হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি- হাসান আজিজুল হক
|
| হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি |
হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি
হাসান আজিজুল হক
তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমাদের গাঁয়ে দুজন ডাক্তার ছিলেন। একজন হোমিওপ্যাথ আর একজন এ্যালোপ্যাথ। গাঁয়ের লোক ঠিক ঠিক বলতে পারত না-একজনকে বলত হেমাপ্যাথি আর একজনকে বলত এ্যালাপ্যাথি। দুজনের চিকিৎসার ধরন ছিল বাঁধা। ওষুধও দিতেন একরকম।
হোমিওপ্যাথ অঘোর ডাক্তারের কাছে গেলেই একটুখানি সাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট টপ টপ করে ফেলে তিন-চারটি পুরিয়া করে দিতেন। খেতে ভালোও লাগত না, মন্দও লাগত না। কখনো কখনো আবার স্রেফ টিউবওয়েলের পানিতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট মিশিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘যা, খাগে যা।’
ওষুধ হাতে নিয়ে, আমি হয়তো ফস করে জিজ্ঞেস করে বসতাম, ‘ডাক্তারবাবু ভালো হবে তো? অঘোর ডাক্তার দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলে উঠতেন, ‘ভালো হবে না মানে? ভালো হয়ে উপচে পড়বে। যা, ওষুধ খাগে।’
আমি বলতাম, ‘পেটের ভেতর গরগর করে।’
‘ও কিছু না, ব্যাঙ হয়েছে তোর পেটে।’
‘ওরে বাবা, ব্যাঙ হয়েছে আমার পেটে। গোঁ গোঁ শব্দ হয় যে ডাক্তারবাবু।’
‘ও কিছু না-ব্যাঙ ডাকে গোঁ গোঁ করে। আমার ওষুধ যেই এক পুরিয়া খাবি, দেখবি তখন ব্যাঙের লাফানি।’
‘কী করে দেখব? ব্যাঙ যে পেটের ভেতরে।’
অঘোর ডাক্তার তখন বলতেন, ‘ওরে বাবা, দেখবি মানে বুঝবি। বুঝবি ঠেলা।’
এই হচ্ছে আমাদের গাঁয়ের এক নম্বর ডাক্তার অঘোরবাবুর কথা।
এইবার দুই নম্বর তোরাপ ডাক্তারের কথা বলি। আগেই বলেছি, ইনি ছিলেন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার। কী করে যে তিনি ডাক্তার হয়েছিলেন, কেউ জানে না। শোনা যায়, বাল্যকালে তিনি নাকি এক বড়ো ডাক্তারের হুঁকো সাফ করতেন। সে যাই হোক, তোরাপ ডাক্তারের একটা ছোট্ট শেয়াল-রঙের বেতো ঘোড়া ছিল। তার সামনের পা-দুটি ছাঁদনা দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকত প্রায় সময়। এই বাঁধা পা নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে গাঁয়ের আশেপাশে চরে বেড়াত ঘোড়াটা। কারো ক্ষতি করতে দেখিনি কোনো দিন।
তোরাপ ডাক্তার খালি ডাক্তারিই করতেন না কিন্তু। নিজের হাতে হালচাষ করতেন। বর্ষা আর শীতের সময় ডাক্তারির ধার ধারতেন না তিনি। বর্ষাটা হচ্ছে চাষবাসের সময় আর শীতকালটা হচ্ছে ফসল কাটার মরশুম। এই সময় রোগী মরে গেলেও তোরাপ ডাক্তারকে পাওয়া যাবে না।
বর্ষা আর শীতে গাঁয়ের লোকদের রোগী হয়ে শুয়ে থাকার কোনো উপায় নেই। এই দুই সময়ে কাজ করতে না-পারলে পেটে ভাত জুটবে না।
কাজেই রোগটোগ সব শিকেয় তুলে রেখে দিতে হতো তাদের বাধ্য হয়ে। তারপর শরৎকাল এলে তোরাপ ডাক্তারের মোটামুটি অবসর হতো আর গাঁয়ের লোকদেরও রোগী হয়ে শুয়ে থাকার একটু-আধটু মওকা মিলত।
এই সময়ের জন্যেই যেন ওঁৎ পেতে থাকত ম্যালেরিয়া জ্বর। বাঘ যেমন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের টুটি কামড়ে ধরে, ঠিক তেমনি করে ম্যালেরিয়া জ্বর এসে গাঁয়ের গরিব লোকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। এটা ঘটত আশ্বিন মাস থেকে। ম্যালেরিয়ার মতো বাঘা জ্বর তখন আর কিছু ছিল না। ঘরে ঘরে মানুষ ছেঁড়া কাঁথা, ন্যাকড়া, ত্যানা গায়ে চাপিয়ে কোঁকাত। আর সে কী কাঁপুনি! কাঁপুনি থামাবার জন্যে পাথরের জাঁতা পর্যন্ত গায়ে চাপাতে দেখেছি।
এই সময়টায় ছিল তোরাপ ডাক্তারের মজা। ঘরে ঘরে লোক ম্যালেরিয়া জ্বরে ধুঁকছে। চিকিৎসার জন্যে তোরাপ ডাক্তার ছাড়া গতি নেই। ম্যালেরিয়া পুরোনো হয়ে গেলে কিছুতেই সারতে চায় না। পেটের মধ্যে পিলে উঁচু হয়ে ওঠে, হাত-পা হয়ে যায় প্যাঁকাটির মতো সরু। তোরাপ ডাক্তারের এইরকম অনেক পিলে-ওঠা পুরোনো ম্যালেরিয়া-রোগী ছিল।
রোগের আর একটা সময় ছিল চোত-বোশেখ মাস। এই সময়টায় কলেরা আর বসন্ত হয়ে গ্রামকে গ্রাম সাফ হয়ে যেত। ম্যালেরিয়া আর কলেরার সব রোগী তোরাপ ডাক্তারের। এখানে অঘোর ডাক্তারের কোনো ভাগ ছিল না। জ্বর হলে, সর্দি হলে, বেশি খেয়ে বা অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে পেট ছেড়ে দিলে লোক অঘোর ডাক্তারের কাছে যেত। আনা দুই পয়সা দিলেই, তিনি দিয়ে দিতেন দুই-তিন পুরিয়া ওষুধ। পয়সা দিতে না-পারলে ধারেও দিতেন। এমনকি একটা লাউ বা দুটো শশা নিয়ে গেলেও তিনি রোগী ফেরাতেন না।
অঘোর ডাক্তারের চাষবাসও ছিল না, ভিনগাঁয়ে ‘কলে’ যাবার ঘোড়াও ছিল না। হোমিওপ্যাথি ওষুধ রাখার জন্য একটা কাঠের বাক্স ছাড়া চিকিৎসার সরঞ্জাম বলতে আর কিছুই ছিল না তাঁর। তবে ওরকম বাক্যবাগীশ লোক লাখে একটা মিলবে কিনা সন্দেহ।
তিনি বলতেন, ‘বলি, মরতে তোরা আমার কাছে আসিস কেন বল দিকিনি। তোরাপের কাছে যা না। তা তো যাবি না-গেলে যে ব্যাটা কসাই ঘাড়টি মটকে তাজা রক্ত খাবে তোদের। বলি, এ কী ডাক্তারি বল দিকিন তোরা? তুই বললি, আমার অসুখ করেছে, আর অমনি তোরাপ হয় ছুরি বার করবে, না-হয় কোদাল বার করবে, না-হয় কুড়াল বার করবে...’
