‘১৯৭১’ উপন্যাস
|
| ১৯৭১ |
১৯৭১
হুমায়ূন আহমেদ
|
১
মীর আলি চোখে দেখে না। বদিউজ্জামান তার বড় ছেলে। মধুবন বাজারে তার একটা মনোহ-ারী দোকান আছে। রোজ সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে সাত মাইল হেঁটে সে বাড়ি আসে। পরিশ্রমের ফলে তার ঘুম হয় গাঢ়। সে সাড়া দেয় না। মীর আলি ডেকেই চলে- ‘দি, ও বদি! বদিউজ্জামান!’ জবাব দেয় তার ছেলের বউ অনুফা। অনুফার গলার স্বর অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। সেই তীক্ষ্ণ স্বর কানে এলেই মীর আলির মাথা ধরে। তবু সে মিষ্টি সুরে বলে- ‘ও বৌ, এটু বাইরে যাওন দরকার। বদিরে উঠাও।’
অনুফা তার স্বামীকে জাগায় না। নিজেই কুপি হাতে এগিয়ে এসে শ্বশুরের হাত
ধরে। বড় লজ্জা লাগে মীর আলির। কিন্তু উপায় কি? বুড়ো হওয়ার অনেক যন্ত্রণা।
অনেক কষ্ট। মীর আলি নরম স্বরে বলে- ‘চাঁদনি রাইত নাকি, ও বৌ?’
অনুফা দূরে সরে যায়। মীর আলি ভারমুক্ত হয়। অন্য রকম একটা আনন্দ হয় তার।
ইচ্ছা করে কিছুক্ষণ বসে থাকতে। অনুফা ডাকে-আব্বাজান, হইছে?
মীর আলি অনুফার সাহায্য ছাড়াই উঠানে ফিরে আসে। দক্ষিণ দিক থেকে সুন্দর
বাতাস দিচ্ছে। রাতের দ্বিতীয় প্রহর শেষ হয়েছে বোধহয়। একটা-দু'টা করে
শিয়াল ডাকতে শুরু করেছে। মীর আলি হৃষ্ট গলায় বলে- ‘রাইত বেশি বাকি নাই।’
অনুফা জবাব দেয় না, হাই তোলে। মীর আলি বাধ্য ছেলের মতো বিছানায় শুয়ে পড়ে। একবার ঘুম ভাঙলে বাকি রাতটা তার জেগে কাটাতে হয়। সে বিছানায় বসে ঘরের স্পষ্ট অস্পষ্ট সব শব্দ অত্যন্ত মন দিয়ে শোনে।
বদি খুক খুক করে কাশছে। টিনের চালে ঝটপট শব্দ। কিসের শব্দ? বানর? চৌকির
নিচে সবগুলি হাঁস একসঙ্গে প্যাঁক প্যাঁক করল। বাড়ির পাশে শেয়াল
হাঁটাহাঁটি করছে বোধহয়। পরীবানু কেঁদে উঠল। দুধ খেতে চায়। অনুফা দুধ দেবে
না। চাপা গলায় মেয়েকে শাসাচ্ছে। বদি আবার কাশছে। ঠাণ্ডা লেগেছে নাকি?
পরশু দিন ভিজে বাড়ি ফিরেছে। জ্বরতো হবেই। বদির কথা শোনা যাচ্ছে। ফিস ফিস
করে কি যেন বলছে। কি বলছে? এত ফিসফিসানি কেন? মীর আলি কান খাড়া করে শোনার
চেষ্টা করে। কাক ডাকল। সকাল হচ্ছে নাকি? মীর আলি ভোরের প্রতীক্ষা করে-
তার তলপেট আবার ভারি হয়ে ওঠে।
বদি প্রচণ্ড একটা চড় বসায় পরীবানুর গালে। বিরক্ত গলায় বলে-টর্চটা দাও
অনুফা। অনুফা টর্চ খুঁজে পায় কিন্তু অন্ধকারে ব্যাটারি খুঁজে পায় না। তার কিছুক্ষণ পর পঞ্চাশ জন সৈন্যের ছোট একটা দল গ্রামে এসে ঢুকে। মার্চ টার্চ না, এলোমেলোভাবে চলা। তাদের পায়ের বুটে কোনো শব্দ হয় না। তারা যায় মীর আলির বাড়ির সামনে দিয়ে এবং তাদের একজন মীর আলির চোখে পাঁচ ব্যাটারি টর্চের আলো ফেলে। মীর আলি কিছু বুঝতে পারে না। শুধু উঠোনে বসে থাকা কুকুরটা তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। মীর আলি ভীত স্বরে ডাকে- ‘বদি, ও বদি! বদিউজ্জামান!’
কুকুরটি একসময় আর ডাকেনা। দলটির পেছনে পেছনে কিছুদূর গিয়ে থমকে দাঁড়ায়।
তারপর দ্রুত ফিরে আসে মীর আলির কাছে। মীর আলি উঁচু গলায় ডাকে- ‘ও বদি! ও
বদিউজ্জামান!’ গ্রামের নাম নীলগঞ্জ। পহেলা মে। উনিশশো একাত্তর। ক্ষুদ্র সৈন্য বাহিনীর অধিনায়ক একজন মেজর- এজাজ আহমেদ। কাবুল মিলিটারি একাডেমির একজন কৃতী ক্যাডেট। বাড়ি পেশোয়ারের এক অখ্যাত গ্রামে। তার গাঁয়ের নাম- রেশোবা। |
২
ময়মনসিংহ-ভৈরব লাইনের একটি স্টেশন নান্দাইল রোড। রুয়াইল বাজার এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। নান্দাইল রোড থেকে সোজা উত্তরে দশ মাইল। খুব খারাপ রাস্তা। বর্ষাকালে রিকশা চলে না। হেঁটে যেতে হয়। এঁটেল মাটিতে পা ডেবে যায়, থিক থিক ঘন কাদা। নান্দাইল রোড থেকে রুয়াইল বাজার আসতে বেলা পুইয়ে যায়। বাজারটি অন্য সব গ্রাম্য বাজারের মতো। তবে স্থানীয় লোকদের খুব অহংকার একে নিয়ে। কি নেই এখানে? ধানচালের আড়ত আছে। পাটের গুদাম আছে। ধান ভাঙানোর কল আছে। চায়ের দোকান আছে। এমন কি রেডিও সারাবার একজন কারিগর পর্যন্ত আছে। গ্রামের বাজারে এর চেয়ে বেশি কি দরকার। রুয়াইল বাজারকে পেছনে ফেলে আরো মাইল ত্রিশেক উত্তরে মধুবন বাজার। যাতায়াতের একমাত্র ব্যবস্থা গরুর গাড়ি। তাও শীতকালে। বর্ষায় হাঁটা ছাড়া অন্য উপায় নেই। উজান দেশ। নদী-নালা নেই যে নৌকা চলবে। মধুবন বাজার পেছনে ফেলে পুবদিকে সাত-আট মাইল গেলে ঘন জঙ্গল। স্থানীয় নাম মধুবনের জঙ্গলা মাঠ। কাঁটা ঝোপ বাঁশ আর জারুলের মিশ্র বন। বেশ কিছু গাব ও ডেফল জাতীয় অন্ত্যজ শ্রেণির গাছও আছে। জঙ্গলা মাঠের এক অংশ বেশ নিচু। সেখানে মোরতা গাছের ঘন অরণ্য। শীতকালে সেই সব মোরতা কেটে এনে পাটি বোনা হয়। পাকা লটকনের খোঁজে বালক-বালিকারা বনের ভেতর ঘুরে বেড়ায়- কিন্তু বর্ষাকালে কেউ যায় না সেদিকে। খুব সাপের উপদ্রব। বনে ঢুকে প্রতি বছরই দু'-একটা গরু-ছাগল সাপের হাতে মারা পড়ে। জঙ্গলা মাঠের পেছনে নীলগঞ্জ গ্রাম। দরিদ্র শ্রীহীন ত্রিশ-চল্লিশ ঘরের একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ। বিস্তীর্ণ জলাভূমি গ্রামটিকে কাস্তের মতো দু’কে ঘিরে আছে। সেখানে শীতকালে প্রচুর পাখি আসে। পাখি-মারা জাল নিয়ে পাখি ধরে বাজারে বিক্রি করে পাখি-মারারা। চাষবাস যা হয় দক্ষিণের মাঠে। জমি উর্বর নয় কিংবা এরা ভালো চাষী নয়। ফসল ভালো হয় না। তবে শীতকালে এরা প্রচুর রবিশস্য করে। বর্ষার আগে করে তরমুজ ও বাঙ্গি। দক্ষিণের জমিতে কোনোরকম যত্ন ছাড়াই এ দু’টি ফল প্রচুর জন্মায়। গ্রামের অধিকাংশ ঘরেই খড়ের ছাউনি। সম্প্রতি কয়েকটি টিনের ঘর হয়েছে। বদিউজ্জামানের ঘরটি টিনের। তার হাতে এখন কিছু পয়সাকড়ি হয়েছে। টিনের ঘর বানানো ছাড়াও সে একটা সাইকেল কিনেছে। চালানো শিখে উঠেনি বলে এখনো সে হেঁটেই মধুবন বাজারে যায়। সপ্তাহে একবার নতুন সাইকেলটি ঝাড়পোছ করে। গ্রামের একমাত্র পাকা দালানটি প্রকাণ্ড। দু'বিঘা জমির উপর একটা হুলস্থুল ব্যাপার। সুসং দুর্গাপুরের মহারাজার নায়েব চন্দ্রকান্ত সেন মশাই এ বাড়ি বানিয়ে গৃহ-প্রবেশের দিন সর্পাঘাতে মারা পড়েন। চন্দ্রকান্ত সেন প্রচুর ধনসম্পদ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সে সবের কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি। সবার ধারণা, সোনাদানা পিতলের কলসিতে ভরে তিনি যখ করে গেছেন। তাঁর উত্তরাধিকারীরা পেতলের কলসির খোঁজে প্রচুর খোড়াখুড়ি করেছে। কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। চন্দ্রকান্ত সেন মশায়ের বর্তমান একমাত্র উত্তরাধিকারী নীলু সেন প্রকাণ্ড দালানটিতে থাকেন। তাঁর বয়স প্রায় পঞ্চাশ। দেখায় তারচেয়েও বেশি। নীলু সেনকে গ্রামে যথেষ্ট খাতির করা হয়। যাবতীয় সালিশীতে তিনি থাকেন। বিয়ে-শাদীর কোনো কথাবার্তা তাঁকে ছাড়া কখনো হয় না। লোকটি অত্যন্ত মিষ্টভাষী। এ গ্রামে সবচে’ সম্পদশালী ব্যক্তি হচ্ছে জয়নাল মিয়া। প্রচুর বিষয়-সম্পত্তির মালিক। মধুবন বাজারে তার দু'টি ঘরও আছে। লোকটি মেরুদণ্ডহীন। সবার মন রেখে কথা বলার চেষ্টা করে। গ্রাম্য সালিশীতে সবার কথাই সমর্থন করে বিচার সমস্যা জটিল করে তোলে। তবু সবাই তাকে মোটামুটি সহ্য করে। সম্পদশালীরা এই সুবিধাটি সব জায়গাতেই ভোগ করে। দু’জন বিদেশি লোক আছেন নীলগঞ্জে। একজন নীলগঞ্জ মসজিদের ইমাম সাহেব। এত জায়গা থাকতে তিনি এই দুর্গম অঞ্চলে ইমামতি করতে কেন এসেছেন সে রহস্যের মীমাংসা হয়নি। তিনি মসজিদেই থাকেন। মাসের পনেরো দিন জয়নাল মিয়ার বাড়িতে খান। বাকি পনেরো দিন পালা করে অন্য ঘরগুলিতে খান। কিছুদিন হলো তিনি বিয়ে করে এই গ্রামে স্থায়ীভাবে থাকবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। প্রস্তাবটিতে কেউ এখনো তেমন উৎসাহ দেখাচ্ছে না। ধানী জমি দিতে পারে জয়নাল মিয়া। সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছে। শুনেও না শোনার ভান করছে। দ্বিতীয় বিদেশি লোকটি হচ্ছে আজিজ মাস্টার। সে নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের হেড মাস্টার। প্রাইমারি স্কুল সরকারি সাহায্যে তিন বছর আগে শুরু হয়। উদ্দেশ্য বোধহয় একটিই দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌছানো। উদ্দেশ্য সফল হয়নি। শিক্ষকরা কেউ বেশি দিন থাকতে পারে না। খাতাপত্রে তিনজন শিক্ষক থাকার কথা। এখন আছে একজন- আজিজ মাস্টার। লোকটি রুগ্ন, নানান রকম অসুখ-বিসুখ। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে হাঁপানি। শীতকালে এর প্রকোপ হয়। গরম কালটা মোটামুটি ভালোই কেটে যায়। আজিজ মাস্টার একজন কবি। সে গত তিন মাসে চার নম্বরি একটি রুলটানা খাতা কবিতা লিখে ভরিয়ে ফেলেছে। প্রতিটি কবিতা একটি. রমণীকে উদ্দেশ্য করে লেখা, যাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়েছে, যেমন- স্বপ্ন-রাণী, কেশবতী, অচিন পাখি ইত্যাদি। তার তিনটি কবিতা নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত মাসিক কিষাণ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আজিজ মাস্টারের কাব্য-প্রতিভা সম্পর্কে গ্রামের লোকজন ওয়াকিবহাল। তারা এই কবিকে যথেষ্ট সমীহ করে। সমীহ করার আরেকটি কারণ হলো আজিজ মাস্টার গ্রামের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ। বি.এ. পর্যন্ত পড়েছিল। পরীক্ষা দেয়া হয়নি। তার আবার পরীক্ষা দেয়ার কথা। সে জয়নাল মিয়ার একটি ঘরে থাকে। তার স্ত্রীকে সে ‘ভাবীসাব’ ডাকে কিন্তু তার বড় মেয়েটিকে দেখলেই কেমন যেন বিচলিত বোধ করে। মেয়েটির নাম মালা। মাঝে মাঝে মালা তাকে ভাত বেড়ে দেয়। সে সময়টা আজিজ মাস্টার বড় অস্বস্তি বোধ করে। সে যখন বলে-মামা, আরেকটু ভাত দেই? তখন কোনো কারণ ছাড়াই আজিজ মাস্টারের কান-টান লাল হয়ে যায়। আজিজ মাস্টার কয়েক দিন আগে ‘মালা রানী’ নামের একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছে। কবিতাটি কিষাণ পত্রিকায় পাঠাবে কি-না এ নিয়ে সে খুব চিন্তিত। হয়ত পাঠাবে। নীলগঞ্জের যে দিকটায় জলাভূমি একদল কৈর্বত থাকে সেদিকে। গ্রামের সঙ্গে তাদের খুব-একটা যোগ নেই। মাছ ধরার সিজনে জলমহালে মাছ মারতে যায়। আবার ফিরে আসে। কর্মহীন সময়টাতে চুরি-ডাকাতি করে। নীলগঞ্জের কেউ এদের ঘাঁটায় না।
গত বৎসর কৈবত পাড়ায় খুন হলো একটা। নীলগঞ্জের মাতবররা এমন ভাব করলেন যেন
তাঁরা কিছুই জানেন না। থানা পুলিশ কিছুই হলো না। যে বাড়ির ছেলে খুন হলো
সে কিছুদিন ছুটাছুটি করল নীলু সেনের কাছে। নীলু সেন শুকনো গলায় বলল-
তোদের ঝামেলা তোরা মিটা। থানাওয়ালার কাছে যা। বুড়ি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল-
থানাওয়ালার কাছে গেলে আমারে দহের মইধ্যে পুইত্তা থুইব কইছে। নীলু সেন
গম্ভীর হয়ে গেল। টেনে টেনে বলল- এদের ঘাঁটাঘাঁটি করা ঠিক না। রক্ত-গরম
জাত। কি করতে কি করে। নীলু সেন তার জবাব দিতে পারল না। অস্পষ্টভাবে বলল- এখন বাদ দে। পরে দেখি কিছু করা যায় কি-না। বুড়ি আরো কিছুদিন ছুটাছুটি করল। এবং একদিন দেখা গেল কৈবর্তরা দল বেঁধে জলমহালে মাছ মারতে গিয়েছে। বুড়িকে সঙ্গে নেয়নি। বুড়ি আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করল কিছুদিন। নীলু সেনের দালানের এক প্রান্তে থাকতে লাগল। চরম দুর্দিন। কৈবর্তরা ফিরে এল তিনমাস পর- কিন্তু বুড়ির জায়গা হলো না। সে এ-বাড়ি ও-বাড়ি ভিক্ষা করে খেতে লাগল। হতদরিদ্র নীলগঞ্জের প্রথম ভিক্ষুক। সব গ্রামের মতো এই গ্রামে একজন পাগলও আছে। মতি মিয়ার শালা নিজাম। সে বেশির ভাগ সময়ই সুস্থ থাকে। গ্রামের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত ছুটাছুটি করতে থাকে। দুপুরের রোদ খুব বেড়ে গেলে মধুবন জঙ্গলায় ঢুকে পড়ে। 'পাগলদের সাপে কাটে না' প্রবাদটি হয়তো সত্যি। নিজাম বহাল তবিয়তেই বন থেকে বেরিয়ে আসে। ছুটাছুটি করা এবং বনের ভেতরে বসে থাকা ছাড়া সে অন্য কোনো উপদ্রব করে না। গ্রামের পাগলদের গ্রামবাসীরা খুব স্নেহের চোখে দেখে। তাদের প্রতি অন্য এক ধরনের মমতা থাকে সবার। |
৩
চিত্রা বুড়ি রাতে একনাগাড়ে কখনো ঘুমায় না। মা কালী কিছু শোনেন কিনা বলা মুশকিল। কিন্তু চিত্রা বুড়ির ধারণা তিনি শোনেন এবং তিনি যে শুনছেন তার নমুনাও দেন। যেমন এক রাত্রিতে খল-খল হাসির শব্দ শোনা গেল। বুড়ির রক্ত জল হয়ে যাবার মতো অবস্থা। সে কাঁপা গলায় ডাকল- হেই মা, হেই গো নেংটা বেটি? হাসির শব্দ দ্বিতীয়বার আর শোনা গেল না। দেবীরা তাদের মহিমা বার বার করে দেখাতে ভালোবাসেন না। চিত্রা বুড়ি আজ রাতেও মা কালীর সঙ্গে সুখ-দুঃখের অনেক কথা বলল। জোঁড়া পাঠার আশ্বাস দিয়ে ঘুমাতে গেল। কিন্তু বুড়ির মনে হলো অনেকগুলি মানুষ যেন এদিকে আসছে। শব্দ করে পা ফেলছে। হুঁহাঁহুঁ হাঁ এরকম একটা আওয়াজও আসছে। ডাকাত নাকি? চিত্রা বুড়ি ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। তার চোখের সামনে দিয়ে মিলিটারি দলটি পার হলো। আলো কম। স্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছে না। চিত্রা বুড়ি কিছু বুঝতে পারল না। এরা কারা? এই রাতে কোথেকে এসেছে? বুড়ি দেখল সেন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার টর্চের আলো ফেলল। তার মানে কি ডাকাত? কিন্তু সেন বাড়িতে ডাকাত আসার কথা নয়। সেনরা এখন হতদরিদ্র। এই বিশাল বাড়ির ইটগুলো ছাড়া ওদের আর কিছুই নেই। ওরা আবার চলতে শুরু করেছে। জুম্মা ঘরের কাছে এসে আবার সেন বাড়ির উপর টর্চের আলো ফেলল। কোনদিকে যাচ্ছে? কৈবর্ত পাড়ার দিকে? ওদের আগেভাগে খবর দেয়া দরকার। সেন বাড়ির পেছন দিক দিয়ে ছুটে গিয়ে খবর দেবে? চিত্রা বুড়ির কাছে সমস্ত ব্যাপারটা অস্বাভাবিক লাগছে। এই রাতের বেলা দল বেঁধে এরা কেন আসবে? না, কৈবর্ত পাড়ার দিকে যাচ্ছে না। জুম্মা ঘর পিছন ফেলে এরা সড়কে উঠে গেল। টর্চের আলো এখন আর ফেলছে না। বুড়ির মনে হলো এরা স্কুলঘরের দিকে যাচ্ছে। আজিজ মাস্টারকে খবর দেয়া দরকার। কিন্তু তারও আগে খবর দেয়া দরকার কৈবর্ত পাড়ায়। বিপদের সময় নিজ গোত্রের মানুষের কথাই প্রথম মনে পড়ে। চার-পাঁচটা কুকুর একসঙ্গে চেঁচাচ্ছে। এরা কিছু টের পেয়েছে। কুকুকু-বেড়াল অনেক কিছু আগে-ভাগে জানে। বুড়ি কালী মন্দিরের চাতাল থেকে নেমে এল। সে কোনদিকে যাবে মনস্থির করতে পারছে না। গ্রামে মিলিটারি ঢুকেছে এটা প্রথম বুঝতে পারলেন নীলগঞ্জ মসজিদের ইমাম সাহেব। পাকা মসজিদের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তিনি সুরা ইয়াসিন পড়ছিলেন। আযান দেবার আগে তিনি তিনবার সুরা ইয়াসিন পড়েন। দ্বিতীয়বার পড়বার সময় অবাক হয়ে পুরো দলটাকে দেখলেন। এরা স্কুলঘরের দিকে যাচ্ছে। প্রথম কয়েক মুহূর্ত তিনি ব্যাপারটা বুঝতেই পারলেন না। সুরা ইয়াসিন শেষ করে দীর্ঘ সময় মসজিদের সিঁড়িতে বসে রইলেন। অন্ধকার এখনো কাটেনি। পাখপাখালি ডাকছে। ইমাম সাহেব মনস্থির করতে পারছেন না এখানে বসে থাকবেন, না খবর দেয়ার জন্যে ছুটে যাবেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর মনে হলো, সিঁড়িতে এরকম প্রকাশ্যে বসে থাকা ঠিক না। মসজিদের ভেতরে থাকা দরকার। কিন্তু নীলগঞ্জের মসজিদে তিনি কখনো একা. ঢোকেন না। এই মসজিদে জ্বীন নামাজ পড়ে এরকম একটা প্রবাদ আছে। অনেকেই দেখেছে। তিনি অবিশ্যি এখনো দেখেন নি। কিন্তু তাঁর ভয় করে। একা বসে থাকতে থাকতে তাঁর মনে হলো, এই যে তিনি দেখলেন একদল মিলিটারি, এটা চোখের ভুল না তো? নান্দাইল রোডে মিলিটারি আসেনি, সোহাগীতে আসেনি। এখানে আসবে কেন? এখানে আছেটা কি? নেহায়েতই গণ্ডগ্রাম। ইমাম সাহেব ইউনিয়ন বোর্ডের রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন। স্কুলঘর বাঁশবনের আড়ালে পড়েছে- কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মুসুল্লীরা কেউ আসছে না কেন? নাকি মিলিটারির খবর জেনে গেছে সবাই। তাঁর প্রবল ইচ্ছে হতে লাগল নামাজ না পড়েই ঘরে ফিরে যেতে। আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে অথচ কারো দেখা নেই।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করবার পর মতি মিয়াকে আসতে দেখা গেল। মতি মিয়া একটা
মামলায় জড়িয়ে ইদানিং ধর্ম-কর্মে অতিরিক্ত রকমের উৎসাহী হয়ে পড়েছে। ইমাম
সাহেব নিচু গলায় বললেন- এই মতি, কিছু দেখলা?
ইমাম সাহেব আর কিছু না বলে চিন্তিত ভঙ্গিতে আজান দিতে গেলেন। আজান শেষ
করে মতি মিয়াকে আবার জিজ্ঞেস করলেন-ইস্কুল ঘরের কাছে কিছুই দেখ নাই?
ইমাম সাহেব নামাজ শুরু করবার আগেই আরো তিনজন নামাজী এসে পড়ল। তারাও কিছু জানে না। একজন এসেছে স্কুলঘরের সামনে দিয়ে, সেও কিছু দেখেনি। ইমাম সাহেব আজ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত নামাজ পড়লেন। নামাজের শেষে সাধারণত তিনি হাদিস-কোরআনের দুই-একটি কথা বলেন। আজ কিছুই বললেন না। বাড়ির দিকে রওনা হলেন। বেশ আলো চারদিকে। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। জোড়া শিমুল গাছের কাছে এসে তিনি আড়চোখে স্কুলঘরের দিকে তাকালেন। বারান্দায় সারি সারি সৈন্য বসে আছে। ইমাম সাহেবের মনে হলো স্কুল কম্পাউন্ডের গেটের কাছে দাঁড়ানো একটা লোক হাত ইশারা করে তাঁকে ডাকছে। লোকটির পরনে ফুল প্যান্ট এবং নীল রঙের একটা হাফ শার্ট। কিন্তু তাঁকে ডাকছে কেন? নাকি তিনি ভুল দেখছেন? ইমাম সাহেবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। তিনি একবার আয়াতুল কুর্সী ও তিনবার দোয়া ইউনুস পড়ে স্কুলঘরের দিকে এগুলেন।
নীল শার্ট পরা লোকটিও এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। ব্যাপার কি? এ কে? তিনি অতি
দ্রুত দোয়া ইউনুস পড়তে লাগলেন- লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সোবহানাকা ইন্নি
কুনতু মিনাজুয়ালিমিন। এই দোয়াটি খুব কাজের। হযরত ইউনুস আলায়হেস সালাম
মাছের পেটে বসে এই দোয়া পড়েছিলেন। ইমাম সাহেব তিনবার ইয়া মুকাদ্দেমু পড়ে ডান পা আগে ফেললেন। সঙ্গের নীল শার্ট পরা লোকটি মৃদু স্বরে বলল- এত ভয় পাচ্ছেন কেন? ভয়ের কিছুই নাই। |
৪
আজিজ মাস্টারের অনিদ্রা রোগ আছে। আজিজ মাস্টার দরজা খুলে দেখল রাসমোহনের থুতনি বেয়ে ঘাম পড়ছে। গায়ের ফতুয়াটাও ঘামে ভেজা। স্কুল থেকে দৌড়ে এসেছে বোধহয়। শব্দ করে শ্বাস টানছে। রাসমোহন আবার বলল, মিলিটারি আপনারে ডাকে স্যার। আজিজ মাস্টার রাসমোহনের কথা মোটেও বিশ্বাস করল না। সময়টা খারাপ। খাকি পোশাকের একজন পিওন দেখলেও সবাই ভাবে পাঞ্জাবী মিলিটারী। রাসমোহনের রজ্জুতে সর্পভ্রম হয়েছে। থানাওয়ালারা কেউ এসেছে কেন্দুয়া থেকে। খুব সম্ভব চিত্রা বুড়ির ছেলের ব্যাপারে। মার্ডার কেইসে পুলিশের খুব উৎসাহ। দল বেঁধে চলে আসে। নগদ বিদায়ের ব্যবস্থা আছে। এখানেও তাই হয়েছে। আজিজ মাস্টার অনেকখানি সময় নিয়ে হাত-মুখ ধোল। তার মাথায় চুল নেই, তবু যত্ন করে চুল আঁচড়াল। পরিষ্কার একটা পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে রাস্তায় বেরুল। অর্ধেক পথ আসার পর তার মনে পড়ল চাবি ফেলে এসেছে। আবার ফিরে গেল চাবি আনতে। বাড়ি ফিরবার পথে সত্যি সত্যি বুঝল গ্রামে মিলিটারি এসেছে। তার মতি মিয়ার সঙ্গে দেখা হলো। রতন মাঝির সঙ্গে দেখা হলো। বাড়ি ঢুকবার মুখে জয়নাল মিয়াকেও ছাতা মাথায় দিয়ে আসতে দেখা গেল। রাসমোহন এদের প্রত্যেককে একবার একবার করে তার অভিজ্ঞতার কথা বলল।
রাসমোহনের বর্ণনামতে, সে স্কুল ঘরের বারান্দায় ঘুমাচ্ছিল। তখনো চারদিকে
অন্ধকার। কে যেন তার পায়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মুখে টর্চের আলো ফেলল। সে
উঠে বসে দেখে স্কুলে মিলিটারি গিজ গিজ করছে।
জয়নাল মিয়া বিরক্ত মুখে বলল- অস্ত্রপাতি তো থাকবই। এরা কি বিয়া করতে
আইছে? আজিজ মাস্টার গম্ভীর গলায় বলল- তারপর কি হয়েছে রাসমোহন? আজিজ একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে লক্ষ্য করল তার হাত কাঁপছে। এবং প্রস্রাবের বেগ হচ্ছে। খুব খারাপ লক্ষণ। এক্ষুণি হাঁপানির টান শুরু হবে। অতিরিক্ত উত্তেজনায় তার হাঁপানির টান উঠে। এখন সিগারেট খাওয়াটা ঠিক হবে না জেনেও আজিজ মাস্টার লম্বা লম্বা টান দিতে শুরু করল। সে সাধারণত জয়নাল মিয়ার সামনে সিগ্রেট খায় না।
জয়নাল মিয়া গম্ভীর গলায় বলল- তুমি যাও মাস্টার, বিষয়ডা কি যাইন্যা আস।
আজিজ মাস্টারের সত্যি সত্যি হাঁপানির টান উঠে গেল। সিগারেট ফেলে দিয়ে সে
লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে শুরু করল। জয়নাল মিয়া গম্ভীর গলায় বলল- এরা
এইখানে থাকবার জন্যেই আসে নাই। বুঝলা? যাইতাছে অন্য কোনোখানে। ভয়ের কিছু
নাই। একটা পাকিস্তানী পতাকা হাতে নিয়া যাও। একটা পতাকা আছে না? বাঁশের
আগায় বান্ধ।
বেলা প্রায় সাতটার দিকে ছ’জনের একটি ছোট্ট দলকে একটি পাকিস্তানী ফ্ল্যাগ হাতে
নিয়ে ইস্কুল ঘরের দিকে আগাতে দেখা গেল। রোগা আজিজ মাস্টার দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সে ইস্কুল ঘরের কাছাকাছি এসে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল- পাকিস্তান! দলের অন্য সবাই
আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বলল- জিন্দাবাদ!! |
|
৫
রোদ উঠে গেছে। রাস্তার ওপাশে চার-পাঁচটা জারুল গাছ। গাছের নিচে গেলে ছায়া পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে যাওয়া ঠিক হবে কি-না আজিজ মাস্টার বুঝতে পারছে না। তারা জড়াজড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ধ্বনি দেয়। আড়চোখে মিলিটারিদের দিকে তাকায়। সরাসরি তাকাতে সাহসে কুলায় না। সমস্ত বারান্দা জুড়ে মিলিটারিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ বসে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়ে এগিয়ে আসা দলটির প্রতি তাদের আছে। কেউ মাথার নিচে হ্যাভারস্যাক দিয়ে ঘুমের মতো পড়ে আছে। কোনো উৎসাহ দেখা গেল না। তাদের দৃষ্টি সন্ন্যাসীদের মতো নির্লিপ্ত। যেন জগতের কোনো কিছুতেই তাদের কিছু আসে যায় না। পাকিস্তানের ফ্ল্যাগটি মতি মিয়ার হাতে। সে হাত উঁচু করে ফ্ল্যাগটি দোলাচ্ছিল- হাত ব্যথা হয়ে গেছে কিন্তু নামাবার সাহস হচ্ছে না। আজিজ মাস্টার খুক খুক করে কয়েকবার কাশল। সেই শব্দে বারান্দায় বসা কয়েকজন তাকাল তার দিকে। আজিজ মাস্টার প্রাণপণে কাশি চাপতে চেষ্টা করল। সময়টা খারাপ। এ রকম সময়ে কাউকে অযথা বিরক্ত করা ঠিক না। কিন্তু ক্রমাগত কাশি উঠছে। আজিজ মাস্টার লক্ষ্য করল উঠোনে চেয়ার পেতে যে অফিসারটি বসে আছেন তিনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। অত্যন্ত রূপবান একজন মানুষ। মিলিটারি পোশাকেও তাঁকে রাজপুত্রের মতো লাগছে। এর চোখে-মুখে কোনো ক্লান্তি নেই। তবে বসে থাকার ভঙ্গিটি শ্রান্তির ভঙ্গি। তিনি তাঁর সামনের টেবিলে পা তুলে দিয়েছেন। পায়ে খয়েরী রঙের মোজা। মানুষটি প্রকাণ্ড তবে সেই তুলনায় পায়ের পাতা দু'টি ছোট। তাঁর কাছাকাছি যে রোগা লোকটি দাঁড়িয়ে আছে তাকে দেখতে বাঙালির মতো লাগছে। তার গায়ে চকচকে নীল রঙের একটা শার্ট। এই লোকটি খুব ঘামছে। ময়লা একটা রুমালে ক্রমাগত ঘাড় মুছছে। অফিসারটি মৃদু স্বরে কি যেন বলল নীল শার্ট পরা লোকটিকে। নীল শার্ট পরা লোকটি তীক্ষ্ণ গলায় বলল- আপনাদের মধ্যে হেড মাস্টার সাহেব কে? |
৬
|
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের শব্দার্থ ও টীকা : |
|---|
|
➠ মনিহারী- কাগজ-কলম, খেলনা, কাচের চুড়ি, প্রসাধন সামগ্রী, শৌখিন জিনিস
প্রভৃতি খুচরা দ্রব্য বিক্রি হয় এমন। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের মূলভাব আলোচনা: |
|---|
|
১৯৭১ উপন্যাস সম্পর্কে বাজারে এক গল্প প্রচলিত আছে। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই এ গল্প প্রচার করেছেন। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাককে তিনি দিয়েছিলেন বইটির এক কপি। রাজ্জাক নাকি বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, যে বইয়ের নাম ১৯৭১, তার পৃষ্ঠাসংখ্যা মাত্র সত্ত্বর? সপ্তাহখানেক পরে বাসায় ডেকে নিয়ে হুমায়ূনকে তিনি নাকি একপ্রস্ত উপদেশ দিয়েছিলেন। বলেছেন: নিজের মতো লিখবেন, কারো কথা শুনবেন না। আহমদ ছফা অধ্যাপক রাজ্জাককে নিয়ে যদ্যপি আমার গুরু নামে যে বিখ্যাত বই লিখেছেন, তাতে শিল্পকলা ও সাহিত্য সম্পর্কে রাজ্জাকের দৃষ্টিভঙ্গির কতক পরিচয় পাওয়া যায়। জয়নুলের গরু গাড়ি তিনি নাকি ভীষণ পছন্দ করতেন। বলেছেন, এই ছবিতে আকার আর দূরত্বের যে সমানুপাত ও সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়েছে, তা রীতিমতো উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। এ তথ্য থেকে প্রফেসর রাজ্জাকের শিল্পদৃষ্টি সম্পর্কে যে ধারণা হয়, তাতে নিশ্চিত করে বলা যায়, তাঁর ১৯৭১ পছন্দ হওয়ারই কথা। বস্তুত, বাস্তববাদী ভঙ্গিতে স্থান ও কালের নিপুণ সমবায়ে চরিত্র ও ঘটনাকে কজায় রেখে হুমায়ূন এ উপন্যাসের কাহিনিকে যেভাবে প্রায় অভাবনীয় পরিণতিতে নিয়ে গেছেন, তা মহৎ সাহিত্যেরই লক্ষণ। তুলনামূলক ছোট পরিসরে কম কথায় ইশারার গভীরতা সৃজনে হুমায়ুনের নৈপুণ্য বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭১ সে ধরনের রচনার এক সফল উদাহরণ। ফলে উপন্যাসটি-যে রাজ্জাক পছন্দ করতে পারেন, তা অনুমান করা কঠিন নয়। অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই: এ রচনা প্রসঙ্গে তিনি অন্যের উপদেশ গ্রহণ না করার উপদেশ কেন দিলেন? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে রাজ্জাকের উপদেশের গুরুত্ব বুঝতে হবে। একদিকে পার্টি রাজনীতির বিষ, অন্যদিকে সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তের কপটতা এ দুইয়ের বিশৃঙ্খল সমাবেশে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধচর্চার ধারা বেশ কতকটা এলোমেলো। এ ধরনের পরিস্থিতি শিল্পসম্মত মনোযোগের অনুকূল নয়। এমতাবস্থায় ব্যক্তিত্ববান দৃষ্টিভঙ্গিই কেবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন উপন্যাসের পরিণতি পেতে পারে। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের যে আবহ তৈরি হয়েছে, তা তিনি পছন্দ করেছেন। অন্যদিকে তিনি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যক্তিত্বও স্বীকার করেছেন। ১৯৭১ উপন্যাস প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয়, এটি প্রাথমিকভাবে যুদ্ধের কাহিনি, মুক্তিযুদ্ধের নয়। মুক্তিযুদ্ধটা আবিষ্কৃত হয়েছে পরে, যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। হুমায়ুনের মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক লেখালেখির এটা অন্যতম প্রধান বিশিষ্টতা। একেবারে ছক কষে মাটি, মানুষ, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যনির্মিত অবকাঠামো এঁকে-হুমায়ূন বাংলার এক নিভৃত গ্রামকে বানিয়ে তুলেছেন যুদ্ধের ময়দান। কৌশলটা চলচ্চিত্রের। বিবরণের চিত্রধর্মিতা, চরিত্রের আগমন-তিরোভাব-ক্রিয়া, পটভূমির ফটোগ্রাফিক নির্মাণ সিনেমার কৌশলকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। চোখ তো বটেই, কানের ব্যবহারেও পাই সে একই কৌশলের ছাপ। অন্ধ মীর আলি যেভাবে শব্দ শুনে সাড়া দেয়, তার ভঙ্গি বর্ণনামূলক নয়, চলচ্চিত্রীয়। গুলির শব্দের বর্ণনাগুলোও তাই। লেখক নিজের জিম্মায় জানাচ্ছেন না যে, গুলি হয়েছে; বরং বলছেন, উপস্থিত লোকেরা এদিক থেকে বা ওদিক থেকে গুলির শব্দ শুনেছে। নিঃসন্দেহে সামরিক অভিযানের আবহ নির্মাণ এবং সিরিয়াসনেসের শৈল্পিক প্রয়োজনেই এই বাড়তি বাস্তববাদী নৈপুণ্য আমদানি করেছেন লেখক। যুদ্ধটা অবশ্য একপক্ষীয়। অন্যপক্ষ মাঠে অনুপস্থিত। মাঠটা কিন্তু আছে; আর সে মাঠে আছে অন্যের ভূমি, ভূমিতে ক্রিয়াশীল ও বসবাসরত জনগোষ্ঠী। এ মাঠে যুদ্ধ মানেই নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। ঝাঁপিয়ে পড়ার নানা কলা আর ছলা। পেছনের জঙ্গলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল সৈন্য লুকিয়েছিল কি না, তাদের সাথে বন্দি মেজর বখতিয়ার ছিল কি না, কিংবা তাদের আহত কয়েকজনকে কৈবর্তপাড়ার লোকেরা আশ্রয় দিয়েছিল কি না, সেসব কথা কোথাও পষ্ট করা হয়নি। প্রতিটি সম্ভাবনাই আছে। আবার এমনও হতে পারে যে, এ ধরনের কোনো ঘটনাই নীলগঞ্জে ঘটেনি। কিন্তু দখলদার বাহিনী গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এক পরিকল্পিত অভিযানে নেমেছে নীলগঞ্জের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তাহলে অভিযান শেষ করে চলে গেলেই হয়। কিন্তু না। তা হবার নয়। প্রতিটি যুদ্ধেরই সাধারণ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি কিছু অসাধারণ বিশিষ্টতা থাকে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক বিশিষ্টতা এই যে, এখানে দূর থেকে উড়ে এসে এক আগ্রাসী বাহিনী হামলা চালাবে এমন এক অঙ্গনে, যার উপর তার কোনো সমর্থনজনিত অধিকার নেই। সমর্থন না থাকা এবং সমর্থন আদায় করতে না চাওয়া অথবা সমর্থন আদায় করতে পারার সম্ভাবনা না থাকা এ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান বিশিষ্টতা। মেজর এজাজ আহমেদের ক্ষোভ ছিল। তার বন্ধু বন্দি হয়েছে বিরোধী জোয়ানদের হাতে। কিন্তু সে ক্ষোভ যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে সাধারণ মানুষের উপর অযৌক্তিকভাবে আছড়ে পড়তে পারে না। দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধ হলে অন্তত প্রাথমিকভাবে এমনটা হতো না। একপক্ষীয় আরোপণমূলক যুদ্ধ বলেই হয়েছে। ওই ক্ষুদ্র বাহিনীর অধিনায়ক এজাজ আসলে নিশ্চিত হতে পারছিল না, গ্রামবাসীর সাথে লুকিয়ে থাকা সেনাদের কোনো যোগাযোগ আছে কি না। যদি নাও থাকে, তাহলেও খুবই সম্ভব যে, কোনো লড়াই শুরু হওয়া মাত্রই নীলগঞ্জের পুরো প্রাঙ্গণ জনমানুষসহ দাঁড়িয়ে যাবে তার বিরুদ্ধে। ফলে তাকে ছক কষতে হয়েছে পুরো পরিস্থিতিটাকেই বিরোধীপক্ষ ধরে নিয়ে। তার মানেই হল, এই যুদ্ধে ময়দানের যুদ্ধের চেয়ে ময়দানের বাইরের যুদ্ধ মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; আর মেজর এজাজকে সে লড়াইটাও লড়তে হয়েছে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যেখানে যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে নাই, সেখানে যুদ্ধের যে কোনো পদক্ষেপই অন্যায্য হতে বাধ্য। ফলে এজাজ যতই এগিয়েছে ততই জড়িয়েছে অন্যায় যুদ্ধে। মেজর এজাজ এ উপন্যাসের সবচেয়ে সুচিত্রিত চরিত্রগুলোর একটি। হুমায়ূন আহমেদের নিরাসক্তি এবং সুমিতি এতটাই প্রত্যয়ী যে, হানাদার বাহিনীর অন্যায় যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী একটি চরিত্রকে তিনি কোনো প্রকার বিদ্বেষ ছাড়াই অঙ্কন করে যান, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। এটা আসলে ঔপন্যাসিকের প্রাথমিক গুণ। উপন্যাসের দিক থেকে বরং দেখা দরকার, এরকম সুঅঙ্কিত একটা চরিত্র শেষ পর্যন্ত কী ধরনের জরুরি দায়িত্ব পালন করে। উপন্যাসের মেজর এজাজ কাকুল মিলিটারি একাডেমির কৃতী ক্যাডেট। বাড়ি পেশোয়ারের এক অখ্যাত গ্রামে। তার গাঁয়ের নাম রেশোবা। এসব কথাবার্তা খানিকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবেই হুমায়ূন বলে নেন উপন্যাসের শুরুর পরিচ্ছেদেই। উপন্যাস-পাঠকরা হয়তো বেশ খানিকটা অস্বস্তি বোধ করবেন প্রথম পরিচ্ছেদের মীর আলির পরিচয়জ্ঞাপক অংশেও। উপন্যাসের 'মূল ঘটনা'র বেশ বাইরের জিনিস মনে হতে পারে ওই অংশকে, এমনকি মীর আলি সম্পর্কিত অন্য অংশগুলোকেও। কিন্তু উপন্যাসটির ছোট্ট আয়তনের কথা মাথায় রাখলে ধারণা করা সম্ভব, এ অংশগুলো মূলের মধ্যেই পড়ে; আর তাতে হয়তো আমাদের আরেকবার নতুন করে ভেবে দেখতে হয়, আদৌ মুক্তিযুদ্ধের মূল অংশ কী কী। মেজর এজাজের কথাই ধরা যাক। এজাজ যদি বেশ রূপবান তরুণই হয়, যদি সে অখ্যাত এক গ্রাম থেকে উঠে আসা জোয়ানই হয়, আর তার নিজের কথামতো ওই রেশোবা গ্রামে তার অন্ধ পিতা নীলগঞ্জের মীর আলির মতোই বাড়ির দরোজায় বসে থেকে থাকে, তাহলে একথাও বলা যাবে, এ ব্যক্তি জন্মসূত্রে খারাপ স্বভাবের নয়। তার অবস্থান ও কর্মকাণ্ডকে ব্যক্তিগত স্বভাব হিসেবে না দেখে কাঠামোগত সন্ত্রাস হিসেবে দেখার এক জোর তাগিদ অনুভূত হবে। তাতে উপরিকাঠামোর বেশ কিছু উপাদান মুক্তিযুদ্ধের কাঠামোগত সন্ত্রাসের অন্যতম উৎস হিসেবে আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এর প্রধানটি নিশ্চয়ই জাতিগত ঘৃণা। এজাজ তার সহচর রফিককে কোনো রাখঢাক না রেখেই বাঙালির জাতিগত উনতা বিষয়ে তার এবং তাদের নিশ্চয়তার কথা বলেছে। বাঙালি মুসলমানের মুসলমানত্ব যে মোটেই ধর্তব্যের মধ্যে নয়, বরং তারা যে প্রায় হিন্দুর কাছাকাছি, এ বিষয়েও মেজর এজাজ কোনো অনিশ্চয়তা রাখেনি। আর, এগুলো যে যুদ্ধকালীন আগ্রাসী পক্ষের প্রধান আদর্শিক অস্ত্র, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে ওই পক্ষের একজন সেনাপতি হিসেবে এজাজের কর্মকাণ্ড এবং যুদ্ধকৌশলও এসব ধারণার বহিঃপ্রকাশ হওয়ার কথা। প্রশ্ন হল, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিজাত তৎপরতার ফল কী হতে পারে? ছোট্ট গ্রাম নীলগঞ্জের ছোট্ট জনবসতির উপর এসবের পরিণতি নিপুণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে ১৯৭১ উপন্যাসে। লেখক প্রথমেই শ্রেণি, পেশা, শিক্ষা ও ক্ষমতাসম্পর্কের ভিত্তিতে ওই অঞ্চলের মানুষদের বিন্যাসটা উপস্থাপন করেছেন। এই ভিত্তিকাঠামো বেশ কিছু সময় ভালোভাবেই কাজ করেছে। পাকিস্তানি পক্ষ এবং তার সহচর হিসেবে রাজাকার দল ওই ভিত্তিকাঠামোর ভিত্তিতেই আচরণ করেছে। ইমাম, শিক্ষক, জয়নাল মিয়া ইত্যাদি। শিক্ষিত, ক্ষমতাবান, রেডিও আছে কি নেই, জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহীদের খাবার সরবরাহের ক্ষমতা আছে কি নেই ইত্যাদি হিসেব-নিকেশ কিছুক্ষণ কার্যকর থাকে। কিন্তু শীঘ্রই ভিত্তিকাঠামো ভিত্তিক এসব বর্গ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে শুরু করে। তার জায়গা দখল করতে থাকে বর্ণবাদী আচরণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সুভাষণ, আর পরিকল্পিত সন্ত্রাস তৈরির যুদ্ধনীতি। নিজেদের ঘোষিত যুদ্ধকে সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে নিয়ে দখলদার বাহিনী অগ্রসর হয় ধর্ষণ-লুণ্ঠনে। এ স্তরেও শ্রেণি বা অন্য অনেক বর্গ অকার্যকর হয়ে যায়। আর কে না জানে, আগুন কোনো বাধ মানে না। পাকিস্তানি এবং তাদের দোসররা যে অগ্নিসংযোগে ভীষণ রকমের উৎসাহী ছিল, তার পরিচয় নীলগঞ্জবাসী ভালোভাবেই পেয়েছে। মেজর এজাজ একজন বুদ্ধিমান মানুষ। সে নিজেও এ দাবি করেছে, আর তার কর্মকাণ্ডেও তার প্রমাণ মিলেছে। পাকিস্তানি মিলিটারির শ্রেষ্ঠত্বের মিথ, দেখা যাচ্ছে, নীলগঞ্জেও যথেষ্ট চালু ছিল। তাহলে এজাজের তো বোঝার কথা, নিপীড়ন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধকৌশলের দিক থেকে তার বা তাদের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে উঠবে। দুনিয়ার নিপীড়নের ইতিহাস সে কথাই বলে। এজাজরা যে একথা বুঝতে চায়নি, তার প্রাথমিক কারণ, একটা জনগোষ্ঠীকে অস্তিত্বের পরীক্ষায় ফেলে দেওয়া যে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, জাতিগত ঘৃণার কারণে তারা তা অনুমান করতে পারেনি। মূল কারণ আসলে তাদের অনন্যোপায় অবস্থা। দুটি মুখোমুখি পক্ষ সামরিক কেতায় পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হলে তার আদব হয় একরকম। আর কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিপক্ষ বানিয়ে লড়াই করলে তার চরিত্র হবে অন্যরকম। আগ্রাসী নিপীড়নের মুখে তখন বিপক্ষের অসামরিক-সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে বাধ্য। ভেঙে পড়াটা সবার জন্যই বিপজ্জনক। ক্ষমতার স্বাভাবিক ক্রম ও স্তর লঙ্ঘিত হলে ওই সম্পর্কের ভিত্তিতে যে আদব ও শৃঙ্খলা বিদ্যমান থাকে, তাও ভেঙে পড়তে বাধ্য। তখন বুদ্ধিমান সামরিক কর্তা এজাজের ছক বা হিসেব-নিকেশও আর কাজ করবে না। মীর আলিকে সালাম জানিয়ে দশের মন ভজানোর চেষ্টা সাময়িকভাবে কাজ করতে পারে; কৈবর্তপাড়ার চিত্রা বুড়ির ছেলের খুনের বিচারের নামে মনা কৈবর্তকে মেরে ন্যায়বিচারের একটা বিভ্রম তৈরি হতে পারে; কিংবা মনার এগার বছর বয়সী ভাইকে অকারণে হত্যার মধ্য দিয়ে কায়েম করতে পারে ভীতির রাজত্ব। কিন্তু ন্যায়বিচারের গল্প, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিথ, বিশেষ মতাদর্শ বা ধর্মের প্রতি পাকিস্তানি বাহিনীর ক্ষোভের অনুমান- এসবই কাজ করেছে অস্তিত্বের ভয়ে ভীত লোকজনের মধ্যে। চূড়ান্ত পর্যায়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার প্রেক্ষাপটে অস্তিত্বের ভয় কেটে গেলে এগুলোর কোনোটাই আর কার্যকর থাকবে না। তখন ন্যাংটো মাস্টার উপড় হয়ে তার পাজামা তুলতে শুরু করবে: জয়নাল মিয়া সবজান্তা গোয়েন্দার মতো তথ্য আওড়াতে থাকবে: সবদারউল্লাহ দা হাতে ঘুরে বেড়াবে অনির্দিষ্ট শত্রুর সন্ধানে; আর রফিক দৃপ্ত ভঙ্গিতে নামতে থাকবে বিলের পানিতে। এখানে বাংলাদেশের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কর্তাসত্তার প্রশ্নটি সামনে আসে, যে কর্তাসত্তার অভূতপূর্ব জাগরণ তাদের নিরীহ আলস্যের বিপরীত চিত্র ধরে আবির্ভূত হয়েছিল 'মুক্তি'র বেশে। প্রশ্ন হল, মেজর এজাজের বহুমাত্রিক নিপীড়নই কি অবদমিত জনতার বিপরীত মূর্তিতে আবির্ভূত হওয়ার একমাত্র কারণ? ১৯৭১-এ হুমায়ুন এ মর্মে সচেতন ছিলেন বলেই মনে হয়। মেজর এজাজের সাথে প্রশ্নোত্তর পর্বে ইমাম, মাস্টার, জয়নালসহ অন্যরা যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, তা যে এক মেধাবী নির্মাণ তা নিশ্চয় করে বলা যায়। এ মানুষগুলো আসলে ভূগোল, উৎপাদন-ব্যবস্থা, জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ইত্যাদির চেতন-অচেতন মিশেলে অতি বাস্তবের অতি সাধারণ জীবনই যাপন করছিল। ইকবাল-জিন্নাকে নিয়ে তৎপর হওয়া তার এই জীবনের জন্য জরুরি নয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি ওদের সবার হয়ত বিরাগ ছিল না। কিন্তু তাই বলে জিন্নাকে বিশেষভাবে স্মরণে রাখা বা ইকবালের কবিতা চর্চা করার কথাও তাদের মনে হয়নি। ঠিক তেমনি নিজের অস্তিত্বের পক্ষে আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিব বা স্বাধীন বাংলা বেতারের তৎপরতা তাদের চাপা উল্লাসের কারণ হয়েছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু সেটাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। 'পাকিস্তান' নামের রাষ্ট্রটির প্রতি তখনো তাদের কারো আবেগ বা নিরপেক্ষ অবস্থান যদি থেকেও থাকে, এজাজের নিপীড়ন সে ব্যাপারে তাদের মায়া কাটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। পরিস্থিতিই অস্তিত্বের শেষ সীমানায় ফেলে দিয়ে তাদের নামিয়ে এনেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। এই-ই তো বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এটাই একমাত্র ভিত্তি, যার জোরে মুক্তিযুদ্ধকে ‘জনযুদ্ধ’ বা ‘গণযুদ্ধ’ বলা যায়। ১৯৭১ উপন্যাসে লেখক তাদেরই উচ্চকিত করতে চেয়েছেন, যাদের যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো বর্গেই ফেলা যায় না। আগ্রাসী বাহিনীর পক্ষেও তাদের নির্বিচারে 'শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করা আদৌ সহজ ছিল না। কিন্তু তারা তা করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ তারা রাজনৈতিক অবস্থানকে সামরিক কায়দায় মোকাবিলা করেছে। সামরিক কায়দায় মোকাবিলার পন্থা গ্রহণ করায় পুরো বাংলাদেশটাই তার ভূমি, মানুষ ও অপরাপর উপাদানসহ এক অতিকায় শত্রুপক্ষ হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষকে শত্রু-কোঠায় সক্রিয় হতে বাধ্য করে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে আসার এই প্রক্রিয়াকে হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গভীর বিশিষ্টতা বলে সাব্যস্ত করেন। এদিক থেকে দেখলে উপন্যাসের পটভূমিকায় মীর আলিকে নিয়ে তুলনামূলক দীর্ঘ বয়ান, এবং এজাজের উল্লেখসূত্রে রেশোবা গ্রামে তার অন্ধ পিতার উল্লেখের অন্য তাৎপর্য উন্মোচিত হয়। রেশোবা গ্রামের জনৈক অন্ধ পিতার সন্তান নীলগঞ্জের আরেক অন্ধ পিতার সন্তানের জন্য যে বিপর্যয় তৈরি করেছে, যুদ্ধের ঘটনা হিসেবে তার পরিচয় দেয়া সম্ভবপর নয়। আগেই বলা হয়েছে, এজাজের পক্ষে এ কাঠামোগত সন্ত্রাস এড়ানো কিছুতেই সম্ভব ছিল না, যেমন সম্ভব ছিল না ব্যক্তিগত জীবনসমূহের বিপর্যয় রোধ করা। ফলে, মীর আলি, যে কিনা ছেলের সম্ভাব্য মৃত্যু আর গ্রামে বিচরণশীল মিলিটারির তাণ্ডবকে উপেক্ষা করে তার ভাতের ক্ষুধাকে বেশ প্রত্যক্ষ ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছিল, তার ব্যক্তিগত বিপর্যয় ঠেকানোর কোনো উপায়ই আসলে এজাজের ছিল না, যতই সে নিজের বাবার সাথে এই প্রান্তীয় মানুষটার মিল খুঁজে পাক। একটা মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের মধ্যে মানুষের ওই বিশ্বজনীন সাযুজ্যের বোধ মুলতুবি হয়ে যায়। আর হুমায়ূন হয়তো তুলনাসূত্রেই আমদানি করেন এক কালবৈশাখির চিত্র। ১৯৭১-এ ওই কালবৈশাখি নানারকম দায়িত্ব পালন করেছে। এজাজের সাহসিকতা ও বোধবুদ্ধির অন্যতম প্রমাণ দাখিল করা থেকে শুরু করে মুক্তিসেনাদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার কল্পিত বা সত্য ঘটনা ঘটতে দেয়া পর্যন্ত। একটা গুরুতর ব্যাপার এই যে, ঝড়ে মীর আলির ঘরের চালাটি উড়ে যায় মানুষ এবং অপরাপর বস্তুসামগ্রী যথাস্থানে রেখেই; আর আমাদের জানানো হয় মীর আলির ভাগ্যে আগেও একবার এ ঘটনা ঘটেছিল। সেবার পরিবারটি সামলে ওঠে দ্রুত। কিন্তু এখন, প্রাকৃতিক পীড়নের পাশাপাশি এজাজদের প্রযোজনায় অধিকতর বিপর্যয়কর যে ঘটনা ঘটছে, যেখানে তার একমাত্র জোয়ান ছেলের ঘরে ফেরার সম্ভাবনা বেশ পরিমাণে তিরোহিত, তা সামলে ওঠার কোনো আশা আর থাকে না। ঝড়-কবলিত মীর আলিকে তাই একাত্তরের অন্যায় সমরে সংঘটিত মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবে পড়াই সঙ্গত। এ ধরনের অসংখ্য বহুমাত্রিক নিপীড়ন ও বিপর্যয়ের ফলে ধীরে ধীরে বদলে যায় হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কর্মরত চৌকস তরুণ রফিক; মেজর এজাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, একটুও ভীত না হয়ে, নবলব্ধ মনোবল নিয়ে, এজাজের আশু ধ্বংসবার্তা প্রচার করে, রফিক যখন নামতে থাকে বিলের মৃত্যুর দিকে, তখনই আসলে জন্ম নিতে থাকে বদলে যাওয়া এক নতুন বাংলাদেশ। রফিক এ উপন্যাসের সম্ভবত সবচেয়ে জটিল চরিত্র। তাকে বাস্তব হিসেবে না পড়ে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে পড়ার নিগূঢ় আমন্ত্রণ আছে উপন্যাসটিতে। পরিষ্কার বলা হয়েছে, রফিক কখনো এ গ্রামে আসেনি। অথচ সে এমনভাবে কাজ করেছে, যেন শুধু নীলগঞ্জের রাস্তাঘাট নয়, মানুষজন এবং প্রাকৃতিক অবকাঠামোও তার খুবই চেনা। উপন্যাসের বর্ণনাধারার বাইরে গিয়ে তথ্যটি দিয়ে দিচ্ছেন স্বয়ং লেখক। সে কোন এলাকার মানুষ তা জানতে চেয়েছিল ইমাম। রফিক জবাব দেয়নি। মেজর এজাজের সহযোগী হিসেবে গ্রামে প্রবেশ করলেও 'আমরা' হিসাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধি হয়েই সে কথা বলেছে। আর এভাবেই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের যে কোনো গ্রামের যে কোনো রফিক। যুদ্ধই করতে চেয়েছে সে। তাই প্রথম থেকে নিজের অনাস্থা জানিয়ে এসেছে অন্যায্য নিপীড়নের ব্যাপারে। অবশেষে যখন সে নিশ্চিত হয়েছে, এটা যুদ্ধ নয়, অন্যায় যুদ্ধ মাত্র, তখন প্রতিবাদ ছাড়া তার হাতে আর কোনো উপায় ছিল না। প্রতিবাদটি সে করেছে জীবন দিয়ে। যুদ্ধের শুরুর পর্বে বাংলাদেশের আপামর জনতা যখন বুঝতে শুরু করে, তাদের সামষ্টিক বেঁচে থাকা কেবল ব্যক্তিক জীবনদানের মধ্য দিয়েই সম্ভবপর, তখনি আসলে বাংলাদেশ প্রবেশ করতে থাকে যুদ্ধে। যুদ্ধ রূপান্তরিত হতে থাকে এক সর্বব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে। হুমায়ুনের সাহিত্যিকজীবনের অন্যতম মেধাবী নির্মাণ রফিক এভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ ধরনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিলের পানিতে সে যখন নামছিল, ততক্ষণে কৈবর্তপাড়ায় রাজাকাররা আগুন বেশ জমিয়ে তুলতে পেরেছে। আগুনের আলো পড়েছে রফিকের মুখে। আগুনের আঁচে বিলের পানিতে মেজর এজাজের কাছে অচেনা হয়ে ওঠা যে রফিক দাঁড়িয়ে আছে, সে রফিকই আসলে এ উপন্যাসের একাত্তর, এ উপন্যাসের মুক্তিযুদ্ধ। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের ঔপন্যাসিক পরিচিতি : |
|---|
হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার ও টিভি-নাট্যকার। ১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর তিনি নেত্রকোনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতার কর্মসূত্রে দেশের নানা শহরে তাঁর শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত হয়। এ কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনাও হয় বিভিন্ন স্কুলে। পরে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে বিএসসি (অনার্স) ও এমএসসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডেকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৭৩ সাল থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে অধ্যাপনা থেকে অবসর নিয়ে তিনি সার্বক্ষণিক সাহিত্যচর্চা ও নাটক-সিনেমা নির্মাণে মনোনিবেশ করেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের সাথে হুমায়ূন আহমেদের অন্তরঙ্গ পরিচয় ছিল। বিশেষত বিশ শতকের সত্তর ও আশির দশকের নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের চিত্র অঙ্কনে তিনি যে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন, তার তুলনা বিরল। প্রধানত গল্প, উপন্যাস ও নাটক-সিনেমায় জীবনের স্বরূপ উন্মোচনের কাজটি তিনি করেছেন। এছাড়া বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, শিশু-কিশোর সাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি ও আত্মজৈবনিক রচনায়ও তিনি সিদ্ধহস্ত। সাবলীল গদ্যভঙ্গি, বহুমাত্রিক হাস্যরস এবং বিষয়গত বৈচিত্র্য তাঁর রচনার বৈশিষ্ট্য। কথাসাহিত্যিক ও নাট্য-নির্মাতা হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা কিংবদন্তি হয়ে আছে। বাজারের চাহিদা মেটাতে জনপ্রিয় ধাঁচের বহু গদ্য লিখেছেন তিনি। তবে তাঁর কালোত্তীর্ণ রচনার পরিমাণও অনেক। তিনি একজন নিপুণ গল্পকার। একরৈখিকতা এবং সাংকেতিকতা রক্ষা করে জীবনের বিশেষ দিক উন্মোচিত হয়েছে তাঁর অনেকগুলো চমৎকার ছোটগল্পে। বড় উপন্যাস বেশ কয়েকটি লিখলেও তাঁর সাফল্য ও সিদ্ধি এসেছে মূলত ছোট আকারের উপন্যাস বা নভেলায়। এ ধরনের রচনার মধ্যে নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, অচিনপুর, ফেরা, এই বসন্তে, প্রিয়তমেষু, যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ, গৌরীপুর জংশন, চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক, ১৯৭১, অনিল বাগচীর একদিন, আগুনের পরশমণি, আমার আছে জল, কৃষ্ণপক্ষ, জনম জনম, দ্বৈরথ, নবনী, নি, শূন্য ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কবি', জোছনা ও জননীর গল্প, মধ্যাহ্ন, মাতাল হওয়া, লীলাবতী, বাদশা নামদার প্রভৃতি তুলনামূলক বৃহৎ পটভূমিতে রচিত উপন্যাস। এছাড়া তিনি জনপ্রিয় চরিত্র হিমু, মিসির আলি ও শুভ্রকে কেন্দ্রে রেখে অনেকগুলো কাহিনি রচনা করেছেন; লিখেছেন বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি তথা সায়েন্স ফিকশন।
বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি-জগতে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এক বর্ণাঢ্য চরিত্র। একুশের বইমেলা তাঁকে ঘিরে উৎসবের বাড়তি আমেজ পেত। তাঁর নাটক ও সিনেমা প্রায়ই আলোড়ন তুলত বৃহত্তর ভোক্তা-সমাজে। দেশে-বিদেশে তিনি বিপুলভাবে নন্দিত ও পুরস্কৃত হয়েছেন। অসাধারণ সৃষ্টিশীলতার সাথে দেশ ও মানুষের প্রতি নিঃশর্ত অঙ্গীকার এবং এক উদার ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর সাফল্যের ভিত্তি। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের জ্ঞানমূলক প্রশ্ন : |
|---|
|
১. অনুফা কে? সে কেন মীর আলির উপর বিরক্ত হয়? ২. মীর আলি আজকাল শব্দ সহ্য করতে পারে না কেন? ব্যাখ্যা করো। ৩. ‘চারদিকে সীমাহীন অন্ধকার’- ব্যাখ্যা করো। ৪. মীর আলির পারিবারিক অবস্থার বর্ণনা দাও। ৫. মীর আলি অত্যন্ত বিচলিত বোধ করে কেন? ব্যাখ্যা করো। ৬. ‘১৯৭১’ উপন্যাসে লেখক উজান দেশ বলতে কী বুঝিয়েছেন? ৭. চন্দ্রকান্ত সেনের সর্পাঘাত ও গুপ্তধন সম্পর্কিত মিথের বর্ণনা দাও। ৮. নান্দাইল রোড স্টেশন থেকে মধুবন বাজারে যাওয়ার প্রক্রিয়া বর্ণনা করো। ৯. নীলগঞ্জ গ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে লেখো। ১০. ‘দুজন বিদেশি লোক আছেন নীলগঞ্জ।’- নীলগঞ্জে এ বিদেশি কারা এবং তাদের কেন বিদেশি বলা হচ্ছে? ব্যাখ্যা করো। ১১. ‘চিত্রা বুড়ি রাতে একনাগাড়ে কখনো ঘুমায় না’- কেন? বর্ণনা করো। ১২. চিত্রা বুড়ি নীলগঞ্জের প্রথম। প্রথম ভিক্ষুক হলো কীভাবে? এর কারণ ব্যাখ্যা করো। ১৩. সেনবাড়িতে ডাকাত আসার কথা নয় কেন? বুঝিয়ে লেখো। ১৪. চিত্রা বড়ির কাছে কোন ব্যাপারটি অস্বাভাবিক লাগে? ব্যাখ্যা করো। ১৫. ‘মিলিটারি আইলে এতক্ষণে গুলি শুরু হইয়া যাইত। মিলিটারি কি সোজা জিনিস?’- ব্যাখ্যা করো। ১৬. গ্রামে প্রথম মিলিটারি প্রবেশের প্রবেশের চিত্রটি ইমাম সাহেবের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করো। ১৭. নীলগঞ্জ গ্রামে মিলিটারি দল কীভাবে প্রবেশ করে? ব্যাখ্যা কর। ১৮. ইমাম সাহেব সেদিন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত নামাজ পড়লেন কী কারণে? বুঝিয়ে লেখো। ১৯. গ্রামে মিলিটারি প্রবেশের চিত্র দেখে ইমাম সাহেবের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়? ২০. চার-পাঁচজন মুসল্লি মসজিদে রাত কাটাল কেন? ব্যাখ্যা কর। ২১. রাসমোহন চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে নীলগঞ্জ গ্রামের মিলিটারি দলের বর্ণনা দাও। ২২. আজিজ মাস্টারের নেতৃত্ব দেওয়া দেওয়া ছোট দলটি বুকের মধ্যে কাঁপুনি অনুভব করে কী কারণে? বুঝিয়ে লেখো। ২৩. স্কুলঘরে মিলিটারিদের সাথে দেখা করতে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো। ২৪. প্রথম সাক্ষাতে আজিজ মাস্টারের দৃষ্টিকোণ থেকে মেজর এজাজ ও রফিকের স্বরূপ বর্ণনা করো। ২৫. আজিজ মাস্টারের জন্য সবাই কোথায় অপেক্ষা করে? কেন করে? ২৬. মিলিটারি সম্পর্কে বদিউজ্জামানের ধারণার সত্যতা ব্যাখ্যা করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের অনুধাবনমূলক প্রশ্ন : |
|---|
|
১. “মীর আলি অসহায় গ্রামীণ বৃদ্ধ পিতার প্রতিরূপ”- ‘১৯৭১’ উপন্যাসের আলোকে
উক্তিটি বিশ্লেষণ করো। ২. “বুড়ো হওয়ার অনেক যন্ত্রণা। অনেক কষ্ট।” ‘১৯৭১’ উপন্যাসের মীর আলি চরিত্রের আলোকে ব্যাখ্যা করো? ৩. ‘১৯৭১’ উপন্যাসে প্রতিফলিত নীলগঞ্জের জনজীবনের পরিচয় দাও। ৪. ‘১৯৭১’ উপন্যাসে নীলগঞ্জ গ্রামের মসজিদের ইমাম নিপীড়িত বাঙালির প্রতীক।- মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো। ৫. i. রফিক চরিত্রটি তোমার কাছে কি দ্বিমুখী চরিত্র মনে হয়? ব্যখ্যা করো। ii. রফিকের চরিত্র বিশ্লেষণ করো। iii. “রফিকই আসলে ‘১৯৭১’ উপন্যাসের একাত্তর, এই উপন্যাসের মুক্তিযুদ্ধ।”- রফিক চরিত্র অবলম্বনে কথাটি বিশ্লেষণ করো। iv. ‘১৯৭১’ উপন্যাসের রফিক চরিত্রটি মুক্তিকামী বাঙালি সেনাদের প্রতিনিধি- কথাটি বিশ্লেষণ করো। ৬. i. আজিজ মাস্টার চরিত্রটি তোমার কাছে কেমন মনে হয়? ব্যখ্যা করো? ii. আজিজ মাস্টার চরিত্র বিশ্লেষণ করো। iii. “অপমানের চেয়ে মানুষ মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে।”- আজিজ মাস্টারের উদাহরণ ব্যবহার করে বাক্যটির সত্যতা যাচাই করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১: |
|---|
|
ক. ‘নিজাম পাগল’ সম্পর্কে এজাজের অভিমত কতখানি সত্য বুঝিয়ে লেখো। |
|
ক. ‘নিজাম পাগল’ সম্পর্কে এজাজের অভিমত সত্য নয়; কেননা, বেশ কয়েকবার
নিজামকে জঙ্গলা মাঠের দিকে যাওয়া-আসা করতে দেখা গেলেও যুদ্ধ সংক্রান্ত
কোনো তৎপরতায় তার সংশ্লিষ্টতা মেলে না।
খ. বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। প্রায়
তিন-চার দশক ধরে তিনি বাঙালি পাঠককে বিমোহিত করেছেন।
|
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২: |
|---|
|
ক. বলাই কোনোখানেই বেশিক্ষণ থাকতে পারছে না কেন? বর্ণনা দাও। |
|
ক. নীলু সেনকে মিলিটারিরা হত্যা করার পর তাকেও মেরে ফেলতে পারে এই ভয়ে
বলাই কোনোখানেই থাকতে পারছে না।
খ. বাংলা সাহিত্যের সর্বকালীন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকগণের অন্যতম হুমায়ূন
আহমেদ। ‘১৯৭১’ তাঁর সাহিত্যকীর্তিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ
উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে নীলগঞ্জের মতো একটি গণ্ডগ্রাম রণাঙ্গনে
পরিণত হয়ে উঠল। বিশেষত, মিলিটারিদের বিবেকহীন অত্যাচার-নির্যাতন ও
নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ নীলগঞ্জবাসীকে করে তুলেছে মুক্তিকামী যোদ্ধা। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৩: |
|---|
|
ক. আজিজ মাস্টার শাস্তি হিসেবে পরে মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিলেন কেন? ব্যাখ্যা
করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৪: |
|---|
|
ক. মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের প্রভাব ‘১৯৭১’
উপন্যাসের আলোকে সংক্ষেপে বর্ণনা করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৫: |
|---|
|
ক. মেজর এজাজের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগল কেন? ব্যাখ্যা করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৬: |
|---|
|
ক. রফিক কেন মিলিটারিদের কৈবর্তপাড়ায় তল্লাশি করা থেকে নিবৃত্ত করেছিলেন?
|
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৭: |
|---|
|
ক. বলাই কে? বলাইয়ের সাথে রফিকের সম্পর্ক কেমন ছিল? ব্যাখ্যা করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৮: |
|---|
|
ক. ‘মিলিটারিদের পোশাকটাই এরকম গায়ে দিলে রক্ত গরম হয়ে যায়’- কথাটি
বুঝিয়ে লেখো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৯: |
|---|
|
ক. ‘চিত্রাবুড়ির কাছে সমস্ত ব্যাপারটাই অস্বাভাবিক লাগছে।’- এখানে কোন
ঘটনার কথা বলা হয়েছে? |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১০: |
|---|
|
ক. মুসল্লিরা মসজিদে রাত কাটালো কেন? ব্যাখ্যা করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১১: |
|---|
|
ক. সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তনের প্রধান কারণ ব্যাখ্যা করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১২: |
|---|
|
ক. ‘মৃত্যুর মুখোখুখি দাঁড়ালে অনেকেই এরকম করবে।’ এ উক্তিটি কার?
উক্তিটি করার কারণ কী ছিল? বুঝিয়ে লেখো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৩: |
|---|
|
ক. আজিজ মাস্টারের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল? ব্যাখ্যা করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৪: |
|---|
|
ক. মীর আলিকে মেজর এজাজ কেন সালাম দিলেন? ব্যাখ্যা করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৫: |
|---|
|
৫। ক) খুনের বিচার করতে মেজর এজাজ এতটা আগ্রহী হয়েছিল কেন? |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৬: |
|---|
|
৬। ক) বদিউজ্জামান কাদের ভয়ে এবং কোথায় লুকিয়েছিল? তার অবস্থা সংক্ষেপে
বর্ণনা করো। |
| ‘১৯৭১’ উপন্যাসের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৭: |
|---|
|
৭। ক) অনুফা কে? সে কেন মীর আলির উপর বিরক্ত হয়? |
| তথ্যসূত্র : |
|---|
|
১. বাংলা পাঠ: নবম-দশম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,
ঢাকা, ২০২৬। ২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮। ৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫। |
