কাকতাড়ুয়া- সত্যজিৎ রায়

কাকতাড়ুয়া
কাকতাড়ুয়া

কাকতাড়ুয়া
সত্যজিৎ রায়

মৃগাঙ্কবাবুর সন্দেহটা যে অমূলক নয় সেটা প্রমাণ হলো পানাগড়ের কাছাকাছি এসে। গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে গেল। পেট্রোলের ইনডিকেটরটা কিছুকাল থেকেই গোলমাল করছে, সে কথা আজও বেরোবার মুখে ড্রাইভার সুধীরকে বলেছেন, কিন্তু সুধীর গা করেনি। আসলে কাঁটা যা বলছিল তার চেয়ে কম পেট্রোল ছিল ট্যাঙ্কে

‘এখন কী হবে?’ জিজ্ঞেস করলেন মৃগাঙ্কবাবু।

‘আমি পানাগড় চলে যাচ্ছি’, বলল সুধীর, ‘সেখান থেকে তেল নিয়ে আসব।’

‘পানাগড় এখান থেকে কতদূর?’

‘মাইল তিনেক হবে।’

‘তার মানে তো দু-আড়াই ঘণ্টা। শুধু তোমার দোষেই এটা হলো। এখন আমার অবস্থাটা কী হবে ভেবে দেখেছ?’

মৃগাঙ্কবাবু ঠান্ডা মেজাজের মানুষ, কিন্তু আড়াই ঘণ্টা খোলা মাঠের মধ্যে একা গাড়িতে বসে থাকতে হবে জেনে মেজাজটা খিটখিটে হয়ে গিয়েছিল।

‘তাহলে আর দেরি করো না, বেরিয়ে পড়ো। আটটার মধ্যে কলকাতা ফিরতে পারবে তো? এখন সাড়ে তিনটে।’

‘তা পারব বাবু।’

‘এই নাও টাকা। আর ভবিষ্যতে এমন ভুলটি কোরো না কখনো। লংজার্নিতে এসব রিস্কের মধ্যে যাওয়া কখনোই উচিত নয়।’

সুধীর টাকা নিয়ে চলে গেল পানাগড় অভিমুখে

মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায় খ্যাতনামা জনপ্রিয় সাহিত্যিক। দুর্গাপুরে একটি ক্লাবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁকে ডাকা হয়েছিল মানপত্র দেওয়া হবে বলে। ট্রেনে রিজার্ভেশন পাওয়া যায়নি, তাই মোটরে যাত্রা। সকালে চা খেয়ে বেরিয়েছেন, আর ফেরার পথে এই দুর্যোগ। মৃগাঙ্কবাবু কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন না, পাঁজিতে দিনক্ষণ দেখে যাত্রা করাটা তাঁর মতে কুসংস্কার, কিন্তু আজ পাঁজিতে যাত্রা নিষিদ্ধ বললে তিনি অবাক হবেন না। আপাতত গাড়ি থেকে নেমে আড় ভেঙে তিনি তাঁর চারদিকটা ঘুরে দেখে নিলেন।

মাঘ মাস, খেত থেকে ধান কাটা হয়ে গেছে, চারদিক ধু-ধু করছে মাঠ, দূরে, বেশ দূরে, একটিমাত্র কুঁড়ে ঘর একটি তেঁতুলগাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এ ছাড়া বসতির কোনো চিহ্ন নেই। আরও দূরে রয়েছে একসারি তালগাছ, আর সবকিছুর পিছনে জমাটবাঁধা বন। এই হলো রাস্তার এক দিক, অর্থাৎ পুব দিকের দৃশ্য।

পশ্চিমেও বিশেষ পার্থক্য নেই। রাস্তা থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাত দূরে একটা পুকুর রয়েছে। তাতে জল বিশেষ নেই। গাছপালা যা আছে তা-দু একটা বাবলা ছাড়া-সবই দূরে। এদিকেও দুটি কুঁড়েঘর রয়েছে; কিন্তু মানুষের কোনো চিহ্ন নেই। আকাশে উত্তরে মেঘ দেখা গেলেও এদিকে রোদ। মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটা কাকতাড়ুয়া।

শীতকাল হলেও রোদের তেজ আছে বেশ, তাই মৃগাঙ্কবাবু গাড়িতে ফিরে এলেন। তারপর ব্যাগ থেকে একটা গোয়েন্দাকাহিনি বার করে পড়তে আরম্ভ করলেন।

এর মধ্যে দুটো অ্যাম্বাসাডর আর একটা লরি গেছে তাঁর পাশ দিয়ে, তার মধ্যে একটা কলকাতার দিকে। কিন্তু কেউ তাঁর অবস্থা জিজ্ঞেস করার জন্য থামেনি। মৃগাঙ্কবাবু মনে মনে বললেন, বাঙালিরা এ-ব্যাপারে বড়ো স্বার্থপর হয়। নিজের অসুবিধা করে পরের উপকার করাটা তাদের কুষ্টিতে লেখে না। তিনি নিজেও কি এদের মতোই ব্যবহার করতেন? হয়তো তাই। তিনিও তো বাঙালি। লেখক হিসেবে তাঁর খ্যাতি আছে ঠিকই, কিন্তু তাতে তাঁর মজ্জাগত দোষগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি।

উত্তরের মেঘটা অপ্রত্যাশিতভাবে দ্রুত এগিয়ে এসে সূর্যটাকে ঢেকে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে একটা ঠান্ডা হাওয়া। মৃগাঙ্কবাবু ব্যাগ থেকে পুলোভারটা বার করে পরে নিলেন। এদিকে সূর্যও দ্রুত নিচের দিকে নেমে এসেছে। পাঁচটার মধ্যেই অন্ত যাবে। তখন ঠান্ডা বাড়বে। কী মুশকিলে ফেলল তাঁকে সুধীর!

মৃগাঙ্কবাবু দেখলেন যে, বইয়ে মন দিতে পারছেন না। তার চেয়ে নতুন গল্পের প্লট ভাবলে কেমন হয়? ‘ভারত’ পত্রিকা তাঁর কাছে একটা গল্প চেয়েছে, সেটা এখনও লেখা হয়নি। একটা প্লটের খানিকটা মাথায় এসেছে এই পথটুকু আসতেই। মৃগাঙ্কবাবু নোটবুক বার করে কয়েকটা পয়েন্ট লিখে ফেললেন।

নাহ্, গাড়িতে বসে আর ভালো লাগে না।

খাতা বন্ধ করে আবার বাইরে এসে দাঁড়ালেন মৃগাঙ্কবাবু। তারপর কয়েক পা সামনে এগিয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখে তাঁর মনে হলো বিশ্বচরাচরে তিনি একা। এমন একা তিনি কোনোদিন অনুভব করেননি।

না, ঠিক একা নয়। একটা নকল মানুষ আছে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে।

ওই কাকতাড়ুয়াটা।

মাঠের মধ্যে এক জায়গায় কী যেন একটা শীতের ফসল রয়েছে একটা খেতে, তারই মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কাকতাড়ুয়াটা। একটা খাড়া বাঁশ মাটিতে পোঁতা, তার সঙ্গে আড়াআড়িভাবে একটা বাঁশ ছড়ানো হাতের মতো দুদিকে বেরিয়ে আছে। এই হাত দুটো গলানো রয়েছে একটা ছেঁড়া জামার দুটো আন্তিনের মধ্য দিয়ে। খাড়া বাঁশটার মাথায় রয়েছে একটা উপুড় করা মাটির হাঁড়ি। দূর থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু মৃগাঙ্কবাবু অনুমান করলেন সেই হাঁড়ির রং কালো, আর তার ওপর সাদা রং দিয়ে আঁকা রয়েছে ড্যাবা ড্যাবা চোখ-মুখ। আশ্চর্য- এই জিনিসটা পাখিরা আসল মানুষ ভেবে ভুল করে, আর তার ভয়ে খেতে এসে উৎপাত করে না। পাখিদের বুদ্ধি কি এতই কম? কুকুর তো এ ভুল করে না। তারা মানুষের গন্ধ পায়। কাক চড়ুই কি তাহলে সে গন্ধ পায় না?

মেঘের মধ্যে একটা ফাটল দিয়ে রোদ এসে পড়ল কাকতাড়ুয়াটার গায়ে। মৃগাঙ্কবাবু লক্ষ করলেন যে, যে জামাটা কাকতাড়ুয়াটার গায়ে পরানো হয়েছে সেটা একটা ছিটের শার্ট। কার কথা মনে পড়ল ওই ছেঁড়া লাল-কালো ছিটের শার্টটা দেখে? মৃগাঙ্কবাবু অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলেন না। তবে কোনো একজনকে তিনি ওরকম একটা শার্ট পড়তে দেখেছেন-বেশ কিছুকাল আগে।

আশ্চর্য-ওই একটি নকল প্রাণী ছাড়া আর কোনো প্রাণী নেই। মৃগাঙ্কবাবু আর ওই কাকতাড়ুয়া। এই সময়টা খেতে কাজ হয় না বলে গ্রামের মাঠেঘাটে লোকজন কম দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু এরকম নির্জনতা মৃগাঙ্কবাবুর অভিজ্ঞতায় এই প্রথম।

মৃগাঙ্কবাবু ঘড়ি দেখলেন। চারটা কুড়ি। সঙ্গে ফ্লাস্কে চা রয়েছে। সেটার সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে।

গাড়িতে ফিরে এসে ফ্লাস্ক খুলে ঢাকনায় চা ঢেলে খেলেন মৃগাঙ্কবাবু। শরীরটা একটু গরম হলো।

কালো মেঘের মধ্যে ফাঁক দিয়ে সূর্যটাকে একবার দেখা গেল। কাকতাড়ুয়াটার গায়ে পড়েছে লালচে রোদ। সূর্য দূরের তালগাছটার মাথার কাছে এসেছে, আর মিনিট পাঁচেকেই অন্ত যাবে।

আরেকটা অ্যাম্বাসাডর মৃগাঙ্কবাবুর গাড়ির পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। মৃগাঙ্কবাবু আরেকটু চা ঢেলে খেয়ে আবার গাড়ি থেকে নামলেন। সুধীরের আসতে এখনও ঘণ্টাখানেক দেরি। কী করা যায়?

পশ্চিমের আকাশ এখন লাল। সেদিক থেকে মেঘ সরে এসেছে। চ্যাপটা লাল সূর্যটা দেখতে দেখতে দিগন্তের আড়ালে চলে গেল। এবার বাপ করে অন্ধকার নামবে।

কেন জানি মৃগাঙ্কবাবু অনুভব করছেন প্রতি মুহূর্তেই ওই নকল মানুষটা তাঁকে বেশি করে আকর্ষণ করছে।

সেটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে থাকতে মৃগাঙ্কবাবু কতকগুলো জিনিস লক্ষ করে একটা হৃৎকম্প অনুভব করলেন।

ওটার চেহারায় সামান্য পরিবর্তন হয়েছে কি?

হাত দুটো কি নিচের দিকে নেমে এসেছে খানিকটা? দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা কি আরেকটু জ্যান্ত মানুষের মতো?

খাড়া বাঁশটার পাশে কি আরেকটা বাঁশ দেখা যাচ্ছে?

ও দুটো কি বাঁশ, না ঠ্যাং?

মাথার হাঁড়িটা একটু ছোটো মনে হচ্ছে না?

তিনি কি এই তেপান্তরের মাঠে একা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে চোখে ভুল দেখছেন?

কাকতাড়ুয়া কখনো জ্যান্ত হয়ে ওঠে?

