প্রথম পরিচ্ছেদ : ভাষা
|
| ভাষা |
ভাষা
১.১ ভাষা
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তার মনের মধ্যে সব সময়ই নানা বুদ্ধি বা ভাবের আনাগোনা চলে। সেই বুদ্ধি বা ভাব ইশারায়, নানা অঙ্গভঙ্গি করে, ছবি ও নাচের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে। কিন্তু মুখের ধ্বনির সাহায্যে ব্যাপক পরিসরে তা প্রকাশ করা যায়। যেভাবেই মনের ভাব প্রকাশ করা হোক না কেন, এর সবই ভাষা। তবে অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় মানুষের মুখের ধ্বনি অনেক বেশি অর্থপূর্ণ হয় ও অন্যে বুঝতে পারে। সুতরাং সাধারণ কথায় ‘ভাষা’ বলতে বোঝায়, মানুষের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা অর্থপূর্ণ কতকগুলো আওয়াজ বা ধ্বনির সমষ্টি। এই অর্থপূর্ণ ধ্বনিই হলো ভাষার প্রাণ।
ভাষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন: “মনের ভাব-প্রকাশের জন্য, বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনি দ্বারা নিষ্পন্ন, কোনও বিশেষ জন-সমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত, তথা বাক্যে প্রযুক্ত, শব্দসমষ্টিকে ভাষা বলে।”
অর্থাৎ, নির্দিষ্ট জনসমাজের মানুষ মনের ভাব প্রকাশের জন্য মুখ দিয়ে অন্যের বোধগম্য অর্থপূর্ণ যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি উচ্চারণ করে তাকে ভাষা বলে।
স্থান, কাল ও সমাজভেদে ভাষার রূপভেদ দেখা যায়।
ধ্বনির সৃষ্টি হয় বাগযন্ত্রের সাহায্যে। মানুষের গলনালি, দাঁত, মুখবিবর, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, নাক ইত্যাদির সহযোগ হলো বাগযন্ত্র।
যেকোনো ধ্বনি বা আওয়াজই ভাষা নয়। সেখানে অর্থ এবং অর্থের ধারাবাহিকতা থাকা চাই। ধ্বনির অর্থপূর্ণ মিলনে গঠিত হয় শব্দ। আর একাধিক শব্দের সমন্বয়ে অর্থের ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় বাক্য।
পশু-পাখির ডাক ও মানুষের ভাষার মধ্যে পার্থক্য এখানেই। মানুষ একের পর এক অর্থবোধক শব্দ জুড়ে বাক্য তৈরি করে। বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে একের মনের ভাব অন্যের কাছে প্রকাশ করে। এই ক্ষমতা পশু-পাখির মধ্যে নেই। পশু-পাখি নানা আওয়াজ করে ঠিকই, কিন্তু তা ভাষার ধ্বনি, শব্দ ও বাক্যের মতো কোনো বিষয় বা ধারণাকে ধারাবাহিকভাবে স্পষ্ট করতে পারে না। সে জন্য পশু-পাখির ডাক ভাষা নয়।
স্থান, কাল ও সমাজভেদে ভাষার রূপভেদ হয় বলে পৃথিবীর সব দেশের সব জনগোষ্ঠীর মানুষের ভাষা এক নয়। আবার একই ভাষার এক হাজার বছর আগের রূপ আর আজকের রূপ হুবহু মেলে না। যেমন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ভাষা বাংলা, ইংল্যান্ডের মানুষের ভাষা ইংরেজি, ফ্রান্সের মানুষের ভাষা ফরাসি, চীন দেশের অধিকাংশ মানুষের ভাষা ম্যান্ডারিন ইত্যাদি। আবার বাংলাদেশে বাংলার পাশাপাশি চাকমা জনগোষ্ঠী নিজস্ব চাংমা ভাষায়, গারো জনগোষ্ঠী তাদের আচিক ভাষায় কথা বলে। প্রায় পাঁচশো বছর আগের বাংলা ভাষা এবং আজকের বাংলা ভাষাও হুবহু এক নয়। সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে ভাষারূপের এই পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনশীলতার কারণে ভাষাকে প্রবহমান নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে মনের ভাবকে প্রকাশের জন্য বিভিন্ন মানবসমাজে ভিন্ন ভিন্ন দেশে নানা রকমের শব্দ ব্যবহার করা হয়। এগুলোই একেক দেশে একেক রকম ভাষার জন্ম দিয়েছে। পৃথিবীর কোনো ভাষাই স্থির থাকে না। ভাষা স্থির হয়ে গেলে তা মৃতভাষায় পরিণত হয়। পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজারের কাছাকাছি ভাষা প্রচলিত আছে।
১.২ মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা
ক. মাতৃভাষা
মানুষ জন্মের পর সাধারণত প্রথমে তার মায়ের কাছে প্রতিপালিত হয়, তারই কথা শেখে। তাই জন্মলগ্ন থেকে স্বাভাবিকভাবে মানুষ নিজের মায়ের কাছে যে-ভাষাটি শিক্ষা পায়, তাকেই তার 'মাতৃভাষা' বলে। এটি একটি ধারণার প্রকাশমাত্র। তাই যে শিশুর মা তার জন্ম-মুহূর্তেই মৃত্যুবরণ করে, সেই শিশু যখন বড় হয়, সে পিতা বা অন্য কোনো অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে বড় হলেও তার মুখের সাধারণ ভাষাকে 'মাতৃভাষা'ই বলে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ জন্মের পর মায়ের কোলে এবং মায়ের বাংলা বোলে বড় হয়। বাঙালি মায়ের এই বুলি বাংলা। তাই বাঙালি জাতির মাতৃভাষা বাংলা। আবার বাংলাদেশে অনেক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বাস করে। তাদেরও পৃথক মাতৃভাষা আছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড রাজ্য; মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ইত্যাদি স্থানে বাংলা ভাষার প্রচলন রয়েছে। এসব অঞ্চলে অনেকেরই মাতৃভাষা বাংলা। তা ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিশ্বের বহু দেশেই বাংলাভাষী জনগণ রয়েছে। সেসব স্থানেও বাংলা অনেকের মাতৃভাষা। পৃথিবীর প্রায় ত্রিশ কোটি লোকের মাতৃভাষা বাংলা। মাতৃভাষার বিবেচনায় সারা বিশ্বে বাংলা ভাষার স্থান ষষ্ঠ।
খ. রাষ্ট্রভাষা
রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারের জন্য কোনো দেশের সংবিধানস্বীকৃত ভাষাকে ঐ দেশের
রাষ্ট্রভাষা বলে। একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে
ভিন্ন ভাষার ব্যবহার থাকতে পারে। যেমন:
বাংলাদেশে বাংলা, চাংমা, আচিক, মণিপুরী ভাষা ইত্যাদি;
ভারতে বাংলা, গুজরাটি, হিন্দি, পাঞ্জাবি, কানাড়ি ভাষা ইত্যাদি;
পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, বালুচ, সিন্ধি ভাষা ইত্যাদি।
এতে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাজ কোন ভাষাতে পরিচালিত হবে- এই প্রশ্ন আসে।
এ প্রশ্ন সমাধানকল্পে কোনো কোনো রাষ্ট্র নির্দিষ্ট এক বা একাধিক ভাষাকে
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম ভাগের তৃতীয়
অনুচ্ছেদে লিপিবদ্ধ আছে: প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।
রাষ্ট্রের সর্বাধিক মানুষের বোধগম্য ভাষা হিসেবে সাধারণত রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃত হয়ে
থাকে। এ ভাষায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড, যেমন শিক্ষাপ্রদান,
পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, সাহিত্যরচনা, সংবাদপত্র প্রকাশ, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান
পরিচালনা, দলিল-দস্তাবেজ লিখন, রাষ্ট্রীয় নথিপত্র লিপিবদ্ধকরণ ইত্যাদি সম্পন্ন
হয়।
পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পাশে ইংরেজিকেও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি
দেওয়া হয়েছে।
ভারত প্রজাতন্ত্রের সংবিধানস্বীকৃত কোনো রাষ্ট্রভাষা বা জাতীয় ভাষা না থাকলেও
দাপ্তরিক কাজকর্মের ভাষা হিসেবে হিন্দির পাশাপাশি ইংরেজি স্বীকৃত।
ভারতের রাজ্যগুলোতে প্রশাসনিক কর্মে আঞ্চলিক ভাষাসমূহ ব্যবহার হয়।
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড রাজ্য এবং আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার অন্যতম
প্রশাসনিক ভাষা বাংলা।
১.৩ সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্য
পৃথিবীর সব উন্নত ভাষার মতো বাংলা ভাষারও একাধিক আলাদা রূপ আছে একটি বলার ভাষা বা
মৌখিক রূপ, অপরটি লেখার ভাষা বা লৈখিক রূপ। ভাষার মৌখিক রূপের আবার দুটো রীতি
রয়েছে, যথা: আঞ্চলিক রীতি ও প্রমিত রীতি। অপর দিকে লৈখিক রূপেরও দুটো আলাদা রীতি
আছে, যেমন:
চলিত রীতি ও সাধু রীতি।
বাংলা ভাষার এ প্রকার বা রীতি-ভেদ নিচে ছকের সাহায্যে দেখানো হলো:
আঞ্চলিক ভাষারীতি:
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠী মুখে মুখে যে ভাষারীতিতে মনোভাব ব্যক্ত করে সে ভাষারীতিই বাংলার ‘আঞ্চলিক ভাষারীতি’ নামে অভিহিত। অর্থাৎ অঞ্চলভেদে বাংলা ভাষার প্রচলিত কথ্যরূপকেই আঞ্চলিক ভাষারীতি বলে।
যেমন: বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষারীতি:
‘ঔগোয়া মাইনষ্যের দুয়া পোয়া আছিল্।’
অর্থাৎ একজন লোকের দুটি ছেলে ছিল।
আঞ্চলিক ভাষাকে উপভাষা বলে। আঞ্চলিক ভাষায় শব্দের বহুবিচিত্র রূপ দেখা যায়।
যেমন:
‘ছেলে’ শব্দটি অঞ্চলভেদে ছোয়াল, ছাওয়াল, ছাবাল, ছেইলে, পোলা, পোয়া, পুয়া, ব্যাটা,
ব্যাডা, পুত, হ্রত ইত্যাদি উচ্চারিত হয়।
প্রমিত ভাষারীতি:
বিভিন্ন ভাষারীতি কালক্রমে পরিমার্জিত হয়ে সবার গ্রহণযোগ্য একটি রূপ লাভ করে। এই
ভাষারীতি সাধারণত শিক্ষিত লোকের কথাবার্তা ও নিত্য ব্যবহারে আরও আকর্ষণীয় হয়।
ভাষাও যে শ্রমসাধ্য, প্রযত্নলব্ধ এবং শেখার কোনো বিষয়- প্রমিত ভাষারীতি তার
প্রমাণ। এক কথায়, ভাষার সর্বজনগ্রাহ্য ও সমকালের সর্বোচ্চ মার্জিত রূপকেই প্রমিত
ভাষারীতি বলে। যেমন:
‘একজনের দুটো ছেলে ছিল।’
সাধু ভাষারীতি:
যে ভাষারীতি অধিকতর গাম্ভীর্যপূর্ণ, তৎসম শব্দবহুল, ক্রিয়াপদের রূপ প্রাচীনরীতি
অনুসারী এবং আঞ্চলিকতামুক্ত তা-ই সাধু ভাষারীতি। যেমন:
‘এক ব্যক্তির দুইটি পুত্র ছিল।’
এই রীতি শুধু লিখিত গদ্যে পরিদৃষ্ট হয়।
চলিত ভাষারীতি:
ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী স্থানসমূহের মৌখিক ভাষারীতি মানুষের মুখে মুখে রূপান্তর
লাভকরে প্রাদেশিক শব্দাবলি গ্রহণ এবং চমৎকার বাভঙ্গির সহযোগে গড়ে ওঠে। এই
ভাষারীতিকেই চলিত ভাষারীতি বলে। এই রীতি মৌখিক ও লিখিত উভয় ক্ষেত্রেই আকর্ষণীয় ও
আদরণীয়। যেমন:
‘একজন লোকের দুটি ছেলে ছিল।’
সাধু ভাষারীতির বৈশিষ্ট্য
ক. সাধু ভাষার রূপ অপরিবর্তনীয়। অঞ্চলভেদে বা কালক্রমে এর কোনো পরিবর্তন হয়
না।
খ. এ ভাষারীতি ব্যাকরণের সুনির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে চলে। এর পদবিন্যাস
সুনিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট।
গ. সাধু ভাষারীতিতে তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার বেশি বলে এ ভাষায় এক প্রকার
আভিজাত্য ও গাম্ভীর্য আছে।
ঘ. সাধু ভাষারীতি শুধু লেখায় ব্যবহার হয়। তাই কথাবার্তা, বক্তৃতা, ভাষণ ইত্যাদির
উপযোগী নয়।
ঙ. সাধু ভাষারীতিতে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের পূর্ণরূপ ব্যবহৃত হয়।
চলিত ভাষারীতির বৈশিষ্ট্য
ক. চলিত ভাষা সর্বজনগ্রাহ্য মার্জিত ও গতিশীল ভাষা। তাই এটি মানুষের কথাবার্তা ও
লেখার ভাষা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এটি পরিবর্তনশীল।
খ. এ ভাষারীতি ব্যাকরণের প্রাচীন নিয়মকানুন দিয়ে সর্বদা ব্যাখ্যা করা যায় না।
গ. চলিত ভাষারীতিতে অপেক্ষাকৃত সহজ-সরল শব্দের ব্যবহার বেশি বলে এটি বেশ সাবলীল,
চটুল ও জীবন্ত।
ঘ. বলার ও লেখার ভাষা বলেই এ ভাষা বক্তৃতা, ভাষণ, নাটকের সংলাপ ও সামাজিক
আলাপ-আলোচনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
ঙ. চলিত ভাষারীতিতে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সংক্ষিপ্তরূপ ব্যবহৃত হয়।
সাধু ও চলিত ভাষারীতির মধ্যে নানাদিক থেকে বেশ কিছু পার্থক্যও রয়েছে। এ দুই ভাষারীতির বৈশিষ্ট্য থেকেই তার ধারণা পাওয়া যায়। নিচে সাধু ও চলিত ভাষারীতির কয়েকটি পার্থক্য দেখানো হলো:
| সাধু ভাষারীতি | চলিত ভাষারীতি |
|---|---|
| ১. সাধু ভাষারীতি সর্বজনগ্রাহ্য লেখার ভাষা। | ১. চলিত ভাষারীতি সর্বজনবোধ্য মুখের ও লেখার ভাষা। |
| ২. সাধু ভাষারীতি সব সময় ব্যাকরণের নিয়ম মেনে চলে। | ২. চলিত ভাষা সব সময় ব্যাকরণের নিয়ম মেনে চলে না। |
| ৩. সাধু ভাষায় পদবিন্যাস রীতি সুনির্দিষ্ট। | ৩. চলিত ভাষায় পদবিন্যাস রীতি অনেক সময় পরিবর্তিত হয়। |
| ৪. সাধু ভাষায় তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার বেশি। | ৪. চলিত ভাষায় তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার কম। |
| ৫. সাধু ভাষা বক্তৃতা, ভাষণ ও নাটকের সংলাপের উপযোগী নয়। | ৫. চলিত ভাষা বক্তৃতা, ভাষণ ও নাটকের সংলাপের উপযোগী। |
| ৬. সাধু ভাষায় সর্বনাম, ক্রিয়া ও অব্যয় পদের পূর্ণরূপ ব্যবহৃত হয়। | ৬. চলিত ভাষায় সর্বনাম, ক্রিয়া ও অব্যয়পদের সংক্ষিপ্তরূপ ব্যবহৃত হয়। |
| ৭. সাধু ভাষা গুরুগম্ভীর, দুর্বোধ্য ও মন্থর। | ৭. চলিত ভাষা চটুল, সরল ও সাবলীল। |
| ৮. সাধু ভাষারীতি অপরিবর্তনীয়, তাই কৃত্রিম। | ৮. চলিত ভাষারীতি পরিবর্তনশীল, তাই জীবন্ত। |
নিচের কয়েকটি ক্ষেত্রে সাধু ও চলিত ভাষারীতির পার্থক্য দেখা যায়। যথা:
১. বিশেষ্যপদের রূপে
২. সর্বনামপদের রূপে
৩. ক্রিয়াপদের রূপে
৪. অব্যয়পদের রূপে
| সাধু | চলিত | সাধু | চলিত |
|---|---|---|---|
| অগ্নি | আগুন | কর্ণ | কান |
| চন্দ্র | চাঁদ | দন্ত | দাঁত |
| পক্ষী | পাখি | ব্যাঘ্র | বাঘ |
| মৎস্য | মাছ | হস্তী | হাতি |
২. সর্বনামপদের রূপের পার্থক্য
| সাধু | চলিত | সাধু | চলিত |
|---|---|---|---|
| এই | এ | ইহা | এ |
| ইহাকে | একে | ইহাদের | এদের |
| উহা | ও | উহাদিগের | ওদের |
| কাহাকে | কাকে | কেহ | কেউ |
| তাহা | তা | তাহার | তার |
| যাহা | যা | যাহাদের | যাদের |
৩. ক্রিয়াপদের রূপের পার্থক্য
| সাধু | চলিত | সাধু | চলিত |
|---|---|---|---|
| আসিয়া | এসে | করিয়া | করে |
| করিয়াছে | করেছে | খাইতেছিল | খাচ্ছিল |
| গিয়াছিল | গেছিল | ঘুমাইতেছে | ঘুমাচ্ছে |
| চলিল | চলল | চাহিয়া | চেয়ে |
| জ্বালাইয়া | জ্বেলে | ডাকিতেছে | ডাকছে |
| নিদ্রা যাওয়া | ঘুমানো | পড়িব | পড়ব |
| পার হইয়া | পেরিয়ে | ফুটিয়া উঠিয়াছে | ফুটে উঠেছে |
| বলিয়াছিলেন | বলেছিলেন | বলিয়া | বলে |
| বলিতে থাকিবে | বলতে থাকবে | ভাঙিয়া যাইতে লাগিল | ভেঙে যেতে লাগল |
| লম্ফ প্রদান করিল | লাফ দিল | শুনিল | শুনল |
| শুনিয়াছিল | শুনেছিল | শয়ন করিলেন | শুলেন |
| শ্রবণ করিলাম | শুনলাম |
৪. অব্যয়পদের রূপের পার্থক্য
| সাধু | চলিত | সাধু | চলিত |
|---|---|---|---|
| অদ্য | আজ | অদ্যাপি | আজও |
| কদাচ | কখনো | তথাপি | তবুও |
| নচেৎ | নইলে | নতুবা | নইলে |
| প্রায়শ | প্রায়ই | যদ্যপি | যদিও |
সাধু ও চলিত ভাষারীতির উদাহরণ
সাধু ভাষারীতি
“উপন্যাসের অনুরূপ কোনো বস্তু আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। শুধু আমাদের দেশ বলিয়া নহে, পৃথিবীর কোনো দেশেরই পুরাতন সাহিত্যে উপন্যাসের দর্শন মিলে না। উপন্যাসের প্রধান বিশেষত্বই এই যে, ইহা সম্পূর্ণ আধুনিক সামগ্রী।”
চলিত ভাষারীতি
“একে একে গাড়িগুলো ছেড়ে দিল, আমার গাড়িটাও চলতে শুরু করল। স্টেশন দূরে নয়, সেখানে পৌঁছে নামতে গিয়ে দেখি অতিথি দাঁড়িয়ে। কিরে, এখানেও এসেছিস? সে লেজ নেড়ে তার জবাব দিল, কী জানি মানে তার কী!”
১.৪ কর্ম-অনুশীলন
১. মানুষ ভাষার সাহায্যে মনের কী কী ভাব প্রকাশ করতে পারে তার একটা তালিকা তৈরি
করো।
২. একজন ভাষাবিদের নাম উল্লেখ করে ভাষা সম্পর্কে তিনি যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা
লেখো।
৩. ‘আমার কার্য আমি করিয়াছি। এক্ষণ তাহাদিগের ইচ্ছা হইলে আমাকে পুরস্কার প্রদান
করিবে।’ এই রকম করে সাধু ভাষায় দশটি বাক্য তৈরি কর। তারপর সেগুলোকে চলিত ভাষায়
রূপান্তর করে দেখাও।
৪. তোমার পঠিত একটি গল্প থেকে বিভিন্ন পদের একটি তালিকা তৈরি কর। তারপর সেগুলোর
সাধুরূপের সাহায্যে দশটি বাক্য রচনা করো।
| ‘ভাষা’ পরিচ্ছেদের বহুনির্বাচনি প্রশ্ন : |
|---|
প্রশ্ন থেকে
অভিনন্দন!
|
| তথ্যসূত্র : |
|---|
|
১. বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি: সপ্তম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও
পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৫। ২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮। ৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫। |

Namir 44