচিত দেশমাতৃকার সেবা করা ও তার স্বজনদের বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা। আর এটাই মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব হওয়া উচিত। নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কাজ করার উজ্জ্বল নিদর্শন স্থাপন করেছেন গল্পের নাদিয়া ও লেখক। তাঁরা নিজেদের ক্ষুদ্রস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেশমাতৃকার কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন স্থাপন করে প্রকৃত মানুষের মর্যাদায় সমুন্নত হয়েছেন। সস্থাপন করেছেন যুদ্ধের আহ্বান। ইসরাইলি তৎপরতা থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে রক্ষা করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি তাঁর বন্ধু মুস্তাফাকেও আহবান করেছেন দেশে ফিরে এসে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করার জন্য। সঙ্গতকারণেই তাই বলা যায়, দেশ ও স্বজনের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব উক্তিটি যন্ত্রর্থ বলে প্রমাণিত হয়।


তথ্যসূত্র:
১. আনন্দপাঠ: অষ্টম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৬।
২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url