মুক্তি- অ্যালেক্স হ্যালি
|
| মুক্তি |
মুক্তি
অ্যালেক্স হ্যালি
অনুবাদ: গীতি সেন
সকালের খাবার দেবার পর দুজন সাদা মানুষ একবোঝা জামা-কাপড় হাতে ঘরে ঢুকল। ভীত বন্দিদের বাঁধন খুলে দিয়ে সেগুলো কী করে পরতে হয় দেখিয়ে দেওয়া হলো। একটা বস্ত্রে পা থেকে কোমর পর্যন্ত, অন্য একটায় ঊর্ধ্বাঙ্গ ঢাকতে হয়। কুন্টার ঘাগুলো সেরে এসেছিল। জামা-কাপড় পরামাত্র সেগুলো চুলকাতে শুরু করল। বাইরে লোকজনের কথাবার্তার কোলাহল ক্রমে বাড়ছিল। ক্রমশই লোক জমছিল। কুন্টারা জামাকাপড় পরে বিমূঢ় হয়ে বসেছিল-কী জানি এর পরে কপালে কী আছে!
সাদা মানুষ দুটো ফিরে এসে প্রথমে রাখা বন্দিদের মাঝে তিনজনকে বার করে নিয়ে গেল। তারপরেই বাইরের আওয়াজের ধরনটা বদলে গেল। কুন্টা অবাক হয়ে কতকগুলো অবোধ্য চিৎকার শুনছিল।
‘নিখুঁত স্বাস্থ্য। অফুরন্ত কর্মশক্তি।’
‘তিনশো পঞ্চাশ!’
‘চারশো!’
প্রথম সাদা মানুষটির চিৎকার শোনা গেল, ‘ছয়! কে ছয় বলবেন? তাকিয়ে দেখুন। দুর্দান্ত কর্মক্ষমতা!’
কুন্টা ভয়ে শিউরে উঠছিল। তার মুখ বেয়ে দরদর করে ঘাম বারছিল। নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল। যখন চারজন সাদা মানুষ ঘরে ঢুকল-সে যেন অসাড়। কুন্টাকে স্পর্শ করতে সে রাগে ভয়ে দাঁত খিঁচিয়ে উঠল।
তখনই মাথায় একটা প্রবল আঘাত পেয়ে তার বোধশক্তি লুপ্ত হয়ে গেল। সচেতন হয়ে উঠতে দেখতে পেল-উজ্জ্বল দিবালোকে আরো দুজনের সঙ্গে সেও বাইরে লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে শত শত সাদা মানুষ হা-করে তাকিয়ে আছে। তারই মাঝে দুটো কালো মানুষ শিকল হাতে দাঁড়িয়ে। মুখের ভাব দেখে মনে হয়, পারিপার্শ্বিক অবস্থা অবস্থা সম্পর্কে তারা একান্ত উদাসীন। চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত, লক্ষ্যহীন।
‘সদ্য গাছ থেকে পেড়ে আনা।’
‘বাঁদরের মতো তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন!’
‘সবকিছু শিখিয়ে নেওয়া যাবে!’
সাদা মানুষটা পায়চারি করতে করতে হাত নেড়ে কুন্টার আপাদমস্তক নির্দেশ করে কথাগুলো চিৎকার করে বলছিল। তারপর কুন্টাকে জোর করে ঠেলে সামনে একটা বেদির মতো উঁচু জায়গায় ওঠাল।
‘একেবারে সরেস। নিজের ইচ্ছামতো গড়ে নেওয়া যাবে!’
কুন্টা ভয়ে হতবুদ্ধি হয়ে লক্ষও করেনি কখন চারদিকের লোকজন এগিয়ে এসে তার সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে পরীক্ষা করছে।
‘তিনশো ডলার!’-‘তিনশো পঞ্চাশ!’
‘পাঁচশো!’ ‘ছয়!’
সাদা মানুষটা ক্রুদ্ধ গর্জনে বলে উঠল-‘বাজারের সেরা। তরুণ যুবা। কেউ কি সাড়ে সাত বলবেন?’
একজন চেঁচিয়ে উঠল-
‘সাড়ে সাত!’
‘আট! আট!’