কখনোই না।

কিন্তু-

মৃগাঙ্কবাবুর দৃষ্টি আবার কাকতাড়ুয়াটার দিকে গেল। কোনও সন্দেহ নেই। সেটা জায়গা বদল করেছে। সেটা ঘুরে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে খানিকটা এগিয়ে এসেছে। এসেছে না, আসছে।

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা, কিন্তু দু পায়ে চলা। হাঁড়ির বদলে একটা মানুষের মাথা। গায়ে এখনো সেই ছিটের শার্ট; আর তার সঙ্গে মালকোঁচা দিয়ে পরা খাটো ময়লা ধুতি।

‘বাবু!’

মৃগাঙ্কবাবুর সমস্ত শরীরের মধ্যে দিয়ে একটা শিহরন খেলে গেল। কাকতাড়ুয়া মানুষের গলায় ডেকে উঠেছে এবং এ গলা তাঁর চেনা।

এ হলো তাঁদের এককালের গৃহকর্মী অভিরামের গলা। এদিকেই তো ছিল অভিরামের দেশ। একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন মৃগাঙ্কবাবু। অভিরাম বলেছিল, সে থাকে মানকড়ের পাশের গাঁয়ে। পানাগড়ের আগের স্টেশনই তো মানকড়।

মৃগাঙ্কবাবু চরম ভয়ে পিছোতে পিছোতে গাড়ির সঙ্গে সেঁটে দাঁড়ালেন। অভিরাম এগিয়ে এসেছে তাঁর দিকে।

এখন সে মাত্র দশ গজ দূরে।

‘আমায় চিনতে পারছেন বাবু?’

মনে যতটা সাহস আছে সবটুকু একত্র করে মৃগাঙ্কবাবু প্রশ্নটা করলেন।

‘তুমি অভিরাম না?’

‘অ্যাদ্দিন পরেও আপনি চিনেছেন বাবু?’

মানুষেরই মতো দেখাচ্ছে অভিরামকে, তাই বোধহয় মৃগাঙ্কবাবু সাহস পেলেন। বললেন, ‘তোমাকে চিনেছি তোমার জামা দেখে এ জামা তো আমিই তোমাকে কিনে দিয়েছিলাম।’

‘হ্যাঁ বাবু, আপনিই দিয়েছিলেন। আপনি আমার জন্য অনেক করেছেন, কিন্তু শেষে এমন হলো কেন বাবু? আমি তো কোনো দোষ করিনি। আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করলেন না কেন?’

মৃগাঙ্কবাবুর মনে পড়ল। তিন বছর আগের ঘটনা। অভিরাম ছিল মৃগাঙ্কবাবুদের বিশ বছরের পোরনো গৃহকর্মী।

শেষে একদিন অভিরামের ভীমরতি ধরে। সে মৃগাঙ্কবাবুর বিয়েতে পাওয়া সোনার ঘড়িটা চুরি করে বসে। সুযোগ-সুবিধা দুই-ই ছিল অভিরামের। অভিরাম নিজে অবশ্য অস্বীকার করে। কিন্তু মৃগাঙ্কবাবুর বাবা ওঝা ডাকিয়ে কুলোতে চাল ছুড়ে মেরে প্রমাণ করিয়ে দেন যে, অভিরামই চোর। ফলে অভিরামকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়। অভিরাম বলল, ‘আপনাদের ওখান থেকে চলে আসার পর আমার কী হলো জানেন? আর আমি চাকরি করিনি কোথাও, কারণ আমার কঠিন ব্যারাম হয়। উদুরি। টাকা-পয়সা নাই। না ওষুধ, না পথ্যি। সেই ব্যারামই আমার শেষ ব্যারাম। আমার এই জামাটা ছেলে রেখে দেয়। সে নিজে কিছুদিন পরে। তারপর সেটা ছিঁড়ে যায়। তখন সেটা কাকতাড়ুয়ার পোশাক হয়। আমি হয়ে যাই সেই কাকতাড়ুয়া। কেন জানেন? আমি জানতাম একদিন না একদিন আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে। আমার প্রাণটা ছটফট করছিল। -হ্যাঁ, মৃত লোকেরও প্রাণ থাকে-আমি মরে গিয়ে যা জেনেছি সেটা আপনাকে বলতে চাইছিলাম।’

‘সেটা কী অভিরাম?’

‘বাড়ি ফিরে গিয়ে আপনার আলমারির নিচে পিছন দিকটায় খোঁজ করবেন। সেখানেই আপনার ঘড়িটা পড়ে আছে এই তিন বছর ধরে। আপনার নতুন চাকর ভালো করে ঝাড় দেয় না, তাই সে দেখতে পায়নি। এই ঘড়ি পেলে পরে আপনি জানবেন অভিরাম কোনো দোষ করেনি।’

অভিরামকে আর ভালো করে দেখা যায় না- সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মৃগাঙ্কবাবু শুনলেন অভিরাম বলছে, ‘এতকাল পরে নিশ্চিন্ত হলাম বাবু। আমি আসি। আমি আসি...’

মৃগাঙ্কবাবুর চোখের সামনে থেকে অভিরাম অদৃশ্য হয়ে গেল।

‘তেল এনেছি বাবু।’

সুধীরের গলায় মৃগাঙ্কবাবুর ঘুমটা ভেঙে গেল। গল্পের প্লট ফাঁদতে ফাঁদতে কলম হাতে গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। ঘুম ভাঙতেই তাঁর দৃষ্টি চলে গেল পশ্চিমের মাঠের দিকে। কাকতাড়ুয়াটা যেমন ছিল তেমনভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।

বাড়িতে এসে আলমারির তলায় খুঁজতেই ঘড়িটা বেরিয়ে পড়ল। মৃগাঙ্কবাবু স্থির করলেন ভবিষ্যতে আর কিছু গেলেও ওঝার সাহায্য আর কখনো নেবেন না।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের উৎস নির্দেশ :
--

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের শব্দার্থ ও টীকা :
➠ অমূলক- ভিত্তিহীন।
➠ ইনডিকেটর- নির্দেশক। ইংরেজি Indicator.
➠ ট্যাঙ্কে- গাড়ির তেল রাখার জায়গা।
➠ লংজার্নি- দীর্ঘ ভ্রমণ। ইংরেজি Long journey.
➠ রিস্ক- ঝুঁকি। ইংরেজি Risk.
➠ মানপত্র- সম্মানসূচক স্মারক।
➠ রিজার্ভেশন- সংরক্ষণ। ইংরেজি Reservation.
➠ কুসংস্কার- বিভিন্ন বিশ্বাস যার পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ থাকে না।
➠ পাঁজি- পঞ্জিকা; যেখানে তারিখ, সন, তিথি নক্ষত্র ইত্যাদি লেখা থাকে।
➠ কুঁড়ে ঘর- খড়কুটো দিয়ে বানানো ছোটো ঘর।
➠ বসতি- বসবাসের জায়গা।
➠ অ্যাম্বাসাডর- এক ধরনের মোটর গাড়ির নাম। ইংরেজি Ambassador.
➠ কুষ্টি- নবজাতকের ভবিষ্যদ্বাণী লেখা হয় যেখানে।
➠ মজ্জাগত- জন্মগত।
➠ পুলোভার- সুতোয় বোনা শীতকালীন জামা।
➠ প্লট- কাহিনি।
➠ নোটবুক- দরকারি তথ্য টুকে রাখার খাতাবিশেষ। ইংরেজি Note Book.
➠ পয়েন্ট- বিষয়, প্রসঙ্গ। ইংরেজি point.
➠ বিশ্বচরাচর - সারা পৃথিবী।
➠ ড্যাবা ড্যাবা- বড়ো অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
➠ সদ্ব্যবহার- ঠিকভাবে কোনো কিছু ব্যবহার বা কাজে লাগানো।
➠ হৃৎকম্প- হৃদয়ের কম্পন।
➠ মালকোঁচা- দুই পায়ের মধ্য দিয়ে গোঁজা ধুতি লুঙ্গি প্রভৃতির কোঁচা।
➠ শিহরন- অনুভূতি।
➠ সেঁটে- লেগে থাকা।
➠ ভীমরতি- বয়স বাড়ার কারণে জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পাওয়া বুঝাতে ব্যবহৃত হয়।
➠ ব্যারাম- রোগ।
➠ উদুরি- পেটের পীড়া।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব :

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে সত্যজিৎ রায় কুসংস্কারের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরেছেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে মানবমনে বিচিত্রসব অনুভূতির প্রকাশ ঘটতে পারে। গল্পে একটি অনুষ্ঠান শেষে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কলকাতা ফিরছিলেন লেখক মৃগাঙ্কবাবু। পথে গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যাওয়ায় গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভার তেল আনতে যান। এই অবকাশে মৃগাঙ্কবাবুর চোখে পড়ল ধু-ধু মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটি কাকতাড়ুয়া। তিনি লক্ষ করলেন কাকতাড়ুয়ার গায়ে পরানো আছে তিন বছর আগে তাড়িয়ে দেওয়া তাঁর গৃহকর্মী অভিরামের লাল-কালো ছিটের শার্ট। ওঝার কথায় মৃগাঙ্কবাবুর বাবা স্বর্ণের ঘড়ি চুরির অভিযোগে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। অভিরাম নিজের বাড়িতে এসে অর্থ-কষ্টে ও রোগে মারা যায়। সেই অভিরাম কাকতাড়ুয়ারূপে লেখককে জানায় যে, আলমারির নিচে পিছন দিকটায় ঘড়িটি এখনো পড়ে আছে। আসলে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছিলেন মৃগাঙ্কবাবু। বাড়ি ফিরে তিনি আলমারির তলা থেকে ঘড়িটা খুঁজেও পেলেন। অভিরামের মাধ্যমে মৃগাঙ্কবাবুর প্রাপ্ত তথ্য সত্যিকার অর্থে অবচেতনে লুকিয়ে থাকা সত্যেরই প্রকাশ। তিনি বুঝতে পারলেন ওঝার কথা ঠিক ছিল না। তাই মৃগাঙ্কবাবু সিদ্ধান্ত নেন ভবিষ্যতে কোনো ওঝার সাহায্য নেবেন না।

কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না, এ সত্যটিই ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের লেখক পরিচিতি :
সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায়। তাঁর পূর্ব-প্রজন্মের ভিটা ছিল কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার মসুয়া গ্রামে। সত্যজিৎ রায় একজন চলচ্চিত্র-নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্পনির্দেশক, সংগীত পরিচালক ও লেখক। তিনি বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের একজন হিসেবে বিবেচিত। তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫) বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। চলচ্চিত্র নির্মাণের বাইরে তিনি ছিলেন একাধারে কল্পকাহিনি লেখক, প্রকাশক ও চিত্রকর। তিনি ছোটোগল্প ও উপন্যাসও রচনা করেছেন। তাঁর সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র গোয়েন্দা ফেলুদা ও প্রোফেসর শঙ্কু
১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১:
ক. চাকরি চলে যাওয়া অভিরামের জীবনে কীরূপ প্রভাব ফেলে? ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের চরিত্রগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

ক. অবিরাম ছিল মৃগাঙ্কবাবুর বিশ্ব ভ্রমণের, পুরানো পুরুষের। মৃগাঙ্কবাবুর দামি ঘড়ি চুরি দায়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরি চলে যাওয়ার অভিমানে জীবনে আসে চরম দুঃসময়। ঐ সময় লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার জন্য তিনি পেটের দায়ে চাচার দোকানে চা-ও বেচতেন ও দোকানে ঝি-এর সাথে চলে গিয়ে মুদির দোকানে ঢোকা পড়ে। একদিন সে মৃগাঙ্কবাবুকে দেখে। চাকরিচ্যুত তাকে কৃষ্ণ বল্লাল দান করে।

খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের প্রধান চরিত্রগুলো হলো মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায়, সুধীর অভিরাম এবং কাকতাড়ুয়া। মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায় একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক। তার ভাইঝির সখী, তার বাড়ির চাকরিয়াত থেকে অবসরপ্রাপ্ত একাকাতুয়া হলো গল্পের চরিত্র।
মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায় একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক। তিনি লোকসমাজে প্রশংসিত ছিলেন। মৃগাঙ্কশেখর বিশ্বাসী মনে করে তার অত্যাধিক দুর্ভোগ এতো গভীরে গেছে যে নিজে তিনি আলম্বন বিনাশের পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর জন্য প্রচুর কর্মী। তবে তিনি তাদের বাড়ির বছর বছরের চাকরকে চাকরিচ্যুত করেন। অর্থাত্ তার চরিত্রে আমরা কুসংস্কারের পরিষ্কার ছাপ দেখতে পাই।
মৃগাঙ্কবাবুর বাড়ির পুরানো চাকর হলো একাকাতুয়া। মৃগাঙ্কবাবুর দামি ঘড়ি চুরি দায়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এই বিষয় নিয়ে মৃগাঙ্কশেখর কোনো কিছুই জানাতে চান না। ফলে এ গল্পে সে তার অভয় দেওয়ার প্রদান করে তার মুদির ঘরে বসে। তার চরিত্রে দেখা যায় একজন সৎ ও ব্যক্তিত্ববান ব্যক্তির গুণাবলি।
সুধীর চরিত্র হলো সে খানমৌলিপুরের বাসিন্দা। তার ও এ লোকের গল্পের একাধক্রমে সমস্যায় পড়তে হয় মৃগাঙ্কবাবুকে।
এমনিতে তিনি নির্দোষ চারিত্র। তবু সে কিছু না বলাতে তার সত্যিই অভিপ্রায়ের ইঙ্গিত। ঘড়িটি হারিয়ে সুচতুর অভিপ্রায়ের চরিত্র অভিযোগের মুক্তি ঘটায়। গল্পে কাকতাড়ুয়া রূপক চরিত্র হয়েছে। অভিপ্রায়দের চরিত্র অভিযোগ মুক্তের করে এবং মৃগাঙ্কশেখর কুসংস্কারের প্রতি আগ্রহের জন্মে। বলা যায়, কাকতাড়ুয়া ও গল্পের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২:

ক. মৃগাঙ্কবাবুর দেখা স্বপ্নের বাস্তব ভিত্তি কী ছিল? আলোচনা করো।
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের মাধ্যমে লেখক কীভাবে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের কুফল তুলে ধরেছেন?

ক. সত্যজিৎ রায়ের লেখা ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে মৃগাঙ্কবাবুর দেখা স্বপ্নের একটি বাস্তব ভিত্তি ছিল, যা তার অতীতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গল্পের শুরুতে দেখা যায়, মৃগাঙ্কবাবু একটি নির্জন মাঠে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে একা অবস্থান করছিলেন। রাতের নিস্তব্ধতা, একাকীত্ব এবং কাকতাড়–য়ার উপস্থিতি তার মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করছিল।
এই পরিস্থিতিতে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন এবং স্বপ্নে তার পুরোনো গৃহকর্মী অভিরাম আত্মারূপে তার সামনে আসে। স্বপ্নে অভিরাম জানায় যে, সে চোর ছিল না এবং তাকে অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। সে মৃগাঙ্কবাবুকে বলে, তার বাবার ঘড়িটি আসলে আলমারির পেছনে ছিল এবং সে চুরি করেনি। এখানে স্বপ্নের বাস্তব ভিত্তি ছিল অপরাধবোধ ও সত্যের অন্বেষণ। গল্পে উল্লেখ আছে যে, মৃগাঙ্কবাবুর বাবা তিন বছর আগে একটি ঘড়ি হারিয়ে ফেলেন। সেই সময় তিনি একজন ওঝার শরণাপন্ন হন। ওঝা চাল ছিটিয়ে দেখে জানান যে ঘরের ভেতরেই চোর আছে, এবং সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে গৃহকর্মী অভিরামের ওপর। যদিও অভিরাম বারবার নিজের নির্দোষিতার কথা বলেছিল, তবুও তাকে বিশ্বাস করা হয়নি এবং চাকরি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তিন বছর পর একদিন হঠাৎ করেই মৃগাঙ্কবাবু পুরোনো আলমারির পেছনে সেই নিখোঁজ ঘড়িটি খুঁজে পান। ততদিনে অভিরাম অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটিয়ে মারা গিয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে ওঝার কথার কোনো ভিত্তি ছিল না এবং অভিরাম সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল। এই সত্যটি মৃগাঙ্কবাবুর অবচেতন মনে গেঁথে ছিল এবং যখন তিনি নির্জন মাঠে একা ঘুমিয়ে পড়েন, তখন তার স্বপ্নের মাধ্যমে অপরাধবোধ ও অনুশোচনা প্রকাশ পায়। বাস্তবে তিনি যে ভুল করেছিলেন, তা তার অবচেতন মনের ভিতরেই বাসা বেঁধেছিল। ফলে স্বপ্নের মাধ্যমে অভিরামের আত্মা যেন তাকে প্রকৃত সত্যের দিকে ইঙ্গিত দেয়।
এই গল্পের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন যে, কোনো ঘটনা যদি মানুষের মনে অপরাধবোধ সৃষ্টি করে, তবে সেটি তার চেতনার গভীরে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায় এবং স্বপ্নের মাধ্যমে কখনো কখনো প্রকাশ পেতে পারে।

খ. সত্যজিৎ রায় ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের মাধ্যমে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের ভয়ংকর পরিণতি অত্যন্ত বাস্তবধর্মীভাবে তুলে ধরেছেন। গল্পের মূল বার্তা হলো—অন্ধবিশ্বাসের কারণে নির্দোষ ব্যক্তি অন্যায়ের শিকার হতে পারে এবং সমাজে বড় ক্ষতির সৃষ্টি করতে পারে।
গল্পে দেখা যায়, মৃগাঙ্কবাবুর বাবা যখন ঘড়ি হারান, তখন তিনি কোনো যুক্তিসঙ্গত অনুসন্ধানের পরিবর্তে ওঝার শরণাপন্ন হন। ওঝা এক বিশেষ ধরনের চাল ছিটিয়ে দেখে এবং ঘোষণা করে যে চোর গৃহের ভেতরেই আছে। অথচ এই পদ্ধতি একেবারেই অবৈজ্ঞানিক এবং কোনো বাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। ওঝার এই কথায় মৃগাঙ্কবাবুর বাবার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয় এবং গৃহকর্মী অভিরামের ওপর মিথ্যা দোষ চাপানো হয়।
মৃগাঙ্কবাবুর পরিবার যুক্তি-বুদ্ধির পরিবর্তে কুসংস্কার ও ওঝার কথাকে প্রাধান্য দেয়। এই কুসংস্কার তাদের ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যার ফলে নির্দোষ অভিরাম চাকরি হারায় এবং চোরের অপবাদ মাথায় নিয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
অভিরাম কাজ হারানোর পর কষ্টকর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। তার পরিবারের সদস্যরাও চরম দারিদ্র‍্যরে মধ্যে পড়ে। কোনো অপরাধ না করেও সে সমাজের অবিচারের শিকার হয় এবং শেষ পর্যন্ত অসুস্থতা ও দারিদ্র‍্যরে কারণে মৃত্যু বরণ করে। এটি দেখায় যে, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের কারণে একজন মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
কিছু বছর পর যখন মৃগাঙ্কবাবু হঠাৎ করেই আলমারির পেছনে হারিয়ে যাওয়া ঘড়িটি খুঁজে পান, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে অভিরাম সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল। কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না। অভিরাম মারা গেছে এবং তার জীবন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
গল্পের শেষে দেখা যায়, মৃগাঙ্কবাবু সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি আর কখনো ওঝা বা কোনো কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তির কথা বিশ্বাস করবেন না। এটি সমাজের জন্য একটি শিক্ষণীয় বার্তা বহন করে। গল্পটি আমাদের বলে যে, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি, বিজ্ঞান ও বাস্তবতাকে গ্রহণ করাই উত্তম।
সত্যজিৎ রায়ের ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পটি কুসংস্কারের ভয়ংকর পরিণতি এবং অন্ধবিশ্বাসের বিপরীতে বাস্তববাদের গুরুত্ব তুলে ধরে। গল্পের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন যে, কুসংস্কারের কারণে কখনো কখনো নিরীহ মানুষ অন্যায়ের শিকার হতে পারে, এবং এটি শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, সমাজের জন্যও ক্ষতিকর। সুতরাং, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতাকে গ্রহণ করাই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৩:

ক. মৃগাঙ্কবাবু কাকতাড়ুয়ার গায়ে থাকা লাল-কালো ছিটের শার্ট দেখে কী অনুভব করলেন? এটি তার অতীত স্মৃতির সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে আছে?
খ. ‘আলমারির নিচে হারানো ঘড়িটি খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে গল্পের মূল বার্তাটি শক্তিশালী হয়েছে’— মন্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ করো।

ক. সত্যজিৎ রায়ের ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে মৃগাঙ্কবাবু একটি নির্জন মাঠে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর একটি কাকতাড়ুয়া দেখতে পান, যার গায়ে লাল-কালো ছিটের শার্ট ছিল। এই দৃশ্য তাকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলে দেয় এবং তার মনে একটি বিশেষ স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।
লাল-কালো ছিটের শার্টটি আসলে তার প্রাক্তন গৃহকর্মী অভিরামের পোশাকের সঙ্গে মিল ছিল। গল্পে উল্লেখ আছে যে, অভিরাম যখন মৃগাঙ্কবাবুর বাবার হারানো ঘড়ির চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল, তখন সে একটি লাল-কালো ছিটের শার্ট পরা ছিল। যদিও অভিরাম বারবার নিজের নির্দোষিতার কথা বলেছিল, তবুও কেউ তাকে বিশ্বাস করেনি এবং তাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এই পোশাকের সঙ্গে অভিরামের দুঃখজনক অতীত ও মৃগাঙ্কবাবুর নিজের অপরাধবোধ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। যখন তিনি কাকতাড়ুয়ার গায়ে একই রকম শার্ট দেখতে পান, তখন তার মনে অভিরামের সেই কষ্টের স্মৃতি আবার ভেসে ওঠে। কাকতাড়ুয়ার নির্জনতা, নিঃসঙ্গতা ও পোশাকের সাদৃশ্য তাকে মনে করিয়ে দেয়, কিভাবে সমাজ অন্যায়ভাবে অভিরামের মতো নিরপরাধ মানুষকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের কারণে তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।
এটি মৃগাঙ্কবাবুর অবচেতন মনে থাকা অপরাধবোধের প্রকাশ। কাকতাড়ুয়ার পোশাক দেখে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ও তার পরিবার একটি চরম ভুল করেছিলেন, যার ফলে অভিরাম অন্যায়ভাবে শাস্তি পেয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কষ্টকর জীবনযাপন করে মৃত্যুবরণ করেছিল। এই উপলব্ধি তাকে গভীরভাবে বিচলিত করে এবং তার মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।

খ. ‘আলমারির নিচে হারানো ঘড়িটি খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে গল্পের মূল বার্তাটি শক্তিশালী হয়েছে’— মন্তব্যটির যথার্থতা।
গল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে তখন, যখন মৃগাঙ্কবাবু হঠাৎ করেই আলমারির নিচে তার বাবার হারানো ঘড়িটি খুঁজে পান। এটি প্রমাণ করে যে, অভিরাম চোর ছিল না, বরং সে ছিল অন্যায়ভাবে দোষারোপের শিকার। এই ঘটনাটি গল্পের মূল বার্তাকে আরও শক্তিশালী করেছে, কারণ এটি দেখায়-কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের কারণে কতোটা ভয়ংকর ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব, যার ফলে নিরপরাধ মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
এই মুহূর্তটি গল্পের শিক্ষামূলক দিকটিকে আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। নিচে এই মন্তব্যের যথার্থতা ব্যাখ্যা করা হলো-
১. কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিপর্যয়: ঘড়ি হারানোর পর মৃগাঙ্কবাবুর পরিবার কোনো যুক্তিযুক্ত অনুসন্ধান না করে ওঝার কাছে গিয়েছিল। ওঝা চাল ছিটিয়ে মিথ্যা দাবি করেছিল যে চোর ঘরের ভেতরেই আছে, এবং অভিরামকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। অথচ বাস্তবে দেখা গেল, ওঝার কথা একেবারেই ভুল ছিল। এই ঘটনার মাধ্যমে গল্পটি আমাদের সতর্ক করে যে, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক। এটি সমাজে অন্যায় ও নিপীড়নের জন্ম দেয়, যা নিরীহ মানুষের জীবন ধ্বংস করতে পারে।
২. বিচারহীনতার ভয়াবহতা: অভিরামের ওপর ভুল অভিযোগ আনার পর তার কোনো প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হয়নি। একবার যখন তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো, তখন সমাজ তাকে আর স্বাভাবিক চোখে দেখেনি। ফলে সে তার জীবনের বাকি সময় দারিদ্র্যের মধ্যে কাটিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত মারা গেছে। এই বাস্তবতা গল্পের পাঠকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং বোঝায় যে, একবার ভুল করলে সেটি অনেক বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
৩. দেরিতে পাওয়া সত্যের মূল্যহীনতা: মৃগাঙ্কবাবু যখন আলমারির নিচে হারানো ঘড়িটি খুঁজে পান, তখন সত্য প্রকাশিত হয়, কিন্তু ততদিনে অভিরাম আর বেঁচে নেই। তার জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে, যা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ভুল সিদ্ধান্ত বা অন্যায়কে দ্রুত সংশোধন না করলে, পরে সত্য প্রকাশ পেলেও সেটি আর কোনো কাজে আসে না।
৪. গল্পের উপসংহার ও নৈতিক শিক্ষা: গল্পটি শেষ হওয়ার সময় মৃগাঙ্কবাবু নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি আর কখনো কুসংস্কারে বিশ্বাস করবেন না। তবে অভিরামের ক্ষেত্রে এই উপলব্ধি বিলম্বিত ন্যায়বিচারের প্রতীক, যা গল্পের মূল বার্তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই গল্প আমাদের সচেতন করে যে, সত্যকে লুকিয়ে রাখা, যুক্তিহীন বিশ্বাস ও কুসংস্কারের ওপর নির্ভর করা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। গল্পের শিক্ষা হলো-যুক্তিবাদী হও, বিচার-বিশ্লেষণ কর, এবং কুসংস্কার থেকে দূরে থাকো।
সুতরাং, এই মন্তব্যটি যথার্থ যে, হারানো ঘড়িটি খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে গল্পের নৈতিক শিক্ষা আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং এটি পাঠকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে- অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৪:

ক. অভিরামের স্বপ্ন-প্রতিচ্ছবি কেন মৃগাঙ্কবাবুর সামনে হাজির হয়েছিল? এটি দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের মূলভাব আলোচনা করো।

ক. গল্পের প্রধান চরিত্র মৃগাঙ্কবাবু যখন কাকতাড়ুয়ার গায়ে থাকা লাল-কালো ছিটের শার্ট দেখে, তখন তার সামনে অভিরামের স্বপ্ন-প্রতিচ্ছবি হাজির হয়। এর মাধ্যমে গল্পটি মৃগাঙ্কবাবুর মনে অপরাধবোধ ও অনুশোচনা প্রকাশের ইঙ্গিত দেয়।
মৃগাঙ্কবাবুর সামনে অভিরামের স্বপ্ন-প্রতিচ্ছবি হাজির হওয়ার কারণ:
মৃগাঙ্কবাবু তার অতীতের ঘটনাগুলি মনে করে দেখে যে অভিরামের প্রতি তার পরিবারের অন্যায় সিদ্ধান্ত তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। তার পরিবারের সদস্যরা অভিরামকে চোর হিসেবে দোষারোপ করেছিল, অথচ সে ছিল নির্দোষ। তবে মৃগাঙ্কবাবু তখন কিছুই বলেনি বা প্রতিবাদ করেনি। অভিরাম মারা যাওয়ার পর, মৃগাঙ্কবাবু অপরাধবোধে ভুগছিলেন। সেই অপরাধবোধ ও অনুশোচনারই প্রতিফলন হিসাবে অভিরামের প্রতিচ্ছবি তার সামনে এসেছে।
মৃগাঙ্কবাবু যখন কাকতাড়ুয়ার গায়ে ওই শার্টটি দেখে, তখন তার সামনে ফিরে আসে সেই পুরোনো ঘটনার স্মৃতি। তবে, এখন সত্য প্রকাশ পাচ্ছে যে অভিরাম নির্দোষ ছিল এবং তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছিল তা ছিল মিথ্যা। এই দৃশ্যটি সত্যের বিজয়ের প্রতীক, যা অবশেষে মৃগাঙ্কবাবুর মনে উপস্থিত হয়ে তাকে উপলব্ধি করায় যে, অপরাধবোধের শাস্তি কখনো শেষ হয় না, তা অবচেতনে প্রভাবিত করে থাকে।
এটি দিয়ে যা বোঝানো হয়েছে:
এটি মূলত অপরাধবোধ ও অক্ষমতার শাস্তির বিষয় তুলে ধরেছে। মৃগাঙ্কবাবু অতীতে অভিরামের পক্ষে কথা বলেননি, এবং সেই ভুল তার মনের গভীরে একটি দাগ হয়ে থেকে গেছে। অভিরামের স্বপ্ন-প্রতিচ্ছবি হাজির হওয়ার মাধ্যমে তাকে বোঝানো হয়েছে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত, এবং যে কোনো ঘটনা যখন ঘটে, তখন সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি মৃগাঙ্কবাবু তখন সত্য জানতেও নীরব থাকতেন, তাহলে তার ভবিষ্যতে চিরকাল এই অনুশোচনাই তার সঙ্গী হতো। অতএব, এই স্বপ্ন-প্রতিচ্ছবি অপরাধবোধ, অনুশোচনা এবং সমাজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পটি সত্যজিৎ রায়ের একটি মনস্তাত্ত্বিক গল্প, যেখানে মূলত মানুষের বিশ্বাস, অনুশোচনা, এবং অপরাধবোধের ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে লেখক কুসংস্কার, আত্মবিশ্বাস, এবং চেহারার পরিবর্তন সংক্রান্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠককে দেয়। গল্পের মূলভাব বা উদ্দেশ্য কীভাবে বাস্তবতা এবং কুসংস্কারের মধ্যে পার্থক্য ধরা এবং মানুষের ভুল সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষতি হওয়ার কথা বলা।
গল্পের শুরুতে, মৃগাঙ্কবাবু দুর্গাপুরের একটি ক্লাবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে, তাঁর গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যায় এবং ড্রাইভার সুধীর পানাগড়ের দিকে তেল নিতে চলে যায়। মৃগাঙ্কবাবু একা মাঠের মধ্যে গাড়িতে বসে থাকতে থাকেন এবং আশেপাশের নির্জনতা অনুভব করেন। তখন তিনি একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পান-একটি কাকতাড়ুয়ার। কাকতাড়ুয়ার, যা সাধারণত মাঠে পাখিদের ভয় দেখানোর জন্য তৈরি করা হয়, সে দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং মানুষের মতো কিছু একটা ভঙ্গি করছে।
এই কাকতাড়ুয়া দেখতে দেখতে মৃগাঙ্কবাবুর মনে অতীতের এক স্মৃতি জেগে ওঠে। এটি ছিল তাঁর পুরনো গৃহকর্মী অভিরাম-এর কথা। তিন বছর আগে, অভিরাম তাঁর সোনার ঘড়ি চুরি করে বলে মৃগাঙ্কবাবুর পরিবার তাকে কাজ থেকে ছাঁটাই করেছিল, যদিও অভিরাম নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিল। কিন্তু মৃগাঙ্কবাবু বিশ্বাস করেননি। অভিরামের পরে কী হয়েছে, তা মৃগাঙ্কবাবু জানতেন না। কিন্তু কাকতাড়ুয়াটির দিকে তাকিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, এটি আসলে অভিরামের স্মৃতি।
অভিরাম, মৃত্যুর পর, এক সময়ের গৃহকর্মী হয়ে কাকতাড়–য়াতে পরিণত হয়ে মৃগাঙ্কবাবুর সামনে হাজির হয়। সে জানায়, সে নির্দোষ ছিল এবং তাঁর পুরনো সোনার ঘড়ি, যা মৃগাঙ্কবাবু ভুলে গিয়েছিলেন, এখনও আলমারির নিচে পড়ে রয়েছে। অভিরাম তাকে বিশ্বাস না করার কারণে, সে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল, এবং মৃত্যুর পর তার আত্মার শান্তি হয়েছিল এই তথ্য জানিয়ে।
গল্পটি শেষ হয় সুধীর তেল নিয়ে ফিরে আসার সাথে। মৃগাঙ্কবাবু বাড়ি ফিরে গিয়ে আলমারির নিচে ঘড়িটি খুঁজে পান, যা তাকে অভিরামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। গল্পের মাধ্যমে লেখক অপরাধবোধ, অনুশোচনা, এবং সত্যের প্রতি বিশ্বাস এর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৫:

ক. মৃগাঙ্কবাবু কোথায় গিয়েছিলেন? মাঝপথে গাড়ি থেমে গিয়েছিল কেন? ব্যাখ্যা কর।
খ. কাকতাড়ুয়া কী? কাকতাড়ুয়া তৈরির উপাদান ও উদ্দেশ্য বর্ণনা কর।

ক. মৃগাঙ্কবাবু দুর্গাপুর ক্লাবের আয়োজন করা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন। তিনি একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক, এবং দুর্গাপুরের ক্লাব থেকে তাকে সাহিত্য সম্মাননা বা মানপত্র গ্রহণের জন্য আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে ট্রেনে আসন না পাওয়ায় মৃগাঙ্কবাবু মোটরযানে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেন। যাত্রা শুরুর আগে তিনি নিজের চাকর সুধীরকে সতর্ক করে বলেছিলেন, “পেট্রোল যা আছে, তাতে আমাদের যাত্রা শেষ হবে না।” কিন্তু সুধীর সেই কথায় গুরুত্ব দেয়নি, কারণ পেট্রোলের ইনডিকেটর অনুযায়ী তেলের পরিমাণ যথেষ্ট ছিল, এবং তার মতে, যাত্রা সফলভাবে শেষ করা সম্ভব ছিল। তবে মৃগাঙ্কবাবু জানতেন যে ইনডিকেটরটি কিছুদিন ধরে সঠিকভাবে কাজ করছে না, এবং তাই তিনি সুধীরের ওপর ভরসা করে পেট্রোল না নিয়েই যাত্রা শুরু করেছিলেন। এর ফলে যাত্রাপথের মাঝপথে পেট্রোল ফুরিয়ে গিয়ে গাড়িটি থেমে যায়, এবং মৃগাঙ্কবাবুর সন্দেহটাই সঠিক প্রমাণিত হয়।

খ. কাকতাড়ুয়া হলো একটি কৃত্রিম মানুষের আকৃতি যা ফসলের মাঠে পাখি ও পোকামাকড় থেকে ফসল রক্ষার জন্য তৈরি করা হয়। এটি সাধারণত বাঁশ, পুরনো কাপড়, হাঁড়ি এবং কিছু কাঠি দিয়ে তৈরি করা হয়।
এটি গ্রামাঞ্চলে একটি প্রচলিত বস্তু, বিশেষ করে গারাচর এলাকায় এটি দেখা যায়। সাধারণত ছোট দানার শস্য যেমন ধান, ডাল, তিল, সূর্যমুখী এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি যা পাখি ও পোকামাকড়ের আক্রমণের শিকার হয়, তাদের সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়ার জন্য কাকতাড়ুয়া তৈরি করা হয়, কারণ মানুষের পক্ষে সারা দিন মাঠে দাঁড়িয়ে থাকাটা সম্ভব নয়। তাই মানুষের আকৃতি দিয়ে এটি পাখি ও পোকামাকড়ের হাত থেকে ফসল রক্ষায় সাহায্য করে, এবং এই প্রথা প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত। কাকতাড়ুয়া তৈরি করা অত্যন্ত সহজ। প্রথমে একটি মাঝারি আকারের বাঁশ মাটিতে পুঁতে রাখতে হয়। তারপর বাঁশের উপরের দিকে কিছুটা নিচে আড়াআড়ি করে কাঠির বা বাঁশের কঞ্চি বেঁধে দিতে হয়। তারপর অব্যবহৃত পুরোনো কাপড়, যেমন জামা, শার্ট, ফতুয়া বা পাঞ্জাবি আড়াআড়ি করে কঞ্চির দুপাশে গলিয়ে দিতে হয়। এরপর একটি হাঁড়ি বাঁশের মাথায় উলটো করে চড়িয়ে দেওয়া হয়, এবং হাঁড়ির ওপর সাদা রঙ দিয়ে চোখ ও মুখ আঁকা হয়। এতে তৈরি হয়ে যায় কাকতাড়ুয়া, যা ফসলের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে।
কাকতাড়ুয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে। এটি ফসলকে পাখি ও পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করে, যার ফলে ফসলের গুণগত মান বজায় থাকে এবং সংরক্ষণ করা যায়। প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন দেশে কাকতাড়ুয়া ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি একটি উপকারী কৃত্রিম মানুষ, যা কখনও কখনও চোরের কাছেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৬:

ক. ‘কিন্তু আজ পাঁজিতে যাত্রা নিষিদ্ধ বললে তিনি অবাক হবেন না।’—কথাটি ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে মানবমনে বিচিত্রসব অনুভূতির প্রকাশ ঘটতে পারে।’— ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।

ক. “কিন্তু আজ পঞ্জিকায় যাত্রা নিষিদ্ধ বলা হলে তিনি অবাক হতেন না।”— এই বক্তব্যের মাধ্যমে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে কুসংস্কারে বিশ্বাসী না হয়েও সেটিকে অস্বাভাবিক মনে না করার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। বাক্যটিতে ‘পঞ্জিকা’ বলতে সেই নির্দিষ্ট দিনটির শুভ-অশুভ সময় সম্পর্কে দেওয়া তথ্য বোঝানো হয়েছে, যা অনেকেই কুসংস্কারের ভিত্তিতে অনুসরণ করে থাকেন। সাধারণত, শুভ-অশুভ মুহূর্ত নির্ধারণের এই প্রথা যুক্তিসম্মত নয়, তবে কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির শিকার হলে অনেকেই এমন বিশ্বাসের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। খ্যাতনামা সাহিত্যিক মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায়ও এমন একটি পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন, যা তাকে এই ধরনের কুসংস্কারমূলক ভাবনার দিকে ঠেলে দেয়।
দুর্গাপুরের একটি ক্লাব তাকে সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মানপত্র প্রদান করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। যেহেতু ট্রেনে আসন সংরক্ষণ পাননি, তাই তিনি মোটরগাড়িতে যাত্রা করেন। সকালে এক কাপ চা খেয়ে বেরোনোর পর সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু ফেরার পথে এক বিপত্তি ঘটে। পানাগড়ের কাছাকাছি এসে গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যায়। অথচ তিনি আগে থেকেই তার চালক সুধীরকে পেট্রোল পরীক্ষা করতে বলেছিলেন, কিন্তু সুধীর তা করেনি। বাধ্য হয়ে সুধীর একাই প্রায় তিন মাইল দূরের পানাগড়ে তেল আনতে চলে যায়, আর মৃগাঙ্কবাবু জনমানবশূন্য স্থানে একা পড়ে থাকেন। আশপাশে ছিল শুধু একটি কাকতাড়ুয়া, যা প্রতীকীভাবে তার একাকিত্ব এবং দুর্ভাগ্যের ইঙ্গিত বহন করছিল।
এই পরিস্থিতিতে দু-আড়াই ঘণ্টা একা অপেক্ষা করতে হবে জেনে তিনি মনে মনে ভাবলেন—যদি পঞ্জিকায় আজকের দিনকে ‘যাত্রা নিষিদ্ধ’ বলা হয়ে থাকে, তবে তিনি অবাক হবেন না। অর্থাৎ, তিনি কুসংস্কার বিশ্বাস না করলেও এমন দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে মনে হলো, আজকের দিনটি হয়তো সত্যিই তার জন্য ‘অশুভ’। এই ভাবনাটি মূলত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন, যেখানে বাস্তবিক দুর্ভোগ কোনো কুসংস্কারের সত্যতা প্রমাণ না করলেও, সেটিকে ততটা অবাস্তবও মনে হয় না।

খ. ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে মানবমনে বিচিত্র সব অনুভূতির প্রকাশ ঘটতে পারে।’— উক্তিটি একেবারেই যথার্থ। কারণ মানুষের মন প্রকৃতিগতভাবে সংবেদনশীল, এবং যখন সে কোনো বিশেষ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তখন তার চেতনার জগতে নানা রকম চিন্তা, দুশ্চিন্তা, ভয় কিংবা কল্পনার সঞ্চার ঘটে। সাধারণ অবস্থায় যে মানসিকতা প্রকাশ পায়, সংকটময় মুহূর্তে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। কারণ সেই বিশেষ মুহূর্ত মানুষের চিন্তাধারা এবং উপলব্ধিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
মানবমনের এই বিচিত্রতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের প্রধান চরিত্র মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায়ের মাধ্যমে। গল্পের শুরুতে দেখা যায়, তিনি একজন ঠান্ডা মেজাজের, বাস্তববাদী ও কুসংস্কারবিরোধী মানুষ। কিন্তু দুর্গাপুর থেকে ফেরার পথে এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে পড়ে তার মনোজগতে অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। পানাগড়ের কাছে এসে তার গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যায়, অথচ আগেই চালক সুধীরকে পেট্রোল পরীক্ষা করতে বলা হয়েছিল, কিন্তু সে তা করেনি। ফলে সুধীর যখন তিন মাইল দূরের পানাগড়ে তেল আনতে চলে যায়, তখন মৃগাঙ্কবাবুকে জনমানবশূন্য রাস্তায় একা অপেক্ষা করতে হয়। এ অবস্থায় তিনি বিরক্ত হন, এবং অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেন যে, বিশেষ মুহূর্তে মানুষ ভিন্নভাবে চিন্তা করতে বাধ্য হয়।
এসময় মৃগাঙ্কবাবুর মনোজগতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিশেষত, তার আশেপাশে যখন আর কোনো মানুষ নেই, তখন মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাকতাড়ুয়া তার ভাবনাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। স্বাভাবিকভাবে তিনি কুসংস্কারে বিশ্বাসী নন, কিন্তু যখন একাকিত্ব ও অন্ধকার পরিবেশ তাকে ঘিরে ধরে, তখন তার মনে অদ্ভুত কল্পনার উদয় হয়। মনে হতে থাকে কাকতাড়ুয়াটির চেহারায় পরিবর্তন এসেছে, হাত দুটো খানিকটা নেমে গেছে, এমনকি তার ভঙ্গিমাও অনেকটা জীবন্ত মানুষের মতো। একপর্যায়ে, তিনি কাকতাড়ুয়াটিকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে কল্পনা করেন, যা একসময় ঘুরে দাঁড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে! এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, মানুষ সবসময় যুক্তিবাদী থাকতে পারে না; বিশেষ পরিস্থিতি তার মানসিকতায় বৈচিত্র‍্য আনতে পারে। কুসংস্কারে বিশ্বাস না করলেও বিপদের মুখে পড়লে সে কুসংস্কারকেও অস্বাভাবিক মনে করে না। যেমন, মৃগাঙ্কবাবু যখন একা পড়ে যান, তখন মনে মনে ভাবেন, ‘আজ যদি কেউ বলেন যে পঞ্জিকায় যাত্রা নিষিদ্ধ ছিল, তাহলে তিনি অবাক হবেন না।’
অতএব, এই গল্পের প্রেক্ষাপটে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়— ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে মানবমনে বিচিত্র সব অনুভূতির প্রকাশ ঘটতে পারে।’ প্রশ্নোক্ত উক্তিটি সম্পূর্ণ সত্য এবং বাস্তবধর্মী।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২০:

ক. চাকরি চলে যাওয়া অভিরামের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে? ব্যাখ্যা কর।
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের চরিত্রগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

ক. অভিরামের জীবনে চরম দুর্দশা নেমে আসে তার চাকরি চলে যাওয়ার কারণে, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের অভিরাম একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী, যিনি বিশ বছর ধরে খ্যাতনামা সাহিত্যিক মৃগাঙ্কবাবুর বাড়িতে সততার সঙ্গে কাজ করেছেন। কিন্তু একদিন মৃগাঙ্কবাবুর বিয়েতে পাওয়া স্বর্ণের ঘড়িটি হারিয়ে গেলে সকলের সন্দেহ অভিরামের ওপর গিয়ে পড়ে। ওঝার সাহায্যে চাল ছুঁড়ে তাকে চোর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, এবং এই ভিত্তিহীন অভিযোগের ফলে সে চাকরি হারায়।
চাকরি হারানোর পর অভিরাম আর কোনো কাজ করতে পারেনি। একদিকে তার গুরুতর অসুস্থতা, অন্যদিকে অর্থের অভাব-দুটোই তার জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। সে উদুরি রোগে আক্রান্ত হয়, কিন্তু দারিদ্রের কারণে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেনি। ক্রমাগত রোগভোগের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। দুঃখজনকভাবে, মৃত্যুর অনেকদিন পর জানা যায় যে সে আসলে চোর ছিল না। হারিয়ে যাওয়া ঘড়িটি আলমারির নিচে পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু ততদিনে অভিরাম বিনা অপরাধে, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছে। সমাজের অবিচার ও ভুল সিদ্ধান্ত তার জীবন অকালে শেষ করে দেয়।

খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের চরিত্রগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো—
১. মৃগাঙ্কবাবু: মৃগাঙ্কবাবু এই গল্পের প্রধান চরিত্র, একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক, যিনি নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। সম্প্রতি দুর্গাপুর ক্লাব থেকে তিনি সম্মাননা পেয়েছেন। তবে এই সম্মাননা গ্রহণের পর ফেরার পথে একটি পুরোনো সত্য উদ্‌ঘাটিত হয়। তিনি জানতে পারেন, তার পূর্বতন চাকর অভিরাম, যাকে একসময় চুরির অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে নির্দোষ ছিল। বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং পরিবেশের প্রভাবে তিনি এই সত্যের মুখোমুখি হন, যা তাকে অনুশোচনায় দগ্ধ করে। এই ঘটনার পর তিনি শপথ করেন, ভবিষ্যতে কোনো জিনিস হারালে আর কুসংস্কারের আশ্রয় নেবেন না।
২. অভিরাম: অভিরাম মৃগাঙ্কবাবুর একনিষ্ঠ চাকর, যিনি দীর্ঘ বিশ বছর ধরে বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত, মৃগাঙ্কবাবুর বিয়েতে পাওয়া স্বর্ণের ঘড়িটি হারিয়ে গেলে সবাই তাকে সন্দেহ করে। একপ্রকার বিনা অপরাধেই চুরির দায়ে চাকরি হারাতে হয় তাকে। চাকরি হারানোর পর সে মারাত্মক উদুরি রোগে আক্রান্ত হয় এবং অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বরণ করে।
৩. মৃগাঙ্কবাবুর বাবা: মৃগাঙ্কবাবুর বাবা একজন চরম কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তি। তিনি তার পুরোনো এবং বিশ্বস্ত চাকর অভিরামকে চোর মনে করেন, যদিও অভিরাম তার নির্দোষিতা প্রমাণের চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি সেটি মানতে অস্বীকার করেন এবং চোর শনাক্ত করার জন্য ওঝা ডাকেন। ওঝা কুলোয় চাল ছুঁড়ে অভিরামকে চোর হিসেবে চিহ্নিত করলে তিনি তা বিশ্বাস করেন এবং তাকে চাকরিচ্যুত করেন।
৪. সুধীর: সুধীর মৃগাঙ্কবাবুর নতুন চাকর, যিনি দায়িত্ব পালনে বেশ গাফিলতি করেন। তিনি সময়মতো গাড়ির পেট্রোল পরীক্ষা করেননি, ফলে যাত্রাপথে গাড়ি বন্ধ হয়ে বিপত্তি ঘটে। এছাড়া, ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রেও তিনি অবহেলা করেন। তার দায়িত্বহীনতার কারণে স্বর্ণের ঘড়িটি আলমারির নিচে পড়ে থাকলেও সেটি পাওয়া যায়নি। মৃগাঙ্কবাবুর অবচেতনে অভিরামের উপস্থিতি বোঝায় যে, সুধীর যদি ঘর ভালোভাবে ঝাড় দিত, তবে অনেক আগেই হারানো ঘড়িটি খুঁজে পাওয়া যেত। সুধীরের চরিত্রটি মূলত অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার প্রতিচিত্র।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৭:

ক. “কিন্তু তাতে তাঁর মজ্জাগত দোষগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি।”— কথাটি বুঝিয়ে লেখো।
খ. “কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না।”— ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের আলোকে কথাটির সত্যতা যাচাই করো।

ক. “কিন্তু তাতে তাঁর মজ্জাগত দোষগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি।”—কথটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, মৃগাঙ্কবাবু তার স্বভাবগত দোষের কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে স্বীকার করেছেন, কারণ তিনি মনে করেন, বাঙালিরা সাধারণত স্বার্থপর প্রকৃতির হয়ে থাকে। তারা নিজের স্বার্থকে সবার আগে রাখে এবং কখনোই নিজেদের কষ্ট দিয়ে অন্যের উপকার করতে চায় না। মৃগাঙ্কবাবু একসময় এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমালোচনা করলেও পরে উপলব্ধি করেন, তিনিও এর ব্যতিক্রম নন।
ঘটনাটি ঘটে যখন দুর্গাপুরের একটি ক্লাব থেকে তাঁকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেখানে তাঁকে সম্মানসূচক মানপত্র দেওয়া হবে। ট্রেনে রিজার্ভেশন না পাওয়ায় তিনি মোটরগাড়িতে করে সেখানে যান। কিন্তু ফেরার পথে তাঁর গাড়ির পেট্রোল শেষ হয়ে যায় পানাগড়ের কাছাকাছি। গাড়ি যেখানে থামে, সেখান থেকে পানাগড় বেশ দূরে, ফলে দু-আড়াই ঘণ্টা তাঁকে সেখানে অপেক্ষা করতে হয়। তাঁর ড্রাইভার সুধীর তাকে একা রেখে তেল আনতে চলে যায়।
অপেক্ষার সময় তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন হন। এই সময় তাঁর পাশ দিয়ে দুটি অ্যাম্বাসাডর ও একটি লরি চলে গেলেও কেউ তাঁর অসুবিধার খোঁজ নিতে থামেনি। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, বাঙালিরা সত্যিই স্বার্থপর—তারা নিজেদের কষ্ট দিয়ে কখনোই অন্যের উপকার করতে চায় না। এরপর তিনি নিজের স্বভাব নিয়েও ভাবতে শুরু করেন এবং অনুধাবন করেন, হয়তো তিনিও অন্য কারও এমন পরিস্থিতি দেখলে একইভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন।
এই উপলব্ধির মাধ্যমে তিনি স্বীকার করেন, লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও তাঁর মজ্জাগত স্বার্থপরতা বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ, সমাজ নিয়ে লেখালেখি করলেও তিনি নিজে তার দোষ-গুণের সংস্কার করতে পারেননি, যা তাঁকে আরও আত্মবিশ্লেষণের দিকে ঠেলে দেয়।

খ. “কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না।”—এই মন্তব্যটি সম্পূর্ণ সত্য, কারণ কুসংস্কার মানুষের অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন বিশ্বাসের প্রতিফলন, যা যুক্তির পরিপন্থী। এটি মানুষের বিচার-বিবেচনা শক্তিকে দুর্বল করে, অপ্রয়োজনীয় ভয়-ভীতি তৈরি করে এবং সমাজে অশান্তি ডেকে আনে। বিশেষ করে, কুসংস্কারের ফলে নির্দোষ ব্যক্তির জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের কুসংস্কারের ভয়াবহ পরিণতি স্পষ্টভাবে দেখা যায় ‘কাকতাড়–য়া’ গল্পে, যেখানে কুসংস্কারের শিকার হয়ে একজন বিশ্বস্ত চাকর অভিরামের জীবন নষ্ট হয়ে যায়।
গল্পে তিন বছর আগের একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। অভিরাম ছিল মৃগাঙ্কবাবুর পরিবারের বিশ বছরের পুরোনো গৃহকর্মী। একদিন মৃগাঙ্কবাবুর বিয়েতে পাওয়া সোনার ঘড়িটি হারিয়ে গেলে সন্দেহের তীর অভিরামের দিকে যায়। যদিও অভিরাম বারবার তার নির্দোষিতা প্রমাণের চেষ্টা করে, তবুও মৃগাঙ্কবাবুর কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাবা ওঝা ডাকিয়ে কুলোতে চাল ছুঁড়ে তাকে চোর হিসেবে চিহ্নিত করেন। যুক্তির চেয়ে কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে তারা অভিরামকে চাকরিচ্যুত করে। মৃগাঙ্কবাবুও বাবার প্রভাবের কারণে অভিরামকে দোষী মনে করেন, যদিও তা কোনোভাবেই ন্যায্য ছিল না।
এই অন্যায় সিদ্ধান্তের ফলে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মৃগাঙ্কবাবুর পরিবার একজন বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল কর্মচারীকে হারায়, যা পরে তাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, পরবর্তীতে তারা যে গৃহকর্মীকে নিয়োগ দেয়, সে দায়িত্বশীল ছিল না এবং কাজেও অবহেলা করত। অন্যদিকে, অভিরামের জীবনেও নামে সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট। চাকরি হারানোর পর সে আর কোথাও কাজ পায়নি। অভাব-অনটনের মধ্যে পড়ে সে কঠিন উদুরি রোগে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারায়, চরম দারিদ্র‍্যরে মধ্যে বিনা চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়। অথচ, যে ঘড়িটি চুরির অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, সেটি পরে আলমারির নিচে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, বিনা অপরাধে শুধুমাত্র কুসংস্কারের কারণে তাকে অন্যায়ভাবে শাস্তি পেতে হয়।
এই ঘটনাই প্রমাণ করে, কুসংস্কারে বিশ্বাস রাখা মানুষ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কুসংস্কার শুধু অন্যায়কেই প্রশ্রয় দেয় না, এটি নিরপরাধ মানুষকে চরম দুর্ভোগে ঠেলে দেয়। তাই “কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না”— এই মন্তব্যটি নিঃসন্দেহে সত্য ও বাস্তবসম্মত।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৮:

ক. চোর শনাক্ত করার জন্য মৃগাঙ্কবাবুর বাবা কী করেছিলেন? ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের মূলভাব বর্ণনা করো।

ক. মৃগাঙ্কবাবুর বাবা চোর শনাক্ত করতে ওঝার সাহায্য নেওয়ার মাধ্যমে কুসংস্কারের প্রতি তার অন্ধ বিশ্বাসের পরিচয় দেন। ‘কাকতাড়–য়া’ গল্পের প্রধান চরিত্র মৃগাঙ্কবাবু, যার জীবনে তিন বছর আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে—তার বিয়েতে পাওয়া স্বর্ণের ঘড়িটি বাড়ি থেকে হারিয়ে যায়।
এ ঘটনার পর, মৃগাঙ্কবাবুর বাবার সন্দেহের তীর যায় অভিরামের দিকে, যে বিশ বছর ধরে তাদের বাড়িতে সততার সঙ্গে চাকরি করছিল। বারবার জিজ্ঞাসাবাদের পরও অভিরাম চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে, কিন্তু মৃগাঙ্কবাবুর বাবা তাকে বিশ্বাস না করে ওঝার শরণাপন্ন হন। কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে তিনি চোর শনাক্ত করতে ওঝাকে ডেকে আনেন। ওঝা কুলোতে চাল ছুড়ে চুরির প্রমাণ দেয় এবং অভিরামকেই চোর হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে, অভিরামকে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এটি স্পষ্ট যে, মৃগাঙ্কবাবুর বাবা যুক্তি ও বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কুসংস্কারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওঝার সাহায্যে চোর চিহ্নিত করার এই অযৌক্তিক ও অন্যায্য প্রক্রিয়া মৃগাঙ্কবাবুর বাবার কুসংস্কারের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের পরিচায়ক।

খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে সত্যজিৎ রায় কুসংস্কারের ভয়াবহ পরিণতি ও এর বিরূপ প্রভাব তুলে ধরেছেন। এটি একটি উপদেশমূলক গল্প, যেখানে কুসংস্কারে বিশ্বাস কীভাবে একজন নিরপরাধ ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে, তা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
গল্পের প্রধান চরিত্র মৃগাঙ্কবাবু, যিনি একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক। এক সাহিত্য সভায় সম্মাননা গ্রহণের পর তিনি মোটরযোগে ফিরে আসছিলেন। কিন্তু পানাগড়ের কাছাকাছি এসে গাড়ির পেট্রোল শেষ হয়ে যায়। তার চাকর সুধীর তেল আনতে পানাগড়ে গেলে মৃগাঙ্কবাবুকে একাই জনমানবহীন দুর্গম এলাকায় অপেক্ষা করতে হয়। এই অসহনীয় একাকিত্বের মুহূর্তে তিনি চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে দেখতে থাকেন। তবে চারদিক শুনশান, শুধুমাত্র একটি মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাকতাড়–য়া তার চোখে পড়ে, যার গায়ে লাল-কালো ছিটের শার্ট।
এই কাকতাড়–য়াটিই তার মনে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি করে। শার্টটি দেখে তার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে অভিরামের কথা, যিনি বিশ বছর ধরে তাদের বাড়িতে বিশ্বস্ত চাকর হিসেবে কাজ করেছিলেন। একসময় মৃগাঙ্কবাবু নিজেই অভিরামকে এই ধরনের একটি শার্ট উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু বুড়ো বয়সে অভিরামের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, যখন মৃগাঙ্কবাবুর বিয়েতে পাওয়া স্বর্ণের ঘড়িটি হারিয়ে যায় এবং অভিরামকে চোর হিসেবে সন্দেহ করা হয়।
বারবার অস্বীকার করলেও, মৃগাঙ্কবাবুর বাবা যুক্তির বদলে কুসংস্কারে বিশ্বাস করে ওঝাকে ডেকে আনেন। ওঝা কুলোয় চাল ছুড়ে মেরে প্রমাণ দেয় যে অভিরামই চোর। এর ফলে অভিরাম চাকরি হারায় এবং এরপর আর কোথাও চাকরি না পেয়ে অনাহারে ও কষ্টে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়।
গল্পের চূড়ান্ত পর্যায়ে, মৃগাঙ্কবাবু গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে কাকতাড়ুয়া বেশধারী অভিরামকে দেখতে পান। স্বপ্নে অভিরাম তাকে জানিয়ে যায় যে স্বর্ণের ঘড়িটি আসলে আলমারির নিচে পড়ে আছে। বাড়ি ফিরে ঠিক সেখানেই ঘড়িটি খুঁজে পেয়ে মৃগাঙ্কবাবু বুঝতে পারেন, তারা কত বড় ভুল করেছিলেন। তখন থেকেই তিনি শপথ করেন, ভবিষ্যতে কোনো কিছু হারালে আর কখনো ওঝার শরণাপন্ন হবেন না।
এই গল্পের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় দেখিয়েছেন যে সত্য কখনো চাপা থাকে না, সত্য একদিন নিজ গুণে প্রকাশিত হয়। একইসঙ্গে, গল্পটি আমাদের শেখায় যে কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না, বরং তা অন্যায় ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৯:

ক. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের শিক্ষণীয় দিকটি ব্যাখ্যা করো।
খ. গল্পে উল্লিখিত পরিবেশ, সময় ও আবহাওয়ার বর্ণনা দাও।

ক. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের মূল শিক্ষণীয় দিক হলো কুসংস্কারের ওপর নির্ভর করে চোর শনাক্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি বিপজ্জনকও। সত্যজিৎ রায় এই গল্পের মাধ্যমে কুসংস্কারের ভয়াবহ পরিণতি ও এর ক্ষতিকর দিকটি তুলে ধরেছেন।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মৃগাঙ্কবাবু। তিন বছর আগে তাঁর বাবার স্বর্ণের ঘড়ি হারিয়ে যায়। সন্দেহের তীর পরিবারের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত চাকর অভিরামের দিকে যায়, যদিও অভিরাম বারবার নির্দোষ দাবি করে। কিন্তু যুক্তির চেয়ে কুসংস্কারকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে মৃগাঙ্কবাবুর বাবা চোর শনাক্ত করতে ওঝার সাহায্য নেন। ওঝা কুলোতে চাল ছুড়ে বলে দেয় যে অভিরামই চোর। এর ফলে অভিরাম চাকরি হারায় এবং পরবর্তী জীবনে চরম দারিদ্র‍্যরে শিকার হয়ে অবশেষে কষ্টে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করে।
তিন বছর পর, মৃগাঙ্কবাবু এক বিশেষ পরিস্থিতিতে অবচেতনে স্বপ্নের মাধ্যমে দেখতে পান ঘড়িটির আসল অবস্থান। বাড়ি ফিরে আলমারির নিচে খুঁজে পেয়ে তিনি বুঝতে পারেন, কত বড় ভুল করা হয়েছিল।
এই গল্প আমাদের শেখায় যে কোনো কিছু হারিয়ে গেলে কুসংস্কারকে আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়, বরং যৌক্তিকভাবে অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন। সন্দেহের বশে কারও ওপর অন্যায়ভাবে দোষ চাপানো শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজের জন্যই ক্ষতিকর।

খ. সত্যজিৎ রায়ের ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের পটভূমি শীতকাল, অর্থাৎ মাঘ মাসের এক দুপুর। এ সময় মাঠঘাট ফাঁকা, জনমানবহীন এবং প্রকৃতি নির্জনতা ধারণ করেছে। গল্পের প্রধান চরিত্র মৃগাঙ্কবাবুর গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যাওয়ায় তিনি থামতে বাধ্য হন পানাগড় নামক স্থানে। তবে এটি প্রধান বন্দর থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে, যেখানে কোনো জনবসতি নেই, শুধু ধু-ধু ফসল কাটার পরের ফাঁকা মাঠ।
ঘটনার সময় দুপুর সাড়ে তিনটা, যখন গ্রামবাসীরা গোসল, খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রাম নেয়, ফলে চারপাশ আরও বেশি জনশূন্য হয়ে পড়ে। মাঘ মাসে ধান কাটা শেষ হওয়ায় মাঠে চাষাবাদের কর্মব্যস্ততা নেই। একটি কুঁড়েঘর তেতুলগাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আর আরও দূরে দেখা যায় এক সারি তালগাছ ও ঘন বনভূমি। রাস্তার অন্য পাশেও বিশেষ কিছু নেই, কেবল একটি জলশূন্য পুকুর ও কয়েকটি কুঁড়েঘর।
যদিও আকাশে মেঘ দেখা যাচ্ছে, তবু সূর্যের তেজ রয়ে গেছে। রোদ-মেঘের খেলা চলতে থাকায় এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়। মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়াটির গায়ে মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছে। সূর্য যত পশ্চিমে হেলে পড়ছে, ততই ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার দিকে ঠান্ডা আরও বাড়তে থাকে। এই নির্জন, শীতল পরিবেশে মৃগাঙ্কবাবু একা বসে আছেন, আর ফাঁকা মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়াটি ক্রমেই যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠছে। কয়েকটি রাঙা রঙের গাড়ি পাশ দিয়ে গেলেও কেউ তাঁর সমস্যার কথা জানতে চায়নি। ফলে তিনি ফ্লাস্ক থেকে চা পান করে অপেক্ষা করতে থাকেন।
গল্পটিতে শীতের এক নির্জন বিকেলের পরিবেশ ও আবহাওয়া অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক, যা গল্পের রহস্যময় ও কল্পনাপ্রবণ আবহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১০:

ক. ‘একটা নকল মানুষ আছে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে’ কথাটি ব্যাখ্যা করো।
খ. “‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে মৃগাঙ্কবাবর চরিত্রে প্রকাশ পেয়েছে কুসংস্কারহীনতা”—মন্তব্যটির সত্যতা নিরূপণ করো।

ক. ‘একটা নকল মানুষ আছে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে’ কথাটি দ্বারা কাকতাড়ুয়াকে বোঝানো হয়েছে।
‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে মৃগাঙ্কবাবু যখন দূর্গাপুর থেকে মোটরগাড়ি করে কলকাতার পথে যাচ্ছিলেন। তখন পথে গাড়ির পেট্রোল ফুরিয়ে যাওয়ায় গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভার তেল আনতে যান। যেখানে গাড়ি থেমেছিলো সেখানে চারিদিকে শুধু ধু-ধু মাঠ, কোনো জনমানব নাই। বেশ দূরে একটি মাত্র কুঁড়েঘর ও পাশে ছিলো একটি তেতুলগাছ। মৃগাঙ্কবাবুর সময় যেনো কিছুতেই কাটছিলো না। হঠাৎ চোখে পড়লো মাঠে দাঁড়িয়ে আছে একটা কাকতাড়–য়া যেনো একটা নকল মানুষ। তাই তিনি এই নির্জনে নিজেকে আর একা অনুভব করলেন না। বিরান মাঠে গাড়ি থামিয়ে তিনি যখন খুব একাকিত্ব, অনুভব করছিলেন তখন এই কাকতাড়ুয়া অর্থাৎ নকল মানুষটি মৃগাঙ্কবাবুর সঙ্গী হয়।
প্রশ্নোক্ত কথাটিতে কাকতাড়ুয়ার অবস্থান বোঝাতেই কথক এরূপ মন্তব্য করেছেন।

খ. সত্যজিৎ রায় রচিত ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের কেন্দ্রিয় বা প্রধান চরিত্র মৃগাঙ্কবাবু। যার মাধ্যমে লেখক কুসংস্কারের ভিত্তিহীনতা রূপায়ন করেছেন।
একবার একটি অনুষ্ঠান শেষে তিনি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কলকাতা ফিরছিলেন। কিন্তু পথমধ্যে গাড়ির তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় তিনি মহাবিপদে পড়লেন। ড্রাইভার তেল আনার উদ্দেশ্যে মৃগাঙ্কবাবুকে একা রেখে বেরিয়ে পড়লেন। তার ফিরতে সব মিলিয়ে ঘণ্টা আড়াইয়ের মতো লাগবে। অতঃপর ড্রাইভার চলে যাওয়ার পর কথকের এক অস্বস্থি সময় কাটতে লাগলো। নির্জন মাঠ, শীতের শেষের দিকে হওয়ায় ফসল কাটার সুবাদে কাউকে আর মাঠেও দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় মৃগাঙ্কবাবু এক অভূতপূর্ব ঘটনার মুখোমুখি হলেন। নির্জন মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়–য়া দেখে তার মনে নানা প্রশ্নের উদয় হলো। একপর্যায়ে তার মনে হলো কাকতাড়ুয়াটি তার দিকে এগিয়ে আসছে। কাকতাড়ুয়ার গায়ের জামাটিও দেখে তার পরিচিত মনে হলো। কথক বুঝতে পারলেন কাকতাড়ুয়া হলো তাদের বাড়ির পুরাতন ভৃত্য যাকে তিন বছর আগে একটা চুরির সন্দেহে অপমান করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন কথকের বাবা। কথকের বিয়েতে উপহার পাওয়া ঘড়িটি চুরি না করেও কেবল ওঝার কথা ওপর নির্ভর করে কাকতাড়ুয়ারূপী অভিরামকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। অভিরাম সেই সত্যটাই কথকের কাছে বলে যায় যা ছিলো মূলত কথকের অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা কুসংস্কারহীনতা। কারণ অভিরামের বর্ণনা অনুযায়ী ঠিকই সোনার চেইনের ঘড়িটি আলমারির নিচে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো।
আর মনের মধ্যে এই সত্য ধারণের প্রেক্ষাপটেই তাই বলা যায় মৃগাঙ্কবাবুর চরিত্রে কুসংস্কারহীনতাই প্রতিফলিত হয়।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১১:

ক. “বাঙালিরা এ ব্যাপারে বড়ো স্বার্থপর হয়”—ব্যাখ্যা করো।
খ. কুসংস্কারচ্ছন্নতা অভিরামের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে? বিশ্লেষণ করো।

ক. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে মৃগাঙ্কবাবু যখন ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কলকাতার দিকে ফিরছিলেন তখন পথে গাড়ির তেল ফুড়িয়ে যাওয়ায় ড্রাইভার চলে যায় তেল আনতে। এদিকে গাড়ি যেখানে থামানো সেখানে চারিদিকে ধু-ধু মাঠ। তিনি ভীষণ একাকীত্ব অনুভব করতে থাকলেন, কারণ আশে পাশে কোনো জনমানব নাই, নির্জন জায়গা। এই ফাঁকা রাস্তায় হঠাৎ করে একটি দুটি করে গাড়ি আসে। এর মধ্যে দুটো অ্যাম্বাসাডর ও একটি লড়ি তার পাশ দিয়েই চলে গেলো কলকাতার দিকে। কিন্তু ফাঁকা রাস্তার মাঝে নির্জন জায়গায় কেনো গাড়িটি থামানো তা কেউই জানার প্রয়োজন অনুভব করলো না। কারণ বাঙালি জাতি হিসেবে খুবই স্বার্থপর, কারও বিপদে কেউ সহজে এগিয়ে আসে না।
তাই তিনি মনে মনে বললেন বাঙালিরা এই ব্যাপারে বড়ো স্বার্থপর। অর্থাৎ একজন বাঙালি হয়েও তিনি বাঙালি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরলেন।

খ. অভিরামের করুণ জীবন চালনা ও পরিণতির অন্যতম নিয়ামক ছিলো কুসংস্কারাচ্ছন্নতা।
‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে লেখক কুসংস্কারের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরেছেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মৃগাঙ্কবাবু যখন মোটরগাড়ি করে কলকাতা যাচ্ছিলেন তখন মাঝপথে তার গাড়ির তেল ফুড়িয়ে যায়। তেল আনতে ড্রাইভার যখন চলে যায় তখন নির্জন মাঠে একা মৃগাঙ্কবাবু অবকাশের সময় হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েন এবং এক অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি হন। নির্জন মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়–য়ারূপী অভিরাম তার করুণ জীবনের কাহিনি কথকের কাছে তুলে ধরে। এই অভিরাম প্রায় বিশ বছর যাবৎ কথকের বাড়িতে কাজ করতো। কিন্তু গল্পকথকের বিয়েতে পাওয়া সোনার ঘড়ির চেইন হারিয়ে গেলে দোষ দেওয়া হয় অভিরামকে। বিশেষত ওঝার কথার উপর বিশ্বাস করে গল্পকথকের বাবা তাকে চুরির অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। তারপর থেকে অভিরাম নানা রোগ-শোকে জর্জড়িত হয়ে শেষ পর্যন্ত মারা যায়। কিন্তু অভিরাম যে চুরি করেনি আর প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়না। বাবার এই নিষ্ঠুরতা গল্পকথক মৃগাঙ্কবাবুর অন্তরে তীব্র অনুশোচনা জাগায়। নির্জন মাঠের অভিরামের সাক্ষাতের মধ্যে সেই সত্যই প্রতিফলিত হয়। কারণ অভিরামের তথ্যমতে ঘড়িটি আলমারির পেছনে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অথচ এই ঘড়িকে কেন্দ্র করে অভিরামের জীবন ভয়াবহ হয় ও শেষ পর্যন্ত করুণ মৃত্যু হয়। এতো বছরের পুরাতন ভৃত্য হওয়া সত্ত্বেও কেবল ওঝার কথা উপর নির্ভর করে অভিরাম এরূপ শাস্তিভোগ করলো। তাই বলা যায়, কুসংস্কারে বিশ্বাস স্থাপনই অভিরামের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১২:

ক. মৃগাঙ্কবাবু বইয়ে মন দিতে পারছিলেন না কেনো? ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘মৃগাঙ্কবাবুর সমস্ত শরীরের মধ্য দিয়ে একটা শিহরণ খেলে গেলো’—মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

ক. ব্যক্তিগত গাড়িতে করে মৃগাঙ্কবাবু যখন কলকাতার দিকে যাচ্ছিলেন তখন মাঝ রাস্তায় গাড়ির তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েন। ড্রাইভার তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে পড়েন তেল আনার উদ্দেশ্যে। গাড়িতে থাকলেন মৃগাঙ্কবাবু। যেখানটাতে গাড়ি থেমে আছে সেখানে শুধু বিরান মাঠ, জনমানবহীন জায়গা। মৃগাঙ্কবাবু তখন ভীষণ একাকীত্ব অনুভব করছিলেন। এই একাকীত্বের মাঝে মৃগাঙ্কেবাবুর মনে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছিলো যে কখন ড্রাইভার সুধীর ফিরবে কারণ তাকে আটটার মাঝেই কলকাতা পৌঁছতে হবে। তাই তিনি ভাবলেন বই পড়ে সময়টা কাটিয়ে দিবেন ড্রাইভার সুধীর আসার পূর্বপর্যন্ত। কিন্তু এই অস্তিরতার মাঝে মৃগাঙ্কের বই পড়তে ও ভালো লাগছিলো না। তাই তিনি বইয়ে মন দিতে পারছেন না।

খ. ‘কাকতুড়ায়া’ গল্পে সত্যজিৎ রায় কুসংস্কারের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরেছেন।
এই কুস্কারের নির্মম শিকার হন গল্পের অন্যতম চরিত্র অভিরাম। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মৃগাঙ্কবাবু দুর্গাপুরের একটি ক্লাবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে কলকাতার দিকে ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে যখন ফিরছিলেন, তখন রাস্তায় হঠাৎ গাড়ির তেল ফুরিয়ে যায়। ড্রাইভার তেল আনার জন্য প্রায় তিন কিলোমিটারের দূরত্ব পানাগড়ে চলে যায়। যার ফলে এই নির্জন মাঠের পাশে মৃগাঙ্কবাবুকে একা একা থাকতে হয়। বিজন মাঠে তখন তিনি জীবনের সবচেয়ে বড়ো একাকিত্ব অনুভব করছিলেন। এমন সময় তার চোখে পড়ে মাঠের অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কাকতাড়ুয়া। যাকে কথকের মনে হয়েছে একজন নকল মানুষ হিসেবে। আর এই নির্জন মাঠের কাকডুয়ারূপী নকল মানুষটাকেই তিনি সঙ্গী হিসেবে কল্পনা করছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তিনি যেনো এক অদ্ভুত ঘটনা দেখতে পান। কিছু ভয়ে ও কৌতুহলী হয়ে তিনি নকল মানুষটার দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার ফলে কাকতাড়ুয়াকে জ্যান্ত মানুষের মত মনে হচ্ছে। তিনি গাড়িতে উঠে কখন যে ঘুমিয়ে গেলেন কিন্তু বাস্তবত তার মনে হলো কাকতাড়–য়া তার কাছে এগিয়ে আসছে। তিনি বিশ্বাস রাখলেন এটি সম্ভব নয়। কিন্তু তার সেই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে সত্যি সত্যিই কাকতাড়ুয়া তার দিকে এগিয়ে এলো। তিনি যেনো স্পষ্ট দেখতে পেলেন তাদের বাড়ির সেই পুরাতন ভৃত্য অভিরাম। যাকে তিন বছর পূর্বে চুরির অপবাদ দিয়ে গল্পকথকের বাবা তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অথচ নির্জন মাঠে সেই আভিরাম তার দিকে হেঁটে আসছে। শুধু হেঁটেই আসেনি, কাছে এস তাকে যথারীতি অবাক করে দিয়ে ডাকলেন ‘বাবু’ সম্বোধন করে। আর এই নির্জন মাঠে এরূপ অভূত্থপূর্ব ঘটনার মুখোমুখি হওয়ায় মৃগাঙ্কবাবুর মধ্যে ভয়ে যেনো একটা শিহরণ খেলে গেলো।
অর্থাৎ, এই নির্জন জায়গায় যেখানে কোনো জনমানব নেই সেখানে কাকতাড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ যেন তা বাস্তব রূপ হয়ে তার সামনে উপস্থিত হয়েছে। আর এরূপ ঘটনার কারণেই মৃগাঙ্কের শরীরের মাঝে শিহরণ খেলে।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৩:
ক. ‘কাকতাড়ুয়া’ কী? বুঝিয়ে লেখো।
খ. ‘কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না।’- কথাটি ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৪:
ক. অভিরামকে চোর প্রমাণ করতে পারার কারণ ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে ‘কুসংস্কারকে বিশ্বাস ভালো নয়’ এর বাইরেও যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উঠে এসেছে সে বিষয়টি সম্পর্কে আলোকপাত করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৫:
ক. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের নকল মানুষ আসলে কী তার বর্ণনা দাও।
খ. মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায় চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৬:
ক. ‘বাঙালিরা এ ব্যাপারে বড়ো স্বার্থপর হয়।’- ব্যাখ্যা করো।
খ. মৃগাঙ্কবাবুর মানসিক অস্থিরতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৭:
ক. ‘তারা মানুষের গন্ধ পায়’- কাদের সম্পর্কে এবং কী প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে? বুঝিয়ে লেখো।
খ. ‘মানুষ অবচেতন কখনো ন্যায়ের লঙ্ঘন করতে পারে না’- ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৮:
ক. মৃগাঙ্কবাবুর দেখা স্বপ্নের বাস্তব ভিত্তি কী ছিল? আলোচনা করো।
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের মাধ্যমে লেখক কীভাবে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের কুফল তুলে ধরেছেন?

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১৯:
ক. মৃগাঙ্কবাবু কাকতাড়ুয়ার গায়ে থাকা লাল-কালো ছিটের শার্ট দেখে কী অনুভব করলেন? এটি তার অতীত স্মৃতির সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে আছে?
খ. ‘আলমারির নিচে হারানো ঘড়িটি খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে গল্পের মূল বার্তাটি শক্তিশালী হয়েছে’—মন্তব্যটির যথার্থতা নিরূপণ করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২০:
ক.মৃগাঙ্কবাবু কোথায় গিয়েছিলেন? গাড়ি মাঝপথে থেমে যাওয়ার কারণ কী? ব্যাখ্যা করো।
খ. কাকতাড়ুয়া তৈরির উপাদান ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২১:
ক. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের শিক্ষণীয় দিকটি ব্যাখ্যা করো।
খ. গল্পে উল্লিখিত পরিবেশ, সময় ও আবহাওয়ার বর্ণনা দাও।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২২:
ক. চোর শনাক্ত করার জন্য মৃগাঙ্কবাবুর বাবার কার্যাবলি ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের মূলভাব বর্ণনা করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২৩:
ক. “কিন্তু আজ পাঁজিতে যাত্রা নিষিদ্ধ বললে তিনি অবাক হবেন না।”- কথাটি ব্যাখ্যা করো।
খ.“বিশেষ পরিস্থিতিতে মানবমনে বিচিত্রসব অনুভূতির প্রকাশ ঘটতে পারে।”- ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২৪:
ক. “কিন্তু তাতে তাঁর মজ্জাগত দোষগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি।”- কথাটি বুঝিয়ে লেখো।
খ. “কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না।”- ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের আলোকে কথাটির সত্যতা যাচাই করো।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২৫:
ক. মৃগাঙ্কবাবু কোথায় গিয়েছিলেন? গাড়ি মাঝপথে থেমে যাওয়ার কারণ কী? ব্যাখ্যা করো।
খ. কাকতাড়ুয়া তৈরির উপাদান ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করো।


‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২৬:
ক. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের শিক্ষণীয় দিকটি ব্যাখ্যা করো।
খ. গল্পে উল্লিখিত পরিবেশ, সময় ও আবহাওয়ার বর্ণনা দাও।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২৭:
ক. চাকরি চলে যাওয়া অভিরামের জীবনে কীরূপ প্রভাব ফেলে? ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের চরিত্রগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২৮:
ক. “কিন্তু তাতে তাঁর মজ্জাগত দোষগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি।”- কথাটি বুঝিয়ে লেখ ।
খ. “কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না।”- ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের আলোকে কথাটির সত্যতা যাচাই করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২৯:
ক. অভিরামকে চোর প্রমাণ করতে পারার কারণ ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পে ‘কুসংস্কারে বিশ্বাস ভালো নয়’ এর বাইরেও যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উঠে এসেছে সে বিষয়টি সম্পর্কে আলোকপাত করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৩০:
ক. ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের নকল মানুষ আসলে কী তার বর্ণনা দাও।
খ. মৃগাঙ্কশেখর মুখোপাধ্যায় চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৩১:
ক. ‘বাঙালিরা এ ব্যাপারে বড়ো স্বার্থপর হয়।’- ব্যাখ্যা করো।
খ. মৃগাঙ্কবাবুর মানসিক অস্থিরতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করো।

‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৩২:
ক. ‘তারা মানুষের গন্ধ পায়’- কাদের সম্পর্কে এবং কী প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে? বুঝিয়ে লেখো।
খ. ‘মানুষ অবচেতনে কখনো ন্যায়ের লঙ্ঘন করতে পারে না’- ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

তথ্যসূত্র :
১. আনন্দপাঠ: অষ্টশ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৫।
২.
৩. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৪. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url