সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ
বিকেলের নক্ষত্রের কাছে;
সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে
নির্জনতা আছে।
এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা
সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।
কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে;
তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।
আজকে অনেক রূঢ় রৌদ্রে ঘুরে প্রাণ
পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো
ভালোবাসা দিতে গিয়ে তবু,
দেখেছি আমারি হাতে হয়ত নিহত
ভাই বোন বন্ধু পরিজন প’ড়ে আছে;
পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।
কেবলি জাহাজ এসে আমাদের বন্দরের রোদে
দেখেছি ফসল নিয়ে উপনীত হয়;
সেই শস্য অগণন মানুষের শব;
শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময়
আমাদের পিতা বুদ্ধ কনফুশিয়সের মতো আমাদেরো প্রাণ
মূক করে রাখে; তবু চারিদিকে রক্তক্লান্ত কাজের আহ্বান।
সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;
সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;
এ-বাতাস কী পরম সূর্যকরোজ্জ্বল;
প্রায় ততদূর ভালো মানব-সমাজ
আমাদের মতো ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে
গড়ে দেবো, আজ নয়, ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে।
মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভালো হতো অনুভব করে;
এসে যে গভীরতর লাভ হলো সে সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে;
দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়-
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।
➠ সু- শুভ; সুন্দর।
➠ চেতনা-চিন্তা
➠ সুচেতনা- শুভ/সুন্দর চিন্তা।
➠ নক্ষত্র- তারা, সূর্য। এখানে সূর্যকে বোঝানো হয়েছে।
➠ দারুচিনি- এক ধরনের মসলা জাতীয় গাছ।
➠ বনানী- বন।
➠ নীরবতা- নির্জনতা।
➠ রণ- যুদ্ধ, লড়াই, মারামারি।
➠ রূঢ়- কঠিন, কঠোর।
➠ রৌদ্র- রোদে।
➠ মানুষের মতো- সংবেদনশীল মানবিক মানুষের মতো।
➠ আমরি- আমারই, নিজেই।
➠ পরিজন- পরিবারের লোক, আত্মীয়স্বজন।
➠ এই পথে- গভীর অসুখের পথে।
➠ ক্রমমুক্তি- ক্রমান্বয়ে মুক্তি, ধীরে ধীরে মুক্তি।
➠ শতাব্দী- ১০০ বছর।
➠ এ বাতাস- ধীরে ধীরে মুক্তির বাতাস।
➠ পরম- শ্রেষ্ঠ, দারুণ, চমৎকার।
➠ সূর্যকরোজ্জ্বল- সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল।
➠ নাবিক- নৌকা বা জাহাজের চালক।
➠ ঢের দূরে- অনেক দূরে।
➠ অন্তিম প্রভাতে- শেষ সকাল/ভোর।
➠ মানবজন্মের- মানুষরূপে জন্ম নেওয়া।
➠ সমুজ্জ্বল- বিশেষভাবে উজ্জ্বল, অতি উজ্জ্বল।
➠ শ্বাশত- চিরন্তন, চিরকালীলন।
➠ অনন্ত- যার কোনো শেষ নেই।
➠
সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ
বিকেলের নক্ষত্রের কাছে;
সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে
নির্জনতা আছে।- সুচেতনা নামে এক শুভ চেতনার কথাই এখানে বোঝানো হয়েছে। কবির কল্পনায়
দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এই চেতনার সবুজে বিরাজ করছে নির্জনতা। অর্থাৎ এই শুভ
চেতনা সর্বত্র বিস্তারিত, বিরাজমান নয়।
➠
এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা
সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।- সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি বহু যুদ্ধ-রক্তপাত-প্রাণহানী সংঘটিত হয়েছে এবং
এখনো হচ্ছে। তবে এই ধ্বংসাত্মক দিকটিই পৃথিবীর শেষ সত্য নয়।
➠
আজকে অনেক রূঢ় রৌদ্রে ঘুরে প্রাণ
পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো
ভালোবাসা দিতে গিয়ে তবু,
দেখেছি আমারি হাতে হয়ত নিহত
ভাই বোন বন্ধু পরিজন প’ড়ে আছে;- প্রেম, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও পৃথিবীতে অগণিত প্রাণহানি,
রক্তপাতের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ অনেক রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিয়েই পৌঁছাতে হয়
ভালোবাসার পরিণামে।
➠ এই পথে আলো জ্বেলে- এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;-
পৃথিবীব্যাপ্ত গভীর অসুখ বা বিপর্যয় থেকে মুক্তির পথই শুভ চেতনা। ইতিবাচক এ
চেতনার আলো প্রজ্বলনের মাধ্যমেই সকল বিপর্যয় থেকে পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি
ঘটবে।
➠
মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভালো হতো অনুভব ক’রে;
এসে যে গভীরতর লাভ হলো সে-সব বুঝেছি- ব্যক্তিক ও সামষ্টিক সংকট প্রত্যক্ষ করে পৃথিবীতে মানবরূপে জন্ম না
নেওয়াকে আপাতভাবে কাঙ্ক্ষিত মনে হলেও এই পৃথিবী ও শুভ চেতনা থেকে প্রাপ্তিই
শেখাবধি আমাদের গভীরভাবে প্রাণিত ও ঋণী করে।
➠ শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।- পৃথিবীব্যাপ্ত অন্ধকার
বা অশুভের অন্তরালেই আছে সূর্যোদয়, মুক্তির দিশা। সুচেতনার বিকাশেই এই
আলোকজ্জোল পৃথিবীর দেখা মিলবে, এটিই কবির বিশ্বাস।
‘সুচেতনা’ কবিতার পাঠ-পরিচিতি :
‘সুচেতনা’ জীবনানন্দ দাশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা। এ কবিতায় সুচেতনা
সম্বোধনে কবি তাঁর প্রার্থিত, আরাধ্য এক চেতনানিহিত বিশ্বাসকে শিল্পিত
করেছেন। কবির বিশ্বাসমতে, সুচেতনা দূরতম দ্বীপসদৃশ একটি ধারণা, যা পৃথিবীর
নির্জনতায়, যুদ্ধে, রক্তে নিঃশেষিত নয়। চেতনাগত এই সত্তা বর্তমান পৃথিবীর
গভীরতর ব্যাধিকে অতিক্রম করে সুস্থ ইহলৌকিক পৃথিবীর মানুষকে জীবন্ময় করে
রাখে। জীবন্মুক্তির এই চেতনাগত সত্যই পৃথিবীর ক্রমমুক্তির আলোকে প্রজ্বলিত
রাখবে, মানবসমাজের অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করবে। শাশ্বত রাত্রির বুকে অনন্ত
সূর্যোদয়কে প্রকাশ করবে।
‘সুচেতনা’ কবিতার কবি পরিচিতি :
আধুনিক বাংলা কাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশ। ১৮৯৯ সালের ১৭ই
ফেব্রুয়ারি তিনি বরিশালে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন বরিশাল
ব্রজমোহন স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন সেকালের
বিখ্যাত কবি। মায়ের কাছ থেকে তিনি কবিতা লেখার প্রেরণা লাভ করেছিলেন।
স্বল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন পেশা অবলম্বন করলেও মূলত ইংরেজি সাহিত্যের
অধ্যাপক হিসেবেই তিনি জীবন অতিবাহিত করেন। কবি জীবনানন্দ দাশ কবিতায়
সূক্ষ্ম ও গভীর অনুভবের এক জগৎ তৈরি করেন। বিশেষ করে গ্রামবাংলার নিসর্গের
যে ছবি তিনি এঁকেছেন, বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা চলে না। সেই নিসর্গের সঙ্গে
অনুভব ও বোধের বহুতর মাত্রা যুক্ত হয়ে তাঁর হাতে অনন্যসাধারণ কবিতাশিল্প
রচিত হয়েছে। এই অসাধারণ কাব্যবৈশিষ্ট্যকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘চিত্ররূপময়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এছাড়া ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা,
আধুনিক জীবনের বিচিত্র যন্ত্রণা ও হাহাকার এবং সর্বোপরি জীবন ও জগতের রহস্য
ও মাহাত্ম্য সন্ধানে তিনি এক অপ্রতিম কবিভাষা সৃষ্টি করেছেন। বুদ্ধদেব বসু
তাঁকে আখ্যায়িত করেছেন ‘নির্জনতম কবি’ বলে। উপমা, চিত্রকল্প, প্রতীক
সৃজন, আলো-আঁধারের ব্যবহার, রঙের ব্যবহার এবং অনুভবের বিচিত্র মাত্রার
ব্যবহারে তাঁর কবিতা লাভ করেছে অসাধারণত্ব। তাঁর নিসর্গবিষয়ক কবিতা বাঙালির
জাতিসত্তা বিকাশের আন্দোলনে ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সংগ্রামী
জনতাকে তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক হিসেবেও
বাংলা সাহিত্যে তাঁর বিশেষ স্থান রয়েছে। জীবনানন্দের উল্লেখযোগ্য
কাব্যগ্রন্থ
‘ঝরা পালক’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘বেলা অবেলা
কালবেলা’, ‘রূপসী বাংলা’। ‘কবিতার কথা’ তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ এবং
‘মাল্যবান’ ও ‘সুতীর্থ’ তাঁর বিখ্যাত দুইটি উপন্যাস।
জীবনানন্দ দাশ ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে অক্টোবর কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায়
আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
‘সুচেতনা’ কবিতার বহুনির্বাচনি প্রশ্ন :
প্রশ্ন থেকে
অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন
-এর মধ্যে!
যা
সুচেতনা কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন :
‘সুচেতনা’ কবিতার অনুধাবনমূলক প্রশ্ন :
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই - প্রীতি নেই-
করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব'লে মনে হয়
মহত্ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।
[উৎস: অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ - জীবনানন্দ দাশ]
ক. ‘সুচেতনা’ কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে চয়ন করা
হয়েছে?
খ. ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’ - উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকটিতে ‘সুচেতনা’ কবিতাটির কোন দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে? ব্যাখ্যা
করো।
ঘ. ‘উদ্দীপকটিতে ‘সুচেতনা’ কবিতার সমগ্র দিক উন্মোচিত হয়নি।’- উক্তিটি
মূল্যায়ন করো।
ক. ‘সুচেতনা’ কবিতাটি জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থ থেকে চয়ন
করা হয়েছে।
খ. ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’ - উক্তিটিতে কবির সমসাময়িককালে
পৃথিবীতে বিরাজমান ধ্বংসোন্মুখ অবস্থার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে।
➠ মানবপ্রেমী কবি তাঁর সমকালীন পৃথিবীতে মানুষে মানুষে বিরাজমান
অসহিষ্ণুতার ভয়ংকর রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন। অগণিত প্রাণহানি, রক্তপাতের
ঘটনা তাঁকে মর্মাহত করেছে। এই ধ্বংসাত্মক রূপকে তিনি পৃথিবীর ‘গভীর
গভীরতর অসুখ' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; যার পরিসমাপ্তিই কবির একমাত্র
প্রত্যাশা।
গ. উদ্দীপকটিতে ‘সুচেতনা’ কবিতায় বর্ণিত পৃথিবীতে বিদ্যমান অশুভ চেতনার
দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতাটিতে কবি অশুভ চেতনার স্থলে শুভ চেতনার প্রত্যাশা
ব্যক্ত করেছেন। কবি প্রত্যক্ষ করেছেন পৃথিবীতে অন্ধকার তথা অশুভ শক্তির
ভয়ংকর বিস্তার। স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষ লিপ্ত, ভালোবাসার পরিণামে
পৌছাতে স্বীকার করতে হয় বহু আত্মত্যাগ। পৃথিবীব্যাপ্ত এ গভীর অসুখ বা
বিপর্যয় থেকে মানুষের মুক্তি প্রয়োজন। আর একমাত্র শুভচেতনার আলো
প্রজ্বালনের মাধ্যমেই তা সম্ভব।
➠ উদ্দীপকের কবিতাংশে পৃথিবীব্যাপী অশুভ শক্তির প্রতাপ পরিলক্ষিত হয়।
সমাজের সর্বস্তরে অযোগ্য দুশ্চরিত্র লোকেরাই সর্বেসর্বা। পক্ষান্তরে
জ্ঞানী-গুণীরা অবহেলিত। পৃথিবীর বৈষম্যময় সমাজব্যবস্থাই মূলত এর জন্য
দায়ী। ‘সুচেতনা’ কবিতার বিষয়বস্তুতেও আমরা পৃথিবীতে এমন অশুভ শক্তির
বিস্তার লক্ষ করি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, উদ্দীপকটিতে আলোচ্য কবিতায় বর্ণিত
পৃথিবীতে বিদ্যমান অশুভ চেতনার দিকটিই প্রতিফলিত হয়েছে।
ঘ. উদ্দীপকে কেবল পৃথিবীব্যাপী অশুভ শক্তির বিস্তারের বিষয়টি উঠে এলেও
‘সুচেতনা' কবিতার আশাবাদের দিকটি উন্মোচিত হয়নি।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতাটিতে কবি তাঁর প্রার্থিত, আরাধ্য এক চেতনানিহিত
বিশ্বাসকে শিল্পিত করেছেন। যে চেতনা পৃথিবীতে বিরাজিত সকল অন্যায়, অনিয়ম,
যুদ্ধ, মৃত্যুসহ যাবতীয় গভীরতর ব্যাধিকে অতিক্রম করে সুস্থ ইহলৌকিক
পৃথিবীর মানুষকে জীবন্ময় করে রাখবে। কবির মতে, জীবমুক্তির এই চেতনাগত
সত্যই পৃথিবীতে ক্রমমুক্তির আলোকে প্রজ্জ্বালিত রাখবে, মানবসমাজের
অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করবে। ইতিবাচক এ আলো প্রজ্বালনের মাধ্যমেই সকল অশুভ
শক্তি থেকে পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি ঘটবে বলে তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত
করেছেন।
➠ উদ্দীপকে পৃথিবীতে এক অদ্ভুত আঁধারের বিস্তার দেখানো হয়েছে। যে আঁধারে
অযোগ্যরাই যোগ্যতর হিসেবে মর্যাদা লাভ করে আর যোগ্য ব্যক্তিরা হয়
অবমূল্যায়িত। পৃথিবী যেন আজ অযোগ্য মানুয়দের পরামর্শ ও নেতৃত্বেই চলছে।
যোগ্য, জ্ঞানী, মহৎ মানুষদের মর্যাদা আজ নেই। উদ্দীপকের মতো সামাজিক
সংকটের প্রতিচ্ছবি ‘সুচেতনা’ কবিতায়ও বিদ্যমান। তবে কবিতায় এ সংকট
উত্তরণে মুক্তির পথের দিশারও অনুসন্ধান করা হয়েছে।
➠ উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতার বিষয়বস্তু পর্যালোচনা শেষে বলা যায়,
উদ্দীপকে কেবল পৃথিবীতে বিরাজমান অশুভ শক্তির প্রভাবের দিকটি প্রকাশ
পেয়েছে, যা ‘সুচেতনা’ কবিতার একটি মাত্র দিক। ‘সুচেতনা’ কবিতায় এ বিষয়টি
ছাড়া আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ের সমাবেশ ঘটেছে। অশুভ শক্তির স্থলে শুভশক্তির
বা শুভচেতনার বিজয় কবিতাটিতে তাৎপর্যপূর্ণ রূপ লাভ করেছে। ইতিবাচক এ
চেতনার মাধ্যমেই সকল বিপর্যয় থেকে পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি ঘটবে— এমন
আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, যা উদ্দীপকে অনুপস্থিত। তাই বলা যায়,
“উদ্দীপকটিতে ‘সুচেতনা’ কবিতার সমগ্র দিক উন্মোচিত হয়নি।”— উক্তিটি
যথার্থ।
ক. জীবনানন্দ দাশের কোন ধরনের কবিতা মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামী জনতাকে
অনুপ্রাণিত করেছিল?
খ. ‘ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিক’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতার কোন দিককে নির্দেশ করেছে? ব্যাখ্যা
করো।
ঘ. ‘কবিতায় সমকালীন জীবন যন্ত্রণার উন্মোচনে জীবনানন্দ দাশ সিদ্ধহস্ত।’ -
‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপকের আলোকে মন্তব্যটির যথার্থতা নির্ণয় করো।
ক. জীবনানন্দ দাশের নিসর্গবিষয়ক কবিতা মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামী জনতাকে
অনুপ্রাণিত করেছিল।
খ. একটি সুন্দর মানবসমাজ নির্মাণে যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত
হয়েও অক্লান্তভাবে চেষ্টা করে যান, তাঁদের বোঝাতে কবি ‘ক্লান্ত
ক্লান্তিহীন নাবিক’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন।
➠ কবি জানেন পৃথিবীর ক্রমমুক্তির মাধ্যমে একটি ভালো মানবসমাজ নির্মাণ
অত্যন্ত কঠিন কাজ। তার জন্য সামষ্টিক মানুষের সুচেতনার উজ্জীবন ও দীর্ঘ
সময়ব্যাপী সাধনার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু কবি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীতে এমন
কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হলেও নিরলস শ্রম ও
মেধা দিয়ে যাবেন একটি মানবিক সমাজ নির্মাণে। কবি শ্রদ্ধার সঙ্গে এমন
মানুষগুলোকে বিশেষিত করেছেন 'ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিক' শব্দবন্ধে।
গ. উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতায় উল্লিখিত অসুস্থ পৃথিবীর ধ্বংস ও ভাঙনের
দিককে নির্দেশ করেছে। ‘সুচেতনা’ কবিতায় চূড়ান্ত পরিণামে আশাবাদী হলেও কবি
সমকালীন সভ্যতার সংকটকে চিহ্নিত করেছেন সাবলীলভাবে। কবির মনে হয়েছে
রণ-রক্ত-সফলতা নিয়ে ব্যস্ত যে নাগরিক ও আধুনিক সমাজ সেখানে সুচেতনা এখনো
দূরবর্তী দ্বীপের মতোই দুর্লভ। সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি ঘটছে বহু
যুদ্ধ-রক্তপাত-প্রাণহানি। প্রেম, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও
পৃথিবীতে স্বজন হননের মতো ঘটনা ঘটছে। এমন ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি বিবেচনা
কবির অনুভব, 'পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন'। উদ্দীপকের কবিতাংশে কবি
‘সুচেতনা’ কবিতার মতো সমকালীন সংকটকে উপস্থাপন করেছেন। উদ্দীপকের প্রথম
চরণে কবি মানুষের সভ্যতার মর্মে বা চেতনায় ক্লান্তি অনুভব করেছেন।
দ্বিতীয় চরণে সভ্যতা যেসব বড়ো বড়ো নগরী সৃষ্টি করেছে, কবি তার মাঝে অনুভব
করেছেন বুকভরা ব্যথা। উদ্দীপকে বর্ণিত সভ্যতা ও শহরের এমন ক্লান্তি ও
ব্যথা নিঃসন্দেহে বিপর্যস্ত পৃথিবীর তীব্র সংকটের প্রতিচ্ছবি, যা
‘সুচেতনা’ কবিতার অসুস্থ পৃথিবীর ধ্বংস ও ভাঙনের দিককে নির্দেশ করে।
ঘ. উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা' কবিতা উভয়ক্ষেত্রেই সমকালীন সমাজ-সংকট প্রত্যক্ষ
করে কবিহৃদয়ের রক্তক্ষরণের পরিচয় পাওয়া যায়।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ শিল্পঋদ্ধ ভাষায় সভ্যতার সমকালীন
সংকটকে প্রকাশ করেছেন। সভ্যতার ধ্বংসোমূখ আচরণ, মারণপ্রবণতা, অসার
অর্থলিপ্সার গ্লানি কবিকে বিমূঢ় করে দিয়েছে বারবার। কবির চোখে বর্তমানে
সুচেতনা যেন অবস্থান নিয়েছে। দূরতর দ্বীপের নির্জনতায়। কবি প্রত্যক্ষ
করেছেন, প্রেম, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও পৃথিবীতে স্বজন হননের
মতো স্বারে ঘটছে। ফলে সমকালীন জীবন যন্ত্রণায় দগ্ধ কবির অনুভব, ‘পৃথিবীর
গভীর গভীরতর অসুখ এখন।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতার মতো উদ্দীপকে বর্ণিত কবিতাংশের কবিও জীবনানন্দ দাশ।
'মিতভাষণ' কবিতার এই অংশটুকুতে আছে কবির অসামান্য শিল্পবোধের পরিচয়।
উদ্দীপকের প্রথম চরণে কবি সমকালীন টানাপোড়নে পিষ্ট মানুষের এবং সভ্যতার
মর্মের ক্লান্তির বং শোনান আমাদের। আর দ্বিতীয় চরণে মানবসভ্যতার অসামান্য
সৃষ্টি নগরের বুকে যে ব্যথার দ্যোতনা সৃষ্টি হয়েছে তা কয়েকটি শব্দের
সুনিপুণ ব্যবহারে পাঠককে জানিয়ে দেন। আলোচ্য কবিতায়ও একইভাবে সভ্যতার এমন
সংকটাপন্ন দশার চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে।" উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতা
সম্পর্কিত উপর্যুক্ত আলোচনায় আমরা দেখলাম, উভয়ক্ষেত্রেই কবি জীবনানন্দ
দাশ সমকালীন সমাজ সভ্যতা, ও মানুষের যন্ত্রণার কথা বলেছেন। মানুষ সেখানে
সফলতা-বিফলতার অর্থহীন টানাপোড়নে দগ্ধ। মানুষের জীবনযন্ত্রণা সভ্যতা ও
নগরীকেও ক্লিষ্ট করে তুলেছে।
➠ আর এসব বর্ণনায় কবি যে শিল্পঋদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন তা অসামান্য। তাই
‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপকের আলোকে বলা যায়, 'কবিতায় সমকালীন
জীবনযন্ত্রণার উন্মোচনে জীবনানন্দ দাশ সিদ্ধহস্ত।'- মন্তব্যটি যথার্থ।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৩:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা আমি বাঁধি তার ঘর,
আপন করিতে কাদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।
যে মোরে করিল পথের বিবাগী—
পথে পথে আমি ফিরি তার লাগি,
দীঘল রজনী তার তরে জাগি' ঘুম যে হয়েছে মোর।
ক. কবি বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ দাশকে কী বলে অভিহিত করেছেন?
খ. ‘এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য, তবুও শেষ সত্য নয়।’ ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের কবিতাংশে ‘সুচেতনা’ কবিতার কোন বিষয়টি ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা
করো।
ঘ. ‘উদ্দীপকের কবিতাংশ ও ‘সুচেতনা’ কবিতার কবিদ্বয়ের প্রত্যাশা মূলত
অভিন্ন।’ - বিশ্লেষণ করো।
ক. কবি বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ দাশকে নির্জনতম কবি বলে অভিহিত করেছেন।
খ. সভ্যতার ধ্বংসাত্মক দিকগুলোকে স্বীকার করলেও একেই শেষ সত্য বলে না
মানার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে প্রশ্নোক্ত চরণে।
➠ মানুষের জীবনের বিফলতা ও সফলতার দ্বন্দ্ব অতীতেও ছিল এখনো আছে। সভ্যতার
বিকাশের পাশাপাশি বহু যুদ্ধ-রক্তপাত-প্রাণহানি সংঘটিত হয়েছে এবং এখনো
হচ্ছে। কিন্তু একে শেষ সত্য হিসেবে মেনে নিলে মানুষ গভীর হতাশায় নিমজ্জিত
হবে এবং সমাজের কল্যাণসাধন বাধাগ্রস্থ হবে। সভ্যতার এই ধ্বংসাত্মক দিককে
পৃথিবীর শেষ সত্য বলে মানতে পারছেন না আশাবাদী কবি। আর তাই তিনি বলেছেন,
এই পৃথিবীর রণ-রক্ত-সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।
গ. উদ্দীপকের কবিতাংশে হিংসা-বিদ্বেষের বিপরীতে ভালোবাসার জয়গান গাওয়া
হয়েছে, যা ‘সুচেতনা’ কবিতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি তাঁর প্রার্থিত ও আরাধ্য এক চেতনাকে শিল্পিত রূপ
দিয়েছেন। কবির বিশ্বাসমতে, সুচেতনা দূরতম নির্জন দ্বীপসদৃশ একটি ধারণা,
যা পৃথিবীর ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের বিপরীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
আর এই চেতনাগত সত্যই পৃথিবীর ক্রমমুক্তির আলোকে প্রজ্বলিত রাখবে,
মানবসমাজের অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করবে।
➠ উদ্দীপকের কবি নেতিবাচক সম্ভার বিপরীতে ইতিবাচক উদার সত্তার পরিচয়
দিয়েছেন। যে নেতিবাচক পাষাণ সত্তা তাঁর ঘর ভেঙেছে কবি তার ঘরই বেঁধে
দিয়েছেন। যে কবিকে পথের বিবাগী করেছে করি তাকে ফিরিয়ে আনতে পথে পথে
ঘুরেছেন। যার জন্য কবির ঘুম নষ্ট হয়েছে কবি তার মঙ্গলের জন্যই রাতের পর
রাত জেগে থেকেছেন। এমনই শুভচেতনার প্রকাশ লক্ষ করা যায় ‘সুচেতনা’ কবিতায়।
এখানেও কবি ভালবাসাপূর্ণ পৃথিবী প্রতিষ্ঠায় আশাবাদী। তিনি মনে করেন,
পৃথিবীর ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ই শেষ সত্য নয়। থাকবেই। কিন্তু রক্তাক্ত পথ
পাড়ি দিয়েই পৌঁছাতে হয় ভালোবাসার পরিণামে। সুতরাং কেননা যেকোনো মহৎ কাজে
যুদ্ধ-রক্ত-প্রাণহানি উদ্দীপকের কবিতাংশে ‘সুচেতনা’ কবিতার হিংসার
বিপরীতে প্রেম, প্রীতি ও ভালোবাসার দিকটি ফুটে উঠেছে।
ঘ. উদ্দীপক ও সুচেতনা' কবিতার কবিষয়ের একমাত্র কামনা ভালোবাসাপূর্ণ
পৃথিবী গড়ে তোলা।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি সুচেতনা নামক এক মহান অনুভূতির কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি মনে করেন, পৃথিবীব্যাপ্ত গভার অসুখ বা বিপর্যয় থেকে মুক্তির প্রথই
শুভচেতনা। ইতিবাচক এ চেতনার আলো প্রজ্বালনের মাধ্যমেই সকল বিপর্যয় থেকে
পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি ঘটবে। এক সময় কবি সমস্যাসংকুল এ পৃথিবীতে জন্ম
নেওয়াকেই অনাকাঙ্ক্ষিত মনে করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই পৃথিবী ও
শুভচেতনা থেকে প্রান্তি তাঁকে গভীরভাবে প্রাণিত করেছে।
➠ উদীপকে মানবতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে। কবি তাঁর শত্রুকে ক্ষমা
করেই ক্ষান্ত হননি, বরং শত্রুতার প্রতিদানস্বরূপ তার উপকারে মনোনিবেশ
করেছেন। যে তাঁকে ঘরছাড়া করেছে কবি তার ঘরই গড়ে দিয়েছেন। আবার যার কারণে
তাঁকে পথের বিবাগী হতে হয়েছে, তাকেই তিনি পথে পথে খুঁজে ফিরেছেন।
সুচেতনা' কবিতাতেও আমরা এমনই এক চেতনার সাক্ষাৎ পাই যা পৃথিবীতে শান্তি
প্রতিষ্ঠার মন্ত্রে উজ্জীবিত।
➠ উদ্দীপকের কবি তাঁর শত্রুর উপকার করার মাধ্যমে সমাজে শান্তি আনতে
চেয়েছেন। কেননা তিনি মনে করেছেন, এই পথ ধরেই আমাদের মধ্যে বিরোধ দূর করা
সম্ভব। তিনি তাই সামাজিক সুখ-শান্তি আনয়ন করতে আত্মত্যাগের মহান পথকেই
বেছে নিয়েছেন। ‘সুচেতনা’ কবিতার কবির ভাবনাতেও একই চেতনা ক্রিয়াশীল হয়ে
উঠেছে। তিনিও মনে করেন, প্রেম, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও
পৃথিবীতে অগণিত প্রাণহানি, রক্তপাতের ঘটনা ঘটে। আর এই রক্তাক্ত পথ পাড়ি
দিয়েই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। সুতরাং ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে
পৃথিবীতে শান্তি আনয়নে উভয় কবির প্রত্যাশা এক ও অভিন্ন।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৪:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরবর্তী রামান্নার একটি গ্রামে এক নারী
ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে ব্যবহৃত গ্রেনেডের খোলস ব্যবহার আয়ে তা দিয়ে ফুল
চাষ করে সালিয়ে তুলেছেন নিজের বাগান। এ যেন যুদ্ধের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে এক
অভিনব প্রতিবাদ। যে প্রানের যুদ্ধে কেবল শত্রুকে ধ্বংস করতে ব্যবহার করা
হয়, সেই গ্রেনেডের খোলসে ফুলের চাষ যেন অস্ত্র, রক্ত আর ক্ষমতার দাপটে
গড়ে ওঠা আধুনিক বিশ্বের ভয়াবহতার মুখে চপেটাঘাত। আর সেই আঘাত যেন যুদ্ধের
বদলে ভালোবাসার প্রকাশ।
ক. কুসুমকুমারী দাশ কী হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন?
খ. ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি নির্জনতা প্রত্যাশা করেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকের নারীর সাথে ‘সুচেতনা’ কবিতার কবির চেতনাগত সাদৃশ্য তুলে
ধরো।
ঘ. ‘উদ্দীপকের নারীর প্রচেষ্টা ও ‘সুচেতনা' কবিতার কবির ভাবনা সমসূত্রে
গ্রথিত।’- মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।
ক. কুসুমকুমারী দাশ কবি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন।
খ. প্রাকৃতিক শান্তি ও নির্জনতায় শুভচেতনা বিরাজিত বলে কবি ‘সুচেতনা'
কবিতায় নির্জনতা প্রত্যাশা করেছেন।
➠ সভ্যতার রক্তক্ষয়ী হানাহানি, মারণপ্রবণতা, সফলতা-বিফলতার দ্বন্দ্ব
কবিকে বিমূঢ় করে দিয়েছে। তিনি অনুভব করেছেন পৃথিবীর গভীরতর অসুস্থতা।
পৃথিবীকে অসুস্থতা থেকে মুক্ত করতে প্রয়োজন শুভচেতনার আলোকিত পথ। কবির
বিশ্বাস নগরের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনে সুচেতনার অস্তিত্ব নেই। সুচেতনা
বিরাজিত প্রাকৃতিক শান্তি ও নির্জনতায়। তাই ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি
নির্জনতা প্রত্যাশা করেছেন।
গ. কল্যাণময় পৃথিবী প্রত্যাশার দিক থেকে উদ্দীপকের নারী এবং ‘সুচেতনা’
কবিতার কবির চেতনা সাদৃশ্যপূর্ণ।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি তাঁর প্রার্থিত ও আরাধ্য এক চেতনানিহিত বিশ্বাসকে
আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, পৃথিবীব্যাপ্ত গভীর অসুখ বা বিপর্যয়
থেকে মুক্তির পথই শুভচেতনা। ইতিবাচক এ চেতনার আলো প্রজ্বালনের মাধ্যমে
সকল বিপর্যয় থেকে পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি ঘটবে— এটাই কবির বিশ্বাস।
➠ উদ্দীপকে উল্লিখিত নারী যুদ্ধ ও হানাহানির বিপরীতে অবস্থান নিয়ে
সৌন্দর্য ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তিনি যুদ্ধে ব্যবহৃত
গ্রেনেডের খোলসে ফুল চাষ করে সাজিয়ে তুলেছেন তাঁর বাগান। এর মাধ্যমে তাঁর
মধ্যে যুদ্ধবিরোধী চেতনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। এ নারী চরিত্রের
মাধ্যমে মূলত যুদ্ধের ভয়াবহতার বিপরীতে ভালোবাসার জয়গানকে উপস্থাপন
করেছেন। পৃথিবীতে মানুষে-মানুষে যে রেষারেষি-বিবাদ, তার বিপরীত চিত্র উঠে
এসেছে উদ্দীপকের নারীর চরিত্রে। ফলে ভালোবাসাপূর্ণ পৃথিবী প্রতিষ্ঠার
প্রত্যাশার দিক দিয়ে উদ্দীপকের নারীর মানসিকতার সাথে ‘সুচেতনা’ কবিতার
কবির চেতনাগত সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছে।
ঘ. ভালোবাসাপূর্ণ পৃথিবী প্রতিষ্ঠার অনুপম প্রত্যয় স্থাপন করার দিক দিয়ে
উদ্দীপকের নারীর প্রচেষ্টা ‘সুচেতনা’ কবিতার কবির ভাবনার মধ্যে সমসূত্রে
প্রথিত।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি মানবিক সমাজ গড়ার শুভচেতনার কথাই আমাদের বোঝাতে
চেয়েছেন। কবির মতে, সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি বহু
যুদ্ধ-রক্তপাত-প্রাণহানি সংঘটিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তবে এই ধ্বংসাত্মক
কর্মকা-ই পৃথিবীর শেষ সত্য নয়। তিনি মনে করেন, পৃথিবীতে প্রেম, সত্য ও
কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য এমন প্রাণহানি ঘটতেই পারে। তবে এ পথ পাড়ি দিয়েই
আমরা একদিন সুচেতনার আলোর সাহায্যে ভালোবাসাপূর্ণ জগতে পৌঁছতে পারব।
➠ উদ্দীপকে উল্লিখিত নারী ভালোবাসাপূর্ণ পৃথিবীর প্রত্যাশায় যুদ্ধে
ব্যবহৃত গ্রেনেডের খোলসে ফুল চাষ করে তৈরি করেছেন বাগান। অশান্তির উপকরণে
তিনি সাজিয়ে তুলেছেন শান্তির বেদি। যুদ্ধ ও রক্তের বিনিময়ে গড়ে ওঠা
‘আধুনিক বিশ্বের’ মুখে এ যেন প্রচন্ড প্টোঘাত। সুচেতনা' কবিতায় এই ভাবটিই
স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়েছে।
➠ উদীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতার আলোচনা থেকে বলা যায়, উভয়ক্ষেত্রে গুরুত্ব
পেয়েছে হানাহানির বিপরীতে ভালোবাসার পক্ষে অবস্থান। দুর্ব উদ্দীপকের
নারীর মতো কবিরও প্রত্যাশা শান্তিপূর্ণ পৃথিবী। উদ্দীপকের নারী এবং
‘সুচেতনা’ কবিতার কবি দুজনেই পৃথিবীতে মানবিকতার জয়গানের প্রত্যাশী। আর
সকল অশান্তির বিরুদ্ধে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সুচেতনার আলো প্রজ্বালনের
মাধ্যমেই পৃথিবীর মানুষের মুক্তি পৃথিবী প্রতিষ্ঠার অনুপম প্রয়াসের দিক
দিয়ে উদ্দীপকের নারী ও ‘সুচেতনা’ কবিতার কবির ভাবনা সমসূত্রে প্রথিত।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৫:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
হিংসা মেষ রহিবে না কেহ কারে করিবে না ঘৃণা
পরস্পর বাঁধি দিব প্রীতির বন্ধনে
বিশ্বজুড়ে এক সুরে বাজিবে গো মিলনের বীণা
মানব জাগিবে নব জীবন স্পন্দনে।
ক. যুদ্ধে রক্তে নিঃশেষিত নয় কী?
খ. ‘মাটি পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি’ - চরণটি ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের সঙ্গে ‘সুচেতনা’ কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা
করো।
ঘ. উদ্দীপকটি কী ‘সুচেতনা’ কবিতার সমগ্রভাবকে ধারণ করতে পেরেছে? তোমার
উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করো।
ক. যুদ্ধে রক্তে নিঃশেষিত নয় সুচেতনা।
খ. ‘মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি— চরণটিতে কবির ইহজাগতিক
বোধ ও পৃথিবীর প্রতি দায়বন্ধতার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে।
➠ জীবনের অপার ক্লান্তির মাঝেও ক্লান্তিহীন কাজের মাধ্যমে কবি একটি ভালো
মানবসমাজ নির্মাণ করতে চান। সেই আকাঙ্ক্ষায় মাটি ও পৃথিবীর টানে যেন তিনি
পৃথিবীতে মানবরূপ লাভ করেছেন। ব্যক্তিক ও সামষ্টিক সংকট প্রত্যক্ষ করে
হয়তো চকিতে কবি মানবজন্ম লাভে অর্থহীনতায়। কথা বলেছেন তবুও বলা যায়, মাটি
ও পৃথিবীর প্রতি দায়বদ্ধতার কারণেই তাঁর পৃথিবীতে আসা। কবি অন্তত তা-ই
মনে করেন।
গ. উদ্দীপকের কবিতাংশে ‘সুচেতনা’ কবিতায় ফুটে ওঠা শুভচেতনার ভাবটি
প্রতিফলিত হয়েছে।
➠ আলোচ্য কবিতায় সুচেতনা সম্বোধনে কবি তাঁর প্রার্থিত, আরাধ্য এক
চেতনানিহিত বিশ্বাসকে শিল্পিত করেছেন। কবির বিশ্বাস মতে, সুচেতনা দূরতম
দ্বীপসদৃশ একটি ধারণা, যা পৃথিবীর নির্জনতায়, যুদ্ধে, রক্তে নিঃশেষিত নয়।
চেতনাগত এই সত্তা বর্তমান পৃথিবীর গভীরতর ব্যাধিকে অতিক্রম করে সুস্থ
ইহলৌকিক পৃথিবীর মানুষকে জীবন্ময় করে রাখে।
➠ উদ্দীপকের কবিতাংশে মানবপ্রেম তথা ভালোবাসার মাধ্যমেই যে সমাজে শান্তি
প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব সেই দিকটিই প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে কেউ কাউকে ঘৃণা
করবে না। সকলে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ভালোবাসাপূর্ণ একটি সমাজ
প্রতিষ্ঠা করবে। 'সুচেতনা কবিতায়ও কবি মানুষের মাঝে শুভচেতনার জাগরণের
মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তি চেয়েছেন। যে চেতনা জাগ্রত হলে পৃথিবী হয়ে উঠবে।
ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। কবি মনে করেন, পৃথিবীতে যে যুদ্ধ-রক্তপাত-প্রাণহানি
ঘটছে, এই ধ্বংসাত্মক দিকটিই শেষ সত্য নয়, মানুষ এসব অতিক্রম করে একদিন
ভালোবাসাপূর্ণ মানৰিক পৃথিবী প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে। অর্থাৎ উদ্দীপক এবং
‘সুচেতনা’ কবিতা উভয়ক্ষেত্রে শুভচেতনার জয়গান করা হয়েছে।
ঘ. উদ্দীপকের কবিতাংশে ভালোবাসাপূর্ণ পৃথিবী প্রতিষ্ঠার দিকটি ফুটে
উঠেছে, যা ‘সুচেতনা’ কবিতার মূলভাবেরই ধারক।
➠ ‘সুচেতনা' কবিতায় সুন্দর পৃথিবী নির্মাণের শুভচেতনার কথা কবি তুলে
ধরেছেন। কবির কল্পনায় এই চেতনা দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এবং সেখানে বিরাজ
করে নির্জনতা। অর্থাৎ কবি মনে করেন, এই চেতনা সর্বত্র বিস্তারিত হলেও
বিরাজমান নয়। কবি সংঘাতময় পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকলের মাঝে এই
চেতনার জাগরণ প্রত্যাশা করেছেন।
➠ উদ্দীপকে মানবপ্রেম বা ভালোবাসা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা
ব্যক্ত করেছেন কবি। তিনি এমন সমাজের প্রত্যাশী যেখানে কারো মধ্যে কোনো
হিংসা-দ্বেষ থাকবে না, কেউ কাউকে ঘৃণা করবে না, সবাই সম্প্রীতির বন্ধনে
আবদ্ধ থাকবে। যার ফলে পৃথিব জুড়ে কেবল মিলনের সুর ধ্বনিত হবে। মানুষের
জীবনে আসবে এক নতুন জাগরণ। ‘সুচেতনা’ কবিতার কবির ভাবনার মধ্যেও এই
দিকটির প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
➠ ‘সুচেতনা' কবিতায় কবি সাময়িক সময়ের জন্য দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় পৃথিবীতে
ব্যক্তিক ও সামষ্টিক সংকট প্রত্যক্ষ করে জন্ম নেওয়াকেই অনাকাঙ্ক্ষিত মনে
করেছিলেন। আবার, এই পৃথিবী ও শুভচেতনা থেকে প্রাপ্তি তাঁর কাছে অসামান্য
মনে হয়েছে। তিনি বিচার করে দেখেছেন প্রেম, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে
গিয়েও পৃথিবীতে অগণিত প্রাণহানি, রক্তপাতের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ অনেক
রক্তপাতের পথ পাড়ি দিয়েই পৌছাতে হয় ভালোবাসার স্বর্ণদ্বীপে। কবির
প্রত্যাশা, সুচেতনার বিকাশেই আলোকোজ্জ্বল পৃথিবীর দেখা মিলবে উদ্দীপকের
কবিতাংশেও উঠে এসেছে প্রীতির বন্ধনের গুরুত্ব। প্রীতির বন্ধন থাকলে মানুষ
কখনো একে-অপরের ক্ষতি করতে পারবে না; মানুষের মাঝে আর কোনো হিংসা-বিদ্বেষ
থাকবে না। আলোচ্য কবিতার কবিও পৃথিবীতে যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তা বন্ধ করতে
ভালোবাসারূপ শুভচেতনার প্রত্যাশা করেছেন। এদিক বিবেচনায় উদ্দীপকটি
‘সুচেতনা’ কবিতার মূলভাবেরই ধারক হয়ে উঠেছে।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৬:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
একটি পৃথিবী নষ্ট হয়ে গেছে আমাদের আগে;
আরেকটি পৃথিবীর দাবি
স্থির করে নিতে হলে লাগে
সকালের আকাশের মতন বয়স;
সে-সকাল কখনো আসে না ঘোর, দ্বধর্মনি‘রাত্রি বিনে।
ক. কবি জীবনানন্দ দাশ কীভাবে মৃত্যুবরণ করেন?
খ. ‘এই পথে আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে’ - বলতে কবি কী
বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকটি ‘সূচেতনা’ কবিতার কোন দিকটিকে নির্দেশ করে?- আলোচনা করো।
ঘ. সামষ্টিক মানুষের দীর্ঘকালের সাধনার দ্বারাই কেবল পৃথিবীর সত্যিকার
কল্যাণ প্রত্যাশা করা যায়। উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতার আলোকে মন্তব্যটি
বিচার করো।
ক. কবি জীবনানন্দ দাশ ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।
খ. ‘এই পথে আলো জ্বেলে’- এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে।'— বলতে কবি
বুঝিয়েছেন, শুভ, কল্যাণ ও মঙ্গলচিন্তার আলোকিত পথে পৃথিবীর ক্রমমুক্তি
হবে।
➠ অর্থ-ক্ষমতা-আধিপত্যকামী সভ্যতায় স্বার্থমগ্ন মানুষ সুচেতনা থেকে দূরে
অবস্থিত। সফলতা-বিফলতার দ্বন্দ্বে পৃথিবী আজ অসুস্থ—গভীর গভীরতর অসুখ
তার। তবু কবি বিশ্বাস করেন ধ্বংস ও ভাঙনের শক্তিগুলো প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছে নতুন পৃথিবী সৃজনে। প্রগতিশীল মানুষদের
নিরন্তর প্রয়াসে একদিন পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে। আর পৃথিবীর সেই মুক্তি
হবে— শুভ, কল্যাণ ও মঙ্গলচিন্তার আলোকিত পথে।
গ. উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতার অসুস্থ পৃথিবীর ক্রমমুক্তির এবং একটি ভালো
মানবসমাজ নির্মাণের বিষয়টিকে নির্দেশ করে।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় আমরা দেখি, সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি বহু
যুদ্ধ-রক্তপাত-প্রাণহানি সংঘটিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। ভালোবাসার পরিণামে
পৌঁছাতেও পাড়ি দিতে হয় রক্তাক্ত পথ। কবির ভাষায়, পৃথিবীর গভীর গভীরতর
অসুখ এখন। কিন্তু কবি পৃথিবীর ক্রমমুক্তি এবং ভালো মানবসমাজ প্রতিষ্ঠায়
আশাবাদী। তবে তিনি জানেন, মঙ্গলচিন্তার আলোকিত পথে সামষ্টিক মানুষের
দীর্ঘকালের সাধনার মাধ্যমেই কেবল পৃথিবীর ক্রমমুক্তি নিশ্চিত করে ভালো
মানবসমাজ গঠন করা সম্ভব।
➠ কবিতার মতো উদ্দীপকেও পৃথিবীর, সভ্যতার অস্থিরতার বিষয়ে ইঙ্গিত করা
হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘একটি পৃথিবী নষ্ট হয়ে গেছে আমাদের আগে।’ এ কথাটি
‘সুচেতনা’ কবিতার– ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’ চরণটিকে স্মরণ করিয়ে
দেয়। তবে ‘সুচেতনা’ কবিতায় যেমন অসুস্থ পৃথিবীর ক্রমমুক্তির আশা ব্যক্ত
হয়েছে, উদ্দীপকেও তেমনি নতুন পৃথিবী নির্মাণে আশা বর্তমান। 'সুচেতনা’
কবিতায় মঙ্গলচিন্তার আলোকিত পথে সামষ্টিক মানুষের প্রয়াসের দিকে
গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তেমনি উদ্দীপকেও বলা হয়েছে, আরেকটি পৃথিবীর দাবি
স্থির করে নিতে হলে লাগে সকালের আকাশের মতন বয়স। অর্থাৎ পৃথিবীর ইতিবাচক
পরিবর্তন সাধনে প্রয়োজন সমষ্টিক মানুষের বহুকালের সাধনা।
ঘ. উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতা উভয়ক্ষেত্রেই পৃথিবীর উন্নয়নে মানব সমাজের
সুদীর্ঘ সাধনাকেই মূল শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি সভ্যতার নানা সংকট প্রত্যক্ষ করে বলেছেন,
‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’। তবে পৃথিবী সম্পর্কে আশাবাদী কবির
বিশ্বাস— শুভ, কল্যাণ ও মঙ্গলচিন্তার আলোকিত পথে পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে।
কিন্তু পৃথিবীর এই ক্রমমুক্তির জন্য প্রয়োজন সামষ্টিক মানুষের বহু প্রয়াস
এবং সে পথ অতিক্রম করতে লাগে সুদীর্ঘ সময়।
➠ উদ্দীপকেও অসুস্থ পৃথিবী থেকে সুস্থ স্থির পৃথিবী নির্মাণের প্রত্যয়
ব্যক্ত হয়েছে। সুচেতনা' কবিতায় উল্লিখিত গভীর অসুখের মতো উদ্দীপকেও শুনি
‘একটি পৃথিবী নষ্ট হয়ে গেছে আমাদের আগে’। পৃথিবী ও সভ্যতার এই দুঃসময়
থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন সকালের আকাশের মতন সময়; অর্থাৎ এক দীর্ঘ
কালপরিক্রমা। বলা বাহুল্য, সেই কালপরিক্রমায় থাকবে সামষ্টিক মানুষের
নিরলস প্রয়াস। একক ব্যক্তির স্বল্প সময়ের প্রচেষ্টায় বিশাল পৃথিবীর খুব
বড়ো কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
➠ উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতা উভয়ক্ষেত্রেই কবিতায় আর উদ্দীপকে ব্যস্ত
হয়েছে সকালের আকাশের মতন সময় অর্থাৎ এক দীর্ঘ কালপরিক্রমার কথা। আর তাই
‘সুচেতনা’ কবিতা। তাই সামষ্টিক মানুষের প্রয়াসকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া
হয়েছে। সামষ্টিক মানুষের শতাব্দীব্যাপী কাজের কথা বলা হয়েছে ‘সুচেতনা’ ও
উদ্দীপকের আলোকে বলা যায়, সামষ্টিক মানুষের দীর্ঘকালের সাধনার দ্বারাই
কেবল পৃথিবীর সত্যিকার কল্যাণ প্রত্যাশা করা যায়।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৭:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
হৃদয়, অনেক বড়ো বড়ো শহর দেখেছো তুমি;
সেইসব শহরের ইট পাথর
কথা, কাজ, আশা, নিরাশার ভয়াবহ ঘৃত্ত চক্ষু
আমার মনের বিষাদের ভিতর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
কিন্তু তবুও শহরের বিপুল মেঘের কিনারে সূর্য উঠতে দেখেছি।
ক. কোথায় অনন্ত সূর্যোদয় হবে বলে কবির বিশ্বাস?
খ. কবির প্রাণ অনেক রূঢ় রৌদ্রে ঘুরেছে কেন?
গ. ‘সুচেতনা’ কবিতার সঙ্গে উদ্দীপকের বিষয়গত সাদৃশ্য দেখাও।
ঘ. ‘নৈরাশ্যের ভেতরেও আশাবাদের প্রকাশ-জীবনানন্দ দাশের কবিতার
উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।’ - ‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপকের আলোকে মন্তব্যটি
বিচার করো।
ক. শাশ্বত রাত্রির বুকে অনন্ত সূর্যোদয় হবে বলে কবির বিশ্বাস।
খ. পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো ভালোবাসার জন্য কবির প্রাণ অনেক রূঢ়
রৌদ্রে ঘুরেছে।
➠ প্রেম,সত্য ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠা সহজ নয় এই পৃথিবীতে। অনেক রক্তাক্ত পথ
পাড়ি দিয়েই পৌঁছাতে হয় ভালোবাসার পরিণামে কবি জীবনানন্দ দাশ মানুষের
মঙ্গলে, কল্যাণে বিশ্বাসী। তাঁর প্রাণ পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মতো
ভালোবাসা দিতে চেয়েছে। আর মানুষকে ভালোবাসতেই কবির প্রাণ অনেক রূঢ় রৌদ্রে
ঘুরেছে অর্থাৎ অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে।
গ. মানবসভ্যতার রূঢ়তার মাঝেও আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ‘সুচেতনা’
কবিতা ও উদ্দীপকের সাদৃশ্যগত দিক।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি শুনিয়েছেন মানবসভ্যতার ধ্বংস ও মারণপ্রবণতা আর
সফলতা-বিফলতার চিরন্তন দোলাচলের ইতিকথা। সম্প ক্ষমতা, আধিপত্যের লোভে
মানু। রণক্লান্ত জীবনবোধ এবং প্রেম প্রতিষ্ঠার পথেও স্বজন হননের মতো গভীর
পার্থিব সংকটের কথা আছে কবিতাতে। তবুও কবি বিশ্বাস করেন এসব অসুখ, ব্যথা
মুছে গিয়ে পৃথিবী একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে।
➠ একই রকম চেতনার অনুরণন রয়েছে আলোচ্য উদ্দীপকে। উদ্দীপকে ‘শহর’ শীর্ষক
কবিতায় বর্ণিত হয়েছে নাগরিক ও যান্ত্রিক সভ্যতার ভয়াবহতা। সেই ভয়াবহতায়
মানুষের কথা, কাজ, আশা, নিরাশা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মানুষের হৃদয়ে ভর করে
নিদারুণ বিষাদ। তবে নৈরাশ্য কাটিয়ে যে পৃথিবীতে একদিন আলোকোজ্বল সকাল
আসবে ‘সুচেতনা’ কবিতার মতো উদ্দীপকেও সে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
আর সীমাহীন রূঢ়তার মাঝেও আশাবাদী হয়ে ওঠার এই প্রবণতা ‘সুচেতনা’ কবিতা ও
উদ্দীপকটিকে সাদৃশ্যপূর্ণ করে তুলেছে।
ঘ. ‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপকের কবিতাংশে প্রকাশিত ইতিবাচকতার বিশ্লেষণের
আলোকে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ বলেই প্রতীয়মান হয়।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় আছে নৈরাশ্য ও আশাবাদের দোলাচল। তবে কবি কবিতার
অন্তিমে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কবিতায় কবি মানুষের রা রক্ত সফলতাকে সত্য
বললেও শেষ সত্য বলে মানেননি। পৃথিবীর গভীরতর অসুখের কথা তিনি জানিয়েছেন,
জানিয়েছেন সভ্যতার স্বান্দ্বিকতার বিষয়টিও। কিন্তু সবশেষে তিনি আশাবাদী
পৃথিবীর ক্রমমুক্তিতে; আশাবাদী শাশ্বত রাত্রির বুকে অনন্ত সূর্যোদয়ের
আগমনে।
➠ উদ্দীপকেও বিদ্যমান নৈরাশ্য ও আশাবাদের সমন্বিত প্রকাশ। উদ্দীপকের
কবিতাংশে বর্ণিত হয়েছে নাগরিক ও যান্ত্রিক সভ্যতার ভয়াবহতা। সেই ভয়াবহতায়
মানুষের কথা, কাজ, আশা, নিরাশা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তবু অন্তিমে মনের
বিস্বাদ ও বিষাদের মাঝে কবি দেখেছেন শহরের বিপুল মেঘের কিনারে সূর্য
উঠতে। অর্থাৎ ‘সুচেতনা’ কবিতার মতো এখানেও কবি আশায় আস্থা রেখেছেন।
➠ ‘সুচেতনা’ এবং উদ্দীপকের ‘শহর’ উভয় কবিতার কবি জীবনানন্দ দাশ। উভয়
কবিতাতে আমরা দেখলাম নৈরাশ্য ও আশার দ্বন্দ্ব। কবি জীবন-যন্ত্রণায় পিষ্ট
মানুষের হাহাকার শুনিয়েছেন উভয়ক্ষেত্রেই। কিন্তু পরিণামে তিনি আশাবাদী
হয়ে উঠেছেন। উভয়ক্ষেত্রে যে সূর্যোদয়ের কথা বলা হয়েছে তা প্রবল
আশাবাদেরই ইঙ্গিত। আর তাই, ‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপকের আলোকে নিঃসন্দেহে
বলা যায়, নৈরাশ্যের ভেতরেও আশাবাদের প্রকাশ- জীবনানন্দ দাশের কবিতার একটি
লক্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
ক. পৃথিবীব্যাপ্ত অন্ধকার বা অশুভের অন্তরালে কী আছে?
খ. কবি মানবসমাজে সুচেতনা প্রত্যাশা করেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকের কবিতাংশে ‘সুচেতনা’ কবিতার কোন দিকটি ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা
করো।
ঘ. ‘উদ্দীপকের কবিতাংশ ও ‘সুচেতনা’ কবিতার কবিদ্বয়ের প্রত্যাশা মূলত এক ও
অভিন্ন।’ - বিশ্লেষণ করো।
ক. পৃথিবীব্যাপ্ত অন্ধকার বা অশুভের অন্তরালে সূর্যোদয় আছে।
খ. কবি মানবসমাজকে সকল বিপর্যয় থেকে মুক্তি দিতে সুচেতনার প্রত্যাশা
করেছেন।
➠ সভ্যতার বিকাশে অনেক রক্তপাত ও জীবনের অবসান ঘটেছে। প্রেম, সত্য ও
কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েও অগণিত প্রাণহানি ও রক্তপাতের পথ পাড়ি দিতে
হয়েছে। এতদসত্ত্বেও পৃথিবীকে এগিয়ে যেতে হয়, এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য শুভ
চেতনা বা সুচেতনার প্রসার ঘটাতে হবে। তবেই সকল বিপর্যয় থেকে মানবসমাজ
মুক্ত হবে বলে কবির প্রত্যাশা।
গ. উদ্দীপকের কবিতাংশে ‘সুচেতনা’ কবিতার মানবজীবনের মুক্তির আশ্বাসের
দিকটি ফুটে উঠেছে।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতাটিতে কবি মানবজীবনের স্থায়িত্বের জন্য সুচেতনাকে ধারণ
করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। কবির প্রত্যাশা সভ্যতার বিকাশে অনেক
প্রাণহানি ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটলেও ইতিবাচক চেতনার মাধ্যমে এসব অশুভ থেকে
মুক্তি মিলবে। সেই আশায় সকলকে সুচেতনা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ধারণ করার
প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
➠ উদ্দীপকের কবিতাংশে দুর্যোগ কেটে যাওয়ার আশা ব্যক্ত হয়েছে। ঘনঘোরে
থাকা সকলকে নির্ভয় দেওয়া হয়েছে। আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে অশুভের দুর্গতোরণ
পদতলে মথিত হয়েছে। তাই নবজীবনের আশ্বাসে ‘ভয় নেই, ভয় নেই’ রব তোলা হয়েছে।
কবিতাংশের এই আশ্বস্ততা ‘সুচেতনা’ কবিতার মানবমুিক্তর আশ্বাসকেই যেন
ফুটিয়ে তোলে। উক্ত কবিতায় মানবজীবনের অন্তরালে যে বিষাদ ও ত্যাগের ইতিহাস
রয়েছে তা উন্মোচন করা হয়েছে। কবি মনে করেন, সৃষ্টির পেছনে ধ্বংসের প্রভাব
থাকে। সভ্যতার উৎকর্ষেও তেমনি প্রাণহানি ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে। এতে করে
মানবজীবন ব্যর্থ বা স্থবির হয়ে থাকেনি। অন্ধকারের নেপথ্যে যেমন আলো থাকে
তেমনি দুর্যোগের অন্তরালে থাকে নতুন সূর্যালোক, যা মানবমুক্তিকে নিশ্চিত
করে। এজন্য সুচেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। সেই বিকাশের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের
মুক্তি নিশ্চিত হবে।
ঘ. উদ্দীপকের কবিতাংশ ও ‘সুচেতনা’ কবিতার কবিদ্বয়ের প্রত্যাশা মূলত মানব
জীবনের অগ্রযাত্রায় এক ও অভিন্ন।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতার কবি মানবজীবনের সার্থকতায় বিশ্বাসী। ঝড়-ঝঞ্ঝায়
ইতিবাচক মনোভাব ধারণ করে জীবনের চলার পথ স্বাভাবিক রাখাই কবির কাম্য।
মানব সভ্যতার উত্থানে পতনের ধ্বনি থাকলেও সভ্যতার বিনির্মাণেই যে সত্য
কবি সে বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রত্যাশী।
➠ উদ্দীপকের কবিতাংশের কবি ও একজন আশাবাদী কবি। তিনিও প্রত্যাশা করেন
ঘনঘোরের অবসান ঘটার। তাঁর মতে, রাত্রি যত গভীরই হোক না কেন, তা স্থায়ী
নয়। অশুভের পতন হয়ে কল্যাণ ও মঙ্গল স্থান করে নেওয়ার প্রত্যাশা তাঁর
কবিতার মূল প্রত্যাশা। কবি সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন উদয় বা বিজয় সন্নিকটে
বলে। তিনি ‘মাভৈঃ মাভৈ’ ধ্বনি তুলে নবজীবনকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। মানব
মুক্তির অভ্যুদয়ে জয়ের কথা বলেছেন।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতার কবি চেতনাকে জাগ্রত করে মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন। তাঁর
মতে, ধ্বংসই পৃথিবীর শেষ কথা নয়। সেই সাথে সভ্যতার অভ্যুদয়েও যে ঘটছে তাও
বিবেচনায় নিতে হবে। ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে সভ্যতা থেমে থাকেনি, বরং
মানুষ নতুন নতুন সভ্যতা গড়ে পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়েছে। প্রেম, সত্য ও
কল্যাণের জন্য পৃথিবীতে অগণিত প্রাণহানি ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে। এই
রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিয়েই ভালোবাসার পরিণামে পৌঁছাতে হয়। এজন্য তিনি
ইতিবাচক চেতনা প্রজ্বলনের কথা বলেছেন। তবেই পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি ঘটবে
বলে কবির প্রত্যাশা। তাঁর এ প্রত্যাশা উদ্দীপকের কবিতাংশের কবিরও
প্রত্যাশা। তিনিও মনে করেন ভয় কেটে মানবের জয় হবে। নবজীবন লাভ হবে
অমানিশা কেটে।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৯:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
‘মানুষ সবার জন্যে শুভ্রতার দিকে অগ্রসর হতে চায় অগ্রসর হয়ে যেতে পারে।
ক. ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবিপ্রাণ কোথায় ঘুরেছে?
খ. মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের ভাববস্তুর সঙ্গে ‘সুচেতনা’ কবিতার ভাববস্তুর সাদৃশ্য
দেখাও।
ঘ. ‘প্রগতিশীল মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য পৃথিবীর সত্যিকার মুক্তি।’ -
‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপকের আলোকে মন্তব্যটি বিচার করো।
ক. ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবিপ্রাণ রূঢ় রৌদ্রে ঘুরেছে।
খ. মানবজীবনে নানা রূঢ়তা থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর প্রতি, পৃথিবীর মানুষের
প্রতি যে মানুষের দায়বদ্ধতা ও ঋণ রয়েছে কবি তাই বুঝিয়েছেন।
➠ এই পৃথিবীর রণ-রক্ত-সফলতার দ্বন্দ্বে মানবজীবন আন্দোলিত। ভালোবাসার
পরিণামে পৌঁছাতেও মানুষকে পাড়ি দিতে হয় রক্তাক্ত পথ। সভ্যতার
মারণপ্রবণতায় অসুস্থ পৃথিবীর যন্ত্রণা মানুষকে ক্লিষ্ট করে। তবুও কবি মনে
করেন এই পৃথিবী মানুষকে জীবন উপভোগের যে সুযোগ দিয়েছে তার জন্য পৃথিবীর
প্রতি মানুষের ঋণ ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। মানুষকে পৃথিবীর কল্যাণে নিয়োজিত
হতে হবে।
গ. পৃথিবীতে মানুষের শুভকর্মের প্রয়াস এবং তাতে ক্রমসাফল্যের আশাবাদের
দিক থেকে ‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপকের ভাবগত সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবির বিশ্বাস, পৃথিবীব্যাপ্ত অন্ধকার বা অশুভের
অন্তরালেই আছে সূর্যোদয়, মুক্তির দিশা। যদিও মুক্তি অর্জন সহজ নয়।
সামষ্টিক মানুষের দীর্ঘকালের সাধনার ফলেই কেবল পৃথিবীতে মানুষের সত্যিকার
কল্যাণ প্রত্যশা করা যায়। বস্তুত, সামষ্টিক মানুষের সুচেতনার বিকাশেই
দেখা মেলে আলোকোজ্জ্বল পৃথিবীর।
➠ উদ্দীপকেও শুভ্রতার দিকে সামষ্টিক মানুষের অগ্রগমনের বিষয়ে আলোকপাত করা
হয়েছে। উদ্দীপকেও কবি স্থিরপ্রত্যয়ী যে, যদি মানুষ সকল মানুষের
মঙ্গলচিন্তায় অগ্রসর হতে চায়, তবে তারা সাফল্য লাভ করে। উদ্দীপকের
‘শুভ্রতার দিকে অগ্রসর হতে চায় – চরণটি ‘সুচেতনা’ কবিতার— ‘সুচেতনা, এই
পথে আলো জ্বেলে এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে; সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর
কাজ’; চরণটির ভাবনাকে ধারণ করেছে। পৃথিবীতে মানুষের ক্রমসাফল্যের এই
আশাবাদ ‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপকের মূল ভাবনাগত সাদৃশ্য।
ঘ. উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতা উভয়ক্ষেত্রেই আলোকিত মানুষের হাতে আলোকিত
সমাজ গড়ার আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ পৃথিবীর ক্রমমুক্তিতে বিশ্বাসী।
তিনি দেখেছেন সভ্যতার মারণপ্রবণতায় মানুষ সফলতা-বিফলতার দোলাচলে স্বজন
হননও করে থাকে। সেই সাথে তিনি এও দেখেছেন যে, প্রগতিশীল মানুষ সুচেতনার
আলো জ্বেলে মানুষকে মানুষের মতো ভালোবাসে। ক্লান্ত শরীরেও অক্লান্ত মনে
একটি সূর্যকরোজ্জ্বল মানবসমাজ গড়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়।
➠ উদ্দীপকেও আছে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়। উদ্দীপকের কবি শোনাচ্ছেন,
শুভ্রতার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য মানুষের প্রয়াসের কথা। উদ্দীপকের
শুভ্রতার দিকে অগ্রসর হওয়া মূলত পৃথিবীর ক্রমমুক্তির বিষয়টিকে নির্দেশ
করে। এমন প্রগতিশীল মানুষ যে পরিণামে সফল হয় সে বিষয়ে কবি সন্দেহহীন।
➠ বস্তুত, ‘সুচেতনা’ কবিতা এবং উদ্দীপক উভয়ক্ষেত্রেই বর্ণিত হয়েছে
প্রগতিশীল মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও কর্মতৎপরতা। উভয়ক্ষেত্রেই আমরা দেখলাম
প্রগতিশীল মানুষ সামষ্টিক মানুষের কল্যাণ প্রত্যাশা করে। শুধু প্রত্যাশা
করেই তারা থেকে থামে না। সুচেতনার আলো জ্বেলে তারা মানবকল্যাণের মধ্য
দিয়ে পৃথিবীর ক্রমমুক্তির পথে অগ্রসর হয়। পৃথিবীর ক্রমমুক্তিই তাদের
একান্ত কাম্য।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১০:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধী ছিলেন একজন মানবতাবাদী
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়েই তিনি দলিত হরিজন
সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। কারণ, তাঁর
উদ্দেশ্যই ছিল বর্ণবিভেদহীন মানবসমাজ বিনির্মাণ।
ক. জীবনানন্দ দাশের মায়ের নাম কী?
খ. ভালো মানব-সমাজা বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতার কোন দিককে নির্দেশ করে?— আলোচনা করো।
ঘ. ‘একটি ভালো মানব-সমাজ প্রত্যেক মানবতাবাদী মানুষের একান্ত কাম্য।’ -
‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপকের আলোকে মন্তব্যটি বিচার করো।
ক. জীবনানন্দ দাশের মায়ের নাম কুসুমকুমারী দাশ।
খ. ‘ভালো মানব-সমাজ’ বলতে কবি জীবনানন্দ দাশ সেই মানবসমাজকে বুঝিয়েছেন,
যেখানে মানুষ সফলতা-বিফলতা দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হয়ে শুভ চেতনার আলো
জ্বেলে আলোকিত পৃথিবী নির্মাণ করবে।
➠ কবি দেখেছেন, সমকালের নানা সংকটে মানবসমাজ বিপর্যস্ত। সকলেই
অর্থ-ক্ষমতা-আধিপত্য চিন্তায় মগ্ন। ভালোবাসার পরিণতিতে পৌছাতেও ঘটে অনেক
রক্তপাত। এমন অবস্থাতেও কবি বিশ্বাস করেন মানুষ সত্য ও মঙ্গলচিন্তার
আলোকিত পথে পৃথিবীর ক্রমমুক্তি ঘটাবে। সমাজের এই শুভ ও মঙ্গলকামী মানুষের
দ্বারা যে মানবিক বোধসম্পন্ন সমাজ নির্মিত হবে, তা-ই কবির কাছে ‘ভালো
মানব-সমাজ’ রূপে বিবেচিত।
গ. উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবির ‘ভালো মানব-সমাজ’ গড়ার প্রত্যয়ের
দিকটিকে নির্দেশ করে।
➠ ‘সচেতনা’ কবিতায় কবি পৃথিবীর গভীরতর অসুখ থেকে ক্রমমুক্তির প্রত্যাশা
ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বিশ্বাস শুভ, কল্যাণ ও মঙ্গলচিন্তার আলোকিত পথে
পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে। তার জন্য সামষ্টিক মানুষের দীর্ঘকালের সাধনা
আবশ্যক। কবির প্রত্যয় শুভ চিন্তায় প্রভাবিত মানুষ ক্লান্তিহীন মনে আলোকিত
মানবসমাজ গড়ে দেবে। সে সমাজে প্রেম, সত্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা পাবে।
➠ উদ্দীপকে একটি বর্ণবিভেদহীন আলোকিত মানবসমাজ নির্মাণের কথা উল্লেখ করা
হয়েছে। মানবতাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের
পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধী সচেষ্ট ছিলেন দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের অধিকার
প্রতিষ্ঠায়। জীবনানন্দ দাশ যেমন একটি উন্নত মানবসমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত
করেছেন তাঁর ‘সুচেতনা’ কবিতায়, তেমনি মহাত্মা গান্ধীরও উদ্দেশ্য ছিল
ভারতে বর্ণবিভেদহীন মানবসমাজ বিনির্মাণ।
ঘ. উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতা উভয়ক্ষেত্রেই সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ
গড়ার স্বপ্ন নিহিত রয়েছে।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশ সুচৈতন্যর উদ্বোধন প্রত্যাশা
করেছেন। তিনি দেখেছেন যুদ্ধ-রক্ত-সফলতার দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত মানবসমাজ।
মানুষের ভালোবাসার মাঝেও স্বার্থের হিসাব, হিংসা-দ্বেষ, দাঙ্গা-যুদ্ধ চলে
আসে। কিন্তু আশাবাদী কবি বিশ্বাস করেছেন শুভ চেতনার আলো প্রজ্বলনের
মাধ্যমেই সকল বিপর্যয় থেকে পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি ঘটবে। মানবতাবাদী
দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি প্রত্যাশা করেছেন পৃথিবীতে নির্মিত হবে
এক ‘ভালো মানবসমাজ’।
➠ উদ্দীপকে বর্ণিত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধী
সারা বিশ্বে একজন মানবতাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত। তাঁর
নিকট সমাজে সকল মানুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে উত্তাল সময়েও তিনি দলিত হরিজনদের অধিকার
প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। নির্মাণ করতে চেয়েছেন বর্ণবিভেদহীন
মানবসমাজ।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতা ও উদ্দীপক উভয়ক্ষেত্রে একটি আলোকিত মানবসমাজ নির্মাণের
আকাঙ্ক্ষা ব্যস্ত হয়েছে। ‘সুচেতনা’ কবিতায় কবি তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিতে
এমন এক উত্তম মানবসমাজ নির্মাণ করতে চেয়েছেন যা পরম সূর্যকরোজ্জ্বল;
অর্থাৎ যেখানে বিভেদ, কৃত্রিমতা, ধ্বংসপ্রবণতার সংকট নেই। অন্যদিকে
মহাত্মা গান্ধীও যে তেমনই একটি সুন্দর মানবসমাজ নির্মাণপ্রত্যাশী ছিলেন
উদ্দীপকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বস্তুত জীবনানন্দ দাশ কিংবা মহাত্মা
গান্ধীর মতো সকল মানবতাবাদী মানুষের ঐ একই প্রত্যাশা। আলোচ্য কবিতা ও
উদ্দীপকে তাঁরা পৃথিবীর সমস্ত শান্তিকামী আলোকিত মানুষের প্রতিনিধি হয়ে
উঠেছেন। তাই উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতার আলোকে প্রশ্নে উল্লিখিত
মন্তব্যকে যথার্থ বলা যায়।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১১:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
(i) ও ভাই, ভয়কে মোরা জয় করিব হেসে-
গোলাগুলির গোলেতে নয়, গভীর ভালোবেসে।
(ii) মানুষ আত্মভেদী আত্মনাশী নীলপতঙ্গ
একদিন পাঁজরের হাড় দিয়ে গড়েছে এ পৃথিবী,
একদিন মানুষই ধ্বংস করবে তাঁকে।
ক. জীবনানন্দ দাশ রচিত প্রবন্ধগ্রন্থের নাম লেখো।
খ. “এই পথে আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে”- বুঝিয়ে লেখো।
গ. উদ্দীপক (i) নং ‘সুচেতনা’ কবিতার কোন চেতনাকে ধারণ করে? ব্যাখ্যা
করো।
ঘ. উদ্দীপকের বিষয়বস্তু ও ‘সুচেতনা’ কবিতার বিষয়বস্তুর মধ্যকার বৈসাদৃশ্য
নিরূপণ করে তোমার যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করো।
ক. জীবনানন্দ দাশ রচিত প্রবন্ধগ্রন্থের নাম হলো ‘কবিতার কথা’।
খ. “এই পথে আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে”- উল্লিখিত চরণে
কবির আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতা হতে পাই, পৃথিবীব্যপ্ত গভীর অসুখ বা বিপর্যয় থেকে
মুক্তির পথই শুভ চেতনা। ইতিবাচক এ চেতনার আলো প্রজ্বলনের মাধ্যমেই সকল
বিপর্যয় থেকে পৃথিবী ও মানুষের মুক্তি ঘটবে- এ কথাই উক্ত চরণে কবি
বুঝিয়েছেন।
গ. উদ্দীপক (i)-এ হিংসা-দ্বেষে মানবসভ্যতার ধ্বংস এবং ভালোবাসা দিয়ে তা
জয় করার বিষয়টি প্রকাশিত।
➠ মানবসভ্যতার মাঝে হিংসা-দ্বেষ, হানাহানি-মারামারি বিদ্যমান, যা কখনই
মঙ্গলবার্তা বয়ে আনে না। বরং সভ্যতাকে ঠেলে দেয় ধ্বংসের দিকে। তাই,
হিংসা-দ্বেষের স্থানে পরস্পর ঐক্য জরুরি।
➠ উদ্দীপক (i)-এ মানুষ-মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানির দিকটি তুলে ধরা
হয়েছে। ভালোবাসার শক্তিতে সবরকম ভয়কে জয় করার আহ্বান উদ্দীপকে প্রকাশ
পেয়েছে। কবি সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ভালোবাসা ও কল্যাণকর
মন্ত্রের জয়গান করেছেন। এক্ষেত্রে, ‘সুচেতনা’ কবিতায়, পৃথিবী গভীরতম
ব্যধি ও যুদ্ধকে অতিক্রম করার জন্য কবি ‘সুচেতনা’ নামক আরাধ্য এক
বিশ্বাসের ও চেতনার প্রার্থনা করেছেন। কবির মতে, সুস্থ ইহলৌকিক পৃথিবীর
মানুষকে জীবন্ময় করে রাখতে ক্রমমুক্তির ঐ আলো প্রয়োজন। মানবসমাজের
অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত করতে কবি ‘সুচেতনা’ নামক বিশ্বাসের কামনা করেছেন।
এক্ষেত্রে, বলা যায় যে, উদ্দীপকে কবিতার ভালোবাসা দিয়ে সুন্দর পৃথিবী গড়ে
তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে।
ঘ. উদ্দীপকের বিষয়বস্তুর সাথে ভাবগত দিক থেকে ‘সুচেতনা’ কবিতার বৈসাদৃশ্য
রয়েছে।
➠ পৃথিবীতে ভালোবাসার শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। মানবসভ্যতার
অগ্রগতির পেছনে রয়েছে মানবপ্রেম। কারণ, ভালোবাসা বা প্রেম দিয়েই পৃথিবী
থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করা সম্ভব। প্রত্যেকের মাঝে ভালোবাসা জায়গা কর
নিলে অশান্তি দূর হবে।
➠ উদ্দীপক (ii) নং অংশে, স্বার্থপরতা মানুষকে মানবিকতাশূন্য করে তোলে- এ
কথা বুঝিয়েছে। কবি তাই মানুষের এমন আচরণ নিয়ে উক্ত কবিতাংশ উদ্বেগ প্রকাশ
করেছেন। অন্যদিকে, (i) নং উদ্দীপকে, মানুষে-মানুষে,
হিংসা-বিদ্বেষ-হানাহানির দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। মূলত, ভালোবাসার জয়গান
করার মধ্য দিয়ে যেভাবে সবরকম ভয়কে জয় করা সম্ভব, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে
উক্ত অংশে। এক্ষেত্রে, উদ্দীপক (i) ও (ii) নং অংশে বর্ণিত কোনো বক্তব্যই
সুচেতনা কবিতার ভাবকে ধারণ করে না।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায়, কবি সুচেতনা সম্বোধনে তার প্রার্থিত, আরাধ্য এক
চেতনানিহিত বিশ্বাসকে শিল্পিত করেছেন। কবির বিশ্বাস মতে, সুচেতনা দূরতম
দ্বীপসদৃশ একটি ধারণা, যা পৃথিবীর নির্জনতায়, যুদ্ধে, রক্তে, নিঃশোষিত
নয়। কবিতায় কবি এমন এক ভালোবাসা ও কল্যাণকর মন্ত্রের জয়গান করেছেন যা
শাশ্বত রাত্রি বুকে অনন্ত সূর্যোদয় প্রকাশ করবে। এক্ষেত্রে, উদ্দীপকের
অংশে এ বিষয়ে কোনো ভাব প্রকাশ পায় নি। যেহেতু, উদ্দীপকে, ‘সুচেতনা’
কবিতার গভীর ভাব প্রতিফলিত হয়নি। সুতরাং, পরিশেষে বলা যায় যে, উদ্দীপকের
বিষয়বস্তুর সাথে সুচেতনা কবিতার বৈসাদৃশ্য নিরূপণ করা সম্ভব- যুক্তিসহ
বিশ্লেষণ করা হলো।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১২:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
আজি সেই চির দিবসের প্রেম অবসান লভিয়াছে,
রাশি রাশি হয়ে তোমার পায়ের কাছে,
নিখিলের সুখ, নিখিলের দুখ, নিখিলের প্রাণের প্রীতি;
একটি প্রেমের মাঝারে মিলেছে সকল প্রেমের স্মৃতি;
সকল কালের সকল কবির গীতি।
ক. জীবনানন্দ দাশের কাব্যবৈশিষ্ট্যকে ‘চিত্ররূপময়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন
কে?
খ. “এই পৃথিবীর রণ-রক্ত-সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়” কোন প্রসঙ্গে কবি
এরূপ বলেছেন?
গ. উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতার কোন ভাবের ইঙ্গিত বহন করে? ব্যাখ্যা
করো।
ঘ. “সাদৃশ্য থাকলেও উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতার সমগ্র ভাবের ধারক হতে
পারে নি” মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।
ক. জীবনানন্দ দাশের কাব্যবৈশিষ্ট্যকে ‘চিত্ররূপময়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। খ. “এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য, তবু শেষ সত্য নয়”
বলতে কবির চেতনানিহিত বিশ্বাসবোধ প্রকাশ পেয়েছে।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায়, সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি বহু যুদ্ধ রক্তপাত
প্রাণহানি সংঘটিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তবে এই ধ্বংসাত্মক দিকটিই যে
পৃথিবীর শেষ সত্য নয়- এ কথাই কবি উল্লিখিত চরণে বোঝাতে চেয়েছেন।
গ. উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতার ভালোবাসার শক্তি ও কল্যাণময় ভাবের ইঙ্গিত
বহন করে।
➠ ভালোবাসা আছে বলেই পৃথিবী টিকে আছে। ভালোবাসা মানুষের মধ্যে তার মনবীয়
বোধের জাগরণ ঘটায়। মানুষ ভালোবাসা শিখলেই পৃথিবী থেকে দূর হবে সমস্ত
হিংসা ও বিদ্বেষ। পৃথিবী হবে শান্তিময় ও কল্যাণকর।
➠ উদ্দীপকের কবিতাংশে প্রেম-ভালোবাসা-প্রীতির কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর যত
সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা সব কবি পান একটি সফল প্রেমের স্মৃতির মধ্য দিয়ে। এই
প্রেম, এই ভালোবাসা সব কবির গান। ভালোবাসার প্রতি আশ্বাস ও বিশ্বাসের
কথাই উদ্দীপকে প্রকাশ পেয়েছে। অপরদিকে, ‘সুচেতনা’ কবিতায়, কবি তার
প্রার্থিত, আরাধ্য এক চেতনানিহিত বিশ্বাসের শিল্পায়ন করেছেন। কবির
বিশ্বাস হলো এমন যে, চেতনাগত এই সত্তা বর্তমান পৃথিবীর সকল গভীরতর
ব্যাধিকে অতিক্রম করে সুস্থ ইহলৌকিক পৃথিবীর মানুষকে জীবন্ময় করে রাখবে।
এক্ষেত্রে, কবিতায়, কল্যাণকর এক পৃথিবীর আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে। সুতরাং,
বলা যায় যে, উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতার সাদৃশ্যগত ভাবের ইঙ্গিত বহন করে।
ঘ. “সাদৃশ্য থাকলে ও উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতার সমগ্র ভাবের ধারক হতে
পারেনি” মন্তব্যটি সত্য।
➠ হিংসা-বিদ্বেষ কখনই মঙ্গলজনক নয়। ভালোবাসার মধ্য দিয়েই সমাজে
সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক সময় নিজের স্বার্থের জন্য মানুষ
মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে ফেলে। ভালোবাসা আর সম্প্রীতি মানুষকে সেই বিপথ থেকে
ফেরায়।
➠ উদ্দীপকের কবিতাংশের মূল সুর প্রেম। মানুষের কাছে এসেই প্রেম-ভালোবাসা
পূর্ণতা পায়। কবি প্রেমের মধ্য দিয়ে জগতের সব সুখ-দুঃখ প্রীতি হয়েছেন।
ভালোবাসার গান গাওয়াই সব কবির উদ্দেশ্য। ‘সুচেতনা’ কবিতায়ও অমোঘ
চেতনানিহিত এক ভালোবাসার কথা প্রকাশ পেয়েছে। কবিতায় প্রকৃতির প্রতি,
মানুষের প্রতি ও সভ্যতার প্রতি এবং নতুন চেতনার আহ্বান প্রকাশ পেয়েছে।
কবি ধ্বংসের কামনা করেন নি। শান্তির বাতাসে অনন্তকাল বেঁচে থাকার ইচ্ছা
ব্যক্ত করেছেন।
➠ ‘সুচেতনা’ কবিতায়, কবি অন্তর থেকে এমন এক পৃথিবীর আহ্বান কামনা করেছেন,
যেখানে কবির প্রার্থিত, আরাধ্য নির্জন শান্তি পাওয়া যাবে। কবি শান্তির
জন্য পৃথিবীময় কল্যাণকর ভাবের প্রত্যাশা করেছেন। উদ্দীপকেও একই চেতনার
প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু, উদ্দীপকে সুচেনা কবিতার সমগ্র ভাগ প্রকাশ পায় নি।
আংশিক ভাব প্রকাশ পাওয়ায় মন্তব্যটি সঠিক ও যথার্থ। সুতরাং, পরিশেষে বলা
যায় যে, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি সত্য ও যৌক্তিক।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৩:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
মাটি থেকে কবর উৎপাদন একসঙ্গে সবচেয়ে লম্বা দেবদারু, যেখানে তার শিকড় ছিল
আগে, সেই গর্তে ফেলব ছুড়ে, আমাদের সব অস্ত্র।
ধরণী গর্ভে, ধরণী তলে,
মোরা চিরতরে দেব কবর সেই গভীরে
আর পুঁতব সেই গর্তে সাদা গোলাপ
হ্যাঁ, আসবে সময় মহা শান্তির।
ক. ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থটি কত সালে প্রকাশিত হয়?
খ. “শাশ্বত রাত্রি বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়”- বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের ‘সাদা গোলাপ’, ‘সুচেতনা’ কবিতার কোন দিকটির সাথে
সাদৃশ্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “উদ্দীপকটি শান্তিপ্রিয় কবির জন্য এক চিরায়ত প্রার্থনা সংগীত”-
‘সুচেতনা’ কবিতার আলোকে উক্তিটির সার্থকতা বিচার করো।
ক. বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয়।
খ. “শাশ্বত রাত্রি বুকে অনন্ত সূর্যোদয়”- বলতে উল্লিখিত চরণে কবির
প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে।
‘সুচেতনা’ কবিতায় পৃথিবীব্যাপ্ত অন্ধকার বা অশুভের অন্তরালেই যে সূর্যোদয়
আছে, আছে মুক্তির দিশা, তা বর্ণিত হয়েছে, সুচেতনার বিকাশেই এই আলোকজ্জ্বল
পৃথিবীর দেখা মিলবে- এ কথাই কবি উক্ত চরণে প্রত্যাশা হিসেবে বুঝাতে
চেয়েছেন।
ঘ ‘সুচেতনা’ কবিতায় প্রকাশিত কবির কল্যাণকর সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খার
স্বরূপ বিশ্লেষণ করো।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৪:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
চলে যাবো- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণ পণে পৃথিবীর সবার জঞ্জাল-
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি,
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে, সব কাজ শেষে
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাবে আশীর্বাদ। তারপর হবো ইতিহাস। [তথ্যসূত্র: ছাড়পত্র: সুকান্ত
ভট্টাচার্য
১ ক. জীবনানন্দ দাশ রচিত উপন্যাস সংখ্যা কত?
খ. “সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ”- বলতে কবি কোন ভাব প্রকাশ করেছেন?
গ. উদ্দীপকের সাথে ‘সুচেতনা’ কবিতার বৈসাদৃশ্য চিহ্নিত করো।
ঘ. “উদ্দীপকটি ‘সুচেতনা’ কবিতার সমগ্র দিক উন্মোচন করেনি”- মন্তব্যটি
মূল্যায়ণ করো।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৫:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
শুধু ভালোবাসা পারে ধুয়ে দিতে জীবনের কালি
মুছে দিতে ক্ষতচিহ্ন, জীবনের কালো দাগ,
আর কোনোকিছু পারবেনা ভরিয়ে দিতে হৃদয়ের
আকাশ, শুধু ভালোবাসা পারে মৃত্যুকে হয়তো
ফিরিয়ে দিতে খালি হাতে;
আর জীবনের শূন্যপাত্র একবার ভরিয়ে দিতে
কানায় কানায়।
ক. ‘সুচেতনা’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে?
খ. “শিশির-শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে”- কথাটির অর্থ বুঝিয়ে লেখো।
গ. উদ্দীপক ও ‘সুচেতনা’ কবিতার মধ্যকার সাদৃশ্য চিহ্নিত করো।
ঘ. “উদ্দীপকে ‘সুচেতনা’ কবিতার মূলভাব প্রতিফলিত হয়েছে”- তোমার উত্তরের
স্বপক্ষে যুক্তি দাও।
‘সুচেতনা’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- :
তথ্যসূত্র :
১. সাহিত্য পাঠ: একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক
বোর্ড, ঢাকা, ২০২৫।
২. প্রকাশিত-অপ্রকাশিত রচনাসমগ্র: জীবনানন্দ দাশ, অবসর প্রকাশনা সংস্থা,
ঢাকা,নভেম্বর, ২০২০।
৩. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৪. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।