ডাক উঠল-‘আট!’ আর কেউ কিছু বলে ওঠার আগেই আবার শোনা গেল-‘সাড়ে আট।’
ডাক আর চড়ল না।
যে সাদা মানুষটা এদিক থেকে চেঁচাচ্ছিল, সে কুন্টার শিকল খুলে নিয়ে তাকে সামনে একজনের দিকে ঠেলে দিল। এই নতুন সাদা মানুষটার পেছনে একজন কালো লোক। শিকলের প্রান্তটা তারই হাতে দেওয়া ছিল। তার প্রতি কুন্টার অনুনয়পূর্ণ চাহনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। সে লক্ষ্যহীন নির্বিকার দৃষ্টিতে কুন্টাকে শিকলসুদ্ধ টেনে একটা চার চাকার বাক্সের সামনে নিয়ে এল। বাক্সটার সামনে একটা বিরাট গাধাজাতীয় পশু। কালো লোকটা রূঢ়ভাবে কুন্টাকে বাক্সের মেঝেতে ঠেলে ফেলে দিয়ে শিকলটা কোথায় আটকে দিল। কিছুক্ষণ পরে কুন্টা গন্ধে অনুভব করল- সাদা মানুষটা ফিরে এসেছে। সে গাড়ির ওপরে চড়ে বসতে, কালো লোকটিও সামনের সিটের মাথায় উঠে বসে একটা চামড়ার ফিতে পশুটার পিঠে আছড়ে ফেলল। অমনি বাক্সটা গড়িয়ে চলতে শুরু করল।
কুন্টা শিকলটা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল। বড়ো ক্যানুতে তাদের যে শিকল দিয়ে বাঁধা হয়েছিল, তার থেকে এটা হালকা ধরনের। প্রাণপণে চেষ্টা করলে কি ছেঁড়া যাবে না? কিন্তু এখন গাড়ি থেকে লাফাবার উপযুক্ত সময় নয়।
কুন্টা একবার মাথা তুলে সাদা মানুষটার দিকে তাকাল। সেই মুহূর্তে সেও পেছন ফিরে তাকাতে তাদের চোখাচোখি হয়ে গেল। ভয়ে কুন্টার দেহ হিম। কিন্তু সাদা মানুষটার মুখে ভাবের লেশমাত্র ছিল না।
পথের ধারে বিস্তৃত শস্যক্ষেত্র। বিভিন্ন রঙের শস্য দেখা যাচ্ছে। তার মাঝে ভুট্টা সে চিনতে পারল। জুফরেতে ফসল কাটবার সময় যেমন দেখতে হয়, তেমনি। খানিকক্ষণ পর সাদা মানুষ এবং কালোটি দুজনেই শুকনো রুটি আর মাংস বের করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে লাগল। কুন্টার খুবই খিদে পেয়েছিল। খাদ্যের সুগন্ধে তার জিভে জল এসে গেল। তবুও সামনের কালো লোকটি যখন পেছন ফিরে তাকে এক টুকরো রুটি দিতে চাইল, সে তার মুখ ফিরিয়ে নিল।
সূর্য অন্ত যাচ্ছিল। তাদের গাড়ির পাশ দিয়ে আর একটি গাড়ি বিপরীত দিকে ছুটে গেল। গাড়িটির পেছনে চরম ক্লান্তিভরে দ্রুত পদক্ষেপে চলছিল মোটা কাপড়ের পুরোনো ছেঁড়া পোশাক-পরা সাতটি কালো মানুষ। তাদের মুখে গভীর হতাশার ছাপ। ক্রমে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে কুন্টাদের গাড়িটা পাশের ছোটো রাস্তায় ঢুকে পড়ল। দূরে গাছের ফাঁকে একটা বিরাট সাদা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। এবার কী হবে? এখানেই কি তাকে হত্যা করে খাওয়া হবে?
বাড়িটার কাছে এসে কুন্টা আরো কালো মানুষের গন্ধ পেল। অন্ধকারের ভেতর তিনটি মানুষের আকার বোঝা যাচ্ছিল। একজনের হাতে আলো ঝোলানো। বড়ো ক্যানুর অন্ধকার খোলের ভেতর এ ধরনের আলো কুন্টা দেখেছে। কেবল এটার চারপাশে একটা স্বচ্ছ চকচকে আবরণ, তার ভেতর দিয়ে অবশ্য স্পষ্ট দেখা যায়। কালো লোকগুলোর পাশ দিয়ে একটা সাদা মানুষ এগিয়ে এল। গাড়িটা থেমে যেতে একজন আলোটা উঁচু করে ধরল। ভেতরের সাদা মানুষটা নেমে এসে নতুন লোকটার সঙ্গে করমর্দন করল। তারপর দুজনে হাসিমুখে বাড়ির দিকে চলে গেল।
কুন্টার মনে একটু আশা হলো। এবার কালো লোকেরা তাকে ছেড়ে দেবে না? কিন্তু এ কেমন কালো লোক? তারা তাকে দেখে বিদ্রূপের হাসি হাসছে! নিজের স্বজাতির লোক নিয়ে এরা পরিহাস করছে? ছাগলের মতো সাদা মানুষের হুকুমে কাজ করে? এদের আফ্রিকাবাসীর মতো দেখাচ্ছে বটে, কিন্তু এরা কখনো তা হতে পারে না। গাড়িটা কুন্টাকে নিয়ে এগিয়ে গেল। অন্য কালো লোকগুলো হাসাহাসি করতে করতে পাশে পাশে চলল। কিছুদূর গিয়ে গাড়িটা থামতে, চালক নেমে এসে শিকলের অপর প্রান্ত খুলে বুঢ় ভঙ্গিতে টান মেরে কুন্টাকে নামতে ইঙ্গিত করল।
লোকগুলো জোর করে তাকে নামাল। তারপর একটা খুঁটির সঙ্গে শিকলটা আবার বেঁধে দিল। কুন্টা দৈহিক যন্ত্রণা, ত্রাস, ক্রোধ ও ঘৃণাতে কাতর হয়ে সেখানে পড়ে থাকল। একজন তার সামনে এক পাত্র জল ও এক পাত্র খাদ্য নামিয়ে রাখল। খাদ্যটা যেমন অদ্ভুত দেখতে, তেমনি অদ্ভুত তার গন্ধ। তবুও তা দেখেই কুন্টার রসনা লালায়িত হয়ে উঠল। কিন্তু কুন্টা মুখ ফিরিয়েই থাকল। কালো লোকগুলো তা দেখে আবারও বিদ্রূপের হাসি হাসল। গাড়ির চালক আলোটা তুলে ধরে মোটা খুঁটির কাছে গিয়ে শিকলটা জোরে টেনে কুন্টাকে দেখিয়ে দিল-ওটা ছেঁড়া যাবে না। তারপর খাবারের দিকে ইঙ্গিত করে শাসানির ভঙ্গি করল। সবাই হাসতে হাসতে চলে গেল।
কুন্টা অপেক্ষা করতে লাগল-কখন সবাই ঘুমোবে, কখন সে পালাবার সুযোগ পাবে। এরই মধ্যে একটা কুকুর এসে তার খাবারের পাত্র খালি করে দিয়ে গেল। রোষে কুন্টার সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল। সে খানিকটা জলপান করে নিল। কিন্তু তাতে শারীরিক অবস্থার বিশেষ উন্নতি হলো না।
পালাবার অদম্য ইচ্ছা অতি কষ্টে দমন করে সারারাত সে জেগে কাটাল। সে জানে শিকল ভাঙবার চেষ্টা করলেই ঝনঝনানির শব্দে পাশের কুটিরের লোক ছুটে আসবে। ইতোমধ্যেই কুকুরের ডাকে গাড়ির চালকটি একবার বেরিয়ে এসে শিকল পরীক্ষা করে গিয়েছে।
পুবের আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছিল। কুন্টা আর একটু জল পান করল। এমন সময় সেই কালো লোক চারটে দ্রুত পায়ে এসে কুন্টাকে টেনে তুলে আবার সেই গড়ানো বাক্সের মতো গাড়িটাতে চড়ে বসল। তারপর গাড়ি বড় রাস্তা দিয়ে আগের দিনের মতই চলল। কুন্টার দুই চক্ষু অপরিসীম ক্রোধ ও ঘৃণায় সামনের মানুষগুলোর পিঠের ওপর অগ্নিবর্ষণ করতে থাকল। যদি এদের খুন করা যেত। কিন্তু বুদ্ধি স্থির রাখতে হবে। মাথা গরম করলে চলবে না। অযথা শক্তি ক্ষয় করে লাভ নেই।
কিছু দূর গিয়ে ঘন বন দেখা গেল। কতক জায়গায় গাছ কেটে জঙ্গল সাফ করা হয়েছে। আবার কিছু জায়গায় জঙ্গল পোড়ানো হচ্ছে। ধূসর বর্ণ ধোঁয়ার রাশি উঠছিল। সাদা মানুষরাও কি জুফরের মতো গাছপালা পুড়িয়ে জমির ফলন শক্তি বৃদ্ধি করে?
আরো খানিকটা দূরে কাঠের তৈরি একটি ছোট্ট চৌকো কুটির, আর তার সামনে পরিষ্কার একখণ্ড জমি। একটা ষাঁড়ের পেছনে বাঁকানো হাতলওয়ালা কী একটা মস্ত জিনিস। একজন সাদা মানুষ হাতল দুটো চেপে ধরেছে। তাতে পেছনের মাটি বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আরো দুটো রোগামতন সাদা মানুষ গাছের নিচে উবু হয়ে আছে। তিনটে রোগা-পটকা শুয়োর আর কিছু মুরগি চারপাশে ছুটোছুটি করছে। কুটিরের দরজায় একটি লাল চুলের সাদা মেয়ে মানুষ। তিনটে সাদা বাচ্চা খেলে বেড়াচ্ছিল। তারা গাড়িতে কুন্টাকে দেখে হাত নেড়ে চেঁচাতে লাগল। কুন্টার ভাব দেখে মনে হলো সে হায়েনা শিশু দেখছে। এতদিনে সে সত্যি একটি সাদা মানুষের পুরো পরিবার দেখতে পেল। পথে যেতে যেতে আগেকার মতো আরো দুটি মন্ত সাদা বাড়ি দেখা গেল। প্রত্যেকটির ওপর দিকে একটার ওপর আর একটা চাপানো-দুটো বাড়ির সমান। প্রত্যেকটিরই কাছাকাছি বেশ কিছু ছোটো ছোটো অন্ধকার কুটির। কুন্টা আন্দাজ করল-সেগুলোতেই কালো লোকেদের বাস। আর চারপাশ ঘিরে বিস্তীর্ণ তুলোর খেত। অল্পদিন আগে ফসল তোলা হয়েছে। তখনও গোছা-গোছা তুলো চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো।
পথে কুন্টা আর একটি অদ্ভুত জিনিসের দেখা পেল। রাস্তার ধার দিয়ে দুজন বিচিত্রদর্শন লোক যাচ্ছিল। প্রথমে সে ভেবেছিল-তারা বুঝি কালো। কাছাকাছি আসতে দেখা গেল তাদের গায়ের রং কেমন লালচে বাদামি। দীর্ঘ কালো চুল দড়ির মতো পাকানো হয়ে পেছনে ঝুলছে। হালকা জুতো পায়ে, কোমরে সম্ভবত চামড়ার তৈরি এক ধরনের আচ্ছাদন ঝুলিয়ে লোক দুটো দ্রুত পায়ে হাঁটছিল। সঙ্গে তির-ধনুক। তারা সাদা মানুষ নয়। আবার আফ্রিকাবাসীও নয়। তাদের গায়ের গন্ধই আলাদা। গাড়ি দেখে তারা ভ্রূক্ষেপও করল না।
পুরো দুদিন উপবাসের পর কুন্টার দুর্বল লাগছিল। চারিদিকে কী ঘটছে সে বিষয়ে তার আর উৎসাহ ছিল না। কিছু সময় পরে গাড়ির চালক বাক্সের পাশে একটা আলো ঝুলিয়ে দিল। আবার খানিকটা পর সাদা মানুষটা কী যেন বলাতে গাড়ির চালক কুন্টার দিকে একটা চাদর ছুঁড়ে দিল। নিজেরাও গায়ে চাদর জড়িয়ে নিল। কুন্টা শীতে কাঁপছিল। কিন্তু ওদের দেওয়া চাদর সে কিছুতেই ব্যবহার করবে না। তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে আবার গায়ের চাদর দেবার বদান্যতা কেন? কালো লোকটাকেও বলিহারি! সে-ই অগ্রণী হয়ে সাদা মানুষটাকে এসব কাজে সাহায্য করছে! কুন্টাকে পালাতেই হবে। না-হয় সে চেষ্টাতে তার প্রাণটাই যাবে। জীবনে আর কখনো জুফরে দেখবার সৌভাগ্য হবে না। যদি হয়, তবে সে গাম্বিয়ার ঘরে ঘরে সাদা মানুষের এই অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতার কাহিনি বলবে।
গাড়িটা বড়ো রাস্তা থেকে এবার একটা ছোটো রাস্তায় ঢুকল। দূরে আর একখানা ভূতুড়ে সাদা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। আজ রাত্রে আবার কপালে কী আছে কে জানে। কুন্টা বাড়ির সামনে পৌঁছেও সাদা বা কালো মানুষের কোনো চিহ্ন বা গন্ধ পেল না। সাদা মানুষটা গাড়ি থেকে নেমে কয়েকবার আড়মোড়া ভেঙে শরীরের আড়ষ্টতা কাটিয়ে নিল। তারপর সে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। গাড়িটা আরো খানিকটা এগিয়ে একটা কুটিরের সামনে দাঁড়াল। গাড়ির চালক কোনোক্রমে নিজেকে ওপর থেকে নামিয়ে নিল। বাতিটা হাতে নিয়ে অতি কষ্টে পা টেনে টেনে ঘরের দিকে রওয়ানা দিয়ে কী যেন ভেবে ফিরে এল। গাড়ির সিটের নিচে হাত বাড়িয়ে শিকলটা খুলে নিয়ে সে আবার যাবার উপক্রম করল। কুন্টা সঙ্গে আসবে না দেখে শিকল ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে তার উদ্দেশ্যে ক্রুদ্ধ স্বরে কিছু বলে উঠল। মুহূর্তে কুন্টা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রচণ্ড পরাক্রমে হায়নার শক্তিশালী চোয়ালের মতো কঠিন হাতে তার কণ্ঠনালি টিপে ধরল। বাতিটা মাটিতে পড়ে গেল। কালো লোকটার গলা দিয়ে একটা অবরুদ্ধ আওয়াজ বেরোল। সে তার বলিষ্ঠ দুই হাতে কুন্টার মুখে ও বাহুতে যথাসাধ্য আক্রমণ চালাল। কিন্তু কুন্টার গায়ে তখন অযুত হাতির বল। সে নিজের শরীর বাঁকিয়ে শত্রুর ঘুষি, হাঁটুর গুঁতো, পায়ের লাথি এড়াবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হাতের চাপ শিথিল হতে দেয়নি। অবশেষে লোকটার গলায় একটা ঘরঘর শব্দ হতে থাকল। তার শক্তিহীন নিঃসাড় দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
কুন্টা ভূলুণ্ঠিত দেহ আর উলটে-পড়া বাতির কাছ থেকে দ্রুতবেগে সরে গেল। খেতের অসমান কর্কশ জমির ওপর দিয়ে সে নিচু হয়ে দৌড়াতে লাগল। এতদিনের অব্যবহারে শরীরের পেশিগুলো যন্ত্রণায় প্রচণ্ড আর্তনাদ করছিল। কিন্তু ঠান্ডা হাওয়াতে তার আরাম বোধ হচ্ছিল। আর মুক্তির আনন্দে সর্বদেহ মন আতশবাজির মতো ফেটে পড়তে চাইছিল।
| ‘মুক্তি’ গল্পের উৎস নির্দেশ : |
|---|
| ‘মুক্তি’ গল্পটি আলেক্স হ্যালির ‘Roots’ উপন্যাসের অংশবিশেষের অনুবাদ। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের শব্দার্থ ও টীকা : |
|---|
|
➠ ঊর্ধ্বাঙ্গ- শরীরের ওপরের অংশ। ➠ বিমূঢ়- হতবুদ্ধি, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ➠ রুদ্ধ- বন্ধ। ➠ দিবালোক- দিনের আলো। ➠ পারিপার্শ্বিক অবস্থা- চারপাশের অবস্থা। ➠ নির্লিপ্ত- কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ নেই এমন। ➠ আপাদমস্তক- পা থেকে মাথা পর্যন্ত। ➠ সরেস- খাঁটি। ➠ অনুনয়- অনুরোধ। ➠ ক্যানু- নৌকা-জাতীয় জলযান। ইংরেজি Canoe. ➠ শাসানো- ভয় দেখানো। ➠ রোষ- ক্ষোভ। ➠ প্রত্যুষ- ভোর। ➠ আন্দাজ- অনুমান। ➠ বিচিত্রদর্শন- দেখতে উদ্ভট। ➠ আচ্ছাদন- আবরণ। ➠ ভ্রূক্ষেপ- তাকানো বা লক্ষ করা। ➠ উপবাস- না-খেয়ে থাকা। ➠ বদান্যতা- উদার, দরদি ভাব। ➠ বলিহারি- চমৎকার। ➠ অগ্রণী- প্রধান নেতা, শ্রেষ্ঠ। এখানে 'আগ বাড়িয়ে' অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ➠ আড়মোড়া- আলস্য ভাব। ➠ আড়ষ্টতা- জড়তা। ➠ পরাক্রম- বল, বীরত্ব। ➠ ভূলুণ্ঠিত- মাটিতে পড়ে যাওয়া। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব : |
|---|
|
‘মুক্তি’ গল্পাংশে আফ্রিকার গাম্বিয়া নামক দেশের একটি গ্রাম জুফরে। কুন্টা সেই গ্রামের অধিবাসী। কালো এই মানুষটিকে ধরে নিয়ে এসেছে সাদা আমেরিকানরা। দাস হিসেবে তাকে বিক্রি করা হবে। পোশাক পরিয়ে পরিপাটি করে দাস বাজারে তাকে বিক্রি করা হলো সাড়ে আটশ ডলারে। কুন্টা তরুণ, যুবক। বাজারে তার মূল্য বেশি। কেননা তাকে দিয়ে সব কাজ করিয়ে নেয়া যাবে। ভালো দাম দিয়ে কিনে নিয়ে গেল এক সাদা লোক। কুন্টার সঙ্গে তারা খুব দুর্ব্যবহার করল, অপমান করল। সে দেখতে পেল তার মতোই অনেক কালো আছে দাসবাজারে কিংবা সাদা মানুষদের বাড়িতে। সাদাদের জন্য কাজ করছে। কুন্টার মনের ভেতর শুধু পালাবার ইচ্ছা। সুযোগের অপেক্ষায় থাকল সে। তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সাদা লোকদের কোনো এক বাড়িতে। রাত্রিবেলা পৌঁছল সেই বাড়ি। সাদা লোকটি যখন গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল তখন সে ঝাঁপিয়ে পড়ল গাড়িচালকের ওপর। প্রচণ্ড আক্রোশে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করল তাকে। লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। পালিয়ে গেলো কুন্টা। তার শরীর ও মনে তখন মুক্তির প্রবল আনন্দ। আফ্রিকার ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল যখন সাদারা কালোদের বন্দি করে বিভিন্ন দেশের দাস-বাজারে বিক্রি করত। ‘মুক্তি’ গল্পটিতে দাসব্যবসার একটি প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়েছে। এ গল্পে তরুণ কুন্টা তার বুদ্ধি, সাহস ও শক্তি দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছে। গল্পটিতে জাতিগত ও বর্ণগত নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবার তীব্র বাসনারই প্রকাশ ঘটেছে। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের লেখক পরিচিতি : |
|---|
| আলেক্স হ্যালি একজন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখক। তিনি জন্মেছেন ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে। ‘Roots’ বইটির জন্যই মূলত তাঁর বিশ্বজুড়ে খ্যাতি। এই উপন্যাসের গল্প নিয়েই পরবর্তীকালে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজ। হ্যালি মারা যান ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের অনুবাদক-পরিচিতি : |
|---|
| গীতি সেনের জন্ম কুমিল্লায়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশভাগের পর সপরিবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। ‘শেকড়ের সন্ধানে’ তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদকর্ম। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. কুন্টার প্রতি সাদা লোকের আচরণ ছিল একেবারে অমানবিক ও নৃশংস। কুন্টাকে তারা শুধু একটি বস্তু হিসেবে দেখছিল, যেটি তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানোর জন্য তৈরি। কুন্টার শারীরিক অবস্থার অবনতির মধ্যেও তারা তাকে কিছুতেই ছাড় দেয়নি। তারা তার শরীরে হাত বুলিয়ে যাচ্ছিল, যেন কোনো মূল্যবান সম্পত্তি কিনছে। এর মাধ্যমে তারা কুন্টাকে শিকল দিয়ে বেঁধে এবং পরিক্ষার মাধ্যমে দেখছিল, কতটা শক্তিশালী বা সক্ষম সে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কুন্টাকে একটি পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা এবং তার শ্রমের মাধ্যমে লাভবান হওয়া। সাদা লোকেরা কুন্টার মানবিক দিকটি মোটেও মূল্যায়ন করেনি, বরং তারা তাকে শুধু তাদের দাস হিসাবে বিবেচনা করছিল, যার কাজ হলো তাদের নির্দেশ অনুসরণ করা এবং তাদের জন্য কঠোর পরিশ্রম করা। এতে দাসব্যবস্থার নির্মমতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কুন্টার প্রতি তাদের আচরণ ছিল এক প্রকার শোষণ ও অমানবিকতা, যা তাকে শোষিত, নিঃস্ব এবং অপমানিত অনুভব করানোর উদ্দেশ্য ছিল।
খ. কুন্টা শারীরিক যন্ত্রণা ও কঠোর শিকলবদ্ধ জীবনের মধ্যে মানসিকভাবে শক্তি সঞ্চয় করেছিল তার অবিচলিত মনোবল এবং নিজের স্বাধীনতা লাভের আকাক্সক্ষার মাধ্যমে। যতই তার শরীর ক্লান্ত হয়ে যাক, যতই সে শারীরিকভাবে নিঃশেষ হয়ে পড়–ক, কুন্টার মনে ছিল একমাত্র লক্ষ্য—তার মুক্তি। তার শরীর যদি তাকে বাধা দেয়, তবে মন তার শক্তি বাড়িয়ে তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেত। কুন্টা জানত যে, তার শারীরিক দাসত্ব আর দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে না যদি তার মনোবল ঠিক থাকে। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. কুন্টা তার শিকল ছিঁড়ে পালানোর চিন্তা করেছিল কারণ সে জানত যে, তার দাসত্বের জীবন কোনোদিনই শেষ হবে না যদি সে নিজের আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতা রক্ষা না করে। দাস হিসেবে সে মানবিক মর্যাদাহীন, অপমানিত এবং নিঃস্ব ছিল। তার জন্য জীবন ছিল এক অনিত্য দাসত্বের জীবন, যেখানে কোনো স্বাধীনতা ছিল না। কুন্টা তার শিকল ছিঁড়ে পালানোর মাধ্যমে কেবল নিজের শারীরিক অঙ্গ থেকে মুক্তি চায়নি, বরং তার মন থেকে দাসত্বের শৃঙ্খলও ভাঙতে চেয়েছিল। তার মনে ছিল শক্তিশালী ইচ্ছাশক্তি এবং স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা, যা তাকে শিকল ছিঁড়ে পালানোর জন্য প্রেরণা দিয়েছিল।
খ. ‘মুক্তি’ গল্পে কুন্টার দৃঢ় মানসিকতা এবং ইচ্ছাশক্তির অসীম দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে। কুন্টা তার শারীরিক দাসত্বের মধ্যে একদিনও নিজের আত্মমর্যাদা হারায়নি। সে জানত, যতই তাকে নির্যাতন করা হোক না কেন, তার মনের শক্তি এবং আত্মবিশ্বাস অটুট থাকতে হবে। তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তার দৃঢ় মনোবল। সাদা মানুষের অমানবিক নির্যাতন এবং শারীরিক আঘাতেও কুন্টা কখনো নিজের সংকল্প ও ইচ্ছাশক্তি হারায়নি। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৩: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. কুন্টার মুক্তির তীব্র আকাঙ্খার পেছনে তার পূর্বজীবনের স্মৃতিগুলি বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। কুন্টা একসময় ছিল স্বাধীন এবং সম্মানিত একটি জাতির সদস্য, কিন্তু তাকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়। তার পূর্বজীবনের স্মৃতি ছিল ভীষণ প্রিয় ও মূল্যবান, কারণ সে একটি স্বাধীন জীবন যাপন করেছিল, যেখানে তার মর্যাদা, অধিকার, এবং জীবনধারণের স্বাধীনতা ছিল। এই স্মৃতিগুলো তার মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য শক্তি তৈরি করেছিল, যা তাকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে থাকতে দেয়নি। কুন্টার মধ্যে তার পূর্বজীবনের স্মৃতি ছিল তার সাহস এবং আত্মসম্মান হারানোর মূল কারণ।
গ. ‘মুক্তি’ গল্পের মাধ্যমে গল্পকার দাসত্বের বিরুদ্ধে এক গভীর এবং শক্তিশালী বার্তা দিয়েছেন। গল্পটির মূল বিষয় হল একজন মানুষের মানবাধিকার, মর্যাদা, এবং স্বাধীনতার প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও আগ্রহ। কুন্টার দাসত্বের শিকলে বন্দী হওয়ার পরেও তার মাঝে যে মানসিকতা এবং ইচ্ছাশক্তি গড়ে ওঠে, তা সমাজে অমানবিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিরোধের চিত্র। দাসত্ব, যা শারীরিক দমন-পীড়নের পাশাপাশি মানসিকভাবে একজন মানুষের আত্মসম্মান এবং স্বাধীনতাকে হরণ করে, গল্পকার তা তুলে ধরেছেন। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৪: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. গল্পের প্রেক্ষাপটে যখন কুন্টা বন্দি অবস্থায় শিকলে বাঁধা ছিল, তখন তাকে বিক্রি করার জন্য সাদা মানুষরা তার শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করছিল। চারদিক থেকে লোকজন এগিয়ে এসে কুন্টার শরীরে হাত বুলিয়ে তার শারীরিক গঠন, শক্তি, কর্মক্ষমতা এবং বয়স পরখ করছিল। এটি ছিল এক ধরনের শারীরিক নিরীক্ষা, যা সেদিনকার সমাজের পণ্য হিসেবে মানুষের বিক্রির আগে প্রয়োজন ছিল। তারা কুন্টার মাংসপেশী, শারীরিক শক্তি এবং দক্ষতা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিল, যাতে তার বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা যায়। কুন্টাকে তারা শুধুমাত্র একজন মানুষ হিসেবে নয়, বরং একটি সম্পদ হিসেবে দেখতে পাচ্ছিল, যেটি তাদের শারীরিক শ্রম বা অন্যান্য কাজের জন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে কুন্টার শারীরিক গুণাবলী, যেমন তার শক্তি, দৃঢ়তা, এবং কর্মক্ষমতা পরিমাপ করা হচ্ছিল। সাদা মানুষেরা কুন্টাকে মূল্যায়ন করছিল যেন সে তাদের ব্যবসার জন্য একটি লাভজনক পণ্য, যেখানে তার শারীরিক ক্ষমতা আর শক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তাই, হাত দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করা হচ্ছিল, যেন তারা নিশ্চিত হতে পারে, কুন্টা কতটা শক্তিশালী এবং কাজের জন্য উপযোগী।
খ. এই উক্তিটি কুন্টার মানসিক, শারীরিক এবং আধ্যাত্মিক শক্তির এক নিখুঁত প্রতিফলন। কুন্টা যখন বন্দি ছিল, তখন তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছিল এবং তাকে শিকলে বাঁধা হয়েছিল, কিন্তু সে তার অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে লাগল। প্রথমত, কুন্টার সাহস ছিল তার অন্তর্নিহিত শক্তি। শিকল দিয়ে বাঁধা থাকার পরও, সে পালানোর জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে তার পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নেয়। তার সাহস এবং বুদ্ধিমত্তা তাকে শিকল ভেঙে মুক্তি পাওয়ার পথ দেখায়। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৫: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. গল্পের প্রেক্ষাপটে সাদা লোকগুলো কুন্টার শারীরিক গঠন ও শক্তি দেখে অবাক হয়ে তার প্রশংসা করছিল। যখন কুন্টা শিকলে বাঁধা ছিল এবং তাকে বিক্রি করা হচ্ছিল, তখন সাদা লোকেরা তাকে একটি শারীরিক পরীক্ষা করার জন্য সামনে নিয়ে আসে। তারা কুন্টার সুস্বাস্থ্য এবং শক্তি দেখে চিৎকার করে ওঠে, কারণ তারা তার শারীরিক সক্ষমতা এবং কর্মশক্তি দেখে তার মূল্য নির্ধারণ করতে চেয়েছিল।
খ. এই মন্তব্যটি কুন্টার চরিত্রের গভীর অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের প্রতিফলন। কুন্টা যখন আফ্রিকার একটি ছোট গ্রাম থেকে বন্দি হয়ে সাদা মানুষের দ্বারা দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে আসছিল, তখন তার মধ্যে জাতিগত ও বর্ণগত নিপীড়ন থেকে মুক্তির প্রবল আকাক্সক্ষা ছিল। কুন্টা একজন কালো মানুষ, এবং তাকে দাস বানানোর উদ্দেশ্য ছিল তার জাতিগত পরিচিতি এবং বর্ণের কারণে। সাদা মানুষের দ্বারা কুন্টার নিপীড়ন, শিকল দিয়ে বাঁধা, এবং তাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করা-সব কিছু তার জাতিগত নিপীড়নের এক প্রকাশ। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৬: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. এই উক্তি কুন্টার দাসী অবস্থায় একজন সাদা ব্যক্তি, যাকে সম্ভবত “মাস্টার” বলা হতে পারে, তার প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে। কুন্টা তার শিকল বাঁধা অবস্থায় মুক্তির জন্য অনুনয় ও আবেদন করছিল। তার চোখে ছিল তীব্র আকুতি, যেন সে কিছু সহানুভূতি বা সাহায্য পায়, কিন্তু সাদা ব্যক্তির কাছে তার আবেদন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায়। সাদা ব্যক্তি কুন্টার অনুনয়পূর্ণ চাহনিকে একেবারেই গুরুত্ব দেয়নি এবং তাকে দাস হিসেবে ব্যবহারের জন্য আরও কঠিন পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিল।
খ. ‘মুক্তি’ গল্পে দাস ব্যবস্থার চিত্র একেবারেই নির্মম এবং হৃদয়বিদারক। গল্পে কুন্টার মতো একজন মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া, তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া এবং তাকে অন্যের কাজে লাগানোর কথা তুলে ধরা হয়েছে। দাসব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত অমানবিক, যেখানে দাসদের শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতা পরীক্ষা করা হত এবং তাদের শ্রমের মাধ্যমে তাদের মালিকদের জন্য অর্থ উপার্জন করা হত। কুন্টার মতো একজন মানুষকে তার নিজের ঐতিহ্য, পরিবার ও স্বাধীনতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে, শিকল দিয়ে বাঁধা হয়, এবং তাকে বিক্রি করা হয় শুধুমাত্র তার শারীরিক শ্রমের কারণে। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৭: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. এই উক্তিতে "সে" হলো কুন্টা। কুন্টা তার মুখ ফিরিয়ে নেয় কারণ সে তার দাসত্বের কপাল কাটানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সাদা মানুষগুলোর শোষণ এবং নির্যাতন তাকে তার স্বাধীনতা ও সম্মান হারিয়ে দেয়। কুন্টা তার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তার অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ এবং অপমানের প্রতিক্রিয়া জানায়। সে কোনোভাবেই তার দাসী অবস্থাকে মেনে নিতে রাজি নয়। তার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ফলে কুন্টা তার চরম অসম্মান, নিপীড়ন এবং স্বপ্নভঙ্গের দিকে এক ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে। এটি তার অন্তরের অসন্তোষ এবং জীবনের কঠোর বাস্তবতার প্রতীক।
খ. ‘মুক্তি’ গল্পের মূলভাব হলো দাসত্ব ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা, মানবাধিকার ও মর্যাদার জন্য সংগ্রাম এবং জাতিগত ও বর্ণগত শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৮: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. কুন্টার বাজারমূল্য বেশি হওয়ার কারণ হলো তার বলিষ্ঠ দেহ ও অসাধারণ কর্মক্ষমতা।
খ. বৃদ্ধি, শক্তি ও সাহস থাকলে বন্দি অবস্থা থেকেও নিজেকে মুক্ত করা যায়- উক্তিটির যথার্থতা কুন্টা চরিত্রের বৈশিষ্ট্যে ফুটে ওঠে। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৯: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. আলোচ্য লাইনটি দ্বারা সাদা দাসমালিকের হাত থেকে বাঁচার জন্য কুন্টার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে।
খ. ‘মুক্তি’ গল্পের কেন্দ্রিয় চরিত্র কুণ্ঠার চারিত্রিক বৈশিষ্টে। প্রশ্নোক্ত মন্তব্যের সত্যতা মিলে |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১০: |
|---|
|
ক. কুন্টা কেন খাবার ও চাদর নিতে অস্বীকৃতি জানায়? খ. ‘মুক্তি’ গল্পে জাতিগত ও বর্ণগত নিপীড়ন এবং এ অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার তীব্র বাসনার চিত্র ফুটে উঠেছে। মন্তব্যটির সত্যতা যাচাই করো? |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১১: |
|---|
|
ক. ‘একেবারে সরেশ। নিজের ইচ্ছামতো গড়ে নেওয়া যাবে।’- কথাটি ব্যাখ্যা
করো। খ. ‘মুক্তিই জীবনের সবচেয়ে বড়ো আকাঙ্ক্ষা?’ ‘মুক্তি’ গল্পের আলোকে মন্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ করো? |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১২: |
|---|
|
ক. কুন্টা ভয়ে শিউরে উঠেছিল কেন? ব্যাখ্যা করো। খ. ‘মুক্তি’ গল্পে কুন্টাকে প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি বলা যায় কি? |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৩: |
|---|
|
ক. কুন্টা শিকল ছিঁড়ে পালানোর চিন্তা কেন করেছিল? সে কীভাবে সফল হয়েছিল? খ. কুন্টার দৃঢ় মানসিকতা এবং দৃঢ় ইচ্ছার যে দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে তা আলোচনা করো? |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৪: |
|---|
|
ক. “তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে আবার গায়ের চাদর দেবার বদান্যতা কেন?”
উক্তিটি কোন প্রসঙ্গে করা হয়েছে ব্যাখ্যা করো। খ. “দাসপ্রথার ফলে শ্বেতাঙ্গদের কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অত্যাচারের প্রকৃত দলিল ‘মুক্তি’ গল্প”- আলোচনা করো। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৫: |
|---|
|
ক. ‘দ্য গাছ থেকে পেড়ে আনা।’ ‘বাঁদরের মতো তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন!’ ‘সবকিছু শিখিয়ে নেওয়া যাবে।’ কথাগুলো কার সম্পর্কে কেন বলা হয়েছে? ব্যাখ্যা করো। খ. ‘মুক্তি’ গল্পে প্রকাশিত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের প্রতি শ্বেতাঙ্গ মানুষদের অমানবিক আচরণের স্বরূপ তুলে ধরো। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৬: |
|---|
|
ক. কুন্টা কেন খাবার ও চাদর নিতে অস্বীকৃতি জানায়? খ. ‘মুক্তি’ গল্পের কুন্টার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।- এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করো। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৭: |
|---|
|
ক. ‘কেবারে সরেস। নিজের ইচ্ছামতো গড়ে নেওয়া যাবে।’- কথাটি ব্যাখ্যা করো। খ. ‘মুক্তিই জীবনের সবচেয়ে বড়ো আকাঙ্ক্ষা।’- ‘মুক্তি’ গল্পের আলোকে মন্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ করো। |
| ‘মুক্তি’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৮: |
|---|
|
ক. ‘কিন্তু কুন্টার গায়ে তখন অযুত হাতির বল।’- উক্তিটি বর্ণনা করো। খ. ‘কুন্টার বুদ্ধি, সাহস ও শক্তিই ছিল তার মুক্তির প্রধান হাতিয়া।’- মন্তব্যটি সম্পর্কে তোমার যৌক্তিক মতামত দাও। |
| তথ্যসূত্র : |
|---|
|
১. আনন্দপাঠ: অষ্টশ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা,
২০২৬। ২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮। ৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫। |
