সুভা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুভা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুভা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মেয়েটির নাম যখন সুভাষিণী রাখা হইয়াছিল তখন কে জানিত সে বোবা হইবে। তাহার দুটি বড়ো বোনকে সুকেশিনী ও সুহাসিনী নাম দেওয়া হইয়াছিল, তাই মিলের অনুরোধে তাহার বাপ ছোটো মেয়েটির নাম সুভাষিণী রাখে। এখন সকলে তাহাকে সংক্ষেপে সুভা বলে।

দস্তুরমতো অনুসন্ধান ও অর্থব্যয়ে বড়ো দুটি মেয়ের বিবাহ হইয়া গেছে, এখন ছোটোটি পিতামাতার নীরব হৃদয়ভারের মতো বিরাজ করিতেছে।

যে কথা কয় না সে যে অনুভব করে ইহা সকলের মনে হয় না, এইজন্য তাহার সাক্ষাতেই সকলে তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করিত। সে যে বিধাতার অভিশাপস্বরূপে তাহার পিতৃগৃহে আসিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছে এ কথা সে শিশুকাল হইতে বুঝিয়া লইয়াছিল। তাহার ফল এই হইয়াছিল, সাধারণের দৃষ্টিপথ হইতে সে আপনাকে গোপন করিয়া রাখিতে সর্বদাই চেষ্টা করিত। মনে করিত, আমাকে সবাই ভুলিলে বাঁচি। কিন্তু, বেদনা কি কেহ কখনো ভোলে? পিতামাতার মনে সে সর্বদাই জাগরূক ছিল।

বিশেষত, তাহার মা তাহাকে নিজের একটা ত্রুটিস্বরূপ দেখিতেন; কেননা, মাতা পুত্র অপেক্ষা কন্যাকে নিজের অংশরূপে দেখেন- কন্যার কোনো অসম্পূর্ণতা দেখিলে সেটা যেন বিশেষরূপে নিজের লজ্জার কারণ বলিয়া মনে করেন। বরঞ্চ, কন্যার পিতা বাণীকণ্ঠ সুভাকে তাঁহার অন্য মেয়েদের অপেক্ষা যেন একটু বেশি ভালোবাসিতেন; কিন্তু মাতা তাহাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক জ্ঞান করিয়া তাহার প্রতি বড়ো বিরক্ত ছিলেন। সুভার কথা ছিল না, কিন্তু তাহার সুদীর্ঘপল্লববিশিষ্ট বড়ো বড়ো দুটি কালো চোখ ছিল-এবং তাহার ওষ্ঠাধর ভাবের আভাসমাত্রে কচি কিশলয়ের মতো কাঁপিয়া উঠিত। কথায় আমরা যেভাব প্রকাশ করি সেটা আমাদিগকে অনেকটা নিজের চেষ্টায় গড়িয়া লইতে হয়, কতকটা তর্জমা করার মতো: সকল সময়ে ঠিক হয় না, ক্ষমতার অভাবে অনেক সময়ে ভুলও হয়। কিন্তু কালো চোখকে কিছু তর্জমা করিতে হয় না- মন আপনি তাহার উপরে ছায়া ফেলে; ভাব আপনি তাহার উপরে কখনো প্রসারিত কখনো মুদিত হয়, কখনো উজ্জ্বলভাবে জ্বলিয়া উঠে, কখনো স্নানভাবে নিবিয়া আসে, কখনো অস্তমান চন্দ্রের মতো অনিমেষভাবে চাহিয়া থাকে, কখনো দ্রুত চঞ্চল বিদ্যুতের মতো দিগ্বিদিকে ঠিকরিয়া উঠে। মুখের ভাব বৈ আজন্মকাল যাহার অন্য ভাষা নাই তাহার চোখের ভাষা অসীম উদার এবং অতলস্পর্শ গভীর- অনেকটা স্বচ্ছ আকাশের মতো, উদয়াস্ত এবং ছায়ালোকের নিস্তব্ধ রঙ্গভূমি। এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ত্ব আছে। এইজন্য সাধারণ বালকবালিকারা তাহাকে একপ্রকার ভয় করিত, তাহার সহিত খেলা করিত না। সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন।

গ্রামের নাম চণ্ডীপুর। নদীটি বাংলাদেশের একটি ছোটো নদী, গৃহস্থঘরের মেয়েটির মতো, বহুদূর পর্যন্ত তাহার প্রসার নহে; নিরলসা তন্বী নদীটি আপন কূল রক্ষা করিয়া কাজ করিয়া যায়: দুই ধারের গ্রামের সকলেরই সঙ্গে তাহার যেন একটা-না-একটা সম্পর্ক আছে। দুই ধারে লোকালয় এবং তরুচ্ছায়াঘন উচ্চ তট: নিম্নতল দিয়া গ্রামলক্ষ্মী স্রোতস্বিনী আত্মবিস্মৃত দ্রুত পদক্ষেপে প্রফুল্ল হৃদয়ে আপনার অসংখ্য কল্যাণকার্যে চলিয়াছে।

বাণীকণ্ঠের ঘর নদীর একেবারে উপরেই। তাহার বাঁখারির বেড়া, আটচালা, গোয়ালঘর, ঢেঁকিশালা, খড়ের স্তূপ, তেঁতুলতলা, আম কাঁঠাল এবং কলার বাগান নৌকাবাহী-মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই গার্হস্থ্য সচ্ছলতার মধ্যে বোবা মেয়েটি কাহারও নজরে পড়ে কি না জানি না, কিন্তু কাজকর্মে যখনই অবসর পায় তখনই সে এই নদীতীরে আসিয়া বসে।

প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়। যেন তাহার হইয়া কথা কয়। নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মর-সমস্ত মিশিয়ে চারিদিকের চলাফেরা-আন্দোলন-কম্পনের সহিত এক হইয়া সমুদ্রের তরঙ্গরাশির ন্যায় বালিকার চিরনিস্তব্ধ হৃদয়-উপকূলের নিকটে আসিয়া ভাঙিয়া ভাঙিয়া পড়ে। প্রকৃতির এই বিবিধ শব্দ এবং বিচিত্র গতি, ইহাও বোবার ভাষা বড়ো বড়ো চক্ষুপল্লববিশিষ্ট সুভার যেভাষা তাহারই একটা বিশ্বব্যাপী বিস্তার: ঝিল্লিরবপূর্ণ তৃণভূমি হইতে শব্দাতীত নক্ষত্রলোক পর্যন্ত কেবল ইঙ্গিত, ভঙ্গি, সংগীত, ক্রন্দন এবং দীর্ঘনিশ্বাস।

এবং মধ্যাহ্নে যখন মাঝিরা জেলেরা খাইতে যাইত, গৃহস্থেরা ঘুমাইত, পাখিরা ডাকিত না, খেয়া-নৌকা বন্ধ থাকিত, সজন জগৎ সমস্ত কাজকর্মের মাঝখানে সহসা থামিয়া গিয়া ভয়ানক বিজনমূর্তি ধারণ করিত, তখন রুদ্র মহাকাশের তলে কেবল একটি বোবা প্রকৃতি এবং একটি বোবা মেয়ে মুখামুখি চুপ করিয়া বসিয়া থাকিত- একজন সুবিস্তীর্ণ রৌদ্রে, আর-একজন ক্ষুদ্র তরুচ্ছায়ায়।

সুভার যে গুটিকতক অন্তরঙ্গ বন্ধুর দল ছিল না তাহা নহে। গোয়ালের দুটি গাভী, তাহাদের নাম সর্বশী ও পাঙ্গুলি। সে নাম বালিকার মুখে তাহারা কখনো শুনে নাই, কিন্তু তাহার পদশব্দ তাহারা চিনিত- তাহার কথাহীন একটা করুণ সুর ছিল, তাহার মর্ম তাহারা ভাষার অপেক্ষা সহজে বুঝিত। সুভা কখন তাহাদের আদর করিতেছে, কখন ভর্ৎসনা করিতেছে, কখন মিনতি করিতেছে, তাহা তাহারা মানুষের অপেক্ষা ভালো বুঝিতে পারিত।

সুভা গোয়ালে ঢুকিয়া দুই বাহুর দ্বারা সর্বশীর গ্রীবা বেষ্টন করিয়া তাহার কানের কাছে আপনার গণ্ডদেশ ঘর্ষণ করিত এবং পাঙ্গুলি স্নিগ্ধদৃষ্টিতে তাহার প্রতি নিরীক্ষণ করিয়া তাহার গা চাটিত। বালিকা দিনের মধ্যে নিয়মিত তিনবার করিয়া গোয়ালঘরে যাইত, তাহা ছাড়া অনিয়মিত আগমনও ছিল; গৃহে যেদিন কোনো কঠিন কথা শুনিত সেদিন সে অসময়ে তাহার এই মূক বন্ধু দুটির কাছে আসিত- তাহার সহিষ্ণুতাপরিপূর্ণ বিষাদশান্ত দৃষ্টিপাত হইতে তাহারা কী একটা অন্ধ অনুমানশক্তির দ্বারা বালিকার মর্মবেদনা যেন বুঝিতে পারিত, এবং সুভার গা ঘেঁষিয়া আসিয়া অল্পে অল্পে তাহার বাহুতে শিং ঘষিয়া ঘষিয়া তাহাকে নির্বাক ব্যাকুলতার সহিত সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করিত।

ইহারা ছাড়া ছাগল এবং বিড়ালশাবকও ছিল; কিন্তু তাহাদের সহিত সুভার এরূপ সমকক্ষভাবে মৈত্রী ছিল না, তথাপি তাহারা যথেষ্ট আনুগত্য প্রকাশ করিত। বিড়ালশিশুটি দিনে এবং রাত্রে যখন-তখন সুভার গরম কোলটি নিঃসংকোচে অধিকার করিয়া সুখনিদ্রার আয়োজন করিত এবং সুভা তাহার গ্রীবা ও পৃষ্ঠে কোমল অঙ্গুলি বুলাইয়া দিলে যে তাহার নিদ্রাকর্ষণের বিশেষ সহায়তা হয়, ইঙ্গিতে এরূপ অভিপ্রায়ও প্রকাশ করিত।

উন্নত শ্রেণির জীবের মধ্যে সুভার আরও একটি সঙ্গী জুটিয়াছিল। কিন্তু তাহার সহিত বালিকার ঠিক কিরূপ সম্পর্ক ছিল তাহা নির্ণয় করা কঠিন, কারণ, সে ভাষাবিশিষ্ট জীব; সুতরাং উভয়ের মধ্যে সমভাষা ছিল না।

গোঁসাইদের ছোটো ছেলেটি তাহার নাম প্রতাপ। লোকটি নিতান্ত অকর্মণ্য। সে যে কাজকর্ম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে যত্ন করিবে, বহু চেষ্টার পর বাপ-মা সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন। অকর্মণ্য লোকের একটা সুবিধা এই যে, আত্মীয় লোকেরা তাহাদের উপর বিরক্ত হয় বটে, কিন্তু প্রায় তাহারা নিঃসম্পর্ক লোকদের প্রিয়পাত্র হয়- কারণ, কোনো কার্যে আবন্ধ না থাকাতে তাহারা সরকারি সম্পত্তি হইয়া দাঁড়ায়। শহরের যেমন এক-আধটা গৃহসম্পর্কহীন সরকারি বাগান থাকা আবশ্যক তেমনি গ্রামে দুই-চারিটা অকর্মণ্য সরকারি লোক থাকার বিশেষ প্রয়োজন। কাজে-কর্মে আমোদে-অবসরে যেখানে একটা লোক কম পড়ে সেখানেই তাহাদিগকে হাতের কাছে পাওয়া যায়।

প্রতাপের প্রধান শখ- ছিপ ফেলিয়া মাছ ধরা। ইহাতে অনেক সময় সহজে কাটানো যায়। অপরাহ্ণে নদীতীরে ইহাকে প্রায় এই কাজে নিযুক্ত দেখা যাইত। এবং এই উপলক্ষে সুভার সহিত তাহার প্রায় সাক্ষাৎ হইত। যে-কোনো কাজেই নিযুক্ত থাক, একটা সঙ্গী পাইলে প্রতাপ থাকে ভালো। মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সঙ্গীই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ- এইজন্য প্রতাপ সুভার মর্যাদা বুঝিত। এইজন্য, সকলেই সুভাকে সুভা বলিত, প্রতাপ আর-একটু অতিরিক্ত আদর সংযোগ করিয়া সুভাকে ‘সু’ বলিয়া ডাকিত।

সুভা তেঁতুলতলায় বসিয়া থাকিত এবং প্রতাপ অনতিদূরে ছিপ ফেলিয়া জলের দিকে চাহিয়া থাকিত। প্রতাপের জন্য একটি করিয়া পান বরাদ্দ ছিল, সুভা তাহা নিজে সাজিয়া আনিত। এবং বোধ করি অনেকক্ষণ বসিয়া বসিয়া চাহিয়া ইচ্ছা করিত, প্রতাপের কোনো-একটা বিশেষ সাহায্য করিতে, একটা-কোনো কাজে লাগিতে, কোনোমতে জানাইয়া দিতে যে এই পৃথিবীতে সেও একজন কম প্রয়োজনীয় লোক নহে। কিন্তু কিছুই করিবার ছিল না। তখন সে মনে মনে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করিত মন্ত্রবলে সহসা এমন একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটাইতে ইচ্ছা করিত যাহা দেখিয়া প্রতাপ আশ্চর্য হইয়া যাইত, বলিত, ‘তাই তো, আমাদের সুভির যে এত ক্ষমতা তাহা তো জানিতাম না।’

মনে করো, সুভা যদি জলকুমারী হইত: আস্তে আস্তে জল হইতে উঠিয়া একটা সাপের মাথার মণি ঘাটে রাখিয়া যাইত; প্রতাপ তাহার তুচ্ছ মাছধরা রাখিয়া সেই মানিক লইয়া জলে ডুব মারিত; এবং পাতালে গিয়া দেখিত, রুপার অট্টালিকায় সোনার পালঙ্কে-কে বসিয়া? আমাদের বাণীকণ্ঠের ঘরের সেই বোবা মেয়ে সু- আমাদের সু সেই মণিদীপ্ত গভীর নিস্তব্ধ পাতালপুরীর একমাত্র রাজকন্যা। তাহা কি হইতে পারিত না, তাহা কি এতই অসম্ভব। আসলে কিছুই অসম্ভব নয়, কিন্তু তবুও সু প্রজাশূন্য পাতালের রাজবংশে না জন্মিয়া বাণীকণ্ঠের ঘরে আসিয়া জন্মিয়াছে এবং গোঁসাইদের ছেলে প্রতাপকে কিছুতেই আশ্চর্য করিতে পারিতেছে না।

সুভার বয়স ক্রমেই বাড়িয়া উঠিতেছে। ক্রমে সে যেন আপনাকে আপনি অনুভব করিতে পারিতেছে। যেন কোনো একটা পূর্ণিমাতিথিতে কোনো-একটা সমুদ্র হইতে একটা জোয়ারের স্রোত আসিয়া তাহার অন্তরাত্মাকে এক নূতন অনির্বচনীয় চেতনাশক্তিতে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিতেছে। সে আপনাকে আপনি দেখিতেছে, ভাবিতেছে, প্রশ্ন করিতেছে, এবং বুঝিতে পারিতেছে না।

গভীর পূর্ণিমারাত্রে সে এক-একদিন ধীরে শয়নগৃহের দ্বার খুলিয়া ভয়ে ভয়ে মুখ বাড়াইয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া দেখে পূর্ণিমাপ্রকৃতিও সুভার মতো একাকিনী সুপ্ত জগতের উপর জাগিয়া বসিয়া-যৌবনের রহস্যে পুলকে বিষাদে অসীম নির্জনতার একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত, এমন- কি, তাহা অতিক্রম করিয়াও ধমথম করিতেছে, একটি কথা কহিতে পারিতেছে না। এই নিস্তব্ধ ব্যাকুল প্রকৃতির প্রান্তে একটি নিস্তব্ধ ব্যাকুল বালিকা দাঁড়াইয়া।

এ দিকে কন্যাভারগ্রস্ত পিতামাতা চিন্তিত হইয়া উঠিয়াছেন। লোকেও নিন্দা আরম্ভ করিয়াছে। এমন-কি, এক-ঘরে করিবে এমন জনরবও শুনা যায়। বাণীকন্ঠের সচ্ছল অবস্থা, দুই বেলাই মাছভাত খায়, এজন্য তাহার শত্রু ছিল। বিদেশযাত্রার উদ্‌্যোগ হইতে লাগিল। কুয়াশা-ঢাকা প্রভাতের মতো সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে একেবারে ভরিয়া গেল। একটা অনির্দিষ্ট আশঙ্কা বশে সে কিছুদিন হইতে ক্রমাগত নির্বাক জন্তুর মতো তাহার বাপ-মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিরিত- ডাগর চক্ষু মেলিয়া তাঁহাদের মুখের দিকে চাহিয়া কী- একটা বুঝিতে চেষ্টা করিত, কিন্তু তাঁহারা কিছু বুঝাইয়া বলিতেন না।

ইতোমধ্যে একদিন অপরাহ্ণে ছিপ ফেলিয়া প্রতাপ হাসিয়া কহিল, “কী রে সু, তোর নাকি বর পাওয়া গেছে, তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস? দেখিস আমাদের ভুলিস নে।” বলিয়া আবার মাছের দিকে মনোযোগ করিল।

মর্মবিদ্ধ হরিণী ব্যাধের দিকে যেমন করিয়া তাকায়, নীরবে বলিতে থাকে ‘আমি তোমার কাছে কী দোষ করিয়াছিলাম’, সুভা তেমনি করিয়া প্রতাপের দিকে চাহিল; সেদিন গাছের তলায় আর বসিল না; বাণীকণ্ঠ নিদ্রা হইতে উঠিয়া শয়নগৃহে তামাক খাইতেছিলেন, সুভা তাঁহার পায়ের কাছে বসিয়া তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া কাঁদিতে লাগিল। অবশেষে তাহাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়া বাণীকন্ঠের শুষ্ক কপোলে অশ্রু গড়াইয়া পড়িল।

কাল কলিকাতায় যাইবার দিন স্থির হইয়াছে। সুভা গোয়ালঘরে তাহার বাল্য-সখীদের কাছে বিদায় লইতে গেল, তাহাদিগকে স্বহস্তে খাওয়াইয়া, গলা ধরিয়া একবার দুই চোখে যত পারে কথা ভরিয়া তাহাদের মুখের দিকে চাহিল- দুই নেত্রপল্লব হইতে টপ টপ করিয়া অশ্রুজল পড়তে লাগিল।

সেদিন শুক্লাদ্বাদশীর রাত্রি। সুভা শয়নগৃহ হইতে বাহির হইয়া তাহার সেই চিরপরিচিত নদীতটে শল্পশয্যায় লুটাইয়া পড়িল- যেন ধরণীকে, এই প্রকাণ্ড মূক মানবতাকে দুই বাহুতে ধরিয়া বলিতে চাহে, ‘তুমি আমাকে যাইতে দিয়ো না মা, আমার মতো দুটি বাহু বাড়াইয়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাখো।’ [সংক্ষেপিত]

চিত্রকর: মুসতাকিম রহমান নাহভান; ২য় শ্রেণি
চিত্রকর: মুসতাকিম রহমান নাহভান; ২য় শ্রেণি
‘সুভা’ গল্পের উৎস নির্দেশ :
‘সুভা’ গল্পটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘গল্পগুচ্ছ’ থেকে সংকলিত হয়েছে।

‘সুভা’ গল্পের শব্দার্থ ও টীকা :
➠ অনুরোধে- সুপারিশে।
➠ সংক্ষেপে- ছেটো আকারে।
➠ দস্তুরমত- যথেষ্ট।
➠ অনুসন্ধান- খোঁজ-খবর।
➠ বিরাজ- অবস্থান।
➠ অনুভব- উপলব্ধি।
➠ দুশ্চিন্তা- দুর্ভবনা।
➠ জাগরূক- সজাগ; জাগ্রত; সতর্ক।
➠ গর্ভের কলঙ্ক- সন্তান হিসেবে কলঙ্ক। গর্ভ হলো মায়ের পেট। যে ব্যক্তি বা বস্তুকে পরিবারে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয় তা হলো কলঙ্ক।
➠ সুদীর্ঘ পল্লববিশিষ্ট- বড়ো পাতাবিশিষ্ট। এখানে চোখের পাতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
➠ ওষ্ঠাধর- ওষ্ঠ এবং অধর, উপরের ও নিচের ঠোঁট [ওষ্ঠ+অধর = ওষ্ঠাধর]।
➠ কিশলয়- গাছের নতুন পাতা।
➠ তর্জমা- অনুবাদ, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর।
➠ প্রসারিত- বিস্তার লাভ করা।
➠ মুদিত- মুদ্রিত; নিমিলিত।
➠ ম্লানভাবে- মলিনভাবে।
➠ অস্তমান- ডুবন্ত, ডুবে যাচ্ছে এমন, চন্দ্র-সূর্যের পশ্চিম দিকে অদৃশ্য অবস্থা।
➠ অনিমেষ- অপলক, পলকহীন।
➠ অতলস্পর্শ- তলকে স্পর্শ করা যায় না এমন।
➠ উদয়াস্ত- উদয়+অস্ত= উদয়াস্ত, আবির্ভাব ও তিরোভাব, ওঠা ও ডুবে যাওয়া।
➠ ছায়ালোক- ছায়া আলোক ছায়ালোক। কোনো বস্তুর ওপর আলো পড়লে বিপরীত দিকে যে প্রতিবিম্ব হয় তা হলো ছায়া।
➠ রঙ্গভূমি- থিয়েটার।
➠ বিজন- জনশূন্য; নির্জন।
➠ মহত্ত্ব- মহৎগুণ।
➠ বিজন মহত্ত্ব- কোলাহলমুক্ত প্রকৃতির যে আকর্ষণীয় দিক।
➠ দ্বিপ্রহর- দুপুর; ৩ ঘণ্টা সময়।
➠ নিরলসা- আলস্যহীন।
➠ তন্বী- ক্ষীণ ও সুগঠিত অঙ্গবিশিষ্ট।
➠ স্রোতস্বিনী- নদী।
➠ আত্মবিস্মৃত- আপনভোলা।
➠ বাঁখারি- কাঁধের দুদিকে দুপ্রান্তে ঝুলিয়ে বোঝা বহনের বাঁশের ফালি।
➠ ঢেঁকি- ধান থেকে চাল তৈরির লোকজ যন্ত্র।
➠ ঢেঁকিশালা- যে ঘরে ঢেঁকি রাখা হয়। এখনো গ্রামীণ জীবনে অনেক বাড়িতে ঢেঁকির ঘর আছে।
গার্হস্থ্য সচ্ছলতা- পারিবারিক দৈনন্দিন জীবনের সচ্ছলতা।
চিরনিস্তব্ধ হৃদয় উপকূল- শান্ত হৃদয়। নিস্তব্ধ হলো আলোড়নহীন অবস্থা। উপকূল হলো কূলের সদৃশ্য। এখানে হৃদয় উপকূল বলতে হৃদয়ের কিনারার কথাই বলা হয়েছে।
ঝিল্লিরব পূর্ণ- ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ/শব্দে মুখর।
➠ মধ্যাহ্ন- দুপুর।

➠ বিজনমূর্তি- নির্জন অবস্থা। বিজন হলো নির্জন বা জনমানবশূন্য, মূর্তি হলো কোনোকিছুর প্রতিকৃতি। বিজনমূর্তি শব্দটি এখানে কোলাহলহীন অবস্থা বা নির্জন/জনমানবশূন্য অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
➠ গণ্ডদেশ- গাল।
সহিষ্ণতাপূর্ণ- সহনশীলতা।
➠ গ্রীবা- ঘাড়।
➠ মূক- বধির, বোবা।
বিষাদশান্ত- দুঃখমগ্ন, বিষাদ স্ফূর্তিশূন্যতা, বিষণ্ণতা। বিষাদশান্ত হলো খুব বেশি বিষাদগ্রস্ততা থেকে যে শান্ত অবস্থা।
➠ পূর্ণিমাতিথি- চাঁদের পরিপূর্ণ রূপ হওয়ার সময়।
কন্যাভারগ্রস্ত পিতা-মাতা- যে পিতা-মাতার বিবাহযোগ্যা কন্যা সন্তানের বিয়ে হয়নি।
➠ কপোল- গাল।
➠ নেত্রপল্লব- চোখের পাতা।
➠ শুক্লাদ্বাদশী- চাঁদের বারোতম দিন।
➠ শষ্প- ঘাস।
➠ শষ্পশয্যা- ঘাসের বিছানা।

চিত্রকর: বায়োজিদ; শ্রেণি- কেজি
চিত্রকর: বায়োজিদ; শ্রেণি- কেজি
‘সুভা’ গল্পের পাঠ-পরিচিতি :
বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরী সুভার প্রতি লেখকের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও মমত্ববোধে গল্পটি অমর হয়ে আছে। সুভা কথা বলতে পারে না। মা মনে করেন, এ-তার নিয়তির দোষ, কিন্তু বাবা তাকে ভালোবাসেন। আর কেউ তার সঙ্গে মেশে না, খেলে না। কিন্তু তার বিশাল একটি আশ্রয়ের জগৎ আছে। যারা কথা বলতে পারে না সেই পোষা প্রাণীদের কাছে সে মুখর। তাদের সে খুবই কাছের জন। আর বিপুল নির্বাক প্রকৃতির কাছে সে পায় মুক্তির সনদ। ‘সুভা’ গল্পের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর মন ও চিন্তা, আবেগ ও অনুভূতির সূক্ষ্মতর দিকগুলো উপস্থাপন করেছেন। শিশুর এ ধরনের প্রতি সকলের মমত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্তুতে সহায়তা করে এ গল্প।

‘সুভা’ গল্পের লেখক পরিচিতি:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৫শে বৈশাখ ১২৬৮ সালে (৭ই মে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। বাল্যকালেই তাঁর কবিপ্রতিভার উন্মেষ ঘটে। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তাঁর বনফুল কাব্য প্রকাশিত হয়। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি Gitanjali: Song Offerings সংকলনের জন্য এশীয়দের মধ্যে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বস্তুত তাঁর একক সাধনায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সকল শাখায় দ্রুত উন্নতি লাভ করে এবং বিশ্বদরবারে গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি একাধারে সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সুরকার, নাট্য প্রযোজক ও অভিনেতা। কাব্য, ছোটোগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান ইত্যাদি সাহিত্যের সকল শাখাই তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে। তাঁর অজস্র রচনার মধ্যে মানসী, সোনার তরী, চিত্রা, কল্পনা, ক্ষণিকা, বলাকা, পুনশ্চ, চোখের বালি, গোরা, ঘরে বাইরে, যোগাযোগ, শেষের কবিতা, বিসর্জন, ডাকঘর, রক্তকরবী, গল্পগুচ্ছ, বিচিত্র প্রবন্ধ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮ সালে (৭ই আগস্ট ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ) কলকাতায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

‘সুভা’ গল্পের কর্ম-অনুশীলন :
১. বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধীর সাহায্য-সহযোগিতার জন্য কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়? এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে শ্রেণিশিক্ষকের নিকট জমা দাও।
২. তোমার চারপাশের সমাজে সুভার মতো কারো জীবন-বাস্তবতা থাকলে তা নিজের ভাষায় লেখো।

‘সুভা’ গল্পের বহুনির্বাচনি প্রশ্ন :

প্রশ্ন থেকে

অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন -এর মধ্যে!
যা


‘সুভা’ গল্পের জ্ঞানমূলক প্রশ্ন :
০১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
০২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত তারিখে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ই মে জন্মগ্রহণ করেন।
০৩. বনফুল কাব্য প্রকাশিত হয় কত বছর বয়সে?
উত্তর: মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়।
০৪. রবীন্দ্রনাথ কত বঙ্গাব্দে মৃত্যবরণ করেন?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে মৃত্যবরণ করেন।
০৫. রবীন্দ্রনাথ কত সালে মৃত্যবরণ করেন?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ১৯৪১ সালে মৃত্যবরণ করেন।
০৬. রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা কী?
উত্তর: শেষের কবিতা একটি উপন্যাস।
০৭. নোবেল প্রাপ্তিতে রবীন্দ্রনাথ এশীয়দের মধ্যে কততম?
উত্তর: নোবেল প্রাপ্তিতে রবীন্দ্রনাথ এশীয়দের মধ্যে প্রথম।
০৮. ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ কার লেখা?
উত্তর: ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা।
০৯. মর্মবিদ্ধ হরিণী কার দিকে তাকায়?
উত্তর: মর্মবিদ্ধ হরিণী ব্যাধের দিকে তাকায়।
১০. অবসর সময়ে সুভা কোথায় গিয়ে বসত?
উত্তর: অবসর সময়ে সুভা নদীতীরে গিয়ে বসত।
১১. সুকেশীণী ও সুহাসিনী সুভার কী হয়?
উত্তর: সুকেশীনী ও সুহাসিনী সুভার বড়ো বোন হয়।
১২. সুভার নাম সুভাষিণী রেখেছিল কে?
উত্তর: সুভার নাম সুভাষিণী রেখেছিল তার বাবা বাণীকণ্ঠ।
১৩. পিতা-মাতার নীরব হৃদয়বারের মত বিরাজ করছিল কে?
উত্তর: পিতা-মাতার নীরব হৃদয়বারের মত বিরাজ করছিল সুভা।
১৪. সে আপনাকে দেখিতেছি, ভাবিতেছে, প্রশ্ন করিতেছে এবং বুঝিতে পারিতেছে না এর কারণ কী?
উত্তর: নবযৌবনে পদার্পন করার কারণে সুভা আপনাকে দেখিতেছি, ভাবিতেছে, প্রশ্ন করিতেছে এবং বুঝিতে পারিতেছে না।
১৫. সুভা ছোটোবেলা থেকেই কী বুঝে নিয়েছিল?
উত্তর: সুভা ছোটোবেলা থেকেই বুঝে নিয়েছিল যে সে পরিবারের বোঝা স্বরূপ।
১৬. সুভার বাবর নাম কী?
উত্তর: সুভার বাবর নাম বাণীকণ্ঠ।
১৭. সুভা নিজেকে বিধাতার কী বলে মনে করত?
উত্তর: সুভা নিজেকে বিধাতার অভিশাপ বলে মনে করত।
১৮. সুভাদের গোয়ালে কয়টি গাভী ছিল?
উত্তর: সুভাদের গোয়ালে দুইটি গাভী ছিল?
১৯. সুভা কেমন করে চলত?
উত্তর: সুভা সাধারণে দৃষ্টিপথ থেকে নিজেকে সর্বদা গোপন করে চলত।
২০. সর্বশী ও পাঙ্গুলি কীসের নাম?
উত্তর: সর্বশী ও পাঙ্গুলি সুভাদের দুইটি গাভীর নাম।
২১. উন্নত শ্রেণির জীবের মধ্যে সুভার যে সঙ্গী ছিল তার নাম কী?
উত্তর: উন্নত শ্রেণির জীবের মধ্যে সুভার যে সঙ্গী ছিল তার নাম প্রতাপ।
২২. কাজকর্মে অবসর পেলে সুভা কোথায় এসে বসে?
উত্তর: কাজকর্মে অবসর পেলে সুভা নদীতীরে এসে বসে।
২৩. গোঁসাইদের ছোটো ছেলের নাম কী?
উত্তর: গোঁসাইদের ছোটো ছেলের নাম প্রতাপ।
২৪. প্রতাপ সুভাকে সু বলে ডাকত কেন?
উত্তর: প্রতাপ সুভাকে সু বলে ডাকত আদর করে।
২৫. সুভা কার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করত?
উত্তর: সুভা প্রতাপের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করত।
২৬. সুভা কর্তৃক প্রতাপের জন্য কী বরাদ্দ ছিল?
উত্তর: সুভা কর্তৃক প্রতাপের জন্য নিজ হাতে বানানো একটি পান বরাদ্দ ছিল।
২৭. সুভা কল্পনায় গভীর নিস্তব্ধ পাতালপুরীর একমাত্র কী?
উত্তর: সুভা কল্পনায় গভীর নিস্তব্ধ পাতালপুরীর একমাত্র রাজকন্যা।
২৮. সুভার পরিবারের অথনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: সুভার পরিবারের অথনৈতিক অবস্থা সচ্ছল ছিল।
২৯. বাণীকণ্ঠ দুইবেলায় কী দিয়ে খাবার খেত সুভা গল্পে বলা হয়েছে?
উত্তর: বাণীকণ্ঠ দুইবেলায় মাছ ভাত দিয়ে খাবার খেত।
৩০. সুভা কখন বের হয়ে চিরপরিচিত নদীতটে লুটিয়ে পড়ল?
উত্তর: সুভা শুক্লাদ্বাশীর রাতে বের হয়ে তার চিরপরিচিত নদীতটে লুটিয়ে পড়ল।
৩১. সুদীর্ঘ পল্লবিশিষ্টি বলতে সুভার কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: সুদীর্ঘ পল্লব বিশিষ্টি বলতে সুভার বড় পাতা বিশিষ্ট চোখ কে বোঝানো হয়েছে।
৩২. গর্ভের কলঙ্ক বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: গর্ভের কলঙ্ক বলতে সন্তান হিসাবে কলঙ্ককে বোঝানো হয়েছে।
৩৩. সুভা গল্পে কিশলয় বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: সুভা গল্পে কিশলয় বলতে গাছের নতুন পাতা বোঝানো হয়েছে।
৩৪. তর্জমা শর্ব্দের অর্থ কী?
উত্তর: তর্জমা শর্ব্দের অর্থ অনুবাদ।
৩৫. অনিমেষ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: অনিমেষ শব্দের অর্থ পলকহীন।
৩৬. কোন কিছুর উপর আলো পড়লে যে প্রতিবিম্ব তৈরি হয় তাকে কী বলে?
উত্তর: কোন কিছুর উপর আলো পড়লে যে প্রতিবিম্ব তৈরি হয় তাকে বলে ছায়লোক।
৩৭. বাঁখারি কীসের তৈরি?
উত্তর: বাঁখারি বাঁশের তৈরি।
৩৮. পূর্ণিমা কাকে বলে?
উত্তর: চাঁদের পরিপূর্ণ রূপ হওয়ার সময়কে পূর্ণিমা বলে।
৩৯. নেত্রপল্লব শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: নেত্রপল্লব শব্দের অর্থ চোখের পাতা।
৪০. শুক্লাদ্বাদশী মানে কী?
উত্তর: শুক্লাদ্ধাদশী মানে শুক্লপক্ষের চাঁদের বারোতম দিন।
৪১. সুভা গল্পটি কোন গ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে?
উত্তর: সুভা গল্পটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ গ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে।
৪২. সুভা গল্পের মাধ্যমে কোন স্বরূপ ফুটে উঠেছে?
উত্তর: সুভা গল্পের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের মনঃকষ্টের স্বরূপ ফুটে উঠেছে।
৪৩. সুভা গল্পে সুভা কোন ধরণের প্রতিবন্ধী?
উত্তর: সুভা গল্পে সুভা বাক্প্রতিবন্ধী।
৪৪. সুভার মা সুভার প্রতিবন্ধিকতাকে কী বলে মনে করেন?
উত্তর: সুভার মা সুভার প্রতিবন্ধিকতাকে নিয়তির দোষ ও নিজের গর্ভের কলঙ্ক বলে মনে করেন।
৪৫. কাদের কাছে সুভা প্রখর?
উত্তর: সুভা প্রকৃতির কাছে খুব প্রিয় বা প্রখর।
৪৬. সুভা কোথায় তার আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে?
উত্তর: সুভা প্রকৃতির মাঝে তার আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।
৪৭. সুভা গল্পের নাম সুভা রাখা হয়েছে কোন যুক্তিতে?
উত্তর: কেন্দ্রীয় চরিত্রের ভিত্তিতে সুভা গল্পের নাম সুভা রাখা হয়েছে।
৪৮. সুভা গল্পে সুভাষিণী নামটি সার্থক হয়নি কেন?
উত্তর: সুভা গল্পে সুভাষিণী নামটি সার্থক হয়নি কারণ সুভা নির্বাক বা কথা বলতে পারে না।
৪৯. শিশুকাল থেকেই সুভা নিজেকে বিধাতার অভিশাপ ভেবেছে কেন?
উত্তর: সকলের দুশচিন্তা প্রকাশের জন্য শিশুকাল থেকেই সুভা নিজেকে বিধাতার অভিশাপ বলে ভেবে নিয়েছে।
৫০. পিতা মাতার হৃদয়ে কে সর্বদা জাগরুক ছিল?
উত্তর: পিতা মাতার হৃদয়ে সুভা সর্বদা জাগরূক ছিল।
৫১. কে সুভাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন?
উত্তর: সুভার বাবা সুভাকে তার অন্য দুই মেয়ে অপেক্ষা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন।
৫২. কথার ভাবানুবাদ সব সময় কী হয় না?
উত্তর: কথার ভাবানুবাদ সব সময় ঠিক হয় না।
৫৩. সুভার চোখের ভাষা কেমন?
উত্তর: সুভার চোখের ভাষা অসীম ও উদার।
৫৪. সুভা গল্পের কোন উক্তিতে সুভার মনের ভাব চোখের মর্মার্থ প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর: সুভা গল্পের “যাহার ভাষা নেই তাহার চোখের ভাষা অসীম।” এই উক্তিতে মাধ্যমে সুভার মনের ভাব চোখের ভাষার মর্মার্থ প্রকাশ পেয়েছে।
৫৫. মধ্যাহ্নে মাঝিরা কোথায় যেত?
উত্তর: মধ্যাহ্নে মাঝিরা খাবার খেতে যেত।
৫৬. সুভা নিয়মিত কয় বার গোয়াল ঘরে যেত?
উত্তর: সুভা নিয়মিত তিনবার গোয়াল ঘরে যেত।
৫৭. সুভার সঙ্গীদের মধ্যে কাকে ভাষা বিশিষ্ট জীব বলা হয়েছে?
উত্তর: সুভার সঙ্গীদের মধ্যে প্রতাপকে ভাষা বিশিষ্ট জীব বলা হয়েছে।
৫৮. প্রতাপের প্রধান শখ কী?
উত্তর: প্রতাপের প্রধান শখ ছিপ দিয়ে মাছ ধরা।
৫৯. সহজে সময় কাটানো যায় কোন কাজের মাধ্যমে?
উত্তর: সহজে সময় কাটানো যায় মাছ ধরার মাধ্যমে।
৬০. সুভা বিকালে কোথায় বসে থাকত?
উত্তর: সুভা বিকালে তেঁতুলতলায় বসে থাকত।
৬১. বাণীকণ্ঠ কেন চিন্তিত হয়ে উঠলেন?
উত্তর: সুভাকে নিয়ে লোক নিন্দার কারণে বাণীকণ্ঠ চিন্তিত হয়ে উঠলেন।
৬২. ডাগর চোখ মেলে সুভা কার মুখের দিকে চেয়ে থাকত?
উত্তর: ডাগর চোখ মেলে সুভা তার বাবা-মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকত।
৬৩. বাণীকণ্ঠ ঘুম থেকে উঠে শোবার ঘরে কী খাচ্ছিল?
উত্তর: বাণীকণ্ঠ ঘুম থেকে উঠে শোবার ঘরে তামাক খাচ্ছিল।
৬৪. সবশেষে অসহায় সুভা কার কাছে আত্তসর্ম্পন করেছে?
উত্তর: সবশেষে অসহায় সুভা ধরণির কাছে আত্তসর্ম্পন করেছে।
৬৫. আমার মত দুইটি বাহু বাড়াইয়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাখ- সুভা কথাটি কাকে বলেছে?
উত্তর: আমার মত দুইটি বাহু বাড়াইয়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাখ- সুভা কথাটি প্রকৃতিকে বলেছে।
৬৬. কপোল শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: কপোল শব্দের অর্থ গাল।
৬৭. বিপুল প্রকৃতির কাছে সুভা কী পায়?
উত্তর: বিপুল প্রকৃতির কাছে সুভা মুক্তির আনন্দ পায়।
৬৮. মূক শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: মূক শব্দের অর্থ বধির।
৬৯. সুভা মনে মনে কী হতে চাইত?
উত্তর সুভা মনে মনে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হতে চাইত।
৭০. সুভার গ্রামের নাম কী?
উত্তর.: সুভার গ্রামের নাম চণ্ডীপুর।
৭১. সুভার ওষ্ঠাধর ভাবের আসামাত্র কেমন করে কেঁপে উঠত?
উত্তর: সুভার ওষ্ঠাধর ভাবের আসামাত্র কচি কিশলয়ের মত কেঁপে উঠত।
৭২. প্রতাপ সুভার মর্যদা বুঝত কেন?
উত্তর: মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হওযায় প্রতাপ সুভার মর্যাদা বুঝত। ৭৩. বিজন মহত্ব কী?
উত্তর: কোলাহল মুক্ত প্রকৃতির আর্কষন দিক হলো বিজন মহত্ব।
৭২. বাণীকণ্ঠের কান্নার কারণ কী?
উত্তর: পিতৃহৃদয়ের কাতরতা বাণীকণ্ঠের কান্নার কারণ।
৭৩. অকর্মণ্য লোকেরা সরকারী সম্পত্তি হবার কারণ কী?
উত্তর: অকর্মণ্য লোকেরা সরকারী সম্পত্তি হবার কারণ তাদের সহজে হাতের কাছে পাওয়া যায়।
৭৪. কাদের মধ্যে সমভাষা ছিল না?
উত্তর: প্রতাপ ও সুভার মধ্যে সমভাষা ছিল না।
৭৫. বাণীকণ্ঠের বাড়ির যে দিকটি নৌকাবাহীদের আকর্ষন করত?
উত্তর: বাণীকণ্ঠের বাড়ির সৌন্দর্য ও সচ্ছলতার দিকটি নৌকাবাহীদের আকর্ষন করত।
৭৬. সুভা নিজের বিয়ের সংবাদ প্রথম কার কাছ থেকে পেয়েছিল?
উত্তর: সুভা নিজের বিয়ের সংবাদ প্রথম প্রতাপের কাছ থেকে পেয়েছিল।

‘সুভা’ গল্পের অনুধাবনমূলক প্রশ্ন :

১. সুভার মা সুভাকে কীরূপে দেখতেন? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: সুভার মা সুভাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক বলে বিবেচনা করতেন।
➠ প্রত্যেক মাই পুত্রের চেয়ে মেয়েকে নিজের অংশ হিসেবে দেখে থাকেন। কন্যা সন্তানের কোনো অসম্পূর্ণতা দেখলে সেটাকে বিশেষভাবে নিজের লজ্জার কারণ বলেই মনে করেন। তাই সুভার মা নিজের গর্ভের কলঙ্ক বিবেচনা করে সুভার প্রতি প্রচন্ড বিরক্ত ছিলেন।

২. ‘প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পুরণ করিয়া দেয়।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রকৃতির সাথে সুভার গভীর মিতালির বিষয়টিই প্রকাশিত হয়েছে আলোচ্য উক্তিতে।
➠ সুভা যখন নদীর তীরে এসে বসত তখন তার সামনে নদরি কলধ্বনি লোকের কোলাহল মাঝির গান পাখির ডাক তরর মর্মর সমস্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। প্রকৃতরি এই বিবিধ শব্দ এবং বিচিত্র গতিও সুভার ভাষার মতোই নীরব অথ্চ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। এভাবেই সুভার ভাষার অভাব পূরণ করে দিত প্রকৃতি।

৩. সুভা কেন মনে মনে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত?
উত্তর: প্রতাপকে অভিভুত করার জন্য সুভা মনে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত।
➠ সুভা মনে মনে প্রতাপকে ভালোবাসাত। তাই প্রতাপ যখন নদীর তীরে বসে মাছ ধরত তখন সুভা তার পাশে বসে ভাবত সে যদি প্রতাপের কোনো কাজে বা সাহয্যে আসতে পারত। কিন্তু তার কিছুই করার ছিল না। তাই সে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত- যেন হঠাৎ মন্ত্রবলে সে এমন একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটিয়ে দিতে পারে যা দেখে প্রতাপ অভিভত হয়। বস্তুত প্রতাপের মন হয় করার জন্যই সুভা অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত।

৪. বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে সুভার মনের অবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: বিদেশে যাওয়ার প্রাক্কালে অজানা আশঙ্কায় সুভার মন আচ্ছন্ন ছিল।
➠ বিদেশ যাওয়ার সময় কুয়াশা ঢাকা প্রভাতের মতো সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রবাষ্পে ভরে যায়। একটা অনিদির্ষ্ট আশঙ্কায় সে কিছুদিন থেকেই ক্রমাগত নির্বাক জন্তুর মতো তার বাবা মায়ের সঙ্গে সঙ্গেই থাকত। ভাগর চক্ষু মেলে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করত। কিন্তু তারা তাকে কিছুই বুঝিয়ে বলত না। ফলে একটা ধোয়াশাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে সুভার মন সর্বদা ঘুরপাক খেত।

৫. দেখিস আমাদের ভুলিস নে। প্রতাপ কেন বলেছিল?
উত্তর: বিয়ে হয়ে গেলে সুভা যেন তাকে না ভুলে যায় প্রতাপ ঠাট্টাচ্ছলে সে কথাটিই বলেছিল।
➠ একদিন বিকেলে নদীর তীরে বসে মাছ ধরার সময় প্রতাপ সুভার উদ্দেশ্যে প্রশ্নে উল্লিখিত উক্তিটি করেছিল। সুভার বিয়ের খবর শুনে প্রতাপ হেসে হেসে সুভাকে বলেছিল বিয়ে পর সুভা যেন সবাইকে ভুলে না যায়। বস্তুত প্রতাপ এ উক্তির মধ্যে দিয়ে সুভাকে বোঝানো চেয়েছে সে সুভার শুভাকাঙ্গী।

৬. সুভাকে সুভার মা বিধাতার অভিশাপ মনে করে কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কথা বলতে পারত না বলে সুভাকে তার মা বিধাতার অভিশাপ মনে করেন।
‘সুভা’ গল্পের সুভা জন্ম থেকেই বোবা। তার অনুভব ও অনুভূতি থাকলেও মা তাকে মেনে নিতে পারেনি। সে সুভাকে তার গর্ভের কলঙ্ক মনে করত। কারণ মায়েরা কন্যা-সন্তানকে নিজেদের অংশ মনে করে। ফলে মেয়ের কোনো সমস্যা বা ত্রুটিকে মায়েরা তাদের নিজেদের ত্রুটি বলে ধরে নেয়। সুভার মায়ের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। সুভা কথা বলতে পারত না বলে সুভার মা তাকে বিধাতার অভিশাপ বলে মনে করত। সে নিজের ত্রুটির কথা স্মরণ করে সুভাকে দেখলে বিরক্তি বোধ করত।

৭. মা সুভাষিণীকে নিজের ত্রুটিস্বরূপ দেখতেন কেন?
উত্তর: একজন মা ছেলে অপেক্ষা মেয়েকে নিজের অংশরূপে দেখেন বলে মা সুভাষিণীকে নিজের ত্রুটিস্বরূপ দেখতেন।
‘সুভা’ গল্পে সুভা বাক্প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকেই সে কথা বলতে পারে না। এ জন্য তার মা তাকে নিজের একটি ত্রুটিস্বরূপ দেখতেন। কারণ সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী একজন মা ছেলে অপেক্ষা তার মেয়েকে নিজের অংশরূপে দেখেন। এ জন্য মেয়ের কোনো অসম্পূর্ণতা দেখলে মা সেটিকে নিজের লজ্জার কারণ বলে মনে করেন।

৮. ‘সুভা’ গল্পে ‘গ্রামলক্ষ্মী স্রোতস্বিনী’ কথাটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: সুভা' গল্পে 'গ্রামলক্ষ্মী স্রোতস্বিনী' কথাটি দ্বারা চণ্ডীপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট নদীকে বোঝানো হয়েছে।
সুভাদের গ্রামের নাম চণ্ডীপুর। এই গ্রামের পাশ দিয়ে ছোট নদীটি বয়ে গেছে গৃহস্বঘরের মেয়েটির মতো। নিরলসভাবে তার ছুটে চলা। দুই তীরে অবস্থিত দুই গ্রামের সবার সঙ্গেই যেন নদীটির ভাব বা সম্পর্ক রয়েছে। তার জল গ্রামের সবার জন্য প্রয়োজন। দুই ধারে লোকালয় এবং তরুচ্ছায়াঘন তীর, নিচ দিয়ে যেন গ্রামলক্ষ্মী স্রোতস্বিনী দ্রুত পায়ে নানা মঙ্গল কাজ করে চলেছে।

৯. সুভা মনে মনে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত কেন? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: সুভা মনে মনে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত তার নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রতাপকে বোঝানোর জন্য।
প্রতাপ যখন ছিপ ফেলে জলের দিকে চেয়ে থাকত তখন সুভা তার কাজে সাহায্য করতে চাইত। সে কাজের মাধ্যমে জানিয়ে দিতে চাইত যে এই পৃথিবীতে সেও একজন প্রয়োজনীয় লোক। অথচ সুভা সেসব কিছুই করতে পারত না। আর এই কারণেই সে বিধাতার কাছে প্রার্থনা করত- যাতে অলৌকিক ক্ষমতাবলে কোনো একটি কাজ করে সে প্রতাপের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।

১০. “তুমি আমাকে যাইতে দিয়ো না, মা”- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: নিজের চিরচেনা জগৎকে আঁকড়ে ধরে সুভা প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করে।
বাকপ্রতিবন্ধী শুভাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার পিতা তাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চায়। কলকাতা যাওয়ার আগের দিন সুভা তার চিরপরিচিত জগৎ নদীতীরে এসে লুটিয়ে পড়ে। দুই বাহু প্রসারিত করে সে যেন ধরণিকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কারণ সে তার এই চিরচেনা প্রকৃতি ও পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চায় না। সে চায় ধরণিও তাকে যেন জড়িয়ে ধরে রাখে। তাকে যেন যেতে না দেয়। প্রশ্নোক্ত উক্তিটির মধ্য দিয়ে সুভার এই মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে।

১১. সুভা পিতামাতার মনে সর্বদাই জাগরুক ছিল কেন? বুঝিয়ে দাও।
উত্তর: জন্ম থেকে কথা বলতে না পারার কারণে সুভা পিতা-মাতার মনে সর্বদাই জাগরুক ছিল।
‘সুভা’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুভা। সে জন্মগতভাবেই বোবা। সে বিধাতার অভিশাপরূপে জন্মেছে বলে নিজেকে আড়াল করে রাখত এবং কষ্ট পেত। তার মা তাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক বলে মনে করত। সুভার কথা বলতে না পারার বেদনা তার বাবা-মা কখনই ভুলতে পারত না। তাই সুভা সর্বদাই পিতা-মাতার মনে জাগরূক ছিল।

১২. “বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির বিজন মহত্ত্ব আছে।”- ‘সুভা’ গল্পের লেখকের এই কর। মতো একটা উক্তিটি ব্যাখ্যা।
উত্তর: “বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ত্ব আছে।”- ‘সুভা’ গল্পের লেখকের এই উক্তিটি তাৎপর্যপূর্ণ।
‘সুভা’ গল্পে সুভা বাম্প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকেই সে কথা বলতে পারে না। ফলে সুভার বয়সী ছেলে-মেয়েরা তার সঙ্গে মেশে না। তাই সে নিজেকে পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সে প্রকৃতির কাছে নিজেকে মেলে ধরে। নদীর কলধ্বনি, পাখির ডাক, মাঝির গান, লোকের কোলাহল ইত্যাদি দিয়ে প্রকৃতি সুভার ভাষার অভাব পূরণ করে দেয়। সুভা যখন নদীর পাড়ে এসে বসে তখন প্রকৃতির নানা উপাদান নিজের সমস্ত ভাষা দিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সুভার হৃদয়ে আছড়ে পড়ে। নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন সুভার চোখের ভাষা ছিল অসীম, উদার ও অতলস্পর্শ- অনেকটা গভীর স্বচ্ছ আকাশের মতো, উদয়াস্ত এবং ছায়ালোকের নিস্তব্ধ রঙ্গভূমি। সেই চোখের ভাষা তার বয়সী ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারত না। এই কারণেই লেখক' প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন।

১৩. সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে গেল কেন? বুঝিয়ে গেল।
উত্তর: কলকাতায় যাওয়ার আয়োজন শুরু হওয়ায় সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে গেল।
কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা মেয়ের কথা চিন্তা করে বিদেশ যান। ফিরে এসে স্ত্রীকে সপরিবারে কলকাতায় যাওয়ার কথা বলেন। কথা বলতে না পারলেও সুভা বুঝতে পারে তার পিতা পরিচিত পরিবেশ থেকে তাকে কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছে। একটা অনিদিষ্ট আশঙ্কায় সে সবসময় বাবা-মায়ের সাথে সাথে থাকতে শুরু করে। নিজের চিরচেনা পরিবেশ ও বন্ধুদের ছেড়ে নতুন জায়গায় যেতে হবে ভেবে কুয়াশা ঢাকা প্রভাতের মতো সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে ভরে যায়।

১৪. প্রতাপকে নিতান্ত অকর্মণ্য লোক কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: জীবনের প্রতি উদাসীন আচরণের কারণে প্রতাপকে অকর্মণ্য লোক বলা হয়েছে।
প্রতাপকে তার বাবা-মা সংসারের দায়দায়িত্ব দিয়ে দায়িত্বশীল করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাতে কোনো ভালো ফলাফল পাওয়া যায়নি। বরং প্রতাপ চলেছে তার নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী। সে ছিপ ফেলে মাছ ধরে। গ্রামের অন্যদের কাজকর্ম করে দিতে তার আগ্রহ ও আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। সে অন্যের প্রয়োজন মেটাতে অত্যন্ত উদার ও সচেতন। সেই দিক থেকে সে গ্রামের সবার উপযোগী সরকারি সম্পত্তির মতো। শুধু নিজ সংসার ও বাড়ির দায়িত্বের প্রতিই সে উদাসীন। এ কারণেই 'সুভা' গল্পে প্রতাপকে নিতান্ত অকর্মণ্য লোক বলা হয়েছে।

১৫. ‘মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সঙ্গীই সর্বাপেক্ষা শ্রেয়’- বাক্যটির মানে কী?
উত্তর: ‘মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সঙ্গীই সর্বাপেক্ষা শ্রেয়’- বাক্যটির মানে হচ্ছে- শব্দ শুনলে মাছ চলে যায় বলে শব্দ করে না এমন নীরব সঙ্গী সবচেয়ে ভালো।
নিশ্চুপ পরিবেশে ছিপ ফেলে মাছ ধরার সুবিধার কথা ভেবে প্রতাপ মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সঙ্গী কামনা করেছে। কারণ মাছ ধরার সময় শব্দ শুনতে পেলে মাছ এক জায়গায় একত্র না হয়ে অন্যত্র চলে যায়। এতে ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে অসুবিধা হয়। সুভা কথা বলতে পারে না। সে প্রায়ই কোনো না কোনো কাজে নদীর তীরে যেত। সেখানে সুভার সঙ্গে প্রতাপের দেখা হতো। মাছ ধরার সময় সুভা কাছাকাছি থাকলেও প্রতাপের ছিপ ফেলে মাছ ধরতে কোনো অসুবধিা হতো না। প্রতাপেরও নিজেকে একা মনে হতো না। এ কারণেই সে মাছ ধরার সময় সুভার মতো বাক্যহীন সঙ্গী কামনা করেছে।

১৬. প্রতাপ সুভার মর্যাদা বুঝত কেন? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সঙ্গীই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ-এজন্যই প্রতাপ সুভার মর্যাদা বুঝত।
'সুভা' গল্পে প্রতাপ নিতান্ত অকর্মণ্য ছেলে। তার বাবা-মায়ের পক্ষে অনেক চেষ্টা করেও তাকে দিয়ে সংসারের কোনো কাজ করানো সম্ভব হয়নি। মা-বাবা প্রতাপকে নিয়ে সব প্রত্যাশা বাদ দিয়েছিল। প্রতাপ অবহেলায় সময় কাটানোর জন্য অপরাহে নদীতীরে ছিপ ফেলে মাছ ধরত। বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সময় নীরব পরিবেশের প্রয়োজন। কারণ পরিবেশ কোলাহলপূর্ণ হলে ভয় পেয়ে মাছ অন্য কোথাও চলে যায়। এজন্য প্রতাপ চুপচাপ থাকে এমন কাউকে সঙ্গী হিসেবে পছন্দ করত। কারণ মাছ ধরার সময় একজন নীরব সঙ্গী থাকলে তার সময়টা ভালো কাটত। তাই বাক্যহীন সঙ্গী সুভার মর্যাদা সে বুঝত।

১৭. “সে ভাষাবিশিষ্ট জীব” কার সম্পর্কে কোন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে?
উত্তর: “সে ভাষাবিশিষ্ট জীব”- কথাটি সুভার সঙ্গী প্রতাপ সম্পর্কে বলা হয়েছে। সুভার গুটিকয়েক সঙ্গীর মধ্যে প্রতাপই একমাত্র কথা বলতে পারে, সেই প্রসঙ্গে লেখক প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন।
সুভা কথা বলতে পারে না। পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। বাড়ির দুটি গাভী, বিড়াল, গাছপালা ও নদীর সঙ্গে সে সখ্য গড়ে তোলে। এরাও সুভার মতো ভাষাহীন। এই ভাষাহীনদের বাইরে সুভার আরেকজন সঙ্গী আছে। লেখকের মতে সে উন্নত শ্রেণির জীব, সে ভাষাবিশিষ্ট প্রাণী। তার নাম প্রতাপ, গোঁসাইদের ছোট ছেলে। তার পরিচয় দিতে গিয়েই লেখক প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।

১৮. প্রতাপের প্রতি তার বাবা-মায়ের নিরাশ হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: প্রতাপের প্রতি তার বাবা-মায়ের নিরাশ হওয়ার কারণ হলো- প্রতাপ সংসারের কাজের প্রতি যত্নবান বা মনোযোগী নয়, বরং সে বড় বেশি উদাসীন।
প্রতাপকে তার বাবা-মা সংসারের দায়িত্ব বারবার দিয়ে দেখে যে, সে কোনো কাজ করতে চায় না, কাজের প্রতি তার কোনো আগ্রহই নেই। নিতান্ত অকর্মণ্য হয়ে হয়ে ঘুরে বেড়ানোতেই প্রতাপের বেশি আনন্দ। সে সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। আর বিকেলে নদীর পাড়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরে সময় ব্যয় করে। নিজের কাজের প্রতি তার উৎসাহ নেই। তবে অন্যের কাজের প্রতি তার উৎসাহ ছিল। মূলত প্রতাপের বাবা-মা অনেক চেষ্টা করেও প্রতাপকে ঘর-সংসারের কাজে মনোযোগী করতে পারেননি বলেই তার প্রতি তারা নিরাশ হয়েছেন।

১৯. সুভার কালো চোখকে তর্জমা করতে হয় না কেন?
উত্তর: সুভার মনের ভাব তার চোখে ফুটে ওঠে, তাই তার কালো চোখকে তর্জমা করতে হয় না।
আমরা কথার মধ্য দিয়ে যে ভাষা প্রকাশ করি তা আমাদের নিজের চেষ্টায় গড়ে নিতে হয়। ঠিক কোনোকিছু তর্জমা করার মতো, যা সবসময় ঠিক হয় না। সুভার বড় বড় কালো চোখের যে ভাষা, যে উজ্জ্বলতা তাতে অবর্ণনীয় ভাবের প্রকাশ রয়েছে। যার দিকে তাকালে আর কোনো তর্জমা করার দরকার হয় না। তার চোখ দুটোই কথা বলে। সুভার মনের ভাব তার চোখের উপরে কখনো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠত, আবার কখনো ম্লানভাবে নিভে আসত। কখনো চঞ্চল বিদ্যুতের মতো, আবার কখনো ডুবে যাওয়া চাঁদের মতো হয়ে তার মনের ভাব প্রকাশ করত। সুভার মুখের ভাষা না থাকলেও দৃষ্টির গভীরতা স্পর্শ করা যায়। তাই সুভার কালো চোখকে তর্জমা করতে হয় না।

২০. সুভা মনে মনে কী কল্পনা করত?
উত্তর: মনে মনে জলকুমারী হওয়ার কথা কল্পনা করত।
সুভা সুভা কল্পনা করত সে যদি জলপরী হতো, তাহলে জল থেকে উঠে সাপের একটা মণি ঘাটে রেখে আসত। প্রতাপ তার তুচ্ছ মাছ ধরা ছেড়ে সাপের মাথার সেই মণি নিয়ে জলে ডুব দিত। তারপর পাতালে গিয়ে দেখত রূপার অট্টালিকার সোনার পালঙ্কে সুভা বসে আছে। সে পাতালপুরীর একমাত্র রাজকন্যা। সে পাতালপুরীর রাজকন্যা না হয়ে ভুল করে বাণীকণ্ঠর! পরিবারে জন্ম নিয়েছে। সে মনে মনে এসব বিষয় কল্পনা করত। লোকেরও সে পাতালপুরীর রাজকন্যা না।

২১. “দস্তুরমতো অনুসন্ধান ও অর্থব্যয়ে বড়ো দুটি মেয়ের বিবাহ হইয়া গেছে”- এখানে ‘অর্থব্যয়’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: “দস্তুরমতো অনুসন্ধান ও অর্থব্যয়ে বড়ো দুটি মেয়ের বিবাহ হইয়া গেছে”- এখানে ‘অর্থব্যয়’ বলতে পণের টাকার পরিমাণকে বোঝানো হয়েছে।
সেকালে হিন্দু সমাজে পণপ্রথা প্রচলিত ছিল। কন্যাকে পাত্রস্থ করতে হলে পণ দিতে হতো। এ পণের অঙ্ক সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করত। সামাজিক অবস্থানের তারতম্যে কন্যাপক্ষের সঙ্গে বরপক্ষের দূরত্ব যত বেশি হতো, পণের পরিমাণ তত বেশি হতো। আর দূরত্ব যত কম হতো, পণের অঙ্কও তত কম হতো। এ ছাড়া বর আর কনের সৌন্দর্য বিচারের ওপরও বিষয়টি নির্ভর করত। কনে যদি বেঁটে বা খাটো হতো, তবে পণ বেশি দিতে হতো। আর মেয়ে বরের তুলনায় সুন্দরী হলে পণের পরিমাণ কম হলেও চলত। আলোচ্য লাইনে 'অর্থব্যয়' দ্বারা এই বিষয়টিই বোঝানো হয়েছে।

২২. "তখন কে জানিত সে বোবা হইবে"- ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: সুভার বোবা হওয়া সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে।
‘সুভা’ গল্পের সুভা একটি বোবা মেয়ে। তিন বোনের মধ্যে সে ছোট। তার বড় দুই বোন সুকেশিনী ও সুহাসিনী কথা বলতে পারে। তাই দুই বোনের নামের সাথে মিল রেখে তার নাম রাখা হয় সুভাষিণী। সুভাষিণী অর্থ 'যার কথা সুন্দর'। সুভাষিণীর যখন জন্ম হয় তখন কেউ জানত না যে সে কথা বলতে পারবে না। আর যে কথা বলতে পারে না, তার নাম সুভাষিণী এই বিষয়টি অনেকটা দুঃখজনক। তাই এখানে লেখক মেয়েটির শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সাথে তার নামের বৈপরীত্য প্রকাশ করতে এমন কথা বলেছেন।

২৩. সুভা কেন বাবা-মায়ের হৃদয়ভারের কারণ হয়েছিল?
উত্তর: সুভা বোবা হওয়ার কারণে বাবা-মায়ের হৃদয়ভারের কারণ হয়েছিল।
সুভার বড় দুই বোন সুস্থ ও স্বাভাবিক। তাই তাদেরকে বিয়ে দিতে তার বাবা-মাকে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। অনেক টাকা-1 পয়সা খরচ করে এবং ধুমধাম করে তিনি তাদের বিয়ে দেন। আর সুভা বোবা হওয়ার কারণে তার বাবা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কারণ বোবা মেয়েকে বিয়ে দেওয়াটা অন্য দুই মেয়ের বিয়ে দেওয়ার মতো সহজ কাজ নয়। তাই সুভার বাবা-মা প্রতিনিয়ত এই বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন এবং সুভার অস্তিত্ব যেন তাদের নীরব হৃদয়ভারের মতো হয়ে অবস্থান করে।

২৪. সুভা শিশুকাল থেকেই কী বুঝে নিয়েছিল?
উত্তর: সুভা যে বিধাতার অভিশাপম্বরূপ পিতার ঘরে জন্ম নিয়েছে। সে তা শিশুকাল থেকেই বুঝে নিয়েছিল।
সুভা জন্ম থেকেই বোবা। মুখে কথা বলতে না পারলেও তার মাঝে অনুভূতি ছিল। সে তার চারপাশের সবকিছুই অনুভব করত এবং বুঝতে পারত। ছোটবেলা থেকেই তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যেসব কথাবার্তা হতো সেগুলো থেকেই সে বুঝে নিয়েছিল যে, সে বিধাতার কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে জন্মায়নি। পরিবারের লোকজনের আলোচনার মধ্য থেকেই বুঝে নিয়েছিল যে, সে তার বাবার ঘরে বিধাতার অভিশাপম্বরূপ জন্ম নিয়েছে।

২৫. নদীকে গৃহস্থ ঘরের মেয়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে কেন?
উত্তর: নদীকে গৃহস্থ ঘরের মেয়ের সাথে তুলনা করার কারণ হলো- গৃহস্থ ঘরের মেয়ে নিপুণা কিন্তু তার বিস্তার সংসারের ছোট গণ্ডির মধ্যে। নদীটিও তেমনই।
গৃহস্থ ঘরের মেয়েরা সাধারণত কর্মে পটু হয়। স্বভাব হয় শান্ত। 1 সংসারের প্রতি তাদের আকর্ষণ চিরন্তন। আবার মমত্বে তারা মায়ের মতো, স্বল্পভাষী, চাহনিতে সৌম্য ভাব আর নিরলস পরিশ্রমী। তার বিস্তার সংসারের ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে, বেশি দূর পর্যন্ত নয়। নদীটিও তেমনি সরু ও দীর্ঘ। মানুষের ক্ষতি করে না, কারণ বুকে ঢেউয়ের প্রাবল্য নেই। দুপাশের মানুষের প্রয়োজন ও তৃষ্ণা দুই-ই মেটায়। দুই তীরের গাছপালাকে রসসিক্ত করে প্রাণবন্ত করে তোলে। তার প্রসারতাও বেশি নয়। এই কারণেই নদীকে গৃহস্থ ঘরের মেয়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

২৬. সুভার প্রতি তার মায়ের আচরণ কেমন ছিল?
উত্তর: সুভার প্রতি তার মায়ের আচরণ ছিল বিরক্তিপূর্ণ।
মায়েরা কন্যাসন্তানকে নিজেদের অংশ মনে করে। মেয়েদের কোনো অঙ্গ যদি ত্রুটিপূর্ণ থাকে তাহলে মায়েরা তা নিজেদের ত্রুটি হিসেবে ধরে নেয়। 'সুভা' গল্পে সুভা জন্ম থেকে বোবা ছিল। তাই মা সুভার প্রতি বিরক্ত ছিলেন। এই ত্রুটিকে সুভার মা নিজের গর্ভের কলঙ্ক মনে করতেন। সুভাকে দেখলে সুভার মা নিজের ত্রুটির কথা স্মরণ করতেন বলে তিনি সুভার ওপরে বিরক্ত ছিলেন।

২৭. প্রকৃতি কীভাবে সুভার ভাষার অভাব পূরণ করেছিল?
উত্তর: প্রকৃতির বিভিন্ন শব্দ ও কোলাহল দিয়ে প্রকৃতি সুভার ভাষার অভাব পূরণ করেছিল।
নদীর কলধ্বনি, পাখির ডাক, মাঝির গান, লোকের কোলাহল ইত্যাদি দিয়ে প্রকৃতি সুভার ভাষার অভাব পূরণ করে দেয়। সে সময় পেলেই নদীর পাড়ে এসে বসত। তখন প্রকৃতির নানান উপাদান নিজের সমস্ত ভাষা নিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সুভার হৃদয়ে আঁছড়ে পড়ত। এই ভাষার বিস্তার যেন বিশ্বব্যাপী। এভাবেই প্রকৃতি 1 বিভিন্ন শব্দের মধ্য দিয়ে সভার ভাষার অভাব পরণ করেছিল।

২৮. সুভার সাথে গাভী দুটির সম্পর্ক কেমন ছিল?
উত্তর: সুভার অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল গাভী দুটি।
সুভার অন্তরঙ্গ বন্ধু গাভী দুটি হলো সবশী ও পাঙ্গুলি। এদের সাথে সুভার অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক ছিল। সুভা কখন এদের আদর করত এবং কখন ভর্ৎসনা করত- এরা সব বুঝত। সুভা নিয়মিত রূণ তিনবার গোয়ালঘরে গিয়ে এদের খোঁজ নিত। এমনকি সুভার মনের ভাষা, মর্মবেদনা এরা বুঝতে পারত। সুভার বাহুতে শিং ঘষে সুভাকে এরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করত। সুভার কথাহীন করুণ সুর এরা ভালো করে চিনত। সুভাকে এরা বন্ধুই মনে করত।

২৯. বিড়ালটি সুভার কাছে গিয়ে কী করত?
উত্তর: বিড়ালটি সুভার কাছে গিয়ে আদর নিত।
সুভার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম একটি প্রাণী বিড়াল। সুভা বসে থাকলে বিড়ালটি যখন তখন নিঃসংকোচে- এসে তার গরম। কোলে বসে সুখনিদ্রার আয়োজন করত। সুভা গলায় ও পিঠে হাত! বুলিয়ে দিলে বিড়ালটির ঘুমিয়ে পড়ত।

৩০. প্রতাপ কেমন ছিল?
উত্তর: প্রতাপ নিতান্ত অকর্মণ্য ছিল।
গোঁসাইদের ছোট ছেলে প্রতাপ অকর্মণ্য বলে বাবা-মা তার ওপর থেকে সব রকম আশা ত্যাগ করেছিল। সে তার সংসারের কোনো কাজে না লাগলেও অন্য সবার সব কাজে লাগত। সে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে পছন্দ করত। গ্রামে দু-চারটে অকর্মণ্য লোক থাকেই যারা সব সময় অন্যের উপকারে লাগে, প্রতাপ ছিল তেমনই একজন পরোপকারী ব্যক্তি।

৩১. সুভা ও প্রতাপের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উত্তর: সুভা ছিল প্রতাপের মাছ ধরার সঙ্গী। তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল।
প্রতাপ ছিপ ফেলে মাছ ধরতে খুব পছন্দ করত। তেঁতুলতলায় সুভা বসে থাকত এবং প্রতাপ কিছু দূরে ছিপ ফেলে পানির দিকে তাকিয়ে থাকত। প্রতাপের জন্য সুভা একটি করে পান বানিয়ে নিয়ে যেত। সুভা খুব চেষ্টা করত প্রতাপকে কোনো একটা কাজে সাহায্য করার জন্য, যেন সে বুঝতে পারে যে সুভাও কারও কাজে লাগতে পারে। প্রতাপ মাছ ধরায় ব্যস্ত থাকলে সুভা মনে মনে অলৌকিক কোনো ক্ষমতা আশা করত, যেন সে তা দেখে অবাক হয়। সুভার সাথে প্রতাপের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

৩২. পূর্ণিমার রাতে সুভা কী করেছিল?
উত্তর: পূর্ণিমার রাতে সুভা নিজেকে চেনার চেষ্টা করেছিল।
পূর্ণিমার রাতে একবার সুভা দরজা খুলে ভয়ে ভয়ে মুখ বের করে দিয়ে পূর্ণিমা দেখছিল। তার কাছে মনে হয়েছিল এই পূর্ণিমা রাতও যেন তার মতো একা এবং নির্বাক। সে নিজের অস্তিত্ব এবং নিজের বেড়ে ওঠা সম্পর্কে অনুভূতি লাভ করে। অনেক কিছু বুঝতে চায়, কথা বলতে চায়, পারে না। চারদিকের সমস্ত নির্জনতা যেন তাকে ছাপিয়ে ওঠে। আর এই নিস্তব্ধ প্রকৃতির মধ্যে একটি মেয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকে, সুভা সেই বিষয়টিও অনুভব করে।

৩৩. প্রতাপের দিকে সুভা কেন মর্মবিদ্ধ হরিণীর মতো তাকিয়ে ছিল?
উত্তর: সুভার বর পাওয়া গেছে, সে বিয়ে করে চলে যাবে, বিয়ের পর যেন সুভা তাকে না ভোলে প্রতাপের মুখে এমন কথা শুনে সুভা তার দিকে মর্মবিদ্ধ হরিণীর মতো তাকিয়ে ছিল।
প্রতাপ মাছ ধরার সময় সুভা একদিন তার কাছে গেলে প্রতাপ তাকে বলে যে, তার বর খুঁজে পাওয়া গেছে। তার বিয়ে হবে। বিয়ের পর সে যেন সবাইকে ভুলে না যায়। এ কথা শুনে সুভা প্রতাপের দিকে এমনভাবে তাকায়, যেন মর্মবিদ্ধ হরিণী শিকারির দিকে তাকিয়ে থাকে। কারণ সুভা বিয়ের জন্য রাজি ছিল না। প্রতাপের কাছ থেকে কথাটি শুনে তার মোটেই ভালো লাগেনি। অত্যন্ত কষ্ট পায় বলে সুভা এভাবে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।


‘সুভা’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ১

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
দুই সন্তানের পর কন্যা সন্তান পলাশ বাবুর পরিবারে আনন্দের বন্যা নিয়ে এলো। নাম রাখা হলো ‘কল্যাণী’। সকলের চোখের মণি কল্যাণী বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পলাশ বাবু বুঝতে পারলেন বয়সের তুলনায় কল্যাণীর মানসিক বিকাশ ঘটে নি। কিছু বললে ফ্যাল্ফ্যাল্ করে চেয়ে থাকে। কল্যাণীর বিয়ের কথাবার্তা চলছে। পলাশ বাবু কল্যাণীর সবই বরপক্ষকে খুলে বললেন। সব শুনে বরের বাবা সুবোধ বাবু বললেন, ‘পলাশ বাবু কল্যাণীর মতো আমার ছেলেও তো হতে পারত, কাজেই কল্যাণী মাকে ঘরে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’

ক. সুভার গ্রামের নাম কী?
খ. ‘পিতা-মাতার নীরব হৃদয়ভার’ কথাটি দ্বারা লেখক কী বোঝাতে চেয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের প্রথম অংশের বক্তব্যে কল্যাণী ও সুভার যে বিশেষ দিকটির সঙ্গতি দেখানো হয়েছে তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. কল্যাণী ও সুভা একই পরিস্থিতির শিকার হলেও উভয়ের প্রেক্ষাপট ও পরিণতি ভিন্ন বিশ্লেষণ করো।

ক সুভার গ্রামের নাম চণ্ডীপুর।
খ. ‘পিতা-মাতার নীরব হৃদয়ভার’ কথাটির মধ্য দিয়ে বাক প্রতিবন্ধী সুভার বিয়ের বয়স হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে দিতে না পারায় পিতা-মাতার হৃদয়ে যে নীরব কষ্টের সৃষ্টি হয় লেখক সে কষ্টের কথা বুঝিয়েছেন।
➠ সুভা বাণীকন্ঠের ছোট মেয়ে। সে কথা বলতে পারে না। বাণীকণ্ঠ তার বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বাক প্রতিবন্ধী হওয়ায় বড় দুই মেয়ের মতো সুভার বিয়ে দিতে পারেননি। সুভার ভবিষ্যৎ নিয়ে বাণীকণ্ঠ ও তার স্ত্রী উভয়েই চিন্তিত। সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তাদের হৃদয়ে নীরব কষ্টের সৃষ্টি হয়। লেখক কষ্টকেই বলেছেন পিতা-মাতার নীরব হৃদয়ভার।

গ. উদ্দীপকের প্রথম অংশের বক্তব্যে কল্যাণী ও সুভার শারীরিক প্রতিবন্ধিতার দিকটির সংগতি দেখানো হয়েছে।
➠ শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে মানুষ আমাদের সমাজে অবহেলার শিকার হয়। এতে সমাজের মানুষের হীনম্মন্যতার পরিচয় প্রকাশ পায়। আমাদের সবারই প্রতিবন্ধীদের প্রতি সহানুভূশীল হতে হবে। তবেই তারা বিকশিত হবে ও সুন্দরভাবে বাস করতে পারবে সমাজে। ‘সুভা’ গল্পে সুভা কথা বলতে পারে না। তার জন্ম বাবা-মায়ের মাঝে আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও কথা না বলতে পারার বিষয়টি কিছুটা নীরব হৃদয়ভারের জন্ম দেয়।
➠ উদ্দীপকের কল্যাণীর জন্মও পরিবারের আনন্দের বন্যা নিয়ে আসে। কিন্তু তার মানসিক প্রতিবন্ধিতার দিকটি সবাইকে চিন্তিত করে তোলে। উদ্দীপকের কল্যাণীর মানসিক বিকাশ কিছুটা কম হয়েছে। ‘সুভা’ গল্পের সুভাও বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তার পরিবারের সবার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্দীপকের বক্তব্যে কল্যাণী ও সুভার প্রতিবন্ধিতার দিকটির মিল দেখানো হয়েছে।

ঘ. কল্যাণী ও সুভা একই পরিস্থিতির শিকার হলেও উভয়ের প্রেক্ষাপট ও পরিণতি ভিন্ন মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষেরা আমাদের সমাজে বিভিন্নভাবে অবহেলার সম্মুখীন হয়। তারা আমাদের সমাজেরই অংশ। তারা আমাদের মতোই মানুষ। তাদের কল্যাণে এগিয়ে আসা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের সহানুভূতি ও মমত্ববোধে তারা পাবে জীবনের পূর্ণতা।
➠ উদ্দীপকে কল্যাণীর মানসিক বিকাশ সঠিকভাবে ঘটেনি। বিয়ের কথাবার্তার সময় কল্যাণীর বাবা পলাশ বাবু বরপক্ষের কাছে সব কথা খুলে বলেন। তারা সব শুনে উদারতার পরিচয় দেন। বরের বাবা সুবোধ বাবু মহত্বের পরিচয় দিয়ে কল্যাণীকে ঘরে নিয়ে যেতে চান। অন্যদিকে ‘সুভা’ গল্পের সুভা বাকপ্রতিবন্ধী। সে কথা বলতে পারে না। সবার কাছ থেকে অবহেলা পেলেও সুভা তার বাবার ভালোবাসা পেয়েছে। সুভার সাথে কেউ মেশে না বলে সে পোষা প্রাণীদের মাঝে নিজের একটি বিশাল জগৎ তৈরি করেছে।
➠ উদ্দীপকের কল্যাণী ও ‘সুভা’ গল্পের সুভা একই পরিস্থিতির শিকার হলেও উভয়ের প্রেক্ষাপট ও পরিণতি ভিন্ন। কল্যাণী সুবোধ বাবুর উদারতায় পেয়েছে সুন্দর ভবিষ্যতের সন্ধান। কিন্তু ‘সুভা’ গল্পের সুভার পরিণতি এতটা মানবিকতায় সিক্ত হয়নি। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।


সৃজনশীল প্রশ্ন- ২

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
আনুর মা ডাক্তারের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখে ব’লে উঠল, আপনি বলুন ডাক্তার বাবু, আপনি বলুন। ও হতভাগী কালা-বোবা। সকলের মুখে ফুটে উঠল অদ্ভুত অভিব্যক্তি, বিস্ময়, করুণা, হয়তো কিছুখানি তাচ্ছিল্য আছে তার মধ্যে। ডাক্তারের মুখে তার প্রকাশ সবচেয়ে কম। এ সন্দেহ তার হয়েছিল।

ক. সুভা কোথায় বসে থাকত?
খ. “কিন্তু তাহার পদশব্দ তাহারা চিনিত” বাক্যটির প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের বোবা মেয়েটি ‘সুভা’ গল্পের কোন চরিত্রের অনুরূপ তা নিরূপণ করো।
ঘ. “সাদৃশ্য থাকলেও উদ্দীপকটি ‘সুভা’ গল্পের সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ করে না।” যথার্থতা মূল্যায়ন করো।

ক. সুভা তেঁতুলতলায় বসে থাকত।
খ. গোয়ালের গাভী দুটির সাথে সুভার সম্পর্ক বোঝাতে প্রশ্নোক্ত বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছে।
➠ সুভা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এক বালিকা। সে কথা বলতে পারে না বলে তার কোনো বন্ধু বা সাথি নেই। সবাই তাকে এড়িয়ে চলে। সুভা তাই তাদের গাভী সর্বশী ও পাঙ্গুলির সাথে সখ্য গড়ে তোলে। তারা সুভার মুখে কখনো কথা শোনেনি কিন্তু তার পায়ের শব্দ তারা চিনত। সুভার না বলা কথাগুলো এরা সহজে বুঝতে পারত, যা মানুষ বুঝত না বা বুঝতে চাইত না। লেখক এখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের অনুভূতির তীব্রতার দিকটি উন্মোচন করেছেন।

গ. উদ্দীপকের বোবা মেয়েটি ‘সুভা’ গল্পের সুভার অনুরূপ।
➠ আমাদের সমাজ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতি সচরাচর কেউ সহানুভূতি দেখায় না। ফলে তাদের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ হারিয়ে যায়। আর এই কারণেই তারা মাঝে মাঝে মানুষের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। উদ্দীপকের কালা-বোবা মেয়ে আনু বড়ই অসহায়। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে সে সবার অবহেলার শিকার হয়েছে। মায়ের কথায় তার প্রতি তাচ্ছিল্য ভাব প্রকাশিত হয়েছে।
➠ ‘সুভা’ গল্পের সুভাও সবার কাছ থেকে পেয়েছে শুধু অবহেলা। সবাই মনে করে সুভা কথা বলতে পারে না, তাই সে কিছু অনুভব করতে পারে না। তার সামনেই সবাই তার ভবিষ্যৎ দুশ্চিন্তার কথা প্রকাশ করে, যা সুভার মনকে অনেক ছোট করে দেয়। কথা বলতে না পারাটা তার কাছে অভিশাপের মতো মনে হয়। তাই উদ্দীপকের বোবা মেয়েটিকে ‘সুভা’ গল্পের সুভার অনুরূপ বলা যায়।

ঘ. “সাদৃশ্য থাকলেও উদ্দীপকটি ‘সুভা’ গল্পের সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ করে না।” মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করতে হবে। তাদের কষ্টে নিজেকে একাত্ম করতে হবে। তারাও যে সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে না এই আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে। তবেই পৃথিবী আরও আনন্দময় হয়ে উঠবে।
➠ উদ্দীপকে আনুর মায়ের কথায় শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েটির প্রতি তাচ্ছিল্য ভাব প্রকাশিত হয়েছে। মেয়েটি কথা বলতে পারে না বলে তাকে অবহেলার শিকার হতে হয়েছে। উদ্দীপকের এ বিষয়টি ‘সুভা’ গল্পেও প্রতিফলিত হয়েছে। গল্পের সুভা জন্ম থেকেই বাকপ্রতিবন্ধী। গল্পে লেখক শুধু সুভার কষ্ট ও অসহায়ত্বই প্রকাশ করেননি, তিনি বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও মমত্ববোধের উন্মেষ ঘটাতে চেয়েছেন। সুভার মা নিয়তিকে দোষ দিলেও তার বাবা তাকে অনেক ভালোবেসেছেন। সুভার সাথে কেউ মেশে না বলে সে পোষা প্রাণীদের আপন করে নিয়েছে। তাদের কাছে সুভা ছিল অনেক মুখর। নির্বাক প্রকৃতির কাছে সে মুক্তির আনন্দ পেয়েছে। উদ্দীপকটি ‘সুভা’ গল্পের সুভাষিণীর কথা অর্থাৎ সুভার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
➠ অপরদিকে ‘সুভা’ গল্পের মাধ্যমে গল্পকার পৃথিবীর সব শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশ করতে চেয়েছেন। ‘সুভা’ গল্পে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সার্বিক দিক প্রতিফলিত হয়েছে। ‘সুভা’ গল্পের মাধ্যমে লেখক মূলত মানুষের সহানুভূতি জাগিয়ে তুলেছেন এবং প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি আশ্রয়ের জগৎ’ তৈরি করতে চেয়েছেন। এসব বিষয় উদ্দীপকে অনুপস্থিত। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।


‘সুভা’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৩

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
মা-মরা মেয়ে মিনু। বাবা জন্মের আগেই মারা গেছে। সে মানুষ হচ্ছে এক দূরসম্পর্কের পিসিমার বাড়িতে। বয়স মাত্র দশ, কিন্তু এই বয়সেই সবরকম কাজ করতে পারে সে। সবরকম কাজই করতে হয়। লোকে অবশ্য বলে যোগেন বসাক মহৎ লোক বলেই অনাথা বোবা মেয়েটাকে আশ্রয় দিয়েছেন।

ক. গোঁসাইদের ছোট ছেলেটির নাম কী?
খ. সুভা মনে মনে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত কেন? ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের মিনু ‘সুভা’ গল্পের কোন চরিত্রের প্রতীক? নিরূপন করো।
ঘ. “উদ্দীপকের মিনুর সাথে ‘সুভা’ গল্পের সুভার সাদৃশ্য থাকলেও সুভার জগৎটি ভিন্ন।” উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।

ক. গোঁসাইদের ছোট ছেলেটির নাম প্রতাপ।
খ. প্রতাপের কাছে নিজের প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর জন্য সুভা মনে মনে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত।
➠ প্রতাপ যখন ছিপ ফেলে জলের দিকে চেয়ে থাকত তখন সুভা তার কাজে সাহায্য করতে চাইত। সে কাজের মাধ্যমে জানিয়ে দিতে চাইত যে এই পৃথিবীতে সেও একজন প্রয়োজনীয় লোক। কিন্তু সুভা কিছুই করতে পারত না। আর সে কারণেই সে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করত যাতে অলৌকিক ক্ষমতাবলে কোনো একটি কাজ করে সে প্রতাপের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।

গ. উদ্দীপকের মিনু ‘সুভা’ গল্পের সুভা চরিত্রের প্রতীক। আমাদের সমাজে অনেক মানুষ যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত। তবে অনেকের মাঝেই পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় অবস্থানগত প্রেক্ষাপটের দিক থেকে।
➠ আমাদের সবার উচিত তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা। উদ্দীপকের মিনু সুবিধাবঞ্চিত শিশু। সে কথা বলতে পারে না। শারীরিক এই অক্ষমতা নিয়ে তার আশ্রয় হয় দূরসম্পর্কের পিসিমার বাড়িতে। কথা না বলতে পারলেও সবরকম কাজ সে করতে পারে।
➠ ‘সুভা’ গল্পে সুভা কথা বলতে পারে না। সবার কাছ থেকে যায় শুধু অবহেলা। বোবা বলে সুভা নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে রাখে। কথা বলতে না পারার কষ্ট সুভা নিজের মাঝে বয়ে বেড়ায়। সবাই যখন সুভার কথা না বলতে পারার দিকটিকে ইঙ্গিত করত, তখন সে নিজেকে বিধাতার অভিশাপ হিসেবে মনে করত। এ কারণেই উদ্দীপকের মিনু ‘সুভা’ গল্পের সুভা চরিত্রের প্রতীক।

ঘ. “উদ্দীপকের মিনুর সাথে ‘সুভা’ গল্পের সুভার সাদৃশ্য থাকলেও সুভার জগৎটি ভিন্ন।” উক্তিটি যথার্থ।
➠ সমাজের কিছু মানুষ তাদের শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে অবহেলার শিকার হন। মানুষের অবহেলার কারণে তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। আমাদের সবার উচিত তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। উদ্দীপকের মিনু বাক্প্রতিবন্ধী শিশু। বাবাকে জন্মের আগেই হারিয়ে মিনুর স্থান হয় দূরসম্পর্কের পিসিমার বাড়িতে। মিনুর বয়স মাত্র দশ বছর হলেও সে সবরকম কাজ করতে পারে। পিসিমার বাড়িতে থাকার কারণে এই কষ্ট তাকে মেনে নিতে হয়েছে।
➠ ‘সুভা’ গল্পের সুভাও কথা বলতে পারে না। ছোট থেকেই নিজের এই অভিশাপকে মেনে নিয়েছে সুভা। সুভার পিতা-মাতার মনেও সর্বদা এই বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা বিরাজমান ছিল। বড় দুটি বোনের বিয়ে হয়ে গেলেও সুভাকে নিয়ে তার পিতা-মাতার মাঝে কিছুটা নীরব হৃদয়ভার ছিল। অবশ্য বাবা-মার সাথে থেকে সুভা কখনো নিজেকে অসহায় বোধ করেনি। বরং সুভাকে যেন তার বাবা অন্য মেয়েদের চেয়ে একটু বেশি ভালোবাসতেন। কিন্তু সে কথা বলতে পারে না বলে কেউ তার সঙ্গে মিশত না।
➠ কথা বলতে না পারার দিক থেকে উদ্দীপকের মিনুর সাথে ‘সুভা’ গল্পের সুভার সাদৃশ্য থাকলেও সুভার জগৎটি ভিন্ন ছিল। কারণ মিনু বড় হয়েছে পিসিমার আশ্রয়ে। সেখানে তাকে কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু ‘সুভা’ গল্পের সুভা বড় হয়েছে মা-বাবার ভালোবাসায় এক ভিন্ন জগতে। তাই উক্তিটি যথার্থ।


‘সুভা’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৪

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
‘সেই ছেলেটি’ নাটিকাটিতে একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। একই সাথে প্রকাশ পেয়েছে শিশুর প্রতি বড়দের মমত্ববোধ। আরজু, সোমেন ও সাবু তিন বন্ধু একই স্কুলে একই শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু বিদ্যালয়ে হেঁটে আসতে আরজুর খুব কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে তার পা অবশ হয়ে আসে। বন্ধুদের সাথে সমান তালে চলতে পারে না।

(ক) ‘সুভা’ গল্পে কোন তিথির কথা উল্লেখ আছে?
(খ) প্রতাপ সুভার মতো সঙ্গী প্রত্যাশা করেছে কেন? ব্যাখ্যা কর।
(গ) উদ্দীপকের সাথে ‘সুভা’ গল্পের সাদৃশ্য চিহ্নিত করো।
(ঘ) “উদ্দীপকের আরজুর কষ্ট আর ‘সুভা’ গল্পের সুভার কষ্ট এক সুতোয় গাঁথা”- মন্তব্যটি তুমি সমর্থন করো কি? তোমার মতের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করো।

ক. ‘সুভা’ গল্পে শুক্লাদ্বাদশীর তিথির কথা উল্লেখ আছে।
খ. মাছ ধরার সময় প্রতাপ সুভার মতো সঙ্গী প্রত্যাশা করেছে, কারণ সুভা নিশ্চুপ থাকে। সুভা কথা বলতে পারে না।
➠ তার এই নিশ্চুপ বথাকার বিষয়টি প্রতাপের মাছ ধরার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে না। তাই প্রতাপ যখন ছিপ ফেলে জলের দিকে চেয়ে থাকত তখন সুভার উপস্থিতিতে বিরক্ত হতো না। কারণ সুভা কথা বলতে না পারায় কোনো শব্দ হয় না। মাছ ধরার সময় প্রতাপ এমনই এক সঙ্গীর প্রত্যাশা করেছে। সে মনে করে মাছ ধরার সময় নিশ্চুপ সঙ্গী সবচেয়ে ভালো।

গ. উদ্দীপকের সাথে ‘সুভা’ গল্পের শারীরিক সুবিধাবঞ্চিতদের প্রতি মানুষের সহানুভূতির বিষয়টির সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ শারীরিক প্রতিবন্ধীদের প্রতি আমাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও মমত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। তাদের মধ্যে কথা বলতে না পারা, কানে শুনতে না পারা, দৃষ্টিশক্তিহীনতা, হাত-পা বা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের সমস্যা হতে পারে। আমাদের সেবা ও মানবীয় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা উচিত। উদ্দীপকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন একটি শিশু আরজুর সমস্যা ও মনঃকষ্টের কথা বর্ণনা করা রয়েছে। তার প্রতি বড়দের মমত্ববোধও লক্ষ করা যায়। পায়ে সমস্যা থাকার কারণে অন্য বন্ধুদের সাথে স্কুলে হেঁটে আসতে তার কষ্ট হয়। পা অবশ হয়ে আসায় সবার সাথে সমানতালে চলতে পারে না। তার এ পরিস্থিতিতে সবাই সহানুভূতি ও মমত্ববোধ প্রকাশ করেছে।
➠ ‘সুভা’ গল্পে সুভা কথা বলতে পারে না। তার মা এটাকে নিয়তির দোষ মনে করলেও বাবা তাকে অনেক ভালোবাসেন। কেউ তার সঙ্গে মেশে না, খেলাধুলা করে না, তার সামনেই তার কথা না বলতে পারার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে। কেউ পাশে না থাকলেও সুভার বাবা ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর সহানুভূতির বিষয়টি উদ্দীপকটিকে ‘সুভা’ গল্পের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ করে তুলেছে।

ঘ. “উদ্দীপকের আরজুর কষ্ট আর ‘সুভা’ গল্পের সুভার কষ্ট এক সুতোয় গাঁথা।”- মন্তব্যটি আমি সমর্থন করি।
➠ প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোর আমাদের সমাজের মানুষ। তারা শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিজেদের গুটিয়ে রাখতে ভালোবাসে। আমাদের সবার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। উদ্দীপকের আরজুর পায়ে সমস্যা থাকার জন্য হেঁটে স্কুলে আসতে কষ্ট হয়অ তার অন্য বন্ধুদের সাথে সে সমান তালে চলতে পারে না, পা অবশ হয়ে আসে। এ কারণে আরজু প্রচন্ড কষ্ট পায়।
➠ ‘সুভা’ গল্পের সুভাও কথা বলতে পারে না। এজন্য কেউ তার সাথে মেশে না। সবাই সুভার সামনেই তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা বলে। যার জন্য সে একা একা থেকে নিজের একটি জগৎ তৈরি করে নেয়। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সুভা মনে মনে অনেক কষ্ট পায়।
➠ ‘সুভা’ গল্পের সুভার মনে কথা না বলতে পারার কষ্ট ছিল। আর উদ্দীপকের আরজুর পায়ের সমস্যার কারণে মনে মনে কষ্ট পেয়েছে। দুজনই এই কষ্ট দূর করার জন্য সবার সহানুভূতি প্রত্যাশা করেছে। সে কারণেই বলা যায়, উদ্দীপকের আরজুর কষ্ট আর ‘সুভা’ গল্পের সুভার কষ্ট এক সুতোর গাঁথা।


‘সুভা’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৫

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
অতি সাধারণ এক কিশোর লখা। কথা বলতে পারে না সে। কিন্তু তাতে কীই-বা আসে যায়। লখা উঁচু ডালে উঠে লাল ফুল সংগ্রহ করে শহিদ মিনারে যায় শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। কথা বলতে না পারলেও তার মুখ দিয়ে আঁ আঁ আঁ আঁ ধ্বনির মধ্য দিয়েই বেরিয়ে আসে বাঙালির গর্বের উচ্চারণ।

ক. সর্বশী ও পাঙ্গুলি কার নাম?
খ. প্রতাপের দ্বারা সংসারের উন্নতির আশা বাবা-মা ত্যাগ করেছিলেন কেন? ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের লখা ‘সুভা’ গল্পের কোন চরিত্রের প্রতিচ্ছবি? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “উদ্দীপকটি ‘সুভা’ গল্পের একটি চরিত্রকে প্রতীকায়িত করেছে মাত্র, গল্পের সম্পূর্ণ ভাব ধারণ করতে পারেনি।” মূল্যায়ন করো।

ক. সর্বশী ও পাঙ্গুলি সুভাদের গোয়ালের দুটি গাভীর নাম।
খ. প্রতাপ নিতান্ত অকর্মণ্য ছির বলে তার বাবা-মা তার দ্বারা সংসারের উন্নতির আশা ত্যাগ করেছিলেন।
➠ বাবা-মার ছোট ছেলে প্রতাপ ছিল নিতান্ত অকর্মণ্য। অনেক চেষ্টা করেও তাকে দিয়ে সংসারের উন্নতির কোনো কাজ করানো সম্ভব হয়নি। এজন্য প্রতাপের মা-বাবা তাকে নিয়ে প্রত্যাশা বাদ দিয়েছেন। সে অপরাহ্নে নদীতীরে ছিপ ফেলে মাছ ধরত। কারণ এভাবে অনেকটা সময় কাটানো যায়। আসলে প্রতাপ ছিল প্রচণ্ড অলস প্রকৃতির একজন মানুষ।

গ. উদ্দীপকের লখা ‘সুভা’ গল্পের সুভা চরিত্রের প্রতিচ্ছবি।
➠ পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এই সুন্দর পৃথিবীতে শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে অনেক মানুষ অনিন্দ্য সৌন্দর্য উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও অনেকে তাদের তীক্ষ্ণ অনুভূতি ও দক্ষতা দিয়ে অনেক মহৎ কাজ সম্পাদন করে। উদ্দীপকে আমরা কিওেশার লখার পরিচয় পাই, যে কথা বলতে পারে না। লখা বাক্প্রতিবন্ধী কিশোর। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কোনো কাজেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। অন্যান্য সুস্থ মানুষের মতো লখাও নিজেকে সব কাজে সম্পৃক্ত করতে চায়।
➠ ‘সুভা’ গল্পের সুভাও কথা বলতে পারে না। কথা বলতে পারে না বলে কেউ তার সাথে মেশে না। সুভা বাক্প্রতিবন্ধী হলেও সব কাজ করতে পারে। আর দশটি স্বাভাবিক মানুষের মতো সেও নিজেকে সব কাজে সম্পৃক্ত করতে চায়। এদিক দিয়ে উদ্দীপকের লখাকে ‘সুভা’ গল্পের সুভার প্রতিচ্ছবি বলা যায়।

ঘ. “উদ্দীপকটি ‘সুভা’ গল্পের একটি চরিত্রকে প্রতীকায়িত করেছে মাত্র, গল্পের সম্পূর্ণ ভাব ধারণ করতে পারেনি।”- মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ শারীরিক প্রতিবন্ধিতা মানুষকে স্বাভাবিক জীবন থেকে পৃথক করে দেয়। কথা বলতে না পারা এক ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা। যারা বোবা তারা কর্মের মাধ্যমে তাদের না-বলা কথাগুলোকে প্রকাশ করে। তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। উদ্দীপকে দেখা যায়, কিশোর লখা কথা বলতে পারে না। কিন্তু কথা না বলতে পারার কষ্ট নিয়ে লখা থেমে থাকে না। অন্যান্য মানুষের মতো সেও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
➠ ‘সুভা’ গল্পে লেখক বাক্প্রতিবন্ধী এক কিশোরী চরিত্রের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। তার নাম সুভা। সুভা কথা বলতে পারে না বলে পরিবারের সবাই অনেক চিন্তিত তার ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু সুভাও সবার মতো কাজ করতে পারে। সেও নিজেকে সকলের মাঝে সম্পৃক্ত করতে চায়। বাক্প্রতিবন্ধকতার কষ্ট সে তার কাজের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে উঠতে চায়। সে সৃষ্টিকর্তার কাছে অলৌকিক ক্ষমতারও প্রার্থনা করে যাতে সে সবার দৃষ্টিতে কাজের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
➠ এই দিকটিকে উদ্দীপকটি তুলে ধরলেও গল্পের সামগ্রিক বিষয় তুলে ধরতে পারেনি। ‘সুভা’ গল্পে উদ্দীপকের লখার সাথে সুভার সাদৃশ্য রয়েছে বটে, তবে এই দিকটি ছাড়াও গল্পে বেশকিছু বিষয়ের এবং ভাবের বর্ণনা রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের ওপর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের মনঃকষ্ট ও অসহায়ত্ব, অনুভূতির তীব্রতা, তাদের প্রতি সমাজের মনোভাব, লেখকের সহমর্মিতা- এসব বিষয় উদ্দীপকে অনুপস্থিত। তাই বলা যায়, মন্তব্যটি যথার্থ।


‘সুভা’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৬
নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
-----------

তথ্যসূত্র :
১. বাংলা সাহিত্য: নবম-দশম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৫।
২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url