একজন রোগী হয়তো বাধা দিয়ে বলল, ‘না না ডাক্তারবাবু, তোরাপ ডাক্তার আবার কোদাল কুড়ুল কবে বার করলে!’
‘ওই হলো, লাঙলের ফালের মতো ছুঁচওয়ালা একটা বোতল বার করল। কী? না ইঞ্জেকশন দেব, গলা কাটব, মারব, ধরব। তারপর ওষুধ চাও, দেবে তোমাকে এক বোতল পিশাচের রক্ত। ওয়াক থু। যেমন দুর্গন্ধ, তেমনি বিচ্ছিরি সোয়াদ-ছ্যা ছ্যা ছ্যা! আর আমাদের হোমিওপ্যাথ কী করছে? বাঘ যেমন ভেড়ার পাল তাড়িয়ে নিয়ে যায় ঠিক তেমনি করে একটি পুরিয়ার আমার এই ওষুধ তোমার পায়ের আঙুলের ডগা থেকে জীবাণু বাবাজিদের খেদাতে খেদাতে মাথার চুলের ডগা দিয়ে বার করে দিচ্ছে। অথচ তুমি জানতেও পারছ না।’
সে বছর শরৎকালে ধান কেবল ডাঁশিয়ে উঠছে, ধানের ভেতর সাদা দুধ জমে চাল বাঁধছে, বেশ ঝরঝরে আবহাওয়া, আকাশভর্তি রোদ, একটু একটু ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে-এমনি সময়ে হুড়মুড়িয়ে চলে এল ম্যালেরিয়া জ্বর।
ব্যস, ম্যালেরিয়া জ্বরে লোক দমাদম বিছানা নিতে লাগল। ছেলে-বুড়ো কেউই বাদ যায় না। ম্যালেরিয়া যাদের পুরোনো হয়ে গেছে তাদের তো খুব মজা। ঠিক বেলা দশটার সময় চোখে সূর্যটা একটু হলুদ হলুদ ঠেকে, তারপর গা একটু গরম হয়, চোখ দুটি সামান্য জ্বালা করে তবে তারপর হুড় হুড় করে এসে পড়ে জ্বর। সঙ্গে সঙ্গে কী পিপাসা। ঘটি ঘটি পানি খেয়ে পিপাসা কমে না। পানি পেটে গিয়ে গরম হয়ে যায়, তারপর গা-টা গুলিয়ে ওঠে, তারপরেই বমি। বমি হয়ে গেলেই আবার পিপাসা। আবার ঘটি ঘটি পানি খাওয়া তারপর আবার বমি। জ্বর কমে আসে আন্তে আন্তে। রাত দশটার দিকে একদম জ্বর চলে গিয়ে গা ঠান্ডা।
গাঁয়ের অর্ধেকের বেশি লোক ম্যালেরিয়া জ্বরে পড়ল। তোরাপ ডাক্তার হলুদ রঙের বড়ো বড়ো বিকট দাঁত বের করে এ্যাই বড়ো সিরিঞ্জ নিয়ে, রোগীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে লাগলেন। দুই পকেট ভর্তি ম্যাপাক্রিন বড়ি। সে যে কি ভয়ানক বড়ি ভাবা যায় না। রোগী যেখানেই থাক, সে মাটির দাওয়াতেই হোক আর খোলা আকাশের নিচে উঠোনেই হোক বা ঘরের ভেতরেই হোক, গলায় স্টেথোটি ঝুলিয়ে ইনজেকশনের বাক্সটি হাতে নিয়ে তোরাপ ডাক্তার ঠিক হাজির। লোকেই-বা আর কী করে? কাজেই বাধ্য হয়ে তোরাপ ডাক্তারকে ডাকতেই হয়। বেচারা অঘোর ডাক্তারের গুঁড়োতে যে কোনো কাজই হয় না।
সে যাই হোক, ঘরে ঘরে ঢুকেই গোদা গোদা এ্যাকাব্যাঁকা আঙুল দিয়ে তোরাপ ডাক্তার রোগীর কজি চেপে ধরে কিছুক্ষণ নাড়ি পরীক্ষা করতেন। রোগীরা সব বলাই সাধু। হয়তো জিজ্ঞেস করল, “তবে কি 'ম্যালোরি' জ্বর ডাক্তার সাহেব?”
তোরাপ ডাক্তার দাঁত কড়মড়িয়ে বলতেন, ‘তাছাড়া আর কী হবে? এই যে দেখাচ্ছি মজা, একটি ইনজেকশনে ম্যালেরিয়ার ভূত ছাড়াব।’ এই বলে আশেপাশের লোকদের আদেশ দিতেন, ‘ধর তো এটাকে চেপে, সুঁইটা দিয়ে দিই একবার। আর দুটো টাকা রাখো এখানে আমার সামনে, আমার ফি আর ওষুধের দাম। উঁহু আগে টাকা রাখো, তারপর অন্য কাজ।’
এই বলে তোরাপ ডাক্তার একদিকের পকেটে টাকা দুটো ভরতেন, আরেক পকেট থেকে বের করতেন ইনজেকশন দেবার সিরিঞ্জ। কী প্রচণ্ড সিরিঞ্জ! আর তার ছুঁচ তো নয়, ঠিক যেন মোষের লাঙলের ফলা। লোকের গায়ে ফুঁড়তে ফুঁড়তে ছুঁচের মাথা গিয়েছে ভোঁতা হয়ে। সেই ভয়ানক যন্ত্র দেখেই তো রোগী বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে পালাবার চেষ্টা করত। তোরাপ ডাক্তার চিৎকার করতেন, ‘ধর ধর, ঠেসে, চেপে ধর’-সঙ্গে সঙ্গে তিন-চারজন যণ্ডাগোছের লোক গিয়ে বিছানার সঙ্গে চেপে ধরত রোগীকে। তারপর কোমরের কাপড়ের কষিটা খুলে তোরাপ ডাক্তার মাংসের মধ্যে প্যাঁট করে ঢুকিয়ে দিতেন সেই মোটা ছুঁচ। সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সমস্ত পা-টা যেত অবশ হয়ে।
এইরকম করে ইনজেকশন দিয়ে সে-বছর শরৎকালে তোরাপ ডাক্তার দুহাতে টাকা রোজগার করতে লাগলেন। ম্যালেরিয়ার প্রকোপ যত বাড়ে ততই বাড়ে তাঁর রোজগার। ইনজেকশন দিয়ে তিনি দু-তিনটে লোককে তো চিরদিনের জন্য খোঁড়া করে দিলেন। তাঁর ম্যাপাক্রিন বড়ি খেয়ে কয়েকজন তো চিরকালের জন্য কালা হয়ে গেল। তবু লোকে বাধ্য হয়ে তাঁর কাছেই যেতে লাগল। হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিয়ে ম্যালেরিয়ার মতো দুর্দান্ত জ্বর ঠেকানের সাধ্য ছিল না অঘোর ডাক্তারের। তাঁর কাছে আর কেউ যায় না। তাঁর সংসার চলাই দায় হয়ে উঠল। শেষপর্যন্ত কী আর করেন তিনি।
একদিন অঘোর ডাক্তার চুপিচুপি জেলা শহরে গিয়ে একটা সিরিঞ্জ আর কিছু কুইনাইন ইনজেকশন কিনে আনলেন। মনে মনে বললেন, তোরাপটার বড্ড বাড় বেড়েছে। খুব দু-পয়সা করে নিচ্ছিস, না? কিন্তু আমি হচ্ছি সব্যসাচী, সে খবরটা তো জানিস না তোরাপ। আমি দুই হাতে তির ছুড়তে পারি। ইচ্ছে হলে হোমোপ্যাথি করব আবার ইচ্ছে হলে এ্যালাপ্যাথি ইনজেকশন দেবো। মনে মনে এইসব কথা ভেবে তিনি সিরিঞ্জের ছুঁচ কিনলেন খুব মিহি দেখে। কাউকে কোনো কথা না-বলে সরঞ্জাম সব কিনে চুপি চুপি বাড়ি ফিরে এলেন সন্ধেবেলা।
পরের দিন সকাল বেলায় মুখটি ধুয়ে দাওয়ায় কাঠের টুল পেতে কেবল বসেছেন তিনি-এমন সময় ইদরিস আলীর বাড়ি থেকে লোক এল। ইদরিস আর তার পুরো পরিবার অনেকদিন থেকে তাঁর রোগী। শত অসুখ-বিসুখে তারা কোনোদিন তোরাপ ডাক্তারের কাছে যায় না, বলে, হেমাপ্যাথির ওপর ওষুধ আছে নাকি ডাক্তারবাবু? মরলে আপনার হেমাপ্যাথি খেয়েই মরব, তবু তোরাপ ডাক্তারের হাতে জান দিতে পারব না।
ইদরিস আলীর বাড়ির লোকের কাছ থেকে অঘোর ডাক্তার শুনলেন যে গত পাঁচ-সাত দিন থেকে ইদরিস নিদারুণ ম্যালেরিয়া জ্বরে বেহুঁশ। কিন্তু তোরাপ ডাক্তারের নাম করলেই তার হুঁশ ফিরে আসছে আর তখন সে বলছে, ‘আমি অঘোর ডাক্তারের হেমাপ্যাথি খেয়ে মরব, কিছুতেই এ্যালাপ্যাথি চিকিচ্ছে করাব না।’
কথা শুনে অঘোর ডাক্তার মিটিমিট হেসে বললেন, ‘কেন রে, এ্যালাপ্যাথি চিকিচ্ছেটা খারাপ হলো কোথায়? তোরাপ হলো ডাকাত, ও আবার ডাক্তার হলো কবে? এখন থেকে আমিই এক-আধটু এ্যালাপ্যাথি করব ভাবছি।’ ইদরিসের বাড়ির লোকটা অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি এ্যালাপ্যাথি করবে কী গো? তুমি আবার সুই দেবে নাকি? অঘোর ডাক্তার রেগে বললেন, ‘কেন, দেব না কেন? সব বিদ্যাই জানা আছে আমার বুঝলি? চিকিচ্ছেটা তোরাপের লাঙল চালানো নয়। কেমন মিহি সুই কিনেছি দেখবি। ইদরিসকে আজ ফুঁড়ব। তুই যা, আমি আসছি। আর শোন বাবা, দুটো টাকা আগে জোগাড় করে রাখিস। তোরাপও দু-টাকা করে নেয়, আমাকে দিবি না কেন?’ অঘোর ডাক্তার কুইনাইন ইনজেকশন দিবেন এই খবর দেখতে দেখতে সারা গাঁয়ে চাউর হয়ে গেল। গাঁয়ের যত সুস্থ মানুষ ছিল, সব ছুটল ইদরিসের বাড়ির দিকে। ইদরিসের মেটেবাড়ির ছোট্ট ঘরে আর তিলধারণের জায়গা নেই-একটা লোক কোমরে চাদর জড়িয়ে হেঁড়ে গলায় চেঁচাতে লাগল, ‘এই, এই সব বাতাস ছেড়ে দাও, বাতাস আসতে দাও।’ কিন্তু কে কার কথা শোনে! অঘোর ডাক্তার হেমাপ্যাথি ছেড়ে ইনজেকশন দেবে-এ কী সোজা কথা!
