| ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের চরিত্র পরিচিতি : |
|
➠ সিরাজউদ্দৌলা
ভূমিকা : সিকান্দার আবু জাফরের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের নায়ক সিরাজউদ্দৌলা
ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। এ তরুণ নবাবকে স্বার্থান্ধ স্বদেশী
ষড়যন্ত্রকারী এবং ক্ষমতা ও অর্থলোভী বিদেশি চক্রান্তকারীদের সম্মিলিত
শঠতা, দুরভিসন্ধি ও শক্তির মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং এ মোকাবেলা
প্রচেষ্টার কাহিনি ও তাঁর করুণ পরিণতিই বিধৃত হয়েছে ‘সিরাজউদ্দৌলা’
নাটকে। তাঁর চরিত্রে সমাবেশ ঘটেছিল বহু বিরল গুণের। তিনি ছিলেন
স্বাধীনচেতা, নীতিবান, সাহসী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, বিবেচক, ধর্মীয় চেতনায়
উদ্বুদ্ধ ও সর্বোপরি স্বদেশপ্রেমিক।
আপসকামী : সিরাজ মসনদে আরোহণ করার সময় চিরাচরিত প্রথায় নজরানা পাঠানো
থেকে বিরত থাকলেও তিনি বার বার ইংরেজদের সাথে আপস করার চেষ্টা করেন। কারণ
তিনি জানতেন যে, ঘসেটি বেগম তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন। কিন্তু
নবাবের আপোসকামিতা অর্থলোভী ইংরেজ কোম্পানির লোকদের স্পর্ধা বাড়াতে থাকে।
তারা কাশিমবাজার কুঠিতে গোপনে অস্ত্র আমদানি করে, কলকাতার আশেপাশে
গ্রামের পর গ্রাম দখল করে, ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার করে সামরিক শক্তি
বৃদ্ধি করে এবং নবাবের আদেশ লঙ্ঘন করে কৃষ্ণবল্লভকে আশ্রয় দেয়। এভাবে
ধৃষ্টতা ও অনাচার যখন চরমে পৌঁছে তখন নবাব কোম্পানির বিরুদ্ধে সামরিক
দেওয়ান নিযুক্ত করেন, মুক্তি দেন উমিচাঁদকে এবং কোম্পানির কর্মচারী
হলওয়েল, ওয়াট্স ও কলেটকে রাজধানীতে পাঠাবার নির্দেশ দেন।
কৌশলী : গভর্নর ড্রেক, ক্যাপটেন ক্লেটন প্রমুখ ইংরেজ পালিয়ে সঙ্গীদেরসহ
ভাগিরথী নদীবক্ষে ফোর্ট উইলিয়াম জাহাজে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং শোচনীয়
জীবনযাপন করতে থাকেন। অর্থলোভী উমিচাঁদ ঘুষের বিনিময়ে বিশ্বাসঘাতক
মানিকচাঁদের কাছ থেকে কলকাতার ইংরেজদের ব্যবসার অনুমতি আদায় করে তা ফোর্ট
উইলিয়াম জাহাজে পাঠিয়ে দেয়। নবাব এ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। ওদিকে
নবাবও নানা ওয়াদা আদায় করে হলওয়েল ও ওয়াটসকে মুক্তি দেন। নবাবের উদ্দেশ্য
ছিল ইংরেজদের তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত করা ও তাদের ক্ষমতা খর্ব করা,
তাদের ব্যবসা সমূলে উচ্ছেদ করা নয়; তাই তিনি বন্দিদের মুক্তি দেন।
তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী : উভয় স্বার্থান্বেষী পক্ষ অপদার্থ শওকতজঙ্গকে
মসনদে বসাতে তৎপর হয়। ঘসেটি বেগমের মতিঝিলের প্রাসাদে যখন সব পরিকল্পনা
চূড়ান্ত হয়ে আসে তখন মোহনলালকে নিয়ে নবাব সেখানে উপস্থিত হন। তিনি জানান,
শওকতজঙ্গকে বিদ্রোহী ঘোষণা করে তার বিরুদ্ধে অভিযানের আদেশ দিয়েছেন।
তারপর তিনি ঘসেটি বেগমকে তাঁর নিজ প্রাসাদে নিয়ে যাবার নির্দেশ দেন।
মতিঝিলের ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র ভেঙে যায় এবং এরপর শওকতজঙ্গ পরাজিত ও নিহত
হয়। সিরাজের তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ফলে একটা বিপদের অবসান হয়।
ধৈর্যশীল : ষড়যন্ত্র তখন নতুন খাতে বইতে থাকে, বিজ্ঞ সিরাজ তখন ইংরেজদের
অত্যাচারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তাঁর অমাত্যদের বিবেক ও স্বদেশপ্রেম
জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। সেই সঙ্গে তিনি দেখিয়ে দেন তাদের পরামর্শের
ভ্রান্তি। কিন্তু নির্যাতিত লবণ-প্রস্তুতকারীকে উপস্থিত করার ব্যাপারটাকে
তাঁরা তাঁদের প্রতি অপমান বলে গণ্য করে ক্ষুব্ধ হন। মিরজাফর প্রচ্ছন্ন
ভীতি প্রদর্শন করতেও কুণ্ঠিত হন না। সিরাজ তাঁদের শিষ্ট আচরণের কথা মনে
করিয়ে দিয়ে বলেন যে, দেশকে বাঁচাতে হলে সিপাহ্সালার, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ,
উমিচাঁদ প্রমুখকে কয়েদখানায় আটক রাখা উচিত। তাঁর এ মন্তব্যে তাঁর বাস্তব
পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণাই প্রকাশ পায়। কিন্তু ধৈর্যশীল ও
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নবাব একতাবদ্ধভাবে দেশের কল্যাণ প্রচেষ্টার পথ অনুসরণ
করাকে শ্রেয় মনে করেন। তিনি ইংরেজদের বিদ্রোহমূলক কার্যকলাপের কথা উল্লেখ
করে সন্দেহ-বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত সম্প্রীতির ভিত্তিতে কল্যাণের
পথে অগ্রসর হবার আহ্বান জানান। তিনি সেনাপতি ও অমাত্যদের কাছে তাঁকে
মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিভ্রান্ত না করারও অনুরোধ জানান।
দূরদর্শী : স্বার্থান্ধদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে। মিরজাফর
মসনদ লাভের আকাক্সক্ষায় উন্মাদ হয়ে ওঠে। অন্যান্যরাও নিজ নিজ স্বার্থ
হাসিল করতে বদ্ধ-পরিকর। মিরনের বাড়িতে দেশি ষড়যন্ত্রকারী ও বিদেশি
ক্ষমতালিপ্সুদের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নবাব সব খবরই রাখতেন। তিনি
ইংরেজদের রাজধানী আক্রমণ করার সুযোগ না দিয়ে ইংরেজদের মোকাবেলা করার জন্য
পলাশির প্রান্তরে শিবির স্থাপন করেন। মিরজাফর, রায়দুর্লভ প্রমুখ
সেনাপতিরা তাঁর পক্ষে লড়বেন না জেনেও দূরদর্শী নবাব তাঁদের সাথে নিয়ে যান
যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে রাজধানী দখল না করতে পারে। উল্লেখ্য যে,
সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহের আশঙ্কায় তাঁদের পদচ্যুত করাও সম্ভব ছিল না।
দেশপ্রেমিক : নবাব ছিলেন অনন্যসাধারণ দেশপ্রেমিক। তাই তিনি আশা করতেন,
দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন দেখে মিরজাফর, রায়দুর্লভ ও ইয়ার লুৎফ খাঁদের
অন্তরে শেষ মুহূর্তে দেশপ্রেম জেগে উঠতে পারে। উচ্চ চিন্তার অধিকারী নবাব
জানতেন না স্বার্থবোধ মানুষকে কত নিচে নামাতে পারে। নবাবের ক্ষীণ আশা
পূর্ণ হয়নি। পলাশির প্রান্তরে যুদ্ধের অভিনয় হলো; মিরমর্দান, বদ্রী আলী
প্রমুখ প্রাণ দিলেন, কিন্তু বিপর্যয় এড়ানো গেল না।
প্রবল মনোবল : চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তেও নবাব আশা না হারিয়ে নিজে
যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তৈরি হতে লাগলেন। অবিলম্বে
মোহনলাল এসে পরাজয়ের খবর জানিয়ে নবাবকে মুর্শিদাবাদ ফিরে গিয়ে রাজধানী
রক্ষা করার চেষ্টা করতে পরামর্শ দিলেন। তিনি দ্রুত ফিরে এসে জনগণকে
দেশরক্ষায় উদ্বুদ্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর সে চেষ্টা
ব্যর্থ হলো। তখন তিনি পতিগত-প্রাণা লুৎফুন্নেসাকে সাথে নিয়ে রাজধানী
ত্যাগ করলেন। ধৃত হয়ে বন্দিবেশে তাঁকে রাজধানীতে ফিরে আসতে হলো। ঘাতকের
আঘাতে দেশের ও সাধ্বী-স্ত্রী লুৎফুন্নেসার কল্যাণের জন্য প্রার্থনা
জানিয়ে কালেমা পড়তে পড়তে নবাব প্রাণ ত্যাগ করেন।
উপসংহার : নবাব চরিত্রে একটি মাত্রই দুর্বলতা দেখা যায় কিন্তু তাঁর উৎসও
একটি মহৎ গুণ। এ দুর্বলতা হচ্ছে দয়া-মমতার আধিক্য। তিনি একটু কঠোর হতে
পারলে হয়তো শেষ রক্ষা করতে পারতেন। তবে ষড়যন্ত্র ও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে
তিনি যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তাতে তার দক্ষতা, মানবিকতা, প্রজাদরদি
ও নির্ভেজাল দেশপ্রীতির পরিচয় ফুটে উঠেছে।
|
|
➠ মিরজাফর
ভূমিকা : বাংলার ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার মূর্ত প্রতীক মিরজাফর। তিনি
ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সিপাহ্সালার, সামরিক
বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। দেশরক্ষার গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত ছিল তার ওপর। তিনি সে
দায়িত্ব পালন করেন নি। নিজের স্বার্থের জন্য বিদেশি বণিক-চক্রের সাথে
ষড়যন্ত্র করে তিনি দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়ে বসেছিলেন বাংলার মসনদে।
তাই মিরজাফর বাংলার ইতিহাসে সর্বাধিক ঘৃণিত, ধিকৃত আর অভিশপ্ত ব্যক্তি।
মসনদলোভী : সিপাহ্সালারূপে বাংলার নবাবের প্রতি তার আনুগত্য ছিল না। তিনি
আজীবন স্বপ্ন দেখতেন বাংলার নবাবীর। “একটা দিন, মাত্র একটা দিনও যদি ওই
মসনদে মাথা উঁচু করে আমি বসতে পারতাম।” এ লোভই তাকে মনুষ্যত্বের মর্যাদা
থেকে স্খলিত করেছিল। ওয়াদাভঙ্গকারী : মসনদে বসার পর থেকে সিরাজ মিরজাফরকে
সঙ্গত কারণেই সন্দেহের চোখে দেখেছেন, তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছেন।
তবু দেশের জনগণের কল্যাণের খাতিরে তিনি তাকে অনুরোধ করেছেন, তিনি যেন
মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে তাকে বিভ্রান্ত না করেন। জবাবে মিরজাফর দেশের
স্বার্থের জন্য পবিত্র কোরান ছুঁয়ে ওয়াদা করলেন আজীবন নবাবের আজ্ঞাবহ
হয়েই থাকবেন। অথচ তাঁর স্বার্থবোধ ধর্মবোধকে গলা টিপে মেরেছে, করেছে
নিষ্ক্রিয়।
হীন স্বার্থপর : মিরজাফরের মতো দুর্জনের ছলের অভাব নেই। নিজের হীন
স্বার্থ চরিতার্থ করার ব্যাপারে এ লোকটা ছিলেন সদা তৎপর। নিজের
কার্যকলাপের কথা ভুলে গিয়ে তিনি প্রকাশ্যে বলে বেড়াতেন সিরাজ তাঁকে
মর্যাদা দেন না। প্রকাশ্য দরবারে মোহনলালের তরবারি নিষ্কাশনে তিনি
অপমানিত বোধ করেন। অথচ এই মর্যাদা-অভিমানী সিপাহ্সালার অন্তরের অন্তস্থলে
ছিল ঘৃণ্য কাপুরুষতা। মোহনলালের উন্মুক্ত তরবারি তাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে
তোলে। ক্লাইভের কাছে কৃতজ্ঞতায় তিনি লজ্জাজনকভাবে নতজানু।
ধূর্ত : ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে মিরজাফর ছিলেন সবচেয়ে ধূর্ত। ধরা পড়বার
ভয়ে গুপ্তচরদের মাধ্যমে তিনি চিঠিপত্রের আদান-প্রদান করতেন খুবই কম।
ক্লাইভের দাবি দেশের আর্থিক অবস্থার প্রেক্ষিতে অযৌক্তিক জেনেও তিনি তা
মেনে নিতে ষড়যন্ত্রের সাথিদের অনুরোধ করেন। তিনি রাজা রাজবল্লভকে বলেন,
“আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি রাজা রাজবল্লভ। ও কথা আর এখন ভাবলে চলবে না।
সকলের স্বার্থের খাতিরে ক্লাইভের দাবি মেটাবার যা হোক একটা ব্যবস্থা
করতেই হবে।”
তার সাংগঠনিক বুদ্ধিও ছিল প্রচুর। তিনি বিভিন্ন স্বার্থের পূজারী একদল
বিচ্ছিন্ন ষড়যন্ত্রকারীকে এক জোটে কাজ করার প্রেরণা যুগিয়েছেন, তাদের
মধ্যে ঐক্য রক্ষার দুঃসাধ্য কাজে সফলতা অর্জন করেছেন।
ক্ষীণ দেশপ্রেম : এমন যে স্বার্থান্ধ দেশদ্রোহী, তাঁর প্রাণেও দেশের জন্য
ভালোবাসা ছিল। ক্লাইভের সাথে ভবিষ্যতের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দেবার পূর্ব
মুহূর্তে তিনিও বিবেকের দংশন অনুভব করেছেন, কল্পনায় অমঙ্গলসূচক মরাকান্না
শুনেছেন। তার সে সময়ের অস্বস্তি চতুর ক্লাইভের দৃষ্টি এড়ায় নি। এ জন্য
ক্লাইভ তাকে 'পড়ধিৎফ' আখ্যা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও কলম হাতে নিয়েও মিরজাফর
বলেছেন, “কিন্তু রাজবল্লভ যেমন বলেন, সবাই মিলে সত্যিই আমরা বাংলাকে
বিক্রি করে দিচ্ছি না তো?” কিন্তু চতুর ক্লাইভ লোকটার আসল দুর্বলতার
খোঁজ রাখতেন। তাই প্রচণ্ড উত্তেজনায় মিরজাফর শেষ পর্যন্ত সে ঐতিহাসিক
ঘৃণ্য দলিলে স্বাক্ষর করেন।
চক্রান্তকারী : পলাশির রণক্ষেত্রে মিরজাফরের চক্রান্ত চরমে ওঠে। তিনি তার
বিরাট বাহিনী নিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকেন। মিরমর্দানের দুর্বার আক্রমণে
ইংরেজ সৈনিকেরা যখন লক্ষবাগে আশ্রয় নিচ্ছিল, তখন এলো বৃষ্টি। সিপাহ্সালার
হিসেবে তখন মিরজাফর যুদ্ধরত নবাব বাহিনীকে হুকুম দেন যুদ্ধ বন্ধ করতে।
তারা বিশ্রামের জন্য শিবিরের দিকে ফিরছে এমন সময় কিলপ্যাট্রিক আক্রমণ করে
তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ক্লাইভের সাথে হাত মিলিয়ে মিরজাফর প্রবেশ করেন
নবাবের শিবিরে।
অন্যের হাতের পুতুল : ইংরেজের সেবাদাস মিরজাফর নবাব হয়ে প্রথম দরবারে
ক্লাইভ না আসা পর্যন্ত মসনদে বসেন নি। ক্লাইভ এলে তিনি গদগদ কণ্ঠে
সিংহাসনের জন্য ক্লাইভের কাছে প্রকাশ্য দরবারে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন এবং
তাঁর হাত ধরে মসনদে আসন গ্রহণ করেন। তিনি ক্লাইভকে বার্ষিক চার লাখ টাকা
আয়ের চব্বিশ পরগণার জমিদারীর স্থায়ী মালিকানা প্রদান করেন। তিনি প্রকৃত
নবাব হন নি, হয়েছিলেন ক্লাইভের হাতের পুতুল। ইতিহাসে এ কারণে তাঁকে বলা
হয়েছে ‘ক্লাইভের গর্দভ’।
উপসংহার : মিরজাফর নবাব হবার পরও সিরাজ সম্পর্কে তার অন্তরের ভীরু সঙ্কোচ
ভাব কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। তিনি চেয়েছিলেন সিরাজকে রাজধানীতে না এনে
বাইরে কোথাও আটকে রাখতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্লাইভের চাতুর্যের কাছে
তাকে হার মানতে হয়। ক্লাইভের কথায় তিনি ঘোষণা করেন সিরাজের বিচার হবে এবং
কেউ ভূতপূর্ব নবাবের প্রতি অনুকম্পা দেখালে তার শাস্তি হবে। এ ঘোষণা তার
অন্তর থেকে বেরোয়নি, ক্লাইভই তাঁকে দিয়ে কথাগুলো বলিয়েছেন। সিরাজকে
রাজপথে অপমানিত করার যে প্রস্তাব ক্লাইভ করেছিলেন মিরজাফর তা মেনে নেন
নি। নাট্যকার মিরজাফরকে কিছুটা মানবিক গুণে গুণান্বিত করে রক্ত-মাংসের
মানুষ হিসেবে চিত্রিত করতে চেষ্টা করেছেন। তাই মিরজাফরকে পুরোপুরি
হৃদয়হীন টাইপ চরিত্র বলা চলে না। মিরজাফর দুরাকাক্সক্ষী, মিরজাফর লোভী,
কিন্তু তিনি রক্ত-মাংসের মানুষ, সংবেদনশীল চরিত্র। তিনি কিছুতেই সিরাজের
হত্যার আদেশে স্বাক্ষর করতে পারেন নি, তার মুরুব্বি ক্লাইভের পরোক্ষ
ইঙ্গিতেও তা তিনি করেন নি। এ মানবিক গুণটি বাংলার ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার
মূর্ত-প্রতীক মিরজাফরকে দোষে-গুণে মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
|
|
➠ রাজবল্লভ
ভূমিকা : দেশীয় প্রভাবশালী জমিদার রাজবল্লভ ছিলেন ব্রাহ্মণ, কিন্তু তিনি
তার ব্রাহ্মণত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের মনিব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে
স্বার্থান্বেষীদের ষড়যন্ত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।
দূরদর্শী : রাজবল্লভ ঘসেটি বেগমের অনুগ্রহভাজন। শওকতজঙ্গকে বাংলার নবাব
করার ষড়যন্ত্র সফল হলে ঘসেটি বেগম হতেন সত্যিকার নবাব এবং ঘসেটির নামে
শাসনকার্য চালাতেন রাজবল্লভ। কিন্তু তাঁর সে ষড়যন্ত্র সফল হয় নি। কিন্তু
তাই বলে এ উদ্যোগী পুরুষ হতাশ হননি। তিনি মিরজাফরের সমর্থক হিসেবে
কোম্পানির কর্মচারীদের সাথে ষড়যন্ত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন।
রাজবল্লভ ক্লাইভের সাথে সম্পাদিত দলিলে স্বাক্ষর করেছেন। তবে তিনি সন্ধির
পেছনে ক্লাইভের যে অভিসন্ধি ছিল তা ঠিকই ধরে ফেলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,
“এই সন্ধি অনুসারে সিপাহ্সালার শুধু মসনদে বসবেন। কিন্তু রাজ্য চালাবে
কোম্পানি।” সন্ধিতে কোম্পানির কর্মচারীদের যে ক্ষতিপূরণ ও পুরস্কারের
শর্ত ছিল তাও তিনি সমর্থন করতে পারেন নি। চুক্তি পড়ে তিনি বলেছিলেন,
“নবাবের তহবিল দুবার লুট করলেও তিন কোটি টাকা পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।”
তবু এ লোকটিই শেষ পর্যন্ত মিরজারকে সেই মারাত্মক দলিলে সই করতে প্ররোচিত
করেছিলেন। কখনো বিবেকের উদয় হলেও রাজবল্লভের সিরাজের প্রতি বিদ্বেষ ছিল
প্রখর। কারণ সিরাজ তাকে অর্থ আত্মসাতের দায়ে বন্দি করেছিলেন। তাই তিনি
সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করতে।
সাবধানী অথচ রসিক : রাজবল্লভ অত্যন্ত সাবধানী লোক। মন্ত্রীসভায় রাইসুল
জুহালার প্রবেশকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখেন। তবে তিনি রসিক লোক। রাইসুল
জুহালার কৌতুক অভিনয় তিনি উপভোগ করেন। কিন্তু দায়িত্ব সম্পর্কেও তিনি
পূর্ণ সচেতন। নর্তকীদের কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম দিয়ে তিনি কাজের কথা
সেরে নিতে চান। আলোচনার প্রারম্ভেই সবাই তর্ক জুড়ে দিলে তিনি তাদের বারণ
করেন। তিনি ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটা সংক্ষেপে সারতে চেয়েছেন। ক্লাইভের
চুক্তিনামাটাও তিনি আগে পড়ে দেখতে চান। কারণ তিনি সতর্ক স্বভাবের
ব্যক্তি।
আত্মসম্মানবোধ : সিরাজ তাঁর সভাসদদের প্রকৃত পরিচয় জানতেন বলে তাঁদের
সাথে আলোচনা করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না; তাতেও রাজবল্লভ ক্ষুব্ধ
ছিলেন। একবার সিরাজ জরুরি বিষয়ের মীমাংসার জন্য তাদের দরবারে ডেকেছেন বলে
রাজবল্লভ তাঁর মুখের ওপর বলেন: “বেয়াদবি মাপ করবেন জাঁহাপনা। দরবারে আজ
পর্যন্ত কোনো জরুরি বিষয়ের মীমাংসা হয়নি।” রাজবল্লভের আত্মসম্ভ্রম-বোধ
ছিল অত্যন্ত প্রখর। অত্যাচারিত লবণ প্রস্তুতকারীকে দরবারে হাজির করলে
তিনি নবাবকে বলেছিলেন, “কিন্তু প্রকাশ্যে দরবারে এমন সুচিন্তিত
পরিকল্পনায় আমাদের অপমান না করলেও চলতো।”
প্রতারক ও বিশ্বাসঘাতক : রাজবল্লভ প্রতারক, রাজবল্লভ বিশ্বাসঘাতক।
তামা-তুলসী-গঙ্গাজল হাতে নিয়ে প্রকাশ্য দরবারে শপথ করেও তিনি নবাবের
অর্থাৎ সমগ্র দেশের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণ
ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নবাব তাদের প্রকৃত পরিচয় জানেন এবং
উপযুক্ত সময়ে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির বিলুপ্তি ঘটাবেন। তাই তিনি
সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করবার জন্য অবিলম্বে কর্মপন্থা গ্রহণের অনুরোধ
জানান। তিনি মিরজাফরকে অপদার্থ জেনেও তার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন। কারণ
তিনি জানতেন, ইংরেজরা বেনিয়ার জাত। টাকা ছাড়া তারা আর কিছুই বোঝে না।
তারা জানে যে, সিরাজের কাছ থেকে তাদের সুবিধা আদায়ের কোনো আশা নেই। কাজেই
তারা তাদের সেবাদাস মিরজাফরকে মসনদে বসাবার জন্য সর্বপ্রকার সাহায্য
করবে। ষড়যন্ত্র সফল করবার জন্য রাজবল্লভ অতিমাত্রায় উৎসাহী।
স্পষ্টভাষী : রাজবল্লভ ছিলেন স্পষ্টভাষী। তিনি ক্লাইভকেও ছেড়ে কথা বলেন
নি। ক্লাইভ গাল ফুলিয়ে বড়ো কথা বললে তিনি তার মুখের ওপর বলেছিলেন,
“তোমাকে ধরে বস্তাবন্দি হুলো-বেড়ালের মতো পানা-পুকুরে দুচারদিট চুবুনি
দিতে বাদশাহের ফরমান যোগাড় করতে হবে নাকি?” রাজবল্লভ রসিক পুরুষ। মিরজাফর
বাংলার মসনদে বসবার প্রথম দিন আসতে দেরি করায় তিনি রসিকতা করে বলেছেন,
“দর্জি নতুন পোশাকটা নিয়ে ঠিক সময়ে পৌঁছেছে কিনা কে জানে।”
উপসংহার : মিরজাফরের প্রথম দরবারে ক্লাইভ নবাবকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ
করলে রাজবল্লভ বলেছেন, “রাজকার্য পরিচালনায় কাকে কী দায়িত্ব দেওয়া হবে
তাও মোটামুটি জানা দরকার।” এতে বোঝা যায় সরকারি পদমর্যাদা লাভের জন্য
রাজবল্লভের একটা মোহ ছিল।
|
|
➠ উমিচাঁদ
ভূমিকা : উমিচাঁদ লাহোরের শিখ ব্যবসায়ী। অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে সে
বাংলায় এসেছিল। নিজের স্বার্থসিন্ধির জন্য সে নবাবের শাসন-ব্যবস্থায়
হস্তক্ষেপ করে। এ স্বার্থান্ধ বণিক নিজের মতলব হাসিলের জন্য নবাবের
বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়, কিন্তু কোনো পক্ষের প্রতিই সে
পুরোপুরি বিশ্বস্ত ছিল না। স্বার্থের পাল্লা যেদিকে ভারি দেখেছে, সেদিকেই
সে ঝুঁকে পড়েছে। দু’নৌকায় পা দিয়ে চলেছিল বলে শেষ পর্যন্ত তার ভরাডুবি
হয়েছে।
ইংরেজ তোষণ : উমিচাঁদ এক সময় কলকাতায় ইংরেজদের হাতে বন্দি হয়। নবাব
কলকাতা জয় করলে হলওয়েল তাকে মুক্তি দেন। ছাড়া পেয়ে সে ইংরেজের বিপদ
মুক্তির জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। তার রসিকতাও বেশ উপভোগ্য। কলকাতায়
ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ থেকে ক্যাপ্টেন ক্লেটন পালিয়ে গেছেন শুনে সে রসিকতা
করে হলওয়েলের মুখের ওপর বলেছিল, “ব্রিটিশ সিংহ ভয়ে লেজ গুটিয়ে নিলেন, এ
বড় লজ্জার কথা।” সে আরও বলেছিল, “ক্যাপ্টেন কর্নেলরা সব পালিয়ে গেছেন,
এখন ফাঁকা ময়দানে হাসপাতালের হাতুড়ে সার্জন জন জেকানিয়া হলওয়েল
সর্বাধিনায়ক। “আপনিই এখন কমান্ডার-ইন-চীফ।” হলওয়েল ব্যাকুলভাবে উমিচাঁদের
সাহায্য চাইলে ধূর্ত উমিচাঁদ রাজা মানিকচাঁদের কাছে চিঠি লিখবে বলে
আশ্বাস দেয়। দুর্গের পতনের মুখে দুর্গ-প্রাকারে সাদা নিশান উড়িয়ে দিতে সে
হলওয়েলকে পরামর্শ দেয়।
স্বার্থান্বেষী : স্বার্থান্বেষী উমিচাঁদ নিজের স্বার্থের সন্ধানে সেই
দুর্যোগের দিনে প্রভাবশালী সবার সাথেই যোগাযোগ রেখে চলত। তাকে কেউই
পুরোপুরি বিশ্বাস করতো না; সেও সবসময় মনে করতো তাকে সবাই ঠকাচ্ছে। ঘসেটির
বাড়িতে তাই সে রায়দুর্লভকে বলেছে, “আপনারা সরশুদ্ধ দুধ খেয়েও গোঁফ শুকনো
রাখেন, আর আমি দুধের হাড়ির কাছে যেতে না যেতেই হাড়ির কালি মেখে গুলবাঘা
বনে যাই।”
ভিজেবেড়াল : উমিচাঁদ ভিজেবেড়াল। সিরাজের পতন হলে কে কী পদ পাবেন তা নিয়ে
আলোচনার সময় উমিচাঁদ বলেছে তার কোনো বিষয়ে দাবি-দাওয়া নেই। সে খাদেম।
খুশি হয়ে যে যা দেয় তাই সে নেয়। উমিচাঁদের বুদ্ধির অভাব ছিল না। সে
তখনকার পরিস্থিতিটা ঠিক আঁচ করতে পেরেছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, সিরাজ তাকে
বিশ্বাস করেন না। সিরাজের নবাবী কায়েম থাকলে অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীদের
মতো তারও রক্ষা নেই। তাই সে মনে-প্রাণে সিরাজের পতন কামনা করেছে।
উমিচাঁদের জীবনে টাকার মতো পরম কাম্য অন্য কোনো জিনিস নেই। সে নিজেই
বলেছে, “দওলত তার কাছে ভগবানের দাদা মশায়ের চেয়েও বড়ো। সে দওলতের
পূজারী।”
কালকেউটে : মিরনের বাড়িতে সিরাজের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র-সভায় উমিচাঁদ
ছিল না। জগৎশেঠ বলেছেন উমিচাঁদকে বাদ দিয়ে কোম্পানির সাথে চুক্তি
স্বাক্ষর সম্ভব নয়। কারণ কোম্পানি যেমন এদেশে বাণিজ্য করতে এসে লুটপাট
করছে, উমিচাঁদও ব্যবসা করতে এসে অর্থ সংগ্রহ করে চলেছে। মিরজাফর নিজেও
উমিচাঁদকে ভালো করে জানতেন। জগৎশেঠের মন্তব্যের প্রত্যুত্তরে বলেছেন,
উমিচাঁদ একটা আস্ত কালকেউটে। তার দাবিই সবার আগে মেটানো দরকার। তা না
হলে, দণ্ড না পেরোতেই সমস্ত খবর পৌঁছে যাবে নবাবের দরবারে। উপসংহার :
ক্লাইভের মতে সে-যুগের সেরা বিশ্বাসঘাতক উমিচাঁদ। উমিচাঁদ ইংরেজদের গোপন
অভিসন্ধি নবাবকে জানিয়ে দিয়েছে। তারপর আবার একটা নতুন প্রস্তাব নিয়ে
এসেছে তাদের কাছে। উমিচাঁদ ত্রিশ লক্ষ টাকা দাবি করেছে। উমিচাঁদ ধড়িবাজ,
কিন্তু ক্লাইভও কম ছিলেন না। তাই ক্লাইভ জাল দলিল করে উমিচাঁদকে ফাঁকি
দিয়েছে। সিরাজের পতনের পরে উমিচাঁদ তার ত্রিশ লক্ষ টাকা না পেয়ে টাকার
শোকে পাগল হয়ে যায়। উন্মাদের মতো নতুন নবাবের দরবারে প্রবেশ করে চিৎকার
করে ফরিয়াদ জানায়। ক্লাইভ মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা দিয়ে বলেন, তার বয়স হয়েছে,
তাই মাথায় গোলমাল দেখা দিয়েছে। তিনি তাকে তীর্থ করতে আর ঈশ্বরের ভজনা
করতে উপদেশ দেন। কিলপ্যাট্রিক তাকে টেনে নিয়ে যায় দরবারের বাইরে। সে টাকা
টাকা বলে অবিরাম চিৎকার করতে থাকে। তার উক্তি অর্থলোভী শাইলককে মনে করিয়ে
দেয়।
|
|
➠ জগৎশেঠ
ভূমিকা : জৈন জগৎশেঠ তৎকালীন বাংলার ধনকুবের ছিলেন। স্বয়ং নবাবও মাঝে
মাঝে টাকার জন্য তার কাছে হাত পাতেন। ঘসেটি বেগমের বাড়িতে নাচ-গানের
জলসায় তার সাথে পাঠকের প্রথম পরিচয়। তিনি লোভী, অর্থটাই তার জীবনের
পরমার্থ। তিনি বুদ্ধিমান ও বহুদর্শী। ঘসেটি বেগমের ষড়যন্ত্র সফল হলে কার
কী লাভ হবে তিনি সঠিকভাবে আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি ঘসেটি বেগমকে
স্পষ্ট বলেছিলেন, “শওকতজঙ্গ নিতান্তই অকর্মণ্য। ভাং-এর গেলাস আর নর্তকী
ছাড়া তিনি আর কিছুই জানেন না। তিনি নবাব হলে আসল কর্তৃত্ব থাকবে বেগম
সাহেবার হাতে। তখন বেগমের নামে শাসনকার্য চালাবেন তার অনুগ্রহভাজন রাজা
রাজবল্লভ।” কাজেই শওকতজঙ্গের আমলে জগৎশেঠের স্বার্থ কিছুতেই নির্বিঘœ হবে
না। অতএব তার জন্য সে ক্রান্তিলগ্নে নগদ কারবারই ভালো। তাই তিনি বলেন
যুদ্ধের ব্যয় বাবদ তিনি শওকতকে সাধ্যমতো সাহায্য করবেন, কিন্তু আসল আর
লাভ মিলিয়ে বেগম সাহেবা তাঁকে একটা কর্জনামা লিখে দিলে তিনি নিশ্চিন্ত
হতে পারেন।
সিরাজভীতি : জগৎশেবের ধারণা ছিল সিরাজ তাদের গোপন ষড়যন্ত্রের কথা টের
পেয়েছেন। তিনি যে-কোনো সময় তাদের বন্দি করতে চান। কাজেই সিরাজ স্থির হয়ে
মসনদে বসতে পারলে তাদের নিষ্কৃতি নেই। তিনি নিজের ধনসম্পদ নবাবের হাত
থেকে রক্ষা করার জন্য আগে থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অজস্র অর্থ
ব্যয়ে সেনাপতি ইয়ার লুৎফা খাঁর অধীনে দু’হাজার অশ্বারোহী সৈন্যের একটা দল
পুষতেন।
বুদ্ধিমান : বুদ্ধিমান জগৎশেঠের কোনো আস্থা ছিল না তৎকালীন বাংলার
গুপ্তচরদের ওপর। তার মতে, গুপ্তচররা মূল চিঠি হয়তো আসল জায়গায় পৌঁছে
দিচ্ছে। কিন্তু তার আগে সে চিঠির একটা নকল নবাব-দরবারেও পাচার করে
দিচ্ছে। তবে বাংলার তৎকালীন বিশৃঙ্খল অবস্থায় গুপ্তচরদের সাহায্য ছাড়া
তাদের পক্ষে এক পা-ও অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।
দ্বিধা-দ্বন্দ্ব : ইংরেজের ওপর জগৎশেঠ পুরোপুরি আস্থা স্থাপন করতে পারেন
নি। তিনি ক্লাইভকেও তার মুখের ওপর স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “ভগবানের দিব্যি,
কর্নেল সাহেব, তোমরা বড় বেহায়া। এই সেদিন কলকাতায় যা মার খেয়েছো এখনো তার
ব্যথা ভোলার কথা নয়।” তিনি বলেছেন, ইংরেজরা তাদের ব্যবসায়ের স্বার্থ
রক্ষা করুক; কিন্তু তারা যেন দেশের শাসন-ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ না করে।
শাসন-ব্যবস্থায় বিদেশিদের অনুপ্রবেশ সম্বন্ধে তার এ স্পষ্ট ভাষণ
প্রণিধানযোগ্য।
উপসংহার : মিরজাফরের ওপরও জগৎশেঠের আস্থা পুরোপুরি ছিল না। মিরজাফর নবাব
হয়ে প্রথমে দরবারে আসতে দেরি করায় তিনি রসিকতা করে বলেছেন, “খাঁ সাহেব
ঢাল-তলোয়ার ছেড়ে নবাবী লেবাস নিচ্ছেন, তাই দেরি হচ্ছে। তা ছাড়া চুলে নতুন
খেজাব, চোখে সুরমা, দাড়িতে আতর, এসব তাড়াহুড়ার কাজ নয়।”
অর্থপিশাচ এই ধনকুবের রসিক-পুরুষও ছিলেন।
|
|
➠ রায়দুর্লভ
ভূমিকা : কায়স্থ রায়দুর্লভ ছিলেন সিরাজউদ্দৌলার অন্যতম সেনাপতি। নবাব
ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ আক্রমণ করে অধিকার করেছিলেন। সে- অভিযানে সেনাপতির
দায়িত্ব পালন করেছেন রায়দুর্লভ। তিনি প্রথম জীবনে নবাবের বিশ্বস্ত
সেনাপতিই ছিলেন। শেষ দিকে ষড়যন্ত্রকারীদের খপ্পরে পড়ে সিপাহসালার হবার
প্রলোভনে তাদের সাথে হাত মিলিয়েছেন। শওকতজঙ্গের বিরুদ্ধে সিরাজের সার্থক
অভিযানের প্রাক্কালে রায়দুর্লভ গোপনে শওকতকে সমর্থন করেন কিন্তু বিনা
স্বার্থে তিনি তা করেন নি। শওকত নবাব হলে তাঁকে পদাধিকারের একটা
একরারন্যামা সই করে দেবার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
লোভী : রায়দুর্লভের হৃদয় থেকে দেশপ্রেম একেবারে শুকিয়ে যায় নি। নবাব তাঁর
প্রকাশ্য দরবারে কুঠিয়াল সাহেবদের দ্বারা নির্মমভাবে উৎপীড়িত একজন হতশ্রী
লবণ-প্রস্তুতকারককে হাজির করালে রায়দুর্লভ তার দুর্দশায় সাতিশয় ব্যথিত
হয়ে ক্ষোভে-রোষে তরবারি নিষ্কাশন করে বলেছেন, “একি! এর এই অবস্থা কে
করলো?” তিনিও তামা, তুলসী ও গঙ্গাজল স্পর্শ করে শপথ করেছিলেন, সর্বশক্তি
নিয়ে তিনি নবাবের অনুগামী থাকবেন, কিন্তু তিনিও লোভ দমন করতে পারেন নি।
সিরাজের পতন হলে তিনি সিপাহসালার হবেন, এ প্রলোভন তাঁকে বিশ্বাসঘাতকে
পরিণত করে। তিনি সম্ভবত এ লোভেই মিরজাফর তোষামোদ করে চলতেন। প্রকাশ্য
দরবারে সিরাজ সভাসদদের অপমান করলে এ সুযোগসন্ধানী সেনাপতি বলেছিলেন,
“সিপাহ্সালারের অপমানটাই আমার বেশি বেজেছে।”
রসিক : স্বার্থপর রায়দুর্লভের মধ্যেও রসিকতার অভাব ছিল না। মিরনের বাড়িতে
নৃত্য-গীতের আসরে মন্ত্রণাসভা বসবার পূর্ব মুহূর্তে তিনি সেখানে গিয়ে
উপস্থিত হন। তার সে আকস্মিক আবির্ভাবে মিরন বিস্ময় প্রকাশ করলে রায়দুর্লভ
বলেন, “আমাকে আপনি নৃত্য-গীতের সুধারসে একেবারে নিরাসক্ত ধরে নিয়েছেন।”
তিনি বলেছেন, অহরহ অশান্তি আর অব্যবস্থার মধ্যে থেকে তার জীবন বিস্বাদ
হয়ে উঠেছে।
ধূর্ত : রায়দুর্লভ ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত ও ধুরন্ধর। তিনি ইচ্ছে করেই গোপন
সভায় উপস্থিত থাকেন নি। তার পক্ষে অধিকক্ষণ বাইরে থাকা তিনি নিরাপদ মনে
করেন নি। তিনি ভয় করেছেন, কখন কী কাজে নবাব তাকে তলব করে বসেন তার ঠিক
নেই। তলবের সাথে সাথে হাজির না পেলে নবাবের মনে সন্দেহ জাগতে পারে। তবুও
বিপদ ঘাড়ে করে তিনি মিরনের সাথে বৈঠকের আগে দেখা করতে এসেছেন শুধু তার
সম্বন্ধে কী ব্যবস্থা করা হলো তা জানার জন্য। মিরন তাকে প্রধান
সেনাপতিত্ব প্রাপ্তির আশ্বাস দেয় এবং তিনি কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে প্রস্থান
করেন।
দ্বন্দ্ব-সন্দেহ : দুকূল বজায় রেখে চলেছেন কায়স্থ সেনাপতি রায়দুর্লভ।
তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের সাফল্যটা নিশ্চিত বলে ধরে নিতে পারেন নি। তিনি
মিরনকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, চারদিকের অবস্থা দেখে যদি তিনি
বুঝতে পারেন যে, ষড়যন্ত্রকারীদের সাফল্য লাভের কোনো আশা নেই, তাহলে তারা
যেন তার সহায়তার আশা না করেন। অবিশ্বাস আর ষড়যন্ত্রের ধুম্রজালে আচ্ছন্ন
হয়ে তিনি তার সঠিক কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারেন নি।
বিশ্বাসঘাতক : রায়দুর্লভ মাসে মাসে রাজবল্লভের কাছ থেকে যে-মোটা বেতন
পেতেন এ তথ্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তিনি প্রকৃত অর্থে নবাবের অনুগত
ছিলেন না। তবে আনুগত্যের মুখোশটা রক্ষা করতে তিনি বেশি তৎপর ছিলেন।
মিরজাফরের কথায়, রায়দুর্লভ ছিলেন ক্ষুদ্র শক্তিধর। তবু ষড়যন্ত্রকারীদের
কাছে প্রয়োজনের সময় নবাবের বিরুদ্ধে তার বিশ্বাসঘাতকতার গুরুত্বও ছিল
যথেষ্ট।
উপসংহার : পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে মিরজাফরের মতো তিনিও যুদ্ধ করেন নি। তিনি
ইংরেজের সাথে হাত মিলিয়েছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার মনে অনুশোচনা
জেগেছিল কি না তা বলা দুষ্কর। তিনি সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেন
নি। মিরজাফরের নবাবী আমলের প্রথম দরবারেও তাকে দেখা যায় না।
|
|
➠ মোহনলাল
ভূমিকা : কাশ্মীরি মোহনলাল সাহসী যোদ্ধা ও বিশ্বস্ততার মূর্ত প্রতীক।
নিজের জীবন দিয়ে মোহনলাল দেশের কল্যাণ চেয়েছিলেন, বিদেশি ক্ষমতালোভী আর
স্বদেশি দেশদ্রোহীদের গতিরোধ করতে গিয়ে নিজের প্রাণ দিয়ে ইতিহাসে তিনি
অমর হয়ে আছেন। সিপাহসালার আর গণ্যমান্য সভাসদেরা যখন ঘসেটি বেগমকে
কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্রের ছুরি শাণাচ্ছেন তখন এ বিশ্বাসী সেনাপতির অধীনে
ফৌজ পাঠিয়ে নবাব শওকতজঙ্গের বিদ্রোহ দমন করেন। নবাবের বিরুদ্ধে নিরন্তর
ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ঘসেটি বেগমকে তার মতিঝিলের প্রাসাদ থেকে নিয়ে এসে নবাবের
নিজের প্রাসাদে রাখার দায়িত্বও পেয়েছিলেন মোহনলাল। নবাব যখন মিরজাফরের মত
প্রমুখ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রকাশ্য দরবারে শপথ করান তখনও বিশ্বাসী
মোহনলাল ছিলেন নবাবের পাশে। একমাত্র মিরমর্দান ছাড়া ভাগ্যবিড়ম্বিত নবাবের
এতোবড়ো বিশ্বস্ত অনুচর মোহনলাল ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। নবাবপ্রীতি :
বাংলার স্বাধীনতা, নবাবের নিরাপত্তার চিন্তায় মোহনলালের চোখে ঘুম ছিল না।
মিরনের আবাসে ষড়য়ন্ত্রকারীরা গোপন সভায় সম্মিলিত হয়েছে- গুপ্তচরের মুখে এ
সংবাদ পেয়ে মোহনলাল সেখানে হানা দিয়েছিলেন।
দেশপ্রীতি : পলাশির যুদ্ধের পূর্বরাত্রে নবাব যখন নিজের শিবিরে
বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিদের কথা ভেবে ক্ষণে ক্ষণে বিভ্রান্ত ও ব্যাকুল হয়ে
পড়ছিলেন, তখনো সবশেষ খবর জানতে এসেছেন মোহনলাল। তিনি নবাবকে আশ্বাস
দিয়েছেন, নবাবের শক্তি ইংরেজদের শক্তির চেয়ে অনেক বেশি। ইংরেজের তিন
হাজার সৈন্যের মোকাবেলায় নবাবের রয়েছে পঞ্চাশ হাজার সৈন্য, ইংরেজদের দশটি
কামানের তুলনায় নবাবের রয়েছে পঞ্চাশটিরও বেশি। মোহনলাল ছিলেন নবাবের
দুর্দিনের বন্ধু, অন্ধকারের আলো। দেশহিতব্রতী এ বিশ্বস্ত সৈনিকের ছিল
একটি নির্ভরযোগ্য গুপ্তচর বাহিনী। তাদের মাধ্যমে তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের সব
সংবাদ রাখতেন। মিরজাফর আর ক্লাইভের মধ্যে যে সব গোপনীয় পত্র বিনিময় হতো
তার বেশ কয়েকটি তার গুপ্তচরদের হাতে ধরা পড়ে। তিনি নিজেদের জয় সম্বন্ধে
নিশ্চিত ছিলেন। পলাশিতে যুদ্ধের প্রহসন না হয়ে সত্যিকার যুদ্ধ হলে নবাবের
জয় ছিল অবধারিত।
বিশ্বস্ত : তিনি নবাবকে শ্রদ্ধা করতেন, ভয়ও করতেন। যুদ্ধের পূর্বরাত্রে
মিরজাফরের গুপ্তচর কমর বেগ ধরা পড়লে সে নবাবকে জানায় মোহনলালের হুকুমে
তার ভাই উমর বেগ জমাদারকে হত্যা করা হয়েছে। সিরাজ তাঁর প্রতি অসন্তোষের
দৃষ্টিতে তাকান। তখন মোহনলাল নবাবকে কৈফিয়তের সুরে জানান, মিরজাফরের
গুপ্তচর উমর বেগ জমাদার ক্লাইভের চিঠিসহ ধরা পড়ে। সে পালাবার চেষ্টা করলে
প্রহরীদের তরবারির আঘাতে তার মৃত্যু হয়।
সাহসী যোদ্ধা : মোহনলাল ছিলেন দুর্দান্ত সাহসী যোদ্ধা। প্রতিকূল অবস্থার
মধ্যেও পলাশির যুদ্ধের সময় তিনি তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে ইংরেজ বাহিনীর
ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। ইংরেজ বাহিনী লক্ষবাগের দিকে হটে যেতে থাকে।
বিশ্বাসঘাতক মিরজাফর বৃষ্টিতে নবাবের বারুদ ভিজে অকেজো হয়ে গেছে অজুহাতে
যুদ্ধ বন্ধ করার হুকুম জারি করেন, কিন্তু দুঃসাহসী যোদ্ধা মোহনলাল সে
হুকুম মানতে চান নি। সিপাহ্সালার, রায়দুর্লভ প্রমুখের ষড়যন্ত্র ও
বিশ্বাসঘাতকতায় যুদ্ধের অবস্থা যখন মারাত্মক পরিণতির দিকে যাচ্ছিল, তখনো
তিনি নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবেননি। তিনি নবাবকে শিবিরে গিয়ে জানিয়েছেন,
যুদ্ধে তাঁদের পরাজয় হয়েছে। তখন আর আত্মভিমানের সময় নেই। নবাব যেন এক
মুহূর্ত সময়ও নষ্ট না করে মুর্শিদাবাদে গিয়ে রাজধানী রক্ষার চেষ্টা করেন।
পরাজয় নিশ্চিত জেনেও মোহনলাল নবাবের সাথে রাজধানীতে ফিরে যান নি। তিনি
বলেছেন, পলাশিতে তাঁর যুদ্ধ তখনো শেষ হয় নি। তিনি ফরাসি বীর সাঁফ্রের
সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যান জীবনের শেষ যুদ্ধ লড়তে। উপসংহার : সিরাজ
অনেক ভরসা রাখতেন তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলালের ওপর। পরাজিত হয়ে
রাজধানীতে ফিরে তিনি জনগণকে জানিয়েছিলেন, তখনো মোহনলাল জীবিত আছেন। তিনি
বন্দি হননি। তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে জনগণকে পরিচালিত করবেন।
এমন সময় বার্তাবাহক এসে জানায় সেনাপতি মোহনলাল বন্দি হয়েছেন। খবরটা
নবাবের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। মোহনলালের স্মৃতি সিরাজের নামের সাথে অমর হয়ে
আছে।
|
|
➠ মিরমর্দান
ভূমিকা : ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের অন্যতম ঐতিহাসিক চরিত্র মিরমর্দান। ফোর্ট
উইলিয়াম দুর্গ আক্রমণে সিরাজের অন্যতম সেনাপতি ছিলেন মিরমর্দান। তিনিই
দুর্গে প্রবেশ করে হলওয়েলকে জিজ্ঞেস করেন, তারা আত্মসমর্পণ করছে কিনা।
তিনিই ইংরেজদেরকে হাত তুলে দাঁড়াতে হুকুম দেন। দুর্গ জয়ের পর সিরাজ তাঁর
এ বিশ্বস্ত সেনাপতির ওপর দায়িত্ব দেন রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণবল্লভকে ছেড়ে
দেবার।
বিশ্বস্ত যোদ্ধা : যুদ্ধের পূর্বরাত্রে পলাশির নবাব শিবিরে নিজেদের সৈন্য
বিন্যাস ও প্রস্তুতির নকশা নবাবকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। নবাব মিরমর্দানকে
বলেছিলেন, কেমন যেন অঙ্কের হিসাবে শত্রুর সুবিধের পাল্লা ভারি হয়ে উঠেছে।
তিনি বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিদের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। দুঃসাহসী বীর
মিরমর্দান বুক উঁচিয়ে নবাবকে বলেছিলেন, ইংরেজদের ঘায়েল করতে সেনাপতি
মোহনলাল, সাঁফ্রে আর তাঁর বাহিনীই যথেষ্ট। সিরাজ তাঁকে বলেছিলেন,
মিরমর্দান হারতে থাকলে মিরজাফরদের বাহিনী দু’কদম এগিয়ে ক্লাইভের সাথে হাত
মেলাবে বিনা বাধায়। মিরমর্দান বলেছিলেন, তাঁদের হারবার কোনো প্রশ্নই ওঠে
না। মিরমর্দান চিন্তিত নবাবকে বুকভরা ভরসা দিয়ে বলেছিলেন, তাঁর চিন্তিত
হবার কারণ নেই, তাঁদের প্রাণ থাকতে নবাবের কোনো ক্ষতি হবে না। নবাবকে
চিন্তিত দেখে তিনি অবাক হয়েছেন। কারণ আত্মশক্তিতে তিনি ছিলেন পরম
বিশ্বাসী।
সাহসী : মিরমর্দান শত্রুপক্ষের গুপ্তচরদের ভালো করেই চিনতেন। যুদ্ধের
পূর্বরাত্রে গুপ্তচর কমর বেগ জমাদার ধরা পড়লে তিনিই তাকে শনাক্ত করেন।
যুদ্ধের সময় বৃষ্টিতে নবাবের বারুদ ভিজে অকেজো হয়ে গেলেও দুর্দান্ত সাহসী
সেনাপতি মিরমর্দান কামানের অপেক্ষা না করে হাতাহাতি লড়বার জন্য দ্রুত
এগিয়ে যান। শত্রুকে কামান ছুঁড়বার সময় না দিয়ে তিনি তলোয়ার নিয়েই সামনে
এগিয়ে গিয়েছিলেন।
উপসংহার : শত্রুর গোলার আঘাতে মীরমর্দানের পতন সংবাদ শুনে নবাবের বুক
ভেঙে গিয়েছিল। আচ্ছন্নভাবে তিনি শুধু প্রশ্ন করতে পেরেছিলেন মিরমর্দান
শহিদ হয়েছেন কিনা। ফরাসি সাঁফ্রে বলেছেন, 'ঞযব নৎধাবংঃ ংড়ষফরবৎ রং ফবধফ.'
মিরমর্দান সত্যিই ছিলেন পলাশি যুদ্ধের সর্বাধিক সাহসী সৈনিক। মিরমর্দানের
মৃত্যুতে সিরাজ হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগের পূর্ব
মুহূর্তে নবাব প্রহরীকে বলে যান, সে যেন মোহনলালকে খবর দেয়, তিনি যেন
কয়েকজন ঘোড়সওয়ারের হেফাজতে মিরমর্দানের মৃতদেহ তক্ষুণি রাজধানীতে পাঠাবার
ব্যবস্থা করেন। উপযুক্ত মর্যাদার যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন মিরমর্দান।
|
|
➠ ক্লাইভ
ভূমিকা : বাংলার ইতিহাসের বড় কলঙ্কময় অধ্যায়ের সূচনা করেন বিদেশি বণিকের
অন্যতম কর্মকর্তা রবার্ট ক্লাইভ। বাংলার পতনের দিনে এ ভাগ্যান্বেষী ইংরেজ
কর্মচারী বাংলার স্বাধীনতা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন, বাংলার জনজীবনে সূচনা
করেছেন অপরিসীম দুর্গতি। তিনি ছিলেন বাংলার নবাবের বিরুদ্ধে অন্যতম
প্রধান চক্রান্তকারী। তারই কূট-কৌশলে বণিকের মানদণ্ড দেখা দিয়েছিল
রাজদণ্ডরূপে।
জোচ্চোর ও ষড়যন্ত্রকারী : যে কোনো রকম ছলনা, জোচ্চুরি এবং ঘৃণ্য কাজের
পাণ্ডা ছিলেন কর্নেল ক্লাইভ। মিরনের বাড়িতে ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন সভায়
ক্লাইভ আসেন ওয়াটসনকে সাথে নিয়ে রমণীর ছদ্মবেশে। ক্লাইভ ছিলেন বেপরোয়া
দুঃসাহসী। জুয়া খেলায় অভ্যস্ত ক্লাইভ নিজের জীবন বিপন্ন করেও সে বৈঠকে
অংশগ্রহণ করেন। সুচতুর ক্লাইভ পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলেন বাংলার নবাবের
সত্যিকারের কোনো ক্ষমতা নেই। তিনি ঠিকই জানতেন যে, নবাবের সেনাপতি
বিশ্বাসঘাতক। যার খাজাঞ্চি, দেওয়ান, আমির-ওমরাহ্ প্রত্যেকেই প্রতারক, তার
কোনো ক্ষমতা থাকতে পারে না। চতুর ক্লাইভ নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী
আমির-ওমরাহদের বিশ্বাস করতেন না। তাদের সাথে চলতে তিনি প্রতি পদক্ষেপে
সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি গোপন বৈঠকে রাজবল্লভকে খোলাখুলি বলেছেন,
তারা ইচ্ছে করলে ইংরেজের ক্ষতি করতে পারেন। বিশ্বাসহন্তারা সবই পারে।
তারা নবাবকে ডোবাচ্ছেন, কাল যে ইংরেজকে ডোবাবেন না তা বিশ্বাস করা কঠিন।
তিনি বরং নবাবকে বিশ্বাস করতে পারেন। স্বচ্ছ দৃষ্টির অধিকারীর পক্ষেই এ
মূল্যায়ন করা সম্ভব।
নীতিহীন : ক্লাইভ উমিচাঁদের চেয়েও নীতিহীন বুদ্ধিমান ছিলেন।
জাল-জুয়োচুরিতে পাকা ছিল তার হাত। তিনি মানুষ চিনতেন। তিনি নবাবের
বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক কর্মচারীদের যেমন চিনতেন, তেমনি চিনতেন প্রতারক
উমিচাঁদকে। তার মতে, উমিচাঁদ ছিল সে যুগের সেরা বিশ্বাসঘাতক। ক্লাইভ এ
ধূর্ত-বিশ্বাসঘাতককেও বিশ্বাসঘাতকতায় হার মানিয়ে পাগল বানিয়েছিলেন।
দেশ ও জাতির প্রতি বিশ্বস্ত : নবাবের কর্মচারীরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন,
প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন, নিজেদের স্বার্থের জন্য। কিন্তু ক্লাইভের
জালিয়াতি ও কূট-কৌশলের পিছনে লুকানো ছিল তার দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ
স্বার্থ। সেদিক থেকে তার স্থান এদের অনেক ওপরে। পলাশির যুদ্ধের আগে
মিরজাফরদের সাথে ক্লাইভের যে চুক্তি হয় তার মুসাবিদা করেন ক্লাইভ। সে
চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল সিরাজের পতনের পরে মিরজাফর নামেমাত্র নবাব হবেন।
কিন্তু রাজ্যশাসনের দায়িত্ব থাকবে কোম্পানির হাতে। ধরা পড়ে ধূর্ত ক্লাইভ
সাফাই গেয়েছেন, তারা শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের ঢ়ৎরারষবমব-টুকু ংবপঁৎবফ করে
নিচ্ছেন। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হতেই ক্লাইভ দলিল দুটো ফেরত নিয়ে যাবার
প্রস্তাব দেন। তখন বাংলার প্রতারকরা নরম হয়ে পড়েন।
দূরদৃষ্টি : মিরজাফর দলিলে সই করতে ইতস্তত করছেন দেখে ক্লাইভ তাকে ডড়সবহ-
দের চেয়েও ঈড়ধিৎফ বলে কাজ হাসিল করেন। ঈড়ধিৎফ- দের ওপর কোনো কাজের জন্যই
ভরসা করা যায় না। তাই দলিল সই করাতে তিনি নিজেই এসেছেন। মিরজাফর দলিলে
স্বাক্ষর দেবার পর এ ধূর্ত ইংরেজ প্রসন্ন মুখে বলেছিলেন, “আমরা এমন কিছু
করলাম যা ইতিহাস হবে।” তার সে ভবিষ্যদ্বাণী নিদারুণ ঐতিহাসিক সত্যে পরিণত
হয়েছে।
সতর্ক : অতিমাত্রায় সতর্ক ছিলেন এ ইংরেজ। পলাশির যুদ্ধের শেষে তিনি
সিরাজের শিবিরে প্রবেশ করে তাঁর প্রধান গুপ্তচর নারান সিংকে হত্যা করেন।
নবাব পলায়ন করেছেন শোনামাত্র তিনি মিরজাফরকে রাজধানী অভিমুখে যাত্রা করতে
নির্দেশ দেন। তিনি জানতেন সময় পেলে নবাব প্রস্তুতি গ্রহণ করে রুখে
দাঁড়াবেন। তিনি মিরজাফরকে অপদার্থ বলেই জানতেন। মিরজাফর যখন কৃতজ্ঞতায়
বিগলিত হয়ে বলেন, ক্লাইভের হাত ধরে বসতে না পারলে তিনি বাংলার মসনদে
বসবেন না, ক্লাইভ তখন মিরজাফরকে সেরা ঈষড়হি বলেই অভিহিত করেন। তবে এ
ধূর্ত ইংরেজ অনুগত প্রজার মতো নতুন নবাবকে নজরানা দেন। দরবারের লোকজনকে
আশ্বাস দিয়ে বলেন, আমাদের দেশে আবার শান্তি ফিরে এসেছে। নিজের ব্যক্তিগত
লাভের প্রতিও তার ছিল প্রখর দৃষ্টি। ষড়যন্ত্রের নায়ক হিসেবে তিনি পেলেন
নগদ একুশ লাখ টাকা আর বার্ষিক চার লাখ টাকা আদায়ের জমিদারি চব্বিশ পরগণার
স্থায়ী মালিকানা। এরপর শঠের চূড়ামণি রূপে তিনি উমিচাঁদকে তীর্থে গিয়ে
ঈশ্বরের নাম জপ করার পরামর্শ দেন।
বুদ্ধিমান : বুদ্ধিমান ক্লাইভ তার হাতের পুতুল নবাব মিরজাফরকে মসনদে
সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। কারণ তিনি জানতেন, এ লোভী ও অপদার্থ লোকটাকে
কলের পুতুল হিসেবে সামনে রেখে বাণিজ্যের নামে এ দেশের রাজদণ্ড হস্তগত করা
ইংরেজের পক্ষে খুবই সহজসাধ্য হবে। তাই তিনি মিরজাফরকে শক্ত হতে বলেছেন।
উপসংহার : সিরাজকে হত্যা করতে বাংলার কোনো কর্মকর্তাই চান নি। কিন্তু
ক্লাইভ তার জনপ্রিয়তার কথা জানতেন, ভবিষ্যতে বাংলার মানুষ যে-কোনো সময়
সিরাজের বন্ধন মুক্তি ঘটিয়ে ক্লাইভের কবল থেকে বাংলার শাসনব্যবস্থা আবার
ছিনিয়ে নিতে পারে, তার এমন আশঙ্কা ছিল। তাই তিনি মিরজাফরের অপদার্থ পুত্র
মিরনকে প্ররোচিত করেন সিরাজকে হত্যা করতে; সে মোহাম্মদি বেগকে দিয়ে
সিরাজকে হত্যা করায়। এভাবে ক্লাইভের কৌশলে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের
জীবনাবসান হয়।
|
|
➠ লুৎফুন্নেসা
ভূমিকা : নবাব সিরাজদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নেসা ছিলেন পতিগতপ্রাণা মহিয়সী
রমণী। তিনি ছিলেন রমণীসুলভ সরলতার মূর্তপ্রতীক, শত্রু-মিত্র চেনার মতো
প্রখর দৃষ্টি তাঁর ছিল না। নবাবের অফুরন্ত ভালোবাসার অমৃত সরোবরে নিশ্চিত
হৃদয়া স্বচ্ছন্দ বিহারিণী ছিলেন বেগম লুৎফুন্নেসা। আভিজাত্যের ঔদ্ধত্য বা
কূটনীতির বক্রতা তার চরিত্রে কখনও ছায়াপাত করে নি। মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট
অভিজাত মির্জা ইরাজ খাঁর কন্যা লুৎফুন্নেসা বাংলার পতন যুগের ইতিহাসে
সরলতা, পবিত্রতা ও পতিপ্রেমের জন্য স্মরণীয়া হয়ে আছেন।
শ্রদ্ধাবোধ : প্রাসাদে নিজের কক্ষে তিনি খালা শাশুড়ি ঘসেটি বেগমকে প্রবেশ
করতে দেখে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সালাম করে বলেন, তিনি তাকে মায়ের মতো
ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন। এ সরলা নবাব-পত্নী ঘসেটিকে এ কথাগুলো বলেন তাঁর
নিজের কক্ষে তাঁর ও আমিনা বেগমের সামনে সিরাজের বিরুদ্ধে ঘসেটির প্রচণ্ড
বিষোদগারের পরের মুহূর্তে। রাজনীতির কুটিল আবর্তের বাইরে সাধ্বী রমণীর
এসব উক্তির মধ্যে বিন্দুমাত্র কপটতা ছিল না।
বিশ্বস্ত : ঘসেটি বেগম সিরাজ সম্পর্কে অনেক অশ্রাব্য কটূক্তি করার পরও
লুৎফুন্নেসার স্বাভাবিক চরিত্র মাধুর্যের ওপর বিন্দুমাত্র ছায়াপাত ফেলে
নি। পতিগতপ্রাণা লুৎফুন্নেসা ধীর প্রশান্ত বাক্যে খালা শাশুড়ি ঘসেটিকে
নিশ্চিত আশ্বাস দিয়েছেন যে, নবাব তার কাছ থেকে যে-টাকা নিয়েছেন তা অবশ্যই
ফেরত দেবেন।
চিরন্তন বাঙালি নারী : সিরাজের সাথে ঘসেটি বেগমের যে-কথা কাটাকাটি হয়
ঘসেটি বেগম তাতে নিজেকে অপমানিত বোধ করেন। কথাটা তিনি সরলভাবে স্বামীকে
অবহিত করেছেন। সিরাজ তখন তাকে ঘসেটি বেগমের ষড়যন্ত্রের কথা বুঝিয়ে বলেন।
লুুৎফুন্নেসা তখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে স্বামীর কাছে ক্ষমা চান। নবাবের
শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি লুৎফুন্নেসার হৃদয় স্পর্শ করে। তিনি প্রস্তাব
করেছেন, নবাব সমস্ত দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে তার কাছে দুএকদিন যেন বিশ্রাম
করেন। লুৎফুন্নেসা স্বামীর বিশ্রাম কামনা করেছেন, ব্যাকুলভাবে চেয়েছেন
স্বামীকে নিজের কাছে একান্তভাবে পেতে। কিন্তু সেনাপতি মোহনলালের কাছ থেকে
জরুরি খবর পেয়ে নবাব দ্রুতপদে বেরিয়ে গেলেন লুৎফুন্নেসার কামরা থেকে।
দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে লুৎফুন্নেসার দুগাল বেয়ে। লুৎফুন্নেসার এ
চিরন্তনী নারী-মূর্তি সত্যিকার প্রশংসার দাবিদার।
প্রেরণাদাত্রী : পলাশির যুদ্ধ থেকে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে নবাব দরবারে
সমবেত জনগণকে শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে তাঁর পাশে দাঁড়াবার জন্য
ব্যাকুল আবেদন জানান। কিন্তু তার সে-আবেদনে কেউ সাড়া দেয় নি। সেনাপতি
মোহনলালের বন্দি হওয়ার সংবাদ শুনে নবাব যখন মর্মাহত, তখন সবাই দরবার থেকে
একে একে বেরিয়ে যায়। তখন হাতাশাপীড়িত অসহায় নিঃসঙ্গ নবাবের পাশে এসে
দাঁড়ান বেগম লুৎফুন্নেসা। তিনি স্বামীকে বলেন, ফাঁকা দরবারে বসে থেকে
কোনো লাভ নেই।
প্রকৃত জীবনসঙ্গিনী : লুৎফুন্নেসা ছিলেন নবাবের সত্যিকার জীবনসঙ্গিনী।
দুর্দিনের ঘনীভূত অন্ধকারেও তিনি স্বামীকে উৎসাহ দিয়েছেন, বলেছেন- ভেঙে
পড়া চলবে না। তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে দূরে নির্ভরযোগ্য বন্ধুদের কাছে গিয়ে
আশ্রয় নেবার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন নবাবকে, সেখান থেকে শক্তি সঞ্চয় করে
বিদ্রোহীদের শাস্তি বিধানের কথাও তিনি বলেছেন। স্বামীর নিরাপত্তার জন্য এ
সাধ্বী রমণী অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাই দেরি না করে প্রাসাদ
ত্যাগ করতে তিনি স্বামীকে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি নিজেও প্রাসাদে থাকতে রাজি
হননি। নবাব তাকে বলেছিলেন, মানুষের দৃষ্টি থেকে চোরের মতো পালিয়ে পালিয়ে
তাকে পথ চলতে হবে পাটনার পথে। লুৎফুন্নেসা সে কষ্ট সইতে পারবেন না।
প্রত্যুত্তরে পতিগতপ্রাণা রাজমহিষী লুৎফুন্নেসা বলেছিলেন, তিনি সে কষ্ট
সহ্য করতে পারবেন, তাকে পারতেই হবে এবং তিনি নবাবের সহগামিনী হয়েছিলেন।
উপসংহার : লুৎফুন্নেসা রমণী-রত্ন। বাংলার পতনের যুগে নারীত্ব যখন ধূলায়
লুণ্ঠিত, মানবতা ও মনুষ্যত্বের শেষ চিহ্ন পর্যন্ত যখন বিলুপ্ত, তখন
লুৎফুন্নেসা নারীত্বের জয় ঘোষণা করেছেন। তিনি চিরন্তন নারীত্বের অম্লান
প্রতীক।
|
|
➠ ঘসেটি বেগম
ভূমিকা : ঘসেটি বেগম নবাব আলিবর্দীর জ্যেষ্ঠা কন্যা। তার স্বামী ছিলেন
ঢাকার দেওয়ান। কিন্তু বিলাসী নবাব-জামাতা মুর্শিদাবাদ ছেড়ে আসতেন না। তার
অবর্তমানে ঢাকায় শাসনকার্য চালাতেন রাজা রাজবল্লভ। স্বামীর মৃত্যুর পর
ঘসেটি বেগম বাস করছিলেন মতিঝিলে নিজের প্রাসাদে। নিঃসন্তান ঘসেটি বেগম
নিজের পালিত পুত্র শওকতজঙ্গকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, অপুত্রক নবাব
আলিবর্দীর মৃত্যুর পরে অপদার্থ ভাংখোর শওকতকে নামেমাত্র বাংলার মসনদে
বসিয়ে নিজেই দেশ শাসন করবেন। তখন তার অনুগ্রহভাজন রাজা রাজবল্লভ বাংলার
শাসনকার্য চালাবেন তার হয়ে। কিন্তু নবাব আলিবর্দী মৃত্যুর আগে সিংহাসন
দিয়ে যান তাঁর যোগ্যতম দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলাকে। ফলে ঘসেটির লালিত স্বপ্ন
ব্যর্থ হয়ে যায়। তিনি সিংহাসন লাভেব্যর্থ হয়ে হিংস্র হয়ে ওঠেন সিরাজের
বিরুদ্ধে। অজস্র অর্থ ব্যয় করে ষড়যন্ত্র পাকিয়ে তোলেন নবাবের বিরুদ্ধে।
মিরজাফর, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ প্রমুখ প্রভাবশালী আমির-ওমরাহদের নিজের বাড়িতে
ডেকে এনে তিনি ষড়যন্ত্র করছিলেন শওকতজঙ্গকে বাংলার মসনদে বসাবার জন্য।
সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করতে শওকতকে যে-যুদ্ধ করতে হবে তা পরিচালনা করবেন
পরোক্ষে থেকে তিনি; তিনিই তাঁর ব্যয়ভার বহন করবেন; অর্থ দিয়ে, সৈন্য
দিয়ে, মৌখিক অনুমোদন দিয়ে শওকতের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন আমির-ওমরাহরা।
ষড়যন্ত্রকারী : এ ব্যাপারে শেষ সিদ্ধান্ত নেবার জন্য নাচ-গানের জলসার
আড়ালে গোপন বৈঠক হয় ঘসেটির মতিঝিল প্রাসাদে। দেউড়িতে কড়া পাহারা দেয়
সশস্ত্র প্রহরী। ঘসেটি বেগম সমবেত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শওকতকে নবাব করার
জন্য কে কী পুরস্কার চান তা জানতে চান। জগৎশেঠ বলেন, সিরাজের বিরুদ্ধে
শওকতজঙ্গকে তারা তো ইতোমধ্যে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েই দিয়েছেন। তবে শওকত নবাব
হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কী পাবেন তা তিনি স্পষ্টভাবে জানতে চান। তিনি
বলেন, শওকতজঙ্গ নবাবী পেলে বেগম সাহেবা ও রাজা রাজবল্লভের স্বার্থ যেমন
নির্বিঘœ হবে, অন্যদের তেমন কোনো আশা নেই। তাই তাদের পক্ষে নগদ কারবারই
তিনি ভালো মনে করেন। তিনি নগদ টাকা চান না, যুদ্ধের খরচ বাবদ টাকা তিনি
সাধ্য মতো দেবেন; কিন্তু আসল আর লাভ মিলিয়ে তাকে একটা কর্জনামা লিখে
দিলেই তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন। এভাবে যখন আলোচনা অগ্রসর হচ্ছিল, তখন
হঠাৎ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে তার গোপন বৈঠকের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখে
অসাধারণ বুদ্ধিমতী ঘসেটি বেগম মনের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
হীনবুদ্ধি নারী : ঘসেটির বুকে কঠিন আঘাত হেনে নবাব তাঁর খালাআম্মা ও
উপস্থিত সবাইকে জানিয়ে দেন, তিনি শওকতজঙ্গকে বিদ্রোহী ঘোষণা করে তাকে
শায়েস্তা করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন। তিনি নিজে এসেছেন তাঁর
শ্রদ্ধেয়া খালাআম্মাকে নিজের প্রাসাদে নিয়ে যেতে। বুদ্ধিমতী নারী বুদ্ধির
খেলায় নিজের কোলে-পিঠে মানুষ করা বোনপোর কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়ে
হতাশায় ভেঙে পড়েন। ক্ষোভে-দুঃখে তিনি পাগলিনী হয়ে যান। তিনি মুখের খোলস
ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে প্রকাশ্যে উপস্থিত ওমরাহদের সাহায্য কামনা করেন। তিনি
একজন অসহায় বিধবা। তার ওপর সিরাজ ওভাবে অত্যাচার করছে জানিয়ে তিনি
রাজবল্লভ, জগৎশেঠ প্রমুখ ব্যক্তিদের সাহায্য কামনা করেন। দুঃখে, হতাশায়,
আশা ভঙ্গের বেদনায় রমণী সিরাজকে অভিশাপ দেন। তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এ
উচ্চাভিলাষী রমণীর সকল আশার সমাধি রচনা করে নবাবের আদেশে মোহনলাল তাকে
সসম্মানে নিয়ে যান নবাবের প্রাসাদে, নবাব-জননী তার ছোটবোন আমেনা বেগম আর
নবাব মহিষী লুৎফুন্নেসার কাছে।
উচ্চাভিলাষী : ঘসেটি বেগম ছিলেন উচ্চাভিলাষী, বাংলার শাসনকার্যে কর্তৃত্ব
লাভের জন্য অতিমাত্রায় উৎসাহিনী। তার উচ্চাভিলাষ পূরণের পথে একমাত্র
অন্তরায় সিরাজের উচ্ছেদ সাধনে তিনি বদ্ধপরিকর। লুৎফুন্নেসার সশ্রদ্ধ
সালামের প্রত্যুত্তরে এই ঈর্ষাপরায়ণা রমণী তাঁকে প্রাণ খুলে আশীর্বাদ
করতে পারেন নি। বলেছেন, তাকে সুখী ও সৌভাগ্যবতী হবার দোয়া করলে তা তার
নিজের পক্ষে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি সিরাজের সর্বনাশ কামনা করেন,
বাংলার সিংহাসন থেকে তাঁকে বিতাড়িত করবার জন্য তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত
চেষ্টা করেন। অথচ- ছেলেবেলায় সিরাজকে তিনিই কোলেপিঠে করে মানুষ করেছিলেন,
সিরাজ জননী সে-কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি তাঁকে বলেন, “অদৃষ্টের পরিহাস
তাই ভুল করেছিলাম। যদি জানতাম বড় হয়ে সে একদিন আমার সৌভাগ্যের অন্তরায়
হবে, যদি জানতাম অহরহ সে আমার দুশ্চিন্তার একমাত্র কারণ হয়ে দাঁড়াবে,
জীবনের সমস্ত সুখ শান্তি সে গ্রাস করবে রাহুর মতো, তাহলে দুধের শিশু
সিরাজকে প্রাসাদ চত্বরে আছড়ে মেরে ফেলতে কিছুমাত্র দ্বিধা করতাম না।”
উপসংহার : ঘসেটি বেগম ঈর্ষা করতেন সিরাজকে এবং সে কারণে তার ঈর্ষার আগুনে
তিনি দগ্ধ করেছেন আমিনা বেগমকে, নবাব মহিষী লুৎফুন্নেসাকে। সিরাজ বাংলার
নবাব আর তিনি তাঁর প্রজা- এ ধারণাটা তার কাছে ছিল একান্ত অসহ্য। নবাব
তাকে নিজের প্রাসাদে এনে আবদ্ধ করে রেখেছেন, দেশের অশান্তি দূর না হওয়া
পর্যন্ত বাইরের কারও সাথে যাতে তিনি যোগাযোগ করতে না পারেন সে ব্যবস্থা
করেছেন। নবাবের এ ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ সময়োপযোগী, কিন্তু ঘসেটি বেগম
তাতে ভীষণ ক্ষুব্ধ। নিজের ঈর্ষার আগুনে তিনি জ্বলে-পুড়ে মরেছেন, নবাব আর
তার স্নেহময়ী জননী আর প্রেমময়ী পত্নীকে পুড়িয়ে মেরেছেন, বাংলার ভাগ্যও সে
আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। বাংলার সমকালীন ইতিহাসে ঘসেটি বেগম ছিলেন
মূর্তিমতী অভিশাপ।
|