গন্তব্য কাবুল- সৈয়দ মুজতবা আলী

গন্তব্য কাবুল
গন্তব্য কাবুল

গন্তব্য কাবুল
সৈয়দ মুজতবা আলী

চাঁদনি থেকে নয়সিকে দিয়ে একটা শার্ট কিনে নিয়েছিলুম। তখনকার দিনে বিচক্ষণ বাঙালির জন্য ইয়োরোপিয়ান থার্ড নামক একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ভারতের সর্বত্র আনাগোনা করত।
হাওড়া স্টেশনে সেই থার্ডে উঠতে যেতেই এক ফিরিঙ্গি হেঁকে বলল, “এটা ইয়োরোপিয়ানদের জন্য।”
আমি গাঁকগাঁক করে বললুম, “ইয়োরোপিয়ান তো কেউ নেই। চল, তোমাতে আমাতে ফাঁকা গাড়িটা কাজে লাগাই।”

এক তুলনাত্মক ভাষাতত্ত্বের বইয়ে পড়েছিলুম, “বাংলা শব্দের অন্ত্যদেশে অনুস্বার যোগ করিলে সংস্কৃত হয়; ইংরেজি শব্দের প্রাগদেশ জোর দিয়া কথা বলিলে সায়েবি ইংরেজি হয়।” অর্থাৎ পয়লা সিলেবলে অ্যাকসেন্ট দেওয়া খারাপ রান্নায় লঙ্কা ঠেসে দেওয়ার মতো- সব পাপ ঢাকা পড়ে যায়। সোজা বাংলায় এরই নাম গাঁকগাঁক করে ইংরেজি বলা। ফিরিঙ্গি তালতলার নেটিভ কাজেই আমার ইংরেজি শুনে ভারি খুশি হয়ে জিনিসপত্র গোছাতে সাহায্য করল।

কিন্তু এদিকে আমার ভ্রমণের উৎসাহ ক্রমেই চুপসে আসছিল। এতদিন পাসপোর্ট জামাকাপড় যোগাড় করতে ব্যস্ত ছিলুম, অন্য কিছু ভাববার ফুরসত পাইনি। গাড়ি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রথম যে ভাবনা আমার মনে উদয় হলো সেটা অত্যন্ত কাপুরুষজনোচিত- মনে হলো আমি একা।
ফিরিঙ্গিটি লোক ভালো। আমাকে গুম হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে বলল, “এত মনমরা হলে কেন? গোয়িং ফার?”
দেখলুম, বিলিতি কায়দা জানে। “হোয়ার আর ইউ গোয়িং ” বলল না।

তা সে যাই হোক, সায়েবের সঙ্গে আলাপচারিতা আরম্ভ হলো। তাতে লাভও হলো। সন্ধ্যা হতে না হতেই সে প্রকাণ্ড এক চুবড়ি খুলে বলল, তার ‘ফিয়াঁসে’ নাকি উৎকৃষ্ট ডিনার তৈরি করে সঙ্গে দিয়েছে এবং তাতে নাকি একটা পুরাদস্তুর পল্টন পোষা যায়। আমি আপত্তি জানিয়ে বললুম যে আমিও কিছু কিছু সঙ্গে এনেছি, তবে সে নিতান্ত নেটিভ বস্তু, হয়ত বড্ড বেশি ঝাল। খানিকক্ষণ তর্কাতর্কির পর স্থির হলো, সব কিছু মিলিয়ে দিয়ে ব্রাদারলি ডিভিশন করে আলাকার্ত ভোজন, যার যা খুশি খাবে।

সায়েব যেমন যেমন তার সব খাবার বের করতে লাগল, আমার চোখ দুটো সঙ্গে সঙ্গে জমে যেতে লাগল। সেই শিককাবাব, সেই ঢাকাই পরোটা, মুরগি মুসল্লম, আলু-গোস্ত। আমিও তাই নিয়ে এসেছি জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে।
এবার সায়েবের চক্ষুস্থির হওয়ার পালা। ফিরিস্তি মিলিয়ে একই মাল বেরোতে লাগল। এমনকি শিক কাবাবের জায়গায় শামিকাবাব নয়, আলু-গোস্তের বদলে কপি-গোস্ত পর্যন্ত নয়। আমি বললুম, “ব্রাদার, আমার ফিয়াঁসে নেই, এসব জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে কেনা।”

একদম হুবহু একই স্বাদ। সায়েব খায় আর আনমনে বাইরের দিকে তাকায়। আমারও আবছা আবছা মনে পড়ল, যখন সওদা করছিলুম তখন যেন এক গাব্দাগোব্দা ফিরিঙ্গি মেমকে হোটেলে যা পাওয়া যায় তাই কিনতে দেখেছি। ফিরিঙ্গিকে বলতে যাচ্ছিলুম তার ফিয়াঁসের একটা বর্ণনা দিতে, কিন্তু থেমে গেলুম।
ভোর কোথায় হলো মনে নেই। জুন মাসের গরম পশ্চিমে গৌরচন্দ্রিকা করে নামে না। সাতটা বাজতে না বাজতেই চড়চড় করে টেরচা হয়ে গাড়িতে ঢোকে আর বাকি দিনটা কী রকম করে কাটবে তার আভাস তখনই দিয়ে দেয়।
গাড়ি যেন কালোয়াত ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছে, কোনো গতিকে রোদ্দুরের তবলচিকে হার মানিয়ে যেন কোথাও গিয়ে ঠান্ডায় জিরোবে। আর রোদ্দুরও চলেছে সঙ্গে সঙ্গে ততোধিক ঊর্ধ্বশ্বাসে। সে পাল্লায় প্যাসেঞ্জারদের প্রাণ যায়।

গাড়ি এর মাঝে আবার ভোল ফিরিয়ে নিয়েছে। দাড়ি লম্বা হয়েছে, টিকি খাটো হয়েছে, নাদুসনুদুস লালাজিদের মিষ্টি মিষ্টি ‘আইয়ে বৈঠিয়ে’ আর শোনা যায় না। এখন ছ-ফুট লম্বা পাঠানদের ‘দাগা, দাগা, দিলতা, রাওড়া’, পাঞ্জাবিদের ‘তুবি, অসি’, আর শিখ সর্দারজিদের জালবন্ধ দাড়ির হরেক রকম বাহার।
সামনের বুড়ো সর্দারজিই প্রথম আলাপ আরম্ভ করলেন। ‘গোয়িঙ্গ ফার?’ নয়, সোজাসুজি ‘কহাঁ জাইয়েগা?’ আমি ডবল তসলিম করে সবিনয় উত্তর দিলুম- ভদ্রলোক ঠাকুরদার বয়সী আর জবরজঙ্গ দাড়ি-গোঁফের ভিতর অতি মিষ্ট মোলায়েম হাসি। জিজ্ঞাসা করলেন, পেশাওয়ারে কাউকে চিনি? না হোটেলে উঠব। বললুম ‘বন্ধুর বন্ধু স্টেশনে আসবেন, তবে তাঁকে কখনো দেখিনি, তিনি যে আমাকে কী করে চিনবেন সে সম্বন্ধে ঈষৎ উদ্বেগ আছে।’
সর্দারজি হেসে বললেন, “কিছু ভয় নেই, পেশাওয়ার স্টেশনে এক গাড়ি বাঙালি নামে না, আপনি দু-মিনিট সবুর করলেই তিনি আপনাকে ঠিক খুঁজে নেবেন।”

আমি সাহস পেয়ে বললুম, “তা তো বটেই, তবে কিনা শার্ট পরে এসেছি-” সর্দারজি এবার অট্টহাস করে বললেন, “শার্টে যে এক ফুট জায়গা ঢাকা পড়ে তাই দিয়ে মানুষ মানুষকে চেনে নাকি?”
আমি আমতা আমতা করে বললুম, “তা নয়, তবে কিনা ধুতি-পাঞ্জাবি পরিলে হয়ত ভালো হতো।”
সর্দারজিকে হারাবার উপায় নেই। বললেন, “এও তো তাজ্জবকি বাত- পাঞ্জাবি পরলে বাঙালিকে চেনা যায়?”
আমি আর এগলুম না। বাঙালি ‘পাঞ্জাবি’ ও পাঞ্জাবি কুর্তায় কী তফাত সে সম্বন্ধে সর্দারজিকে কিছু বলতে গেলে তিনি হয়ত আমাকে আরও বোকা বানিয়ে দেবেন। তার চেয়ে বরঞ্চ উনিই কথা বলুন, আমি শুনে যাই। জিজ্ঞাসা করলুম, “সর্দারজি শিলওয়ার বানাতে ক-গজ কাপড় লাগে?”
বললেন, “দিল্লিতে সাড়ে তিন, জালবন্ধের সাড়ে চার, লাহোরে সাড়ে পাঁচ, লালমুসায় সাড়ে ছয়, রাওলপিন্ডিতে সাড়ে সাত, তারপর পেশোয়ার এক লম্ফে সাড়ে দশ, খাস পাঠানমুল্লুক কোহাট খাইবারে পুরো থান।”
‘বিশ গজ!’
“হ্যাঁ, তাও আবার খাকি শার্টিং দিয়ে বানানো।”
আমি বললুম, “এ রকম এক বস্তা কাপড় গায়ে জড়িয়ে চলাফেরা করে কী করে? মারপিট, খুন-রাহাজানির কথা বাদ দিন।”

সর্দারজি বললেন, “আপনি বুঝি কখনো বায়োস্কোপ যান না? আমি এই বুড়োবয়সেও মাঝে মাঝে যাই। না গেলে ছেলেছোকরা দের মতিগতি বোঝাবার উপায় নেই- আমার আবার একপাল নাতি-নাতনি। এই সেদিন দেখলুম, দুশো বছরের পুরোনো গল্পে এক মেমসায়েব ফ্রকের পর ফ্রক পরেই যাচ্ছেন, পরেই যাচ্ছেন- মনে নেই, দশখানা না বারোখানা। তাতে নিদেনপক্ষে চল্লিশগজ কাপড় লাগার কথা। সেই পরে যদি মেমরা নেচেকুঁদে থাকতে পারেন, তবে মদ্দা পাঠান বিশগজি শিলওয়ার পরে মারপিট করতে পারবে না কেন?” আমি খানিকটা ভেবে বললুম, “হক কথা; তবে কিনা বাজে খরচ।”
ইতোমধ্যে গল্পের ভিতর দিয়ে খবর পেয়ে গিয়েছি যে পাঠানমুল্লুকের প্রবাদ, “দিনের বেলা পেশাওয়ার ইংরেজের, রাত্রে পাঠানের।” শুনে গর্ব অনুভব করেছি বটে যে বন্দুকধারী পাঠান কামানধারী ইংরেজের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে কিন্তু বিন্দুমাত্র আরাম বোধ করিনি। গাড়ি পেশাওয়ার পৌঁছবে রাত নয়টায়। তখন যে কার রাজত্বে গিয়ে পৌঁছব তাই মনে মনে নানা ভাবনা ভাবছি; এমন সময় দেখি গাড়ি এসে পেশাওয়ারেই দাঁড়াল।

প্ল্যাটফরমে বেশি ভিড় নেই। জিনিসপত্র নামাবার ফাঁকে লক্ষ করলুম যে ছ-ফুটি পাঠানদের চেয়েও একমাথা উঁচু এক ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। কাতর নয়নে তাঁর দিকে তাকিয়ে যতদূর সম্ভব নিজের বাঙালিত্ব জাহির করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি এসে উত্তম উর্দুতে আমাকে বললেন, তাঁর নাম শেখ আহমদ আলী। আমি নিজের নাম বলে এক হাত এগিয়ে দিতেই তিনি তাঁর দুহাতে সেটি লুফে নিয়ে দিলেন এক চাপ- পরম উৎসাহে, গরম সংবর্ধনায়। সে চাপে আমার হাতের পাঁচ আঙুল তাঁর দুই থাবার ভিতর তখন লুকোচুরি খেলছে।

খানিকটা কোলে-পিঠে, খানিকটা টেনে-হিঁচড়ে তিনি আমাকে স্টেশনের বাইরে এনে একটা টাঙায় বসালেন। আমি তখন শুধু ভাবছি ভদ্রলোক আমাকে চেনেন না, জানেন না, আমি বাঙালি তিনি পাঠান। তবে যে এত সংবর্ধনা করছেন তার মানে কী? এর কতটা আন্তরিক, আর কতটা লৌকিকতা?

আজ বলতে পারি পাঠানের অভ্যর্থনা সম্পূর্ণ নির্জলা আন্তরিক। অতিথিকে বাড়িতে ডেকে নেওয়ার মতো আনন্দ পাঠান অন্য কোনো জিনিসে পায় না আর সে অতিথি যদি বিদেশি হয় তা হলে তো আর কথাই নেই।

আরবি ভাষায় একটি প্রবাদ আছে “ইয়োম উস সফর, নিসফ উস্ সফর”- অর্থাৎ কিনা যাত্রার দিনই অর্ধেক ভ্রমণ। পূর্ব বাংলায়ও একই প্রবাদ প্রচলিত আছে। সেখানে বলা হয়, ‘উঠোন সমুদ্র পেরলেই আধেক মুশকিল-আসান।’ আহমদ আলীর উঠোন পেরোতে গিয়ে আমার পাক্কা সাতদিন কেটে গেল। আটদিনের দিন সকালবেলা আহমদ আলী স্বয়ং আমাকে একখানা বাসে ড্রাইভারের পাশে বসিয়ে তাকে আমার জান-মাল বাঁচাবার জন্য বিস্তর দিব্যদিলাশা দিয়ে বিদায় নিলেন। হাওড়া স্টেশনে মনে হয়েছিল ‘আমি একা’, এখন মনে হলো ‘আমি ভয়ংকর একা’। ‘ভয়ংকর একা’ এই অর্থে যে নো ম্যানস ল্যান্ডই বলুন আর খাস আফগানিস্তানই বলুন, এসব জায়গায় মানুষ আপন আপন প্রাণ নিয়েই ব্যস্ত।

সাধারণ লোকের বিবেকবুদ্ধি এসব দেশে এরকম কথাই কয়। তবু আফগানিস্তান স্বাধীন সভ্য দেশ; আর পাঁচটা দেশ যখন খুন-খারাবির প্রতি এত বেমালুম উদাসীন নয় তখন তাঁদেরও তো কিছু একটা করবার আছে এই ভেবে দু-চারটে পুলিশ দু-একদিন অকুস্থলে ঘোরাঘুরি করে যায়।

ডানদিকে ড্রাইভার শিখ সর্দারজি। বয়স ষাটের কাছাকাছি। কাঁচাপাকা দীর্ঘ দাড়ি ও পরে জানতে পারলুম রাতকানা। বাঁ দিকে আফগান সরকারের এক কর্মচারী। পেশাওয়ার গিয়েছিলেন কাবুল বেতারকেন্দ্রের মালসরঞ্জাম ছাড়িয়ে আনবার জন্য। সব ভাষাই জানেন অথচ বলতে গেলে এক ফরাসি ছাড়া অন্য কোনো ভাষাই জানেন না। অর্থাৎ আপনি যদি তাঁর ইংরেজি না বোঝেন তবে তিনি ভাবখানা করেন যেন আপনিই যথেষ্ট ইংরেজি জানেন না, তখন তিনি ফরাসির যে ছয়টি শব্দ জানেন সেগুলো ছাড়েন। তখনো যদি আপনি তার বক্তব্য না বোঝেন তবে তিনি উর্দু ঝাড়েন। শেষটায় এমন ভাব দেখান যে অশিক্ষিত বর্বরদের সঙ্গে কথা বলবার ঝকমারি আর তিনি কত পোহাবেন? অথচ পরে দেখলুম ভদ্রলোক অত্যন্ত বন্ধুবৎসল, বিপন্নেসহায়। তারও পরে বুঝতে পারলুম ভাষা বাবদে ভদ্রলোকের এ দুর্বলতা কেন যখন শুনতে পেলুম যে তিনি অনেক ভাষায় পাণ্ডিত্যর দাবি করে বেতারে চাকরি পেয়েছেন।

বাসের পেটে একপাল কাবুলি ব্যবসায়ী। পেশাওয়ার থেকে সিগারেট, গ্রামোফোন, রেকর্ড, পেলেট-বাসন, ঝাড়-লণ্ঠন, ফুটবল, বিজলি-বাতির সাজ-সরঞ্জাম, কেতাব-পুঁথি, এক কথায় দুনিয়ার সব জিনিস কিনে নিয়ে যাচ্ছে। বাদবাকি প্রায় সব কিছুই আমদানি করতে হয় হিন্দুস্থান থেকে, কিছুটা রুশ থেকে। এসব তথ্য জানবার জন্য আফগান সরকারের বাণিজ্য প্রতিবেদন পড়তে হয় না, কাবুল শহরে একটা চক্কর মারলেই হয়।
সে সব পরের কথা। পেশাওয়ার থেকে জামরুদ দুর্গ সাড়ে দশ মাইল সমতল ভূমি। সেখানে একদফা পাসপোর্ট দেখাতে হলো। তারপর খাইবার গিরিসংকট।

দুদিকে হাজার ফুট উঁচু পাথরের নেড়া পাহাড়। মাঝখানে খাইবার পাস। এক জোড়া রাস্তা এঁকেবেঁকে একে অন্যের গা ঘেঁষে চলেছে কাবুলের দিকে। এক রাস্তা মোটরের জন্য, অন্য রাস্তা উট খচ্চর গাধা ঘোড়ার পণ্যবাহিনী বা ক্যারাভানের জন্য। সংকীর্ণতম স্থলে দুই রাস্তায় মিলে ত্রিশ হাতও হবে না। সে রাস্তা আবার মাতালের মতো টলতে টলতে এতই একেবেঁকে গিয়েছে যে, যে কোনো জায়গায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে ডানে বাঁয়ে পাহাড়, সামনে পিছনে পাহাড়।

দ্বিপ্রহর সূর্য সেই নরককুণ্ডে সোজা নেমে এসেছে-তাই নিয়ে চতুর্দিকের পাহাড় যেন লোফালুফি খেলছে।
অবাক হয়ে দেখছি সেই গরমে বুখারার পুস্তিন (ফার) ব্যবসায়ীরা দুই ইঞ্চি পুরু লোমওয়ালা চামড়ার ওভারকোট গায়ে দিয়ে খচ্চর খেদিয়ে খেদিয়ে ভারতবর্ষের দিকে চলেছে। সর্দারজিকে রহস্য সমাধানের অনুরোধ জানালে তিনি বললেন, যাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে তাদের পক্ষে সত্যই এরকম পুরু জামা এই গরমে আরামদায়ক। বাইরের গরম ঢুকতে পারে না, শরীর ঠান্ডা রাখে। ঘাম তো আর এদেশে হয় না, আর হলেই বা কি? এরা তার থোড়াই পরোয়া করে। এটুকু বলতে বলতেই দেখলুম গরমের হল্কা মুখে ঢুকে সর্দারজির গলা শুকিয়ে দিল। গল্প জমাবার চেষ্টা বৃথা।

কত দেশের কত রকমের লোক পণ্যবাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। কত ঢঙের টুপি, কত রঙের পাগড়ি, কত যুগের অস্ত্র-গাদাবন্দুক থেকে আরম্ভ করে আধুনিকতম জর্মন মাউজার। দামেস্কের বিখ্যাত সুদর্শন তরবারি, সুপারি কাটার জাঁতির মতো 'জামধর' মোগল ছবিতে দেখেছিলুম, বাস্তবে দেখলুম হুবহু সেই রকম গোলাপি সিল্কের কোমরবন্ধে গোঁজা। কারো হাতে কানজোখা পেতলে বাঁধানো লাঠি, কারো হাতে লম্বা ঝকঝকে বর্শা। উঠের পিঠে পশমে রেশমে বোনা কত রঙের কার্পেট, কত আকারের সামোভার। বস্তা বস্তা পেস্তা বাদাম আখরোট কিসমিস আলুবুখারা চলেছে হিন্দুস্থানের বিরিয়ানি পোলাওয়ের জৌলুস বাড়াবার জন্য। আরও চলেছে, শুনতে পেলুম, কোমরবন্ধের নিচে, ইজেরের ভাঁজে, পুস্তিনের লাইনিংয়ের ভিতরে আফিং আর হাসিস না ককেনই, না আরও কিছু।
সবাই চলেছে অতি ধীরে অতি মন্থরে।

পাঠান দু-বার বলেছিলেন, আমি তৃতীয়বার সেই প্রবাদ শপথরূপে গ্রহণ করলুম। 'হন্তদন্ত হওয়ার মানে শয়তানের পন্থায় চলা।' কে বলে বিংশ শতাব্দীতে অলৌকিক ঘটনা ঘটে না? আমার সকল সমস্যা সমাধান করেই যেন ধড়াম করে শব্দ হলো। কাবুলি তড়িৎ গতিতে চোখের ফেটা খুলে আমার দিকে বিবর্ণ মুখে তাকাল, আমি সর্দারজির দিকে তাকালুম। তিনি দেখি অতি শান্তভাবে গাড়িখানা এক পাশে নিয়ে দাঁড় করালেন। বললেন, টায়ার ফেঁসেছে। প্রতিবারেই হয়। এই গরমে না হওয়াই বিচিত্র।'

প্রয়োজন ছিল না, তবু সর্দারজি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, খাইবার পাসের রাস্তা দুটো সরকারের বটে, কিন্তু দুদিকের জমি পাঠানের। সেখানে নেমেছ কি মরেছ। আড়ালে-আবডালে পাঠান সুযোগের অপেক্ষায় ওৎ পেতে বসে আছে। নামলেই কড়াক- পিতৃ। তারপর কী কায়দায় সব কিছু হরণ করে তার বর্ণনা দেবার আর প্রয়োজন নেই।

পাঠান যাতে ঠিক রাস্তার বুকের ওপর রাহাজানি না করে তার জন্য খাইবার পাসের দুদিকে যেখানে বসতি আছে সেখানকার পাঠানদের ইংরেজ দু-টাকা করে বছরে খাজনা দেয়। পরে আরেকটি শর্ত অতি কষ্টে আদায় করেছে। আফ্রিদি আফ্রিদিতে ঝগড়া বাধলে রাস্তার এপারে ওপারে যেন বন্দুক না মারা হয়।
মোটর আবার চলল। কাবুলির গলা ভেঙে গিয়েছে। তবু বিড়বিড় করে যা বলছিলেন, তার নির্যাস-
কিচ্ছু ভয় নেই সায়েব- কালই কাবুল পৌঁছে যাচ্ছি। সেখানে পৌঁছে কর্ করে কাবুল নদীতে ডুব দেব। বরফগলা হিমজল পাহাড় থেকে নেমে এসেছে, দিল জান কলিজা সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
আমি বললুম, "আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।"
হঠাৎ দেখি সামনে একি! মরীচিকা? সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে গেট কেন? মোটর থামল। পাসপোর্ট দেখাতে হলো। গেট খুলে গেল। আফগানিস্তানে ঢুকলুম। বড়ো বড়ো হরফে সাইনবোর্ডে লেখা-
কাবুলি বললেন, "দুনিয়ার সব পরীক্ষা পাস করার চেয়ে বড় পরীক্ষা খাইবারপাস পাস করা। আলহামদুলিল্লা (খুদাকে ধন্যবাদ)।"
আমি বললুম, "আমেন।"

খাইবার পাস তো দুঃখে-সুখে পেরোলুম এবং মনে মনে আশা করলুম এইবার গরম কমবে। কমলো বটে, কিন্তু পাসের ভিতর পিচ-ঢালা রাস্তা ছিল-তা সে সংকীর্ণ হোক আর বিস্তীর্ণই হোক। এখন আর রাস্তা বলে কোনো বালাই নেই। হাজারো বৎসরের লোক-চলাচলের ফলে পাথর এবং অতি সামান্য মাটির ওপর যে দাগ পড়েছে তারই উপর দিয়ে মোটর চলল। এ দাগের ওপর দিয়ে পণ্যবাহিনীর যেতে আসতে কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু মোটর-আরোহীর পক্ষে যে কতদূর পীড়াদায়ক হতে পারে তার খানিকটা তুলনা হয় বীরভূম-বাঁকুড়ায় ডাঙ্গা ও খোয়াইয়ে রাত্রিকালে গোরুর গাড়ি চড়ার সঙ্গে- যদি সে গাড়ি কুড়ি মাইল বেগে চলে, ভিতরে খড়ের পুরু তোশক না থাকে এবং ছোটবড় নুড়ি দিয়ে ডাঙ্গা-খোয়াই ছেয়ে ফেলা হয়।
লান্ডিকোটাল থেকে দক্কা দশ মাইল।

সেই মরুপ্রান্তরে দক্কাদুর্গ অত্যন্ত অবান্তর বলে মনে হলো। মাটি আর খড় মিশিয়ে পিটে পিটে উঁচু দেয়াল গড়ে তোলা হয়েছে আশপাশের রঙের সঙ্গে রং মিলিয়ে- ফ্যাকাশে, ময়লা, ঘিনঘিনে হলদে রং। দেয়ালের ওপরের দিকে এক সারি গর্ত; দুর্গের লোক তারই ভিতরে দিয়ে বন্দুকের নল গলিয়ে নিরাপদে বাইরের শত্রুকে গুলি করতে পারে। দূর থেকে সেই কালো কালো গর্ত দেখে মনে হয় যেন অন্ধের উপড়ে নেওয়া চোখের শূন্য কোটর।
কিন্তু দুর্গের সামনে এসে বাঁ দিকে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। ছলছল করে কাবুল নদী বাঁক নিয়ে এক পাশ দিয়ে চলে গিয়েছেন- ডান দিকে এক ফালি সবুজ আঁচল লুটিয়ে পড়েছে।
কাবুলি বললেন, "চলুন দুর্গের ভিতরে যাই। পাসপোর্ট দেখাতে হবে। আমরা সরকারি কর্মচারী। তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেবে। তাহলে সন্ধ্যার আগেই জালালাবাদ পৌঁছতে পারব।"
দুর্গের অফিসার আমাকে বিদেশি দেখে প্রচুর খাতির-যত্ন করলেন। দক্কার মতো জায়গায় বরফের কল থাকার কথা নয়, কিন্তু যে শরবত খেলুম তার জন্য ঠাণ্ডা জল কুঁজোতে কী করে তৈরি করা সম্ভব হলো বুঝতে পারলুম না।

আফগানিস্তানের অফিসার যদি কবি হতে পারেন, তবে তাঁর পক্ষে পির হয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করাও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। তিন-তিনবার চাকা ফাটালো, আর ইঞ্জিন সর্দারজির ওপর গোসা করে দুবার গুম হলেন। চাকা সারাল হ্যাজি ম্যানন তদারক করলেন সর্দারজি।

জালালাবাদ পৌঁছবার কয়েক মাইল আগে সর্দারজির কোমরবন্ধ অথবা নীবিবন্ধ কিংবা বেল্ট- যাই বলুন, ছিঁড়ে দুটুকরো হলো। তখন খবর পেলুম সর্দারজিও রাতকানা। রেডিওর কর্মচারী আমার কানটাকে মাইক্রোফোন ভেবে ফিস ফিস করে প্রচার করে দিলেন, “অদ্যকার মতো আমাদের অনুষ্ঠান এইখানেই সমাপ্ত হলো। কাল সকাল সাতটায় আমরা আবার উপস্থিত হব।” আধ মাইলটাক দূরে আফগান সরাই। বেতারের সায়েব ও আমি আস্তে আস্তে সেদিকে এগিয়ে চললুম। বাদবাকি আর সকলে হৈ-হল্লা করে করে গাড়ি ঠেলে নিয়ে চলল।

সর্দারজি তন্বী করে বললেন, একটু পা চালিয়ে। সন্ধ্যা হয়ে গেলে সরাইয়ের দরজা বন্ধ করে দেবে।"
সরাই তো নয়, ভীষণ দুশমনের মতো দাঁড়িয়ে এক চৌকো দুর্গ। "কর্মঅন্তে নিভৃত পান্থশালাতে" বলতে আমাদের চোখে যে স্নিগ্ধতার ছবি ফুটে উঠে এর সঙ্গে তার কোনো সংশ্রব নেই। ত্রিশ ফুট উঁচু হলদে মাটির নিরেট চারখানা দেয়াল, সামনের খানাতে এক বিরাট দরজা- তার ভেতর দিয়ে উট, বাস, ডবল-ডেকার পর্যন্ত অনায়াসে ঢুকতে পারে, কিন্তু ভেতরে যাবার সময় মনে হয়, এই শেষ ঢোকা, এ দানবের পেট থেকে আর বেরোতে হবে না।

ঢুকেই থমকে দাঁড়ালুম। কত শত শতাব্দীর পুঞ্জীভূত দুর্গন্ধ আমাকে ধাক্কা মেরেছিল বলতে পারি নে, কিন্তু মনে হলো আমি যেন সে ধাক্কায় তিন গজ পিছিয়ে গেলুম। ব্যাপারটা কী বুঝতে অবশ্য বেশি সময় লাগল না। এলাকাটা মৌসুমি হাওয়ার বাইরে, তাই এখানে কখনো বৃষ্টি হয় না- যথেষ্ট উঁচু নয় বলে বরফও পড়ে না। আশেপাশে নদী বা ঝরনা নেই বলে ধোয়ামোছার জন্য জলের বাজে খরচার কথাও ওঠে না। অতএব সিকন্দরশাহি বাজিরাজ থেকে আরম্ভ করে পরশুদিনের আস্ত ভেড়ার পাল যে সব ‘অবদান’ রেখে গিয়েছে, তার স্থূলভাগ মাঝে মাঝে সাফ করা হয়েছে বটে, কিন্তু সূক্ষ্ম গন্ধ সর্বত্র এমনি স্তরীভূত হয়ে আছে যে, ভয় হয় ধাক্কা দিয়ে না সরালে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব।
সূচিভেদ্য অন্ধকার দেখেছি, এই প্রথম সূচিভেদ্য দুর্গন্ধ শুকলুম।

ভোরবেলা ঘুম ভাঙল আজান শুনে। নামাজ পড়ালেন বুখারার এক পুস্তিন সদাগর। উৎকৃষ্ট আরবি উচ্চারণ শুনে বিস্ময় মানলুম যে তুর্কিস্তানে এত ভালো উচ্চারণ টিকে রইল কী করে। বেতারওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বললেন, "আপনি নিজেই জিজ্ঞেস করুন না।" আমি বললুম, "কিছু যদি মনে করেন?" আমার এই সংকোচে তিনি এত আশ্চর্য হলেন যে বুঝতে পারলুম, খাস প্রাচ্য দেশে অচেনা-অজানা লোককে যে কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে বাধা নেই। পরে জানলুম, যার সম্বন্ধে কৌতূহল দেখানো হয় সে তাতে বরঞ্চ খুশিই হয়।

মোটরে বসে তারই খেই তুলে নিয়ে আগের রাতের অভিজ্ঞতার জমাখরচা নিতে লাগলুম।
চোখ বন্ধ অবস্থায়ই ঠাণ্ডা হাওয়ার প্রথম পরশ পেলুম; খুলে দেখি সামনে সবুজ উপত্যকা- রাস্তার দুদিকে ফসল ক্ষেত। সর্দারজি পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, "জালালাবাদ"। তখন দুদিকেই সবুজ, আর লোকজনের ঘরবাড়ি। সামান্য একটি নদী ক্ষুদ্রতম সুযোগ পেলে যে কী মোহন সবুজের লীলাখেলা দেখাতে পারে জালালাবাদে তার অতি মধুর তসবির। এমনকি যে দু-চারটে পাঠান রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল তাদের চেহারাও যেন সীমান্তের পাঠানের চেয়ে মোলায়েম বলে মনে হলো। লক্ষ করলুম, যে পাঠান শহরে গিয়ে সেখানকার মেয়েদের বেপর্দামি নিন্দা করে তারই বউ-ঝি ক্ষেতে কাজ করছে অন্য দেশের মেয়েদেরই মতো। মুখ তুলে বাসের দিকে তাকাতেও তাদের আপত্তি নেই। বেতার কর্তাকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, "আমার যতদূর জানা, কোনো দেশের গরিব মেয়েই পর্দা মানে না, অন্তত আপন গাঁয়ে মানে না। শহরে গিয়ে মধ্যবিত্তের অনুকরণে কখনো পর্দা মেনে 'ভদ্রলোক হবার চেষ্টা করে' কখনো কাজ-কর্মের অসুবিধা হয় বলে গাঁয়ের রেওয়াজই বজায় রাখে।"

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, "আরবের বেদুইন মেয়েরা"।
তিনি বললেন, 'আমি ইরাকে তাদের বিনা পর্দায় ছাগল চরাতে দেখেছি।'
গাড়ি সদর রাস্তা ছেড়ে জালালাবাদ শহরে ঢুকল। কাবুলিরা সব বাসের পেট থেকে বেরিয়ে এক মিনিটের ভেতর অন্তর্ধান। কেউ একবার জিজ্ঞেস পর্যন্ত করল না, বাস ফের ছাড়বে কখন। আমার তো এই প্রথম যাত্রা, তাই সর্দারজিকে শুধালাম "বাস আবার ছাড়বে কখন?" সর্দারজি বললেন, আবার যখন সবাই জড়ো হবে। জিজ্ঞেস করলুম সে কবে? সর্দারজি যেন একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, "আমি তার কী জানি? সবাই খেয়েদেয়ে ফিরে আসবে যখন তখন।"

বেতারকর্তা বললেন, "ঠায় দাঁড়িয়ে করছেন কী? আসুন আমার সঙ্গে।" আমি শুধালাম, “আর সব গেল কোথায়? ফিরবেই বা কখন?”
তিনি বললেন, “ওদের জন্য আপনি এত উদ্বিগ্ন হচ্ছেন কেন, আপনি তো ওদের মালজানের জিম্মাদার নন।”
আমি বললুম, “তা তো নই-ই। কিন্তু যেরকম ভাবে হুট করে সবাই নিরুদ্দেশ হলো তাতে তো মনে হলো না যে ওরা শিগগির ফিরবে। আজ সন্ধ্যায় তা হলে কাবুল পৌঁছব কী করে?"

বেতারকর্তা বললেন, 'সে আশা শিকেয় তুলে রাখুন। এদের তো কাবুল পৌঁছবার কোনো তাড়া নেই। বাস যখন ছিল না, তখন ওরা কাবুল পৌঁছত পনেরো দিনে, এখন চার দিন লাগলেও তাদের আপত্তি নেই। জালালাবাদে পৌঁছেছে এখানে সক্কলেরই কাকা-মামা-শালা, কেউ-না-কেউ আছে, তাদের তত্ত্বতালাশ করবে, খাবে-দাবে, তারপর ফিরে আসবে।'

মোটর ছাড়ল অনেক বেলায়। কাজেই বেলাবেলি কাবুল পৌঁছবার আর কোনো ভরসাই রইল না। পেশাওয়ার থেকে জালালাবাদ একশ মাইল, জালালাবাদ থেকে কাবুল আরও একশ মাইল। শাস্ত্রে লেখে, সকলে পেশওয়ার ছেড়ে সন্ধ্যায় জালালাবাদ পৌঁছবে। পরদিন ভোরবেলা জালালাবাদ ছেড়ে সন্ধ্যায় কাবুল। তখনই বোঝা উচিত ছিল যে, শাস্ত্র মানে অল্প লোকেই। পরে জানলুম একমাত্র মেল বাস ছাড়া আর কেউ শাস্ত্রনির্দিষ্ট বেগে চলে না। সন্ধ্যা কাটল নালার পারে, নারগিস বনের এক পাশে, চিনার মর্মরের মাঝখানে। সূর্যাস্তের শেষ আভাটুকু চিনার-পল্লব থেকে মুছে যাওয়ার পরে ডাক-বাংলোর খানসামা আহার দিয়ে গেল। খেয়েদেয়ে সেখানেই চারপাই আনিয়ে শুয়ে পড়লুম।

শেষরাত্রে ঘুম ভাঙল অপূর্ব মাধুরীর মাঝখানে। হঠাৎ শুনি নিতান্ত কানের পাশে জলের কুলুকুলু শব্দ আর আমার সর্বদেহ জড়িয়ে নাকমুখ ছাপিয়ে কোন অজানা সৌরভ সুন্দরীর মধুর নিঃশ্বাস।

শেষরাত্রে নৌকা যখন বিল ছেড়ে নদীতে নামে তখন যেমন নদীর কুলুকুলু শব্দে ঘুম ভেঙে যায়, জানলার পাশে শিউলি গাছ থাকলে শরতের অতি ভোরে যে রকম তন্দ্রা টুটে যায়, এখানে তাই হলো কিন্তু দুয়ে মিলে গিয়ে। এ সংগীত বহুবার শুনেছি, কিন্তু তার সঙ্গে এহেন সৌরভসোহাগ জীবনে আর কখনো পাইনি।

সেই আধা-আলো-অন্ধকারে চেয়ে দেখি দিনের বেলার শুকনো নালা জলে ভরে গিয়ে দুই কূল ছাপিয়ে নারগিসের পা ধুয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে। বুঝলুম নালার উজানে দিনের বেলায় বাঁধ দিয়ে জল বন্ধ করা হয়েছিল- ভোরের আজানের সময় নিমলার বাগানের পালা; বাঁধ খুলে দিতেই নালা ছাপিয়ে জল ছুটেছে- তারই পরশে নারগিস নয়ন মেলে তাকিয়েছে। এর গান ওর সৌরভে মিশে গিয়েছে।

আর যে-চিনারের পদপ্রান্তে উভয়ের সংগীতে সৌরভ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে, সে তার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রভাতসূর্যের প্রথম রশ্মির নবীন অভিষেকের জন্য। দেখতে-না-দেখতে চিনার সোনার মুকুট পরে নিল- পদপ্রান্তে পুষ্পবনের গন্ধধূপে বৈতালিক মুখরিত হয়ে উঠল।
“এদিন আজি কোন ঘরে গো
খুলে দিল দ্বার
আজি প্রাতে সূর্য ওঠা
সফল হলো কার?”
ভোরের নামাজ শেষ হতেই সর্দারজি ভেঁপু বাজাতে আরম্ভ করলেন। ভাবগতিক দেখে মনে হলো তিনি মনস্থির করে ফেলেছেন, আজ সন্ধ্যায় যে করেই হোক কাবুল পৌঁছবেন।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির উৎস নির্দেশ:
সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত ‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনিটি তাঁর ‘দেশে বিদেশে’ (১৯৪৮) গ্রন্থের ১ম থেকে ১০ম পরিচ্ছেদ থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে সংকলিত হয়েছে।

‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির শব্দার্থ ও টীকা:
১.
➠ নয়সিকে- ১ সিকি সমান ০.২৫ পয়সা। আর ৯ সিকি সমান ২ টাকা ২৫ পয়সা।
➠ বিচক্ষণ- দূরদর্শী; সুবিবেচক; বিদ্বান; দক্ষ।
➠ সর্বত্র- সব জায়গায়; সর্ব স্থানে; সবদিকে।
➠ আনাগোনা- যাতায়াত।
হাওড়া স্টেশন- পশ্চিমবঙ্গের একটি রেলস্টেশন। আয়তনের দিক থেকে এটি ভারতের একটি বৃহত্তর রেলস্টেশন। বর্তমানে এই স্টেশনে ২৬টি প্লাটফর্ম আছে।
➠ গাঁকগাঁক- উচ্চস্বরে কথা বলার ভঙ্গি।
➠ অন্ত্যদেশে- শেষ প্রান্তে; শেষ অংশে।
➠ সিলেবলে- একটি Word-এর যতটুকু অংশ একবারে উচ্চারণ করা যায়, ততটুকু অংশকে এক একটি Syllable বা শব্দংশ বলে । যেমন : Farmer= Far+mer; Mother= Mo+ther.
➠ অ্যাকসেন্ট- (accent) অক্ষরের উপর জোর।
➠ প্রাগদেশ- কোনো কিছুর শুরুতে। পূর্বদেশ। পূর্বস্থান।
➠ ফিরিঙ্গি- ফার্সি থেকে আগত শব্দ। এর অর্থ হলো ফরাসি বা ইউরোপিয়ান। তবে ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষে সাদা চামড়ার বিদেশি মাত্রেই ফিরিঙ্গি বলে অভিহিত হতেন।
➠ নেটিভ- ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের নেটিভ বলে অভিহিত করতেন। এর মানে হলো স্বদেশি। যে ব্যক্তি যে-দেশে বা যে পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি ওই দেশের বা পরিবেশের নেটিভ।
➠ ফুরসত- অবকাশ।
➠ মনমরা- বিমর্ষ; উৎসাহহীন।
➠ আলাপচারিতা- আলাপ-আলোচনা, কথোপকথন।
➠ প্রকাণ্ড- বড়ো; মস্ত; বিশাল।
➠ চুবড়ি- বেত বা বাঁশের কঞ্চির তৈরি চওড়ামুখ ছোটো ঝুড়ি, টুকরি, ছোটো ধামা।
➠ ফিয়াঁসে- ভালোবাসার নারী। প্রাচীন ফরাসি ভাষায় এর অর্থ প্রতিজ্ঞা।
➠ Dinner- রাতের খাবার।
➠ পুরাদস্তুর- সম্পূর্ণ।
➠ পল্টন- ফৌজ; সৈন্যদল।
➠ বড্ড- খুব।
➠ তর্কাতর্কি- অনুকূল ও প্রতিকূল যুক্তি প্রদর্শন-সহ কথা-কাটাকাটি, বাদপ্রতিবাদ।
➠ আলাকার্ত- Ala carte। ফরাসি শব্দ। এর অর্থ খাদ্যতালিকা অনুযায়ী।
জাকারিয়া স্ট্রিট- কলকাতার একটি স্থান। হোটেলের জন্য বিখ্যাত। সব ধরনের খাবার পাওয়া যায়।
মুরগি মুসল্লম- এর অর্থ পুরো মুরগি। এটি মুঘলাই খাবার যা ভারতীয়দের কাছে বেশ জনপ্রিয়। একটা পুরো মুরগি আদা, রসুন বাটা ও অন্যান্য মশলা সহকারে তৈরি করা হয়। এটি শুকনো কিংবা ঝোলসহ রান্না করা হয়। কাজুবাদাম ও রূপালি পাতা দিয়ে পরিবেশন করা হয়।
➠ চক্ষুস্থির- অত্যধিক বিস্ময়জনিত হতবুদ্ধিতা।
➠ ফিরিস্তি- ফর্দ; তালিকা; সূচিপত্র।
শিক কাবাব- শলাকায় গেঁথে আগুনে ঝলসানো মসলামাখা মাংস।
➠ শামিকাবাব- মাংস ডাল প্রভৃতির তৈরি বড়াবিশেষ।
➠ সওদা- পণ্যদ্রব্য।
➠ গাব্দাগোব্দা- গাবদাগোবদা অর্থ স্থূল ও বেমানান; মোটাসোটা ।
➠ গৌরচন্দ্রিকা- ভূমিকা। প্রাক্কথন।
➠ চড়চড়- রোদের তাপে কাঠ ফাটার অনুকার শব্দ।
➠ কালোয়াত- ধ্রুপদ, খেয়াল ইত্যাদি। সংগীতে পারদর্শী শিল্পী। উচ্চাঙ্গ সংগীতের মতো দ্রুত লয়ে।
➠ তবলচি- গানের সঙ্গে তবলা বাজায় যে; তবলবাদক।
➠ নাদুসনুদুস- হৃষ্টপুষ্ট; মোটাসোটা; গোলগাল; থলথলে।
➠ লালাজি- সাধারণত সম্মানসূচকভাবে একজন বয়স্ক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সম্বোধন করা। বিশেষ করে, এটি হিন্দি এবং উর্দুভাষী অঞ্চলে প্রচলিত; যেখানে স্যার বা mister-এর মতো ব্যবহার করা হয়।
➠ টিকি- মাথার পেছনে রেখে দেওয়া কেশগুচ্ছ; শিখা; চৈতন।
➠ জবরজঙ্গ- বিশৃঙ্খল; এলোমেলো।
➠ ঈষৎ- সামান্য।
➠ উদ্বেগ- ভয়মিশ্রিত ভাবনা; দুশ্চিন্তা।
পেশোয়ার স্টেশন- পাকিস্তানের পেশোয়ারে অবস্থিত রেলস্টেশন।
➠ দিল্লি- ভারতের রাজধানী শহর। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল শহর হিসেবে পরিচিত। আয়তনের দিক থেকে ভারতের সবচেয়ে বড় শহর এবং ভারতের প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম।
➠ জলন্ধর- ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অতি প্রাচীন শহর। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে পরিচিত।
➠ লালমুসা- লালামুসা হলো পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গুজরাট জেলার একটি ছোট শহর এবং গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (জিটি রোড)-এ অবস্থিত।
➠ রাওলপিন্ডি- পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে নয় মাইল দূরের শহর রাওয়ালপিন্ডি। পাকিস্তানের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর।
➠ এক লম্ফে- এক লাফে।
➠ পেশোয়ার- পাকিস্তানের খাইবার পাখতুন প্রদেশের সবচেয়ে বড় শহর পেশোয়ার। খাইবার পাস-এর শেষ পূর্ব প্রান্তের হ্রদের পাশে শহরটি অবস্থিত। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে শহরটি সমৃদ্ধ।
➠ বায়োস্কোপ- দ্বিমাত্রিক চলমান চিত্র; ছায়াছবি।
➠ ছেলেছোকরা- অপরিণত বুদ্ধির বালক; কিশোর বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি।
➠ মতিগতি- মনের গতিপ্রকৃতি; হাবভাব; অভিপ্রায় ও চেষ্টা।
➠ একপাল- অনেক; বহু; প্রচুর।
➠ ফ্রক- বালিকাদের পরিধেয় ঘাগরাজাতীয় খাটো জামা।
➠ নিদেনপক্ষে- অন্ততপক্ষে।
➠ মদ্দা- মরদ; ব্যাটাছেলে; পুরুষ; যুবক; জোয়ানলোক।
দিনের বেলা পেশাওয়ার ইংরেজের, রাত্রে পাঠানের- দিনের বেলা পেশাওয়ার শহরে ব্রিটিশ বা ইংরেজদের আধিপত্য ছিলো; আর রাতের বেলা পাঠান জাতির প্রভাব বেশি ছিলো। অন্যভাবে বলা যায়, দিনের বেলা পেশাওয়ার শহরে ব্রিটিশ বা ইংরেজরা তাদের কাজকর্ম করত, আর রাতের বেলা পাঠানরা তাদের নিজেদের মতো করে চলত।

২.
➠ প্ল্যাটফরম- রেলগাড়িতে যাত্রীদের ওঠানামার জন্য স্টেশনে রেললাইনের ধার ঘেঁষে নির্মিত উঁচু ও লম্বা সমতল মেঝে।
➠ পাঠান- পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অধিবাসী।
➠ জাহির- প্রদর্শন।
➠ টাঙা- টাট্টু ঘোড়ায় টানা দুই চাকার গাড়ি।
➠ লৌকিকতা- সামাজিক শিষ্টাচার; সামাজিকতা; অভ্যর্থনা।
➠ নির্জলা- খাঁটি।

৩.
➠ প্রবাদ- বহুকাল যাবৎ প্রচলিত উপদেশমূলক উক্তি। প্রবচন। জনশ্রুতি।
➠ আধেক- অর্ধেক; আধাআধি।
মুশকিল-আসান- সমস্যার সমাধান; বিপদ বা অসুবিধা থেকে মুক্তি।
➠ খুন-খারাবি- রক্তারক্তি; রক্তপাত; হত্যাকাণ্ড; দাঙ্গাহাঙ্গামা।
➠ বেমালুম- সম্পূর্ণ, জ্ঞাত বিষয় নয় এমন।
➠ উদাসীন- নিরপেক্ষ। অনাসক্ত। নির্লিপ্ত। বৈরাগী। স্ত্রীবাচক: উদাসীনা।
➠ অকুস্থল- যে স্থানে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, ঘটনাস্থল।
➠ শিখ- গুরু নানক প্রবর্তিত ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়।
➠ রাতকানা- (সাধারণত ভিটামিন এ অভাবজনিত) চোখের রোগবিশেষ। রাতে ভালো দেখতে পায় না এমন।
➠ বেতারকেন্দ্র- বেতার অনুষ্ঠান সম্প্রচারের স্থান।
➠ ঝকমারি- ঝামেলা; মূর্খতা; বোকামি।
➠ বন্ধুবৎসল- বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা আছে এমন।
➠ বিপন্ন- সংকটাপন্ন। স্ত্রীবাচক: বিপন্না।
➠ সহায়- যে ব্যক্তি সাহায্য করে। অবলম্বন।
➠ পাণ্ডিত্য- বিদ্যাবত্তা; মনীষা; বিচক্ষণতা; অভিজ্ঞতা।
গ্রামোফোন- যে যন্ত্রে কোনো ঘূর্ণ্যমান চাকতির অমসৃণ খাঁজের ওপর রাখা একটি পিনের সঙ্গে সংযুক্ত ডায়াফ্রাম থেকে উৎপন্ন শব্দ শোনা যায়; কলের গান।
➠ বাদবাকি- অবশিষ্ট হিসেবে রয়ে গেছে বা বাকি আছে এমন।
জামরুদ দুর্গ- এটি পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার খাইবার জেলার পেশোয়ার দিক থেকে খাইবার গিরিপথের প্রবেশপথে বাব-ই-খাইবারের পাশে অবস্থিত।

৪.
খাইবার পাস- গিরিপথ। এই গিরিপথের মাধ্যমে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সংযোগ সাধিত হয়েছে। পৃথিবীর প্রাচীনতম রাস্তার মধ্যে এটি অন্যতম। আলেকজান্ডার দি গ্রেট ও চেঙ্গিস খান থেকে শুরু করে মুসলিম শাসকগণ তাদের বিশ্ব বিজয়ে খাইবার পাস ব্যবহার করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবে ব্রিটিশরা এই খাইবার পাস দিয়ে একটি ভারি রেলওয়ে নির্মাণ করে। বর্তমানে এই পথ দিয়ে আমেরিকা তাদের সৈন্যদের জন্য আফগানিস্তানে রসদ নিয়ে যায়।
➠ খচ্চর- ঘোড়া ও গাধার মিলনজাত পশু; অশ্বতর।
➠ মাতাল- যে মদের নেশায় বিভাের হয়ে আছে; মদে আসক্ত।
➠ দ্বিপ্রহর- দ্বিতীয় প্রহর; দুপুর; মধ্যাহ্ন।
➠ নরককুণ্ড- পাপীদের শাস্তিভোগের জন্য নরকের কুণ্ড। (বাংলায়) অত্যন্ত নোংরা ও যন্ত্রণাদায়ক স্থান।
➠ লোফালুফি- পরস্পরের দিকে ছুড়ে দেওয়া ও লুফে নেওয়ার কাজ।
➠ বুখারা- উজবেকিস্তানের পঞ্চম বৃহৎ শহর। প্রাচীন এই শহর ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতিচর্চা ও ধর্মচর্চার জন্য বিখ্যাত। একদিকে প্রচুর স্থাপত্যকর্ম এবং অন্যদিকে মসজিদ-মাদ্রাসা এই শহরটিকে বৈচিত্র্যমণ্ডিত করে তুলেছে।
➠ পুস্তিন- চামড়ার জামা বা কোট।
➠ থোড়াই- সামান্যই; অল্পই।
➠ পরোয়া- গ্রাহ্য; তোয়াক্কা; ভয়; আশঙ্কা।
➠ গাদাবন্দুক- যে বন্দুক থেকে গুলি নিক্ষেপ করার জন্য বারুদ ঠেসে ভরতে হয়।
জর্মন মাউজার- জার্মানের একটি অস্ত্র তৈরির কারখানার নাম মাউজার (Mauser)। পল মাউজার এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৮৭৪ সালের ২৩এ মে কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখনো এই প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনকৃত রাইফেল ও পিস্তল সারা পৃথিবীতে বিক্রি হয়।
➠ দামেস্ক- সিরিয়ার রাজধানী। সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চার বিখ্যাত কেন্দ্র। চার হাজার বছর আগে শহরটি নির্মিত হয়।
➠ জাঁতি- সুপারি কাটার অস্ত্রবিশেষ; সরতা। জাঁতাকল।
➠ জামধর- কোনো বস্তুকে ইস্পাতের দুটি ফলার মধ্যে এঁটে ধরার জন্য কামারশালায় ব্যবহৃত হাতিয়ারবিশেষ; পাকসাঁড়াশি।
➠ কানজোখা- কাঁধ পরিমাণ।
➠ পেস্তা- দক্ষিণ ইউরোপে চাষ করা হয় এমন সবুজাভ শাঁসযুক্ত বাদামজাতীয় ফল বা তার গাছ (আদিনিবাস: পশ্চিম এশিয়া)।
আলুবোখারা- শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায় এমন বোখারা অঞ্চলে জাত গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের অম্লস্বাদ গোলাকার ফল।
➠আফিম- পোস্তফলের নির্যাস থেকে উৎপাদিত তিক্তস্বাদ মাদকবিশেষ।
➠ কোকেন- মাদকরূপে সেবন করা হয় এবং চেতনানাশক ওষুধরূপে ব্যবহৃত দক্ষিণ আমেরিকায় জাত কোকাগুল্মের পাতা ও অন্যান্য অংশের ক্ষারজাতীয় নির্যাস।
➠ মন্থর- চটপটে নয় এমন। মন্দগামী। অলস। নত, নম্র।
➠ হন্তদন্ত- ব্যস্তসমস্ত, অত্যন্ত ব্যস্ত ও ব্যাকুল।
➠ আবডাল- আড়াল, অন্তরাল।
➠ রাহাজানি- প্রকাশ্য রাজপথে ডাকাতি ছিনতাই প্রভৃতি অপরাধ।
➠ আফ্রিদি- পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের সাহসী উপজাতি বিশেষ। পশ্চিম পেশোয়ারের প্রায় এক হাজার বর্গমাইলব্যাপী এদের বাস।
➠ বিড়বিড়- অস্পষ্ট ও মৃদু স্বরে কথন।
➠ নির্যাস- সারবস্তু। শ্রেষ্ঠাংশ। ক্বাথ। আরক।
➠ ফুলচন্দন- সম্মাননীয় অতিথিবরণের জন্য নিবেদিত ফুল ও চন্দন।
➠ মরীচিকা- গ্রীষ্মকালে মরুভূমির তপ্ত বায়ুর ভিন্ন ভিন্ন স্তর থেকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সূর্যরশ্মির প্রতিসরণজনিত দৃষ্টিভ্রম (যাতে মনে হয় কোনাে জলাশয় থেকে আলাে প্রতিফলিত হচ্ছে)।
➠ পাসপোর্ট- নিজ দেশ ছেড়ে বহির্দেশে গমনের উদ্দেশ্যে সরকারপ্রদত্ত বাহকের পরিচয় ও নাগরিকত্বের সনদবাহী ছাড়পত্র।

৫.
➠ সংকীর্ণ- অপ্রশস্ত (সংকীর্ণ গিরিপথ)।
➠ আরোহী- আরোহণকারী।
➠ পীড়াদায়ক- ক্লেশকর; যন্ত্রণাদায়ক।
মরু প্রান্তর- জলহীন ও প্রায় উদ্ভিদশূন্য বালুকাময় বিস্তীর্ণ প্রান্তর।
➠ লান্ডিকোটাল- পাকিস্তানের উপজাতি শাসিত অঞ্চলের একটি শহর। খাইবার পাস-এর পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এই শহর অবস্থিত।
➠ অবান্তর- বৃত্তান্ত; কাহিনি; রহস্য; অপ্রধান; গৌণ।
➠ ঘিনঘিন- ঘৃণা জাগিয়ে তোলে এমন ভাব; অস্বস্তিবোধ।
➠ কোটর- গহ্বর।
➠ ফালি- লম্বালম্বিভাবে কাটা টুকরো।
➠ আঁচল- প্রান্তভাগ।
➠ খাতির- সৌহার্দ্য বা প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক; সমাদর; যত্ন; কদর।
➠ শরবত- চিনি মিছরি ফলের রস প্রভৃতি মিশিয়ে তৈরি ঠান্ডা পানীয়।
➠ কুঁজো- মাটির তৈরি সরুগলা জলপাত্র।

৬.
➠ সামোভার- গরম পানির পাত্রবিশেষ।
➠ পির- মুসলমান সাধুপুরুষ; পুণ্যাত্মা।
➠ ভবিষ্যদ্‌বাণী- ভবিষ্যতে কী ঘটবে সে বিষয়ে উক্তি।
➠ বিচিত্র- নানা বর্ণবিশিষ্ট; নানারূপে চিত্রিত; মনোরম; মনোহর।
➠ গোসা- রাগ; ক্রোধ; অভিমান।
➠ গুম- নির্বাক; নিশ্চুপ ও গম্ভীর; স্তম্ভিত; স্তব্ধ।
➠ তদারক- তত্ত্বাবধান।
➠ জালালাবাদ- আফগানিস্তানের একটি শহর। আদিনাপুর নামে খ্যাত। কাবুল নদী, কুনার নদী ও লাগমান দ্বীপের সংযোগস্থলে শহরটি অবস্থিত। পাকিস্তানের নিকটবর্তী আফগানিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী জালালাবাদ।
➠ কোমরবন্ধ- পরিধেয় বস্ত্র কোমরে বেঁধে রাখার পটি; কটিবন্ধ; বেল্ট।
➠ নীবিবন্ধ- নারীর কটিবস্ত্রের বাঁধন।
➠ ফিসফিস- চুপিচুপি কথা বলার শব্দ; চাপা বা মৃদু স্বরে কথাবার্তা।
➠ অদ্যকার- আজকের।
➠ সরাই- পান্থশালা; পথিক নিবাস।
➠ তন্বী- ক্ষীণ ও সুগঠিত অঙ্গবিশিষ্টা।
➠ চৌকো- চারটি কোণ আছে এমন; চারকোণবিশিষ্ট; চতুষ্কোণ।
➠ পান্থশালা- পথিকদের বিশ্রাম ও আহারের স্থান; সরাই।
➠ স্নিগ্ধতা- কোমলতা; মধুরতা।
➠ সংশ্রব- সংযোগ। সম্পর্ক, সম্বন্ধ। মনোযোগ সহকারে শ্রবণ।
➠ নিরেট- ঘন; জমাট; ফাঁপা নয় এমন; কঠিন।
➠ ডবল ডেকার- দুই তলবিশিষ্ট যান।
➠ অনায়াস- আয়াসশূন্য; স্বতঃস্ফূর্ত।
➠ শতাব্দী- একশত বর্ষব্যাপী সময়, শতক।
➠ পুঞ্জীভূত- সঞ্চিত; স্তূপীকৃত।
➠ দুর্গন্ধ- খারাপ গন্ধ।
➠ গজ- ৩৬ ইঞ্চি বা ৯১.৪ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের পরিমাপ; আনুমানিক দুই হাত।
➠ সূচিভেদ্য- কেবল সুচ ভেদ করতে পারে এমন নিবিড়; জমাট (সূচিভেদ্য অন্ধকার)।

৭.
পুস্তিন সওদাগর- চামড়ার জামা বা কোটের ব্যবসায়ী।
➠ উৎকৃষ্ট- ভালো।
➠ বিস্ময়- চমৎকৃত ভাব বা অবস্থা; আশ্চর্য।
➠ তুর্কিস্তান- ১৮৬৪ সালে রুশরা তুর্কিস্তান শহর দখল করে। শহরের নাম অনুসারে তারা সমগ্র অঞ্চলের নাম করেন তুর্কিস্তান। বর্তমানে মধ্যএশিয়ায় তুর্কি জাতিসমূহ অধ্যুষিত অঞ্চলকে তুর্কিস্তান বলা হয়।
➠ খাস- আসল; প্রকৃত।
➠ প্রাচ্য- ইউরোপের পূর্বদিকস্থ দেশসমূহ।
➠ বরঞ্চ- পক্ষান্তরে, তার বদলে।
➠ উপত্যকা- দুটি পর্বতের মধ্যবর্তী নিম্নভূমি। নদীর দুই তীরের ঢালু জমি।
➠ পরশ- ‘স্পর্শ’-এর কোমল ও কাব্যিক রূপ।
➠ খেই- প্রসঙ্গ; সূত্র (কথার খেই)।
➠ মোহন- মনোহর, মনোহরী, সুন্দর, চিত্তাকর্ষক।
➠ লীলাখেলা- রহস্যময় ক্রিয়াকলাপ; জীবনযাত্রা।
➠ তসবির- ছবি; চিত্র।
➠ মোলায়েম- নরম; মৃদু; হালকা; সুললিত (মোলায়েম কণ্ঠ)।
➠ বেপর্দা- পর্দাপ্রথা মানে না এমন; পর্দা নেই এমন; উন্মুক্ত।
➠ রেওয়াজ- রীতি; প্রথা; প্রচলিত আচার।
➠ অনুকরণ- নকল।
➠ বেদুইন- আরবের মরু অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় এমন যাযাবর জাতিবিশেষ।
➠ অন্তর্ধান- তিরোধান; পলায়ন।
➠ যখনতখন- সময় অসময় বিচারবিবেচনা না করে; যে কোনো সময়ে; ঘনঘন; প্রায়ই।
➠ ঠায়- স্থির হয়ে; কর্মহীন হয়ে; একটানা। কাছে।
➠ মালজান- ধনসম্পদ ও জীবন।
➠ জিম্মাদার- যে ব্যক্তির দায়িত্বে কোনো কিছু রাখা হয়।
➠ নিরুদ্দেশ- লক্ষ্যহীন; উদ্দেশ্যহীন।
শিকেয় তোলা- (অলংকাররূপে) অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত বা মুলতুবি রাখা।
➠ তাড়া- কোনো কাজ দ্রুত সম্পাদনের জন্য পীড়াপীড়ি; ব্যস্ততা।
➠ তত্ত্বতালাশ- খোঁজখবর ও তত্ত্ব প্রেরণ।

৮.
➠ বেলাবেলি- দিনের আলোয়; অন্ধকার নেমে আসার আগে।
➠ মেলবাস- দ্রুতগামী বাস।
➠ খানসামা- আহার পরিবেশন করা যার পেশা; পরিচারক।
➠ চারপাই- চারটি পায়াবিশিষ্ট খাট।
➠ মাধুরী- কোমল ও মধুর ভাব; মধুরতা; মাধুর্য; সৌন্দর্য।
➠ নিতান্ত- অতিশয় (নিতান্ত অসহায়)। ঘনিষ্ঠ (নিতান্ত আপনজন)।
➠ কুলকুল- জলপ্রবাহের মৃদু কলকল ধ্বনি।
➠ তন্দ্রা- ঘুমের আবেশ বা ঘোর, ঘুমঘুম ভাব।
➠ এহেন- এই প্রকার।
➠ পদপ্রান্ত- চরণতল; পায়ের নিকটবর্তী স্থান।
➠ বৈতালিক- শান্তিনিকেতনে বিশেষ উৎসব উপলক্ষ্যে প্রভাতফেরিতে যে গান গাওয়া হয়; স্তুতিপাঠক; (বাংলায়) অতীতে রাজা-মহারাজাদের স্তুতি পাঠ করে ভোরবেলা যে গান গাওয়া হতো।
➠ ভেঁপু- তালপাতা, আমের আঁটি প্রভৃতির তৈরি খেলনার বাঁশি (আম-আঁটির ভেঁপু)।
➠ ভাবগতিক- চালচলন; ধরনধারণ।

‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির পাঠ-পরিচিতি :
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনাটির মধ্য দিয়ে আমরা সৈয়দ মুজতবা আলীর অসাধারণ ভ্রমণ-সাহিত্যের সঙ্গেই শুধু পরিচিত হই না, অধিকন্তু তাঁর জীবনবোধ, সাহিত্যরুচি ও নিজস্ব শিল্প-বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারি। সৈয়দ মুজতবা আলী বিচিত্র এক জীবন যাপন করেছেন। কত জনপদ, কত মানুষ আর কত ঘটনার সঙ্গে যে তিনি এক জীবনে পরিচিত হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। আর সেই জনপদ, সেই মানুষ আর সেই সব ঘটনাকেও তিনি দেখেছেন কখনো রসিকের চোখে, কখনো ভাবুকের চোখে এবং কখনোবা বিদগ্ধ পাণ্ডিত্যের মনন ও নিষ্ঠার চোখে। ফলে অনিবার্যভাবেই তাঁর সব সৃষ্টির মতো ভ্রমণ-সাহিত্যও হয়ে উঠেছে তুখোড় এক জীবনচাঞ্চল্যে ভরপুর কথামালা। ‘গন্তব্য কাবুল’ তার ব্যতিক্রম নয়। হাওড়া স্টেশন থেকে কাবুলের উদ্দেশে যে যাত্রাটি তিনি শুরু করেছিলেন তাতে শেষ পর্যন্ত অসাধারণ রসঘন এক অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। এই পরিচয়ের প্রতিটি পর্বে কত যে কৌতুক, কৌতূহল, হাসি-ঠাট্টা, রম্য-রসিকতা আর প্রজ্ঞা ও মনন পাঠকের জন্য অপেক্ষা করে তার কোনো তুলনা চলে না। যাত্রার শুরুতেই গাড়িতে উঠতে গেলে একজন ইংরেজ হাঁক দিয়ে বলেছিলেন “ওটা ইয়োরোপিয়ানদের জন্য”। এই একটি মাত্র উক্তির মধ্যে ব্রিটিশশাসিত দুইশ বছরের ইতিহাসের একটি মাত্রা অনুভব করা যায়। আবার সেই ফিরিঙ্গির সঙ্গেই যখন শান্তিপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ যাত্রা শুরু হয় আর ভাগ-বাঁটোয়ারা করে খাওয়া হয় নিজেদের সঙ্গে করে আনা বিচিত্র খাবার তখন অন্য এক ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। সেই ইতিহাস মানবিকতার, সাম্যের, সৌন্দর্যের। এই বিচিত্র মানুষ-জনের সঙ্গে মিলেমিশে আছে নানা ধরনের প্রকৃতি, ভূগোল, ইতিহাস ও নানা সংস্কৃতি। এই রচনায় সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতার একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের পরিচয় তুলে ধরেছেন।

‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির লেখক পরিচিতি:

সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই সেপ্টেম্বর পিতার কর্মস্থল আসামের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস বৃহত্তর সিলেট জেলায়। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ সিকান্দার আলী। মুজতবা আলীর শিক্ষাজীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে শান্তিনিকেতনে। তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

আফগানিস্তানের কাবুলে কৃষিবিজ্ঞান কলেজে কিছুকাল অধ্যাপনা করেন তিনি। এছাড়াও দেশে-বিদেশে বহুস্থানে তিনি কর্মসূত্রে গমন করেছেন। আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, ফরাসি, জার্মানসহ বিভিন্ন ভাষায় তাঁর দক্ষতা ছিল। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রসাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে তাঁর ছিল বিশেষ পাণ্ডিত্য। সাহিত্যিক রসবোধ সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনার মুখ্য প্রবণতা। তাঁর রচনায় বিচিত্র জীবনপ্রবাহের নানা অনুষঙ্গ কৌতুক ও ব্যঙ্গে রসাবৃত হয়ে উপস্থাপিত হয়। সৈয়দ মুজতবা আলীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে দেশে বিদেশে, পঞ্চতন্ত্র, চাচাকাহিনি, শবনম, কত না অশ্রুজল প্রভৃতি।

সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির বহুনির্বাচনি প্রশ্ন:

প্রশ্ন থেকে

অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন -এর মধ্যে!
যা


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির জ্ঞানমূলক প্রশ্ন:
১. সৈয়দ মুজতবা আলী কত খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
২. সৈয়দ মুজতবা আলী কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী আসামের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।
৩. সৈয়দ মুজতবা আলীর পৈতৃক নিবাস কোথায়?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলীর পৈতৃক নিবাস সিলেট জেলায়।
৪. সৈয়দ মুজতবা আলীর পিতার নাম কী?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলীর পিতার নাম সৈয়দ সিকান্দার আলী।
৫. সৈয়দ মুজতবা আলী কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক চিহ্নি লাভ করেন?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক চিহ্নি লাভ করেন।
৬. সৈয়দ মুজতবা আলী কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি আর্জন করেন?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন।
৭. সৈয়দ মুজতবা আলী কোন সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী রবীন্দ্রসাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন।
৮. ‘কত না অশ্রুজল’ গ্রন্থের রচয়িতা কে?
উত্তর: ‘কত না অশ্রুজল’ গ্রন্থের রচয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলী।
৯. সৈয়দ মুজতবা আলী কত খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
১০. সৈয়দ মুজতবা আলী কোথায় মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: সৈয়দ মুজতবা আলী ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
১১. ফিরিঙ্গি কোথায় হেঁকে বলল, ‘এটা ইউরোপিয়ানদের জন্য?’
উত্তর: ফিরিঙ্গি হাওড়া স্টেশনে হেঁকে বলল, ‘এটা ইউরোপিয়ানদের জন্য’।
১২. ‘ইউরোপিয়ান থার্ড’ কাদের জন্য নির্ধারিত ছিল?
উত্তর: ‘ইউরোপিয়ান থার্ড’ ইউরোপিয়ানদের জন্য জন্য নির্ধারিত ছিল।
১৩. বাংলা শব্দের অন্ত্যদেশে, কী যোগ করলে সংস্কৃত হয়?
উত্তর: বাংলা শব্দের অন্ত্যদেশে অনুস্বার যোগ করলে সংস্কৃত হয়।
১৪. পয়লা সিলেবলে অ্যাকসেন্ট দেওয়াকে লেখক কীসের সঙ্গে ভুলনা করেছেন?
উত্তর: পয়লা সিলেবলে অ্যাকসেন্ট দেওয়াকে লেখক খারাপ রান্নায় লঙ্কা ঠেসে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
১৫. লেখকের ইংরেজি শুনে কে খুশি হয়?
উত্তর: লেখকের ইংরেজি শুনে ফিরিঙ্গি খুশি হয়।
১৬. ভ্রমণের উৎসাহ ক্রমেই চুপসে আসছিল কার?
উত্তর: ভ্রমণের উৎসাহ ক্রমেই চুপসে আসছিল লেখকের।
১৭. ‘এত মনমরা হলে কেন?’- কে বলেছিল?
উত্তর: ‘এত মনমরা হলে কেন?’ কথাটি ফিরিঙ্গি লোকটি বলেছিল।
১৮. ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় বিলেতি কায়দা জানে কে?
উত্তর: ফিরিঙ্গি লোকটি বিলেতি কায়দা জানে।
১৯. লেখক কোথা থেকে খাবার কিনেছিলেন?
উত্তর: লেখক জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে খাবার কিনেছিলেন।
২০. কোন মাসের গরম পশ্চিমে গৌরচন্দ্রিকা করে নামে না?
উত্তর: জুন মাসের গরম পশ্চিমে গৌরচন্দ্রিকা করে নামে না।
২১. পাঠানদের সাধারণ উচ্চতা কত?
উত্তর: পাঠানদের সাধারণ উচ্চতা ছয় ফুট।
২২. পাঠানদের দাড়ি দেখতে কেমন?
উত্তর: লেখক কাবুলির মুখে ফুলচন্দন পড়ার কথা বলেছেন।
২৩. সামনের বুড়ো স্যারজি কি বলে লেখক এর সঙ্গে আলাপ শুরু করেছিলেন?
২৪. উত্তর: সামনের বুড়ো সর্দারজি ‘কহাঁ জাইয়েগা?’
লেখকের বন্ধুর বন্ধু কোন স্টেশনে আসবেন?
উত্তর: লেখকের বন্ধুর বন্ধু পেশোয়ার স্টেশনে আসবেন।
২৫. ‘পাঞ্জাবি পরলে বাঙালিকে চেনা যায়?’- উক্তিটি কে করেছিলেন?
উত্তর: ‘পাঞ্জাবি পরলে বাঙালিকে চেনা যায়?’ উক্তিটি সর্দারজি করেছিলেন।
২৬. ‘দিনের বেলা পেশোয়ার ইংরেজের, রাত্রে পাঠানের।’- এই প্রবাদটি কোন এলাকার?
উত্তর: ‘দিনের বেলা পেশোয়ার ইংরেজের, রাত্রে পাঠানের।’ এই প্রবাদটি পাঠানমুল্লুকের।
২৭. গাড়ি কখন পেশোয়ারে পৌছাবে?
উত্তর: গাড়ি রাত নয়টায় পেশোয়ারে পৌঁছাবে।
২৮. লেখকের বন্ধুর বন্ধুর নাম কী?
উত্তর: লেখকের বন্ধুর বন্ধুর নাম শেখ আহমদ আলী।
২৯. পাঠানের অভ্যর্থনা কেমন?
উত্তর: পাঠানের অভ্যর্থনা সম্পূর্ণ নির্জলা আন্তরিক।
৩০. আহমদ আলীর উঠোন পেরোতে লেখকের কতদিন কেটে গেল?
উত্তর: আহমদ আলীর উঠোন পেরোতে লেখকের সাতদিন কেটে গেল।
৩১. আফগানিস্তানে মানুষ কী নিয়ে ব্যস্ত?
উত্তর: আফগানিস্তানে মানুষ আপন আপন প্রাণ নিয়েই ব্যস্ত।
৩২. ড্রাইভার শিখ সদারজির বয়স কত?
উত্তর: ড্রাইভার শিখ সর্দারজির বয়স যাটের কাছাকাছি।
৩৩. বাসের পেটে কে ছিল?
উত্তর: বাসের পেটে ছিল একপাল কাবুলি ব্যবসায়ী।
৩৪. পেশোয়ার থেকে জমরুদ দুর্গ পর্যন্ত সমতলভূমির পরিমাণ কত?
উত্তর: পেশোয়ার থেকে জমরুদ দুর্গ পর্যন্ত সমতলভূমির পরিমাণ সাড়ে দশ মাইল।
৩৫. দুদিকে কত ফুট উঁচু পাথরের নেড়া পাহাড়। উত্তর: দুদিকে হাজার ফুট উঁচু পাথরের নেড়া পাহাড়।
৩৬. খাইবার পাসের দুদিকের রাস্তা কাদের?
উত্তর: খাইবার পাসের দুদিকের রাস্তা সরকারের।
৩৭. খাইবার পাসের দুদিকের জমি কাদের?
উত্তর: খাইবার পাসের দুদিকের জমি পাঠানের।
৩৮. আড়ালে আবডালে কে সুযোগের অপেক্ষায় ওৎ পেতে বসে আছে?
উত্তর: আড়ালে আবডালে পাঠান সুযোগের অপেক্ষায় ওৎ পেতে বসে আছে।
৩৯. লেখক কার মুখে ফুল চন্দন পড়ার কথা বলেছেন?
উত্তর: লেখক কাবুলীর মুখে ফুলচন্দন পড়ার কথা বলেছেন।
৪০. দুনিয়ার সব পরীক্ষা পাশের চেয়ে বড়ো পরীক্ষা কোনটি?
উত্তর: দুনিয়ার সব পরীক্ষা পাশের চেয়ে বড়ো পরীক্ষা
৪১. খাইবার পাশ করা।
খাইবার পাশের ভেতরের রাস্তা কেমন ছিল?
উত্তর: খাইবার পাশে ভেতরে রাস্তা পিচ ঢালা ছিল।
৪২. লান্ডিকোটাল থেকে দক্কা কত মাইল?
উত্তর: লান্ডিকোটাল থেকে দক্কা দশ মাইল।
৪৩. দক্কাদুর্গকে লেখকের কেমন মনে হলো?
উত্তর: দক্কাদুর্গকে লেখকের অত্যন্ত অবান্তর মনে হলো।
৪৪. দক্কাদুর্গের সামনে বাঁ দিকে কোন নদী ছিল?
উত্তর: দক্কাদুর্গের সামনে বাঁ দিকে কাবুল নদী ছিল।
৪৫. দুর্গের অফিসার লেখককে খাতির-যত্ন করলেন কেন?
উত্তর: লেখক বিদেশি বলে দুর্গের অফিসার তাঁকে খাতির-যত্ন করলেন।
৪৬. ইঞ্জিন সর্দারজির উপর গোসা করে কয়বার গুম হলো?
উত্তর: ইঞ্জিন সর্দারাজির উপর গোসা করে দুবার ওম হলো।
৪৭. 'গন্তব্য কাবুল' ভ্রমণকাহিনিতে রাতকানা কে?
উত্তর: 'গন্তব্য কাবুল' ভ্রমণকাহিনিতে সর্দারজি রাতকানা।
৪৮. লেখকের কানকে মাইক্রোফোন ভেবেছিল কে?
উত্তর: লেখকের কানকে মাইক্রোফোন ভেবেছিল রেডিওর কর্মচারী।
৪৯. কখন সরাইয়ের দরজা বন্ধ হয়ে যায়?
উত্তর: সন্ধ্যায় সরাইয়ের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
৫০. ভীষণ দুশমনের মতো কে দাঁড়িয়ে ছিল?
উত্তর: ভীষণ দুশমনের মতো দাঁড়িয়ে ছিল এক চৌকো দুর্গ।
৫১. ভোরবেলা লেখকের ঘুম ভাঙলো কী শুনে?
উত্তর: ভোরবেলা আজানের শব্দে লেখকের ঘুম ভাঙলো।
৫২. লেখক কোথায় গিয়ে ঠান্ডা হওয়ার প্রথম পরশ পেয়েছিলেন?
উত্তর: লেখক জালালাবাদ গিয়ে ঠান্ডা হাওয়ার প্রথম পরশ পেয়েছিলেন।
৫৩. কারা বাসের পেট থেকে বেরিয়ে এক মিনিটের ভিতর অন্তর্ধান?
উত্তর: কাবুলিরা বাসের পেট থেকে বেরিয়ে এক মিনিটের ভিতর অন্তর্ধান।
৫৪. জালালাবাদ থেকে কাবুলের দূরত্ব কত মাইল?
৫৫. উত্তর: জালালাবাদ থেকে কাবুলের দূরত্ব একশ মাইল।
শাস্ত্র নির্দিষ্ট বেগে চলে কোন বাস?
৫৬. উত্তর: শাস্ত্র নির্দিষ্ট বেগে চলে একমাত্র মেল বাস।
দিনের বেলায় বাঁধ দিয়ে জল বন্ধ করা হয়েছিল কোথায়?
উত্তর: দিনের বেলায় বাঁধ দিয়ে জল বন্ধ করা হয়েছিল নালার উজানে।
৫৭. বৈতালিক মুখরিত হয়ে উঠল কীসে?
উত্তর: পুষ্পবনের গন্ধধূপে বৈতালিক মুখরিত হয়ে উঠল।
৫৮. সর্দারজি ভেঁপু বাজাতে আরম্ভ করলেন কখন?
উত্তর: ভোরের নামাজ শেষে সর্দারজি ভেঁপু বাজাতে আরম্ভ করলেন।

‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির অনুধাবনমূলক প্রশ্ন:

১. ইউরোপিয়ান থার্ড বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: ইউরোপিয়ান থার্ড হলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রতিষ্ঠান যা ভারতের সব জায়গায় আনাগোনা করত।
➠ ইউরোপিয়ান থার্ড মূলত ইউরোপিয়ানদের জন্য বরাদ্ধ থাকত। দেখর হাওড়া স্টেশনে সেই থার্ডে উঠতে চাইলে এক ফিরিঙ্গি তাঁকে বলে যে সেটি ইউরোপিয়ানদের জন্য। লেখক বিচক্ষণ বাঙালি হওয়ায় ইউরোপিয়ানদের সেই গাড়িতে উঠতে পেরেছিলেন। তুলনায়ক ভাষাতত্ত্ব বইয়ে তিনি পড়েছেন, বাংলা শব্দের শেষে অনুস্বার যোগ করলে সংস্কৃত হয় এবং ইংরেজি শব্দের শেষে জোর দিয়ে কথা বললে সায়েবি ইংরেজি হয়। লেখক গাঁক গাঁক করে ইংরেজি বলায় ফিরিজিঙ্গ তাঁকে খুশি হয়ে ইউরোপিয়ানদের গাড়িতে উঠতে দেয়।

২. ‘এটা ইউরোপিয়ানদের জন্য’- কে, কাকে, কেন বলেছিল?
উত্তর: ‘এটা ইউরোপিয়ানদের জন্য’ কথাটি এক ফিরিঙ্গি লেখককে ডেকে বলেছিল।
➠ লেখক হাওড়া ‘স্টেশনে ইউরোপিয়ান থার্ড’-এ উঠতে গেলে এই ব্রিবতকর অবস্থার মুখোমুখি হন। ইউরোপিয়ান থার্ড ভারতের সর্বত্র আনাগোনা করলেও তা শুধু ইউরোপিয়ানদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। ফলে লেখক তাতে চড়তে গেলে ফিরিঙ্গি তাঁকে বাধা দেয়।

৩. ‘অর্থাৎ পয়লা সিলেবলে অ্যাকসেন্ট দেওয়া খারাপ রান্নায় লঙ্কা ঠেসে দেওয়ার মত সব পাপ ঢাকা পড়ে যায়।’-ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: লেখক ইংরেজি ভাষার উচ্চারণ সম্পর্কে আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
➠ ইংরেজি শব্দের প্রথমে জোর দিয়ে কথা বললে ইংরেজি ভাষার উচ্চারণ ইংরেজদের ন্যায় লেখকের মতে, প্রথমা আংলায় বলে গাঁক গাঁক করে ইংরেজি বলা। প্রথম অক্ষরে জোর দিয়ে ইংরেজি উচ্চারণ অনেকটাই খারাপ রান্নার স্বাদ পরিবর্তন করতে প্রচুর মরিচ ব্যবহারের মতোই। কেননা, এতে ইংরেজি ভাষার খারাপ উচ্চারণ বোঝা যায় না।

৪. লেখকের ভ্রমণের উৎসাহ চুপসে গিয়েছিল কেন?
উত্তর: লেখকের ভ্রমণপথে নিজেকে একা মনে হওয়ায় তাঁর ভ্রমণের উৎসাহ চুপসে গিয়েছিল।
➠ ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনির লেখক একজন বাঙালি হাওড়া স্টেশন থেকে কাবুলের উদ্দেশ্যে ভ্রমণপথে তাঁর নিজেকে একা মনে হয়। ভ্রমণের পূর্বে পাসপোর্ট, জামাকাপড় ইত্যাদি জোগাড় করাতে ব্যস্ত থাকায় লেখক অন্য কিছু ভাবার সময় পাননি। গাড়ি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখকের নিজেকে তাঁর ভ্রমণের উৎসাহ চুপসে গিয়েছিল।

৫. সর্দারজিকে লেখকের ভালো লাগার কারণ কা?
উত্তর: ‘গন্তব্য কাবুল’ গল্পে সর্দারজিকে লেখকের ভালো লাগার কারণ হল, সর্দারজি চরিত্রটি অত্যন্ত সাহসী, দৃঢ়চেতা এবং মানবিক গুণাবলীর অধিকারী। সর্দারজি একজন সরল, নিরহঙ্কার ব্যক্তি যিনি নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুঃসাহসিক কাজ করেন, কিন্তু তার মধ্যে কোনো অহংকার বা দম্ভ নেই।
➠ লেখকের কাছে এই চরিত্রটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় এবং শ্রদ্ধার কারণ, কারণ সর্দারজির মধ্যে যে আধ্যাত্মিকতা, মনের শক্তি এবং নৈতিক দৃঢ়তা রয়েছে, তা তাকে একটি নিখুঁত চরিত্রে পরিণত করেছে।
গল্পের পটভূমিতে সর্দারজির কাবুল যাওয়ার উদ্দেশ্য এবং তার কঠিন যাত্রার মধ্যে যে সাহস, শৌর্য এবং নিজস্ব কর্তব্যবোধের পরিচয় পাওয়া যায়, তা লেখকের কাছে অত্যন্ত প্রভাবিত করেছে। তার মানবিক গুণাবলী এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা সর্দারজিকে লেখকের কাছে বিশেষভাবে প্রিয় ও ভালো লাগার মতো একটি চরিত্রে পরিণত করেছে।

৬. সায়েবের বের করা খাবারগুলো দেখে লেখকের চোখ দুটো জমে যেতে লাগল কেন?
উত্তর: ট্রেনে ফিরিঙ্গি সাহেবের আনা খাবার তাঁর কেনা খাবারের সাথে হুবহু একই রকম হওয়ায় লেখক প্রশ্নোত উক্তিটি করেছেন।
➠ ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনির লেখক কলকাতা থেকে পেশোয়ারের ট্রেনে সহযাত্রী হিসেবে এক ফিরিঙ্গি সাহেবকে পেয়েছিলেন। ভদ্রলোক বললেন যে, তার ফিয়াসে একগাদা খাবার রান্না করে পাঠিয়েছে। রাতে খাবারের সময় তিনি যখন প্যাকেট থেকে খাবার বের করা শুরু করলেন, তখন লেখক বিস্মিত হয়ে গেলেন। কারণ, লেখক যাত্রার আগে জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে বিভিন্ন পদের খাবার এনেছেন। ফিরিঙ্গি সাহেবের খাবারও একদম হুবহু একই। সাথে সাথেই লেখক বুঝতে পারলেন যে, ভদ্রলোকের ফিয়াসে হোটেল থেকে খাবার কিনে নিজের রান্না বলে দাবি করেছে। এজন্যই মূলত ফিরিঙ্গি ভদ্রলোকের খাবার দেখে লেখক বিস্মিত হন।

৭.‘এও তো তাজ্জব কি বাত।’-সর্দারজি এ কথা বলেছে কেন?
উত্তর: পেশোয়ারে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে আসলে লেখকের বন্ধুর বন্ধু হয়তো তাঁকে সহজেই চিনে নিতে পারতো-লেখকের এমন দ্বিধার জবাবে সর্দারজি আলোচ্য উক্তিটি করেন।
➠ লেখক কাবুল যাওয়ার পথে পেশোয়ার স্টেশনে এক সর্দারজির সাক্ষাৎ পান। লেখককে সেখান থেকে অভ্যর্থনা দিতে একজন অপরিচিত লোক আসবে বলে সর্দারজিকে জানালে তিনি বলেন যে, তাঁকে চিনে নিতে কোনো অসুবিধেই হবে না। অন্য জাতির মানুষের মাঝে একজন বাঙালিকে চেনা খুবই সহজ হবে। লেখক সহজে পরিচিত হওয়ার জন্য ধুতি-পাঞ্জাবি পরার কথা বললে সর্দারজি অবাক হয়ে যান। কেননা, পাঞ্জাবি তো শুধু বাঙালিরাই পরে না। সে কারণেই লেখকের কথার জবাবে সর্দারজি বলেছে, ‘এও তো তাজ্জব কি বাত।’

৮. ‘পেশাওয়ার স্টেশনে এক গাড়ি বাঙালি নামে না।’- কথাটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, পেশোয়ার স্টেশনে খুব বেশি বাঙালি নামে না।
➠ পেশোয়ার যাওয়ার পথে এক শিখ সর্দারজির সাথে আলাপ হয় লেখকের। কথায় কথায় সর্দারজি লেখকের কাছে জানতে চান যে, পেশোয়ারে তিনি কাউকে চেনেন কি, নাকি হোটেলে উঠবেন। তখন সর্দারজির প্রশ্নের জবাবে লেখক বলেন, স্টেশনে তাকে নিতে আসবে তাঁর এক বন্ধুর বন্ধু। কিন্তু লেখক তাকে আগে কখনো দেখেননি। তাকে সে কীভাবে চিনবে তা নিয়ে তিনি কিছুটা উদবিগ্ন। লেখকের এই কথার প্রেক্ষিতে সর্দারজি প্রশ্নোত্ত উক্তিটি করেন।

৯. কোন বিষয়ে লেখকের ঈষৎ উদ্বেগ রয়েছে? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: পেশোয়ার স্টেশনে লেখকের বন্ধুর বন্ধু তাকে চিনবে কি না সেই বিষয়ে তাঁর কিছুটা উদ্‌দ্বেগ ছিল।
➠ পেশোয়ার যাওয়ার পথে সর্দারজির সাথে লেখকের আলাপ হয়। সর্দারজি লেখকের কাছে জানতে চান, পেশোয়ারে লেখক কাউকে চেনে কি না। সর্দারজির প্রশ্নের উত্তরে লেখক জানান, তাঁর বন্ধুর বন্ধু স্টেশনে আসবে তাকে নিতে। কিন্তু লেখক আগে কখনো তাকে দেখেনি। লেখককে স্টেশনে নিতে আসা লোকটি তাঁকে চিনতে পারবে কি না সেই বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করতেই প্রশ্নোক্ত কথাটি বলা হয়েছে।

১০. ‘আমার চোখ দুটো সঙ্গে সঙ্গে জমে যেতে লাগল।’ -লেখক কেন এ কথা বলেছেন?
উত্তর: ট্রেনে ফিরিঙ্গি সাহেবের আনা খাবার তাঁর কেনা খাবারের সাথে হুবহু একই রকম হওয়ায় লেখক প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।
➠ ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনির লেখক কলকাতা থেকে পেশোয়ারের ট্রেনে সহযাত্রী হিসেবে এক ফিরিঙ্গি সাহেবকে পেয়েছিলেন। ভদ্রলোক বললেন যে, তার ফিয়াসে একগাদা খাবার রান্না করে পাঠিয়েছে। রাতে খাবারের সময় তিনি যখন প্যাকেট থেকে খাবার বের করা শুর করলেন, তখন লেখক বিস্মিত হয়ে গেলেন। কারণ লেখক যাত্রার আগে জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে বিভিন্ন পদের খাবার এনেছেন। ফিরিঙ্গি সাহেবের খাবারও একদম হুবহু একই। সাথে সাথেই লেখক বুঝতে পারলেন যে, ভদ্রলোকের ফিয়াসে হোটেল থেকে খাবার কিনে নিজের রান্না বলে দাবি করেছে। এজন্যই মূলত ফিরিঙ্গি ভদ্রলোকের খাবার দেখে লেখক বিস্মিত হন।

১১. লেখক তিন গজ পিছিয়ে গেলেন কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আফগান সরাইয়ে শত শতাব্দীর পুঞ্জীভূত দুর্গন্ধের কারণে লেখক তিন গজ পিছিয়ে গেলেন।
➠ লেখক আফগান সরাইতে গিয়ে তার অবয়ব দেখে অবাক হন। বিশাল দুর্গ, ত্রিশ ফুট উঁচু হলদে মাটির চারটি দেওয়াল। বিরাট দরজা যা দিয়ে উট, বাস এমনকি ডাবল ডেকার বাসও অনায়াসে ঢুকতে পারে, যা দেখতে অনেকটা দানবের মতো। সাধারণ সরাইখানা যেমন হয় তার সাথে এ কোনো মিল নেই। ওই এলাকাটি মৌসুমি বায়ুর বাইরে হওয়ায় সেখানে কখনো বৃষ্টি হয়। না। আবার বরফও পড়ে না। আশপাশে নদী বা লা না থাকায় ধোয়ামোছা করার জন্য পানির ব্যবহার হয় না। তাই সূক্ষ্ম দুর্গন্ধ সবখানে ছড়িয়ে আছে বলে লেখক আলোচ্য উক্তি করেছেন।

১২. সায়েবের চক্ষুস্থির হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: সায়েবের চক্ষুস্থির হওয়ার কারণ লেখকের খাবারের সঙ্গে তার 'ফিয়াসে'র তৈরি করে দেওয়া খাবারের সাদৃশ্য।
➠ সয়েহের সঙ্গে লেখকের আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি তার ফিয়াসে'র তৈরি করা খাবার বের করে লেখককেও তা খেতে আহ্ববান করেন। কিন্তু লেখক জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে যে খাবার কিনেছিলেন তার সঙ্গে সায়েবের খাবারের হুবহু মিল দেখে তার চক্ষুস্থির হয়ে যায়।

১৩. ‘এর কতটা আন্তরিক, আর কতটা লৌকিকতা?’- কেন বলা হয়েছে?
উত্তর: ‘এর কতটা আন্তরিক, আর কতটা লৌকিকতা?’- কথাটিতে প্রকাশ পেয়েছে মূলত শেখ আহমদ আলীর উষ্ণ অভ্যর্থনায় মুগ্ধ লেখক এর সামরিক দ্বিধা।
➠ পেশোয়ারে পৌঁছানোর পর লেখকের বন্ধুর বন্ধু তাঁকে সংবর্ধনা জানান। যদিও তিনি লেখকের পরিচিত নন; কিন্তু তাঁর অভ্যর্থনায় ছিল আন্তরিকতা আর উৎসাহ, যা লেখককে অভিভূত করেছিল। হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন, এটি কি সত্যিই আন্তরিক নাকি শুধুই লৌকিকতা।

১৪. দক্কাদুর্গের সামনে এসে লেখকের চোখ জুড়িয়ে গেল কেন?
উত্তর: দক্কাদুর্গের সামনে এসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে লেখকের চোখ জুড়িয়ে গেল।
➠ জালালাবাদ যাওয়ার পথে লেখকের সহযাত্রী ছিলেন একজন কাবুলি। গাড়ি যখন দক্কাদুর্গের কাছাকাছি আসে, তখন ওই এলাকার নৈসর্গিক প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে লেখক বিমোহিত হন। দুর্গের একপাশে দিয়ে ছলছল করে বয়ে গেছে কাবুল নদী। অন্যপাশে যেন লুটিয়ে পড়েছে সবুজের মনোরম আঁচল। যে সৌন্দর্য দেখে লেখকের চোখে জুড়িয়ে যায়।

১৫. ‘মনে হলো আমি একা’- লেখক এ কথা বলেছেন কেন?
উত্তর: কাবুল যাওয়ার পথে গাড়িতে নিজের একাকিত্বে অসহায় বোধ করে লেখক এ কথা বলেছেন।
➠ লেখককে কাবুল যাওয়ার পথে যাত্রা শুরুর আগেই নানা রকম ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়। তিনি পাসপোর্ট ও জামাকাপড় জোগাড় করতে অনেক ব্যস্ত সময় পার করেন। ফলে তিনি অন্য কিছু ভাবার ফুরসতও পাননি। তিনি গাড়িতে উঠেন এক ফিরিঙ্গির সাথে। সেখানে কোনো বাঙালি ছিল না যার সাথে তিনি কথা বলতে পারেন। ফলে গাড়িতে উঠতেই লেখকের একাকিত্ব অসহ্য মনে হলো। সে অবস্থা বোঝাতেই তিনি বলেন, 'মনে হলো আমি একা।'

১৬. ‘জুন মাসের গরম পশ্চিমে গৌরচন্দ্রিকা করে নামে না।’- বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: লেখক জুন মাসের গরমের তীব্রতা বোঝাতে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি করেছেন।
➠ জুন মাসের গরম প্রচণ্ড তীর। এই গরম ধীরে ধীরে বাড়ে না। এই গরম সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই চড়চড় করে বাড়তে থাকে। এই গরমে মানুষের প্রাণ হয়ে পড়ে ওষ্ঠাগত। তাই লেখক বলেছেন পশ্চিমে গরম আভাস দিয়ে নামে না।

১৭. ‘তিনি যে আমাকে কী করে চিনবেন সে সম্বন্ধে ঈষৎ উদবেগ আছে।’- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
অথবা, কোন বিষয়ে লেখকের ঈষৎ উদ্বেগ রয়েছে? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: পেশোয়ার স্টেশনে লেখকের বন্ধুর বন্ধু তাকে চিনবে কি না। সেই বিষয়ে তাঁর কিছুটা উদ্বেগ ছিল।
➠ পেশোয়ার যাওয়ার পথে সর্দারজির সাথে লেখকের আলাপ হয়। সর্দারজি লেখকের কাছে জানতে চান, পেশোয়ারে লেখক কাউকে চেনে কি না। সর্দারজির প্রশ্নের উত্তরে লেখক জানান, তাঁর বন্ধুর বন্ধু স্টেশনে আসবে তাঁকে নিতে। কিন্তু লেখক আগে কখনো তাকে দেখেননি। লেখককে স্টেশনে নিতে আসা লোকটি তাঁকে চিনতে পারবে কি না সেই বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করতেই প্রশ্নোক্ত কথাটি বলা হয়েছে।

১৮. ‘এও তো তাজ্জবকি ভাত’- সর্দারজি এ কথা বলছে কেন?
উত্তর: পাঞ্জাবি পরলে বাঙালিকে চেনা যায়-লেখকের এহেন কথায় বিস্মিত হয়ে সর্দারজি আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
➠ লেখক কাবুল যাওয়ার পথে পেশোয়ার স্টেশনে এক সদারজির সাক্ষাৎ পান। লেখককে সেখান থেকে অভ্যর্থনা দিতে একজন অপরিচিত লোক আসবে বলে সর্দারজিকে জানালে তিনি বলেন যে, কোনো অসুবিধেই হবে না। অন্য জাতির মানুষের মাঝে একজন বাঙালিকে চেনা খুবই সহজ। লেখক সহজে পরিচিত হওয়ার জন্য লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরার কথা বললে সর্দারজি অবাক হয়ে যান। কেননা, পাঞ্জাবি তো শুধু বাঙালিরাই পরে না। সে কারণেই লেখকের কথার জবাবে সর্দারজি বলেছে 'এও তো তাজ্জবকি ভাত।'

১৯. ‘হক কথা; তবে কিনা বাজে খরচ।’- লেখক কোন প্রসঙ্গে উক্তিটি করেছেন?
উত্তর: লেখক শিলওয়ার বানাতে বিশ গজ কাপড় খরচ করার কথা শুনে প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।
➠ লেখক সর্দারজির কাছে জানতে চান যে, শিলওয়ার বানাতে কত গজ কাপড় লাগে। সর্দারজি উত্তরে জানান, দিল্লিতে সাড়ে তিন, জলন্ধরে সাড়ে চার, লাহোরে সাড়ে পাঁচ, লালমুসায় সাড়ে ছয়, রাওলপিন্ডিতে সাড়ে সাত, পেশোয়ারে সাড়ে দশ ও খাস পাঠানমুল্লুকে কোহাট খাইবারে পুরো থান লাগে। লেখক অবাক হয়ে যান এ কথা ভেবে যে, বিশগজের কাপড় পরে পাঠানরা মারামারি করে কীভাবে। সর্দারজি এ বিষয়ে বিভিন্ন যুক্তি দেখালে লেখক তার সাথে কথায় পারা যাবে না ভেবে আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।

২০. ‘দিনের বেলা পেশাওয়ার ইংরেজের, রাত্রে পাঠানের।’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: পেশোয়ার শহরটিকে দিনের বেলা ইংরেজ নিয়ন্ত্রণ করলেও রাতে এ শহরকে নিয়ন্ত্রণ করে পাঠানরা। পেশোয়ার পাকিস্তানের একটি শহর।
➠ এই শহর নিয়ে পাঠানমুল্লুকের প্রবাদ হলো, দিনের বেলা পেশোয়ার ইংরেজের, রাত্রে পাঠানের। অর্থাৎ দিনের বেলা ইংরেজ সরকার পেশোয়ার শহরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও রাতের বেলা এই শহরের নিয়ন্ত্রণ থাকে পাঠানদের হাতে।

২১. ‘পাঠানের অভ্যর্থনা সম্পূর্ণ নির্জলা আন্তরিক’- বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন।
উত্তর: পেশোয়ারের শেখ আহমদ আলীর আন্তরিক অভ্যর্থনায় মুগ্ধ হয়ে লেখক বলেছিলেন ‘পাঠানের অভ্যর্থনা সম্পূর্ণ নির্জলা আন্তরিক’।
➠ লেখক হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে পেশোয়ারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। পেশোয়ারে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে আসবেন তাঁর বন্ধুর বন্ধু। ভদ্রলোক লেখকের অপরিচিত। যখন তিনি সেখানে পৌঁছালেন স্টেশনে শেখ আহমদ আলী নামে এক ভদ্রলোক এসে লেখককে নিজের পরিচয় দিয়ে পরম উৎসাহ আর গরম সংবর্ধনায় অভিবাদন জানালেন। অপরিচিত একজন মানুষের এত বেশি আন্তরিকতা দেখানোর কারণ লেখক প্রথম বুঝতে পারেননি। সাতদিন শেখ আহমদ আলীর আতিথেয়তার মাধ্যমে লেখক অবশেষে এই আন্তরিকতার কারণ অনুধাবন করতে পারেন। এ কারণেই লেখক পাঠানের অভ্যর্থনাকে সম্পূর্ণ নির্জলা আন্তরিক বলেছেন।

২২. লেখক নিজেকে ‘ভয়ংকর একা’ ভাবলেন কেন?
উত্তর: পেশোয়ার স্টেশনে পাঠান শেখ আহমদ আলী যখন লেখকের কাছ থেকে বিদায় নিলেন তখন অপরিচিত পরিবেশে তিনি নিজেকে ‘ভয়ংকর একা’ ভাবলেন।
➠ ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনির লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী ভ্রমণের মাঝামাঝি অর্থাৎ পেশোয়ার স্টেশনে আসার পর দেখলেন যে, এখানে প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। অন্য কারো দিকে তাকানোর সময় পর্যন্ত কারো নেই। এমতাবস্থায় সেখানে তাঁকে সাদরে সংবর্ধনা একজন পাঠান। যথেষ্ট আলী লেখকের কাছ থেকে বিদায় নেন, তখন তিনি নিজেকে সেখানে 'ভয়ংকর একা' ভাবলেন।

২৩. খাইবারপাস গিরি কেমন?
উত্তর: পৃথিবীর প্রাচীনতম রাস্তার মধ্যে অন্যতম হলো খাইবার পাস গিরি।
➠ খাইবার পাস হলো একটি গিরিপথ। এই গিরিপথের মাধ্যমে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সংযোগ সাধিত হয়েছে। এই গিরিপথ পৃথিবীর প্রাচীনতম রাস্তার মধ্যে একটি। দুদিকে হাজার ফুট উঁচু পাথরের নেড়া পাহাড়। মাঝখানে খাইবার পাস। একজোড়া রাস্তা এঁকেবেঁকে একে অন্যের গা ঘেঁষে চলেছে কাবুলের দিকে। এক রাস্তা মোটরের জন্য, অন্য রাস্তা উট, খচ্চর, গাধা, ঘোড়ার পণ্যবাহিনী বা ক্যারাভানের জন্য। সংকীর্ণতম স্থলে দুই রাস্তায় মিলে ত্রিশ হাতও হবে না। সে রাস্তা আবার মাতালের মতো টলতে টলতে এতই এঁকেবেঁকে গিয়েছে যে, যেকোনো জায়গায় দাঁড়ালে চোখ পড়ে ডানে-বাঁয়ে পাহাড়, সামনে-পিছনে পাহাড়।

২৪. ইংরেজরা পাঠানদেরকে খাজনা দেয় কেন?
উত্তর: পাঠানরা যাতে ঠিক রাস্তার বুকের উপর রাহাজানি না করে সেজন্যই ইংরেজরা পাঠানদেরকে খাজনা দেয়।
➠ খাইবারপাস হলো গিরিপথ। পৃথিবীর প্রাচীনতম রাস্তার মধ্যে এটি অন্যতম। আলেকজান্ডার দি গ্রেট ও চেঙ্গিস খান থেকে শুরু করে মুসলিম শাসকগণ তাদের বিশ্ব বিজয়ে খাইবারপাস ব্যবহার করেছেন। খাইবারপাস দিয়ে কত দেশের কত রকমের লোক যে পণ্যবাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে চলেছে তার ইয়ত্তা নেই। খাইবারপাসের রাস্তা দুটো সরকারের বটে, কিন্তু দুদিকের জমি পাঠানের। সেখানে আড়ালে-আবডালে পাঠান সুযোগের অপেক্ষায় ওৎ পেতে বসে থাকে। কাউকে সেখানে দেখলেই তার সবকিছু হরণ করে নিয়ে যায়। তাই পাঠানরা যেন ঠিক রাস্তার বুকের উপর রাহাজানি না করে তার জন্য খাইবারপাসের দু'দিকে যেখানে বসতি আছে সেখানকার পাঠানদের ইংরেজরা দুটাকা করে বছরে খাজনা দেয়।

২৫. ‘আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।’-উক্তিটি বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী এক কাবুলিকে উদ্দেশ্য করে আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
➠ পেশোয়ার স্টেশনে পাঠান শেখ আহমদ আলীর উষ্ণ অভ্যর্থনায় লেখক খুবই মুগ্ধ হন। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর শেখ আহমদ আলী লেখককে এক গাড়িতে বসিয়ে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। সেখানে ছিল ড্রাইভার শিখ সর্দারজি এবং আরেকজন আফগান সরকারের এক বেতার কর্মচারী। অনেক ভাষায় পান্ডিত্যের দাবি করে তিনি কাবুল বেতারকেন্দ্রে চাকরি পেয়েছেন। লেখক দেখেন, কাবুলি ভদ্রলোক অত্যন্ত বনবাসুলে বিপন্নের সহায়। তিনি লেখককে অভয় দিয়ে বলেন, 'কালই কাবুলে পৌঁছে যাচ্ছি। সেখানে পৌঁছে কর করে কাবুল নদীতে ডুব দেব। বরফগলা হিমজল পাহাড় থেকে নেমে এসেছে, দিল জান কলিলেখক তাকেজে যাবে। এ কথাগুলো কাবুলির মুখ থেকে শুনেই লেখক উদ্দেশ্য করে আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।

২৬. ‘দূর থেকে সেই কালো কালো বুঝিয়ে লেখোন হয় যেন আন্দের উপড়ে নেওয়া চোখের শূন্য কোটর।’- বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: মরুপ্রান্তরের দক্কাদুর্গ সম্পর্কে প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করা হয়েছে।
➠ দক্কাদুর্গের আশপাশের রঙের সঙ্গে রং মিলিয়ে মাটি ও খড় মিশিয়ে পিটে পিটে উঁচু দেওয়াল গড়ে তোলা হয়েছে। দেওয়ালের উপরের দিকে রয়েছে এক সারি গর্ত। দুর্গের লোকেরা সেই গর্তের ভিতর দিয়ে বন্দুকের নল গলিয়ে বাইরের শত্রুকে গুলি করতে পারে। দেখেকের কাছে দূর থেকে সেই কালো কালো গর্ত দেখে অশ্বের উপড়ে নেওয়া চোখের শূন্য কোটরের মতো মনে হয়। দক্কাদুর্গ সম্পর্কে লেখক তাই প্রশ্নোক্ত উক্তিটির অবতারণা করেছেন।

২৭. ‘এ দানবের পেট থেকে আর বেরোতে হবে না।’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘এ দানবের পেট থেকে আর বেরোতে হবে না।’- উক্তিটি আফগান সরাই সম্পর্কে করা হয়েছে।
➠ লেখক বহু স্থানে ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ভ্রমণাভিজ্ঞতার মধ্যে আফগান সরাইয়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। লেখকের কাছে সরাইকে মনে হয়েছে দুশমনের ন্যায় চৌকো দুর্গের মতো। কর্মক্লান্তি শেষে বিশ্রামের জন্য যেরূপ স্নিগ্ধ পরিবেশের প্রয়োজন হয় সেখানের পরিবেশ সেরূপ নয়। ত্রিশ ফুট উঁচু হলুদ মাটির চারটি দেওয়াল।। সামনের দেওয়ালে রয়েছে একটি বড়ো দরজা। এ দরজার ভিতর দিয়ে উট, বাস ইত্যাদি আনায়াসে ঢুকতে পারলেও ভিতরে যাওয়ার সময় মনে হয় এখান থেকে আর বের হওয়া যাবে না। অর্থাৎ সরাইয়ের দুর্গের মধ্যে প্রবেশের পথ সুগম হলেও বের হওয়ার পথ দুর্গম মনে হয়েছে বলে লেখক প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।

২৮. ‘সূচিভেদ্য দুর্গন্ধ’- বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: 'সূচিভেদ্য দুর্গন্ধ' বলতে লেখক আফগান সরাইখানার ভিতরের দুর্গন্ধময় পরিবেশকে বুঝিয়েছেন।
➠ কাবুলে যাওয়ার পথে জালালাবাদে লেখকের গাড়ির চাকা ফেটে যায়। বাধ্য হয়ে তিনি রাতযাপনের জন্য আধমাইল দূরে আফগান সরাইখানায় আশ্রয় নেন। সরাইখানাটি দেখতে দুর্গের মতো। ত্রিশ ফুট উঁচু হলদে মাটির চারটি দেওয়াল ও একটি দরজাবিশিষ্ট সরাইখানা। সেখানে ভিতরে ঢুকতেই লেখকের মনে হয়েছে, শত শতাব্দীর পুঞ্জীভূত দুর্গন্ধের ধাক্কায় তিনি যেন তিন গজ পিছিয়ে গেছেন। সূক্ষ্ম দুর্গন্ধ সর্বত্র এমন স্তরীভূত হয়ে আছে যে, ধাক্কা দিয়ে না সরালে সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আলোচ্য উক্তিটিতে লেখক এ বিষয়টিই বুঝিয়েছেন।

২৯. জালালাবাদের সৌন্দর্য কেমন?
উত্তর: লেখকের ভ্রমণাভিজ্ঞতার বর্ণনায় জালালাবাদের অসাধারণ সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়েছে।
➠ জালালাবাদ সবুজ উপত্যকায় ঘেরা। সেখানে রাস্তার দুদিকে ফসলের যেতের সৌন্দর্য বিরাজমান। সেখানে সবুজ সৌন্দর্যের মাঝে লোকজনের ঘরবাড়ি রয়েছে। সামান্য একটি নদীর সৌন্দর্য সবুজের লীলাখেলায় অপূর্ব চিত্রের সৃষ্টি করে। এমনটি যে অল্প কজন পাঠানকে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখেছেন লেখকের তাদের চেহারাও সীমান্তের পাঠানদের তুলনায় মোলায়েম মনে হয়েছে। জালালাবাদের ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ লেখককে যুদ্ধ করেছে। মোটকথা, জালালাবাদের প্রকৃতি এবং সেখানকার মানুষের সৌন্দর্য মিলে সেখানকার সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

৩০. ‘সে আশা শিকেয় তুলে রাখুন।’-কে, কেন এ কথা বলেছে?
উত্তর: ‘সে আশা শিকেয় তুলে রাখুন’- এ কথাটি বেতারবার্তী লেখককে নির্দিষ্ট সময়ে কাবুলে যাওয়া সম্ভব না বোঝাতে বলেছেন।
➠ কাবুল যাওয়ার পথে লেখকের গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। তখন যাত্রীরা সবাই যে যার মতো চলে যায়। বাস আবার ছাড়বে কখন এ বিষয়ে কারো কোনো কৌতূহল নেই। লেখক এ যাত্রায় নতুন মানুষ হওয়ায় সর্দারজিকে বাস আবার ছাড়বে কখন সেটি জিজ্ঞেস করেন। সর্দারজি জানান সবাই যখন আবার জড়ো হবে তখন। লেখক যখন সবার ফিরে আসার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় কাবুল পৌঁছানোর বিষয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে তখন বেতার কর্তা তাকে জানালে সেটি লেখা সম্ভব নয়। লেখককে যে, রাখুন।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-১:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
মানুষ যে কেবল নিজেকেই জানিতে চায় তাহাই নহে, বাহিরের জগতের আহ্বানে প্রতিনিয়তই তাহাকে টানিতেছে। এই আহ্বানে প্রলুব্ধ হইয়া অনেক লোক দেশভ্রমণে বহির্গত হয়। নানা দেশ, নানা জাতি, তাহাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিভিন্ন জনের নিকট বিভিন্ন রূপে ধরা দেয়। বাহিরের এই বস্তুসত্তাকে লেখক মানসরসে প্রত্যক্ষ করিয়া তথ্যসংবলিত গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই জাতীয় গ্রন্থে বস্তুসত্তার প্রাধান্য থাকিলেও উহার মধ্যে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থাকিতে পারে।

ক. ফিরিঙ্গি কী?
খ. সর্দারজিকে লেখকের ভালো লাগার কারণ কী?
গ. ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় উদ্দীপকের কোন সত্তাটি বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উপযুক্ত সত্তাটি ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার শেষ কথা নয়। বিশ্লেষণ কর।

ক. ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরাই প্রথম বাংলায় আসে। এ অঞ্চলে পর্তুগিজদেরই ফিরিঙ্গি বলা হয়।
খ. গন্তব্য কাবুল’ গল্পে সর্দারজিকে লেখকের ভালো লাগার কারণ হল, সর্দারজি চরিত্রটি অত্যন্ত সাহসী, দৃঢ়চেতা এবং মানবিক গুণাবলীর অধিকারী। সর্দারজি একজন সরল, নিরহঙ্কার ব্যক্তি যিনি নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুঃসাহসিক কাজ করেন, কিন্তু তার মধ্যে কোনো অহংকার বা দম্ভ নেই। লেখকের কাছে এই চরিত্রটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় এবং শ্রদ্ধার কারণ, কারণ সর্দারজির মধ্যে যে আধ্যাত্মিকতা, মনের শক্তি এবং নৈতিক দৃঢ়তা রয়েছে, তা তাকে একটি নিখুঁত চরিত্রে পরিণত করেছে।
গল্পের পটভূমিতে সর্দারজির কাবুল যাওয়ার উদ্দেশ্য এবং তার কঠিন যাত্রার মধ্যে যে সাহস, শৌর্য এবং নিজস্ব কর্তব্যবোধের পরিচয় পাওয়া যায়, তা লেখকের কাছে অত্যন্ত প্রভাবিত করেছে। তার মানবিক গুণাবলী এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা সর্দারজিকে লেখকের কাছে বিশেষভাবে প্রিয় ও ভালো লাগার মতো একটি চরিত্রে পরিণত করেছে।

গ. ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় উদ্দীপকের যে সত্ত্বাটি বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে, তা হল বাহিরের জগতের আহ্বান এবং দেশভ্রমণের মাধ্যমে সেই বাহ্যিক সত্তা সম্পর্কে জানতে চাওয়া।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে যে, মানুষ কেবল নিজেকেই জানার চেষ্টা করে না, বরং বাহিরের জগতের প্রতি তার আকর্ষণও থাকে, এবং এটি প্রলুব্ধ করে মানুষকে দেশভ্রমণের জন্য। সর্দারজি, যিনি কাবুলের দিকে যাত্রা করেন, তার মধ্যে এই বাহ্যিক জগতের প্রতি আকর্ষণ এবং নতুন পৃথিবী সম্পর্কে জানার ইচ্ছা ফুটে উঠেছে।
গল্পে, সর্দারজি তার দেশভ্রমণটি কেবল শখের জন্য করেননি, বরং তিনি এই ভ্রমণের মাধ্যমে নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করতে চেয়েছিলেন। তিনি কাবুলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানুষের জীবনযাত্রা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। এই বোধ ও আকর্ষণই তাকে কাবুলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে প্রলুব্ধ করে। তার যাত্রার মধ্যে বাইরের পৃথিবী এবং তার সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার গভীর আগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়া, লেখক কাবুলের বাস্তবতাকে একদিকে যেমন তথ্যসমৃদ্ধভাবে বর্ণনা করেছেন, তেমনি তা সর্দারজির দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যক্তিগত অনুভূতির সাথে মিশিয়ে উপস্থাপন করেছেন। লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি গল্পের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে, যা উদ্দীপকে উল্লিখিত ‘ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি’র প্রতি ইঙ্গিত দেয়। সর্দারজির চোখে কাবুলের যাত্রা, সেখানে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং তার অভিজ্ঞতা, সবই লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এভাবে, উদ্দীপকের কথা অনুযায়ী, ‘গন্তব্য কাবুল’-এ বাহিরের জগতের আহ্বান এবং ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে, যা সর্দারজির দেশভ্রমণের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ঘ. উদ্দীপকটির আলোকে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার শেষ কথা বিশ্লেষণ করলে, তা স্পষ্টভাবে বাহিরের জগতের আহ্বান এবং ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় প্রদর্শন করে।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, মানুষের বাহ্যিক পৃথিবী সম্পর্কে জানার আকাক্সক্ষা তাকে দেশভ্রমণে প্রলুব্ধ করে এবং এই অভিজ্ঞতা থেকে লেখক তথ্যসংবলিত গ্রন্থ রচনা করেন। তবে, এই গ্রন্থে সঠিক তথ্যের পাশাপাশি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার ছাপও থাকে। ‘গন্তব্য কাবুল’-এর শেষ কথা একইভাবে সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
গল্পটির শেষ অংশে, সর্দারজির কাবুলে পৌঁছানোর পরের পরিস্থিতি এবং তার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কাবুলের যে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক দৃশ্যপট দেখেন, তা শুধু এক দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রতিফলিত হয় না; বরং তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, অনুভূতি এবং মূল্যবোধও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সর্দারজি কেবল কাবুলের বাহ্যিক সত্তা-যেমন শহরের অবকাঠামো, মানুষের জীবনযাত্রা এবং রাজনৈতিক অবস্থা-এগুলি পর্যবেক্ষণ করেন না, বরং তার অনুভূতির সাথে সেগুলি মিলিয়ে দেখেন।
গল্পের শেষের দিকে সর্দারজি উপলব্ধি করেন যে, তিনি কাবুলে শুধু তথ্য সংগ্রহ করতে যাননি, বরং সেই তথ্যের মাঝে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের ছাপও স্পষ্ট হয়েছে। লেখক কাবুলের বর্ণনায় ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে একে সরাসরি তথ্যসমৃদ্ধ হিসেবে নয়, বরং সর্দারজির অনুভূতি, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে লেখক বুঝাতে চেয়েছেন যে, বাহ্যিক পৃথিবী সম্পর্কে জানার পরেও, তার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এইভাবে, ‘গন্তব্য কাবুল’-এর শেষ কথা শুধুমাত্র একটি তথ্যভিত্তিক উপসংহার নয়, বরং এটি সর্দারজির ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, যা উদ্দীপকের সেই সত্ত্বারই প্রকাশ-বাহ্যিক সত্তার সাথে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির মিশ্রণ।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-২:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
সকালে অফিসে যাওয়ার পথে জমির সাহেব প্রথম রিকশায় উঠলেন। কিছুদূর যেতেই রিকশার টায়ার যাওয়ার জন্য এবার তিনি হন্তদন্ত হয়ে পাঠাও রাইড ধরলেন। ধরতেই তলায় উঠলেন। কিছুদূর যেতেই রিকশার টায়ার কেঁদে পেল। আতা তিনি প্রমথটে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির শাবো। দেশ-বিদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র, জনজীবন, অরণ্য প্রকৃতিসহ নানা জিনিসের সাথে প্রহণকারীর পরিসা ঘটে। পরিচিত হতে পেরে সে একজন অরণ্য নাম।

ক. ‘টাঙা’ কী?
খ. সায়েবের বের করা খাবারগুলো দেখে লেখকের চোখ দুটো জমে যেতে লাগল কেন?
গ. উদ্দীপক (র)—এ ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার যে দিকটি ফুটে উঠেছে, তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘উদ্দীপক (রর) এবং ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সারকথা একইরকম।’ মন্তব্যটি মূল্যায়ন করো।

ক. ‘টাঙা’ হলো টাট্ট ঘোড়ায় টানা দুই চাকার গাড়ি।
খ. ট্রেনে ফিরিঙ্গি সাহেবের আনা খাবার তাঁর কেনা খাবারের সাথে হুবহু একই রকম হওয়ায় লেখক প্রশ্নোত উক্তিটি করেছেন।
‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনির লেখক কলকাতা থেকে পেশোয়ারের ট্রেনে সহযাত্রী হিসেবে এক ফিরিঙ্গি সাহেবকে পেয়েছিলেন। ভদ্রলোক বললেন যে, তার ফিয়াসে একগাদা খাবার রান্না করে পাঠিয়েছে। রাতে খাবারের সময় তিনি যখন প্যাকেট থেকে খাবার বের করা শুরু করলেন, তখন লেখক বিস্মিত হয়ে গেলেন। কারণ, লেখক যাত্রার আগে জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে বিভিন্ন পদের খাবার এনেছেন। ফিরিঙ্গি সাহেবের খাবারও একদম হুবহু একই। সাথে সাথেই লেখক বুঝতে পারলেন যে, ভদ্রলোকের ফিয়াঁসে হোটেল থেকে খাবার কিনে নিজের রান্না বলে দাবি করেছে। এজন্যই মূলত ফিরিঙ্গি ভদ্রলোকের খাবার দেখে লেখক বিস্মিত হন।

গ. উদ্দীপক (র)-এ ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার যাত্রাপথে বিড়ম্বনার দিকটি ফুটে উঠেছে।
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় লেখক জালালাবাদ পৌঁছাবার আগে থেকেই যাত্রাপথে নানা রকম বিড়ম্বনার শিকার হন। তিন-তিনবার গাড়ির চাকা ফেঁসে যায়, দুবার গাড়ির ইঞ্জিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সর্দারজির তদারকিতে হ্যাজি ম্যানন চাকা মেরামত করেন। জালালাবাদ পৌছাবার কয়েক মাইল আগে সর্দারজির কোমরবন্ধ ছিঁড়ে যায়। এরপর জানা যায় সর্দারজি রাতকানা, তাই গাড়ি রাতে আর চলবে না।
উদ্দীপকে (র)-এ জমির সাহেব অফিসে যাওয়ার পথে নানা বিড়ম্বনার মুখোমুখি হন। রিকশার টায়ার ফেঁসে যাওয়ায় ট্যাক্সি নেন, সেখানেও ট্যাক্সি ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকায় ট্রাফিক পুলিশের ঝামেলা হয়। অগত্যা তাকে পাঠাও রাইডে উঠে অফিসে যেতে হয়। এরকম যাত্রাপথের বিড়ম্বনা ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায়ও দেখা যায়। জালালাবাদ যাওয়ার পথে লেখকদের গাড়ির চাকা ফেঁসে যাওয়া, ইঞ্জিন নষ্ট হওয়াসহ বিভিন্ন ঝামেলায় পড়তে হয়।

ঘ. ভ্রমণ-বিষয়ক মৌলিক পর্যালোচনা উদ্দীপকে থাকায় আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ।
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় লেখক তাঁর বিপুল ভ্রমণ অভিজ্ঞতার একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের পরিচয় তুলে ধরেছেন। হাওড়া স্টেশন থেকে কাবুলের উদ্দেশে যে যাত্রাটি তিনি করেছেন, তাতে শেষ পর্যন্ত অসাধারণ রসঘন এক অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। যাত্রাপথের বিভিন্ন স্টেশন, জনপথ ও জনজীবনের বৈচির্ত্য ফুটে উঠেছে রচনায়। আমরা জেনেছি নানা ধরনের প্রকৃতি, ভূগোল ও সংস্কৃতি সম্পর্কে।
উদ্দীপকে (রর)-এ মানুষের ভ্রমণ-বিষয়ক অভিজ্ঞতার সারকথা ফুটে উঠেছে। দেশ-বিদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বৈচির্ত্য, জনজীবন, অরণ্য-প্রকৃতিসহ নানা জিনিসের সাথে পর্যটকের পরিচয়ের কথা বর্ণিত হয়েছে আলোচ্য উদ্দীপকে। ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায়ও এসব বিষয় দৃশ্যমান। জলন্ধর, রাওয়ালপিন্ডি, পেশোয়ার, খাইবার পাস, বুখারা, জালালাবাদ ইত্যাদি জনপদের স্থানিক বৈচিত্রা আলোচ্য রচনায় বর্ণিত হয়েছে। এর পাশাপাশি জনজীবনের বৈচির্ত্যও কম নয়।
উদ্দীপক (রর) ও ‘গন্তব্য কাবুল’ উভয় স্থানেই ভ্রমণ-বিষয়ক আলোচনা রয়েছে। এদের মাঝে প্রথমটিতে অর্থাৎ উদ্দীপক (রর)-এ রয়েছে ভ্রমণ-বিষয়ক আলোচনার সারকথা এবং অন্যটিতে অর্থাৎ আলোচ্য ভ্রমণকাহিনিতে রয়েছে ভ্রমণ অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ। আলোচ্য রুনায় লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা উঠে এলেও উদ্দীপকে এসেছে ভ্রমণের সাধারণ ধারণা। একটি ব্যক্তিবিশেষের হলেও অপরটি যান্তিনির্বিশেষ। তাই বলা যায় যে, উদ্দীপক (রর) এবং ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার বিষয়গত বৈসাদৃশ্য থাকলেও সারকথা একইরকম।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-৩:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
ইবনে বতুতা তাঁর সময়ে সর্বাধিক ভ্রমণ করা ব্যক্তিদের একজন। ১৩২৫ সালে মরক্কো থেকে ১৯ বছর বয়সে তিনি পবিত্র হজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। তিনি স্থল হতে মক্কা যান। তিনি উত্তর আফ্রিকার তটরেখা দরে আবদ-আল ওয়াদিদ এবং হাফাসিদ-এর রাজ্য হয়ে যান। ১৩২৬ সালের বসন্তে প্রায় ৩৫০০ কি.মি. ভ্রমণ শেষে তিনি আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে আসেন।

ক. সর্দারজির মতে, কোন এলাকায় শিলওয়ার বানাতে সাড়ে সাত গজ কাপড় লাগে?
খ. ‘এও তো তাজ্জব কি বাত।’—সর্দারজি এ কথা বলেছে কেন?
গ. উদ্দীপকে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার কোন দিকটি প্রকাশিত হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘লেখক যেন ইবনে বতুতার আধুনিক সংস্করণ।’—উদ্দীপক ও ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার আলোকে বিশ্লেষণ করো।

ক. সর্দারজির মতে, রাওয়ালপিন্ডিতে শিলওয়ার বানাতে সাড়ে সাত গজ কাপড় লাগে।
খ. পেশোয়ারে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে আসলে লেখকের বন্ধুর বন্ধু হয়তো তাঁকে সহজেই চিনে নিতে পারতো—লেখকের এমন দ্বিধার জবাবে সর্দারজি আলোচ্য উক্তিটি করেন।
লেখক কাবুল যাওয়ার পথে পেশোয়ার স্টেশনে এক সর্দারজির সাক্ষাৎ পান। লেখককে সেখান থেকে অভ্যর্থনা দিতে একজন অপরিচিত লোক আসবে বলে সর্দারজিকে জানালে তিনি বলেন যে, তাঁকে চিনে নিতে কোনো অসুবিধেই হবে না। অন্য জাতির মানুষের মাঝে একজন বাঙালিকে চেনা খুবই সহজ হবে। লেখক সহজে পরিচিত হওয়ার জন্য ধুতি-পাঞ্জাবি পরার কথা বললে সর্দারজি অবাক হয়ে যান। কেননা, পাঞ্জাবি তো শুধু বাঙালিরাই পরে না। সে কারণেই লেখকের কথার জবাবে সর্দারজি বলেছে, ‘এও তো তাজ্জব কি বাত।’

গ. উদ্দীপকে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার দীর্ঘ ভ্রমণের দিকটি প্রকাশিত হয়েছে।
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় হাওড়া স্টেশন থেকে শুরু করে কাবুল পর্যন্ত নানা স্টেশন ও জনপদে লেখকের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কথা অত্যন্ত রসনিবিড় করে তুলে-ধরা হয়েছে। যাত্রা শুরু হয় একজন ফিরিঙ্গির সাথে; এরপর লেখকের আরও কতজনের সাথে যে পরিচয় হয় তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ভিন্ন ভিন্ন জনপদ, ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান এবং সর্বোপরি মানুষের বৈচির্ত্য দেখতে দেখতে লেখকের ভ্রমণ পথের সময় কাটে। উদ্দীপকে বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ বৃত্তান্তের এক ক্ষুদ্র অংশ উঠে এসেছে। জন্মভূমি মরক্কো থেকে মক্কায় হজ করার নিমিতে বের হলেও বিশ্ব দেখার আকর্ষণে যাত্রা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার পথ ভ্রমণ, আজ থেকে সাতশত বছর আগে অনেকটা অকল্পনীয়। ভ্রমণের এহেন নেশা ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনাতেও বিদ্যমান। লেখকের কাবুলের উদ্দেশে যাত্রা নিঃসন্দেহে বেশ বড়ো একটি ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।

ঘ. ভ্রমণের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আলোচ্য মন্তব্যটিকে যথার্থ বলা যায়।
আলোচ্য ভ্রমণকাহিনির লেখক বিচিত্র এক জীবনযাপন করেছেন। কত জনপদ, কত মানুষ আর কত ঘটনার সঙ্গে যে তিনি এক জীবনে পরিচিত হয়েছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ‘গন্তব্য কাবুল’ তাঁর বৃহৎ পর্যটক জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র। হাওড়া স্টেশন থেকে কাবুলের উদ্দেশে যে যাত্রাটি শুরু করেছিলেন শেষ পর্যন্ত অসাধারণ রসঘন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তা এগিয়ে চলে।
উদ্দীপকে জগৎবিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার পর্যটক জীবনের সারকথা বর্ণিত হয়েছে। আজ থেকে ৭০০ বছর আগে মাত্র এক বছরের মধ্যে ৩৫০০ কিলোমিটার ভ্রমণ এক কথায় অবিশ্বাস্য। কিন্তু ইবনে বতুতার প্রবল ভ্রমণস্পৃহা সেটিকে বাস্তবে রূপদান করেছে। ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনাতেও লেখকের একইরকম ভ্রমণস্পৃহার পরিচয় মেলে। রচনাটি তাঁর পর্যটক জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র। তাতেই তিনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।
উদ্দীপকের ইবনে বতুতার ভ্রমণস্পৃহা এবং ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার লেখকের ভ্রমণস্পৃহা প্রায় সমান্তরাল। উদ্দীপকে যেমন আজ থেকে ৭০০ বছর আগের জীবনবাস্তবতায় ইবনে বতুতার বিশ্বভ্রমণের কিছুটা পরিচয় মেলে, ঠিক তেমনি আলোচ্য রচনায় গেল শতাব্দীতে লেখকের বিপুল ভ্রমণের একটি অধ্যায় বর্ণিত হয়েছে। তাই বলা যায় যে, ভ্রমণ বিষয়ে লেখক যেন ইবনে বতুতার আধুনিক সংস্করণ।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-৪:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
বিপ্লবের চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বেড়াতে গিয়ে বাঁধল মহা বিপত্তি। গেটের চেকপোস্টে গাড়ি ঘামানো হলো। কারণ সবার জন্য ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত নয়। পরিচয়পত্র দেখিয়ে যার কাছে যাবে তার নাম বলার পর গেট খুলে দেওয়া হলো। ভিতরে দুধারে সবুজ অরণ্যের মাঝে চমৎকার মসৃণ রাস্তা। বিস্তীর্ণ সেই রাস্তায় পায়ে হাঁটা মানুষের কষ্ট হলেও যানবাহনে যাতায়াতকারীদের কোনো কষ্ট হয় না।

ক. পাঠান মুল্লুকের কোহাট খাইবারে কোন কাপড় দিয়ে শিলওয়ার বানানো হয়?
খ. ‘পেশাওয়ার স্টেশনে এক গাড়ি বাঙালি নামে না।’—কথাটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
গ. উদ্দীপকের সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’-এর কোন ঘটনার সাথে মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘উদ্দীপকে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সামগ্রিক ভাব প্রকাশিত হয়নি।’—উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।

ক. পাঠান মুল্লুকের কোহাট খাইবারে খাকি শার্টিং কাপড় দিয়ে শিলওয়ার বানানো হয়।
খ. প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, পেশোয়ার স্টেশনে খুব বেশি বাঙালি নামে না।
পেশোয়ার যাওয়ার পথে এক শিখ সর্দারজির সাথে আলাপ হয় লেখকের। কথায় কথায় সর্দারজি লেখকের কাছে জানতে চান যে, পেশোয়ারে তিনি কাউকে চেনেন কি, নাকি হোটেলে উঠবেন। তখন সর্দারজির প্রশ্নের জবাবে লেখক বলেন, স্টেশনে তাকে নিতে আসবে তাঁর এক বন্ধুর বন্ধু। কিন্তু লেখক তাকে আগে কখনো দেখেননি। তাকে সে কীভাবে চিনবে তা নিয়ে তিনি কিছুটা উদবিগ্ন। লেখকের এই কথার প্রেক্ষিতে সর্দারজি প্রশ্নোত্ত উক্তিটি করেন।

গ. উদ্দীপকের সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’-এর খাইবার পাস অতিক্রম করার ঘটনার মিল রয়েছে। ‘গন্তব্য কাবুল’ এর লেখক কাবুল যাওয়ার পথে এক জায়গায় দেখতে পান রাস্তা বন্ধ করে গেট লাগানো। সেখানে গাড়ি থামাতে হয়। কথায় কাজ হয় না অবশেষে পাসপোর্ট দেখাতে হয়। পাসপোর্ট দেখে তবেই বন্ধ গেট খুলে দেওয়া হয়। কড়াকড়ি অবস্থা দেখে লেখকের কাবুলি- সাথি বলে, দুনিয়ার সব পরীক্ষা পাশের চেয়ে বড়ো পরীক্ষা হলো খাইবার পাস পাশ করা। উদ্দীপকেও আমরা দেখতে পাই, বিপ্লব চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বেড়াতে যায়। ক্যান্টনমেন্টের চেকপোস্টে তার গাড়ি থামানো হয়। কেননা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নিরাপত্তার জন্য সেই গেট সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। তাই সেখানে যেতে বিপ্লবকে নিজের পরিচয়পত্র দেখাতে হয় ও যার কাছে যাবে তার নাম বলতে হয়। তারপর সে ভিতরে ঢুকতে পারে। সুতরাং বলতে পারি, ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার খাইবার পাস পাশের ঘটনার সাথে উদ্দীপকের ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে প্রবেশের ঘটনাটির বেশ মিল রয়েছে।

ঘ. ‘উদ্দীপকে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সামগ্রিক ভাব প্রকাশিত হয়নি।’—উক্তিটি যথার্থ।
‘গন্তব্য কাবুল’ সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি ভ্রমণকাহিনি। এখানে লেখককে হাওড়া স্টেশন থেকে কাবুলের উদ্দেশে যাত্রা করতে দেখা যায়। যাত্রাপথে লেখক সেখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা, কৃষ্টি-কালচার সম্পর্কে ধারণা ও নানা অভিজ্ঞতা লাভ করেন। সেই অভিজ্ঞতার অনেক ঘটনার মধ্যে একটি ঘটনা হলো খাইবার পাস পার হওয়া, যা কাবুলের লোকজনের মতে অনেক কঠিন একটি পরীক্ষার সমতুল্য।
উদ্দীপকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বেড়াতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয় বিপ্লবকে। ক্যান্টনমেন্টের চেকপোস্টে তার গাড়ি থামানো হয়। কেননা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নিরাপত্তার জন্য সবার জন্য গেট উন্মুক্ত নয়। পরিচয়পত্র দেখিয়ে যার কাছে যাওয়া হবে তার নাম বলার পর গেট খুলে দেওয়া হয়। বিপ্লবকেও সেখানে তার পরিচয়পত্র দেখিয়ে যার কাছে যাবে তার নাম বলতে হয়। ভিতরে দুধারে সবুজ অরণ্যের মাঝে চমৎকার। রাস্তা। বিস্তীর্ণ সেই রাস্তায় পায়ে হাঁটা মানুষের জন্য কষ্টকর। উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, বিপ্লব নামের একজন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বেড়াতে গেলে চেকপোস্টে তার গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। ফলে তাকে নিজের পরিচয়পত্র ও যার কাছে যাবে সেই ব্যক্তির নাম বলতে হয়। তারপর ভিতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়। ক্যান্টনমেন্টের ভিতরের মসৃণ রাস্তার দুপাশে রয়েছে সবুজের সমারোহ।
আলোচ্য রচনায় খাইবার পাস পারের সময় লেখককে পাসপোর্ট দেখাতে হয়। তারপর রাস্তা বন্ধ করে লাগানো গেট খুলে দেওয়া হয়। ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় এই ঘটনা ছাড়া আরও বহু ঘটনা ও অভিজ্ঞতার অবতারণা করা হয়েছে। অপরদিকে, উদ্দীপকে কেবল একটি বিষয়ের আলোকপাত রয়েছে। সুতরাং নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, প্রশ্নোক্ত উক্তিটি যথার্থ।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-৫:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
মিতু বিদেশে গিয়ে পরিচিত হয় একজন আফ্রিকান মহিলার সঙ্গে। মহিলা অত্যন্ত ভালো ও আন্তরিক। পরিচয় থেকে আলাপ। অতঃপর খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায় উভয়েই। একদিন দুপুরে খাওয়ার সময় হলে আফ্রিকান মহিলা তার ব্যাগ খুলে কিছু খাবার বের করেন। মায়ের হাতের রান্না করা বলে মিতুকে খেতে বলায় মিতু তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সানন্দে আফ্রিকান মহিলার খাবার গ্রহণ করে।

ক. বুড়ো বয়সেও মাঝে মাঝে বায়োস্কোপে যায় কে?
খ. কোন বিষয়ে লেখকের ঈষৎ উদ্বেগ রয়েছে? বুঝিয়ে লেখো।
গ. উদ্দীপকের আফ্রিকান মহিলার সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’-এর কোন চরিত্রের সাদৃশ্য রয়েছে?
ঘ. ‘উদ্দীপকটি ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার খন্ডাংশ মাত্র।’ উদ্দীপক ও ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার আলোকে তোমার মতামত দাও।

ক. বুড়ো বয়সেও মাঝে মাঝে বায়োস্কোপে যায় সর্দারজি।
খ. পেশোয়ার স্টেশনে লেখকের বন্ধুর বন্ধু তাকে চিনবে কি না সেই বিষয়ে তাঁর কিছুটা উদ্বেগ ছিল।
পেশোয়ার যাওয়ার পথে সর্দারজির সাথে লেখকের আলাপ হয়। সর্দারজি লেখকের কাছে জানতে চান, পেশোয়ারে লেখক কাউকে চেনে কি না। সর্দারজির প্রশ্নের উত্তরে লেখক জানান, তাঁর বন্ধুর বন্ধু স্টেশনে আসবে তাকে নিতে। কিন্তু লেখক আগে কখনো তাকে দেখেনি। লেখককে স্টেশনে নিতে আসা লোকটি তাঁকে চিনতে পারবে কি না সেই বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করতেই প্রশ্নোক্ত কথাটি বলা হয়েছে।

গ. উদ্দীপকের আফ্রিকান মহিলার সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার ফিরিজিা চরিত্রের সাদৃশ্য রয়েছে।
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় দেখা যায়, একজন ফিরিঙ্গি-সহযাত্রীর সাথে লেখকের আলাপ-পরিচয় হয়। কথা বলার মধ্যে সন্ধ্যা হতে না হতেই ফিরিঙ্গি ভদ্রলোকটি প্রকা- এক চুবড়ি খুলে নানা পদের খাবার বের করে। লেখককে বলে এগুলো তার ফিঁয়াসে যত্ন করে ডিনারের জন্য বানিয়ে দিয়েছে।
উদ্দীপকেও দেখতে পাই, বিদেশে গিয়ে মিতুর একজন আফ্রিকান মহিলার সাথে পরিচয় ঘটে। মহিলা অনেক আন্তরিক। আলাপচারিতার মাধ্যমে দুজনের মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একদিন দুপুরে খাওয়ার সময় হয়ে এলে আফ্রিকান মহিলা ব্যাগ থেকে কিছু খাবার বের করে তার মায়ের হাতের রান্না বলে দাবি করে। আনন্দ চিত্তে মিতু তার দেওয়া খাবার গ্রহণ করে। আফ্রিকান মহিলার এই আচরণের সাথে আলোচ্য ভ্রমণকাহিনির ফিরিঙ্গির সাদৃশ্য রয়েছে।

ঘ. ‘উদ্দীপকটি ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনির খ-াংশ মাত্র।’—উক্তিটি যথার্থ।
‘গন্তব্য কবুল’ একটি ভ্রমণকাহিনি। এখানে লেখক তাঁর কাবুল ভ্রমণের অনেক অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার ছোট ছোট ঘটনা সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। যেখানে স্থান পেয়েছে বিভিন্ন জায়গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, কৃষ্টিকালচারসহ নানা অনুষঙ্গ। যার মধ্যে একটি হলো লেখকের সাথে ফিরিঙ্গির পরিচয় ও তার আন্তরিক আতিথেয়তা। দেখিতে লক্ষ করা যায়, বিদেশে মিতুর সাথে পরিচয় ঘটে এক আফ্রিকান মহিলার। পরিচয় থেকে আলাপের একপর্যায়ে দুপুরে খাওয়ার সময় হলে তিনি ব্যাকে কিছু খাবার বের করেন। মিতুকে খেতে আমন্ত্রণ করে বলেন- এগুলো আমার মায়ের হাতের রান্না করা খাবার। মৃত সেই মহিলার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে আতিথেয়তা গ্রহণ করে। উদ্দীপকে আমরা কেবল একজন বিদেশিনির আতিথেয়তার বিষয়টি লক্ষ করি। কিন্তু 'গন্তব্য কাবল' রচনার বিষয়বস্তু আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকটি আলোচ্য রচনার খ-াংশ মাত্র।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-৬:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
নিনাদ রাজশাহী বাসস্ট্যান্ড থেকে বেনাপোল যাওয়ার উদ্দেশে বেনাপোলগামী দূরপাল্লার বাসে চড়ে যাত্রা আরম্ভ করল। বাসের দ্রুতগতির সাথে সমানতালে যেন মে মাসের প্রখর রৌদ্র পাল্লা দিচ্ছিল। বাস ও রৌদ্রের উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলার পাল্লায় নিনাদসহ অন্য যাত্রীর প্রাণ প্রায় যায় যায়।

ক. সৈয়দ মুজতবা আলী কত খ্রিষ্টাব্দে মারা যান?
খ. ‘আমার চোখ দুটো সঙ্গে সঙ্গে জমে যেতে লাগল।’—লেখক কেন এ কথা বলেছেন?
গ. উদ্দীপক ও ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার মধ্যে সাদৃশ্য দেখাও।
ঘ. ‘উদ্দীপকটি ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সমগ্রভাব ফুটে ওঠেনি।’—মন্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ করো।

ক. সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে মারা যান।
খ. ট্রেনে ফিরিঙ্গি সাহেবের আনা খাবার তাঁর কেনা খাবারের সাথে হুবহু একই রকম হওয়ায় লেখক প্রশ্নোত উক্তিটি করেছেন।
‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনির লেখক কলকাতা থেকে পেশোয়ারের ট্রেনে সহযাত্রী হিসেবে এক ফিরিঙ্গি সাহেবকে পেয়েছিলেন। ভদ্রলোক বললেন যে, তার ফিয়াসে একগাদা খাবার রান্না করে পাঠিয়েছে। রাতে খাবারের সময় তিনি যখন প্যাকেট থেকে খাবার বের করা শুর করলেন, তখন লেখক বিস্মিত হয়ে গেলেন। কারণ লেখক যাত্রার আগে জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে বিভিন্ন পদের খাবার এনেছেন। ফিরিঙ্গি সাহেবের খাবারও একদম হুবহু একই। সাথে সাথেই লেখক বুঝতে পারলেন যে, ভদ্রলোকের ফিয়াঁসে হোটেল থেকে খাবার কিনে নিজের রান্না বলে দাবি করেছে। এজন্যই মূলত ফিরিঙ্গি ভদ্রলোকের খাবার দেখে লেখক বিস্মিত হন।

গ. উদ্দীপক ও ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় অসহনীয় গরম ও ভয়-জাগানিয়া দ্রুগতিসম্পন্ন গাড়ির মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।
‘মন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে দেখা যায়, লেখক হাওড়া স্টেশন থেকে কাবুলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। পথিমধ্যে ভোর হতেই অত্যধিক গরমে লেখককে গাড়ির মধ্যে নাকাল হতে হয়। লেখকের মতে, জুন মাসের গরম পশ্চিমে গৌরচন্দ্রিকা করে নামে না। অর্থাৎ কোনো প্রকার পূর্বাভাস গড়াই সকালের শুরুতেই সে সারাদিনের তীব্রতার আভাস দিয়ে যায়। সেই সাথে লেখকের গাড়িও যেন পাল্লা দিয়ে ছুটে চলেছে গরমকে হার মানিয়ে ঠান্ডায় ক্ষণিক জিরানোর জন্য। গরমের এমন তীব্রতা ও গাড়ির দ্রুতগতিতে ছুটে চলায় লেখকসহ অন্য যাত্রীদের প্রায় প্রাণ-যায় অবস্থা। উদ্দীপকের নিনাদ বেনাপোল যাওয়ার উদ্দেশে রাজশাহী বাসস্ট্যান্ড থেকে দূরপাল্লার বাসে চড়ে যাত্রা আরম্ভ করে। যাত্রাপথে মে মাসের প্রচণ্ড গরম বাসের মধ্যে তাদের তাতিয়ে তোলে। গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের বাসও যেন ছুটে চলেছে সমানতালে। বাসের গতি ও রোদের এমন সমান্তরাল তীব্রতায় নিনাদসহ অন্য যাত্রীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে। ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনাতেও লেখককে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে। হয়। উদ্দীপকের বিষয়বস্তুর সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সাদৃশ। মূলত এখানেই নিহিত।

ঘ. উদ্দীপকে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সমগ্রভাব ফুটে ওঠেনি।—মন্তব্যটি যথার্থ।
‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে কাবুলের উদ্দেশে লেখকের যাত্রার বর্ণনা ও মানুষের জীবন বৈচিত্রা, তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য প্রভৃতির বর্ণনা রয়েছে। ভ্রমণপথের বর্ণনা লেখক বেশ রসময় করে উপস্থাপন, করেছেন। বিচিত্র মানুষের বর্ণনা করেছেন বাস্তবিকভাবেই।
উদ্দীপকে নিনাদ রাজশাহী থেকে বেনাপোল যাওয়ার উদ্দেশে বেনাপোলগামী দুরপাল্লার বাসে চড়ে যাত্রা করে। সেখানে প্রখর রোদের কারণে প্রচন্ড গরম পড়ে। ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় খাইবার পাসের উদ্দেশে লেখক যখন যাত্রা করেন তখন সেখানেও প্রচ- গরম পড়ে। উদ্দীপকের সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার এই অংশের মিল থাকলেও সমগ্র ভাব ফুটে ওঠেনি।
‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে লেখক অনেক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। রচনায় লেখক সহযাত্রী ফিরিঙ্গি সাহেবের কথা বলেছেন, জাকারিয়া স্ট্রিটের খাবার, বুড়ো সর্দারজি, শেখ আহমদ আলীর আতিথেয়তা, ড্রাইভার শিখ সর্দারজি, পুস্তিন সদাগর এর উৎকৃষ্ট আরবি উচ্চারণসহ অনেকের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া কাবুলি ব্যবসায়ীদের পেশোয়ার থেকে বিভিন্ন জিনিস কিনে নেওয়া, খাইবার পাসের আঁকাবাঁকা রাস্তা, রাহাজানি, আফগান-সরাইয়ের বর্ণনা এবং জালালাবাদ শহরের বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু উদ্দীপকে যাত্রাপথের কিছু বর্ণনা থাকলেও এ জাতীয় কোনোকিছুর বর্ণনা নেই। তাই বলা যায়, 'উদ্দীপকটি ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সমগ্র ভাব ফুটে ওঠেনি।"- মন্তব্যটি যথার্থ।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-৭:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
প্রতিদিন সকালবেলা নাহিদের ঘুম ভাঙে মায়ের কোরআন তেলাওয়াত শুনে। মিষ্টিমধুর সুরে মায়ের মুখে আরবি উচ্চারণ নাহিদকে। নাহিদকে বিস্মিত করে তোলে। কোনো মানুষ কীভাবে এত স্নিগ্ধ তেলাওয়াত করতেলাগায়োত।

ক. ইরাকে বিনা পর্দায় ছাগল চরায় কারা?
খ. লেখক তিন গজ পিছিয়ে গেলেন কেন? ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের ঘটনার সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সাযুজ্যপূর্ণ দিকটি বর্ণনা করো।
ঘ. উদ্দীপকে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সম্পূর্ণ ভাব ফুটে ওঠেনি।—মন্তব্যটি বিচার করো।

ক. আরবের বেদুইন মেয়েরা ইরাকে বিনা পর্দায় ছাগল চরায়।
খ. আফগান সরাইয়ে শত শতাব্দীর পুঞ্জীভূত দুর্গন্ধের কারণে লেখক তিন গজ পিছিয়ে গেলেন।
লেখক আফগান সরাইতে গিয়ে তার অবয়ব দেখে অবাক হন। বিশাল দুর্গ, ত্রিশ ফুট উঁচু হলদে মাটির চারটি দেওয়াল। বিরাট দরজা যা দিয়ে উট, বাস এমনকি ডাবল ডেকার বাসও অনায়াসে ঢুকতে পারে, যা দেখতে অনেকটা দানবের মতো। সাধারণ সরাইখানা যেমন হয় তার সাথে এ কোনো মিল নেই। ওই এলাকাটি মৌসুমি বায়ুর বাইরে হওয়ায় সেখানে কখনো বৃষ্টি হয়। না। আবার বরফও পড়ে না। আশপাশে নদী বা লা না থাকায় ধোয়ামোছা করার জন্য পানির ব্যবহার হয় না। তাই সূক্ষ্ম দুর্গন্ধ সবখানে ছড়িয়ে আছে বলে লেখক আলোচ্য উক্তি করেছেন।

গ. উদ্দীপকের ঘটনার সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সাযুজ্যপূর্ণ দিকটি হলো বুখারার পুস্তিন সদাগর এর উৎকৃষ্ট আরবি উচ্চারণ।
‘গন্তব্য কবুল' রচনার লেখক তাঁর স্বভাবসুলভ রম্য-রসিকতার পাশাপাশি এক বিদগ্ধ প-িতের ন্যায় ছন্দমধুর প্রজ্ঞা আর মননের পরিচয়ও দিয়ছেন। কাবুলের উদ্দেশে যাত্রাপথে একদিন ভোরবেলায় আজান শুনে লেখকের ঘুম ভাঙে। বুখারার পুস্তিন সদাগরের মোহনীয় সুরে উৎকৃষ্ট আরবি উচ্চারণ লেখককে মুগ্ধ করে। বিস্ময়াবিষ্ট লেখক তুর্কিস্তানে এত ছন্দবদ্ধ উচ্চারণের আরবি টিকে থাকার রহস্য সরাসরি তাঁর কাছ থেকে জদতে দ্বিধাবোধ করেন। এক্ষেত্রে তাঁর সহযাত্রী আফগান সরকারের কর্মচারী লেখককে সরাসরি তা সদাগরকে জিজ্ঞাসা করতে উৎসাহিত যান। প্রচাদেশে অপরিচিত মানুষকেও যে খোলামনে যেকোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা যায়- সেই সংস্কৃতির দিকও এখানে উঠে এসেছে।
উদ্দীপকে নাহিদের প্রতিদিন সকালে ওর মায়ের কোরআন তেলাওয়াত শুনে ঘুম ভাঙে। মিষ্টিমধুর সুরে মায়ের মুখে আরবি উচ্চারণ শুনে সে ইষ্টিত হয়। এত স্নিগ্ধ তেলাওয়াত কোনো মানুষ কীভাবে করতে পারে তা-ই তাকে ভাবিয়ে তোলে। ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় যাত্রাপথে লেখকের ঘুম ভাঙে আজান শুনে। সেখানে নামাজ পড়িয়েছেন বুখারার এক-পুস্তিন সদাগর। তার উৎকৃষ্ট আরবি উচ্চারণ শুনে তিনি অবাক ও মুগ্ধ হন। উদ্দীপকের ঘটনার সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার এই দিক সাযুজ্যপূর্ণ।

ঘ. উদ্দীপকে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার সম্পূর্ণ ভাব ফুটে ওঠেনি।—মন্তব্যটি যথার্থ।
‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে লেখক কাবুল ভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছেন। এই গল্পে লেখক বিভিন্ন স্থানের মানুষের বিচিত্র জীবনাচার ও স্বভাবের বর্ণনা দিয়েছেন। যেখানে ছিল ফিরিঙ্গি, বুড়ো সর্দারজি, শেয়া আহমদ আলী, ড্রাইভার পিক সর্দারজি,পুস্তিন সদাগরসহ আরো অনেকেই। এছাড়াও এখানে তিনি বিভিন্ন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা, আবহাওয়া, বিভিন্ন স্থান দিন খাইবার পাস,জালালাবাদ ইত্যাদির বর্ণনা দিয়েছেন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, নারীদের প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গে ওর মায়ের কোরআন তেলাওয়াত শুনে। তিনি স্নিগ্ধ সুরে তেলাওয়াত তেলাওয়াত করতে পারে।
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় লেখক বুখারার পুস্তিন সদাগর এর আরবি উচ্চারণ শুনে বিস্মিত হন। উদ্দীপকের লেখাটি রচনার এই অংশকে ধারণ করলেও এতে সম্পূর্ণ ভাব ফুটে ওঠেনি। কারণ ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণ কাহিনীতে লেখক অন্যান্য অনেক কিছুর বর্ণনা দিয়েছেন। তাই উক্ত বক্তব্যটি যথার্থ।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-৮:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
ভ্রমণ পিপাসি হলেও মিজান সাহেব খুব বেশি ভ্রমণের সুযোগ পাননি। অফিস থেকে পাঁচ দিনের ছুটি নিয়ে তিনি এবার পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। গাড়িতে তার পাশের সিটে সহযাত্রীটি রাশভারী হাওয়ায় তার সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। ফলে অচেনা-অজানা স্থান ভ্রমণের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে তিনি এক সময় ঘুমিয়ে পড়েন।

ক. ‘এত মনমরা হলে কেন?’—কে বলেছিল?
খ. সায়েবের চক্ষুস্থির হওয়ার কারণ কী?
গ. ‘উদ্দীপকের মিজান সাহেব ও ‘গন্তব্য কাবুল' রচনার লেখকের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।’—আলোচনা করো।
ঘ. সহযাত্রী ভ্রমণ-অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।' উদ্দীপক ও ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনা অবলম্বনে বিশ্লেষণ করো।

ক. কথাটি ফিরিঙ্গি লোকটি বলেছিল।
খ. সায়েবের চক্ষুস্থির হওয়ার কারণ লেখকের খাবারের সঙ্গে তার 'ফিঁয়াসে'র তৈরি করে দেওয়া খাবারের সাদৃশ্য।
সয়েহের সঙ্গে লেখকের আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি তার 'ফিয়াসে'র তৈরি করা খাবার বের করে লেখককেও তা খেতে আহ্ববান করেন। কিন্তু লেখক জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে যে খাবার কিনেছিলেন তার সঙ্গে সায়েবের খাবারের হুবহু মিল দেখে তার চক্ষুস্থির হয়ে যায়।

গ. সহযাত্রীর মনোভাব প্রতিকূল থাকায় উদ্দীপকের মিজান সাহেবের সঙ্গে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার লেখকের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতায় বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
গন্তব্য কাবুল' ভ্রমণকাহিনিতে লেখকের হাওড়া স্টেশন থেকে কাবুলের উদ্দেশে যাত্রায় তাঁর সহযাত্রী হয় এক ফিরিঙ্গি। যিনি লেখকের সাথে খবার ভাগ করে খেয়ে তাঁর একঘেয়েমি দূর করতে সাহায্য করেছিলেন। সহযাত্রী হিসেবে ফিরিঙ্গির আন্তরিকতা লেখকের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে আনন্দময় করে তুলেছিল।
উদ্দীপকে, মিজান সাহেব ভ্রমণপিপাসু হলেও ভ্রমণের সুযোগ তেমন পাননি। তাই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সে স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। গাড়িতে তার সহযাত্রীর সাথে সে নানাভাবে গল্প জমাতে চাইলেও তার সহযাত্রীর রাশভারী স্বভাবের কারণে তিনি বার্থ হন এবং এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়েন। অন্যদিকে, ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে লেখক হাওড়া স্টেশন থেকে কাবুলের উদ্দেশ্যে যে যাত্রা করেছিলেন তাতে তাঁর সহযাত্রী হয় এক ফিরিঙ্গি। ফিরিঙ্গির আন্তরিকতা, বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব লেখকের একঘেয়েমি দূর করে। সহযাত্রীর সঙ্গে বিচিত্র ধরনের খাবার ভাগ-বাটোয়ারা করে খাওয়ার মধ্যে মানবিকতা ও সাম্যের এক দৃষ্টান্তের সজো আমাদের পরিচয় ঘটে। অতএব বলা হয়, সহযাত্রীর মধ্যে বিপরীতধর্মী মনোভাব থাকায় উদ্দীপকের মিজান সাহেব ও আলোচ্য রচনার লেখকের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. ‘গন্তব্য কাবুল’-এর লেখকের অভিজ্ঞতা এবং মিজান সাহেবের অভিজ্ঞতা বিচারে বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে লেখকের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ দিকটি ফুটে উঠেছে রসঘন অনেক ঘটনার মাধ্যমে। ভ্রমণে লেখকের সহযাত্রী ফিরিঙ্গি লেখকের ভ্রমণকালীন ক্লান্তি অনেকটাই লাঘব করে তার আন্তরিকতার দ্বারা। সহযাত্রীর এই অনূকুল মনোভাব লেখকের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে বৈচির্ত্যময় করে তোলে।
উদীপকে ভ্রমণপিপাসু মিজান সাহেব ভ্রমণের খুব বেশি সুযোগ পাননি। তাই অফিস থেকে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে পাঁচ দিনের ছুটি নেন। অজানা-অচেনা রাস্তায় নিজের একাকিত্ব মেটানোর জন্য সহযাত্রীর সঙ্গে তিনি নানাভাবে আলাপচারিতা জমাতে চাইলেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় লেখক কাবুলে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যে গাড়িতে উঠেছিলেন সেখানে প্রাথমিক অবস্থায় তাঁর মনে হয়েছিল সে একা, যার কারণে তাঁর ভ্রমণের উৎকণ্ঠা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু তাঁর সহযাত্রী এক ফিরিঙ্গি তাঁর এই গুম হয়ে যাওয়া দেখে আন্তরিক আচরণ করেন এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে ভ্রমণের একাকিত্ব দূর করতে সহায়তা করেন। তাছাড়া নিজের আনা বিচিত্র ধরনের খাবার ভাগ করে খাওয়ার মাধ্যমে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ভ্রমণপণে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতে থাকায় লেখকের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা সাবলীল মাত্রা পেয়েছিল। সহযাত্রীর এই আন্তরিক মনোভাব উম্মীপকের মিজান সহেবের ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় অনুপস্থিত। তাই বলা যায়, ‘সহযাত্রী ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।’—মন্তব্যটি যথার্থ।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-৯:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
জীবনে প্রথমবারের ক্সবাজারে বেড়াতে এলেন মেরাজ আলী। প্রথমে তিনি স্থানীয় কোনো হোটেলে উঠতে চাইলেও পরে তার এক বন্ধুর দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায় সিদ্ধান্ত নেন। গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা সংকোচ বোধ করলেও তার বন্ধুর দোষ সম্পর্কের মামা আমজাদ আলীর উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথ্যে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান।

ক. লেখকের বন্ধুর বন্ধুর নাম কী?
খ. ‘এর কতটা আন্তরিক, আর কতটা লৌকিকতা?’—কেন বলা হয়েছে?
গ. উদ্দীপকের আমজাদ আলী ও ‘গন্তব্য কাবুল’-এর শেখ আহমদ আলীর চারিত্রিক সাদৃশ্য চিহ্নিত করো।
ঘ. ‘পাঠানের অভ্যর্থনা নির্জলা আন্তরিক।’—উদ্দীপকের আলোকে উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

ক. লেখকের বন্ধুর বন্ধুর নাম শেখ আহমদ আলী।
খ. ‘এর কতটা আন্তরিক, আর কতটা লৌকিকতা?’—কথাটিতে প্রকাশ পেয়েছে মূলত শেখ আহমদ আলীর উষ্ণ অভ্যর্থনায় মুগ্ধ লেখক এর সামরিক দ্বিধা।
পেশোয়ারে পৌঁছানোর পর লেখকের বন্ধুর বন্ধু তাঁকে সংবর্ধনা জানান। যদিও তিনি লেখকের পরিচিত নন; কিন্তু তাঁর অভ্যর্থনায় ছিল আন্তরিকতা আর উৎসাহ, যা লেখককে অভিভূত করেছিল। হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন, এটি কি সত্যিই আন্তরিক নাকি শুধুই লৌকিকতা।

গ. অতিথি আপ্যায়নে আন্তরিকতার দিকটি উদ্দীপকের আমজাদ আলী ও ‘গন্তব্য কাবুল’-এর শেখ আহমদ আলীর মধ্যে চারিত্রিক সাদশের পরিচয় দেয়।
‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে দেখা যায়, লেখকের নিকট পেশোয়ার ছিল এক অপরিচিত স্থান। সেখানে তাঁর বন্ধুর বন্ধু শেষ গ্রাহাম আলী। যে তাঁকে কখনো দেখেনি সে স্টেশন থেকে লেখককে নিতে আসার সময়ে যে আন্তরিকতার পরিচয় দেন লেখক তাতে অভিভূত হন। অচেনা ব্যক্তির প্রতি প্রথম দেখাতেই যে উষ্ণ অভ্যর্থনা লেখককে করা হয়েছিল লেখক তাতে মুগ্ধ হয়ে যান।
উদ্দীপকে, জীবনে প্রথমবারের মেরাজ আলী কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে প্রথমে সে স্থানীয় হোটেলে উঠতে চাইলেও পরে তা দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায় ওঠার সিদ্ধান্ত নেন। বন্ধুর দূরসম্পর্কের স্বজন আমজাদ আলীর উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে যান আমজাদ আলী। একইভাবে, ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে পেশোয়ারের নামার পর লেখকের এক বন্ধুর বন্ধু শেখ আহমদ আলী তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে আসেন। লেখক নাম বলেই নিজের হাত বাড়ালে আহমদ আলী তার দুহাত দিয়ে পরম উৎসাহে তাকে সংবর্ধনা জানান। অচেনা-অজানা লেখককে শেখ আহমদ আলী কোলে-পিঠে করে স্টেশনের বাইরে এনে পরম আন্তরিকতা ও আতিথেয়তার পরিচয় প্রদান করেন। তাই বলা যায়, উষ্ণ অভিবাদন ও অতিথির প্রতি আন্তরিকতার দিকটি আমজাদ আলী ও শেখ আহমদ আলীর চরিত্রের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. ‘পাঠানের অভ্যর্থনা নির্জলা আন্তরিক।’—উক্তিটি দ্বারা পাঠানদের অতিথির প্রতি উষ্ণ আন্তরিকতার দিকটি নির্দেশ করে।
‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে লেখক তাঁর ভ্রমণ সংবলিত সকল খুঁটিনাটি প্রথম থেকে শেষ অব্দি রসঘন ঘটনার মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। সেখানে তাঁকে পেশোয়ার স্টেশন থেকে যে পাঠান নিতে আসে তার অভ্যর্থনায় লেখক মুগ্ধ হন।অজানা এক অতিথির প্রতি পাঠান তথা শেখ আহমদ আলী আন্তরিকতায় লেখক অভিভূত হয়ে যান।
উদ্দীপকে, মেরাজ আলীর এক বন্ধুর দূরসম্পর্কের মামা আমজাদ আলী। অতিথির প্রতি তিনি যেরূপ ব্যবহার করেছেন তাতে রয়েছে অন্তরিকতা উষ্ণতার ছোঁয়া। নিকটাত্মীয়ের প্রতি মানুষের যে আন্তরিকতার অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়- আমজাদ আলীর ব্যবহার মেরাজ আলীর প্রতি ও সেরূপই ছিল।
‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনিতে লেখকের বন্ধুর বন্ধু শেখ আহমদ আলী। যিনি একজন পাঠান, পেশোয়ার স্টেশনে তিনি লেখককে অব্যর্থনা জানাতে আসেন।তিনি লেখককে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন। স্টেশন থেকে লেখককে তিনি টেনে হিজড়ে কোলে পিঠে তুলে টাঙ্গায় বসান। তার এই আন্তরিকতায় কোনো খাদ ছিল না। পাঠানরা অতিথি আপ্যায়নে বেশ উৎসাহী। নিজেদের বাড়িতে নিয়ে অতিথিকে খাওয়ানোর মতো আনন্দ তাদের কাছে আর কিছু নেই। আর সেই অতিথি যদি হয় বিদেশি: তখন তাদের আনন্দের মাত্রা যেন আরও বেড়ে যায়। যার ফলে অচেনা বাঙালি লেখকের প্রতি পাঠান শেখ আহমদ আলীর আন্তরিকতা ছিল নিখাদ। তাই বলা যায়, পাঠানের অভ্যর্থনা সম্পূর্ণ নির্জলা আন্তরিক।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-১০:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
১০. তমিজউদ্দিন ব্যাপারী বয়সে প্রবীণ কিন্তু মনের দিক থেকে তিনি এখনো তরুণ। তিনি বাচ্চাদের খুব ভালোবাসেন। নিজের নাতি- নাতনিসহ পাড়ার অন্য যুবক-যুবতিদের নিয়ে মাঝে মাঝে সিনেমা দেখেন। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেও যান। খেলাধুলা করেন। তার উদ্দেশ্য বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা। এসবের মধ্য দিয়ে তিনি ভালো থাকতে ও আনন্দে বাঁচতে চেষ্টা করেন।

ক. সর্দারজির বয়স কত?
খ. দক্কাদুর্গের সামনে এসে লেখকের চোখ জুড়িয়ে গেল কেন?
গ. উদ্দীপকের তমিজউদ্দিন ব্যাপারীর কর্মকা-ের সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনির ফুটে ওঠা দিকটির সাদৃশ্য দেখাও।
ঘ. ‘আনন্দে বাঁচার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়।’—উদ্দীপক ও ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার প্রেক্ষাপটে তার যথার্থতা নিরূপণ করো।

ক. সর্দারজির বয়স ষাটের কাছাকাছি।
খ. দত্তাদুর্গের সামনে এসে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে লেখকের চোখ জুড়িয়ে গেল।
জালালাবাদ যাওয়ার পথে লেখকের সহযাত্রী ছিলেন একজন কাবুলি। গাড়ি যখন দক্কাদুর্গের কাছাকাছি আসে, তখন ওই এলাকার নৈসর্গিক প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে লেখক বিমোহিত হন। দুর্গের একপাশে দিয়ে ছলছল করে বয়ে গেছে কাবুল নদী। অন্যপাশে যেন লুটিয়ে পড়েছে সবুজের মনোরম আঁচল। যে সৌন্দর্য দেখে লেখকের চোখে জুড়িয়ে যায়।

গ. উদ্দীপকের তমিজউদ্দিন ব্যাপারীর প্রাণবন্ত জীবনযাপনের সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’ ভ্রমণকাহিনির সর্দারজির সাদৃশ্য রয়েছে।
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় দেখা যায়, শিখ সর্দারজি একজন ড্রাইভার। তার বয়স ঘাটের কাছাকাছি। তবু এই বুড়ো বয়সেও তিনি মাঝে মাঝে বায়োস্কোপ দেখতে যান। এ সময় তিনি তার অনেক নাতি-নাতনিদেরও বায়োস্কোপ দেখাতে নিয়ে যান। কেননা, তিনি মনে করেন, এটুকু না করলে ছেলে-ছোকরাদের মতিগতি বোঝা যাবে না।
উদ্দীপকেও দেখতে পাই, তমিজউদ্দিন ব্যাপারী একজন প্রবীণ ব্যক্তি। কিন্তু মনের দিক থেকে তিনি এখনো তরুণ। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের তিনি খুব ভালোবাসেন। নাতি-নাতনিসহ অন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিনি মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতে যান। এছাড়াও নিয়মিত খেলাধুলা করেন এবং ঘুরতে যান। তিনি মনে করেন, এসবের মাধ্যমেই আজকের ছেলেমেয়েদের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সুতরাং উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, উদ্দীপকের তমিজউদ্দিন ব্যাপারীর প্রাণবন্ত থাকার সাথে আলোচ্য রচনার সর্দারজির কর্মকা- সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. ‘আনন্দে বাঁচার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়।’—মন্তব্যটি যথার্থ বলে আমি মনে করি।
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় দেখা যায়, সর্দারজি বয়সে একজন প্রবীণ। শিখ সর্দারজি নিজের মনের তাগিদে এই বয়সেও বায়োস্কোপে যান। তার নাতি-নাতনিদেরকেও সাথে নিয়ে বায়োস্কোপ দেখেন তিনি। তার মতে, জীবনে এসব বিনোদন প্রয়োজন। তাছাড়া তিনি মনে করেন, এসব না করলে ছেলেমেয়েদের মতিগতিও বোঝা যায় না।
উদ্দীপকের তমিজউদ্দিন ব্যাপারীও একজন প্রবীণ। তিনিও মানসিকভাবে তারুণ্যকে ধারণ করেন। তাই নিজ নাতি-নাতনির সাথে পাড়ার অন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিনি ছিনেমা দেখেন। খেলাধুলা করেন, ঘুরতে যান, তার উদ্দেশ্য হলো নতুন প্রজন্মের চিন্তা-চেতনার সাথে পরিচিত হওয়া। তিনি এসব কাজের মধ্যেই বেঁচে থাকার রসদ খোঁজেন এবং আনন্দে থাকতে চান।
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় সরদার জিল কর্মকা-ে জীবন রস আহরণের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। উদ্দীপকের তমিজউদ্দিন ব্যাপারীর মধ্যেও একই বিষয় লক্ষণীয়। সুতরাং প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি খুবই যথার্থ।


‘গন্তব্য কাবুল’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনির সৃজনশীল প্রশ্ন-১১:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
গন্তব্য কাবুল
গন্তব্য কাবুল

ক. সৈয়দ মুজতবা আলী কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
খ. ‘মনে হলো আমি একা’—লেখক এ কথা বলেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকের চিত্রের সাথে ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার খাইবারপাসের সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘উদ্দীপকটি ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার আংশিক পরিচয় প্রকাশে সক্ষম।’—বিশ্লেষণ করো।

ক. সৈয়দ মুজতবা আলী আসামের করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।
খ. কাবুল যাওয়ার পথে গাড়িতে নিজের একাকিত্বে অসহায় বোধ করে লেখক এ কথা বলেছেন।
লেখককে কাবুল যাওয়ার পথে যাত্রা শুরুর আগেই নানা রকম ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়। তিনি পাসপোর্ট ও জামাকাপড় জোগাড় করতে অনেক ব্যস্ত সময় পার করেন। ফলে তিনি অন্য কিছু ভাবার ফুরসতও পাননি। তিনি গাড়িতে উঠেন এক ফিরিঙ্গির সাথে। সেখানে কোনো বাঙালি ছিল না যার সাথে তিনি কথা বলতে পারেন। ফলে গাড়িতে উঠতেই লেখকের একাকিত্ব অসহ্য মনে হলো। সে অবস্থা বোঝাতেই তিনি বলেন, ‘মনে হলো আমি একা।’

গ. বিঘ্নসংকুল পাহাড়ি যাত্রাপথের ছবি হওয়ায় উদ্দীপকের ছবিটি ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার খাইবারপাসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
লেখক কাবুল যাওয়ার পথে খাইবার পাস অতিক্রম করার সময় সেখানকার বিঘœসংকুল পথের বর্ণনা দেন। তাঁর মতে, দুদিকে হাজার ফুট উঁচু পথরের নেড়া পাহাড়ের মাঝখানে খাইবার পাস। এক জোড়া রাস্তা এঁকেবেঁকে একে অন্যের গা ঘেঁষে চলেছে। সংকীর্ণতম স্থলে দুই রাস্তা মিলে ত্রিশ হাতও হবে না। সে রাস্তা এতই এঁকেবেঁকে গিয়েছে যে, যেকোনো জায়গায় দাঁড়ালে ডানে-বামে, সামনে-পিছনে শুধু পাহাড় দেখা যায়।
উদ্দীপকের ছবিতে পাহাড়ি এলাকার দুর্গম পথের চিত্র ফুটে উঠেছে। বামে-ডানে, সামনে-পিছনে সারি সারি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে পাহাড়ি গিরিপথ। একবার তাকিয়ে কোনটি যে পথ তা বোঝা একেবারেই অসম্ভব। এহেন বিঘœসংকুল পথের পরিচয় পাওয়া যায় ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায়। সেখানে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী খাইবারপাস ছবির গিরিপথের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. উদ্দীপকে শুধু খাইবারপাসের মতো বিঘœসংকুল পথের চিত্র থাকায় আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ।
‘গন্তব্য কাবুল’ রচনায় লেখক তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতার একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের পরিচয় তুলে ধরেছেন। যাত্রাপথের বিভিন্ন স্টেশন, জনপদ, জনজীবনের বৈচির্ত্য দেখা যায় এই রচনায়। এই বিচিত্র মানুষজনের সঙ্গে মিলেমিশে আছে নানা ধরনের প্রকৃতি, ভূগোল, ইতিহাস ও নানা সংস্কৃতি। ফলে অনিবার্যভাবেই তাঁর রচনা হয়ে উঠেছে তুখোড় এক জীবনচাঞ্চল্যে ভরপুর কথামালা।
উদ্দীপকের ছবিতে বিঘœসংকুল গিরিপথের চিত্র পাওয়া যায়। চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। সেসব পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে গিরিপথ। ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনাতেও খাইবারপাসের বর্ণনায় এহেন গিরিপথের সন্ধান মেলে। পাকিস্তান ও অফগানিস্তানের সীমান্তে এ গিরিপথ অবস্থিত। তবে আলোচ্য রচনায় আরও বেশকিছু বিষয় বর্ণিত হয়েছে।
উদীপকের পাহাড়ি গিরিপথ ‘গন্তব্য কাবুল’ রচনার শুধু খাইবারপাসের গিরিপথের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এছাড়া উক্ত রচনায় লেখকের পুরো ভ্রমণের নানা স্মৃতি বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন স্টেশন, জনপদ ও জনজীবনের বর্ণনায় পুরোপুরি রচনাটি অনেক বেশি তথ্যবহুল ও হৃদয়গ্রাহী। তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকটি গন্তব্য কাবুল রচনা আংশিক পরিচয় প্রকাশের সক্ষম; পুরোপুরি পরিচয় এখানে অনুপস্থিত।


তথ্যসূত্র:
১. সাহিত্য পাঠ: একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, বাংলাদেশ, ২০২৬।
২. দেশে বিদেশে, সৈয়দ মুজতবা আলী, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, তৃতীয় সংস্করণ(দশম মুদ্রণ), নভেম্বর ২০২০।
৩. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৪. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url