কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ- শওকত আলী

কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ
কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ

কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ
শওকত আলী

বাতাস উঠলে এখন টাঙনের পানিতে কাঁপন লাগে না। পানি এখন অনেক নিচে। বালি কেটে কেটে ভারি ধীর স্রোতে এখন শীতের টাঙন বয়ে যায়। পানির তলায় বালি চিকমিক করে, কোথাও কোথাও সবুজ গুল্ম স্রোতের ভেতরে ভাটির দিকে মাথা রেখে এপাশ ওপাশ ফেরে। চতুর দু-একটা মাছ তির তির করে উজানে ছুটে গেলেও আবার ভাটিতে ফিরে আসে। কিন্তু কাঁপে না পানির স্রোত। এমনকি সাঁকোর ওপর দিয়ে চিনি কলের ভারী আখ-বওয়া ট্রাকগুলো যাবার সময়ও না। সাঁকোর থামগুলো গুম গুম শব্দ করে ওঠে, কিন্তু পানির স্রোত তেমনি ধীর, তেমনি শান্ত। আসমান, কান্দর আর দিগন্তজুড়ে যে শীতের একটা শান্ত ভাব থাকবার কথা সেই ভাবটা টাঙনের স্রোতে আজকাল সব সময় ধরা থাকে।

আর ঐ শান্ত নদীর ধারে বসে থাকবার জন্যেই কিনা কে জানে কপিলদাস ভারি আরামে রোদের দিকে পিঠ মেলে দিয়ে ঝিমোতে পারে। তার চারদিকে নানা শব্দ কিন্তু সে সব তার কানে ঢোকে কি না বোঝা মুশকিল। ধরো, কী রকম গাঁ গাঁ চিৎকার করতে করতে চিনি কলের ট্রাকগুলো ছুটছে, ফার্মের ভেতরে বিনোদ মিস্তিরি খান-দুই ট্রাক্টর ট্রায়ালের জন্য চালু করে রেখেছে-তার ধক্ ধক্ ধক্ ধক্ শব্দ একটানা সকাল দুপুর রাত ধরে ক্রমাগত হয়ে চলেছে, নদীর ওপারে আবার কোথায় এক রাখাল সারাদিন ধরে একটা বুনো সুর বাঁশিতে বাজিয়ে যাচ্ছে-এ সবই তার কানে ঢুকবার কথা। কিন্তু কপিলদাস চুপচাপ। মাথাটা ডাইনে-বাঁয়ে অল্প-স্বল্প দুলছে, আর সে বসে রয়েছে তো বসেই রয়েছে।

ওদিকে ছাগল ঢুকে যদি সব্জি ক্ষেততছনছ করে, কি বিন্দা মাঝির বউ সোনামুখী নগেন হোরোর বোন সিলভীর সঙ্গে ঝগড়া বাধায় কিংবা নদীর ওপারে খোলা কান্দরে খরগোশ তাড়িয়ে নিয়ে আসে কোনো ভিন গাঁয়ের কুকুর এবং সেজন্যে যদি এপারের বাচ্চারা লে লে হই হই করেও ওঠে-কপিলদাস নড়বে না, হেলবে না, কান পাতবে না-কাউকে একটা কথা জিজ্ঞেসও করবে না।

আসলে কপিলদাস বুড়োর কাছে সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো বলে মনে হয়। মনে হয়, এরকমই হয়ে আসছে দুনিয়ায়। ঝগড়া বলো, ঝাঁটি বলো, জন্ম বলো, মরণ বলো-সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো। কত দেখল সে জীবনে। সব কিছুই শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় গিয়ে মিলে যায়। রাগ বল, ক্ষোভ বল, আবার হাসিখুশি মনের ভাব বল, কিংবা সামনে প্রকাণ্ড কান্দর, কি কান্দরের ওপরকার আসমান, আবার তার নিচে টাঙনের স্রোত-সব কিছু, যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যা শোনা যাচ্ছে-সবই একটার সঙ্গে আরেকটা শেষ পর্যন্ত মেলানো। আসলে, তার মনে হয়, সংসারের অনেক ভেতরে শান্ত ধীর এবং নিরবচ্ছিন্ন একটা স্রোত আছে। সব কিছুর ওপর দিয়ে ঐ স্রোত বয়ে যায়। সেখানে কাঁপন নেই, উত্তেজনা নেই, চিৎকার নেই। সব কিছু সেখানে ক্রমাগত একটার সঙ্গে আরেকটা মিলে যাচ্ছে।

ঠিক এই ধরনের একটা গা-ছাড়া পরিতৃপ্ত ভাব আজকাল তাকে প্রায়ই পেয়ে বসে। আর সেজন্যেই শীতের রোদে পিঠ দিয়ে ভারি আরামে সে ঝিমোতে পারে। বয়স বেড়ে গেলে সম্ভবত মানুষের এরকম একটা অবস্থা এসে যায়।
তবে সব সময় ঐ ভাবটা থাকে না।

আর তখনই পুরনো ঘটনা ছবির পর ছবি সাজিয়ে নিয়ে আসে চোখের সামনে। পুশনা পরবে কি তুমুল নাচ জুড়েছে দেখো কপিলদাস। তার গলায় বাঁধা মান্দল কী রকম শূন্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, মেয়েদের গলায় কেমন শানানো স্বর। কপিলদাস দেখতে দেখতে নিজের যৌবনকালে চলে যায়। একের পর এক ঘটনা মনে পড়তে থাকে তার। আর ঐ রকমভাবে স্মৃতি তার সামনে পুরনো পসরা খুলে বসলে সে ভারি সুখে ঐসব পুরনো ঘটনার মধ্যে বিচরণ করে ফেরে।

একবার সেই যে কি হলো, মহাজনের ধান খামার বাড়ি থেকেই কিষানদের হাতে বিলিয়ে দিলি-মনে আছে সে কথা?
আর মানুয়েল পাদ্রিকে টাঙনের পানিতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলি? মনে নাই?

চকিতে সে দেখতে পায় বর্ষায় ভরা টাঙনের পানিতে পাদ্রি তলিয়ে গেল। ঘোলাটে পানির মধ্যে কালো জুতোসুদ্ধ তার পা দুখানি ওপরে উৎক্ষিপ্ত হতে দেখা গেল স্পষ্ট করে। একটু পরই মানুয়েল পাদ্রি আবার ভেসে উঠেছিল। আর সে কি গাল! সাঁতরাতে সাঁতরাতে শাসাচ্ছিল, দেখিস তোর বাপকে বলব, দেখব বিচার হয় কি না।

সেই ছেলেবেলার কথা। হাপন ছিল যখন সে। তোর তির কী রকম নিখুঁত নিশানায় গিয়ে বিধত, কপিলদাস মনে নাই সে কথা?
হ্যাঁ মনে আছে। কপিলদাস মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নিজেকে শোনায়-সব মনে আছে।

কেন মনে থাকবে না। সান্তালের বাচ্চা না সে? দেখ তো খরগোশের পেছনে কে ছুটছে অমন? শুকদেবের ব্যাটা চতুর মাঝি নাকি দিবোদাসের ব্যাটা কপিলদাস? আর ঐ দেখ, কপিলদাসের শিকারি কুকুর কী রকম ছুটে যাচ্ছে তির-খাওয়া শিকারের পেছনে। কপিলদাস মনের ভেতরে স্পষ্ট দেখতে পায় তার কালো রঙের কুকুরটাকে- যেটা তার কিশোরকালের সঙ্গী ছিল সর্বক্ষণ। কুকুরটাকে শেষ পর্যন্ত বাঘে খেল।

কপিলদাস একেক দিন আবার নিজের কাছে গল্প ফাঁদে। দূর থেকে দেখা যায় বুড়ো থেকে থেকে মাথা নাড়াচ্ছে আর ঝুঁকে ঝুঁকে দুলছে। কোন গল্পটা আরম্ভ করবে সে? বাহ্ গল্পের কি আর শেষ আছে-নিজেকেই শোনায় বুড়ো। ধরো, মেলার সেই ঘটনাটা-

মেলার গল্পটাই হঠাৎ মাঝখান থেকে শুরু হয়ে যায়। কেন যে বেছে বেছে মেলার গল্পটাই শুরু হয়-সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। গল্প আরম্ভ করলেই সে মেলার ঘটনায় চলে আসে।

কিংবা ঐ ধান কাটার ব্যাপারটাই ধরো না কেন। আধিয়ার জোতদারের মাঝখানে পড়ে গেল সাঁওতাল বস্তিটা। গুপীনাথ হুঁ হ্যাঁ করে না, ডাইনে-বাঁয়ে তাকায় না। ওদিকে কে একজন আগুনের কুণ্ডলীর ওপরে আরেক বোঝা নাড়া চাপিয়ে দিয়ে গেল। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। আর ঐ আগুনের আলোয় গুপীনাথের কপাল চকচক করতে লাগল। কিন্তু সে শাদা চুল ভর্তি মাথাটা ঝুঁকিয়ে বসে আছে তো বসেই আছে।

সাঁওতালদের তখন কি মুশকিল ভাবো দেখি। মহাজন বসত করবার জায়গা দেয়, আবাদের জমি দেয়, গিরস্তির কাজ দেয়-সেই মহাজনের বিপক্ষে কেমন করে যায়। মহাজন যে সব দেয়। হ্যাঁ, সব দেয়-কিন্তুক পেটের ভাতটা কি সারা বছর দেয়, আঁ? কহ মড়ল, কহ দে, দেয় পেটের ভাতটা? এই রকমের সব বাদানুবাদ। কিন্তুক যদি ভিটেমাটি থেকে তুলে দেয় তাহলে? এই রকমের সব তর্কাতর্কি। ওদিকে গুপীনাথ কিছুই বলে না। মড়ল হলে বোধ হয় ঐ অবস্থায় কিছু বলা যায় না।

কিন্তুক তখন ভারি জাড় হে মড়ল। দেহ দলদল করে কাঁপছে। দূরে দূরে যারা দাঁড়িয়েছিল তাদের মধ্যে থেকে কে যেন চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল-হামরা মাহাজনের সঙ্গে নাই, আধিয়ার কিষানের সঙ্গে হামরা।

কে বলেছিল কথাটা? মনে নেই এখন। সে নিজে হতে পারে, মোহন কিস্কু হতে পারে-কিংবা চতুর মাঝিও হতে পারে। লোকটা যে কে ঠিক মনে নেই। কিন্তু কথাটা ঠিক মনে আছে।
তারপর?

কপিলদাস আর খেই ধরতে পারে না। বিচার সভার শেষ দৃশ্যটা স্মরণে আসে না। বরং হঠাৎ ধান কাটার দৃশ্যটা মনের ভেতরে দেখতে পায় সে। কপিলদাস মাঠে নেমেছে, পাশের ক্ষেতে মোহন কিস্কুর বউ টরি-সারা কান্দরে আর একটা মানুষ দেখা যায় না। ধান গাছের নোয়ানো পাতায়, শিষের গায়ে, তখনও রাতের হিম ফোঁটায় ফোঁটায় জমে আছে। রোদের তাপ গায়ে লাগে কি লাগে না এমনি কুয়াশা।

ঐ রকম গল্প বলতে বলতে বেলা ফুরিয়ে যায় এক সময়। রোদের তাপ কমে আসে। ঝাপসা চোখ দুটি মেলে সে তখন আসমানের ধূসর রঙ দেখে। একবার নদীর ভাটি থেকে উঠে আসা শঙ্খচিলের ডাকটাও শুনতে পায়। বাতাসে তখন শীতের কামড়। তার দুহাতের আঙুল ছেঁড়া কোটের বোতাম দুটি খুঁজতে থাকে।

আর ঐ সময়ই তার চোখে পড়ে যায়। দেখে কজন লোক টাঙনের উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কী যেন দেখাচ্ছে। লোকগুলোকে সে চিনতে চেষ্টা করে। ওখানে এই সময়ে কারা? অমন পরিষ্কার জামা-কাপড় পরা-কে লোকটা? অনেকক্ষণ ধরে লোকটার নড়া-চড়ার ভঙ্গিটা লক্ষ করে। লক্ষ করতে করতেই মনে পড়ে- কদিন আগেও বোধহয় ওদের এইভাবেই দেখেছে সে। ঠিক এইভাবেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কী যেন বলাবলি করছিল। সে এক সময় চিনতে পারে। পরিষ্কার জামা-কাপড় পরা লোকটা ম্যানেজার মহাজন ছাড়া আর অন্য কেউ হতে পারে না। কিন্তু এমন সময় ওখানে দাঁড়িয়ে ওদের কি কাজ? একবার মনে হয় জরিপ হচ্ছে বোধ হয়। একেক সময় ঐ রকম জমিজমার মাপামাপি চলে। ওরা কি জমিজমা মাপতে এসেছে? কই এ রকম কোনো খবর তো তার কানে আসেনি।

একটু পর আর দেখা যায় না কাউকে। দেখতে না পাওয়ায় কৌতূহলটাও আর থাকে না। কপিলদাস তখন গরুর পালের ঘরে ফেরা ঘুন্টির আওয়াজ কান পেতে শোনে। ফার্মের গরুগুলোর গলায় নতুন ঘুষ্টি বাঁধা হয়েছে নিশ্চয়ই। আজকাল বোধহয় জয়হরির ছোট ছেলেটা ফার্মের গরু চরায়। জয়হরির কী যেন হয়েছিল? জয়হরির কথা স্মরণ করতে চেষ্টা করে সে। আর ঠিক ঐ সময় কাছে এসে দাঁড়ায় সলিমউদ্দিন। এসেই ডাকে, বুঢ়া দাদা বাড়িত যাবো নাই?

হ্যাঁ যামু, সে জয়হরির কথা স্মরণ করতে না পেরে সলিমউদ্দিনের দিকে মনোযোগ দেয়। ছোঁড়া কোথেকে আসছে সেই কথা জিজ্ঞেস করতে করতে উঠে দাঁড়ায়।

সলিমউদ্দিন তখন কুশিয়ার ক্ষেতে আজ কী কাণ্ডটা ঘটেছে সেই ঘটনার বর্ণনা আরম্ভ করে এবং ঐ আরম্ভের মুখেই সে জানিয়ে দেয়-বুঢ়া দাদা তুমার বস্তিটা আর এইঠে থাকবে নাই, ইবছর এইঠে ধানের আবাদ হবে। কথাটা কেন যে বলে ছোঁড়া বুড়ো ঠিক ধরতে পারে না। কিংবা এমনও হতে পারে যে তার বর্ণনাতেই বোধহয় প্রসঙ্গটা থাকে না।

কপিলদাসের হঠাৎ খেয়াল হয় লোকগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। এখুনি না দেখল। মুহূর্তের মধ্যে কোথায় উবে গেল অতোগুলো মানুষ।

নাকি সে দেখে নি! তার কেবলি মতিভ্রম হতে থাকে। ইদিকে সলিমউদ্দিনের সেই খামারবাড়ির ঘটনাটার বর্ণনা তখনো ফুরোয়নি।

আবার কথাটা নতুন করে বলতে হলো সলিমউদ্দিনকে। বলল, তুমার বসতটা ইবার উঠায় দিবে, এইঠে ইবছর ট্রাকটর চলিবে।

কপিলদাস এবারও বুঝতে পারে না। তার নিজের হিসাব মেলে না। ট্রাকটর জমিতে চলবে, তাই চলে এসেছে এতকাল। মানুষের বসতের উপর দিয়ে ট্রাকটর চলতে যাবে কেন? ই কেমন কথা? সে অন্ধকারেই ডাইনে বাঁয়ে তাকায়। বলে, ঠিক শুনিছিস তুই, কহ ঠিক শুনিছিস?

সলিমউদ্দিন এবার সত্যিই বিরক্ত হয়। বলে, মোর কথা বিশ্বাস না হয় আর কাহাকো পুছে দেখ। মুই ইবার যাঁউ, তুই বুঢ়া মানুষ, তোর কিছু ফম থাকে না।
কথাটা বলেই হঠাৎ ছোঁড়া চলে গেল।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কপিলদাস মাথা নাড়ায়। আর নিজেকে শোনায়-না, ক্যানে পালাব। তার পা আপনা থেকে বাড়ির পথ ধরে। কোথায় পালাবে সে। এক সময় আবার হাসি পায় বুড়োর, পালাবার কথাটা এল কোত্থেকে? তুই বুঢ়া মানুষ হে মড়ল-নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে তখন সে বলে, তোর কিছু ফম থাকে না। আর ঐ সময় ট্রাকটরের আওয়াজটা তার কানে এসে ধাক্কা মারে। কী কারণে যে হঠাৎ ধকধক শব্দ করে জেগে উঠল ঘুমন্ত ট্রাকটরটা আন্দাজ করা মুশকিল। বিনোদ মিস্ত্রি একেকদিন এই রকম হঠাৎ ট্রাকটরের এঞ্জিন চালিয়ে দেয়। ট্রাকটরটা সে চোখের সামনে দেখতে পায় যেন। বিশাল বিশাল দুটো চাকা ঘুরতে ঘুরতে মাঠের বুকের ওপর দিয়ে চলেছে, পেছনের ধারালো চাকতিগুলো মাটি ফালা ফালা করে দিচ্ছে, গন্ধ বেরুচ্ছে কাটা মাটির ভেতর থেকে। ঐভাবে ট্রাকটরটা চলে আসে একেবারে দীনেশ কিস্কুর বাড়ির সীমানা পর্যন্ত। তারপরই বেশ দিব্যি ঘুরে যায়। বসতই হলো ট্রাকটর চলাফেরা করার শেষ সীমানা। হ্যাঁ, কলের জিনিস ঐ পর্যন্ত আসে। সংসারের সীমানা পর্যন্তই তার আসবার ক্ষমতা, তারপর আর পারে না, এতকাল অন্তত পারেনি। আর এখন সেই কলের জিনিস হুড়মুড় করে ঢুকে পড়বে দীনেশ কিস্কুর উঠোনে। ঘরের দেয়ালে ভোঁতা নাক ঢুকিয়ে উল্টো দিকের দেয়াল ফুঁড়ে বেরুবে। দৃশ্যটাকে সে মনের ভেতর দেখতে পায়। আর তাই দেখে সে ভয়ানক অস্থিরতা বোধ করে। ই কী কথা আঁ? ট্রাকটর চলে আসবে সংসারের বুকের ওপর?

কপিলদাস বুড়োর এখন মনে পড়তে থাকে। এই বস্তি উঠে যাবার ব্যাপারটা আকস্মিক নয় একেবারে-তাহলেও, এই কি শেষ পর্যন্ত পরিণতি? বস্তিটস্তি উঠে যাবে আর ট্রাকটর চলতে থাকবে ঘরবাড়ি-ভিটেমাটির উপর দিয়ে। কোথায় একটা মেয়েমানুষের মাথা গরম করে মাতালের দিকে দা উঁচিয়ে তেড়ে যাবার ঘটনা আর কোথায় বাড়িঘর সংসারসুদ্ধ লোপাট করে দেওয়া। কিসের সঙ্গে কিসের জড়ানো। কিন্তু ভাবো তো বসতটা কত পুরনো? মনে আছে তোর, হ্যাঁ বাহে মড়লের ব্যাটা, তোর কি ফম আছে?

হ্যাঁ যামু, সে জয়হরির কথা স্মরণ করতে না পেরে সলিমউদ্দিনের দিকে মনোযোগ দেয়। ছোঁড়া কোথেকে আসছে সেই কথা জিজ্ঞেস করতে করতে উঠে দাঁড়ায়।

সলিমউদ্দিন তখন কুশিয়ার ক্ষেতে আজ কী কাণ্ডটা ঘটেছে সেই ঘটনার বর্ণনা আরম্ভ করে এবং ঐ আরম্ভের মুখেই সে জানিয়ে দেয়-বুঢ়া দাদা তুমার বস্তিটা আর এইঠে থাকবে নাই, ইবছর এইঠে ধানের আবাদ হবে। কথাটা কেন যে বলে ছোঁড়া বুড়ো ঠিক ধরতে পারে না। কিংবা এমনও হতে পারে যে তার বর্ণনাতেই বোধহয় প্রসঙ্গটা থাকে না।

কপিলদাসের হঠাৎ খেয়াল হয় লোকগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না। এখুনি না দেখল। মুহূর্তের মধ্যে কোথায় উবে গেল অতোগুলো মানুষ।
নাকি সে দেখে নি! তার কেবলি মতিভ্রম হতে থাকে। ইদিকে সলিমউদ্দিনের সেই খামারবাড়ির ঘটনাটার বর্ণনা তখনো ফুরোয়নি।
আবার কথাটা নতুন করে বলতে হলো সলিমউদ্দিনকে। বলল, তুমার বসতটা ইবার উঠায় দিবে, এইঠে ইবছর ট্রাকটর চলিবে।

কপিলদাস এবারও বুঝতে পারে না। তার নিজের হিসাব মেলে না। ট্রাকটর জমিতে চলবে, তাই চলে এসেছে এতকাল। মানুষের বসতের উপর দিয়ে ট্রাকটর চলতে যাবে কেন? ই কেমন কথা? সে অন্ধকারেই ডাইনে বাঁয়ে তাকায়। বলে, ঠিক শুনিছিস তুই, কহ ঠিক শুনিছিস?

সলিমউদ্দিন এবার সত্যিই বিরক্ত হয়। বলে, মোর কথা বিশ্বাস না হয় আর কাহাকো পুছে দেখ। মুই ইবার যাঁউ, তুই বুঢ়া মানুষ, তোর কিছু ফম থাকে না।
কথাটা বলেই হঠাৎ ছোঁড়া চলে গেল।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কপিলদাস মাথা নাড়ায়। আর নিজেকে শোনায়-না, ক্যানে পালাব। তার পা আপনা থেকে বাড়ির পথ ধরে। কোথায় পালাবে সে। এক সময় আবার হাসি পায় বুড়োর, পালাবার কথাটা এল কোত্থেকে? তুই বুঢ়া মানুষ হে মড়ল-নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে তখন সে বলে, তোর কিছু ফম থাকে না। আর ঐ সময় ট্রাকটরের আওয়াজটা তার কানে এসে ধাক্কা মারে। কী কারণে যে হঠাৎ ধকধক শব্দ করে জেগে উঠল ঘুমন্ত ট্রাকটরটা আন্দাজ করা মুশকিল। বিনোদ মিস্ত্রি একেকদিন এই রকম হঠাৎ ট্রাকটরের এঞ্জিন চালিয়ে দেয়। ট্রাকটরটা সে চোখের সামনে দেখতে পায় যেন। বিশাল বিশাল দুটো চাকা ঘুরতে ঘুরতে মাঠের বুকের ওপর দিয়ে চলেছে, পেছনের ধারালো চাকতিগুলো মাটি ফালা ফালা করে দিচ্ছে, গন্ধ বেরুচ্ছে কাটা মাটির ভেতর থেকে। ঐভাবে ট্রাকটরটা চলে আসে একেবারে দীনেশ কিস্কুর বাড়ির সীমানা পর্যন্ত। তারপরই বেশ দিব্যি ঘুরে যায়। বসতই হলো ট্রাকটর চলাফেরা করার শেষ সীমানা। হ্যাঁ, কলের জিনিস ঐ পর্যন্ত আসে। সংসারের সীমানা পর্যন্তই তার আসবার ক্ষমতা, তারপর আর পারে না, এতকাল অন্তত পারেনি। আর এখন সেই কলের জিনিস হুড়মুড় করে ঢুকে পড়বে দীনেশ কিস্কুর উঠোনে। ঘরের দেয়ালে ভোঁতা নাক ঢুকিয়ে উল্টো দিকের দেয়াল ফুঁড়ে বেরুবে। দৃশ্যটাকে সে মনের ভেতর দেখতে পায়। আর তাই দেখে সে ভয়ানক অস্থিরতা বোধ করে। ই কী কথা আঁ? ট্রাকটর চলে আসবে সংসারের বুকের ওপর?

কপিলদাস বুড়োর এখন মনে পড়তে থাকে। এই বস্তি উঠে যাবার ব্যাপারটা আকস্মিক নয় একেবারে-তাহলেও, এই কি শেষ পর্যন্ত পরিণতি? বস্তিটস্তি উঠে যাবে আর ট্রাকটর চলতে থাকবে ঘরবাড়ি-ভিটেমাটির উপর দিয়ে। কোথায় একটা মেয়েমানুষের মাথা গরম করে মাতালের দিকে দা উঁচিয়ে তেড়ে যাবার ঘটনা আর কোথায় বাড়িঘর সংসারসুদ্ধ লোপাট করে দেওয়া। কিসের সঙ্গে কিসের জড়ানো। কিন্তু ভাবো তো বসতটা কত পুরনো? মনে আছে তোর, হ্যাঁ বাহে মড়লের ব্যাটা, তোর কি ফম আছে?

নিজের ছেলে মহিন্দর বিরক্ত হয়-বলে, তুই এখুন যা তো বাবা, বুঢ়া মানুষ তুই ইসবের কী বুঝিস!

কপিলদাস বুড়ো এবার সত্যিই দমে যায়। নিজের জন্ম দেয়া ছেলে যদি এই রকম করে বলে, তো সে কী করবে। তাকে পিছিয়ে আসতে হয়। হ! মড়ল তুই তো বুঢ়া মানুষ, তুই কিছু করিবা পারিস না। কথাটা ঘুরেফিরে কেউ যেন তার কানের কাছে বারবার করে বলতে থাকে। সে কিছুই করতে পারে না, তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে মানুষের জটলাটা দেখে। ততক্ষণে জায়গাটা বেশ একটুখানি সমাবেশ মতো হয়ে উঠেছে। দেখে, দীনদাস হাত নেড়ে নেড়ে কী বলে চলেছে। তারপর আবার মহিন্দর আরম্ভ করল। তার কথা শেষ হতে না হতেই ওদিক থেকে আবার ভায়া মাঝি আরম্ভ করল।

ভারি ধীর নোয়ানো স্বর। শান্তভাবে পরামর্শ হচ্ছে যেন। রাগ নেই। জ্বালা নেই। কারো দুচোখ ধকধক করে জ্বলে উঠছে না, কেউ চিৎকার করে গালাগাল দিচ্ছে না। কপিলদাসের ভারি অবাক লাগে গোটা ব্যাপারটা দেখে। অবাক লাগে, কিন্তু কিছু বলে না সে। বরং নিজেকে সরিয়ে আনে। কয়েক পা পিছিয়ে আসে সে। কিন্তু ঐ কয়েক পা সরে আসতে অনেকটা সময় লেগে যায় তার। কানের কাছে তখনও সে শুনছে-তুই বুঢ়া মানুষ হে মড়ল, তোর কিছুই করার নাই। যেখান থেকে উঠে এসেছিল সেইখানে সে ফিরে যায়। শুধুই যথাস্থানে ফিরে যাওয়া, শুধুই মেনে নেওয়া-তার কেবলই মনে হতে থাকে।

বাচ্চারা লোকসমাগম দেখেই সম্ভবত উঠে এসেছে বিছানা ছেড়ে। মেয়ে-বউরা এখানে সেখানে ইতস্তত দাঁড়িয়ে। বাচ্চারা একত্র হলে যা হয়-ততক্ষণে খুনসুটি, দাপাদাপি এবং হাসাহাসি এইসব আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। পাথরের ওপর ঘষে ঘষে তীরে শান দেওয়া তখনো হচ্ছে। মহিন্দরের ছেলে ডাকল, দাদা তারপর বাঘটার কী হইল?

ও, সেই গল্প। কপিলদাসের মনে পড়ে একটু আগে শিকারের গল্প বলতে বলতে সে উঠে গিয়েছিল। তখন আগুনের আলো কিশোর মুখের ওপর চমকাচ্ছে, কে একজন কঞ্চি দিয়ে আগুনটা আরেকটুখানি উস্কে দিল। আর ঐ ঘটনার কারণেই কি না কে জানে, কপিলদাস গল্পটা আবার আরম্ভ করে দিল। হ্যাঁ, বাঘটার ল্যাজ ধরে টানতে টানতে আসছিল সে। ভারী ওজন হয় বাঘের। আর বাঘটা ওদিকে তখনও কিন্তু মরেনি। নাহ্, বাঘটা বোধহয় মরেই গিয়েছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ে।

কপিলদাস সৎ হয়ে উঠতে চায় বাচ্চাদের কাছে। গল্প বানানো বাদ দেয়। তার স্পষ্ট মনে পড়ে তখন। বাঘটার গায়ে বিকট গন্ধ ছিল, তিরটা ঠিক বুকের মাঝখানে গিয়ে গেঁথেছিল, একেবারে এদিক থেকে ওদিক বেরিয়ে গিয়েছিল। রক্ত তখনও বেরুচ্ছিল গলগল করে। আর ঐ সময়, বিকেল বেলায়, প্রাণনগরের জঙ্গলের ধারে একটা লোক ছিল না চারদিকে কোথাও। সে চিৎকার করে বাবাকে ডাকছিল, বন্ধুদের ডাকছিল। আর ঠিক তখন হঠাৎ তার পাশের ঝোঁপ থেকে কি একটা জানোয়ার লাফ দিয়ে বেরিয়েই বাঁয়ে ছুটতে শুরু করে দিল। ঐ জানোয়ারটা দেখেই সে-

এ পর্যন্ত বলেই সে থামে। নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে বলে ইতস্তত করে। আহা কেমন করে বলবে যে শেয়াল দেখে সে ভয়ানক ভয় পেয়ে পালিয়েছিল।
তারপর, তারপর কী হইল? বাচ্চারা সমস্বরে জিজ্ঞেস করলে সে হঠাৎ হেসে ওঠে।

কপিলদাস তখন নিজের আলাদা অস্তিত্ব আর অনুভব করতে পারে না। তীরে শান দেবার সময় কী রকম করে পাথরের ওপর ঘষতে হয়-তাই দেখায়। একজনের হাত থেকে বাঁশিটা টেনে নিয়ে ফুঁ দিয়ে একটা বহু পুরনো সুর বাজায়। কী বাজালো আঁ, কী বাজালো দাদা? প্রশ্ন হলে সে ভাঙা ভাঙা গলায় গানটা গায়-

ফকির বুলে ঢুলুক বাজে
ভালুক নাচে ঝাম,
হাইয়ারে হালমাল কই গেলু রে-এ-এ।
গানটি শুনে বাচ্চারাও গাইতে শুরু করে দেয়।

বুড়োর ভীমরতি হয়েছে ভেবে মেয়েরা কেউ কেউ মনোযোগ দেয় বাচ্চাদের জটলার দিকে। বড়রা যেখানে সভা বসিয়েছে সেখান থেকেও কে একজন চিৎকার করে গোলমাল বন্ধ করতে বলে। কিন্তু বাচ্চাদের থামাবে কে? মহিন্দরের ছেলে ধনুকের জন্যে বাঁশের ছিলা তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। কপিলদাস তার হাত থেকে কেড়ে নিলো ধনুকটা। বলল, দেখ, কেমন করে ছিলা পরাতে হয় ধনুকে।

বাচ্চারা তখন ঘিরে দাঁড়ায় বুড়োর চারদিকে। কপিলদাস হাঁটু ভেঙে ধনুকের এক মাথা ধরে ঝুলে পড়ে ধনুকটা নোয়ায়। তারপর বাঁ হাতে ছিলার ফাঁসটা ধনুকের মাথায় ঢোকাতে চায়। কিন্তু প্রথমবারেই পারে না।

ডান হাতটা তার ভীষণভাবে কাঁপতে থাকে। বাচ্চারা বুড়োর কাণ্ড দেখে সমস্বরে বলে, পারব নাই দাদা-তুই পারব নাই। কিন্তু পারে সে। ঐ কাঁপা কাঁপা হাতেই সে ছিলা পরিয়ে দেয় ধুনকের। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ছিলা টেনে ধনুকের একটা টঙ্কার তোলে। ভারি সুন্দর টানটান আওয়াজ হয় তাতে। এরপরও বুড়ো থামে না। একটা শানানো তির নেয় হাতে এবং তিরটা ধনুকের ছিলায় বসিয়ে তাক করে। সামনের দিকে একবার, একবার ডাইনে, একবার বাঁয়ে। বুড়ো ভয় দেখিয়ে মস্করা করে যেন। বাচ্চারা তাতে হই হই করে ওঠে। আর ঐ রকম হই হই শুনেই সম্ভবত কপিলদাস তিরটা দু আঙুলের ফাঁকে চেপে ছিলা ধরে টানে। টেনে ধনুকের নিশানা করে অন্ধকারের দিকে। মহিন্দরের ছেলে বলে ওঠে, দাদা তিরটা ছুটে যাবে, দাদা মোর তিরটা ছুটে যাবে। কিন্তু কপিলদাস নাতির মিনতি শুনতে পায় কি না বোঝা যায় না। সে সত্যি সত্যি তিরটা ছেড়ে দেয়। আর বাতাস কাটা শব্দ করে তিরটা অন্ধকারের দিকে ছুটে যায়।

চারদিকে মানুষের বসত। মেয়েরা বুড়োরা কাণ্ড লক্ষ করে হ্যাঁ হ্যাঁ করে ওঠে। সভার মানুষদের মধ্য থেকেও কয়েকজন এগিয়ে আসে। কিন্তু ততক্ষণে বুড়ো কপিলদাস আর একটা তির হাতে তুলে নিয়েছে। সবাই যখন নিষেধ করছে তখন সে দ্বিতীয় তিরটাও সামনের অন্ধকারের দিকে নিশানা করে ছুড়ে দিয়েছে। এবং ঐ কাণ্ড ঘটে যাওয়ায় ব্যাপারটা আর ছেলেমানুষি তামাসার পর্যায়ে থাকে না। দূর থেকে মহিন্দর চিৎকার করে ওঠে, বিন্নি গালাগাল করতে আরম্ভ করে। কিন্তু বুড়ো তখন হাসছে কেমন দেখো, যেন সে কিশোরকালে ফিরে গিয়েছে। জীবনে প্রথম নিশানা ভেদ করার যে খুশি-সেই খুশি পেয়ে বসেছে তাকে। সে শান দেয়া আরও একখানা তির হাতে তুলে নিয়েছে তখন। ওদিকে পেছন থেকে দীনদাস চিৎকার করে বলছে-ধর বুঢ়াটাকে, ধরে কাঢ়ে লে ধেনুকখান-সেই চিৎকার বুড়োর কানে পৌঁছায় না। কেউ পেছনে তাকে ধরতে আসছে কিনা সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে কপিলদাস বুড়ো দুহাতে তির-ধনুক নিয়ে সামনের অন্ধকারের দিকে চলতে থাকে। বিমূঢ় মানুষজনের চোখের সামনে দিয়েই সে অনায়াসে অন্ধকার, গাছপালা, কৈশোর এবং আদিম উল্লাসের মধ্যে চলে যায়। আর সেখান থেকে সে তার তৃতীয় তিরটা সঠিক নিশানায় ছুড়বার জন্যে তৈরি হতে থাকে।
[সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত।]

‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের উৎস নির্দেশ:
‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পটি শওকত আলীর ‘লেলিহান সাধ’(১৯৭৭) গ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের শব্দার্থ ও টীকা:
➠ মুর্মু- সাঁওতাল গোত্রবিশেষ। মুর্মু শব্দের অর্থ নীল গাভি; যা এই গোত্রের গোত্র-চিহ্ন তথা টোটেম। কথিত আছে একবার এক অরণ্যভূমিতে কিছু লোক কাজ করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিল। একসময় তাদের সর্দার ঘুমিয়ে পড়ল। সেই বনে ছিল একটি হিংস্র নীল গাভি। গাভিটি এসে পায়ের চাপা দিয়ে সর্দারকে মেরে ফেলল। ঘুম থেকে উঠে লোকেরা তখন গাভিটিকে হত্যা করল। সেই থেকে মৃত ব্যক্তির গোত্রের নাম বা পদবি হলো মুর্মু। এই গোত্রের একাধিক উপগোত্রও রয়েছে।
➠ টাঙন- পাহাড়ি জলাধারবিশেষ। এ গল্পে ঠাকুরগাঁও শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া টাঙন নদী বোঝানো হয়েছে।
➠ কান্দর- খাত বা নিচু স্থান। সাধারণত খালের অংশবিশেষ।
➠ পুশনা পরব(পৌষ-পার্বণ)- বিশেষ পুজোর আয়োজন। পৌষ-সংক্রান্তিতে এই পুজো উপলক্ষে উৎসবের আয়োজন করা হয়।
➠ হাপন- বালক।
➠ মান্দল- মাদল; এক ধরনের তালবাদ্য।
➠ পসরা- পণ্যসম্ভার; বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শিত দ্রব্য।
➠ ভাঁট- এক ধরনের বুনো ফুলবিশেষ।
➠ নাগরদোলা- ওপর থেকে নিচের দিকে ঘুরতে পারে এমন পাল্কির মতো। এতে ছোট ছোট খোপ থাকে। তাতে মানুষ বসে আর এই খোপগুলোকে যন্ত্রের সাহায্যে কিংবা হাত দিয়ে টেনে ওপর থেকে নিচে ঘুরিয়ে আনে।
➠ জাড়- শীত; ঠান্ডা
➠ আধিয়ার- বর্গাদার। যারা একটি নির্দিষ্ট শর্তে অন্যের মালিকানাধীন জমিতে হাল চাষ করে এবং উৎপাদিত ফসলের অংশ শর্ত মোতাবেক মালিককে প্রদান করে।
➠ জোতদার- ব্রিটিশ শাসনামলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার সূত্র ধরে কৃষকদের জমির মালিকানা চলে যায় জমিদারদের হাতে। এ সময় জমিদার ও কৃষকদের মধ্যে এক মধ্যস্বত্বভোগী জোতদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এরা জমিদারদের কাছ থেকে জমি পত্তনি বা ইজারা নিত। এরাই জমির চাষ তদারকি এবং খাজনা আদায়ের কাজ করত। ফলে উৎপাদনের সম্পূর্ণ খরচ কৃষক বহন করলেও ফসলের অর্ধেক চলে যেত জোতদারের হাতে।
➠ গিরস্তি- গৃহস্থ কাজ।
➠ মড়ল- মোড়ল। গোষ্ঠী প্রধান। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।
➠ ঘুণ্টি- ঘণ্টাবিশেষ। গবাদিপশুর গলায় পরানো হয় এমন ছোট ঘণ্টা।
➠ কুশিয়ার ক্ষেত- আখ ক্ষেত।
➠ পুছে দেখ- জিজ্ঞেস করে দেখ।
➠ ফম থাকা- স্মরণ থাকা। মনে থাকা।

‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের পাঠ-পরিচিতি:

কপিলদাস মুর্মু এক বৃদ্ধ সাঁওতাল। ভূমির অধিকার নিয়ে সাঁওতালদের রয়েছে রক্তে রঞ্জিত গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। ভূমি তাদের অস্তিত্বেরই অপর নাম। তাই নিজেদের বসতবাটি থেকে উন্মুলিত হবার আশঙ্কা যখন তীব্রতর রূপ ধারণ করে তখন বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া, অন্য সবার কাছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় মানুষ কপিলদাস অমিত সাহসে উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। জীবনের শেষ কাজ হিসেবে শেষ লড়াইটা লড়বার জন্য নিজেকে সে সময়ের হাতে তুলে দেয়। তরুণদের ভয় দ্বিধাকে অমূ অমূলক প্রমাণিত করে একাই সে আত্মত্যাগী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাটির কাছাকাছি থাকা এক প্রবীণের এই অনিঃশেষ সংগ্রামশীলতার নান্দনিক রূপায়ণ ঘটেছে এই গল্পে।

সমগ্র গল্পজুড়েই লেখক স্থবির দশায় আক্রান্ত কপিলদাসের অতীতের স্মৃতিকথা, বীরত্বগাথা- যার কতকটা সত্য কতকটা কল্পনা- এসব প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। আর সেইসঙ্গে কপিলদাসের প্রতি অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেন; যার মূল সুর হলো 'হা মড়ল তুই বুঢ়া মানুষ- তুই কিছু করিবা পারিস না।' এরূপ চিন্তার বিপ্রতীপে অবস্থিত কেবল শিশুরা। তাদের কাছে কপিলদাস এবং তার গল্প- দুয়েরই বিশেষ আকর্ষণ ও গুরুত্ব রয়েছে। এই উৎসাহ কপিলদাসকে নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। সে তার বয়সকে অতিক্রম করে যায়; অনেকটা খেলার ছলেই জড়বৎ কপিলদাস আকস্মিকভাবে গতিপ্রাপ্ত হয়। তার হাতে উঠে আসে তির-ধনুক। একের পর এক তির তার হাত থেকে ছুটে যেতে থাকে শত্রুকে লক্ষ করে। কপিলদাস নিজে কেবল একটি চরিত্র থাকে না; হয়ে ওঠে জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের এক আপসহীন যোদ্ধা। কপিলদাসের আশ্রয়ে লেখক আমাদের জানিয়ে যান লড়াইয়ের কোনো বয়স নেই। উন্মুলিতপ্রায় মানুষগুলো কোনো কিছুর পরোয়া না করেই তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এই আশাবাদের দ্যোতনা জাগিয়ে গল্পকার রচনাটি সমাপ্ত করেন। সাঁওতালি কথনভঙ্গি, শব্দ যোজনা এবং যথোপযুক্ত প্রেক্ষাপট সৃজন এই রচনার শিল্পসাফল্যকে বহুগুণ বর্ধিত করেছে।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের লেখক-পরিচিতি:

কথাসাহিত্যিক শওকত আলী পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম খোরশেদ আলী সরদার এবং মায়ের নাম মোসাম্মত সালেমা খাতুন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুরে। ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। অভাব অনটনের মধ্যেই চালিয়ে যান নিজের লেখাপড়া। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে এমএ পাস করেন। সাংবাদিকতা, শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন ধরনের পেশায় তিনি নিয়োজিত ছিলেন। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে দীর্ঘকাল শিক্ষকতার পর সর্বশেষ তিনি সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

জীবনকে নিবিড়ভাবে অবলোকন করা এবং বিচিত্র জীবনপ্রবাহকে শিল্পাবয়ব প্রদান শওকত আলীর সাহিত্যভাবনার মূল প্রবণতা। নৃতত্ত্ব, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানে তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর রচনায়। তিনি ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে এবং ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে একুশে পদকে ভূষিত হন। শওকত আলীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পিঙ্গল আকাশ’, ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’, ‘উত্তরের ক্ষেপ’, ‘লেলিহান সাধ’ প্রভৃতি।
তিনি ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে জানুয়ারি তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের বহুনির্বাচনি প্রশ্ন:

প্রশ্ন থেকে

অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন -এর মধ্যে!
যা


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের জ্ঞানমূলক প্রশ্ন:
১. শওকত আলী কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: শওকত আলী ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
২. শওকত আলী কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন?
উত্তর: শওকত আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন।
৩. জীবনকে নিবিড়ভাবে অবলোকন করা এবং বিচিত্র জীবনপ্রবাহকে শিল্পাবয়ব প্রদান করা কার সাহিত্যভাবনার মূল প্রবণতা?
উত্তর: শওকত আলীর।
৪. ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ গ্রন্থের রচয়িতা কে?
উত্তর: 'প্রদোষে প্রাকৃতজন' গ্রন্থের রচয়িতা শওকত আলী।
৫. শওকত আলী কোথায় মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: শওকত আলী ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
৬. পানির তলায় কী চিকমিক করে?
উত্তর: পানির তলায় বালি চিকমিক করে।
৭. দু-একটা মাছ উজানে ছুটে গেলেও আবার কোথায় ফিরে আসে?
উত্তর: দু-একটা মাছ উজানে ছুটে গেলেও আবার ভাটিতে ফিরে আসে।
৮. চিনি কলের ট্রাক গুলো কিভাবে ছুটছে?
উত্তর: গাঁ গাঁ চিৎকার করতে করতে চিনি ট্রাকগুলো ছুটছে।
৯. নদীর ওপারে কে সারাদিন বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে?
উত্তর: নদীর ওপারে এক রাখাল সারাদিন বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে।
১০. বিন্দা মাঝির বউয়ের নাম কী?
উত্তর: বিন্দা মাঝির বউয়ের নাম সোনামুখী।
১১. সোনামুখী কার সাথে ঝগড়া বাঁধায়?
উত্তর: সোনামুখী সিলভীর সঙ্গে ঝগড়া বাঁধায়।
১২. কপিলদাস শীতের রোদে পিঠ দিয়ে কী করে?
উত্তর: কপিলদাস শীতের রোদে পিঠ দিয়ে ভারি আরামে ঝিমোয়।
১৩. কপিলদাস কাকে ধাক্কা মেরে টাঙনের পানিতে ফেলে দিয়েছিল?
উত্তর: কপিলদাস মানুয়েল পাদ্রিকে ধাক্কা মেরে টাঙনের পানিতে ফেলে দিয়েছিল।
১৪. কপিলদাসের বাবার নাম কী?
উত্তর: কপিলদাসের বাবার নাম দিবোদাস।
১৫. কিশোরকালে কপিলদাসের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল কে?
উত্তর: কিশোরকালে কপিলদাসের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল একটি কুকুর।
১৬. কীসের আলোয় গুপীনাথের কপাল চকচক করতে লাগল?
উত্তর: আগুনের আলোয় গুপীনাথের কপাল চকচক করতে লাগল।
১৭. কে সাঁওতালদেরকে আবাদের জমি দেয়?
উত্তর: মহাজন সাঁওতালদেরকে আবাদের জমি দেয়।
১৮. নদীর ভাটি থেকে উঠে আসা পাখির নাম কী?
উত্তর: নদীর ভাটি থেকে উঠে আসা পাখির নাম শঙ্খচিল।
১৯. কপিলদাসের দুহাতের আঙুল কী খুঁজতে থাকে?
উত্তর: কপিলদাসের দুহাতের আঙুল ছেঁড়া কোটের বোতাম খুঁজতে থাকে।
২০. কপিলদাস কান পেতে কী শোনে?
উত্তর: কপিলদাস কান পেতে গোরুর পালের ঘরে ফেরা ঘুণ্টির আওয়াজ শোনে।
২১. আজকাল কে ফার্মের গোরু চরায়?
উত্তর: আজকাল জয়হরির ছোটো ছেলেটা ফার্মের গোরু চরায়।
২২. সলিমউদ্দিন কপিলদাসকে কী সম্বোধন করে?
উত্তর: সলিমউদ্দিন কপিলদাসকে ‘বুঢ়া দাদা’ সম্বোধন করে।
২৩. ট্রাক্টরটা কার বাড়ির সীমানা পর্যন্ত চলে আসে?
উত্তর: ট্রাক্টরটা দীনেশ কিন্তুর বাড়ির সীমানা পর্যন্ত চলে আসে।
২৪. কোথায় বিচার বসেছিল?
উত্তর: ফার্মের অফিস ঘরে বিচার বসেছিল।
২৫. কে কপিলদাসকে থালায় করে ভাত দিয়ে যায়?
উত্তর: মহিন্দরের বউ কপিলদাসকে থালায় করে ভাত দিয়ে যায়।
২৬. কপিলদাসের ছেলের নাম কী?
উত্তর: কপিলদাসের ছেলের নাম মহিন্দর।
২৭. কপিলদাস কাকে বাঘের গল্প শোনায়?
উত্তর: কপিলদাস তাঁর নাতিদের বাঘের গল্প শোনায়।
২৮. কীভাবে তিরে শান দেওয়া হচ্ছে?
উত্তর: পাথরের উপর ঘষে ঘষে তিরে শান দেওয়া। হচ্ছে।
২৯. কপিলদাস কী দেখে ভয় পেয়ে পালিয়েছিল?
উত্তর: কপিলদাস শিয়াল দেখে ভয় পেয়ে পালিয়েছিল।
৩০. মহিন্দরের ছেলে কী তৈরিতে ব্যস্ত ছিল?
উত্তর: মহিন্দরের ছেলে ধনুকের জন্য বাঁশের ছিলা তৈরিতে ব্যস্ত ছিল।
৩১. কপিলদাস কোন দিকে ধনুকের নিশানা করে?
উত্তর: কপিলদাস অন্ধকারের দিকে ধনুকের নিশানা করে।

‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের অনুধাবনমূলক প্রশ্ন:

১.‘কপিলদাস বুড়োর কাছে সবই একটার সাথে আরেকটা মেলানো মনে হয়।’- কেন?
উত্তর: গল্পের মূল চরিত্র কপিলদাস মুর্মু বয়সের ভারে অনেকটাই অস্পষ্ট এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। কপিলদাস বুড়োর কাছে সবকিছুই একের সাথে আরেকটার মেলানো মনে হয়।
➠ কারণ তাঁর জীবন বা স্মৃতির কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসীমা বা সঠিক ধারাবাহিকতা নেই। তাঁর বয়সের কারণে অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বা বিভেদ তিনি বুঝতে পারেন না। এর ফলে, তাঁর কাছে সময়, ঘটনা, মানুষ-সব কিছু যেন মিশে গিয়ে এক হয়ে যায়। তিনি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে মেলামেশা করে থাকেন, যা তাঁর জীবনকে অস্পষ্ট এবং জটিল করে তোলে। অর্থাৎ, কপিলদাস মুর্মু যখন জীবন বা ঘটনাবলী নিয়ে ভাবেন, তখন তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট সীমায় বাঁধা পড়েন না। তাঁর কাছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, স্মৃতি বা ঘটনা যেন একেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকে, এবং সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

২. ‘কপিলদাস বুড়োর কাছে সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো বলে মনে হয়’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বয়োবৃদ্ধ অভিজ্ঞ কপিলদাসের কাছে জীবনের চলার পথ স্পষ্ট বলেই সবকিছু একটার সাথে আরেকটা মেলানো মনে হয়।
➠ কপিলদাস বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া একজন বৃদ্ধ। তিনি জীবনের অনেকটা সময় পার করে এসেছেন। তাই চারপাশের প্রকৃতির কোনো ঘটনাতেই তিনি বিচলিত হন না। রাগ, ক্ষোভ, ঝগড়া-ঝাঁটি, জীবন-মৃত্যু সবকিছুই যেন তাঁর কাছে একই সূত্রে গাঁথা বলে মনে হয়। এটাই যেন প্রকৃতির নিয়ম। এমনটাই যেন হওয়ার কথা। তাঁর মতে, সংসারে একটি শান্ত ধীর এবং নিরবচ্ছিন্ন স্রোত আছে। সেই স্রোতে সবকিছুই যেন একটি অপরটির সঙ্গী।

৩. ‘কিন্তু পানির স্রোত তেমনি ধীর, তেমনি শান্ত।’- বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ‘কিন্তু পানির স্রোত তেমনি ধীর, তেমনি শান্ত।’ উক্তিটি দ্বারা টাঙন নদীর শান্ত ও ধীর গতির বৈশিষ্ট্যটি ফুটে উঠেছে।
➠ শীতের আগমনে টাঙন নদীর পানি অনেক নিচে নেমে যায়। বালি কেটে ধীর স্রোতে বয়ে চলে টাঙন। নদীর স্রোত এতটাই শান্ত ও ধীর গতির হয়ে থাকে যে, সাঁকোর উপর দিয়ে ট্রাক্টর যাতায়াত করলেও পানির স্রোত কাঁপে না। সাধারণত শীত ঋতুর আগমনের ফলে নদী এইরকম শান্ত থাকার কথা কিন্তু শীত ছাড়াও টাঙনের এই শান্ত ভাবটা এখন সারা বছরই থাকে।

৪. কপিলদাস অনেকক্ষণ ধরে লোকটার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা লক্ষ করে কেন?
উত্তর: কপিলদাস বস্তির দিকে হাত তুলে দেখানো লোকটাকে করে চেষ্টা করে অনেকক্ষণ ধরে তার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা লক্ষ করেন।
➠ লোকটাকে দেখেন, কয়েকজন লোক টাঙ্গনের উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কি যেন দেখাচ্ছে। পরিষ্কার জামা কাপড় পরা লোকটাকে তিনি চিনতে চেষ্টা করেন। একসময় তিনি চিনতে পারে ওই লোকটি ম্যানেজার মহাজন। কপিলদাসের মনে পরে কয়েকদিন আগেও এখানে বস্তির দিকে হাত তুলে কি যেন বলাবলি করছিল তারা। তিনি ভাবেন, এই সময় ওদের এখানে কি কাজ থাকতে পারে। একবার ভাবেন জমি জরিপ করতে এসেছে বোধ হয় এমন খবর তো তার কানে আসেনি।

৫. কপিলদাস অনেকক্ষণ ধরে লোকটার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা লক্ষ করেন কেন?
উত্তর: কপিলদাস বস্তির দিকে হাত তুলে দেখানো লোকটাকে করে চেষ্টা করে অনেকক্ষণ ধরে তার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা লক্ষ করেন।
➠ লোকটাকে দেখেন, কয়েকজন লোক টাঙ্গনের উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কি যেন দেখাচ্ছে। পরিষ্কার জামা কাপড় পরা লোকটাকে তিনি চিনতে চেষ্টা করেন। একসময় তিনি চিনতে পারে ওই লোকটি ম্যানেজার মহাজন। কপিলদাসের মনে পরে কয়েকদিন আগেও এখানে বস্তির দিকে হাত তুলে কি যেন বলাবলি করছিল তারা। তিনি ভাবেন, এই সময় ওদের এখানে কি কাজ থাকতে পারে। একবার ভাবেন জমি জরিপ করতে এসেছে বোধ হয় এমন খবর তো তার কানে আসেনি।

৬. ‘তার তৃতীয় তিরটা সঠিক নিশানায় ছুড়বার জন্যে তৈরি হতে থাকে।’- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: তাঁর তৃতীয় তিরটা সঠিক নিশানায় ছুড়বার জন্য তৈরি হতে থাকে কথাটির মধ্য দিয়ে ভূমির অধিকার অর্জনের জন্য কপিলদাস মুর্মুর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ও প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে।
➠ ভূমির অধিকার আদায়ে সাঁওতালরা সবসময়ই লড়াই সংগ্রাম করে চলে। কপিলদাস মুর্মু একজন বৃদ্ধ সাঁওতাল। তাঁর বয়স হয়েছে কিন্তু তিনি বয়সকে অতিক্রম করে তির-ধনুক হাতে তুলে নেন। শত্রুকে লক্ষ্য করে ছুড়তে থাকেন তির। কপিলদাস মুহূর্তে হয়ে ওঠেন জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার এক আপসহীন যোদ্ধা। তিনি চান উম্মলিত প্রায় মানুষগুলোও তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাবে। তার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এই প্রত্যয় ও প্রত্যাশা ব্যস্ত হয় প্রশ্নোক্ত উক্তিটির মধ্য দিয়ে।

৮. ‘কপিলদাস বুড়ো এবার সত্যিই দমে যায়।’- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আলোচ্য উক্তিটিতে নিজ ছেলে মহিন্দের কাছ থেকে অবজ্ঞার শিকার হয়ে কপিলদাসের মর্মাহত হওয়ার বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
➠ সাঁওতালদের ভূমি মহাজনের হাত থেকে রক্ষার জন্য শলাপরামর্শ চলছিল। এসময় ছেলে মহিন্দরের কাছে একজনকে আসতে দেখে কপিলদাস আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু কপিলদাসকে দেখে তাঁর ছেলে মহিন্দর বিরক্ত হয় এবং বুড়া আখ্যা দিয়ে স্থান ত্যাগ করতে বলে। নিজের জন্ম দেওয়া ছেলে এভাবে অপমান করে কথা বলাতে কপিলদাস খুব মর্মাহত হন। এরপর সামনে আগানোর চিন্তা বাদ দিয়ে একেবারে শান্ত হয়ে দমে যান।

৯. ‘নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে বলে ইতস্তত করে'-ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আলোচ্য উক্তিটি কপিলদাসের শেয়াল দেখে ভয় পাওয়ার বিষয়টি নাতিদের কাছে লুকানোর প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।
➠ প্রবীণ কপিলদাস তাঁর নাতিদের কাছে যৌবনকালে বাঘ শিকারের গল্প করছিলেন। প্রাণনগরের জঙ্গলে শিকারে গিয়ে একটি বাঘকে তিরবিন্ধ হারহিলেন। ঠিক সেই সময় একটি শেয়াল পাশের ঝোঁপে থেকে বেরিয়ে লাফ দিলে কপিলদাস ভয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু শেয়াল দেখে বলিয়েছিলেন সেটি নাতিদের কাছে বললে তাঁর দুর্বলতা প্রকাশ পাবে ভেবে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন। মূলত, কপিলদাস সবার কাছ থেকে অবহেলার শিকার হওয়ায় নিজের মধ্যে সংকীর্ণতাবোধ তৈরি হয়। ফলে নাতিদের কাছে ভীরুতার কথা প্রকাশ করতে চাননি।

৯. কপিলদাস ইতস্তত করেন কেন?
উত্তর: নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে বলে কপিলদাস ইতস্তত করেন।
➠ কপিলদাস মুর্মুর তাঁর নাতিদের কাছে নিজের বাঘ স্বীকার করা গল্প বলেন। তা-ও আবার বাঘ শিকারের মত ভয়ানক গল্প। স্বভাবতই তাঁর কিশোর নাতিদের এরকম ভয়ানক শিকারের গল্প শুনে বিশ্বায়ের সীমা ছিল না। গভীর আগ্রহ সহকারী শুনছিল। ঝোপ থেকে একটা জানোয়ার লাফ দিয়ে ছুটে যাওয়ার কথা আসতেই তিনি হঠাৎ থেমে যান। কেননা সেটি ছিল শেয়াল। এ কথা মুখে আনার আগে তিনি ইতস্তত বোধ করেন। কারণ শিয়াল দেখে তিনি ভয় পেয়েছিলেন- একথা বললে নাতিদের কাছে তার দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে।

১০. কপিলদাস কাউকে একটা কথাও জিজ্ঞেস করবে না কেন?
উত্তর: কপিলদাস শান্ত, ধীর এবং জীবনের প্রতি আকর্ষণহানতার কারণে কাউকে একটি কথাও জিজ্ঞেস করবে না।
➠ কপিলদাস বয়সের কারণে ঝিমিয়ে পড়েছেন। তাই তিান নদীর ধারে রোদের দিকে পিঠ দিয়ে আনমনে বসে থাকেন। চারপাশের কোনো ঘটনাই তাকে ভাবায় না। ছাগল সবজিখেত খেল, নাকি কেউ ঝগড়া করল আবার খরগোশকে কুকুর তাড়া করল কিনা এসবকিছুই কপিলদাসের কাছে অর্থবিীন মনে হয়। তাই বাচ্চারা যদি চিৎকারও করে তাতেও সে নড়বে না, কান পাতবে না এবং কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না।

১১. ‘মাথাটা ডাইনে-বাঁয়ে অল্প-স্বল্প দুলছে, আর সে বসে রয়েছে তো বসেই রয়েছে।’- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মাথাটা ডাইনে-বাঁয়ে অল্প-স্বল্প দুলছে, আর সে বসে রয়েছে তো বসেই রয়েছে- উক্তিটি কপিলদাস সম্পর্কে করা হয়েছে।
➠ কপিলদাস একজন বৃদ্ধ সাঁওতাল। সে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রধান। কিন্তু বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া, অন্য সবার কাছে নিতান্তই প্রয়োজনীয় মানুষ। সে শীতের শান্ত নদী টাঙনের পাশে রোদে বসে আরামে ঝিমোয়। চারপাশের কোনো শব্দ তার কানে ঢোকে না। চিনি কলের ট্রাক্টর, বিনোদ-মিস্ত্রির ফার্মের ভিতর চলা ট্রাক্টর, রাখালের বাঁশি বাজানোর শব্দ কোনো কিছুই যেন তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে না। এত শব্দের পরও কপিলদাস চুপচাপ। বয়সের কারণে তার মাথাটা ডানে-বাঁয়ে দুলতে থাকে। তার কাছে মনে হয়, সব যেন স্বাভাবিক।

১২. ‘ঝগড়া বলো, ঝাঁটি বলো, জন্ম বলো, মরণ বলো সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো।’ কথাটির মর্মার্থ বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: প্রাত্যাহিক জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি জিনিস যেন একই সূত্রে গাঁথা- একথা বোঝাতেই আলোচ্য উক্তিটি করা হয়েছে।
➠ কপিলদাস বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া, প্রাণচঞ্চলহীন, নির্জীব, বৃদ্ধ একজন মানুষ। চারপাশের কোনো ঘটনাই তাকে ভাবায় না। সে নদীর ধারে বসে থাকে অথচ পাশেই যদি সবজি খেত তছনছ করে ছাগল, বিন্দা মাঝির বউ সোনামুখী ঝগড়া বাধায় সিলভীর সঙ্গে কিংবা কোনো কুকুর যদি খরগোশকে তাড়া করে তাতেও কপিলদাস নড়বে না বা কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগ্রহ পোষণ করবে না। কারণ তার কাছে সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো বলে মনে হয়। বৃদ্ধ বয়সে এসে জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তার মনে হয়, দুনিয়ায় কোনোকিছু আলাদা নয়, সবকিছু এরকমই হয়ে আসছে।

১৩. কপিলদাস মানুয়েল পাদ্রিকে টাঙনের পানিতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল কেন?
উত্তর: বালক বয়সের দুরন্তপনার জন্য, কপিলদাস মানুয়েল পাদ্রিকে টাঙনের পানিতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল।
➠ মানুয়েল পাদ্রিকে টাঙনের পানিতে ধাক্কা দিয়েছিল মজা করে। বর্ষায় টাঙনের পানি ছিল ভরপুর। পাদ্রি সেখানে তলিয়ে গেলেন। পরক্ষণেই তিনি ভেসে উঠেছেন। উঠেই গালাগালি দিলেন। সাঁতরে আসার সময় শাসাচ্ছিলেন তোর বাপকে বলব, বিচার দিব। মূলত, দুষ্টুমি আর মজা করার জন্যই মানুয়েল পাদ্রিকে পানিতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল।

১৪. ‘তোর দিদি কিরকম নিখুঁত নিশানায় গিয়ে বিধত’- উক্তিটি কার এবং এর ধারা কি বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কপিলদাস কৈশোরের স্মৃতিচারণা করতে করতে নিজেই নিজেকে এ কথা রলেন।
➠ বালক বয়সে কপিলদাসের তিরের নিশানা ছিল অব্যর্থ। কপিলদাস সাঁওতাল সন্তান। সাঁওতালরা তির-ধনুক নিক্ষেপে অভিজ্ঞ। শৈশব থেকে তাদের শিকারে যেতে হয় তির-ধনুক নিয়ে। তারা প্রকৃতির মায়ে বেড়ে ওঠে। শিকার করা শেখে। তির-ধনুক নিয়ে শিকার করতে করতে তারা শৈশব থেকেই তির-ধনুক চালনায় দক্ষ হয়ে ওঠে।

১৫. কপিলদাস তার কালো রঙের কুকুরের কথা মনে পড়লে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে কেন?
উত্তর: কপিলদাসের দুরন্ত কিশোরকালের সংঙ্গী ছিল একটি কালে রঙের কুকুর, তাই তার কথা মনে পড়লে সে অন্যমনষ্ক হয়ে পড়ে।
➠ কিশোর বয়সে কপিলদাস শিকার করত। আর তাকে সঙ্গ দিত তার কুকুর। একদিন কপিলদাস একটি প্রাণী শিকার করলে কুকুরটি শিকারের পিছনে ছুটে যায়। তাই যখনই শিকারের কথা মনে পড়ে তখনই তার মনে আসে সেই কালো রঙের কুকুরের কথা। যার সাথে তার অনেক স্মৃতি জড়িত। কিন্তু কুকুরটিকে বাঘে খেয়ে ফেলে। তাই কুকুরের কথা মনে পড়লে সে অন্যমনস্ক হয়ে যায়।

১৬. মহাজনের উপর সাঁওতালরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মহাজন সাঁওতালদের বসত করার ও আবাদ করার জায়গা দেয় কিন্তু ফসলের অর্ধেক নিয়ে নেওয়ার কারণে মহাজনের উপর সাঁওতালরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
➠ গছে আবাদ ও ভূমি সাঁওতালদের অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে রয়েছে। তারা মহাজনের কাছে আবাদ আবাদ ও বসতভিটার জন্য জমি পায়। কিন্তু জমির মালিক হিসেবে মহাজনরা সাঁওতালদের কাছ থেকে অর্ধেক ফসল নিয়ে নেয়। সাঁওতালরা সারা বছর খেতে পায় না। আবার কখনো কখনো আবাদ করার জন্য মহাজনরা সাঁওতালদের বসতি পড়িয়ে দেয় তাদের উচ্ছেদ করে। এসব কারণেই মহাজনের উপর সাঁওতালরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

১৭. ফার্মের গোরুগুলোর গলায় মুষ্টি বাঁধা হয়েছে কেন?
উত্তর: গোরুগুলোর নিশানা পাওয়ার জন্য তাদের গলায় খুটি বাঁধা হয়েছে।
➠ গোরুগুলোকে যেন আলাদাভাবে চেনা যায় এবং তার। জেনা পাল থেকে হারিয়ে গেলেও তাদের খুঁজে পাওয়া যায় সেজন্য গোরুর গলায় ঘুন্টি বাঁধা হয়েছে। এছাড়াও ঘুন্টির শব্দ অনেক দূর থেকে শোনা যায়। এতে তাদের অবস্থান সম্পর্কে সহজে জানা যায়।

১৮. ‘মোর কথা বিশ্বাস না হয় আর কাহাকো পুছে দেখ।’- সলিমউদ্দিন একথা বলেছে কেন?
লে দেবে সেকথা ১ উত্তর: কপিলদাসের বস্তি মহাজন তুলে দেবে সেকথা সলিমউদ্দিন কপিলদাসকে এসে বললে কপিলদাস বিশ্বাস করতে পারেনি বলে সলিমউদ্দিন একথা বলেছে।
➠ কপিলদাস বারবার সলিমউদ্দিনকে জিজ্ঞেস করে বস্তি তুলে দেওয়ার ব্যাপারে সে ঠিক শুনেছে কি না। তখন সলিমউদ্দিন বিরক্ত হয়ে বলে আমার কথা বিশ্বাস না হলে অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখ। মূলত, মহাজনরা মানুষের বসতের উপর দিয়ে ট্রাক্টর চালাবে একথা তার বিশ্বাস হয় না। তাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে বারবার একই কথা জিজ্ঞেস করে সে নিশ্চিত হতে চায়।

১৯. ঠান্ডায় কপিলদাসের পা দুখানি অসাড় হয়ে উঠেছে কেন?
উত্তর: বাইরে শীত আর তার মনের ভিতর বার্ধক্য নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ও অক্ষমতা স্মরণ হওয়ায় কপিলদাসের পা দুখানি অসাড় হয়ে ওঠে।
➠ কপিলদাস তার বসতভিটার কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। তার পুরোনো এই বসতভিটা চলে গেলে কী হবে তার শৈশব-কৈশোরের এসব স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে শীতের রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায়। আর এই দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে থাকায় এবং যেহেতু সে বৃদ্ধ হয়েছে তার করার কিছু নাই ফলে নিজের অক্ষমতা স্মরণ করে তার পা দুটি অসাড় হয়ে উঠেছে।

২০. সাঁওতাল কিশোর ছেলের কোন ব্যাপার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ?
উত্তর: শিকারের গল্প শোনার ব্যাপারে সাঁওতাল কিশোর ছেলের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ।
➠ সাঁওতাল কিশোর ছেলেরা তির-ধনুক নিয়ে খেলাধুলা আর শিকার করে ছোটোবেলা থেকে। তাদের বিনোদনের প্রধান সরঞ্জাম তির-ধনুক। তাই কিশোর বয়স থেকেই তারা শিকারে বের হয় তির-ধনুক নিয়ে। তারা প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে বড়ো হয়ে ওঠে। আর শিকারের ব্যাপারে তাদের ব্যাপক আকর্ষণ কাজ করে।

২১. কপিলদাসের গল্প কারা মনোযোগ দিয়ে শোনে?
উত্তর: কপিলদাসের নাতিরা তার গল্প মনোযোগ দিয়ে শোনে।
➠ কপিলদাস বয়সে প্রবীণ হওয়ায় সমাজের চোখে এখন সে অপ্রয়োজনীয়। তার কথাকে কেউ গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু তার নাতিরা তার কৈশোরের সেইসব গল্প শুনতে উদগ্রীব। দাদার শিকারের গল্প তাদের আনন্দ দেয়। তারা অধীর আগ্রহে সেসব গল্প শোনে। তাদের কাছে কপিলদাস এবং তার গল্প দুয়েরই বিশেষ আকর্ষণ ও গুরুত্ব রয়েছে।

২২. ‘শিশুদের কপিলদাসের ব্যাপারে উৎসাহ, তাকে উদ্বুদ্ধ করে।’ -ধারণাটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া কপিলদাস সবার কাছে অপ্রয়োজনীয় মানুষ হলেও শিশুদের কাছে আগ্রহের ও গুরুত্বপূর্ণ।
➠ কপিলদাসের প্রতি শিশুদের এই উৎসাহ তাকে নতুনভাবে উদ্দীপ্ত করে। সে হাতে নেয় তির-ধনুক। একের পর এক তির হাত থেকে ছুটে যেতে থাকে শত্রুকে লক্ষ্য করে। কপিলদাস হয়ে ওঠে জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের এক আপসহীন যোদ্ধা। তরুণদের ভয়-দ্বিধাকে অমূলক প্রমাণিত করে একাই সে আত্মত্যাগী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-১:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
ঊনিশশো সাতচল্লিশ সালের দেশ বিভাগের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এদেশবাসীর ওপর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়সহ নানা দিক থেকে শোষণ-বঞ্চনা চালাতে থাকে। দেশের মানুষ এ সকল শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার হয় বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবি নিয়ে। এই দাবি আদায়ে ঝরাতে হয় রক্ত। পরবর্তীকালের প্রতিটি যৌক্তিক দাবির বিপরীতে পাকিস্তানিদের একের পর এক সীমাহীন দমন-পীড়ন ও অত্যাচার-বৈষম্যের বিরুদ্ধে দেশবাসী সংক্ষুব্ধ হয় এবং ফুঁসে ওঠে। তাদের উচ্চকিত স্লোগানে আন্দোলিত হয় শহর-বন্দর-গ্রাম।

ক. মুর্মু কী?
খ. ‘কপিলদাস বুড়োর কাছে সবই একটার সাথে আরেকটা মেলানো মনে হয়।’ —কেন?
গ. উদ্দীপকের দেশবাসীর সাথে কপিলদাস মুর্মুর চেতনাগত সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘কপিলদাস মুর্মুর অতীত ও বর্তমানই তাঁকে উদ্দীপকের দেশবাসীর প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়।’—তোমার পঠিত গল্প অবলম্বনে মন্তব্যটির যথার্থতা যাচাই করো।

ক. মুর্মু ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে সাঁওতাল পুরুষ কপিলদাসের বংশ পদবী।
খ. গল্পের মূল চরিত্র কপিলদাস মুর্মু বয়সের ভারে অনেকটাই অস্পষ্ট এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন।
➠ কপিলদাস বুড়োর কাছে সবকিছুই একের সাথে আরেকটার মেলানো মনে হয়, কারণ তাঁর জীবন বা স্মৃতির কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসীমা বা সঠিক ধারাবাহিকতা নেই। তাঁর বয়সের কারণে অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বা বিভেদ তিনি বুঝতে পারেন না। এর ফলে, তাঁর কাছে সময়, ঘটনা, মানুষ-সব কিছু যেন মিশে গিয়ে এক হয়ে যায়। তিনি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে মেলামেশা করে থাকেন, যা তাঁর জীবনকে অস্পষ্ট এবং জটিল করে তোলে। অর্থাৎ, কপিলদাস মুর্মু যখন জীবন বা ঘটনাবলী নিয়ে ভাবেন, তখন তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট সীমায় বাঁধা পড়েন না। তাঁর কাছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, স্মৃতি বা ঘটনা যেন একেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকে, এবং সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

গ. উদ্দীপকের আলোকে কপিলদাস মুর্মুর চেতনাগত সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করতে গেলে, প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে কপিলদাস মুর্মুর জীবন ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে কপিলদাস একজন বৃদ্ধ, যাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়ই ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে শোষণ, বৈষম্য, এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদে। কপিলদাস মুর্মু, গল্পের মধ্যে, নিজের জীবনের ঘটনাবলী এবং সেগুলির অনুপ্রেরণায় আগের সময়ের শোষণ-নির্যাতনের স্মৃতি পুনর্বিবেচনা করছেন। তবে, তার মধ্যে এক ধরনের অন্তর্নিহিত অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি রয়েছে, যা তার নিজের জীবনের সঙ্গে জাতীয় শোষণের প্রতি তাঁর অবস্থানের এক বিশেষ সাদৃশ্য তৈরি করে। দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়। সেই আন্দোলনগুলোর মতোই, কপিলদাস মুর্মু নিজে মনে করেন যে তাঁর জীবনের সমস্ত ঘটনা একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছে, এবং তা শোষণ এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কোনো নির্দিষ্ট অবস্থানে দাঁড়ায় না। তাঁর চেতনায় পুরানো কষ্টের স্মৃতিগুলি এক সঙ্গে গাঁথা থাকে, এবং সেই স্মৃতির চেতনায় তিনি যতটা অতীতকে পুনর্বিবেচনা করেন, ঠিক তেমনটাই শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামও সবার মধ্যে মিশে যায়।
➠ যেভাবে ভাষা আন্দোলন, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ একত্রিত হয়েছিল এবং তাদের দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছিল, কপিলদাস মুর্মুর চেতনায়ও সেই ধরনের প্রতিরোধের অনুভূতি লক্ষ্য করা যায়। তিনি মনে করেন, যে সকল মানুষ শোষণ এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিজস্ব রক্ত, সময় ও শক্তি উজাড় করেছে, তাঁদের সংগ্রাম যেন একটি বিরুদ্ধ অবস্থান থেকে এসেছে, যা নিজেকে এবং জাতিকে পুনঃগঠিত করার জন্য। তবে কপিলদাসের চেতনা থেকে দেখা যায় যে, এই সংগ্রাম শুধু শোষণের বিরুদ্ধে নয়, বরং এক ধরনের অস্তিত্বের লড়াই, যেখানে সময়, ঘটনা এবং ব্যক্তি সব কিছু একে অপরের সাথে মিশে যায়। তাহলে, কপিলদাস মুর্মুর চেতনাগত সাদৃশ্য দেশের মানুষের সংগ্রামের সাথে মূলত তা, যে সংগ্রামগুলোর মধ্যে শোষণ-বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক ধরনের অস্পষ্ট কিন্তু অবিচ্ছেদ্য লড়াই অনুভূত হয়।

ঘ. উদ্দীপকের আলোকে কপিলদাস মুর্মুর অতীত ও বর্তমানের মধ্যে যে সাদৃশ্য পাওয়া যায়, তা তাকে দেশবাসীর প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করায়।
➠ কপিলদাস মুর্মু এক পেশাদার শিক্ষক, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে শোষণ, বৈষম্য এবং অযথা অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। তার জীবন একদিকে যেমন ব্যক্তিগত পরিপ্রেক্ষিত থেকে যন্ত্রণা ও অপূর্ণতার পরিচায়ক, তেমনি এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে দেশের জনগণ শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। গল্পের মধ্যে কপিলদাসের অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধন তাকে উদ্দীপকের দেশবাসীর প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করায়, কারণ তার জীবনসংগ্রাম প্রতিফলিত হয় দেশের মানুষের সংগ্রামে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ এবং বৈষম্যের শিকার হয়েছিল বাংলার মানুষ। যেমন দেশবাসী বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আন্দোলন করেছিল এবং সে আন্দোলনে রক্তও ঝরিয়েছিল, তেমনি কপিলদাসও তার জীবনকালে একাধিকবার শোষণ, নিপীড়ন এবং বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তাঁর জীবনের সংগ্রাম তাই দেশবাসীর সংগ্রামেরই প্রতিফলন, যেখানে কপিলদাসের জীবনও এক গভীর প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।
➠ কপিলদাস মুর্মু যেমন রাষ্ট্রীয় শোষণের মধ্যে পড়ে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও তার প্রতি সহ্য করা হয় অবিচার ও অস্পষ্টতা। তিনি যেমন জীবনের নানা দিক থেকে একাধিক কষ্ট ও নিপীড়নের শিকার, তেমনি দেশবাসীও পাকিস্তানি শাসনাধীন সময়ে নিপীড়িত ছিল। তার জীবন যেমন প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে দীর্ঘ সময়ের নিরব প্রতিবাদ, তেমনি দেশবাসীও পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
➠ কপিলদাস মুর্মু যখন অতীতের ঘটনা ও স্মৃতি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করেন, তখন তা দেশবাসীর সংগ্রামের চিত্রের সাথে মিলে যায়। যে দেশের মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, কপিলদাসও যেন সে আন্দোলনেরই অংশ, তবে ব্যক্তিগত স্তরে। তার অস্থিরতা, বিভ্রান্তি, এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব-সবই দেশবাসীর সংগ্রামের ভেতরে খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে একদিকে মানুষের আশা, অন্যদিকে নিপীড়নের বিপরীতে লড়াই করার শক্তি নেই। অতএব, কপিলদাস মুর্মুর জীবন এবং সংগ্রাম যে উদ্দীপকের দেশের জনগণের সংগ্রামের প্রতিনিধি, সে বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়, কারণ তার জীবনের অভিজ্ঞতা একটি বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রামের প্রতীক।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-২:th>

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
পাশে সব আত্মীয় পরিজন
তবু বয়ঃক্রমে পাই অবহেলা,
স্মৃতির আঁধারে তাই কাটে বেলা।
জোয়ানে লড়ে দিয়েছি সমৃদ্ধ
আজ পাই অবহেলা আজ বলো-বৃদ্ধ।

ক. ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের লেখক কে?
খ. ‘কপিলদাস বুড়োর কাছে সবই একটার সঙ্গে আরেকটা মেলানো বলে মনে হয়’—ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের বৃদ্ধের সাথে কপিলদাসের কী সাদৃশ্য রয়েছে? বর্ণনা করো।
ঘ. উদ্দীপকটি কি ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সমগ্রভাবের প্রতিনিধিত্ব করে? তোমার যৌক্তিক মতামত দাও।

ক. অপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ' গল্পের লেখক শওকত আলী।
খ. বয়োবৃদ্ধ অভিজ্ঞ কপিলদাসের কাছে জীবনের চলার পথ স্পষ্ট বলেই সবকিছু একটার সাথে আরেকটা মেলানো মনে হয়।
➠ কপিলদাস বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া একজন বৃদ্ধ। তিনি জীবনের অনেকটা সময় পার করে এসেছেন। তাই চারপাশের প্রকৃতির কোনো ঘটনাতেই তিনি বিচলিত হন না। রাগ, ক্ষোভ, ঝগড়া-ঝাঁটি, জীবন-মৃত্যু সবকিছুই যেন তাঁর কাছে একই সূত্রে গাঁথা বলে মনে হয়। এটাই যেন প্রকৃতির নিয়ম। এমনটাই যেন হওয়ার কথা। তাঁর মতে, সংসারে একটি শান্ত ধীর এবং নিরবচ্ছিন্ন স্রোত আছে। সেই স্রোতে সবকিছুই যেন একটি অপরটির সঙ্গী।

গ. উদ্দীপকের বৃদ্ধ এবং আলোচ্য গল্পের কপিলদাস মুর্মু উভয়ই বয়সের কারণে সকলের অবহেলার শিকার হওয়ার দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ।
➠ আপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ' গল্পে কপিলদাস একজন বয়োবৃদ্ধ সাঁওতাল মোড়ল। যৌবনে তিনি প্রতাপশালী থাকলেও বার্ধক্যের কারণে এখন প্রায় অবহেলার শিকার। বৃদ্ধ হওয়ার কারণে কেউ তাঁর কথা শোনে না, তাঁর উপস্থিতিতে সবাই বিরক্ত হয়। বুড়ো মানুষ কিছু বুঝবে না সে সবাই তাকে অবজ্ঞা করে। তিনি শুধু তার সমৃদ্ধ অতীতের কথা মনে করে নিজেই নিজের সাথে গল্প ফাঁদেন।
➠ উদ্দীপকের বৃদ্ধ তার আত্মীয়স্বজন ও সমাজ থেকে অবহেলা পেয়েছেন। যৌবনকালে তার সমৃদ্ধ জীবনের কথা স্মরণ করে তিনি আবেগপ্রবণ হয় গড়েন। কিন্তু কেউ সেদিকে না তাকিয়ে বয়সের কারণে তাকে গুরুত্বহীন মনে করে অবহেলার পাত্রে পরিণত করেছে। এক্ষেত্রে মিশকের বৃদ্ধও তার পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে অবহেলার শিকার হয়েছেন। তাই বলা যায়, অবহেলা প্রাপ্তির দিক থেকে উদ্দীপকের এখন ও কপিলদাস মুর্মুর জীবন সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. উদ্দীপকটি ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সমগ্রভাবের প্রতিনিধিত্ব করে না।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ' গল্পে কপিলদাসের ছিল এক সোনালি অতীত। অত্যাচারী মহাজনের ধান কেড়ে কিষানদের বিলিয়ে দেওয়া, ব্রিটিশ শাসকের প্রতিনিধি পাদ্রিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার মতো ইতিহাস রয়েছে তাঁর। কিন্তু বয়সের কারণে তিনি এখন সবার অবহেলার পত্র। তাঁর উপস্থিতিতে সবাই বিরক্ত হলেও অত্যাচারী মহাজনের বস্তি উচ্ছেদের পরিকল্পনা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। নিজের মতৃভূমিকে বাঁচাতে অসীম সাহস নিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
➠ উদ্দীপকে একজন বৃদ্ধের নিঃসঙ্গ অসহায় জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। বয়সের কারণে পরিবার-পরিজনসহ সকলের অবহেলার শিকার দ তিনি। অথচ তার ছিল সমৃদ্ধ অতীত। যৌবনে তিনি অনেক সংগ্রাম করেছিলেন এবং অনেক সমৃদ্ধি এনেছিলেন। এখন শুধু সেই হাঁতের স্মৃতিচারণ করেই তার দিন কাটে।
➠ আলাচ্য গল্পে বৃদ্ধের সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৃদ্ধকালে অবহেলার শিকার, মহাজনের ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু উদ্দীপকটিতে বৃদ্ধের সোনালি অতীত ও বৃদ্ধ বয়সে অবহেলার শিকার হওয়ার দিকটিই শুধু ফুটে উঠেছে। গল্পের কপিলদাসের সংগ্রামী চেতনা, লড়াইয়ে অংশগ্রহণ ও মহাজনের শোষণের মতো চিত্রগুলো উদ্দীপকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই উদ্দীপকটি আলোচ্য গল্পের সমগ্রভাবের প্রতিনিধিত্ব করে না বলে আমি মনে করি।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-৩:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
ঈদের ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ আসা রফিক মিয়ার নাতি-নাতনিরা তাঁর কাছে গল্প শূনতে চাইলে ষাটোর্ধ্ব বয়সি রফিক মিয়া তার শৈশবের নানা স্মৃতিবিজড়িত গল্প শোনায় তাদের। পাঠশালা ফাঁকি দিয়ে খেলতে যাওয়া, দল বেঁধে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়া, প্রতিবেশীদের গাছ থেকে ফল চুরি করে খাওয়া এমন নানাবিধ গল্প শুনিয়ে নাতি-নাতনিদের আনন্দে মাতিয়ে তোলেন। কিছু গল্প ভুলে গেলেও তাতে সংযোজন- বিয়োজন করে নাতি-নাতনিদের বায়নায় গল্প শুনিয়ে থাকেন।

ক. ‘হাপন’ অর্থ কী?
খ. ‘কিন্তু পানির স্রোত তেমনি ধীর, তেমনি শান্ত।’—বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গ. উদ্দীপকের রফিক মিয়ার সঙ্গে কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ' গল্পের কোন দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে।
ঘ. ‘উদ্দীপকে বলিল দায়া মুমুর শেষ কাজ' গল্পের সমগ্র দিক উন্মোচিত হয়নি।’—মন্তব্যটির যথার্থতা বিচার করো।

ক. ‘হাপন’ অর্থ বালক।
খ. ‘কিন্তু পানির স্রোত তেমনি ধীর, তেমনি শান্ত।’—উক্তিটি দ্বারা টাঙন নদীর শান্ত ও ধীর গতির বৈশিষ্ট্যটি ফুটে উঠেছে।
➠ শীতের আগমনে টাঙন নদীর পানি অনেক নিচে নেমে যায়। বালি কেটে ধীর স্রোতে বয়ে চলে টাঙন। নদীর স্রোত এতটাই শান্ত ও ধীর গতির হয়ে থাকে যে, সাঁকোর উপর দিয়ে ট্রাক্টর যাতায়াত করলেও পানির স্রোত কাঁপে না। সাধারণত শীত ঋতুর আগমনের ফলে নদী এইরকম শান্ত থাকার কথা কিন্তু শীত ছাড়াও টাঙনের এই শান্ত ভাবটা এখন সারা বছরই থাকে।

গ. গল্প বলার মাধ্যমে অতীত স্মৃতিচারণ করার দিক থেকে উদ্দীপকের রফিক মিয়া ও ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের কপিলদাসের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে বৃদ্ধ কপিলদাস বয়সের কারণে সবার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন। নিজের অতীতের স্মৃতিচারণ করেই দিনের অধিকাংশ সময় কেটে যায়। কখনো নিজের সাথে নিজেই গল্প করে আবার কখনো নাতিদের সাথে গল্প করে। মেলার গল্প, মহাজনের খেত থেকে ধান নিয়ে কৃষকের মাঝে বিলি করা, পাদ্রিকে পানিতে ফেলে দেওয়ার মতো গল্প তিনি নিজেই নিজের সাথে বলেন। আবার যৌবনে একটি বাঘ শিকারের গল্প সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে নাতিদের কাছে উপস্থাপন করেন।
➠ উদ্দীপকের ষাটোর্ধ্ব রফিক মিয়া নাতি-নাতনিদের বায়নায় নানারকম গল্প বলে থাকেন। তাঁর শৈশবে স্কুল পালানো, ডানপিটে হয়ে প্রতিবেশীদের গাছ থেকে ফল চুরি করাসহ নানাধরনের শৈশবস্মৃতি তাঁর গল্পের মধ্যে ফুটে ওঠে। বয়সের কারণে অনেক গল্প ভুলে গেলেও তিনি গল্প-বানিয়ে নেন। ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে বৃদ্ধ কপিলদাসও নিজের সাথে নিজে গল্প করেন এবং নাতিদের আবদার মেটানোর জন্যও গল্প ফাঁদেন। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের রফিক মিয়ার সাথে আলোচ্য গল্পের কপিলদাসের অতীত স্মৃতিচারণ ও গল্প বলার দিক থেকে সাদৃশ্য রয়েছে।

ঘ. উদ্দীপকে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের কপিলদাসের অতীত স্মৃতিচারণের দিকটি পরিলক্ষিত হলেও গল্পের সমগ্র দিক উন্মোচিত হয়নি বলে মন্তব্যটিকে যথার্থ বলা যায়।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পটি মূলত সাঁওতালদের ভূমির অধিকার আদায়ের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। এই গল্পের প্রধান চরিত্র কপিলদাসের যৌবনকালের প্রতিবাদীরূপ, বার্ধক্যে সবার অবহেলার শিকার হওয়া, গল্প করার অভ্যাস এবং নিজের শেষ কর্ম হিসেবে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার চিত্র উঠে এসেছে। সর্বোপরি, সাঁওতাল বৃদ্ধ কপিলদাসের অতীতের স্মৃতিকথা, বীরত্বগাথার সাথে সাথে তাঁর জীবনের শেষের দিকে অস্তিত্বের লড়াইয়ে লড়বার অদম্য দিকটিও ফুটে উঠেছে।
➠ উদ্দীপকে রফিক মিয়া একজন ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ যিনি নিজের নাতি-নাতনিদের কাছে তার শৈশবের নানা স্মৃতিবিজড়িত ঘটনা বলে নিজের শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করেন। নাতি-নাতনিদের কাছে নিজের শৈশবের গল্প বলার মধ্যে তিনি নানারকমের গল্প মাঝে মাঝে সংযোজনও করে থাকেন নিছক আনন্দদানের জন্য। নাতি-নাতনিদের আনন্দদানের জন্য প্রায় তিনি তাদের গল্প শোনান।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে কপিলদাসের অতীতের স্মৃতিচারণ, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, বৃদ্ধ বয়সে সবার অবহেলার শিকার ও শেষ বয়সে অস্ত্র হাতে লড়াইয়ের দিকটি ফুটে উঠেছে। কিন্তু উদ্দীপকে রফিক মিয়ার অতীতের স্মৃতিচারণ ও গল্প বলার দিকটি ছাড়া আর কোনো কিছুর মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই বলা যায়, উদ্দীপকে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সমগ্র দিক উন্মোচিত হয়নি।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-৪:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিকার নিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা, করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের হাতে বেশ কয়েকবার পরাজিত হন। হালকা কিছু দেশীয় অস্ত্রসহ তিতুমীরের পক্ষে ৮৩ হাজার কৃষকসেনা যুদ্ধ করে। একসময় ব্রিটিশ বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের নিকট তিতুমীর পরাজিত ও শহিদ হন। কিন্তু স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা এ দেশের মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা তো দূরে থাক বরং আরও দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ব্রিটিশরা লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়।

ক. ‘ভাঁট’ কী?
খ. কপিলদাস অনেকক্ষণ ধরে লোকটার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা লক্ষ করে কেন?
গ. উদ্দীপকের বিষয়টি ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত তা আলোচনা করো।
ঘ. উদ্দীপকের তিতুমীর এবং আলোচ্য গল্পের কপিলদাসের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও তাদের চেতনা ও আদর্শ এক ও অভিন্ন- বিশ্লেষণ করে।

ক. ‘ভাঁট’ হলো একধরনের বুনো ফলবিশেষ।
খ. কপিলদাস বস্তির দিকে হাত তুলে দেখানো লোকটাকে করে চেষ্টা করে অনেকক্ষণ ধরে তার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা লক্ষ করেন।
➠ লোকটাকে দেখেন, কয়েকজন লোক টাঙ্গনের উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কি যেন দেখাচ্ছে। পরিষ্কার জামা কাপড় পরা লোকটাকে তিনি চিনতে চেষ্টা করেন। একসময় তিনি চিনতে পারে ওই লোকটি ম্যানেজার মহাজন। কপিলদাসের মনে পরে কয়েকদিন আগেও এখানে বস্তির দিকে হাত তুলে কি যেন বলাবলি করছিল তারা। তিনি ভাবেন, এই সময় ওদের এখানে কি কাজ থাকতে পারে। একবার ভাবেন জমি জরিপ করতে এসেছে বোধ হয় এমন খবর তো তার কানে আসেনি।

গ. উদ্দীপকের বিষয়টি ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের শোষকগোষ্ঠীর সাথে লড়াই-সংগ্রামের সাথে সম্পর্কিত।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে সাঁওতালদের উপর জোতদার-মহাজনরা বিভিন্নভাবে শোষণ, নির্যাতন করত। কপিলদাস এ শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এমনটি কপিলদাস সেই ক্ষোভ থেকে একবার ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি ম্যানুয়েল পাদ্রীকে টাঙ্গনের পানিতে ধাক্কা মেরে দেন। তার এ সংগ্রাম আজীবনের। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি সাঁওতালদের অধিকারের জন্য তীর- ধনুক তুলে নিয়েছিলেন।
➠ উদ্দীপকের তিতুমীর ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বীরযোদ্ধা। তিনি ব্রিটিশদের শাসনের নামে শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ৮৩ হাজার কৃষকসেনা নিয়ে ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করেন বেশ কয়েকবার। ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পেও অপিলদাসও নিজের ভূমি রক্ষার জন্য অত্যাচারী মহাজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেন। তাই বলা যায়, ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের শোষকগোষ্ঠীর সাথে লড়াই-সংগ্রামের সাথে উদ্দীপকের তিতুমীরের ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একইভাবে সম্পর্কিত।

ঘ. অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনার দিক থেকে উদ্দীপকের তিতুমীর এবং গল্পের কপিলদাসের চেতনা ও আদর্শ এক ও অভিন্ন।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ' গল্পে কপিলদাস একজন বৃদ্ধ সাঁওতাল এবং প্রাক্তন মোড়ল। মাথা গোঁজার জন্য এক টুকরো ছনের ঘরটিই তাঁর একমাত্র সম্বল। সেটিও মাঝে মাঝে উচ্ছেদ করে দিতে চায় মহাজন। ভূমি থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কা যখন তীব্রতর হয়, তখনই বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া কপিলদাস প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। তির-ধনুক ছাড়া তার কোনো অস্ত্র নেই। কিন্তু তার প্রধান অস্ত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য দৃঢ় মনোবল আর অপরিসীম সাহস।
➠ উদ্দীপকের তিতুমীর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাঁশের কেল্লা স্থাপন করে ব্রিটিশদের ক্ষমতার ভীত নড়বড়ে করে দিয়েছিল। তাঁর দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রামের ব্রিটিশরা মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছিল। সাদামাটা দেশীয় অস্ত্র আর সাদামাটা কৃষকসেনা নিয়ে সুসজ্জিত ব্রিটিশ সেনার ভারী অস্ত্রের মোকাবিলা করেছিল তিতুমীর বাহিনী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মনোবল কতখানি শক্ত হলে এটা সম্ভব।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে কপিলদাস যেমন নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য মহাজনের বিরুদ্ধে সামান্য তির-ধনুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে গড়েন তেমনি উদ্দীপকের তিতুমীরও অত্যাধুনিক ব্রিটিশ অস্ত্রের মোকাবিলা করে দেশীয় বাঁশ, কাঠের টুকরো দিয়ে। তাই বলা যায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনার দিক থেকে উদ্দীপকের তিতুমীর এবং গল্পের কপিলদাসের চেতনাকে একই সূত্রে গেঁথেছে।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-৫:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
সিধুরাম একজন অশীতিপর বৃদ্ধ। আজকাল অনেকটাই নির্জীব ভাব নিয়ে বাড়ির সামনে ছোট্ট মাচায় বসে থাকেন তিনি। ভিতরবাড়িতে তাঁর নাতি-নাতনিরা হইহুল্লোড় করে, ছেলের বউরা কখনো কথা কাটাকাটি করে, কৃষক খেতে কাজ করে। এসব কিছুতেই। তাঁর মন নেই। অথচ এককালে তিনি ছিলেন দুর্বার ও দুরন্ত। শিকার ছিল তাদের ঐতিহ্য। তির-বন্দুক, বর্শা এসব নিয়েই যেন দিন কাটত। শিকার উৎসবের আগে তির, ধনুক, বর্শা, বল্লম, কুড়াল সব ঘষেমেজে শান দিত। মেয়েরা বিভিন্ন রকম শুকনো খাবার তৈরি করত।

ক. ‘পুশনা পরব’ অর্থ কী?
খ. কপিলদাস অনেকক্ষণ ধরে লোকটার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা লক্ষ করেন কেন?
গ. ‘উদ্দীপকের ফজলুর নির্জীব ভাব যেন কপিলদাসের বুড়ো বয়সেরই প্রতিনিধিত্ব করে।’ —ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘শিকার ছিল তাদের ঐতিহ্য’—উদ্দীপক ও ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

ক. ‘পুশনা পরব’ অর্থ বিশেষ পুজোর আয়োজন।
খ. কপিলদাস বস্তির দিকে হাত তুলে দেখানো লোকটাকে করে চেষ্টা করে অনেকক্ষণ ধরে তার নড়াচড়ার ভঙ্গিটা লক্ষ করেন।
➠ লোকটাকে দেখেন, কয়েকজন লোক টাঙ্গনের উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে বস্তির দিকে হাত তুলে কি যেন দেখাচ্ছে। পরিষ্কার জামা কাপড় পরা লোকটাকে তিনি চিনতে চেষ্টা করেন। একসময় তিনি চিনতে পারে ওই লোকটি ম্যানেজার মহাজন। কপিলদাসের মনে পরে কয়েকদিন আগেও এখানে বস্তির দিকে হাত তুলে কি যেন বলাবলি করছিল তারা। তিনি ভাবেন, এই সময় ওদের এখানে কি কাজ থাকতে পারে। একবার ভাবেন জমি জরিপ করতে এসেছে বোধ হয় এমন খবর তো তার কানে আসেনি।

গ. সিধুরামের নির্জীব ভাব কপিলদাসের বুড়ো বয়সেরই প্রতিনিধিত্বকারী।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে কপিলদাস একজন সাঁওতাল বৃদ্ধ। বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া, সকলের কাছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় কপিলদাস উদাস ভঙ্গিতে নদীর তীরে বসে থাকেন। রোদের দিকে পিঠ মেলে ঝিমোতে থাকেন। শীতের টাঙনে যেমন শান্তভাব, নদীর স্রোতে যেমন কাঁপন নেই কপিলদাসও তেমনি শান্ত আর নির্জীব হয়ে বসে থাকেন। গা-ছাড়া একটা পরিতৃপ্ত ভাব যেন তাঁকে পেয়ে বসেছে। কোনোকিছুতেই তাঁর আগ্রহ নেই। ছাগল সবজি খেত নষ্ট করছে, সোনামুখী আর সিলভী ঝগড়া করছে, বাচ্চারা হইহই করছে এসব কিছুই তাঁর কাছে অর্থহীন। তিনি সেদিকে কোনো কর্ণপাতই করেন না।
➠ উদ্দীপকের সিধুরাম অশীতিপর বৃদ্ধ। অনেকটা নির্জীব ভাব নিয়ে বাড়ির সামনের ছোট্ট মাচায় বসে থাকেন তিনি। ভিতরবাড়ির হইহুল্লোড়, চারপাশের কোনোকিছুই যেন তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করে না। গল্পের কপিলদাসও অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। দুজনেই বয়সের কারণে নির্জীব ও প্রাণচাঞ্চল্যহীন। চারদিকের সাজানো এই সংসারে তাঁদের যেন কোনো আগ্রহ নেই। বয়স যেন তাদের সব শখ, আহ্লাদ ও আগ্রহকে কেড়ে নিয়েছে। উদ্দীপকের সিধুরাম ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের কপিলদাসেরই প্রতিনিধি। উভয়ে যেন বয়সের ফ্রেমে নিজেকে বন্দি করে ফেলেছেন।

ঘ. উদীপক ও ‘কপিলদাস মুর্মর শেষ কাজ' গল্পে শিকারের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি প্রকাশিত হওয়ায়- প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মর শেষ কাজ' গল্পের সাঁওতালদের সমাজ জীবন ও সিগারেট চিত্রটি ফুটে উঠেছে। ভূমি নিয়ে তাদের ইতিহাস যেমনি উজ্জ্বল তেমনি স্বীকার করা তাদের জীবনের বড় একটি অংশ। সাঁওতাল কিশোর ছেলের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ শিকারে। ছোটোবেলা থেকেই তির- ধনুক চালানোতে তারা দক্ষ। কপিল দাস কিশোর বয়সে অনেক শিকারে গিয়েছিলেন। এখনো তার ঘর খুঁজলে তীরের ডোঙ্গা পাওয়া যাবে। আর তাঁর সঙ্গ তার কালো রঙের কুকুর।
➠ উদ্দীপকের সিধুরামও কিশোর বয়সে ছিল দুর্বার ও দুরন্ত। শিকারে ছিল তাদের ঐতিহ্য। তির-ধনুক, বর্শা, বল্লম, কুড়াল সব ঘষেমেজে শান দিত শিকারে যাওয়ার আগে। শিকারে খাবার নিয়ে যাওয়ার জন্য মেয়েরা শুকনো আবার তৈরি করে দিত। মূলত, সাঁওতাল কিশোর ছেলেরা কিশোর বয়স থেকেই তির-ধনুক চালায়। বন্যপ্রাণী শিকার করে তাদের মাংসের চাহিদা পূরণ করে তারা।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মর শেষ কাজ' গল্পে কপিলদাসের কিশোর বয়সের শিকারের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাঁর তির নিখুঁত নিশানায় বিধত। গাঁওতালদের এটি বিশেষ দক্ষতা। শিশুকাল থেকেই প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর প্রধান আগ্রহের জিনিস হলো শিকার। আর এই শিকারই তাদের ঐতিহ্য। উদ্দীপকের সিধুরামও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকটা তাদের সবচেয়ে বড়ো উৎসবের মধ্যে একটি হলো শিকার উৎসব। তাই আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-৬:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
আজ আর বিমূঢ় আস্ফালন নয়,
দিগন্তে প্রত্যাসন্ন সর্বনাশের ঝড়;
আজকের নৈঃশব্দ হোক যুদ্ধারম্ভের স্বীকৃতি।
দুহাতে বাজাও প্রতিশোধের উন্মত্ত দামামা,
................................
শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে
একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।

ক. মহাজনের ধান খামার বাড়ি থেকে কিষানদের বিলিয়ে দিয়েছিল কে?
খ. ‘তার তৃতীয় তিরটা সঠিক নিশানায় ছুড়বার জন্যে তৈরি হতে থাকে।’—উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের শোষক আর শাসকের সাথে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের কার সাদৃশ্য রয়েছে?
ঘ. ‘উদ্দীপকের মূলভাব ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের মূলভাবের সমান্তরাল।’—মন্তব্যটি যাচাই করো।

ক. কপিলদাস মুর্মু মহাজনের ধান খামার বাড়ি থেকে কিষানদের বিলিয়ে দিয়েছিল।
খ. তাঁর তৃতীয় তিরটা সঠিক নিশানায় ছুড়বার জন্য তৈরি হতে থাকে—কথাটির মধ্য দিয়ে ভূমির অধিকার অর্জনের জন্য কপিলদাস মুর্মুর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ও প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে।
➠ ভূমির অধিকার আদায়ে সাঁওতালরা সবসময়ই লড়াই সংগ্রাম করে চলে। কপিলদাস মুর্মু একজন বৃদ্ধ সাঁওতাল। তাঁর বয়স হয়েছে কিন্তু তিনি বয়সকে অতিক্রম করে তির-ধনুক হাতে তুলে নেন। শত্রুকে লক্ষ্য করে ছুড়তে থাকেন তির। কপিলদাস মুহূর্তে হয়ে ওঠেন জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার এক আপসহীন যোদ্ধা। তিনি চান উম্মলিত প্রায় মানুষগুলোও তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাবে। তার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এই প্রত্যয় ও প্রত্যাশা ব্যস্ত হয় প্রশ্নোক্ত উক্তিটির মধ্য দিয়ে।

গ. উদ্দীপকের শোষক আর শাসকের সাথে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের মহাজনদের সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ' গল্পে মহাজন বা জোতদারদের শোষণের কথা প্রকাশ পেয়েছে। তারা সাঁওতালদের বসত করার জায়গা দেয়। আবাদ করার জন্য জমি দেয় কিন্তু জমির ফসলের অর্ধেক চলে যায় তাদের হাতে। ফলে সারা বছর সাঁওতাল কৃষকের পেটে ভাত জোটে না। এছাড়াও ভূমি সাঁওতালদের অস্তিত্বেরই অপর নাম। কিন্তু তাদের বারবার বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় তাদের নিরাপদ আশ্রয়। শোষক মহাজনদের সাথে সাথে মোড়লরাও থাকে নিশ্চুপ।
➠ উদ্দীপকেও শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুরতার কথা বলা হয়েছে। তারা জনগণের উপর এতটাই অত্যাচার করে যে, একসময় সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। প্রত্যাসন্ন সর্বনাশের ঝড়কে তারা অপেক্ষা করতে চায়। মূলত, উদ্দীপকের শোষক আর শাসকের সাথে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ' গল্পের মহাজনদের সাদৃশ্য রয়েছে।

ঘ. লড়াই সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আশাবাদ ব্যক্ত হওয়ায় বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের কপিলদাস মুর্মু একজন বৃদ্ধ সাঁওতাল। ভূমির অধিকার, ফসলের অধিকার নিয়ে সাঁওতালদের সারাজীবন লড়াই করতে হয় জোতদার ও মহাজনদের সাথে। ভূমি তাদের অস্তিত্বেরই অপর নাম। তাই নিজেদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কা যখন তীব্র রূপ ধারণ করে তখন বয়সের ভারে ঝিমিয়ে পড়া কপিলদাস অমিত সাহসে উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। জীবনের শেষ কাজ হিসেবে শেষ লড়াইটা লড়বার জন্য নিজেকে সে সময়ের হাতে তুলে দেয়। তরুণদের ভয় আর দ্বিধাকে দূর করতে আত্মত্যাগী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে তির হাতে। কোনোকিছুর পরোয়া না করে মানুষগুলো জেগে উঠবে এই তার আশা।
➠ উদ্দীপকের কবিতাংশেও দেখা যায়া, কবি দিগন্তে যে সর্বনাশের জড় প্রত্যাসন্ন তিনি তার বিরুদ্ধে নিঃশব্দে যুদ্ধ আরম্ভ করতে আহ্বান জানিয়েছেন। দুহাতে বাজাতে বলেছেন প্রতিশোধের দামামা। শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে একত্রিত হতে সংহতি জানাতে বলেছেন সবাইকে। উদ্দীপক ও আলোচা গল্প উভয় জায়গায় মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করবে এই আশাবাদ ব্যয় হয়েছে।
➠ উভয় জায়গায় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে হতে বলা হয়েছে আপসহীন যোদ্ধা। কোনো কিছুর পরোয়া না করেই মানুষের হাত হবে সঙ্ঘবদ্ধ। তাই বলা যায় যে, প্রশ্নোন্ত মন্তব্যটি যথার্থ।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-৭:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
২০২৪ সালের স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফি। একদিন কারফিউ চলাকালীন তার দাদা মুক্তিযোদ্ধা আবুল মনসুর তাকে মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের একটি অপারেশনের গল্প শোনান। রাফি গল্প শুনে উৎসাহিত হয় এবং দাদাকে আগ্রহ নিয়ে নানারকম প্রশ্ন করেন সুর করতে মুত্তিয়ায় ও উৎসাহ দেখে আবুল মনসুরের রক্ত যেন আবার টগবগ করে ওঠে। তিনিও নাতির সাথে ৫ আগস্ট 'মার্চ টু ঢাকা' প্রোগ্রামে রাস্তায় নেমে পড়েন।

ক. ‘জাড়’ অর্থ কী?
খ. ‘কপিলদাস বুড়ো এবার সত্যিই দমে যায়’—ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের কোন দিকটির প্রতিফলন ঘটেছে? বর্ণনা করো।
ঘ. ‘আবুল মনসুর ও কপিলদাস মুর্মু প্রমাণ করেন- লড়াইয়ের কোনো বয়স নেই।’—মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

ক. ‘জাড়’ অর্থ হলো শীত বা ঠান্ডা।
খ. আলোচ্য উক্তিটিতে নিজ ছেলে মহিন্দের কাছ থেকে অবজ্ঞার শিকার হয়ে কপিলদাসের মর্মাহত হওয়ার বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
➠ সাঁওতালদের ভূমি মহাজনের হাত থেকে রক্ষার জন্য শলাপরামর্শ চলছিল। এসময় ছেলে মহিন্দরের কাছে একজনকে আসতে দেখে কপিলদাস আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু কপিলদাসকে দেখে তাঁর ছেলে মহিন্দর বিরক্ত হয় এবং বুড়া আখ্যা দিয়ে স্থান ত্যাগ করতে বলে। নিজের জন্ম দেওয়া ছেলে এভাবে অপমান করে কথা বলাতে কপিলদাস খুব মর্মাহত হন। এরপর সামনে আগানোর চিন্তা বাদ দিয়ে একেবারে শান্ত হয়ে দমে যান।

গ. উদ্দীপকে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের শিশুদের মাধ্যমে কপিলদাসের মধ্যে নতুনভাবে লড়াইয়ের চেতনা সৃষ্টির বিষয়টির প্রতিফলন ঘটেছে।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে কপিলদাস এক প্রবীণ সাঁওতাল। বার্ধক্যের কারণে সবাই তাকে অবহেলা করে। নাতিদের সাথে যৌবন বয়সের বাঘ শিকারের গল্প করতে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে ফিরে পান। তাদের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করেন সেটি নিজের মধ্যেও অনুভব করতে শুরু করেন। নাতিদের ধনুকে ছিলা লাগানো দেখাতে গিয়ে নিজের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হয়, যা তাকে নতুন করে লড়াইয়ের নামতে উদ্বুদ্ধ করে।
➠ উদ্দীপকে ২০২৪ সালের স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে রাফি নামের এক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। তার দাদা আবুল মনসুর একজন মুক্তিযোদ্ধা। রাফিকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার একটি অপারেশনের গল্প শোনাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আবুল মনসুরের মধ্যে পুনরায় সংগ্রামী চেতনার জাগরণ ঘটে। পরে তিনিও আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। আলোচ্য গল্প ও উদ্দীপক উভয়ক্ষেত্রেই নতুন প্রজন্মের দ্বারা উৎসাহিত হয়ে প্রবীণ ব্যক্তিদের মাঝে সংগ্রামী চেতনার পুনর্জাগরণ ঘটেছে। উদ্দীপকের মধ্যে আলোচ্য গল্পের এ দিকটিই প্রতিফলিত হয়।

ঘ. উদ্দীপকের আবুল মনসুর ও আলোচ্য গল্পের কপিলদাসের উদ্দীপনা, সাহসিকতা ও সংগ্রামী মনোভাব প্রত্যক্ষ করে বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথাযথ।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে কপিলদাস বয়োবৃদ্ধ এক সংগ্রামী বীর। বয়সের কারণে সবার অবহেলার পাত্রে পরিণত হন তিনি। কিন্তু মহাজন যখন তাঁদের বস্তি উচ্ছেদ করে দিতে চায় তখন তাঁর মধ্যে সংগ্রামী চেতনা নবরূপে জেগে ওঠে। বয়স তখন তাঁর কাছে মাত্র একটি সংখ্যায় পরিণত হয়। নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য অত্যাচারী মহাজনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
➠ উদ্দীপকের আবুল মনসুর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যৌবনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। বৃদ্ধ বয়সে এসে নাতি রাফির স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে অংশগ্রহণ দেখে আবারও নিজের মধ্যে সংগ্রামী চেতনা অনুভব করেন এবং ‘মার্চ টু ঢাকা’ প্রোগ্রামে অংশ নেন।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে কপিলদাসকে বয়সের কারণে সবাই অবহেলা করলেও নিজের মাতৃভূমি রক্ষার লড়াইয়ে তিনি সবার আগে অংশ নেন। বয়সকে উপেক্ষা করে তিনি মহাজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেন। উদ্দীপকেও আবুল, মনসুর বয়সকে অতিক্রম করে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের আবুল মনসুর ও আলোচ্য গল্পের কপিলদাস মুর্মু প্রমাণ করেন- লড়াইয়ের কোনো বয়স নেই।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-৮:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
দেশের একমাত্র পাহাড়-পর্বতময় অঞ্চলটির নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম। এই অঞ্চলের চাকমারা প্রকৃতির সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে কঠোর ওগ্রাম করে জীবনধারণ করে। কিন্তু এই অঞ্চলটি ইংরেজ শাসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সঙ্গো সঙ্গে তাদের স্বাধীনভাবে জীবিকানির্বাহের পুরোনো বিখা মাংস হতে করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নাগপাশে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে রামু খাঁ ও শের দৌলত চাকমা জাতির সকল লক্ষী এক করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য প্রস্তুত হন।

ক. কিশোরকালে কপিলদাসের সার্বক্ষণিক সঙ্গী কে ছিল?
খ. ‘নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে বলে ইতস্তত করে’—ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের চাকমাদের সাথে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সাঁওতালদের জীবনযাত্রার সাদৃশ্য তুলে ধরো।
ঘ. ‘রামু খাঁ, শের দৌলত এবং কপিলদাস যেন জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের আপসহীন যোদ্ধা।’—মন্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ করো।

ক. কিশোরকালে কপিলদাসের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল একটি কালো রঙের কুকুর।
খ. আলোচ্য উক্তিটি কপিলদাসের শেয়াল দেখে ভয় পাওয়ার বিষয়টি নাতিদের কাছে লুকানোর প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।
➠ প্রবীণ কপিলদাস তাঁর নাতিদের কাছে যৌবনকালে বাঘ শিকারের গল্প করছিলেন। প্রাণনগরের জঙ্গলে শিকারে গিয়ে একটি বাঘকে তিরবিন্ধ হারহিলেন। ঠিক সেই সময় একটি শেয়াল পাশের ঝোঁপে থেকে বেরিয়ে লাফ দিলে কপিলদাস ভয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু শেয়াল দেখে বলিয়েছিলেন সেটি নাতিদের কাছে বললে তাঁর দুর্বলতা প্রকাশ পাবে ভেবে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন। মূলত, কপিলদাস সবার কাছ থেকে অবহেলার শিকার হওয়ায় নিজের মধ্যে সংকীর্ণতাবোধ তৈরি হয়। ফলে নাতিদের কাছে ভীরুতার কথা প্রকাশ করতে চাননি।

গ. উদ্দীপকের চাকমা এবং ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সাঁওতাল উভয় জনগোষ্ঠীর সংগ্রামী জীবনযাত্রার সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ' গল্পের সাঁওতালরা চাষাবাদ করে জীবনধারণ করে। তারা গ্রামের একটি বস্তিতে বাস করে। গ্রামের অত্যাচারী যোজন তাদেরকে আবাদের জমি দিয়ে চাষাবাদ করায়, আবার বণ্টনের সময় সে অন্যায়ভাবে ঠকায়। মহাজন সাঁওতালদের বসতভিটা কেড়ে নিতে চাইলে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে তারা। বৃদ্ধ কপিলদাস এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন এবং আত্মত্যাগী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
➠ উদ্দীপকের পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারা পাহাড়ে জুম চাষ করে স্বাধীনভাবে জীবনধারণ করে। কিন্তু ইংরেজদের শোষণ ও অত্যাচারের কারণে তাদের জীবিকা নির্বাহের স্বাধীন মাধ্যমটি ধ্বংস হয়ে যায়। অবশেষে চাকমা জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আলোচ্য গল্পেও সাওতাল জনগোষ্ঠী অত্যাচারী মহাজন কর্তৃক শোষিত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ কপিলদাস মহাজনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের চাকমা ও আলোচ্য গল্পের সাঁওতাল উভয় জনগোষ্ঠীর জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই ও সংগ্রামের দিকটি সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. রামু খাঁ, শের দৌলত এবং কপিলদাস যেন জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের আপসহীন যোদ্ধা'- মন্তব্যটি যথার্থ বলে আমি মনে করি।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে অত্যাচারী মহাজন নানাভাবে সাঁওতালদের শোষণ ও নির্যাতন করে। সাঁওতাল কৃষকরা মহাজনের কাছ থেকে ফসলি জমি নিয়ে জমি চাষ করে। ফসল বণ্টনে মহাজন কৃষকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। হঠাৎ একদিন কপিলদাস জনতে পারেন, মহাজন তাদের বস্তি তুলে দিয়ে সেখানেও ধানের আবাদ করার পরিকল্পনা করছে। বৃদ্ধ কপিলদাস নিজের ভূমি রক্ষায় প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন এবং অত্যাচারী মহাজনকে হটাতে নিজের শেষ কর্মটির উদ্দেশ্যে বের হন।
➠ উদ্দীপকের পার্বত্য চট্টগ্রামের পহাড়ি অঞ্চলটি ইংরেজ শাসনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় চাকমা জনগোষ্ঠীর স্বাধীনভাবে জীবিকানির্বাহের পুরোনো যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। চাকমা বিদ্রোহের দুই নেতা রামু খাঁ ও শের দৌলত তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে চাকমা জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে কপিলদাস তাঁর নিজ জনগোষ্ঠী তথা সাঁওতালদের ভূমি রক্ষার লড়াইয়ে অংশ নেন। অত্যাচারী শাসক সবজনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে নেমে পড়েন। উদ্দীপকের রামু খাঁ, শের দৌলতও চাকমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের রামু খাঁ, শের দৌলত ও আলোচ্য গল্পের কপিলদাস তাঁদের নিজ গোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে সচেষ্ট ছিলেন বলে নিঃসন্দেহে জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের আপসহীন যোদ্ধা বলে অভিহিত করা যায়।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-৯:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
এখন থেকে প্রায় ২ যুগ আগের ঘটনা। নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার ভীমপুর গ্রামে বাস করত অনেক আদিবাসী সাঁওতাল পরিবার। একদিন স্থানীয় জোতদার শ্রেণির লোকজন সাঁওতাল পল্লিতে হামলা চালিয়ে তাদের ভিটেমাটি দখল করে এবং আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আলফ্রেড ছিল আদিবাসী অধিকার আদায়ের আপসহীন সংগ্রামী নেতা। নিজের মাতৃভূমি রক্ষায় সে আমৃত্যু লড়ে গেছে।

ক. জমিদার ও কৃষকদের মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির নাম কী?
খ. কপিলদাস ইতস্তত করেন কেন?
গ. ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের কোন দিকটি উদ্দীপকে প্রতিফলিত হয়েছে? তা তুলে ধরো।
ঘ. ‘অস্তিত্বের লড়াইয়ে আপস নয়, সংগ্রাম’ —মন্তব্যটি উদ্দীপক এবং গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

ক. জমিদার ও কৃষকদের মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির নাম জোতদার।
খ. নিজের দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে বলে কপিলদাস ইতস্তত করেন।
➠ কপিলদাস মুর্মুর তাঁর নাতিদের কাছে নিজের বাঘ স্বীকার করা গল্প বলেন। তা-ও আবার বাঘ শিকারের মত ভয়ানক গল্প। স্বভাবতই তাঁর কিশোর নাতিদের এরকম ভয়ানক শিকারের গল্প শুনে বিস্ময়ের সীমা ছিল না। গভীর আগ্রহ সহকারী শুনছিল। ঝোপ থেকে একটা জানোয়ার লাফ দিয়ে ছুটে যাওয়ার কথা আসতেই তিনি হঠাৎ থেমে যান। কেননা সেটি ছিল শেয়াল। এ কথা মুখে আনার আগে তিনি ইতস্তত বোধ করেন। কারণ শিয়াল দেখে তিনি ভয় পেয়েছিলেন- একথা বললে নাতিদের কাছে তার দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যাবে।

গ. ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের জোতদার-মধ্যজন শ্রেণির নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের সংগ্রামী চেতনার দিকটি উদ্দীপকে প্রতিফলিত হয়েছে।
➠ ‘কপিলদাস মুমুর শেষ কাজ’ গল্পে সাঁওতালরা গ্রামের একটি বস্তিতে বসবাস করে। তারা মহাজনের জমি চাষ করে একটি অংশ নিজেরা খাওয়ার জন্য পায়। ফসল বন্টনের সময় মহাজন তাদের বিভিন্নভাবে ঠকায়। একসময় জোতদার-মহাজন তাদের সেই বস্তিটি উচ্ছেদের ছক কষতে থাকে। নিজের মাতৃভূমি রক্ষার জন্য কপিলদাস সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।
➠ উদ্দীপকে দেখা যায়, আলফ্রেড সরেন নামে নওগাঁ জেলায় এক আদবাসী সাঁওতাল বাস করত। তিনি জোতদার শ্রেণির অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন একজন প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। একদিন তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে তারা সাঁওতালদের বসতভিটা দখল করে নেয়। তেমনিভাবে গল্পের কপিলদাসও সাঁওতালা গোত্রের মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। বুড়ো বয়সেও কপিলদাস তাঁর তির-ধনুক হাতে নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার মনোভাব প্রকাশ করেন। তাই বলা যায়, গল্পে কপিলদাসের নিজ গোত্রের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের দিকটিও উদ্দীপকে প্রতিফলিত হয়েছে।

ঘ. ‘অস্তিত্বের লড়াইয়ে আপস নয়, সংগ্রাম’—মন্তব্যটি উদ্দীপক এবং গল্পের আলোকে যথার্থ বলা যায়।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে মহাজনরা সাঁওতালদের উপর অত্যাচার করে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে চায়। তাদের ফসলের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য কপিলদাস সংগ্রামী হয়ে ওঠেন। বয়সের কারণে সকলের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়া কপিলদাস নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই কখনো আপস করেননি। অত্যাচারী শাসককে শেষ করে দিতে বেরিয়ে পড়েন।
➠ উদ্দীপকের নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলায় প্রচুর আদবাসী সাঁওতাল পরিবারের বসবাস ছিল। কিন্তু তারা সুখে-শান্তিতে ছিল না কখনো। প্রায়শই তাদের উপর নেমে আসত জোতদার-মহাজন শ্রেণির খড়গহস্ত। এসব অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা আলফ্রেড সরেনকে তারা লক্ষ করে নির্মমভাবে হত্যা করে সাঁওতাল পল্লি দখল করে নেয়।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে সাঁওতালদের উপর মহাজনের শোষণ ও নির্যাতন মেনে নিতে পারেননি কপিলদাস। 'নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে একচুলও ছাড় দিতে রাজি নন তিনি। উদ্দীপকেও নওগা জেলার সাঁওতালদের উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আলফ্রেড সরেন। তিনিও নিজের ভূমি রক্ষায় কোনোপ্রকার আপস না করে সংগাম চালিয়ে গেছেন। তাই বলা যায়, অস্তিত্বের লড়াইয়ে কপিলদাস ও আলফ্রেড সরেন কেউ-ই আপস করেননি বরং বেছে নিয়েছেন সংগ্রামের পথ।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-১০:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
দুষ্কৃতকারী ও ভূমিদস্যু এমএনএইচ বুলুর দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা এবং প্রাণনাশের হুমকির মাধ্যমে নিজ বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের প্রতিবাদে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন গুলশানের মরহুম আবু ফতেহ ভূঁইয়ার স্ত্রী নূরজাহান বেগম। তিনি বলেন ১৯৬২ সাল থেকে আমরা এ বাড়িতে বসবাস করে আসছি। বর্তমানে ভূমিদস্যু বুলুর অত্যাচারে আমাদের বেঁচে থাকা দুরূহ হয়ে উঠেছে।

ক. নগেন হোরোর বোনের নাম কী?
খ. কপিলদাস কাউকে একটা কথাও জিজ্ঞেস করবে না কেন?
গ. উদ্দীপকের কোন দিকটির সাথে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সাদৃশ্য বিদ্যমান? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘ভূমিদস্যু বুলুর অত্যাচারে আমাদের বেঁচে থাকা দুরূহ হয়ে উঠেছে’ কথাটি যেন গল্পেরই প্রতিফলন। —মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

ক. নগেন হোরোর বোনের নাম সিলভী।
খ. কপিলদাস শান্ত, ধীর এবং জীবনের প্রতি আকর্ষণহীনতার কারণে কাউকে একটি কথাও জিজ্ঞেস করবে না।
➠ কপিলদাস বয়সের কারণে ঝিমিয়ে পড়েছেন। তাই তিনি নদীর ধারে রোদের দিকে পিঠ দিয়ে আনমনে বসে থাকেন। চারপাশের কোনো ঘটনাই তাকে ভাবায় না। ছাগল সবজিখেত খেল, নাকি কেউ ঝগড়া করল আবার খরগোশকে কুকুর তাড়া করল কিনা এসবকিছুই কপিলদাসের কাছে অর্থহীন মনে হয়। তাই বাচ্চারা যদি চিৎকারও করে তাতেও সে নড়বে না, কান পাতবে না এবং কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না।

গ. দুষ্কৃতকারীর অত্যাচারে নূরজাহান বেগম দমে না গিয়ে সাহসের সাথে লড়াইয়ের দিকটির সাথে ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সাদৃশ্য বিদ্যমান।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে কপিলদাস একজন সাঁওতাল। সাঁওতাল গোত্রের উপর মহাজন জোতদাররা যুগের পর যুগ শোষণ ও অত্যাচার করে আসছে। সাঁওতালদের বসতবাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে মহাজন সেখানে ধান আবাদ করতে চাইলে কপিলদাস এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। নিজের মাতৃভূমি রক্ষার জন্য বয়সের ভারে ন্যুজ কপিলদাস দমে যাননি বরং অত্যাচারীর বিরুদ্ধে হয়ে ওঠেন সোচ্চার।
➠ উদ্দীপকের নূরজাহান বেগম একজন সাহসী নারী। দুষ্কৃতকারী ও ভূমিদস্যু বুলু তার বাড়ি দখল করে এবং নানাভাবে তাকে হয়রানি করে। নূরজাহান বেগম বুলুর ভয়ে দমে যাননি বরং সাংবাদিক সম্মেলন করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পেও কপিলদাস তাঁর বসতবাড়ি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করে। উদ্দীপকের নূরজাহান বেগম ও গল্পের কপিলদাস উভয়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার দিকটি থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. উদ্দীপক এবং আলোচ্য গল্পে অত্যাচারিত হওয়ার বিষয়টি প্রস্ফুটিত হওয়ায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথাযথ।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে সাঁওতালদের উপর মহাজনদের অত্যাচারের চিত্র ফুটে উঠেছে। মহাজন তাদের জমি চাষ করতে দেয় এবং ফসলের সঠিক বণ্টন না করে তাদের ঠকায়। তাদের বসতবাড়ি উচ্ছেদ করে সেখানেও আবাদ করতে চায় মহাজন। মহাজন জোতদাররা। দিনের পর দিন তাদের উপর শোষণ-বঞ্চনা চালাতে থাকে।
➠ উদ্দীপকের বুলু একজন ভূমিদস্যু। সে নূরজাহান বেগমের বহু পুরোনো বসতবাড়ি অন্যায়ভাবে দখল ও নানাভাবে তাকে হয়রানি করে। এতে নূরজাহান বেগমের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
➠ ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পে সাঁওতালপল্লির বসতভিটা তুলে দিয়ে মহাজন সেখানে ধানের আবাদ করতে চাইলে সাঁওতালদের বেঁচে থাকাটা দুরুহ হয়ে ওঠে। উদ্দীপকেও নূরজাহান বেগমের বাড়ি দখল ও তাঁকে নানাভাবে হয়রানি করে জীবন অতিষ্ঠ করে তোলার চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথাযথ।


‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন-১১:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এদেশবাসীর ওপর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি নানা দিক থেকে শোষণ-বঞ্চনা চালিয়ে আসছিল। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় লাভ করলেও বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে তাদের বিভিন্ন টালবাহানা এদেশবাসীকে সংক্ষুব্ধ করে তোলে। তখন ‘জয় বাংলা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ স্লোগানে শহর-বন্দর-গ্রাম আন্দোলিত হয়।

ক. মুর্মু কী?
খ. কপিলদাস বুড়োর কাছে সবই একটার সাথে আরেকটা মেলানো বলে মনে হয়-কেন?
গ. উদ্দীপকের দেশবাসীর সাথে কপিলদাস মুর্মুর চেতনাগত সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
ঘ. কপিলদাস মুর্মুর অতীত ও বর্তমান তাঁকে উদ্দীপকের দেশবাসীর প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। -মন্তব্যটির যথার্থ্য যাচাই করো।

-----------

তথ্যসূত্র:
১. সাহিত্য পাঠ: একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৬।
২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url