রোগা অঘোর ডাক্তার বহু কষ্টে ঘরে ঢুকে, ট্যাক থেকে সিরিঞ্জ, ওষুধ এইসব বের করলেন। লোকজনের দিকে তাকিয়ে তাঁর দুই হাঁটু থরথর করে কাঁপতে লাগল। মুখে অবশ্য তম্বি করলেন, ‘ভিড় কমাও, আলো আসতে দাও তোমরা।’
এই কথা বলে বহু কষ্টে সিরিঞ্জের মাথায় সুচ লাগালেন, তারপর ওষুধ ভরে রোগীর দিকে এগিয়ে গেলেন। ঠিক এই সময় জ্বরের ঘোর ভেঙে জবাফুলের মতো গোল দুটো চোখ মেলে ইদরিস বলল, ‘ডাক্তারবাবু শেষে আপনার এই কাজ!’ এই বলে ইদরিস চোখ বন্ধ করে মড়ার মতো পড়ে রইল। অঘোর ডাক্তার বললেন, ‘ধর বাবা তোরা, ইদরিসকে একটু ধর।’ চোখ না-খুলেই ইদরিস বলল, ‘কাউকে ধরতে হবে না ডাক্তারবাবু, আপনি ইনজিশন দ্যান-বরঞ্চ আপনাকে ধরতে হলে ওদেরকে বলুন।’
হঠাৎ কেমন বোকার মতো অঘোর ডাক্তার হাসলেন, তারপর ইদরিসের কোমরের নিচে মাংসে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, ‘হেঁ হেঁ বড়ো মিহি কিনেছি ছুঁচটা, এই তুললাম’, এই কথা বলে সকলের দিকে চেয়ে প্রায় কাঁদো-কাঁদো গলায় আবার বললেন, ‘হেঁ হেঁ তোরাপের কম্ম নয়, তোমরা দ্যাখো একবার, এই তুললাম সিরিঞ্জ, এইবার, এইবার'-বলেই প্যাঁট করে সিরিঞ্জের সুচ ঢুকিয়ে দিলেন ইদরিসের কোমরের মাংসে। হাত কাঁপতে লাগল তাঁর, বারবার বলতে লাগলেন, ‘গভীর করে ফুঁড়তে হবে, গভীর করে ফুঁড়তে, .... এই যাহ্।’ পট করে একটা আওয়াজ উঠল আর হাহাকার করে উঠলেন অঘোর ডাক্তার, ‘হায় হায়, ছুঁচ ভেঙে গেছে, ছুঁচ ভেঙে গেছে, গেল গেল, সর্বোনাশ হলো, হায় হায়...।’
সুচটা তখন মাংসের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। অঘোর ডাক্তারের শীর্ণ দুই হাত আঁতিপাঁতি করে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেটাকে। তখন কোথা থেকে একটা জোয়ান ছেলে ছুটে এসে দাঁত দিয়ে কামড়ে তুলে ফেলল সুচটা ইদরিসের কোমর থেকে। সবাই চুপ করে আছে-ছেলেটা দাঁত থেকে খুলে হাতে নিল সুচটা, অঘোর ডাক্তারের দিকে চেয়ে বলল, ‘এই যে ডাক্তারবাবু পেয়েছি।’ অঘোর ডাক্তার দেখতে পেলেন না। ক্ষোভে দুঃখে তখন তাঁর চোখে অশ্রুর ঢল নেমেছে।
| ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পের উৎস নির্দেশ: |
|---|
| -- |
| ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পের শব্দার্থ ও টীকা: |
|---|
|
➠ হোমিওপ্যাথ- রোগ সৃষ্টিকারী বস্তুর ছোটো অংশ দিয়ে ওই রোগ নিরাময়ের
চিকিৎসা-প্রণালি। ইংরেজি Homoeopath. ➠ এ্যালোপ্যাথ- ইউরোপীয় আধুনিক চিকিৎসাপ্রণালি বিশেষ। ইংরেজি Allopath. ➠ স্পিরিট- একধরনের রাসায়নিক পদার্থ। ইংরেজি Spirit. ➠ স্রেফ- শুধু। ➠ বেতো- বেতের মতো। ➠ ছাঁদনা- এক ধরনের দড়ি। গরু বাঁধার কাজে ব্যবহৃত হয়। ➠ শিকেয় তোলা- শিকা হলো দড়ি দ্বারা নির্মিত থলের মতো বস্তু, যেখানে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য হাঁড়ি-পাতিল বুঝুলিয়ে রাখা হয়। এখানে ‘শিকেয় তোলা’ বান্ধারা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ স্থগিত বা মুলতবি রাখা। ➠ মওকা- সুযোগ। ➠ ওঁৎ- পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করা। ➠ টুটি- গলা বা কণ্ঠনালি। ➠ জাঁতা- শস্য গুঁড়া করার ভারি যন্ত্র। ➠ পিলে- প্লীহা। পাকস্থলির বামপাশে অবস্থিত মানবদেহের একটি অঙ্গ। ➠ প্যাকাটি- পাটকাঠি। ছাল ছাড়ানো শুকনো পাটগাছ। ➠ পুরিয়া- মোড়ক। হোমিওপ্যাথি ওষুধ পরিবেশনের জন্যে ব্যবহৃত প্যাকেট। ➠ কল- ডাক, আহ্বান। এককালে ডাক্তারকে টাকা দিয়ে বাড়িতে ডেকে আনাকে ‘কল’ বলা হতো। ইংরেজি call. ➠ বাক্যবাগীশ- বাকপটু। ➠ ভাঁশিয়ে- প্রায় পাকা। ➠ ম্যাপাক্রিন- একধরনের ঔষধ। ইংরেজি mapacrine. ➠ স্টেথো- স্টেথোস্কোপ, হৃৎস্পন্দন মাপার যন্ত্র। ইংরেজি Stetho. ➠ সিরিঞ্জ- ইনজেকশন দেওয়ার উপযোগী সুচ। ইংরেজি Syringe. ➠ বলাই সাধু- শ্রীকৃষ্ণের বড়ো ভাই বলরাম। এখানে ভালো মানুষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ➠ মুণ্ডপাত- শিরশ্ছেদ। এখানে 'অভিশাপ' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ➠ কুইনাইন- ম্যালেরিয়া-জ্বরের ঔষধবিশেষ। ইংরেজি Quinine. ➠ সব্যসাচী- দুই হাতে সমান পারদর্শী। এখানে ‘দক্ষ’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ➠ ট্যাক- কোমর। লুঙ্গি কোমরে বাঁধার সময় যে থলে আকৃতি অংশে টাকা-কড়ি রাখা হয়। ➠ তম্বি- বকাঝকা করা। ➠ আঁতিপাতি- পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। ➠ ইনজিশন- ‘ইনজেকশন’-এর আঞ্চলিক রূপ। ইংরেজি Injection. |
| ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পের পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব: |
|---|
|
‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পে লেখক সরস ভাষায় গ্রাম্য দুজন হাতুড়ে
ডাক্তারের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছেন। হোমিওপ্যাথ ডাক্তারের নাম ছিল
অঘোর এবং এ্যালোপ্যাথ ডাক্তারের নাম ছিল তোরাপ। ম্যালেরিয়ার প্রকোপে
গ্রামের ছেলেবুড়ো সকলে কাতর হলে তোরাপের আয় রোজগারের সুবিধা হতো; আর অঘোর
ডাক্তারের কাছে কেউ যেতই না। রোগীর অভাবে অঘোর ডাক্তারের সংসার চলাই দায়
হয়ে উঠল। তাই অঘোর ডাক্তার একদিন গোপনে বাজার থেকে সিরিঞ্জ আর কুইনাইন
ইনজেকশন কিনে এনে এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা শুরুর চেষ্টা করলেন। অঘোর ডাক্তার
কাঁপা কাঁপা হাতে ইদরিস নামের এক রোগীর কোমরের গভীর মাংসে সিরিঞ্জের সুচ
ঢুকিয়ে দিতে গিয়ে সুচটা ভেঙে ফেললেন। ওই সময়ে একটি বুদ্ধিমান ছেলে
বিষয়টার ভয়াবহ পরিণতি আঁচ করতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে দাঁত দিয়ে সুচটা বের করে
নেয়। লজ্জা, ক্ষোভ, দুঃখ, অপমান ও অভিমানে অঘোর ডাক্তারের চোখে অশ্রু
ঝরে। তিনি নিজের ভুলটা বুঝতে পারলেন।
|
| ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পের লেখক পরিচিতি: |
|---|
| হাসান আজিজুল হকের জন্ম ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে। তিনি বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং শিশু-কিশোর রচনাসহ তাঁর রচিত ও প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই ডজনেরও অধিক। হাসান আজিজুল হকের উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ: ‘ত্মজা ও একটি করবী গাছ’ ও ‘জীবন ঘষে আগুন’; উপন্যাস: ‘আগুনপাখি’ ও ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ এবং শিশুতোষ-গ্রন্থ: ‘লালঘোড়া আমি’ ও ‘ফুটবল থেকে সাবধান’ প্রভৃতি। সাহিত্যক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমিসহ নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একুশে ও স্বাধীনতা পদক। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. অঘোর ডাক্তার ছিলেন এক ধরনের অদ্ভুত চিকিৎসক, যিনি সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করতেন না। তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, তবে তার পদ্ধতি ছিল সাধারণত অতিরিক্ত অদ্ভুত এবং বাচ্চাদের জন্য হাস্যকর। তিনি রোগীদের খুব সহজেই সাদা ময়দার মতো গুঁড়ো বা স্পিরিট মেশানো পানির পুরিয়া দিতেন। তিনি রোগীদের বলতেন, ‘যা, খাগে যা,’ যা মূলত রোগীদের নির্দিষ্ট কোনো দিক নির্দেশনা ছাড়া, শুধুমাত্র প্রেরণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল। কখনও কখনও তিনি রোগীদের টিউবওয়েলের পানিতে স্পিরিট মিশিয়ে পান করতে বলতেন, যার কোনো বাস্তব চিকিৎসাগত উপকারিতা ছিল না।
খ. তোরাপ ডাক্তার ছিলেন একজন এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক, যিনি বেশ অভিজ্ঞ ছিলেন এবং বিভিন্ন কঠোর চিকিৎসার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল অনেকটা ভয়াবহ এবং কঠোর। তিনি রোগীদের জন্য ইনজেকশন, বড় বড় সিরিঞ্জ ও সুঁই ব্যবহার করতেন, যা রোগীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করত। বিশেষ করে, তাঁর সিরিঞ্জগুলো ছিল খুবই মোটা এবং ভয়ঙ্কর, যা দেখে রোগীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। রোগীরা প্রায়ই তাঁর কাছে যাওয়ার সময় কাঁপত, কারণ ইনজেকশনের যন্ত্রণা অনেকটা অস্বস্তির সৃষ্টি করত। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. অঘোর ডাক্তার তাঁর অদ্ভুত ও হাস্যকর চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য রোগীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি সাধারণত খুব সহজ, কিন্তু একেবারে অচিন্তনীয় পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতেন। তার চিকিৎসার মূল অঙ্গ ছিল সাদামাটা গুঁড়ো বা পানির পুরিয়া দেওয়া, যা রোগীদের বিশ্বাসে খুব বেশি কার্যকর ছিল না। তবুও, অঘোর ডাক্তারের রোগীরা তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতিতে বেশিরভাগ সময় হতাশ হতো না, বরং তাঁর হাস্যরসাত্মক উপস্থাপনা এবং আশ্বাসে অনেকটা সাহস পেত। তিনি রোগীদের বলতেন, ‘ভালো হয়ে উপচে পড়বে, যা, ওষুধ খাগে,’ যা রোগীদের মনে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস সঞ্চারিত করত।
খ. তোরাপ ডাক্তার ছিলেন একজন কঠোর এবং অল্প একটু ভীতিজনক চিকিৎসক। তার চিকিৎসার ধরন ছিল অনেকটাই ভয়াবহ, বিশেষ করে তিনি যে ইনজেকশন ও সিরিঞ্জ ব্যবহার করতেন তা রোগীদের মধ্যে তীব্র ভীতি সৃষ্টি করত। তোরাপ ডাক্তার যখন তাঁর রোগীদের চিকিৎসা করতেন, তখন তাদের শারীরিক অবস্থা ছিল যথেষ্ট উদ্বেগজনক এবং মানসিকভাবে তাঁরা ছিল বেশ চাপগ্রস্ত। অনেক রোগী তো ইনজেকশন দেওয়ার জন্য তোরাপ ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ই কাঁপত, কারণ সিরিঞ্জগুলোর আকৃতি ছিল অনেক বড় এবং যন্ত্রণা সহ্য করা খুব কঠিন ছিল। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৩: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. অঘোর ডাক্তার হোমিওপ্যাথি ছেড়ে এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা দিতে চাইছিলেন মূলত আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি তার আকর্ষণ এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে কার্যকারিতার প্রতি তার খোঁজের ফলস্বরূপ। হোমিওপ্যাথির মাধ্যমে তার অভিজ্ঞতা ছিল যে, রোগীরা খুব বেশি উপকার পাচ্ছিল না, বিশেষ করে গুরুতর রোগ বা জটিল রোগের ক্ষেত্রে। তার নিজস্ব বিশ্বাস ছিল যে, রোগীদের ভাল চিকিৎসা ও দ্রুত ফলাফল পাওয়ার জন্য আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি (এ্যালোপ্যাথি) বেশি কার্যকরী। এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার ক্ষেত্রে তিনি রোগের প্রকৃতি, লক্ষণ, এবং তার চিকিৎসার মাধ্যমে দ্রুত ফলাফল পেতে আশা করেছিলেন, যা তাকে হোমিওপ্যাথি থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল।
খ. ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি’ গল্পটি গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তারদের চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে আধুনিক চিকিৎসার মধ্যে মূলত দুটি বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য তুলে ধরে। গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তাররা সাধারণত প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করেন, যেমন হোমিওপ্যাথি বা আথার্ভেদিক চিকিৎসা, যা অনেক সময় রোগীর স্বাস্থ্যের উপর প্রকৃত ফলাফল দেয় না। তাদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলো সাধারণত খুব সাধারণ ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, কিন্তু তা সবসময় রোগীদের সুস্থতা নিশ্চিত করে না। তাছাড়া, হাতুড়ে ডাক্তারদের কাছে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং মেডিকেল সায়েন্সের অভাব থাকে, যার ফলে তাদের চিকিৎসা প্রক্রিয়া অনেক সময় অনির্ভরযোগ্য হয়। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৪: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. গ্রামের হোমিওপ্যাথ ডাক্তার অঘোরের চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল বেশ অদ্ভুত। তার কাছে কোনো রোগী গেলেই তিনি সাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে দু-তিন ফোঁটা স্পিরিট যোগ করে একটা পুরিয়া বানিয়ে দিতেন। তবে ম্যালেরিয়া রোগীরা কখনও তার কাছে যেত না, বরং তারা ভিড় করত এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপের কাছে। একবার পুরো গ্রাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে, তোরাপ ডাক্তার দুহাতে টাকা আয় করেন, অথচ অঘোর ডাক্তার হয়ে পড়েন কর্মহীন। তাই তিনি গোপনে জেলা শহরে গিয়ে সিরিঞ্জ ও কুইনাইন ইঞ্জেকশন কেনার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে তিনি এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসা শুরু করতে পারেন। খ. গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তার বলতে সেই সকল ডাক্তারদের বোঝায়, যারা প্রথাগত ডাক্তারি শিক্ষার বাইরে থেকে সাধারণ চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তারা গ্রামে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে থাকেন, যেখানে নিয়মিত ডাক্তারি সেবা পাওয়া কঠিন। ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি’ গল্পে অঘোর ও তোরাপ দুজনেই সেই শ্রেণির সদস্য। গ্রামে যখন বিপদ বা সংকট আসে, তখন এ দুই ডাক্তারই তাদের শেষ ভরসা হয়ে ওঠেন। গ্রামীণ অঞ্চলে আধুনিক চিকিৎসাসেবা এখনও ঠিকমতো পৌঁছায়নি, ফলে মানুষের ভরসা রাখতে হয় এই হাতুড়ে ডাক্তারদের ওপর। অঘোর ডাক্তার হোমিওপ্যাথি পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেন, যেখানে রোগীর কাছে একই ধরনের সাদা ময়দার গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়। তোরাপ ডাক্তার এ্যালোপ্যাথি পদ্ধতিতে সিরিঞ্জ ব্যবহার করেন। তবে তোরাপের ইনজেকশনের কারণে বহু লোক চিরদিনের জন্য খোড়া হয়ে যায় এবং ম্যালাক্রিন বড়ি খাওয়ার পর কয়েকজনের ত্বক কালো হয়ে যায়। তবুও, গ্রামে একমাত্র চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকায় মানুষ তাদের কাছে যায়। এটি গ্রামীণ অঞ্চলের বাস্তবতা, যেখানে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকলে এসব অদক্ষ হাতুড়ে ডাক্তারদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। তবে, অঘোর ও তোরাপের চিকিৎসা পদ্ধতি বিজ্ঞানসম্মত না হওয়ার কারণে অনেক সময় মানুষের জীবন-যাত্রায় মারাত্মক ক্ষতি হয়, যা কখনও পূর্ণভাবে মিটানো সম্ভব হয় না। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৫: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি’ গল্পে ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রাদুর্ভাব ও তার ভয়াবহতা বর্ণিত হয়েছে। একসময়, ম্যালেরিয়া জ্বর গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে ফেলতো। খ. ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি’ গল্পে হাসান আজিজুল হক গ্রামীণ পটভূমিতে বাস্তবতা খুব সহজ ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। গল্পে দুটি গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তার, অঘোর ও তোরাপের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা উঠে এসেছে। অঘোর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক এবং তোরাপ এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক। শরৎকালে ম্যালেরিয়া বাড়লে এ্যালোপ্যাথ ডাক্তারের আয় বৃদ্ধি পেত, কিন্তু অঘোরের রোগী কমে যাওয়ায় তার সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই একদিন গোপনে অঘোর জেলা শহরে গিয়ে সিরিঞ্জ ও কুইনাইন ইনজেকশন কিনে আসে এবং এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করার চেষ্টা করে। প্রথম প্রচেষ্টায় অঘোর কাঁপা হাতে ইদরিস নামক রোগীর কোমরে সিরিঞ্জ ঢুকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সে সময় সুচটি ভেঙে ফেলে। ওই সময়ে, গ্রামে এক বুদ্ধিমান ছেলে দ্রুত দাঁত দিয়ে সুচটি বের করে আনে। এই ঘটনায় অঘোরের চোখে অপমান ও দুঃখের অশ্রু দেখা দেয়, এবং সে বুঝতে পারে যে নিজের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। গল্পের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন যে, যার যেটা কাজ, সে সেটাই করুক, না হলে দুঃখ ও অপমানের শিকার হতে হয়। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৬: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি’ গল্পে লেখক গ্রামে দুটি ডাক্তারি পেশার মানুষের চরিত্র তুলে ধরেছেন। তাদের মধ্যে তোরাপ হলেন একজন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার। যদিও তিনি পেশায় ডাক্তার, তবে মৌসুম বুঝে তার কাজের ধরন পরিবর্তিত হয়। বর্ষাকালে, যা চাষবাসের মৌসুম, এবং শীতকালে, যা ফসল কাটার সময়, তোরাপ ডাক্তার তার ডাক্তারি পেশাকে একেবারে বাদ দিয়ে মাঠে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। কারণ এই দুই মৌসুমে যদি কৃষিকাজ না করা যায়, তবে সংসারের জন্য আয়ে কোনো আশ্রয় থাকবে না। তাই রোগী হয়ে শুয়ে থাকার কোনো উপায় নেই। এই সময় তোরাপ ডাক্তার শুধু কৃষিকাজে সময় দেন, চিকিৎসা পেশা থেকে তিনি নিজেকে দূরে রাখেন। মূলত কৃষিকাজের জন্যই তোরাপ এই সময়ে ডাক্তারি পেশা পরিত্যাগ করেন। খ. বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে—“যার কাজ তারই সাজে, অন্য লোকের লাঠি বাজে।” এর মানে হলো, যার যেটা কাজ, তাকে সেটাই করতে হবে। অন্যের কাজ করতে গেলে না শুধু নিজের অপমান ঘটে, বরং দুঃখ ও বিপদও বয়ে নিয়ে আসতে হয়। ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি’ গল্পে হোমিওপ্যাথ ডাক্তারের চরিত্র অঘোর এই ভুলটি করেন, যখন তিনি এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেন। গ্রামে ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল অনেক। এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপ সফলভাবে তাদের চিকিৎসা করে প্রচুর টাকা উপার্জন করছিলেন, তবে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার অঘোরের কাছে কোনো রোগী আসত না, কারণ হোমিওপ্যাথি ম্যালেরিয়া জ্বরে কার্যকরী ছিল না। এর ফলে অঘোর তার সংসার চালাতে কষ্ট পেতেন। এক সময়, অঘোর ঠিক করেন তিনিও এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসা দেবেন। তিনি গোপনে জেলা শহরে গিয়ে সিরিঞ্জ ও কুইনাইন ইনজেকশন কিনে আসেন। কিন্তু অঘোরের অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম রোগী ইদরিসের কোমরে সুচ ঢোকানোর সময় সুচটি ভেঙে ফেলে। তখন এক বুদ্ধিমান ছেলে দাঁত দিয়ে সুচটি বের করে নেয়। এই অপমান, দুঃখ ও লজ্জায় অঘোরের চোখে অশ্রু আসে এবং তিনি বুঝতে পারেন যে অন্যের কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এভাবে বলা যায়, “চাষির চাষ দেখে চাষ করল গোয়াল,” অর্থাৎ, যদি আপনি নিজের কাজ জানেন না, তবে অন্যের কাজ করতে গিয়ে দুঃখ ও অপমানের শিকার হবেন, যেমনটি হয়েছে অঘোরের ক্ষেত্রে। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- 7: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. বর্ষা ও শীতকালে গ্রামের মানুষদের রোগী হয়ে শুয়ে থাকার কোনো সুযোগ ছিল না, কারণ এই সময় তারা পুরোপুরি ফসলের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। তবে শরৎকাল আসার পর তোরাপ ডাক্তার কিছুটা সময় পেতেন এবং গাঁয়ের লোকেদের রোগী হয়ে শুয়ে থাকার সুযোগ পাওয়া যেত। এই সময়টাতে ম্যালেরিয়া জ্বরও অতিরিক্ত বেড়ে যেত, যা গোপনে বা আকস্মিকভাবে মানুষের উপর আক্রমণ করত। এই জ্বরকে বাঘের মতো তাড়া করে শিকার করার সাথে তুলনা করা হয়েছে, কারণ বাঘ যেমন গোপনে এগিয়ে গিয়ে শিকারকে আক্রমণ করে, তেমনই ম্যালেরিয়া জ্বর মানুষদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। আশ্বিন মাস থেকে এই রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হত। তখন ঘরে ঘরে মানুষ কাঁথা, ন্যাকড়া গায়ে জড়িয়ে কাঁপতে থাকত, এবং তাদের কাপুনি থামানোর জন্য পাথরের জাতা গায়ে চাপাতে হতো। এর পরবর্তী সময় ছিল চৈত্র-বৈশাখ মাস, যখন কলেরা এবং বসন্ত রোগ ছড়িয়ে পড়ত এবং পুরো গ্রাম সাফ হয়ে যেত।
খ. ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার অঘোর এবং এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপের চিকিৎসা পদ্ধতির পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। অঘোর ডাক্তার রোগীদের সাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে স্পিরিট মিশিয়ে পুরিয়া বানিয়ে দিতেন, যা কখনও ভালো লাগত না, আবার কখনও খেতে মন্দ লাগত না। তিনি একাধিকবার রোগীকে শুধু টিউবওয়েলের পানিতে স্পিরিট মিশিয়ে খাওয়ার জন্যও আদেশ দিতেন। তার মতে, তার ওষুধ রোগীর শরীরের সব জীবাণু দেহ থেকে বের করে ফেলত। ম্যালেরিয়া, সর্দি, অখাদ্য খাওয়ার ফলে পেট খালি হলে, রোগীরা অঘোরের কাছে যেত। আর তিনি দুই-পয়সায় কয়েকটি পুরিয়া ওষুধ দিতেন। না দিতে পারলে, ধারেও দিতেন, এমনকি লাউ বা শশাও নিয়ে এলে ওষুধ দিতেন। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৮: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি’ গল্পে দেখানো হয়েছে যে, কৃষিপ্রধান দেশে বর্ষা ও শীতকাল হচ্ছে কাজের সময়। এই সময় গ্রামবাসীরা অসুস্থ হয়ে শুয়ে থাকতে পারেনি কারণ তাদের জন্য কাজের চেয়ে বড় কোনো কিছু ছিল না। তবে শরৎকালে কিছুটা অবসর পাওয়ার সুযোগ তৈরি হত, আর ঠিক তখনই ম্যালেরিয়া জ্বর গ্রামবাসীদের উপর আক্রমণ করত। আশ্বিন মাসে ম্যালেরিয়া এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ত যে, মানুষ ঘরে ঘরে ছেঁড়া কাঁথা, ন্যাকড়া, ত্যানা গায়ে জড়িয়ে কাঁপত। এই জ্বরটি এতই ভয়ঙ্কর ছিল যে, লেখক এটি বাঘের সাথে তুলনা করেছেন। বাঘ যেমন ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারকে আক্রমণ করে, তেমনি ম্যালেরিয়া জ্বরও আক্রমণ করত গ্রামের মানুষের উপর। এই সময়ে ম্যালেরিয়ার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে এটি বাঘের মতো আক্রমণ করত।
খ. ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালোপ্যাথি’ গল্পে শরৎকালের সুস্থ ও ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সেই সময়ে গ্রামের প্রায় সবাই এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের একমাত্র ভরসা হয় এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার তোরাপ। লেখকের গ্রামের ত্রিশ-পঁইত্রিশ বছর আগে যারা ডাক্তার ছিলেন, তাদের মধ্যে তোরাপ ডাক্তার ছিলেন একজন এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক। গ্রামের দুই হাতুড়ে ডাক্তার তোরাপ ও অঘোরের মধ্যে প্রতিযোগিতায় সবসময় তোরাপ ডাক্তারই এগিয়ে থাকতেন, কারণ ম্যালেরিয়া জ্বরের মতো বড় রোগের চিকিৎসা অঘোরের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় সম্ভব ছিল না। একমাত্র তোরাপ ডাক্তারই ম্যালেরিয়া জ্বরের চিকিৎসা করতে পারতেন। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৯: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পের মাধ্যমে হাসান আজিজুল হক সরস ভাষায় গ্রাম্য দুজন হাতুড়ে ডাক্তারের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা তুলে ধরেছেন।
খ. হাসান আজিজুল হকের ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ ব্যঙ্গাধর্মী গল্পটি একটি শিক্ষণীয় গল্প। তিনি ছিলেন সহজ সরল ভাষার লেখক। সহজ, সরল, ভাব-ভাষা ব্যবহার করে তিনি এ গল্পটিকেও অনবদ্য করে তুলেছেন। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১০: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পটি হাসান আজিজুল হকের লিখিত সামাজিক সচেতনতা, কর্তব্যবোধ এবং দায়বদ্ধতামূলক রচনা। গ্রামের সহজ সরল মানুষকে কৌশলে বোকা বানিয়ে দুই হাতুরে ডাক্তারের নিজ স্বার্থ উদ্ধারের বিষয়টি গল্পে উপস্থাপিত হয়েছে। অঘোর ডাক্তার ছিলেন হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক। অপরদিকে, তোরাপ ডাক্তার ছিলেন এ্যালোপ্যাথ চিকিৎসক। রোগী পেলে উভয়ই খুশি; দুটো পয়সা রোজগারের আশায়। সাধারণত, কাজের মৌসুমে লোকজন রোগ-বালাইকে খুব একটা গুরুত্ব দিতো না। কেননা, অসুস্থতার দোহাই দিয়ে শুয়ে থাকলে পেটে ভাত জুটবে না। কৃষিপ্রধান সমাজে বর্ষা মৌসুম হলো শস্য, বীজ রোপণ করার উপযুক্ত সময় এবং শীত মৌসুম হলো ফসল কেটে ঘরে তোলার সময়। ম্যালেরিয়া ছিলো গ্রামের লোকদের প্রধান ভয়। বাঘ যেমন পুঁটি পুঁটি পায়ে এগিয়ে এগিয়ে হঠাৎ লাফ দিয়ে। ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের টুটি কামড়ে ধরে, ঠিক ম্যালেরিয়া জ্বর। ছিলো তেমনই। ম্যালেরিয়া জ্বর এসে গ্রামের গরিব লোকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। তাঁরা ম্যালেরিয়াকে বাঘা জ্বর বলে অভিহিত করেছে। এ জ্বরে মানুষ ছেঁড়া কাঁথা, ন্যাকড়া, ত্যানা গায়ে চাপিয়ে কোঁকাতো। গায়ের কাপুনি থামাবার জন্য পাথরের জাঁতা পর্যন্ত দিতো; এতো ভয়াবহ হওয়ার কারণে তাই বলা হয়েছে, ‘ম্যালেরিয়ার মতো বাঘা জ্বর আর নেই’।
খ. হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি গল্পের অঘোর ডাক্তার এবং তোরাপ ডাক্তার উভয়ই ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে সক্রিয় ছিলেন। লেখক পঠিত গল্পে গ্রামের সাধারণ গ্রামীণ জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন। গ্রামের মানুষদের প্রধান পেশা ছিলো কৃষিকাজ। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ছিলো অশিক্ষিত, অজ্ঞ। ভালো কিংবা মন্দ বিচার করার মতো ক্ষমতা তাঁদের ছিলো না বলেই গ্রামের দুজন হাতুড়ে ডাক্তার তোরাপ ও অঘোরের জাঁতাকলে পৃষ্ট হতে হয়েছে। গ্রাম্য দুজন হাতুরে ডাক্তার এবং তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে গ্রামের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের চিত্র গল্প করে লেখক হেমাপ্যাথি-এ্যালাপ্যাথি গল্পে উপস্থাপন করেছেন। হেমাপ্যাথি চিকিৎসক হলেন- অঘোর ডাক্তার; অপরদিকে এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন তোরাপ ডাক্তার। তোরাপ ডাক্তার কৃষিকাজও করতে অভ্যস্থ ছিলেন। একজন ডাক্তারের ধর্ম হলো রোগীকে চিকিৎসা করা; সুস্থ করে তোলা। কিন্তু, অঘোর ডাক্তারের চিকিৎসা সরঞ্জাম বলতে তেমন কিছুই ছিলো না। তিনি অনেক সময় শুধু পানি মিশ্রিত, স্পিরিট মিশ্রিত পুড়িয়া দিয়ে গ্রামের সহজ সরল মানুষদের থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিতেন। হোমিওপ্যাথ চিকিৎসার নামে তার চরিত্রে চালাকি এবং প্রতারণার দিকটি উন্মোচিত হয়েছে। |
| ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১১: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও: |
|
ক. হাসান আজিজুল হক ‘হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পে অঘোর ডাক্তারের চরিত্রে লোভী মানসিকতা ফুটিয়ে তুলেছেন।
খ. “হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি’ গল্পে অঘোর ডাক্তার এবং তোরাপ ডাক্তারের মধ্যে সাদৃশ্য হলো উভয়ই গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তার, স্বপ্নবিদ্যা অধিকারী এবং বৈসাদৃশ্য হলো তোরাপ ডাক্তারের তুলনায় অঘোর ডাক্তার প্রতারণাপূর্ণ এবং অধিক লোভী। |
| তথ্যসূত্র : |
|---|
|
১. আনন্দপাঠ: অষ্টশ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা,
২০২৬। ২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮। ৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫। |
