ডেভিড কপারফিল্ড- চার্লস ডিকেন্স

ডেভিড কপারফিল্ড
ডেভিড কপারফিল্ড 

ডেভিড কপারফিল্ড
চার্লস ডিকেন্স
রূপান্তর: আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

আমার বাবাকে আমি কখনো দেখিনি। আমার জন্মের ছয় মাস আগে আমার বাবার চোখ থেকে এই পৃথিবীর আলো চিরকালের জন্য মুছে গিয়েছিল, তিনিও আমাকে দেখেননি।

আমি থাকতাম আমার মায়ের সঙ্গে। মা হালকা গড়নের মহিলা, আমার এক দাদি তাঁকে বলতেন মোমের পুতুল। মার স্বভাবটিও কোমল প্রকৃতির, তিনি কখনো রাগ করতে পারতেন না। আমাদের বাড়িতে কাজ করত পেগোটি বলে একটি মেয়ে, ওর সঙ্গেও মাকে কোনোদিন উঁচু গলায় কথা বলতে শুনিনি। পেগোটি থাকত আমাদের পরিবারের একজন হয়ে, আমাদের খেলাধুলা সব একসঙ্গে, খাওয়াদাওয়াও একসঙ্গে, একই টেবিলে। পড়াশোনা আমি করতাম মায়ের কাছেই, মায়ের কাছে লেখাপড়ার ব্যাপারটা খেলাধুলার মতোই ভালো লাগত। মা আর পেগোটির সঙ্গে আমার বেশ ভালোই কাটছিল।

আমার এই ছিমছাম সুখের জীবনে প্রথম ধাক্কা আসে আমার আট বছর বয়সে। মা একদিন ফের বিয়ে করলেন। আমার সৎ বাবা মার্ডস্টোন সাহেব দশাসই পুরুষ, তাঁর মস্ত জুলফি, পুরু গোঁফ এবং জোড়া ভুরু। তাঁকে দেখে প্রথম থেকেই আমার ঠিক নিজের লোক বলে মনে হয়নি। এর ওপর আমাদের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বাস করতে এলেন তাঁর বোন। ভাইবোনের চেহারায় খুব মিল, গলার স্বরও প্রায় একই রকম। ভাইবোনের স্বভাবও একইরকম- যেমন মার্ডস্টোন সাহেব তেমনি তাঁর বোন-দুজনেই কড়া মেজাজের মানুষ, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের দুষ্টুমি তাঁরা বরদাশত করতে পারতেন না, আসার পর থেকেই আমার কথাবার্তায়, আদব-কায়দায় খুঁত বার করার জন্য একেবারে হন্যে হয়ে উঠলেন।

এমনকি আমার লেখাপড়া শেখাবার কাজটিও মার্ডস্টোন সায়েব নিজের হাতে নেওয়ার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠলেন। আমি কিন্তু কোনো ব্যাপারেই তাঁর কাছে ঘেঁষতে চাইতাম না, পড়াশোনা করে পড়া দিতে যেতাম মাকেই। কোথাও আটকে গেলে মা আদর করে বলতেন, ‘বাবা ডেভি, মনে করতে পারছ না? একটুখানি চেষ্টা করে দেখো তো।’

মার্ডস্টোন সাহেব কর্কশ গলায় বলতেন, ‘আহ্। ক্লারা, ওভাবে বললে হবে না।’

মার্ডস্টোন সাহেবের বোনও একই রকম কন্ঠে ভাইয়ের সমর্থনে এগিয়ে আসতেন, ‘সোজা বলে দাও, পড়া মুখস্থ করে আসুক।’

এখন তাদের মুখের ওপর কিছু বলা আমার মায়ের সাধ্যে কুলায় না। আমি আবার বই নিয়ে বসি। কিন্তু মুশকিল হলো এই যে, মায়ের কোল ঘেঁষে বসে যে কাজটি আমি পানির মতো সহজ করে বুঝতে পারি, যে পড়া অবলীলায় বলে যাই, মার্ডস্টোন সাহেব কি তাঁর বোন সামনে থাকলে সেটি আর হয়ে ওঠে না। মার্ডস্টোন সাহেব জিজ্ঞেস করলে আমার জানা অঙ্ক ভুল হয়, মুখস্থ পড়া ভুলে যাই।

ঠিকমতো পড়া দিতে পারলেও তাঁদের মন পাওয়া যায় না, মার্ডস্টোন সাহেব এমন সব কঠিন অঙ্ক কষতে দিতেন যে আমার একেবারে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা হতো। তাঁদের এড়িয়ে চলার জন্য আমি গিয়ে ঢুকতাম আমার ঘরের লাগোয়া ছোটো ঘরে, এখানে আমার বাবার কয়েকটি বই স্তূপ করে রাখা ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর থেকে এসব কেউ ছুঁয়েও দেখত না। এখানে একা একা বসে আমি ‘রডারিক র‍্যানডম’, ‘টম জোনস’, ‘দি ভিকার অফ ওয়েকফিল্ড’, ‘ডন কুইকসোট’, ‘রবিনসন ক্রুসো’, ‘আরব্য রজনী’-এসব বইপত্র পড়তাম। কিন্তু মার্ডস্টোন সাহেবের হাত থেকে তবু আমার রেহাই নেই। আর আমার এমন অবস্থা যে তাঁর হাতে পড়লেই পড়া আর বলতে পারি না।

একদিন এমনি কী ভুল হয়ে গেল, মার্ডস্টোন সাহেব আমার ঘরে ঢুকলেন হাতে বেত নাচাতে নাচাতে। পেছনে তাঁর বোন। প্রায় ফৌজি কায়দায় দুজনকে ঢুকতে দেখে মা ভয়ে কাঁপছিলেন। আমার ওপর হঠাৎ করে বেতের বাড়ি পড়তে শুরু করলে আমি চিৎকার করে বললাম, 'পায়ে পড়ি, মারবেন না, মারবেন না। আমি তো আজ সারাদিন ধরে পড়লাম, আপনাদের দুজনকে দেখেই সব ভুলে গিয়েছি, আপনাদের দেখলেই আমার জানা পড়া গুলিয়ে ফেলি।'

‘তাই?’ বাজখাঁই গলায় মার্ডস্টোন সাহেব বললেন, ‘সব গুলিয়ে ফেলো, না? দেখি কি করে মনে রাখতে পারো, সেই ব্যবস্থা করি।’

আমার মাথাটা তিনি আঁকড়ে ধরতে চাইছিলেন, কিন্তু আমি মাথা গলিয়ে তাঁর হাত থেকে মুক্ত হলে তিনি আমার মুখ চেপে ধরে পিঠে সপাং সপাং করে বেতের কয়েকটা ঘা মারলেন, আমি আর সহ্য করতে না পেরে আমার মুখে চেপে ধরা তাঁর হাতের বুড়ো আঙুলে এ্যায়সা জোরে এক কামড় বসিয়ে দিলাম যে যন্ত্রণায় তিনি একেবারে চিৎকার করে উঠলেন। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে তিনি শুরু করলেন তাঁর আসল মার, বেতের মুহুর্মুহু আঘাতে আমার শরীর একেবারে ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছিল। ভাবলাম আজ আমি একেবারে মরেই যাব। মারতে মারতে মার্ডস্টোন সাহেবও ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আমার ঘরে আমাকে ঠেলে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হলো। অন্ধকার গাঢ় হয়ে এল, কিন্তু ঘরে আমার একটি বাতিও জ্বলল না। এর মধ্যে মিস মার্ডস্টোন রুটি আর কয়েক টুকরো গোশত দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অন্ধকার হওয়ার পর আর কেউ এল না। আমি একা একাই ঘুমিয়ে পড়লাম। এইভাবে পাঁচদিন কাটল, আমার মনে হলো, মার্ডস্টোন সাহেবের হাত কামড়ে দিয়ে আমি বোধহয় ভয়ানক একটি অপরাধ করে ফেলেছি। আমার মা একদিনও এলেন না, তাঁকে পেলেও না হয় আমি মাফ চাইতে পারতাম।

পেগোটি আমাকে চুপচুপ করে খবর দিয়ে যায় যে, লন্ডনের একটি আবাসিক স্কুলে আমাকে ভর্তি করার আয়োজন চলছে। দেখতে দেখতে আমার বিদায় নেওয়ার সময় ঘনিয়ে এল। আমি বিদায় নেওয়ার সময় মার গলা বেশ ভারী হয়ে আসছিল। এতে মার্ডস্টোন সাহেব এবং তাঁর বোন দুজনেই খুব বিরক্ত। আমার জন্যে মা যে একটু প্রাণ খুলে কাঁদবেন এঁরা সে অধিকারটুকুও তাঁকে দিতে রাজি নন।

ঘোড়ার গাড়ি যাত্রা শুরু করল। পকেট থেকে রুমাল বের করে আমি চোখে চেপে ধরলাম, কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি তা ভিজে একেবারে চপচপে হয়ে গেছে। আধমাইল পথ পেরিয়ে গাড়িটা একটু থামে, থামতে না থামতে পথের ধারে ঝোপ থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে পেগোটি। এক লাফে গাড়িতে উঠে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বাড়িতে আমাকে আদর করা দূরে থাক, বেচারি কথা বলার সুযোগটা পর্যন্ত পায় না। আমাকে ছেড়ে দিয়ে একটি কাগজের টুকরো আমার হাতে তুলে দিয়ে আর একবার সে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর গাড়ি থেকে নামবার আগে গাড়িতে একটি ব্যাগ রেখে দিল।

গাড়ি ফের গড়িয়ে চলতে শুরু করলে আমি ব্যাগটা খুলে দেখি এক টুকরো কাগজে আমার মার লেখা, 'ডেভিকে অনেক আদর ও ভালোবাসা।' কাগজটির সঙ্গে কয়েকটি টাকা।

কিছুক্ষণ পর একই এক্কাগাড়ি থেকে নেমে উঠতে হলো লন্ডনগামী কোচে। বিকাল তিনটেয় ঘোড়ায় টানা সেই কোচ ছাড়ল, লন্ডন পৌঁছবার কথা সকাল আটটায়। কোচে রাত্রিটা কিন্তু তেমন আরামে কাটেনি। দুইপাশে দুজন ভদ্রলোক ঘুমোতে শুরু করলেন, আমার দুই ঘাড় হলো তাঁদের দুজনের বালিশ। আমার অবস্থা একেবারে শোচনীয়।

শেষ পর্যন্ত সূর্য উঠল। আমার দুই দিকের দুই সহযাত্রীর ঘুম ভাঙল। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে লন্ডন শহর দেখে আমার যে শিহরন হলো তা আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না। এই আমাদের স্বপ্নের লন্ডন শহর। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, এখানে আমি একেবারে একা। রবিনসন ক্রুসোর চাইতেও একা। রবিনসন ক্রুসো যে একা তা তো আর কেউ দেখেনি, আর এই জনাকীর্ণ শহরে আমার একাকিত্ব যেন সকলের চোখে পড়ছে।

নানারকম ঝামেলার পর এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হলো। তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসছিলেন। ‘তুমিই তো নতুন এলে?’ আমার দিকে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, ‘এসো, আমি সালেম হাউসের শিক্ষক।’ আমি জানি যে সালেম হাউসে আমাকে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু ওই স্কুলের এই শিক্ষকের চেহারা একটুও আকর্ষণীয় নয়। দেখতে তিনি বড়ো রোগা, গায়ের রং ফ্যাকাশে, তাঁর পোশাকও বিবর্ণ, প্যান্টের ঝুল ও শার্টের হাতা বেশ খাটো। আমার হাত ধরে তিনি চলতে শুরু করলেন। এদিকে আমার তখন খুব খিদে পেয়েছে, শরীর বেজায় ক্লান্ত। খিদের কথা বলতে আমার বাধো-বাধো ঠেকছিল, তবে আমার নতুন শিক্ষকের চেহারা দেখে ভয় পাবার কিছু নেই। আমি বললাম, ‘কাল দুপুরের পর থেকে কিছু খাইনি।’ আরো সাহস করে বললাম, ‘কিছু কিনে খেলে ভালো হতো।’ তিনি রাজি হলে একটা দোকান থেকে ডিম আর মাংস কিনে নিলাম। এখন এগুলো খাব কী করে? আমার নতুন শিক্ষক একটি ঘোড়ার গাড়িতে করে কোথায় যে নিয়ে চললেন আমি ঠিক বুঝতেও পারছিলাম না। রাস্তায় সাংঘাতিক কোলাহল, হইচই, এইসব আওয়াজে আমার মাথায় জট পাকিয়ে যাচ্ছিল, লন্ডন ব্রিজ পেরোবার সময় ঘুমে আমার চোখ জড়িয়ে আসছিল। কিছুক্ষণ চলবার পর শিক্ষক আমাকে নিয়ে নামলেন। তাঁর সঙ্গে আমি যে ছোটো ঘরটিতে ঢুকলাম সেটি বেশ গরিব কোনো মানুষের বাসস্থান, দেখেই বোঝা যায় এটা কোনো অনাথ আশ্রমের অংশ। আবার একটি পাথরে খোদাই করা রয়েছে, ‘পঁচিশ জন দরিদ্র রমণীর জন্য প্রতিষ্ঠিত।’

ছোটো স্যাঁতসেতে ঘরটিতে ঢুকতেই বৃদ্ধা এক মহিলা খুশিতে ডেকে উঠলেন, ‘বাবা চার্লি।’ কিন্তু আমার দিকে তাঁর চোখ পড়তেই একটু থতমত খেয়ে চুপ করলেন। নতুন শিক্ষক তাঁর হাতে ডিম দিলে সসপ্যানে সেটা ভেজে দিলেন, মাংসের টুকরো সেদ্ধ করে দিলেন। আমি তো তখন ক্ষুধার্ত, গোগ্রাসে ওইসব খাচ্ছি তো শুনি যে বৃদ্ধা মহিলা শিক্ষককে বলছেন, ‘বাঁশিটা সঙ্গে থাকলে একটু বাজাও না।’

কোটের ভেতর হাত দিয়ে শিক্ষক বাঁশির তিনটে টুকরা বের করলেন, টুকরাগুলো জোড়া দিয়ে সম্পূর্ণ বাঁশি ঠিক করে নিয়ে তিনি বাজাতে শুরু করলেন।

তিনি কী সুর বাজালেন আমি জানি না, কেমন বাজিয়েছেন তাও বুঝিনি, কিন্তু তাঁর বাঁশির তীব্র ধ্বনি আমার বুকে দারুণ প্রতিধ্বনি তুলল, আমার সমস্ত বেদনার কথা যেন খুঁড়ে ওপরে উঠে এল, আমার সব কষ্টের কথা মনে পড়ল, শেষপর্যন্ত চোখের পানি আর চেপে রাখতে পারলাম না। এর মধ্যে ওই মহিলা এবং আমার নতুন শিক্ষকের চেহারার মিল দেখে আমি বুঝতে পাচ্ছিলাম যে এঁরা মা এবং ছেলে। আমার শিক্ষকের মা এত গরিব কেন, দাতব্যভবনে বাস করেন কেন-এসব প্রশ্ন মনে একটু উঁকি দিলেও আমার সমস্ত মাথা জুড়ে তখন কেবল বাঁশির সুর। আমার আন্তে আস্তে ঘুম পেতে লাগল। যখন ঘুম ভাঙল, দেখি আমি ঘোড়ার গাড়িতে বসে রয়েছি, পাশে পায়ের ওপর আড়াআড়িভাবে আরেকটি পা রেখে বাঁশি বাজিয়ে চলেছেন আমার নতুন শিক্ষক। আমি ফের ঘুমিয়ে পড়ি।

গাড়ি থামলে স্যার আমাকে নিয়ে নিচে নামলেন। সামনে উঁচু দেওয়ালে মস্ত একটি বাড়ি, সাইনবোর্ডে বড়ো বড়ো করে লেখা ‘সালেম হাউস।’ এটাই তাহলে আমার নতুন স্কুল।

দরজায় কড়া নাড়লে শক্তসমর্থ একটি লোক বেরিয়ে আসে। ঘাড়টা ষাঁড়ের ঘাড়ের মতো মোটা, একটা পা কাঠের, ছোটো করে কাটা মাথার চুল। স্যার আমার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলে সে আমাকে ভালো করে দেখল। লোকটি ভেতর থেকে এক জোড়া জুতো এনে সামনে ফেলে দিতে দিতে বলল, ‘মেল সাহেব, মুচি আপনার জুতো ঠিক করতে চায় না। এটার মেরামত করার কিছু নেই, তালি দিতে দিতে একেবারে শেষ হয়ে গেছে।’

জুতোজোড়া হাতে আমার নতুন শিক্ষক মেল সাহেব ওপরে উঠতে লাগলেন, পিছে পিছে আমি। দোতলায় উঠে শেষ প্রান্তের ঘরে হাঁটছি, হঠাৎ চোখ পড়ল একটি বোর্ডের দিকে, বোর্ডে সুন্দর করে লেখা ‘সাবধান এটা কামড়ায়।’ আশেপাশে নিশ্চয় কোনো কুকুর আছে এবং সেটা অবশ্যই কামড়ায় এই ভেবে আমি থমকে দাঁড়ালাম।

মেল সাহেব পেছনে তাকিয়ে বললেন, ‘কী হলো?’

‘এখানে বোধ হয় কুকুর আছে স্যার।’ বোর্ডের দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কুকুর নয়, কপারফিল্ড। আমাকে বলা হয়েছে, ওই বোর্ডটা যেন তোমার পিঠের সঙ্গে আটকে দিই। এখানে এসে প্রথমেই তোমার মনটা খারাপ করে দিতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু এটা আমাকে করতেই হবে।’

আমার সৎ বাবার হাতের আঙুলে কামড় দিয়েছিলাম, সেই খবর তাহলে এখানেও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, তার শান্তি কি আমাকে পেতে হবে এভাবে? সত্যি, আমি একেবারে দমে গেলাম। ক্লাসের সহপাঠীরা আমার পিঠ দেখবে আর আমাকে নিয়ে যে কি ঠাট্টা বিদ্রূপ করবে ভাবতেই লজ্জায়, ভয়ে আমি একবোরে কুঁকড়ে যেতে লাগলাম।

স্কুলের মালিক এবং প্রধান ক্রিকল সাহেব আমাকে ডেকে পাঠালেন। তাঁর সুন্দর বৈঠকখানায় বসেছিলেন মিসেস ক্রিকল আর তাঁদের মেয়ে। এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম কাঠের পা-ওয়ালা ওই লোকটিকে।

ক্রিকল সাহেবের মুখ টকটকে লাল, মনে হয় সবসময় সেখানে আগুন জ্বলছে, চোখজোড়া তাঁর ছোটো, কপালের রগগুলো সব স্পষ্ট দেখা যায়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এর নামে কোনো রিপোর্ট আছে?’

‘না স্যার’, কাঠের পা-ওয়ালা জবাব দিল, ‘নতুন এসেছে, এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই করার সুযোগ পায়নি।’ ‘এদিকে এসো।’ ক্রিকল সাহেব আমাকে এই আদেশ দিলে কাঠের পা-ওয়ালা বলে ওঠে, 'এদিকে এসো।' আমি তাঁর দিকে এগিয়ে এলে আমার কান ধরে ক্রিকল সাহেব বললেন, ‘তোমার সৎবাবাকে আমি চিনি, শক্ত স্বভাবের মানুষ। তা তিনিও আমাকে ভালো করেই চেনেন। তুমি আমাকে চেনো?’

‘না স্যার।’

‘চেনো না, না?’ আমার কানে একটা মোচড় দিয়ে তিনি বললেন, ‘চিনবে হে চিনবে।’

ক্রিকল সাহেবের এই ব্যবহারে আমার যতই খারাপ লাগুক, অনেক বেশি ভয় করতে লাগল স্কুল খুললে ছেলেদের আচরণটা কী হবে সেই ভাবনা করে। তো একদিন স্কুল খুলল, ছেলেরা হোস্টেলে এসে পড়ল। ছেলেরা যথারীতি আমার পেছনে লাগল, কারো পিঠে অমনি একটা বোর্ড সাঁটা থাকলে কিছু ঝক্কি তো তাকে পোয়াতে হবেই। তবে যা ভেবেছিলাম সে রকম ভয়াবহ গোছের কিছু ঘটল না। ‘সাবধান, এটা কামড়ায়’ বলতে বলতে ছেলেরা আমাকে খ্যাপাত, কেউ কেউ আঁতকে ওঠার ভান করত, আবার বুনো মানুষের মতো নাচতে নাচতে ‘কুকুর কুকুর’ বলে চিৎকারও করেছে। কিন্তু বেশির ভাগ ছেলেই তেমন উৎপাত করেনি। এর ওপর ক্রিকল সাহেব ক্লাসে একদিন আমাকে বেদম মারতে গিয়ে দেখলেন যে পিঠে সাঁটা ওই বোর্ডের জন্য বেতের বাড়ি ঠিক জুতমতো লাগানো যাচ্ছে না, তাই তিনি নিজেই ওটা খুলে ফেললেন।

তবে ছেলেদের উৎপাতের হাত থেকে বাঁচতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে আমাদের ক্লাসের একটি ছেলে। ওর নাম জে. স্টিরফোর্ড। আমার চেয়ে অনেক বছর বড়ো এই ছেলেটি দেখতে বেশ সুন্দর, ছাত্র হিসেবেও মেধাবী বলে তার বেশ নামডাক রয়েছে। তার প্রতি ক্রিকল সাহেবের একটু পক্ষপাতিত্বও লক্ষ করা যায়। তো এই ছেলেটি প্রথম থেকেই আমার সঙ্গে বেশ ভাব করে ফেলে। ‘রবিনসন ক্রুসো,’ ‘আরব্য রজনী,’ ‘ডন কুইকসোর্ট’-এসব বইয়ের গল্প আমি বেশ জমিয়ে বলতে পারতাম বলে ছেলেরা অনেকেই আমার পাশে ভিড় করত। স্টিরফোর্ড আর আমি রাত্রে পাশাপাশি বিছানায় ঘুমাতাম, ঘুমাবার আগে তাকে রোজ ওইসব গল্প বলে শোনাতে হতো। এমনিতে স্টিরফোর্ড আমাকে ভালোবাসত আর স্বয়ং ক্রিকল সাহেব তাকে সমীহ করতেন বলে কোনো ছেলে আমাকে ঘাঁটাতে সাহস পেত না। কিন্তু স্টিরফোর্ড কখনো কখনো বড্ডো নিষ্ঠুর হয়ে উঠত।

একদিন বিকালবেলার কথা আমার খুব মনে পড়ে। মেল সাহেবের ক্লাসে গোলমাল হচ্ছিল। মেল সাহেব এমনিতে নিরীহ গোছের মানুষ, সহজে বড়োগলা করে কথা বলতে পারতেন না। সেদিন আমি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে পড়া দিচ্ছিলাম। ছেলেরা প্রায় সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলেই চলেছে, ক্লাসে যে একজন শিক্ষক আছেন তা বোঝাই যাচ্ছিল না। মেল সাহেবের সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি হঠাৎ করে চিৎকার করে ধমক দিলেন, ‘চুপ। চুপ কর।’ তাঁর মুখে এরকম ধমক শুনতে অনভ্যস্ত ছেলেরা অবাক হয়ে চুপ করে গেল। শেষ সারিতে দেওয়ালে হেলান দিয়ে শিস দিচ্ছিল স্টিরফোর্ড, সে কিন্তু থামল না, শিস দিয়েই চলল। মেল সাহেব বললেন, ‘স্টিরফোর্ড, চুপ কর।’

‘আপনিই চুপ করুন।’ স্টিরফোর্ড পালটা ধমকের সুরে বলল, ‘জানেন আপনি চোখ রাঙিয়ে কথা বলছেন কার সঙ্গে?’

‘স্টিরফোর্ড, তুমি কি ভেবেছ তোমার বেয়াদবি আমি লক্ষ করিনি? ছোটো ছোটো ছেলেদের তুমি বারবার উসকে দিচ্ছ, আমি কি দেখছি না ভেবেছ?’ বলতে বলতে মেল সাহেবের ঠোঁটজোড়া কাঁপছিল, ‘সবাই জানে যে এখানে তোমার দিকে পক্ষপাতিত্ব করা হয়, সেই সুযোগ নিয়ে তুমি একজন ভদ্রলোককে এভাবে অপমান করতে সাহস পাও?’

‘দ্রলোক?’ স্টিরফোর্ড মহা বিস্মিত হবার ভান করে বলল, ‘ভদ্রলোকটি কোথায় বলুন তো?’

‘স্টিরফোর্ড, একজন হতভাগ্য মানুষকে এভাবে অপমান করে তুমি খুব ইতর ব্যবহার করলে। তুমি খুব অভদ্র আচরণ করলে, স্টিরফোর্ড।' বলতে বলতে মেল সাহেব আমার পিঠে আলতো করে চাপ দিয়ে বললেন, ‘কপার-ফিল্ড, পড়া বলে যাও।’

স্টিরফোর্ড বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, ‘শুনুন, একজন ভিখেরির মুখে এরকম কথা মোটেই মানায় না।’

হঠাৎ ঘরের ভেতর ক্রিকল সাহেবের ফ্যাসফেসে গলায় আওয়াজ গর্জে উঠল, ‘মেল সাহেব, কী হচ্ছে?’ মেল সাহেব চমকে উঠলেন। স্টিরফোর্ড বলল, ‘স্যার, আমার প্রতি নাকি এখানে পক্ষপাতিত্ব করা হয়-মেল সাহেবের এই কথায় আমি প্রতিবাদ করছিলাম।’

‘পক্ষপাতিত্ব?’ ফ্যাসফেসে গলায় যতটা সম্ভব হুংকার ছেড়ে ক্রিকল সাহেব বললেন, ‘আমার স্কুলে পক্ষপাতিত্বের বদনাম? আপনি কী বলতে চান মেল সাহেব?’

মেল সাহেব মাথা নিচু করে বললেন, ‘আমি খুব উত্তেজিত হয়ে বলেছি, স্যার, ঠান্ডা মাথায় থাকলে ও-রকম কথা বলতাম না।’

মেল সাহেব বিনীত হলেও স্টিরফোর্ডের উত্তেজনা কিন্তু বেড়েই চলে, সে বলে, ‘স্যার, আমাকে ইতর বলা হয়েছে, অভদ্র বলা হয়েছে, তাই আমি রেগে গিয়ে তাঁকে ভিখেরি বলেছি।’

মেল সাহেব আমার পিঠে আস্তে আস্তে হাতের চাপ দিয়েই চলেছেন, তিনি যেন আমার কাছে আশ্রয় চাইছিলেন।

ক্রিকল সাহেব বললেন, ‘ভিখারি? মেল সাহেব ভিক্ষে করেন কোথায়?’

‘তিনি ভিক্ষে না-করলেও তাঁর নিকট আত্মীয় তো করেন, একই হলো।’ বলতে বলতে স্টিরফোর্ড আমার দিকে তাকায়। মেল সাহেব তখনো আমার ঘাড়ে হাত রেখে আস্তে আস্তে চাপ দিচ্ছেন। লজ্জায়, অনুতাপে, আফসোসে আমি মাথা নিচু করে থাকি, আমিই একদিন কথায় কথায় মেল সাহেবের মায়ের গল্প করেছিলাম, তিনি যে দাতব্য আলয়ে বাস করেন সে কথাটিও বলা হয়ে গিয়েছিল। আমার চোখ নিচের দিকে, মেল সাহেব কিন্তু আমার ঘাড়ে আদর করে আন্তে আন্তে চাপ দিয়েই চলেছেন। এর মধ্যে স্টিরফোর্ড বলেই ফেলল, ‘মেল সাহেবের মা দাতব্য আলয়ে অন্যের খয়রাতের ওপর বেঁচে থাকেন।’ মেল সাহেব তখন ওই সুন্দর বালকটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অনেক কষ্টে ক্রিকল সাহেব উত্তেজনা চেপে রেখে বললেন, 'আমার এই প্রতিষ্ঠানে তো এরকম লোককে থাকতে দেওয়া যায় না।' ক্রিকল সাহেবের কপালের রগ দপ করে ফুলে উঠল, তিনি বললেন, ‘আপনি কি এটা একটা দাতব্য স্কুল ভেবেছেন? আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন এখান থেকে অব্যাহতি নিয়ে চলে গিয়ে আমাদের অপমান থেকে অব্যাহতি দিন।’

মেল সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি। আর সময় নেই।’

তাঁর সমস্ত সম্বল যা ছিল, কয়েকটি বই এবং তাঁর বাঁশিটি নিয়ে মেল সাহেব আমাদের স্কুল থেকে চলে গেলেন।

ওই রাত্রেও স্টিরফোর্ডকে গল্প শোনাতে শোনাতে আমি মেল সাহেবের বাঁশির বিষণ্ণ সুর শুনতে পাচ্ছিলাম। রাত অনেক হলে স্টিরফোর্ড ঘুমিয়ে পড়ল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি যেন শুনতে পাচ্ছিলাম যে এখান থেকে অনেক দূরে, অন্য কোথাও বসে মেল সাহেব যেন বিষাদাচ্ছন্ন সুরে এক নাগাড়ে বাঁশি বাজিয়েই চলেছেন। আমি খুব অসহায় বোধ করছিলাম।

(সংক্ষেপিত)

‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের উৎস নির্দেশ:
‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পটি চার্লস ডিকেন্সের ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ উপন্যাসের প্রথম অংশের ভাবানুবাদমূলক সংক্ষিপ্ত রূপ।

‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের শব্দার্থ ও টীকা:
➠ জুলফি- কানের পাশ দিয়ে গালের ওপর এলিয়ে পড়া চুল।
➠ বরদাশত- সহ্য।
‘রডারিক র‍্যানডম’- টবিয়াস স্মলেট রচিত রোমাঞ্চ-উপন্যাস।
‘টম জোনস’- হেনরি ফিল্ডিংসের লেখা উপন্যাস।
‘দি ভিকার অফ ওয়েকফিল্ড’- অলিভার গোল্ডস্মিথের বিখ্যাত উপন্যাস।
‘ডন কুইকসোর্ট’- স্পেনীয় লেখক সার্বেন্তেজের লেখা উপন্যাস।
‘রবিনসন ক্রুসো’- ড্যানিয়েল ডিফোর লেখা উপন্যাস।
‘আরব্য রজনী’- আরবীয় লোকগাঁথার বই।
➠ বাজখাঁই- কর্কশ।
➠ এ্যায়সা- এমন।
➠ মুহুর্মুহু- একনাগাড়ে।
➠ এক্কাগাড়ি- দুই চাকা বিশিষ্ট ঘোড়ার গাড়ি।
➠ জনাকীর্ণ- জনবহুল, বহুলোক আছে এমন।
➠ সসপ্যান- কড়াই। ইংরেজি Saucepan.
➠ গোগ্রাসে- তাড়াহুড়া করে। গরুর মতো একত্রে অধিকপরিমাণ খাদ্য গলাধঃকরণ।
ঠাট্টা-বিদ্রূপ- হাসি-তামাশা।
➠ রিপোর্ট- প্রতিবেদন, বিবরণ। এখানে অভিযোগ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
➠ ঝক্কি- ঝামেলা, বিপদ।
➠ হুঙ্কার- গর্জন।
➠ খয়রাত- দান।
➠ সম্বল- অবলম্বন।
বিষাদাচ্ছন্ন- বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেছে এমন।

‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব:
‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পটি এক বালকের জীবনের করুণ গল্প। মাত্র ছয় মাস বয়সে ডেভিড তার বাবাকে হারায়। ছোটোবেলা থেকেই ডেভিড ছিল অনুভূতি ও কল্পনাপ্রবণ। তার মায়ের নাম ছিল ক্লারা। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে ভালোই যাচ্ছিল ডেভিডের দিনগুলো, কিন্তু আটবছর বয়সে জীবনে নেমে এল নিপীড়ন। মা ক্লারা বিয়ে করলেন নিষ্ঠুর স্বভাবের ব্যক্তি মার্ডস্টোনকে। তার বোন মিস মার্ডস্টোনও বদমেজাজি। বিনা কারণে ডেভিডের ওপর রুষ্ট ছিলেন তার সৎবাবা ও মিস মার্ডস্টোন। মা ও কাজের মেয়ে পেগোটিই ছিল ডেভিডের ভালোবাসার মানুষ। ডেভিডকে লন্ডনের এক আবাসিক স্কুলে ভর্তির জন্য পাঠানো হলে সেখানেও সে নিপীড়নের সম্মুখীন হয়। তবে সেই জীবনে হৃদয়বান মানুষেরও দেখা পেল সে। তার ভালো লাগল নিরীহ ধরনের শিক্ষক মেল সাহেবকে। কিন্তু সে মেল সাহেবও টিকতে পারলেন না মানুষের মন্দ স্বভাবের জন্য।
ডেভিডের জীবন থেকে বোঝা যায়, ধৈর্য ও সংগ্রামশীলতার মধ্য দিয়েই মানুষকে টিকে থাকতে হয়।

‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের লেখক পরিচিতি:
চার্লস ডিকেন্সের পুরো নাম চার্লস জন হাফ্যাম ডিকেন্স। তিনি উনিশ শতকের শক্তিমান ইংরেজ ঔপন্যাসিক। তাঁর জন্ম ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথে। ডিকেন্স তার জীবদ্দশায়ই পূর্বসূরি লেখকদের তুলনায় অনেক জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করেন। মৃত্যুর পরও সারা পৃথিবীতে তাঁর জনপ্রিয়তা অক্ষুন্ন আছে। চার্লস ডিকেন্সের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হচ্ছে ‘অলিভার টুইস্ট’, ‘অ্যা টেল অফ টু সিটিজ’, ‘ডেভিড কপারফিল্ড’, ‘গ্রেট এক্সপেক্টেশন্স’, ‘হার্ড টাইমস’ প্রভৃতি। গভীর জীবনানুভূতি, বাস্তবতাবোধ ও মানবিকতা তাঁর রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
তিনি ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের রূপান্তরকারী-পরিচিতি:
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর জন্ম ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে গাইবান্ধা জেলায়। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাস এবং ‘অন্যঘরে অন্যস্বর’, ‘দুধভাতে উৎপাত’, ‘দোজখের ওম’ প্রভৃতি তাঁর ছোটোগল্প-গ্রন্থ। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশে-বিদেশে নানা গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও একুশে পদক লাভ করেন।
১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ডেভিড কপারফিল্ডের জীবনের প্রথম ধাক্কা কী ছিল?
খ. তার সৎ বাবা ও সৎ মায়ের চরিত্রের মধ্যে কী ধরনের মিল দেখা যায়?

ক. ডেভিড কপারফিল্ডের জীবনে প্রথম বড় ধাক্কা আসে তার মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হওয়ার পর। মাত্র ছয় মাস বয়সে পিতাকে হারানোর পর, ডেভিড এবং তার মা শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করছিল। তারা একে অপরের সঙ্গে সুখী ছিল, এবং বাড়ির কাজের মেয়ে পেগোটি ছিল তাদের সঙ্গী। কিন্তু, আট বছর বয়সে, যখন ডেভিডের মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তখন তার জীবনে পরিবর্তন আসে। ডেভিডের মা মার্ডস্টোন সাহেবের সঙ্গে বিয়ে করেন। মার্ডস্টোন ছিলেন একজন শক্তিশালী শারীরিক গঠনের ব্যক্তি, যার গোঁফ, ভুরু এবং জুলফি ছিল বড় এবং শক্ত। প্রথম থেকেই ডেভিড অনুভব করেন যে মার্ডস্টোন তার জন্য এক অচেনা এবং অস্বস্তিকর ব্যক্তি। তার উপস্থিতি ডেভিডের জন্য জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা হয়ে ওঠে। মার্ডস্টোনের অত্যাচার এবং কঠোর মনোভাব তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এরপর তার সৎ মা, মার্ডস্টোনের বোনও তাদের বাড়িতে আসেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং কঠোর প্রকৃতির। এই দুই কঠোর ব্যক্তি ডেভিডের জীবনে অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি করে।
এমন পরিস্থিতিতে, ডেভিডের সুখী এবং শান্তিপূর্ণ জীবনে যে পরিবর্তন আসে, তা তার জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা হিসেবে চিহ্নিত হয়। তার মা যখন নতুন স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সাথে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন ডেভিড তার মায়ের ভালোবাসা ও স্নেহের অভাব অনুভব করতে শুরু করে। এভাবে, ডেভিডের জীবনে প্রথম বড় ধাক্কা আসে, যখন সে বুঝতে পারে যে তার নিরাপদ ও সুখী জীবন ধীরে ধীরে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

খ. ডেভিডের সৎ বাবা মার্ডস্টোন এবং তার সৎ মা, মার্ডস্টোনের বোন, উভয়ের চরিত্রের মধ্যে কিছু মৌলিক মিল ছিল। প্রথমত, তারা দুজনেই অত্যন্ত কঠোর, নিষ্ঠুর এবং স্বার্থপর ছিলেন। মার্ডস্টোন সাহেব শারীরিকভাবে বিশালকায়, তার গোঁফ, ভুরু এবং জুলফি ছিল অত্যন্ত বড় এবং শক্ত, যা তার শক্তিশালী এবং শাসনমূলক চরিত্রের প্রতীক ছিল। তিনি একজন অত্যন্ত নির্মম ব্যক্তি ছিলেন এবং তার আচরণ ডেভিডের প্রতি ছিল প্রায় সবসময়ই শাসনমূলক এবং শত্রুতা পূর্ণ। তার সৎ মা, মার্ডস্টোনের বোন, ছিলেনও একই ধরনের নিষ্ঠুর এবং কঠোর প্রকৃতির। তিনি ডেভিডের প্রতি কোনো ধরনের সহানুভূতি বা ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন না, বরং তার প্রতি দমনমূলক মনোভাব ছিল। দুজনেই ডেভিডকে তার ব্যক্তিগত অনুভূতি বা ইচ্ছার প্রতি কোনো ধরনের সম্মান দেখাতেন না, বরং তাকে এক ধরনের শাসনাধীন হিসেবে দেখতেন।
এছাড়া, তারা দুজনেই নিজেদের স্বার্থে ডেভিডের মায়ের কাছ থেকে শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন, যেন তাদের কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতা বজায় থাকে। তারা নিজেদের সুবিধার জন্য ডেভিডের জীবনকে কষ্টদায়ক করে তুলেছিল এবং তার জন্য একটি অত্যন্ত কঠোর পরিবেশ তৈরি করেছিল। তাদের নিষ্ঠুর মনোভাব এবং শাসনমূলক আচরণ ডেভিডের জীবনে একটি অসহনীয় এবং দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি করে।
তাহলে, ডেভিডের সৎ বাবা ও সৎ মায়ের চরিত্রের মধ্যে যে মিল দেখা যায় তা হলো তাদের নির্মমতা, শাসনমূলক মনোভাব এবং স্বার্থপরতা। তারা দুজনেই ডেভিডকে ভালোবাসা ও সহানুভূতির পরিবর্তে কঠোরতা এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছিল।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. মার্ডস্টোন সাহেবের কঠোর আচরণের কারণে ডেভিডের কী সমস্যা তৈরি হয়েছিল?
খ. মা ও পেগোটির সঙ্গে ডেভিডের সম্পর্ক কেমন ছিল? আলোনা করো।

ক. মার্ডস্টোন সাহেবের কঠোর আচরণের কারণে ডেভিডের জীবনে অনেক ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছিল। মার্ডস্টোনের উপস্থিতি এবং তার শাসনমূলক মনোভাব ডেভিডের মানসিক এবং শারীরিক অবস্থা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। প্রথমত, মার্ডস্টোন ছিল একজন অত্যন্ত শাসক প্রকৃতির ব্যক্তি, যিনি ডেভিডকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতেন। তার প্রভাবের ফলে ডেভিডের জীবনে প্রথমবারের মতো ভয় এবং অনিশ্চয়তা ঢুকে পড়ে। মার্ডস্টোনের নিষ্ঠুরতা এবং অযথা দোষারোপের কারণে ডেভিডের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হতে শুরু করে এবং তার নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল।
এছাড়া, মার্ডস্টোনের অত্যাচারের কারণে ডেভিডের মানসিক অবস্থাও অবনতির দিকে এগোতে থাকে। তিনি একাকীত্ব এবং নিঃসঙ্গতার অনুভূতিতে ভুগতে থাকেন। মার্ডস্টোন তার প্রতি সবসময় অযথা রাগ এবং তিরস্কার করতেন, যা ডেভিডের শৈশবকে কঠিন করে তুলেছিল। শাসন আর ভয়ংকর আচরণের মধ্যে ডেভিড তার মায়ের স্নেহ এবং সহানুভূতি থেকে দূরে সরে যেত, যার ফলে তার দুঃখ আরও বাড়ত।
মার্ডস্টোনের আসা, ডেভিডের মায়ের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা এবং তার কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি একত্রিত হয়ে ডেভিডের জীবনকে এক দুঃখময় অবস্থায় পরিণত করে। এটি তার মনোবল ভেঙে দিয়ে, তাকে একটি নিঃস্ব, ভয়ানক এবং দুঃখপূর্ণ পরিবেশে আটকে রাখে।

খ. ডেভিডের মা এবং পেগোটি তার জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র ছিলেন, এবং তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল খুবই গভীর এবং সহানুভূতিশীল। ডেভিডের মা ছিলেন একজন আদর্শ মা, যিনি সবসময় তার সন্তানের প্রতি দয়া এবং ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন। যদিও তার মা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর মার্ডস্টোনের কঠোর শাসন এবং নির্লিপ্ততা দেখতে শুরু করেন, তারপরেও ডেভিডের মা তার সন্তানের প্রতি নিজের ভালোবাসা অক্ষুণœ রেখেছিলেন। তবে, মার্ডস্টোনের প্রভাবের কারণে ডেভিড তার মায়ের কাছে আগের মতো নিরাপত্তা এবং ভালোবাসা অনুভব করতে পারছিল না।
পেগোটি ছিল ডেভিডের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। তিনি ছিলেন বাড়ির কাজের মেয়ে, কিন্তু তার সঙ্গে ডেভিডের সম্পর্ক ছিল একদম বন্ধুত্বপূর্ণ এবং স্নেহপূর্ণ। পেগোটি ছিল একজন ভালো মানুষ, যার মনে ছিল অগাধ ভালোবাসা এবং সহানুভূতি। পেগোটি ডেভিডের কষ্ট এবং দুঃখ বুঝতে পারতেন এবং তাকে সান্ত¡না দিতেন। যদিও পেগোটি নিজেও মার্ডস্টোনের অত্যাচারের শিকার ছিল, তবুও তিনি ডেভিডের জন্য তার সর্বোচ্চ সহায়তা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন।
তাদের সম্পর্ক ছিল একে অপরকে বোঝার এবং সহানুভূতি প্রদানের মতো। পেগোটি ডেভিডের জন্য একজন প্রকৃত বন্ধু, যিনি সবসময় তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মা এবং পেগোটির সঙ্গে ডেভিডের সম্পর্ক ছিল সেই সময়ের প্রতিকূল পরিবেশেও একমাত্র আশ্রয়স্থল, যেখানে সে শান্তি এবং ভালোবাসা খুঁজে পেত।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৩:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ডেভিড লন্ডন পৌঁছানোর পর কী ধরনের অনুভূতি অনুভব করেছিলেন?
খ. ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের মূলভাব আলোচনা করো।

ক. ডেভিড যখন লন্ডনে পৌঁছেছিল, তখন তার মনের মধ্যে অনেক ধরনের অনুভূতি কাজ করছিল। তার হৃদয়ে ছিল উদ্বেগ, শঙ্কা এবং এক ধরনের শূন্যতা, কারণ সে একা ছিল এবং তাকে একটি অচেনা শহরে জীবন শুরু করতে হচ্ছিল। লন্ডনের বিশালতা, ব্যস্ততা এবং তার একাকীত্ব তাকে এক অচেনা জগতে ঠেলে দিয়েছিল। একদিকে, তার মনে ছিল স্বাধীনতা এবং নতুন কিছু শুরু করার আশা, তবে অন্যদিকে, তার মধ্যে ছিল ভয় ও অস্থিরতা, কারণ সে জানত না তাকে কীভাবে নতুন জীবনে জায়গা করে নিতে হবে।
লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তাগুলো, বড় বড় বিল্ডিং, অসংখ্য মানুষ, এবং অপরিচিত পরিবেশ ডেভিডকে ভীত ও বিভ্রান্ত করেছিল। সে যেন এক অসীম শহরের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। তার কাছে মনে হচ্ছিল, সে এখানে আসার জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং তার সামনে কতগুলো চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, তা ভাবতে তার অসুবিধা হচ্ছিল। সে একদিকে চেষ্টা করছিল নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে, অন্যদিকে তার নিজের পুরনো জীবন এবং পরিবারকে অনেকটা মিস করছিল। ফলে, লন্ডনে পৌঁছানোর পর ডেভিডের অনুভূতিগুলো ছিল একদিকে আশাবাদী, আবার অন্যদিকে হতাশার।

খ. ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ চার্লস ডিকেন্সের একটি অতি জনপ্রিয় উপন্যাস, যা মূলত একটি আত্মজীবনীর মতো। উপন্যাসটির গল্পটি ডেভিড কপারফিল্ডের জীবন কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে রচিত, যেখানে তার শৈশব, কৈশোর এবং পরিণত বয়সের বিভিন্ন সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের শুরু হয় ডেভিডের শৈশব দিয়ে। মাত্র ছয় মাস বয়সে পিতাকে হারানোর পর তার মা, মিসেস কপারফিল্ড, তাকে বড় করতে থাকেন। তার শৈশব সুখের ছিল, কিন্তু যখন ডেভিড আট বছর বয়সে, তার মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তখন তার জীবনে বড় ধাক্কা আসে। তার সৎ বাবা, মার্ডস্টোন সাহেব, একজন অত্যন্ত কঠোর, নির্মম এবং শাসনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। মার্ডস্টোনের বোনও তাদের বাড়িতে বাস করতে আসে এবং তাদের অত্যন্ত কঠোর আচরণের কারণে ডেভিডের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এমনকি তার সৎ বাবা ডেভিডকে মারধরও করতেন এবং তাকে সহ্য করতে না পেরে ডেভিড তার মায়ের কাছ থেকে পালিয়ে লন্ডনে চলে যায়। সেখানে তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। লন্ডনে এসে ডেভিড সালেম হাউসে চলে যায়, যেখানে তার প্রথম দিন ছিল অত্যন্ত কঠিন, কারণ নতুন পরিবেশে তাকে মানিয়ে নিতে খুব সমস্যা হয়।
ডেভিডের জীবনে আরও অনেক ওঠানামা ছিল। তিনি বিভিন্ন কাজ করেন, যেমন আইনজীবী হওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ, এবং নানা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন। তার জীবনের পথে অনেক প্রতিবন্ধকতা ও বাধা আসলেও, সে প্রতিটি চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সংগ্রাম করে এগিয়ে যায়। ডেভিডের সঙ্গে ছিল তার বন্ধু এবং পরামর্শদাতা পেগোটি, যারা তাকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সাহায্য করেছিল। এছাড়া, তার জীবনে নানা ধরনের চরিত্র ছিল, যেমন তার বন্ধু স্টিরফোর্ড, ড্যান, আন্ট বিটসি, এবং আরও অনেক।
শেষে, ডেভিড তার জীবনের সত্যিকার ভালোবাসা, ডোরা,কে খুঁজে পায় এবং তাদের মধ্যে একটি সুখী সম্পর্ক স্থাপন হয়। ডেভিড শেষে একজন সফল ব্যক্তি হয়ে ওঠে, যার জীবন তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে—আত্মবিশ্বাস, প্রেম, বন্ধুত্ব, এবং একে অপরকে সহ্য করে চলার শক্তি।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৪:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ডেভিডের সুখের জীবনে প্রথম ধাক্কা আসে কখন?
খ. ‘ধৈর্য ও সংগ্রামশীলতার মধ্য দিয়েই মানুষকে টিকে থাকতে হয়।’—‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের আলোকে আলোচনা করো।

ক. মাত্র ছয় মাস বয়সে পিতাকে হারানোর পর ডেভিডের জীবন তার মায়ের সঙ্গে বেশ সুখেই কাটছিল। বাড়ির কাজের মেয়ে পেগোটি এবং মায়ের সঙ্গে তার শান্ত জীবন চলছিল, তবে আট বছর বয়সে প্রথম বড় ধাক্কা আসে তার জীবনে। ডেভিডের মা তখন দ্বিতীয় বিয়ে করেন, এবং তার সৎবাবা মার্ডস্টোন সাহেবের আগমন ঘটে। মার্ডস্টোন ছিলেন শারীরিকভাবে বিশালকায়, তার গোঁফ, ভুরু এবং জুলফি ছিল অত্যন্ত বড় এবং শক্ত। প্রথম থেকেই ডেভিড তাকে নিজের মানুষ বলে অনুভব করেনি। এরই মধ্যে মার্ডস্টোনের বোনও তাদের সঙ্গে বাস করতে আসে। এই দুই কঠোর মানুষ ডেভিডের জীবনে দুর্ভোগের কারণ হয়ে ওঠে। তাই বলা যায়, ডেভিডের সুখী জীবনে প্রথম বড় ধাক্কা আসে তার মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর, যখন সৎবাবা মার্ডস্টোন ও তার বোন তাদের জীবনে প্রবেশ করেন।

খ. মানুষের জীবন কখনোই সহজ বা নির্বিঘ্ণ থাকে না; জীবনের প্রতিটি ধাপে একের পর এক চ্যালেঞ্জ, বিপদ ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এ বাধাগুলির মোকাবিলা করতে ধৈর্য এবং সংগ্রামের প্রয়োজন। ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পটি আমাদের এই শিক্ষা দেয়। গল্পের মূল চরিত্র, ডেভিড, মাত্র ছয় মাস বয়সে তার বাবা হারায়, এবং শুরুতে মায়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ জীবন কাটায়। তবে আট বছর বয়সে, তার মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর, তার জীবনে একের পর এক দুঃখ ও নির্যাতন শুরু হয়। সৎবাবা মার্ডস্টোনের অত্যাচারে ডেভিডের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তার মায়ের স্নেহের চেয়ে সৎবাবার নিষ্ঠুর আচরণই বেশি হয়ে দাঁড়ায়। একসময় ডেভিডকে লন্ডনের সালেম হাউসে পাঠানো হয়, যেখানে সে আবার নিপীড়নের শিকার হয়। তবে, সেখানে সে একজন সৎ মানুষ, শিক্ষক মেল সাহেবের সহানুভূতি পায়। কিন্তু কিছু খারাপ মানুষদের জন্য মেল সাহেবও সেখানে থাকতে পারেন না। এর পরেও ডেভিড জীবনের সব প্রতিকূলতাকে মেনে নিয়ে, ধৈর্য ধারণ করে এগিয়ে চলে। শেষপর্যন্ত, এটি স্পষ্ট হয় যে, জীবনের সকল বাধা এবং বিপদকে অতিক্রম করে ধৈর্য ও সংগ্রামের মাধ্যমে মানুষের টিকে থাকা এবং সফল হওয়া অপরিহার্য।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৫:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ডেভিডের ওপর মার্ডস্টোনের নিষ্ঠুর আচরণের চিত্রটি সংক্ষেপে লেখ।
খ. মেল সাহেবের প্রতি স্টিরফোর্ড ও ক্রিকল সাহেবের নিষ্ঠুর আচরণ আলোচনা করো।

ক. ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পে ডেভিড মাত্র ছয় মাস বয়সে তার বাবাকে হারায়। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল এক অনুভূতিশীল এবং কল্পনাপ্রবণ শিশু। বাবার মৃত্যুর পর, তার মা ক্লারা এবং ডেভিড একসাথে ভালোই কাটছিল। কিন্তু যখন তার মা মার্ডস্টোন নামে এক নিষ্ঠুর পুরুষকে বিয়ে করেন, তখন থেকে ডেভিডের জীবনে দুর্ভোগ শুরু হয়। মার্ডস্টোন এবং তার বোন, যারা দুজনেই ছিলেন বদমেজাজি, তাদের সাথে ডেভিডদের বাসায় আসেন। প্রথমে ডেভিড তার মায়ের কাছেই পড়াশোনা করত, কিন্তু সৎবাবা মার্ডস্টোন তার পড়াশোনার দায়িত্ব নিজের হাতে নিতে চান। তিনি ডেভিডের প্রতি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন, যার ফলে ডেভিড তার সামনে পড়া বলতে পারল না। যখন মায়ের কাছে পড়তে গিয়ে কোথাও আটকে যেত, মা তাকে ধৈর্য ধরতে এবং চেষ্টা করতে বলতেন। কিন্তু মার্ডস্টোন তাতে বিরক্ত হয়ে যেতেন, যার ফলে ডেভিডের মন আরো খারাপ হয়ে যেত। তিনি সঠিকভাবে পড়া দিতে পারলেও, মার্ডস্টোন তাকে কঠিন অঙ্ক করতে বাধ্য করতেন। একদিন তিনি ডেভিডকে বেত দিয়ে অত্যাচার করেন। বেত দিয়ে অনেকক্ষণ আঘাত করার পর, ডেভিড যখন আর সহ্য করতে পারল না, তখন সে মার্ডস্টোনের হাতে কামড় বসিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করে। এরপর মার্ডস্টোন আরো মারধর করেন এবং শেষে তাকে এক ঘরে তালাবন্দী করে রাখেন। এইভাবেই মার্ডস্টোন ডেভিডের ওপর নিষ্ঠুর অত্যাচার চালাতে থাকে।

খ. ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পে মেল সাহেব একজন নিরীহ এবং গরিব শিক্ষক, যিনি সালেম হাউসে পড়াতেন। গল্পে তার ওপর স্কুলের প্রধান ক্রিকল সাহেব এবং ছাত্র স্টিরফোর্ডের নিষ্ঠুর আচরণ দৃশ্যমান। একদিন বিকেলে ক্লাসে গোলমাল হচ্ছিল। মেল সাহেব, যিনি সাধারণত শান্ত স্বভাবের, যখন ছাত্রদের এমন অশান্ত আচরণ দেখেন, তখন তার সহ্যশক্তি শেষ হয়ে যায় এবং তিনি চিৎকার করে তাদের চুপ করতে বলেন। তার ধমক খেয়ে ছাত্ররা চুপ হয়ে যায়, তবে স্টিরফোর্ড পিছন থেকে শিস দিতে থাকে। মেল সাহেব তাকে চুপ করতে বললেও, স্টিরফোর্ড উল্টো তার সাথে বেয়াদবি করে। মেল সাহেব জানতেন, স্টিরফোর্ডের প্রতি ক্রিকল সাহেবের পক্ষপাতিত্ব ছিল, এবং স্টিরফোর্ড তার পক্ষ থেকে মেল সাহেবের বিরুদ্ধে ক্রিকল সাহেবের কাছে বাজে কথা বলতো। একসময় স্টিরফোর্ড মেল সাহেবকে ভিখিরি বলে তার সম্মানহানি করে। পরে, ক্রিকল সাহেব আসলে স্টিরফোর্ডের কথার ভিত্তিতে মেল সাহেবের বিরুদ্ধে অন্যায় অভিযোগ তুলে তাকে অপমান করেন এবং তাকে স্কুল থেকে চলে যেতে বলেন। মেল সাহেব তখন সেখানে কাজ ছেড়ে চলে যান। এই ঘটনার মাধ্যমে ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পে মেল সাহেবের প্রতি স্টিরফোর্ড এবং ক্রিকল সাহেবের নিষ্ঠুর এবং অবিচার আচরণ ফুটে ওঠে।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৬:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. সালেম হাউসে ডেভিডকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে কে? ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের মূলভাব আলোচনা করো।

ক. লন্ডনের সালেম হাউস স্কুলে, ডেভিডকে তার সহপাঠী জে. স্টিরফোর্ড সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল, বিশেষ করে অন্যান্য ছাত্রদের উৎপাত থেকে। স্টিরফোর্ড ছিল ডেভিডের চেয়ে বয়সে বড়, সুদর্শন এবং মেধাবী ছাত্র। তাকে ক্রিকল সাহেবের পক্ষ থেকে বিশেষ সমীহ ছিল। ডেভিড যেহেতু ভালো গল্প বলতে পারত, যেমন রবিনসন ক্রুসো, আরব্য রজনী, ডন কুইকসোটের মতো বইয়ের কাহিনী, তাই অনেকেই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করত। স্টিরফোর্ডও ডেভিডের সাথে বন্ধুত্ব করেছিল এবং তারা একসাথে ঘুমাত। ঘুমানোর আগে ডেভিড তাকে বইয়ের গল্প শোনাত, এবং স্টিরফোর্ডও ডেভিডকে খুব ভালোবাসত। ক্রিকল সাহেবের পক্ষ থেকে স্টিরফোর্ডকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ায়, সালেম হাউসে ডেভিডকে কোনো ছাত্র খোঁচাতে সাহস পেত না। এভাবেই, ডেভিডের জন্য সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী ছিল তার ক্লাসমেট স্টিরফোর্ড।

খ. জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ একটি আত্মজীবনীমূলক গল্প। এই উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ করেছেন আখতারজ্জামান ইলিয়াস। আলোচিত গল্পটি উপন্যাসের প্রথম অংশের সংক্ষিপ্ত রূপ। ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পে, ডেভিড নামক বালকের জীবনের এক করুণ চিত্র ফুটে ওঠে।
ছয় মাস বয়সে ডেভিড তার বাবাকে হারায় এবং ছোটবেলা থেকেই সে ছিল অনুভূতিশীল এবং কল্পনাপ্রবণ। তার জীবন সুখী ছিল, কারণ তার মা ক্লারা এবং কাজের মেয়ে পেগোটি তার কাছাকাছি ছিল। কিন্তু আট বছর বয়সে তার জীবনে বড় ধাক্কা আসে যখন তার মা দ্বিতীয় বিয়ে করে মার্ডস্টোন নামক এক নিষ্ঠুর পুরুষের সাথে। এর পর থেকেই তার জীবনে নিপীড়ন শুরু হয়, কারণ মার্ডস্টোন ও তার বোন দুজনেই ছিলেন বদমেজাজি। ডেভিডের প্রতি তাদের ক্ষোভ ছিল, এবং এ কারণে তার মা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। ডেভিড তার মা এবং পেগোটির ভালোবাসা পেয়েছিল, কিন্তু তার জীবনের সেরা সময়গুলো শেষ হয়ে যায়। তাকে লন্ডনের সালেম হাউসে পাঠানো হয়, যেখানে সে আবার নিপীড়নের শিকার হয়। তার সৎবাবা মার্ডস্টোনের কারণেই এই অশান্তি শুরু হয়, কারণ সে ইচ্ছাকৃতভাবে ডেভিডকে হেয় করে এবং উপহাসের পাত্র বানায়। তবে, সালেম হাউসে ডেভিড একজন ভালো মানুষ, শিক্ষক মেল সাহেবের সঙ্গে পরিচিত হয়। মেল সাহেব তার জন্য হৃদয়বান সহায়ক ছিলেন, কিন্তু দুর্বিপাকের কারণে মেল সাহেবও সেখানে থাকতে পারেন না। মেল সাহেবের চলে যাওয়ার পর, ডেভিড আবার অসহায় বোধ করে। এই গল্পে মূলত ডেভিডের সুখী জীবনে আঘাত হানা সব প্রতিকূলতাকে তুলে ধরা হয়েছে, এবং তার জীবন কাহিনিতে এটি স্পষ্ট যে, ধৈর্য ও সংগ্রামের মাধ্যমে মানুষকে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৭:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. মেল সাহেবকে সালেম হাউস থেকে বের করে দেওয়া হয় কেন?
খ. ‘সাবধান এটা কামড়ায়’ বলতে ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পে কী বোঝানো হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।

ক. লন্ডনের সালেম হাউসের একজন নিরীহ শিক্ষক মেল সাহেব, যিনি নিজে হতদরিদ্র ছিলেন, ডেভিডের জীবনে একমাত্র হৃদয়বান ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত হন। সালেম হাউসে আসার পর, ডেভিডের একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠে এই শিক্ষক। মেল সাহেবের মা একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে জীবনযাপন করতেন, যা জানাজানি হলে, সালেম হাউসের ছাত্র স্টিরফোর্ড তার মাকে ভিক্ষুক বলে অপমান করে। তার মায়ের দাতব্য প্রতিষ্ঠানে থাকা জানিয়ে দিলে, সালেম হাউসের প্রধান শিক্ষক ক্রিকল সাহেবও তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন, কারণ এটি স্কুলের মানহানি হতে পারে। মেল সাহেব তখনই স্কুল থেকে চলে যান, এবং তার মা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে থাকার কারণে তাকে অব্যাহতি নিতে হয়।

খ. চার্লস ডিকেন্সের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ এর বাংলা অনুবাদ করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। এই গল্পে ডেভিডের সৎবাবা মার্ডস্টোন তাকে নির্যাতন করতে শুরু করেন। একদিন মার্ডস্টোন তাকে বেত্রাঘাত করতে থাকেন, আর ডেভিড সহ্য না করে তার সৎবাবার বুড়ো আঙুল কামড়িয়ে ফেলে। এর পরেই ডেভিডকে লন্ডনের আবাসিক স্কুল সালেম হাউসে পাঠানো হয়, যেখানে তার সৎবাবার নির্দেশে একটি সাইনবোর্ডে লেখা থাকে ‘সাবধান, এটা কামড়ায়’। ডেভিড প্রথমে ভাবছিল যে, সাইনবোর্ডে কোনো কুকুরের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু মেল সাহেব তাকে জানিয়ে দেন যে, এখানে কোনো কুকুর নেই, বরং তাকে কুকুর বলা হয়েছে। সাইনবোর্ডটি তার সৎবাবার নির্দেশে সেখানে রাখা হয়, এবং মেল সাহেব বাধ্য হয়ে এটি সঠিকভাবে লাগাতে থাকেন। সৎবাবার এমন আচরণের কারণে ডেভিড অত্যন্ত লজ্জিত ও ভীত হয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পে ডেভিডের ওপর সৎবাবার নির্যাতনের চিত্র ফুটে ওঠে, যেখানে তাকে কুকুরের সাথে তুলনা করা হয় এবং তার জীবনকে আরও অমানবিকভাবে দুর্বিষহ করে তোলা হয়।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৮:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ডেভিডের পিঠ থেকে সাইনবোর্ড খুলে নেওয়া হয় কখন?
খ. লন্ডনের মতো জনাকীর্ণ শহরেও ডেভিড একা হয়ে পড়ে কেন? ব্যাখ্যা করো।

ক. সৎবাবা মার্ডস্টোনের বেত্রাঘাত সহ্য করতে না পেরে একদিন ডেভিড তার আঙুল কামড়ে দেয়, যা তার জীবনে এক বড়ো বিপর্যয় হয়ে দাঁড়ায়। বাড়ি থেকে নির্বাসিত হওয়া সত্ত্বেও তার মুক্তি মেলেনি। লন্ডনের সালেম হাউসে পৌঁছানোর পরেও সৎবাবার নির্দেশে তার পিঠে সাইনবোর্ডে লেখা হয়, ‘সাবধান, এটা কামড়ায়’। এই সাইনবোর্ড দেখে অনেকে তাকে খ্যাপাত, কেউ ভয় পেত এবং কেউ কেউ বুনো মানুষ হিসেবে চিৎকার করে কুকুর কুকুর বলে নাচত। তবে স্কুলের বেশিরভাগ ছেলেই তেমন কিছু করেনি। ডেভিড এই সাইনবোর্ড ধারণ করে জীবনের এক একাকী ও বেদনাদায়ক সময় পার করছিল। একদিন ক্লিকল সাহেব যখন তাকে মারছিলেন, তখন তিনি লক্ষ্য করেন যে, সাইনবোর্ডের কারণে বেতের বাড়ি সঠিকভাবে তার পিঠে পড়ছে না। তাই ক্লাসেই তিনি ডেভিডের পিঠ থেকে সাইনবোর্ডটি খুলে দেন।

খ. সৎবাবা মার্ডস্টোনের অত্যাচারে পীড়িত হয়ে একদিন ডেভিড মার্ডস্টোনের আঙুল কামড়ে দেয়, যার পর তাকে বাড়ি থেকে বের করে লন্ডন পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
লন্ডনে পৌঁছানোর পর, যদিও এটি ছিল এক জনপ্রিয় শহর, ডেভিডের একমাত্র আশ্রয় ছিল তার মায়ের কাজের মেয়ে পেগোটি, যিনি তাকে সবসময় স্নেহ করতেন। তবে ডেভিডকে বাড়ি থেকে পাঠানোর পর, সে লন্ডনের মতো জনাকীর্ণ শহরে একেবারে একা হয়ে পড়ে। মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকেই তার জীবন এক দুর্বিষহ অধ্যায়ে প্রবেশ করে। সৎবাবা মার্ডস্টোনের নির্যাতনে পীড়িত হয়ে, ডেভিড একদিন মুখ চেপে ধরে তাকে কামড়ে দেয়, এরপর তাকে পাঁচদিন এক অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়। পেগোটি তাকে জানায় যে, তাকে লন্ডনের একটি আবাসিক স্কুলে পাঠানো হবে। সেই বিদায়ের মুহূর্তে পেগোটি তাকে কিছু টাকা ও একটি কাগজের টুকরা দেয়, এবং ডেভিড ঘোড়ার গাড়িতে করে তার যাত্রা শুরু করে। একাকী, চোখে অশ্রু নিয়ে, ডেভিড লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। রাতের যাত্রায় সঙ্গী দুজন তার পাশে ঘুমিয়ে থাকে, কিন্তু পরের দিন সকালে ডেভিড লন্ডনে পৌঁছায়। যদিও লন্ডন ছিল একটি স্বপ্নের শহর, সেখানে পৌঁছানোর পর, ডেভিডের মনে হয় সে একেবারে একা, এমনকি রবিনসন ক্রুসো থেকেও বেশি একা, কারণ সে একা ছিল একটি নির্জন দ্বীপে, যেখানে কেউ তার একাকিত্ব দেখে না। কিন্তু ডেভিডের একাকিত্ব সবজনের নজরে আসে, কারণ লন্ডনের মতো জনাকীর্ণ শহরে তার জন্য কেউ ছিল না। সে একা হয়ে পড়ে, কারণ শহরের কেউই তাকে খোঁজে না বা তার সঙ্গে কথা বলে না। বাড়ির কাছের মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, ডেভিড অপরিচিত লন্ডন শহরে একেবারে একা হয়ে পড়ে।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৯:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. “বোর্ডে সুন্দর করে লেখা ‘সাবধান’ এটা কামড়ায়” —উদ্ধৃতাংশটি ব্যাখ্যা করো।
খ. “চেনো না, না? আমার কানে একটা মোচর দিয়ে তিনি বললেন—চিনবে হে চিনবে।” প্রসঙ্গসহ বিশ্লেষণ করো।

ক. বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, চার্লস ডিকেন্সের ‘ডেভিড কপারফিলন্ড’ উপন্যাসের প্রথম অংশের ভাবানুবাদ করেন। কথাসাহিত্যিক এই অংশে একটি বালকের জীবনের করুণ গল্প তুলে ধরেন।
বালকটির নাম ছিলো ডেভিড। ডেভিড ছোটোবেলা থেকেই ছিলো বেশ অনুভূতি ও কল্পনাপ্রবণ একজন বালক। জীবনের প্রথমেই ডেভিড মাত্র ৬ মাস বয়সেই বাবাকে হারায়। ডেভিডের জীবনের বাল্যকালের কাহিনি নিয়েই গল্পটির ঘটনা আবর্তিত হতে থাকে। বাবার মৃত্যুর পরও মায়ের সাথে ডেভিডের জীবন ভালোই কাটছিলো। কিন্তু, ডেভিডের বয়স যখন আট বছর তখন তার মা ক্লারা আবার বিয়ে। করলে তাঁর জীবনে কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়। ডেভিডের সৎবাবা ছিলেন নিষ্ঠুর স্বভাবের মানুষ। তিনি সবসময় বালক ডেভিডের ত্রুটি খুঁজতে থাকেন এবং একটু সুযোগ পেলেই প্রহার করা শুরু করেন। একবার ডেভিডকে শক্ত করে ধরে তার সৎবাবা তাঁকে মারতে থাকলে সে পালানোর জন্য তার হাতে কামড় দেয়। সৎবাবা তাকে দূরে রাখার জন্য লন্ডনের এক আবাসিক স্কুলে পাঠায় এবং নিষ্ঠুর সৎবাবা তার পিঠে একটি বোর্ড লাগিয়ে দিতে বলে যাতে লেখা ছিলো—‘সাবধান এটা কামড়ায়’। বাড়ি থেকে দূরে থেকেও নিষ্ঠুর সৎবাবার লাঞ্ছনার স্বীকার হতে হয় ডেভিডকে।

খ. ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের শিক্ষক ক্লিকল, ডেভিডের বাবার বিষয়ে প্রশ্নোক্ত মন্ত্রব্যটি করেছিলেন।
‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পটি চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাসের প্রথম অংশের ভাবানুবাদ এর সংক্ষিপ্ত রূপ। গল্পে ডেভিড নামের এক বালকের জীবনের করুণ কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। ডেভিডের জন্ম থেকে বালক অবস্থায় এবং আবাসিক স্কুলের পড়ানোর জীবন বৃত্তান্ত বিধৃত হয়েছে গল্পে। ডেভিডের মায়ের নাম ছিলো ক্লারা। ডেভিডের বয়স যখন ছয় মাস তখন তার বাবা মারা যায়। এরপর ডেভিড দীর্ঘদিন মায়ের সাথে বেশ আনন্দেই দিন কাটিয়েছে। অতঃপর ডেভিডের বয়স যখন আট বছর তখন তাঁর মা ক্লারা আবার নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মায়ের নতুন বিবাহের মধ্য দিয়ে ডেভিডের জীবনের মোড় পরিবর্তন হয়ে যায়। ডেভিডের সৎবাবার নাম মার্ডস্টোন। মার্ডস্টোন ছিলেন নিষ্ঠুর স্বভাবের। বিয়ের কিছুদিন পর স্থায়ীভাবে তাদের সাথে বসবাসের জন্য সৎবাবা মার্ডস্টোন এর বোন মিস মার্ডস্টোনও চলে আসে। মিস মার্ডস্টোনও ছিলেন চরিত্রগত দিকে থকে তার ভাইয়ের মতোই। বদমেজাজি স্বভাবের। বিনা কারণেই ডেভিডের ওপর রুষ্ট ছিলেন তার সৎবাবা মার্ডস্টোন ও তার বোন মিস মার্ডস্টোন।
ডেভিডের সৎবাবা প্রায়ই নানা অজুহাতে ডেভিডকে মারধর করতো। একবার প্রচ-ভাবে মার খেতে থাকা ডেভিড সৎবাবার হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য তার আঙুলে কামড় দেয়। সৎবাবা তাকে বাড়ি ছাড়া করার জন্য দূরে লন্ডনের এক আবাসিক স্কুলে পাঠায়। সেখানে গিয়ে তার শিক্ষকদের সাথে পরিচিত হয় এবং এক পর্যায়ে তার শিক্ষক ক্লিকল সাহেব ডেভিডকে জিজ্ঞেস করে তার বাবার সম্পর্কে। শিক্ষক তার সৎবাবাকে ভালোভাবেই চিনতেন। তার সংবাবার চরিত্র যে বদমেজাজি, শত্রু স্বভাবের মানুষ এমনটিই শিক্ষক ইঙ্গিত করেছিলেন। তাই বলা যায়, শিক্ষক ক্লিকলের কথার মাধ্যমে ডেভিডের প্রতি তিনি ইঙ্গিত দেন যে তোমার সৎবাবার বদমেজাজি স্বভাব, তোমাকে বাড়ি ছাড়া করেছে, পিঠে লাঞ্ছনা বোর্ড লাগিয়েছে এমন আরও নিষ্ঠুর কাজ তোমার সৎবাবা বারংবার করতে পারে, তখন ঠিকই বুঝতে পারবে। অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানে শিক্ষকের কথার সত্যতা উপলব্ধি করতে পারবে।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১০:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পটির সারসংক্ষেপ ব্যাখ্যা করো।
খ. “ধৈর্য ও সংগ্রামশীলতার মধ্য দিয়েই মানুষকে টিকে থাকতে। হয়।”—মন্তব্যটি ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

ক. কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পটি চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাসের প্রথম অংশের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেন।
এ গল্পের কেন্দ্রিয় চরিত্র হলো ডেভিড কপারফিল্ড। এটি একটি বালকের জীবনের করুণ গল্প। ডেভিডের বাল্যকালের ঘটে যাওয়া করুণ কাহিনিই গল্পটির বিষয়বস্তু। ছোটোবেলায় যখন ডেভিডের বয়স ছিলো ছয় মাস তথন ডেভিড পিতৃহারা হয়েছিলো। অতঃপর মায়ের সরো ডেভিড। থাকতে শুরু করে। কিন্তু যখন ডেভিডের বয়স আট বছর তখন তার মা আবার বিয়ে করলেন। তার মায়ের দ্বিতীয় বিয়েই ডেভিডের কপালে দুঃখে-যন্ত্রণা বয়ে আনে। কারণ ডেভিডের সৎবাবা মার্ডস্টোন শক্ত, কর্কশ, বদমেজাজি স্বভাবের। তিনি ডেভিডকে সুদৃষ্টিতে দেখতে পারেনি। ছোটো ছোটো কারণে-আকারণে প্রতিনিয়ত ডেভিডের উপর নিপীড়ন চালাতে থাকে ডেভিডের সৎবাবা মার্ডস্টোন। একসময় মার্ডস্টোনের বোনও যুক্ত হয় ডেভিডকে অত্যাচার করতে। একবার ডেভিড মার খাওয়া থেকে বাঁচতে তার সৎবাবার আঙুলে কামড় দিলে তিনি ডেভিডকে আবাসিক স্কুলে পাঠান। এভাবে, ডেভিড নামক বালকটি ছোটো থেকে নানা বাধা-বিপত্তি, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে টিকে থাকার লড়াই করতে থাকে। আর ডেভিডের এই জীবনকাহিনিই পঠিত গল্পের সংক্ষিপ্ত ভাব।

খ. জীবনে চলার পথে নানা বাধা-বিপত্তি আসবেই আর এই বিপদে ধৈর্য ও সংগ্রামশীলতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকার লড়াই করে যাওয়ার নামই হলো জীবন। বাংলাদেশের একজন কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এমনই এক জীবন-বাস্তবতার গল্প তুলে ধরেছেন ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ ছোটো গল্পের মধ্য দিয়ে। গল্পটি মূলত চার্লস ডিকেন্সের ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ উপন্যাসের প্রথম অংশের ভাবানুবাদমূলক সংক্ষিপ্ত রূপ। গল্পটির কেন্দ্রিয় চরিত্র হিসেবে রূপায়িত করেছেন ডেভিড নামের এক বালককে। মূলত ডেভিড কপারফিল্ডের বাল্যজীবনের করুণ কাহিনি লেখক তুলে ধরেছেন। জীবনের উত্থান-পতন, বিপদ, নিপীড়ন, অত্যাচার ইত্যাদি পর্যায়ক্রমে আসলেও হার না মানার মানসিকতা, ধৈর্য ও সংগ্রাশীলতার মধ্য দিয়েই মানুষকে টিকে থাকতে হয়। গল্পে বর্ণিত ডেভিড মাত্র ছয় মাস বয়সে তার বাবাকে হারায়।
ডেভিড চরিত্রে অনুভূতি ও কল্পনাপ্রবণ বৈশিষ্ট্য ছোটোবেলা থেকেই ছিলো। বাবার মৃত্যুর পর ডেভিডের জীবন মায়ের সাথে বেশ আনন্দেই কাটছিলো। ডেভিডের বয়স যখন আট বছর তখন তার মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাঁর সথাবা মার্ডস্টোন ছিলো শক্ত কর্কশ, বেদমেজাজি স্বভাবের মানুষ। নিপীড়ণের দোসর হিসেবে তার সৎবাবার বোন মিস মার্ডস্টোনও যুক্ত হয়। কারণে-অকারণে ডেভিডকে মারধর, নির্যাতন, অত্যাচারের স্বীকার হতে হয়। একবার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে এই সৎবাবার আঙুলে কামড় দিলে তাকে বাড়ি থেকে দূরে লন্ডন শহরে আবাসিক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। সেখানে তাকে লাঞ্ছনা করার জন্য পিঠে বোর্ড লাগিয়ে দেয়; যেখানে লেখা ছিলো 'সাবধান, এটা কামড়ায়'। অর্থাৎ বাড়ি থেকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার পরও তার বাবার অ্যাচার দেওয়ার প্রবণতা কমেনি। এভাবে ডেভিডের জীবনে প্রথমে বাবাকে হারানো, পরবর্তীতে মায়ের দ্বিতীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে মাকেও হারানো, বাড়ি ছেড়ে দূরে অবস্থান করা ইত্যাদি জীবনবাস্তবতা ডেভিডকে সহ্য করতে হয়। তাই বলা যায়, ধৈর্য ও সংগ্রামশীলতার মধ্য দিয়েই মানুষকে টিকে থাকতে হয়।


‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১১:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ডেভিডকে সহপাঠীরা কী বলে খ্যাপাতো এবং কেনো খ্যাপাতো—ব্যাখ্যা করো।
খ. “একজন ভিখেরির মুখে এরকম কথা মোটেই মানায় না” কে, কাকে ভিখেরি বলে সম্বোধন করেছিলো এবং কেনো করেছিলো? স্বপ্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করো।

ক. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কর্তৃক অনুবাদকৃত গল্পে ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ —ডেভিডের সহপাঠীরা ‘সাবধান, এটা কামড়ায়’ বলে বলে তাকে খ্যাপাতো। ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পটিতে বালক ডেভিডের জীবনের করুণ কাহিনি তুলে ধরেছেন লেখক। ডেভিড ছোটোবেলায় তার বাবাকে হারিয়ে ফেলে। তারপর শুরু হয় মায়ের সাথে তার বসবাস। কিন্তু ডেভিডের বয়স যখন আট বছর বয়স তখন তা মা ক্লারা আবার বিয়ে করেন। ডেভিডের সৎবাবা মার্ডস্টোন ছিলেন নিষ্ঠুর প্রকৃতির। বদমেজাজী লোকটি ডেভিডকে মোটেই সহ্য করতে পারতেন না। তিনি ডেভিডের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার করতেন। মা ক্লারা কিছুই প্রতিকার করার সাহস রাখতো না। তার উপরে মার্ডস্টোনের সাথে তার বোন মিস মার্ডস্টোনও যুক্ত হয়। তিনিও ডেডিডকে অত্যাচার করতে উৎসাহ দিতেন। এরূপ অত্যাচারের মুখোমুখি হয়ে ডেভিড একদিন তার সৎবাবাকে কামড়ে দেয়। এই কারণে তাকে ঘরে তালাবন্ধ থাকতে হয়। এমনকি দুইভাবোন মিলে ডেভিডকে ডেভিডকে বাড়ি ছাড়া করে। লন্ডনের এক আবাসিক স্কুলে তাকে পাঠানো হলেও সেখানে তাকে লাঞ্ছনা করা হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ সৎবাবার কথা অনুযায়ী তার পিঠে বোর্ড লাগিয়ে দেয়, যেখানে লিখা ছিলো 'সাবধান, এটা কামড়ায়'। আর এটা দেখে অনেকে খ্যাপাতো, অনেক আঁতকে ওঠার ভান করতো, অনেকে কুকুর কুকুর বলে চিৎকার করতো। এভাবেই ডেভিডের সহপাঠীরা তাকে খ্যাপাতো।

খ. কপার ফিল্ডকে আবাসিক স্কুলে পাঠানো হয় বাড়ি থেকে দূরে লন্ডনের এক স্কুলে। সেই স্কুলের এক শিক্ষার্থী নাম স্টিরফোর্ড তার শিক্ষক মেল সাহেবকে বলেছিলো শুনুন, একজন ভিখেরির মুখে এরকম কথা মোটেও মানায় না। প্রসঙ্গত, ডেভিড কপারফিল্ড গল্পটি কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অনুবাদকৃত সাহিত্য। ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ গল্পটি ডেভিড নামক এক বালকের জীবন কাহিনি নিয়ে রচিত হয়েছে। জীবন বাস্তবতার কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার হতে হয়েছে ডেভিডকে।
জীবনে টিকে থাকতে আগত বিপদ-বাধা, নিপীড়ন-নির্যাতন সবকিছু সহ্য করেই সামনে এগোতে হবে। ডেভিডকে এক অসহায় বালক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাবার মৃত্যুর গর তার আট বছরে মা ক্লারা দ্বিতীয় বিয়ে করলো। তার সৎবাবা মার্ডস্টোন ছিলেন অত্যাচারী ও বদমেজাজী। কোনোভাবেই ডেভিডকে তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। সৎবাবার অত্যাচার তার জীবনকে অতিষ্ঠ করে। ডেভিডকে মায়ের আদর-ভালোবাসা থেকে বঞ্ছিত করে শেষপর্যন্ত তাকে বাড়ি থেকে দূরে রাখার বন্দোবস্ত করে। লন্ডনের এক আবাসিক স্কুলে তাকে ভর্তি করিয়ে দেয়। সেখানেও তার বাবার অত্যাচার প্রতিফলিত হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ পিঠে সার্বক্ষণিক লাঞ্চনামূলক বোর্ড ঝুলে রাখে নিষ্ঠুর বাবার নির্দেশে।
স্টিরফোর্ড হলো ডেভিডের সহপাঠী। আর মেল সাহের হলো ডেভিডের স্কুল শিক্ষক। স্কুল যাওয়ার সময় ডেভিড মেল সাহেবের দারিদ্র্য অবস্থা নিজ চোখে অবলোকন করে। ঘটনক্রমে ডেভিড গল্প বলার ছলে স্টিরফোর্ডকে শিক্ষক মেল সাহেবের বিষয়টিও বলেছিলো। স্টিরফোর্ড ছিলো কিছুটা দুষ্টু প্রকৃতির। সে একদিন ক্লাসে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করে; শিক্ষক সাহেব নিষেধ করলে সে শিক্ষকের উপর চড়াও হয়ে ওঠে।
স্টিরফোর্ড সুযোগ বুঝে শিক্ষককে বিদ্রুপ করে বলে একজন ভিখেরির মুখে এরকম কথা মোটেই মানায় না। পরে ঘটনাক্রমে ক্লিকল সাহেব উপস্থিত হলে শিক্ষক মেল সাহেবকে স্কুল ছেড়ে যেতে বলে; দারিদ্র্যের কথা শুনে তার স্কুলের নাম খারাপ হবে এই অজুহাতে এক্ষেত্রে, শিক্ষকের প্রতি স্টিরফোর্ডের আচরণ মোটেই যুক্তিসঙ্গত হয়নি বলে আমি মনে করি। বস্তুত, স্টিরফোর্ড কেবল হেয় প্রতিপন্ন করতেই শ্রেণিতে শিক্ষক মেল সাহেবকে উদ্দেশ করে আলোচ্য মন্তব্যটি করে, যা খুবই বেদনাদায়ক ব্যাপার।

তথ্যসূত্র :
১. আনন্দপাঠ: অষ্টশ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৬।
২. ডেভিড কপারফিল্ড: চার্লস ডিকেন্স।
৩. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৪. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url