ভাব ও কাজ- কাজী নজরুল ইসলাম

ভাব ও কাজ
ভাব ও কাজ 

ভাব ও কাজ
কাজী নজরুল ইসলাম

ভাবে আর কাজে সম্বন্ধটা খুব নিকট বোধ হইলেও আদতে এ-জিনিস দুইটায় কিন্তু আসমান-জমিন তফাৎ। ভাব জিনিসটা হইতেছে পুষ্পবিহীন সৌরভের মতো, একটা অবাস্তব উচ্ছ্বাস মাত্র। তাই বলিয়া কাজ মানে যে সৌরভবিহীন পুষ্প, ইহা যেন কেহ মনে করিয়া না বসেন। কাজ জিনিসটাই ভাবকে রূপ দেয়, ইহা সম্পূর্ণভাবে বস্তুজগতের।

তাই বলিয়া ভাবকে যে আমরা মন্দ বলিতেছি বা নিন্দা করিতেছি, তাহা নহে; ভাব জিনিসটা খুবই ভালো। মানুষকে কব্জায় আনিবার জন্য তাহার সর্বাপেক্ষা কোমল জায়গায় ছোঁওয়া দিয়া তাহাকে মাতাইয়া না তুলিতে পারিলে তাহার দ্বারা কোনো কাজ করানো যায় না, বিশেষ করিয়া আমাদের এই ভাব-পাগলা দেশে। কিন্তু শুধু ভাব লইয়াই থাকিব, লোককে শুধু কথায় মাতাইয়া মশগুল করিয়াই রাখিব, এও একটা মস্ত বদ-খেয়াল। এই ভাবকে কার্যের দাসরূপে নিয়োগ করিতে না পারিলে ভাবের কোনো সার্থকতাই থাকে না। তাহা ছাড়া ভাব দিয়া লোককে মাতাইয়া তুলিয়া যদি সেই সময় গরমাগরম কার্যসিদ্ধি করাইয়া লওয়া না হয়, তাহা হইলে পরে সে ভাবাবেশ কপূরের মতো উড়িয়া যায়। অবশ্য, এখানে কার্যসিদ্ধি মানে স্বার্থসিদ্ধি নয়। যিনি ভাবের বাঁশি বাজাইয়া জনসাধারণকে নাচাইবেন, তাঁহাকে নিঃস্বার্থ ত্যাগী ঋষি হইতে হইবে। তিনি লোকদিগের সূক্ষ্ম অনুভূতি বা ভাবকে জাগাইয়া তুলিবেন মানুষের কল্যাণের জন্য, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। তাঁহাকে একটা খুব মহত্তর উদ্দেশ্য ও কল্যাণ কামনা লইয়া ভাবের বন্যা বহাইতে হইবে, নতুবা বানভাসির পর পলিপড়ার মতো সাধারণের সমস্ত উৎসাহ ও প্রাণ একেবারে কাদাঢাকা পড়িয়া যাইবে। এই জন্য কেহ কেহ বলেন যে, লোকের কোমল অনুভূতিতে যা দেওয়া পাপ। কেননা অনেক সময় অনুপযুক্ততা প্রযুক্ত ইহা হইতে সুফল না ফলিয়া কুফলই ফলে। আগে হইতে সমস্ত কার্যের বন্দোবস্ত করিয়া বা কার্যক্ষেত্র তৈয়ার রাখিয়া তবে লোকদিগকে সোনার কাঠির ছোঁওয়া দিয়া জাগাইয়া তুলিতে হইবে। নতুবা তাহারা যখন জাগিয়া দেখিবে যে, তাহারা অনর্থক জাগিয়াছে, কোনো কার্য করিবার নাই, তখন মহা বিরক্ত হইয়া আবার ঘুমাইয়া পড়িবে এবং তখন আর জাগাইলেও জাগিবে না। কেননা, তখন যে তাহারা জাগিয়া ঘুমাইবে এবং জাগিয়া ঘুমাইলে তাহাকে কেহই তুলিতে পারে না। তাহা অপেক্ষা বরং কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভালো, সে-ঘুম ঢোল কাঁসি বাজাইয়া ভাঙানো বিচিত্র নয়।

এ-কথাটা একটা মস্ত সত্যি, তাহা এতদিনে আমরা ঠেকিয়া শিখিয়াছি। এই যে সেদিন একটা হুজুগে মাতিয়া হুড়হুড় করিয়া হাজার কতক স্কুল-কলেজের ছাত্রদল বাহির হইয়া আসিল, কই তাহারা তো তাহাদের এই সৎ সঙ্কল্প, এই মহৎ ত্যাগকে স্থায়ীরূপে বরণ করিয়া লইতে পারিল না। কেন এমন হইল? একটা সাময়িক উত্তেজনার মুখে এই ত্যাগের অভিনয় করিতে গিয়া ‘স্পিরিট’ কে কী বিশ্রী ভাবেই না মুখ ভ্যাঙচানো হইল। যাহারা শুধু ভাবের চোটে না বুঝিয়া না শুনিয়া শুধু একটু নামের জন্য বা বদনামের ভয়ে এমন করিয়া তাহাদের 'স্পিরিট' বা আত্মার শক্তির পবিত্রতা নষ্ট করিল, তাহারা কি দরকার পড়িলে আবার কাল এমনি করিয়া বাহির হইয়া আসিতে পারিবে? আজ যাহারা মুখে চাদর জড়াইয়া কল্যকার ত্যক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার মুখটি চুন করিয়া ঢুকিল, কাল দেশের সত্যিকার ডাক আসিলে তাহারা কি আর তাহাতে সাড়া দিতে পারিবে? হঠকারিতা করিয়া একবার যে ভোগটা ভুগিল বা ভ্রম করিল, তাহারই অনুশোচনাটা তাহারা কিছুতেই মন হইতে মুছিয়া ফেলিতে পারিবে না- বাহিরে যতই কেন লা-পরওয়া ভাব দেখাক না। এখন সত্যিকার ডাক শুনিয়া প্রাণ চাহিলেও সে লজ্জায় তাহাতে আসিয়া যোগদান করিতে পারিবে না। এই রূপে আমরা আমাদের দেশের প্রাণশক্তি এই তরুণদের ‘স্পিরিট’টাকে কুব্যবহারে আনিয়া মঙ্গলের নামে দেশের মহাশত্রুতা সাধনই করিতেছি না কি? রাগিবার কথা নয়, এখন ইহা রীতিমতো বিবেচনা-সাপেক্ষ। আমাদের এই আশা-ভরসাস্থল যুবকগণ এত দুর্বল হইল কীরূপে বা এমন কাপুরুষের মতো ব্যবহারই বা করিল কেন? সে কি আমাদেরই দোষে নয়? সাপ লইয়া খেলা করিতে গেলে তাহাকে দস্তুরমতো সাপুড়ে হওয়া চাই, শুধু একটু বাঁশি বাজাইতে পারিলেই চলিবে না। আজ যদি সত্যিকার কর্মী থাকিত দেশে, তাহা হইলে এমন সুবর্ণ সুযোগ মাঝ-মাঠে মারা যাইত না। ত্যাগী অনেক আছেন দেশে, কিন্তু কর্মীর অভাবে বা তথাকথিত কর্মী নামে অভিহিত লোকদের সত্য সাধনার অভাবে তাঁহারা কোনো ভালো কাজে আর কোনো অর্থ দিতে চাহেন না, বা অন্য কোনোরূপ ত্যাগ স্বীকার করিতেও রাজি নন। কী করিয়া হইবেন? তাঁহারা তাঁহাদের চোখের সামনে দেখিতেছেন যে, কতো লোকের কতো মাথার ঘাম পায়ে ফেলার ধন দেশের নামে, কল্যাণের নামে আদায় করিয়া বাজে লোকে নিজেদের উদর পূর্ণ করিতেছে। যাঁহারা সত্যিকার দেশকর্মী-সে বেচারারা সত্যি কথা স্পষ্টভাবে বলিতে গিয়া এই সব কর্মীর কারচুপিতে পুয়াল চাপা পড়িয়া গিয়াছে। বেচারারা এখন ভালো বলিতে গেলেও এই সব মুখোশ-পরা ত্যাগী মহাপুরুষগণ হট্টগোল বাঁধাইয়া লোককে সম্পূর্ণ উল্টা বুঝাইয়া দিয়া তাহাকে একদম খেলো, বুটা ইত্যাদি প্রমাণ করিয়া দেন। সহজ জনসাধারণের সরল মন এ-সব না ধরিতে পারার দরুন তাহাদের মন অতি অল্পেই ঐ সত্যিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে বিষাইয়া উঠে। ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ কথাটা মস্ত সত্যি কথা।

তাহা হইলে এখন উপায় কী? এক সহজ উপায় এই যে, এখন হইতে জনসাধারণের বা শিক্ষিত কেন্দ্রের উচিত, ভাবের আবেগে অতিমাত্রায় বিহ্বল হইয়া কাণ্ডাকাণ্ড ভালোমন্দ জ্ঞান হারাইয়া না ফেলা। আমরা বলিব, ভাবের সুরা পান করো ভাই, কিন্তু জ্ঞান হারাইও না। তাহা হইলে তোমার পতন, তোমার দেশের পতন, তোমার ধর্মের পতন, মনুষ্যত্বের পতন। ভাবের দাস হইও না, ভাবকে তোমার দাস করিয়া লও। কর্মে শক্তি আনিবার জন্য ভাব-সাধনা কর। ‘স্পিরিট’ বা আত্মার শক্তিকে জাগাইয়া তোল, কিন্তু তাই বলিয়া কর্মকে হারাইও না। অন্ধের মতো কিছু না বুঝিয়া না শুনিয়া ভেড়ার মতো পেছন ধরিয়া চলিও না। নিজের বুদ্ধি, নিজের কর্মশক্তিকে জাগাইয়া তোল। তোমার এই ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যই দেশকে উন্নতির দিকে, মুক্তির দিকে আগাইয়া লইয়া যাইবে। এ-সব জিনিস ভাব-আবিষ্ট হইয়া চক্ষু বুজিয়া হয় না। কোমর বাঁধিয়া কার্যে নামিয়া পড়িতে হইবে এবং নামিবার পূর্বে ভালো করিয়া বুঝিয়া-সুঝিয়া দেখিয়া লইতে হইবে, ইহার ফল কী। শুধু উদ্‌মো ষাঁড়ের মতো দেওয়ালের সঙ্গে গা ঘেঁষড়াইয়া নিজের চামড়া তুলিয়া ফেলা হয় মাত্র। দেওয়াল প্রভু কিন্তু দিব্যি দাঁড়াইয়া থাকেন। তোমার বন্ধন ওই সামনের দেওয়ালকে ভাঙিতে হইলে একেবারে তাহার ভিত্তিমূলে শাবল মারিতে হইবে।

আবার বলিতেছি, আর ভাবের ঘরে চুরি করিও না। আগে ভালো করিয়া চোখ মেলিয়া দেখ। কার্যের সম্ভাবনা-অসম্ভাবনার কথা অগ্রে বিবেচনা করিয়া পরে কার্যে নামিলে তোমার উৎসাহ অনর্থক নষ্ট হইবে না। মনে রাখিও তোমার ‘স্পিরিট’ বা আত্মার শক্তিকে অন্যের প্ররোচনায় নষ্ট করিতে তোমার কোনো অধিকার নাই। তাহা পাপ- মহাপাপ।

উৎস নির্দেশ :
‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধটি নেওয়া হয়েছে 'যুগবাণী' গ্রন্থ থেকে।

শব্দার্থ ও টীকা :
➠ আসমান- আকাশ।
➠ জমিন- মাটি, ভূপৃষ্ঠ।
➠ কজায়- আয়ত্তে, অধিকারে।
➠ মশগুল- মগ্ন, বিভোর।
➠ বদ-খেয়াল- খারাপ চিন্তা, খারাপ আচরণ।
➠ দাদ- প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা।
➠ কপূর- বৃক্ষরস থেকে তৈরি গন্ধদ্রব্য বিশেষ, যা বাতাসের সংস্পর্শে অল্পক্ষণের মধ্যে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
➠ ঋষি- শাস্ত্রজ্ঞ তপস্বী, মুনি, যোগী।
➠ বানভাসি- বন্যায় ভাসানো, বন্যায় যা বা যাদের ভাসিয়ে আনে।
➠ বন্দোবস্ত- ব্যবস্থা, আয়োজন।
➠ অনর্থক- ব্যর্থ, নিষ্ফল, অকারণ।
➠ কুম্ভকর্ণ- রামায়ণে বর্ণিত রাবণের ছোটো ভাইয়ের নাম। সে একনাগাড়ে ছয় মাস ঘুমাত। এখানে যে খুব ঘুমায় বা সহজে যাকে জাগানো যায় না।
➠ হুজুগ- সাময়িক আন্দোলন, জনরব, গুজব।
➠ সঙ্কল্প- প্রতিজ্ঞা, শপথ।
➠ স্পিরিট- ইংরেজি Spirit শব্দটির অর্থ উদ্দীপনা, উৎসাহ, শক্তি। এ প্রবন্ধে ‘আত্মার শক্তির পবিত্রতা’ অর্থে স্পিরিট শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
➠ কল্যকার- পূর্ব বা পরবর্তী দিন। এখানে পূর্বের দিন অর্থে।
➠ লা-পরওয়া- গ্রাহ্য না করা।
➠ দস্তুরমতো- রীতিমতো, যথেষ্ট, নিতান্ত।
➠ সুবর্ণ- সোনা, স্বর্ণ।
➠ পুয়াল- খড়।
➠ দশচক্রে ভগবান ভূত- দশজনের চক্রান্তে সাধুও অসাধু প্রতিপন্ন হতে পারে, বহুলোকের ষড়যন্ত্রে অসম্ভবও সম্ভব হয়।
➠ কাণ্ডাকাণ্ড- ন্যায়-অন্যায়, ভালোমন্দ।
➠ উদ্‌মো ষাঁড়- বন্ধনমুক্ত ষাঁড়।
➠ প্ররোচনা- উসকানি, উত্তেজনা সৃষ্টি।

পাঠের উদ্দেশ্য :
এই প্রবন্ধ পাঠ করে শিক্ষার্থীরা মহৎ কাজের জন্য অনুপ্রাণিত হবে। শুধু ভাবের উচ্ছ্বাসে উদ্বেল হওয়া নয়, ভাবের সঙ্গে পরিকল্পিত কর্মশক্তি ও বাস্তব উদ্যোগের প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন হবে।

পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব :
ভাব ও কাজের মধ্যে পার্থক্য অনেক। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ভাবের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু শুধু ভাব দিয়ে মহৎ কিছু অর্জন করা যায় না। তার জন্য কর্মশক্তি এবং সঠিক উদ্যোগের দরকার হয়। ভাবের দ্বারা মানুষকে জাগিয়ে তোলা যায়, কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা ও কাজের স্পৃহা ছাড়া যে কোনো ভালো উদ্যোগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ রচনাটিতে লেখক দেশের উন্নতি ও মুক্তি এবং মানুষের কল্যাণের জন্য ভাবের সঙ্গে বাস্তবধর্মী কর্মে তৎপর হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

কবি পরিচিতি :

কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিদ্যালয়ের পড়াশুনা শেষ করতে পারেননি। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হলে তিনি স্কুল ছেড়ে বাঙালি পল্টনে যোগদান করেন। যুদ্ধ শেষ হলে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালি পল্টন ভেঙে দেওয়া হয়। নজরুল কলকাতায় ফিরে এসে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এ সময় সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে চারদিকে সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর কবিতায় পরাধীনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উচ্চারিত হয়েছে। অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে তিনি প্রবল প্রতিবাদ করেন। এজন্য তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হয়। তাঁর রচনাবলি অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

কবিতা, সংগীত, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও গল্প- সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় নজরুল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি সাম্যবাদী চেতনাভিত্তিক কবিতা, শ্যামাসংগীত, ইসলামি গান ও গজল লিখেছেন। কবিতা ও গানে বহুল পরিমাণে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত হন এবং তাঁর সাহিত্যসাধনায় ছেদ ঘটে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে কবিকে বাংলাদেশে আনা হয়।

১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট উপাধি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও একুশে পদক পান। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে, কাব্যগ্রন্থ: ‘অগ্নি-বীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’, ‘চক্রবাক’; উপন্যাস: ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘কুহেলিকা’; গল্পগ্রন্থ: ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘শিউলিমালা’; প্রবন্ধগ্রন্থ: ‘যুগবাণী’, ‘রুদ্র-মঙ্গল’; নাটক: ‘ঝিলিমিলি’, ‘আলেয়া’, ‘মধুমালা’ ইত্যাদি।

কাজী নজরুল ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।


কর্ম-অনুশীলন :
ক. ‘আত্মার শক্তি’ বিষয়ে একটি গল্প রচনা কর (একক কাজ)।
খ. একদল ‘ভাবে’র পক্ষে এবং আরেক দল ‘কাজে’র পক্ষ নিয়ে বিতর্কে অংশগ্রহণ করবে (দলগত কাজ)।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন :

প্রশ্ন থেকে

অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন -এর মধ্যে!
যা


জ্ঞানমূলক প্রশ্ন :

অনুধাবনমূলক প্রশ্ন :

সৃজনশীল প্রশ্ন- ১

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
তুমি স্বপ্নে রাজা হতে পার, কোটি কোটি টাকা, বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে পার। কল্পলোকের সুন্দর গল্পও হতে পার, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন এক জগৎ। এখানে বড় হতে হলে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। শিক্ষার দ্বারা নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করে সঠিক কর্মানুশীলনের মাধ্যমে বড়ো হতে হবে। সুতরাং কল্পনার জগতে হাবু-ডুবু না খেয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করাই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক।

ক. যিনি ভাবের বাঁশি বাজিয়ে জনসাধারণকে নাচাবেন তাকে কেমন হতে হবে?
খ. লেখক ‘স্পিরিট’ বা আত্মার শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে বলেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকটি ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের যে দিকটি নির্দেশ করে তা বর্ণনা করো।
ঘ. ‘কল্পনার জগতে হাবু-ডুবু না খেয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করাই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক’- মন্তব্যটি ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের আলোকে মূল্যায়ন করো।

(ক) যিনি ভাবের বাঁশি বাজিয়ে জনসাধারণকে নাচাবেন তাকে নিঃস্বার্থ ত্যাগী ঋষি হতে হবে।
(খ) কর্মে শক্তি আনার জন্য লেখক ‘স্পিরিট’ বা আত্মার শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে বলেছেন।
➠ কর্মের মাধ্যমে সফলতা মানব জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করে। এক্ষেত্রে কর্ম-পরিকল্পনা সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। তার জন্য কর্মশক্তি এবং সঠিক উদ্যোগের দরকার হয়। ভাবের দ্বারা মানুষ এগিয়ে গেলেও কর্মে শক্তি আনার জন্য আত্মার শক্তিকে জাগিয়ে তোলা অপরিহার্য।

(গ) উদ্দীপকটি ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে বর্ণিত ভাবের সঙ্গে পরিকল্পিত কর্মশক্তি ও বাস্তব উদ্যোগের প্রয়োজনীয় দিকটি নির্দেশ করে।
➠ ভাব ও কাজের পার্থক্য অনেক। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ভাবের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু ভাব দিয়ে মহৎ কিছু অর্জন করা যায় না। তার জন্য কর্মশক্তি এবং সঠিক উদ্যোগের দরকার। ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম ভাব ও যথাযথ কাজের সমন্বয়কে বিশ্লেষণ করেছেন।
➠ উদ্দীপকটিতে ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের ন্যায় ভাবের সাথে কর্মশক্তি এবং সঠিক উদ্যোগের দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। শুধু চিন্তা, কল্পনা বা ভাবের দ্বারা কোনো কিছু অর্জন করা যায় না। বাস্তবতার আসল রূপ হলো পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার দ্বারা নিজের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করে সঠিক কর্মানুশীলনের মাধ্যমে বড় হতে হবে। তাই উদ্দীপকের সাথে প্রবন্ধের সামগ্রিকতা মিলে যায়।

(ঘ) জীবনকে কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করাই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক।
➠ ব্যক্তিজীবনকে সঠিক ও সুন্দরভাবে পরিচালিত করলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য উজ্জ্বল হওয়ার পাশাপাশি দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা যায়।
➠ উদ্দীপকে কল্পনা ও ভাবের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। স্বপ্নলোকে মানুষ জীবনকে রঙিনভাবে সাজাতে পারে, জীবন সোনার রূপকাঠি দিয়ে কল্পনার জগতে রাজা হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে কল্পনার জগত ও বাস্তবতার দুনিয়া কখনো এক নয়। চরম বাস্তবতার প্রতিটি মুহূর্তে জীবনকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে দেশের স্বার্থে কাজে লাগে।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে কল্পনাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। ভাব ও কল্পনার গুরুত্ব আছে কিন্তু কল্পনা দিয়ে মহৎ কিছু অর্জন করা যায় না। তার জন্য কর্মশক্তি এবং সঠিক উদ্যোগের দরকার হয়। কল্পনার দ্বারা মানুষকে জাগিয়ে তোলা যায় কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা ও কাজের স্পৃহা ছাড়া দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা যায় না। আর সঠিক উদ্যমের মাধ্যমে দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার মধ্যেই মনুষ্যত্বের আসল পরিচয় নিহিত। তাই প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যৌক্তিক।


সৃজনশীল প্রশ্ন- ২

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
সমাজে এমন অনেক মানুষদের আমরা দেখি যারা কাজের চেয়ে কথা বলেন বেশি। এরা কারণে অকারণে কথা বলেন। নিজে যা না তার চেয়ে বেশি বলেন। ফলে তাদের কথার মধ্যে প্রচুর মিথ্যা কথা চলে আসে। অনেকের ভাব ভঙ্গি দেখে ও চলনে-বলনে মনে হয় এরা সবজান্তা, আসলে এরা মূর্খের অধম।

(ক) কাজ জিনিসটা কাকে রূপ দেয়?
(খ) মানুষকে জাগিয়ে তুলতে হলে তার কোমল জায়গায় ছোঁয়া দেওয়া প্রয়োজন কেন?
(গ) উদ্দীপকের সাথে ভাব ও কাজ প্রবন্ধের সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
(ঘ) অনেকের ভাব ভঙ্গি, দেখে ও চলনে- বলনে মনে হয়- এরা সবজান্তা। আসলে এরা মূর্খের অধম- কথাটি উদ্দীপক এবং ভাব ও কাজ প্রবন্ধের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

(ক) কাজ জিনিসটা ভাবকে রূপ দেয়।
(খ) কোমল (হৃদয়) জায়গায় স্পর্শ করতে হবে তাহলেই মানুষ দ্রুত জেগে ওঠে এবং তাকে দিয়ে অধিক কাজ করানো যায়।
➠ মানুষকে জাগিয়ে তুলতে হলে তার কোমল জায়গায় ছোঁয়া দেয়া প্রয়োজন। কোমল জায়গায় ছোঁয়া দিয়ে তাকে জাগিয়ে তুলতে না পারলে তার দ্বারা কোনো কাজ করানো যায় না। আমাদের এই ভাব পাগল দেশে এটি খুবই অপরিহার্য।

(গ) উদ্দীপকের বক্তব্যের সাথে ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে জনগণের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য তাদের মধ্যে ভাব বা অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে হবে। যিনি এই ভাব বা অনুভূতির সঞ্চার করবেন তাকে অবশ্যই নিঃস্বার্থ ত্যাগী ঋষি হতে হবে। জনগণের এই জাগরণকে সততার সাথে পরিচালন করতে হবে। সাময়িক উত্তেজনার মুখে ত্যাগের অভিনয় করলে জনগণের ‘স্পিরিট’ বা আত্মার শক্তি পবিত্রতা নষ্ট হবে। লেখক বলেছেন সাপ নিয়ে খেলতে চাইলে দুস্তুর মতো সাপুড়ে হতে হবে।
➠ উদ্দীপকে বলা হয়েছে সমাজে এমন মানুষ আছেন যারা কাজের চেয়ে কথা বেশি বলেন। যারা কারণে অকারণে কথা বলেন। নিজে যা না তার চেয়ে বেশি বলেন। এরা প্রচুর মিথ্যে বলেন। নিজেদের সবজান্তা ভাবলেও এরা মূর্খ। আসলে এদের সততা বা সাধুতা নেই। প্রবন্ধে বলা হয়েছে যারা সমাজকে জাগিয়ে তুলবেন তাদের আবশ্যই ত্যাগী ঋষি হতে হবে। তাই উদ্দীপকের বক্তব্যের সাথে ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের সাদৃশ্য রয়েছে।

(ঘ) অনেকের ভাব-ভঙ্গি দেখে ও চলনে-বলনে মনে হয়- এরা সবজান্তা। আসলে এরা মূর্খের অধম। উদ্দীপকের এই কথার সমর্থন মেলে ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে পাই, মাথার ঘাম পায়ে ফেলা বহু মানুষের সম্পদ দেশের নামে, কল্যাণের নামে বাজে লোকেরা নিজেদের উদরপূর্ণ করে। এদের কারচুপিতে ঢাকা পড়ে যায় সত্যিকার দেশকর্মী। মুখোশপরা ওই মানুষগুলো সত্যিকার দেশপ্রেমিকদের খেলো, ঝুটা প্রমাণ করে দেয়। এরা এদের মিথ্যাচার দিয়ে ঐ সত্যিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে বিষিয়ে তোলে।
➠ উদ্দীপকে সমাজের অসৎ চাপাবাজদের কথা বলা হয়েছে। যারা কারণে অকারণে বেশি কথা বলে, কাজের চেয়ে কথা বেশি বলে। ফলে প্রচুর মিথ্যে কথাও চলে আসে তাদের মুখে। তাদের চলনে-বলনে সবজান্তা মনে হলেও এরা মূর্খ।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে যে অসৎ ও মুখোশপরা শ্রেণির কথা বলা হয়েছে। এরা দেশপ্রেমিক সেজে মানুষের সাথে প্রতারণা করে আর উদ্দীপকে চাপাবাজ ও মিথ্যাবাদী শ্রেণি সমাজে ভাঙন ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এরা দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর। এরা নিজেদের যতই সজ্জন ও মহাপুরুষ দাবি করেন না কেন লেখকের ভাষায় এরা ভাবের ঘরে চুরি করে।


সৃজনশীল প্রশ্ন- ৩

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
ছাত্রসমাজ শক্তি, ন্যায় ও নতুনত্বের প্রতীক। ছাত্রসমাজকে তাদের সততা ও দক্ষতা দিয়ে যেকোনো কাজে নামালে সে কাজ সফল হয়। আমাদের দেশে অতীতেও এমন ঘটেছে। কিন্তু ছাত্রসমাজের ক্ষমতাকে বিনা কারণে বিপথে ব্যবহার করলে সমাজের বিশেষ উন্নয়ন হয় না। তাই, ছাত্রসমাজকে সঠিক পথে চালাতে হলে চাই প্রাণশক্তিতে ভরপুর নেতৃত্ব।

(ক) ‘সাম্যবাদী’ কার রচিত কাব্যগ্রন্থ?
(খ) হঠকারিতার ফলে সৃষ্ট অনুশোচনা ছাত্ররা কেন মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে না?
(গ) উদ্দীপকে ছাত্রসমাজের যে বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে তার সাথে ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে ছাত্রসমাজের বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
(ঘ) ‘ছাত্রসমাজকে সঠিক পথে চালাতে হলে চাই প্রাণশক্তিতে ভরপুর নেতৃত্ব।’- উদ্দীপকের এ কথাটি ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের চেতনারই প্রতিভূ- বিশ্লেষণ করো।

(ক) ‘সাম্যবাদী’ কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কাব্যগ্রন্থ।
(খ) হুজুগে মেতে হঠকারিতার ফলে সৃষ্ট অনুশোচনা ছাত্ররা মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে না।
➠ সৎ সংকল্প ও মহৎ ত্যাগকে স্থায়ীরূপে বরণ করতে না পারলে তা অকল্যাণই ডেকে আনে। ছাত্রসমাজ সাময়িক উত্তেজনার বশে অনেক সময় হঠকারী কর্মকান্ড করে বসে। এই হঠকারিতার ফলে সৃষ্ট গ্লানি ও অনুশোচনা তারা ভুলতে পারে না।

(গ) উদ্দীপকের ছাত্রসমাজের বৈশিষ্ট্যের সাথে ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের ছাত্রসমাজের বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে লেখক ছাত্রদের স্পিরিট বা আত্মার শক্তির পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেছেন। ছাত্রসমাজ বা যুবসমাজই জাতির প্রাণশক্তি। জাতির আশা ভরসার কেন্দ্রস্থল যুবকরা যদি নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে তবে মুখোশধারী তথাকথিত ত্যাগী ব্যক্তিরা তাদের কাপুরুষের মতো ব্যবহার করে থাকে। ফলে সত্যিকার সত্যের ডাক এলেও সেদিন তারা সাড়া দিতে পারে না।
➠ উদ্দীপকে ছাত্রসমাজের গুরুত্বকে তুলে ধরা হয়েছে। তারা শক্তি, ন্যায় ও নতুনত্বের প্রতীক। ছাত্রসমাজকে সততা দক্ষতা দিয়ে কোনো কাজে নামলে তা সফল হয়। অতীতেও ছাত্রসমাজ বড় বড় কাজ করেছে। ছাত্রসমাজের ক্ষমতাকে বিনা কারণে বিপথে ব্যবহার করলে তা সমাজের কোনো উন্নয়ন বয়ে আনে না। সাময়িক উত্তেজনার বশে হঠকারী কর্মকান্ডে তাদের জড়িত হলে চলবে না। সেটা করলে তাদের ভেতরের স্পিরিট বা আত্মার শক্তি নষ্ট হবে। তাই উদ্দীপক ও প্রবন্ধ উভয় ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজের এরূপ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

(ঘ) ‘ছাত্রসমাজকে সঠিক পথে চালাতে হলে চাই প্রাণশক্তিতে ভরপুর নেতৃত্ব’ উদ্দীপকের উক্তিটি ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের চেতনার প্রতিভূ।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে সমাজসচেতন লেখক কাজী নজরুল ইসলাম দেশের প্রাণশক্তি তরুণদের ভূমিকার বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তারা অনেক সময় ভাবের বশবর্তী হয়ে হঠকারী কর্মকান্ড করে ফেলে। যার প্রায়শ্চিত্ত তারা নিজেরাই করে। হুড়মুড় করে হুজুগে মেতে তারা যে কাজটা করে তাদের সে ত্যাগ স্থায়ী কোনো ফলাফল বয়ে আনে না। লেখকের মতে, জাতির প্রাণশক্তি তরুণদের পরিচালনার জন্য ত্যাগী নিঃস্বার্থ নেতৃত্ব প্রয়োজন।
➠ উদ্দীপকেও ছাত্রসমাজকে শান্তি ও ন্যায়ের প্রতীক বলা হয়েছে। সততা, দক্ষতা দিয়ে তাদের কোনো কাজে নামালে সেকাজ সফল হয়। অতীতে ছাত্রসমাজ সেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে। ছাত্রসমাজের ক্ষমতাকে বিনা কারণে ব্যবহার করলে তা জাতির জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনে না। তা বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে। তাদের পরিচালনার জন্য প্রয়োজন প্রাণশক্তিতে ভরপুর নেতৃত্ব।
➠ উদ্দীপক এবং ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধ বিবেচনা করলে দেখা যায়, উদ্দীপকের মন্তব্য ও লেখকের মতামত একই সত্যকে ধারণ করে। উদ্দীপকে যুবসমাজকে পরিচালনার জন্য প্রাণশক্তি সম্পন্ন নেতৃত্বের কথা বলা হয়েছে। প্রবন্ধে বলা হয়েছে নিঃস্বার্থ ত্যাগী ঋষির কথা। যারা যুবসমাজ ও ছাত্রসমাজকে সঠিক পথে পরিচালনা করবে।


সৃজনশীল প্রশ্ন- ৪

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
বিষ্ণুপুর গ্রামে করিম নামে এক নেতা গোছের লোক আছে। তিনি সবসময় দলবল নিয়ে চলেন। এই করিম যেকোনো ছলছুতায় মানুষের কাছ থেকে চাঁদা ওঠায়। তার দল কখনো উন্নয়নের কথা বলে, কখনো সমাজ সেবার কথা বলে, কখনো দুর্যোগে সহায়তার কথা বলে। আসলে এরা কখনো অন্যের উপকার করে না। নিজের স্বার্থ হাসিল করে। এদের উৎপাতে সত্যিকার ত্যাগী মানুষগুলো কোনো কাজই করতে পারে না। এদের মতো ত্যাগী মানুষের চাইতে বেশি প্রয়োজন সত্যিকার কর্মী।

(ক) কবি কাজী নজরুল ইসলাম কোথায় মৃত্যুবরণ করেন?
(খ) ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’- কথাটি দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
(গ) উদ্দীপকের করিমের সাথে ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের তথাকথিত কর্মী নামে অভিহিত লোকদের সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
(ঘ) ‘ত্যাগী মানুষের চাইতে বেশি প্রয়োজন সত্যিকার কর্মী।’- ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের আলোকে উক্তিটি সম্পর্কে তোমার মতামত দাও।

(ক) কাজী নজরুূল ইসলাম ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
(খ) ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ বলতে দশজনের চক্রান্তে সাধুও অসাধু প্রতিপন্ন হতে পারে- সে কথাই বোঝানো হয়েছে।
➠ যখন কোনো বিষয়ে বহুলোক ষড়যন্ত্র করে তখন অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায়। দশজন যখন মিথ্যাচার করে তখন মিথ্যাটাই সত্যের মতো প্রচারিত হতে থাকে। তখন দশজনের চক্রান্ত সাধুও অসাধু ব্যক্তিতে প্রতিপন্ন হতে পারে।

(গ) ত্যাগ স্বীকারে অনভ্যস্ত উদ্দীপকের করিমের সাথে ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের তথাকথিত কর্মীর মধ্যে মিল বা সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে লেখক মত দিয়েছেন, দেশ ও জাতি গঠনে সত্যিকার কর্মীর প্রয়োজন। সাপ খেলতে গেলে যেমন সামান্য বাঁশি বাজালেই চলে না। তাকে দস্তুরমতো সাপুড়ে হতে হয়। দেশে যদি সত্যিকার কর্মী থাকত তবে কোনো সুবর্ণ সুযোগই মাঠে মারা যেত না। দেশে অনেক ত্যাগী মানুষ আছেন। কিন্তু তারা তথাকথিত কর্মী নামে অভিহিত লোকদের সত্য সাধনার অভাবে তাঁরা কোনো ভালো কাজে অর্থ ব্যয় করতে চান না। কোনো ত্যাগ স্বীকারেও রাজি হন না।
➠ উদ্দীপকের করিম নেতা গোছের লোক। যেকোনো ছলছুতায় মানুষের কাছ থেকে চাঁদা ওঠায় দলবল নিয়ে। উন্নয়ন, সেবা ও সহায়তার কথা বললেও কারো কোনো উপকার করে না। নিজের স্বার্থই শুধু হাসিল করে। এদের উৎপাতে ত্যাগী মানুষেরা কোনো কাজই করতে পারে না। ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের লোক দেখানো তথাকথিত কর্মীর সাথে তাই উদ্দীপকের করিমের সাদৃশ্য রয়েছে।

(ঘ) আলোচ্য উদ্দীপক ও ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে সত্যিকার কর্মীর প্রয়োজনীয়তার কথাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে সমাজ সচেতন লেখক কাজী নজরুল ইসলাম একটি সমৃদ্ধ দেশ, সমৃদ্ধ জাতি গঠনে জনগণের মাঝে প্রকৃত ভাব সৃষ্টি ও কর্তব্য কাজের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তার মতে, যারা জনগণের মাঝে ভাবের বাঁশি বাজিয়ে জাগরণ সৃষ্টি করতে চান তাঁদের নিঃস্বার্থ ত্যাগী ঋষি হতে হবে। হঠকারী কর্মকান্ডের জন্য অনেক ক্ষতি সাধিত হয়। দরকার সঠিক নেতৃত্ব। আত্মার শক্তিকে জাগিয়ে তুলে সত্যিকার কর্মী হিসেবে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সেক্ষেত্রে তিনি যুবকদের প্রতি বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
➠ উদ্দীপকের করিম জনগণের উন্নয়ন ও সেবার কথা বলে নিজের আখের গোছায়। অর্থনৈতিক ফায়দা লাভ করে। সে ও তার দলবলের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ। তাদের উৎপাতে সত্যিকার ত্যাগী ও কর্মী মানুষ ভালো কোনো কাজই করতে পারে না। অথচ এই ত্যাগী ও সত্যিকার কর্মী মানুষের সমাজে বেশি প্রয়োজন।
➠ উদ্দীপক ও ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধ থেকে আমরা জানতে পারি সত্যিকার কল্যাণের জন্য প্রয়োজন সত্যিকার কর্মী। যারা নিস্বার্থভাবে সমাজের কল্যাণ করবে। ব্যক্তিস্বার্থকে কখনো প্রাধান্য দেবে না।


সৃজনশীল প্রশ্ন- ৫

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
মানুষ বড় হয় তার কর্মের মাধ্যমে। সঠিক কর্মের মাধ্যমে মানুষ কাক্সিক্ষত সাফল্য লাভ করতে পারে। কর্ম ও নিজস্ব চিন্তা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনা করে। তাই চিন্তা যদি পরিচ্ছন্ন না হয়; তবে মানুষকে ভাবের সাগরে হাবুডুবু খেতে হয়। যা তাকে প্রকৃত মানুষ হওয়া থেকে বিরত রাখে।

(ক) হুজুগ কী?
(খ) লোকের কোমল জায়গায় স্পর্শ করে কার্যসিদ্ধি বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
(গ) উদ্দীপকে ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের কোন দিকটি বর্ণিত হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
(ঘ) “চিন্তা যদি পরিচ্ছন্ন না হয়; তবে মানুষকে ভাবের সাগরে হাবুডুবু খেতে হয়”- কথাটি উদ্দীপক এবং ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

(ক) লক্ষ নির্ধারণ না করে সাময়িক কোনো আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া গুজবকে হুজুগ বলে।
(খ) লোকের কোমল জায়গায় স্পর্শ করে কার্যসিদ্ধি করা বলতে বোঝায়নো হয়েছে- মানুষকে উদ্দীপ্ত করে তার চেতনা পরিবর্তনের মাধ্যমে সফলতা সৃষ্টি করা ।
➠ প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব একটা অনুভব আছে। তার নিজস্ব একটা চিন্তা ও চেতনা আছে। ব্যক্তির চিন্তার জায়গাটা তার নিজস্ব একটি কোমল জায়গা। মানুষ কোমল জায়গায় অর্থাৎ তার অনুভূতিকে জাগিয়ে তার মাধ্যমে কঠিন কাজও সহজে করা যায়।

(গ) উদ্দীপকে ভাব ও কাজ প্রবন্ধে উল্লিখিত সঠিক কর্ম ও চিন্তার মধ্যদিয়ে সাফল্য লাভের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে লেখক মানুষের মাঝে ভাবের জাগরণ ঘটিয়ে মহৎকর্ম সম্পাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের মনের সঠিক ভাব বা চিন্তা তাকে কল্যাণকর্মী কাজ সম্পাদনে প্রেরণা জোগায়। মানুষের মনের সবচেয়ে কোমল জায়গায় ছোঁয়া দিয়ে মাতিয়ে তুলতে না পারলে তার দ্বারা কোনো কাজ করানো সম্ভব হয় না। ভাবকে তাই কাজের দাস বানিয়ে কাজ সম্পাদন করতে হয়।
➠ উদ্দীপকে বলা হয়েছে মানুষ বড় হয় তার কাজের মাধ্যমে। সঠিক কর্মের মাধ্যমে মানুষ কাক্সিক্ষত সাফল্য লাভ করতে পারে। কর্ম ও নিজস্ব চিন্তা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। উদ্দীপকের এই দিকটি ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধেও উল্লিখিত হয়েছে। তাই সাফল্য লাভের পূর্বশর্ত হলো সঠিক চিন্তা ও কর্ম।

(ঘ) ‘চিন্তা যদি পরিচ্ছন্ন না হয় তবে মানুষকে ভাবের সাগরে হাবু-ডুবু খেতে হয়’- কথাটি তাৎপর্যপূর্ণ।
➠ ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে লেখক বলেছেন, ভাব জিনিসটা খুবই ভালো মানুষকে আয়ত্তে আনার জন্য তার সর্বাপেক্ষা কোমল জায়গায় ছোঁয়া দিতে হয়। আবার শুধু ভাব নিয়েই থাকব। লোককে শুধু কথায় জাগিয়ে রাখব। এটি একটা মস্ত বদখেয়াল। ভাবকে কাজের দাসরূপে নিয়োগ করতে না পারলে ভাবের কোনো সার্থকতাই থাকে না।
➠ উদ্দীপকে বলা হয়েছে মানুষ বড় হয় কর্মের মাধ্যমে। সঠিক কাজের মাধ্যমে মানুষ কাক্সিক্ষত সাফল্য লাভ করতে পারে। কর্ম ও নিজস্ব চিন্তা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনা করে । তাই চিন্তা পরিচ্ছন্ন না হলে মানুষকে ভাবের সাগরে হাবু-ডুবু খেতে হয়। যা তাকে প্রকৃত মানুষ হওয়া থেকে বিরত রাখে।
➠ উদ্দীপক এবং ‘ভাব ও কাজ’ প্রবন্ধে ভাব বা চিন্তার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন বা পরিশুদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ভাব বা চিন্তাটা যদি সঠিক হয় তবে কাজটাও সঠিক হতে বাধ্য। সঠিক কর্মের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত সাফল্য লাভ সম্ভব। চিন্তার জগতের পরিচ্ছন্নতা তাই অপরিহার্য।


তথ্যসূত্র :
১. সাহিত্য কণিকা: অষ্টম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ, ২০২৫।
২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url