উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম

উমর ফারুক
উমর ফারুক

উমর ফারুক
কাজী নজরুল ইসলাম

তিমির রাত্রি-এশার আজান শুনি দূর মসজিদে,
প্রিয়-হারা কার কান্নার মত এ-বুকে আসিয়া বিঁধে!

আমির-উল্-মুমেনিন,
তোমার স্মৃতি যে আজানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন
তকবির শুনি, শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি,
বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি রে গগনে মরুর শশী?
ও-আজান, ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান?
মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহ্বান?

আবার লুটায়ে পড়ি!
‘সেদিন গিয়াছে’-শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি!
উমর! ফারুক! আখেরী নবির ওগো দক্ষিণ-বাহু!
আহ্বান নয়- রূপ ধরে এসো!- গ্রাসে অন্ধতা-রাহু!
ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!
সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ!
শুধু আঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমসের
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি
আর একবার লোহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি!
ইসলাম-সে তো পরশ-মানিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি?
পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি।
আজ বুঝি-কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর-
‘মোর পরে যদি নবি হতাে কেউ, হতো সে এক উমর।’

--------------------------------------

অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধূলার তখতে বসি
খেজুর পাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি
সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি কো নুয়ে,
ঊর্ধ্বের যারা-পড়েছে তাহারা, তুমি ছিলে জওয়াব ভুঁয়ে।
শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ
করেছে সালাম দূর হতে সব ছুঁইতে পারেনি পদ।
সবারে উর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,
বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে।

হেরি পশ্চাতে চাহি-
তুমি চলিয়াছ রোদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি
জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি
বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি।
দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা, বলেছে শত্রু শেষে-
উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে।
হায় রে আধেক ধরার মালিক আমিরুল-মুমেনিন
শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন
সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু খানা শুকনো ‘খবুজ’ রুটি
একটি মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু তিন মুঠি!
প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি
চলেছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি!
মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে,
সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে।
কিছুদুর যেতে উট হতে নামি কহিলে ভৃত্যে, ‘ভাই,
পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এইবার আমি যাই
উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে;
তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে।’

.........ভৃত্য দস্ত চুমি
কাঁদিয়া কহিল, ‘উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি?
উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি
আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?’

খলিফা হাসিয়া বলে,
‘তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে।
রোজ-কিয়ামতে আল্লাহ যে দিন কহিবে, ‘উমর! ওরে
করেনি খলিফা, মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে!’
কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই?
আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু! মোর অধিকার নাই।
আরাম সুখের,-মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা!
ইসলাম বলে সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কে-বা!
ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষেরে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধূলায় নামিল শশী!
জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্পবৃষ্টি হইল কি-না,
কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দি বিশ্ববীণা!
জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব,-
অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, ‘জয় জয় হে মানব।’...

------------------------------------------

তুমি নির্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনিকো কারে ভয়,
সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধত কয়
মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষেরি অপমান,
তাই মহাবীর খালেদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান,
সিপাহ-সালারে ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা,
বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না

-----------------------------------------

মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি,
মনে পড়ে তব মহত্ত্ব-কথা-সেদিন সে বিভাবরী
নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে
মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুধাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে
কাঁদিতেছে আর দুঃখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে হায়,
উনানে শূন্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকূলে চায়!
শুনিয়া সকল-কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে
বায়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজ হাতে,
বলিলে, ‘এ সব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের পরে,
আমি লয়ে যাব বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে!’
কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা,
বলিলে, ‘বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা!
রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার?
মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার
প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি!’-চলিলে নিশীথ রাতে
পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে

এত যে কোমল প্রাণ,
করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি কো অপমান!
মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে
মেরেছ দোর্রা, মরেছে পুত্র তোমার চোখের পরে।
ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি-
‘অপরাধ করে তোরি মত স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী।’

আবু শাহমার গোরে
কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে।

খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে,
‘কোথায় খলিফা’ কেবলি প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে,
একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে,
রোদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে।
...হে খলিফাতুল মুসলিমিন! হে চীরধারী সম্রাট!
অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ,
মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই
তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই। (সংক্ষেপিত)

‘উমর ফারুক’ কবিতার উৎস নির্দেশ:
‘উমর ফারুক’ কবিতাটি কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘জিঞ্জীর’ (১৯২৮) কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে। কবিতাটি মাত্রাবৃত ছন্দে এবং সাধুভাষায় রচিত।

‘উমর ফারুক’ কবিতার শব্দার্থ ও টীকা:
➠ তিমির- অন্ধকার।
আমির উল-মুমেনিন- বিশ্বাসীদের নেতা; এখানে বিশেষভাবে বোঝানো হয়েছে মুসলামানদের ধর্মীয় প্রধান ও রাষ্ট্রীয় নেতা হজরত উমর (রা) কে।
➠ মুয়াজ্জিন- যিনি আজান দেন।
➠ তকবির- ‘আল্লাহ’ ধ্বনি বা রব।
➠ চকিতে- নিমিষে।
➠ বাতায়ন- জানালা।
➠ গগনে- আকাশে।
➠ মরুর শশী- মরুভূমি চাঁদ।
পাপিয়ার ডাক- স্ত্রী পাখিটাকে বলা হয় পাপিয়া,আর পুরুষটি হলো পিউ। দুটোকে একত্রে পাপিয়া কিম্বা পিউ-পাপিয়া বলা হয়। এদের ডাক হিন্দিতে ‘পিউ কাঁহা’, বাংলায় ‘চোখ গেল’ ডাক অনুযায়ী ঐ নামেও চিহ্নিত করা হয়। সাধারণভাবে পাপিয়ার ডাক একটি পরিচিত এবং শ্রুতিমধুর শব্দ যা অনেকের কাছেই পরিচিত।
➠ শিয়র- মাথা।
➠ আখেরি- শেষ।
➠ দক্ষিণ বাহু- ডান হাত; কারো প্রধান অবলম্বন বা সহযোগীতা বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়।
➠ জ্যোতি- উজ্জ্বলতা; দীপ্তি।
➠ ক্ষীণ- মৃদু।
➠ তাপ- উত্তাপ।
➠ হস্ত- হাত।
➠ পেরেসান- বিপর্যস্ত; ক্লান্ত।
➠ পরশ-মানিক- স্পর্শমণি; যার ছোঁয়ায় লোহাও সোনা হয়।
➠ তখত- সিংহাসন।
➠ সাইমুম- শুকনো উত্তপ্ত শ্বাসরোধকারী প্রবল হাওয়া- বিশেষত মরুভূমির হাওয়া।
➠ মশক- পানি বইবার চামড়ার থলে।
➠ দোর্রা- চাবুক।
➠ চীর- ছিন্ন বস্ত্র।
➠ চীরধারী- ছিন্ন বস্ত্র পরিধানকারী।
➠ পিরান- জামা।
➠ নান্দী- স্তুতি; কাব্যপাঠ বা নাটকের শুরুতে ছোট করে মঙ্গলসূচক প্রশস্তি পাঠ।
➠ শমসের- তরবারি।
➠ দস্ত- হাত।
➠ পেরেশান- বিপর্যস্ত; ক্লান্ত।
➠ খালেদ- খালিদ বিন ওয়ালিদ সপ্তম শতাব্দীর একজন আরবের বীর সেনাপতি ছিলেন। খলিফা আবু বকর এবং উমরের সময়কার বীর যোদ্ধা। আবু বকর (রা)-এর মৃত্যুরপর উমর খলিফা হলে খালিদকে পদচ্যুত করে আবু উবাইদাকে সেনাপতি নিয়োগ করেন। কারণ, অনেক মুসলিম বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, খালিদের কারণেই যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হচ্ছে। এই ব্যাপারে উমর বলেছিলেন : বিজয় আল্লাহর তরফ থেকে আসে; শুধু খালিদের কারণে নয়।
➠ উমর ফারুক- ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। ইসলাম ধর্মগ্রহণের পূর্বে তিনি পৌত্তলিক ছিলেন। তাঁর খেলাফতের সময়কাল দশ বছর (৬৩৪-৬৪৪ খিষ্টাব্দ)। তাঁর শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমা আরব সাম্রাজ্য থেকে মিশর ও তুর্কিস্তানের সীমা পর্যন্ত প্রসারিত হয়। একজন ন্যায়নিষ্ঠ, নির্ভীক ও গণতন্ত্রমনা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর খ্যাতি চির অম্লান। 'ফারুক' হজরত উমরের উপাধি। যিনি সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারেন তাঁকেই 'ফারুক' বলা হয়। হজরত উমর (রা.) ছিলেন সত্যের একজন দৃঢ়চিত্ত উপাসক।
‘তোমার স্মৃতি যে আযানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন’- হজরত উমরের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পূর্বে নামাজের জন্য প্রকাশ্য আজান দেয়ার রীতি ছিল না। কোরেশদের ভয়ে মুসলমানরা উচ্চরবে আজান দিতে সাহস পেত না। উমর ছিলেন কোরেশ বংশোদ্ভূত শ্রেষ্ঠবীর। তিনি যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন, তখন প্রকাশ্যে আজান দিতে আর কোনো বাধা রইল না। তাই আজানের সঙ্গে যে উমরের স্মৃতি বিজড়িত সে কথা অনেক মুয়াজ্জিন জানে না।
➠ জেরুজালেম- ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের একটি প্রাচীন শহর জেরুজালেম।
➠ আবু শাহমা- হজরত উমরের পুত্র। মদপানের অপরাধে খলিফা তাকে ৮০টি বেত্রাঘাতের নির্দেশ দেন এবং নিজেই বেত্রাঘাত করেন। বেত্রাঘাতের ফলে আবু শাহমার মৃত্যু হয়।
➠ খলিফাতুল-মুসলেমিন- মুসলিমদের খলিফা; মুসলিমদের প্রতিনিধি

‘রানার’ কবিতার লাইনের ব্যাখ্যা:

তিমির রাত্রি—‘এশা'র আজান শুনি দূর মসজিদে।
প্রিয় হারা কার কান্নার মত এ বুকে আসিয়া বিধে

ব্যাখ্যা: রাতের অন্ধকারে দূর মসজিদের এশার আজান কবির বুকে হারানো প্রিয়জনের কান্নার মতো বিঁধে যায়। সূচনা-ইঙ্গিতে বোঝায়—আজানের ধ্বনি কবিকে উমর ফারুকের স্মৃতিতে টেনে নিচ্ছে।

আমির-উল-মুমেনিন,
তোমার স্মৃতি যে আজানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন।
তকবির শুনি, শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি,
বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি-রে গগনে মরুর শশী?
ও-আজান, ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান?
মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহ্বান?

ব্যাখ্যা: কবি আমির-উল-মুমেনিন (বিশ্বাসীদের নেতা) উমর ফারুককে সম্বোধন করে বলছেন—আজানের ধ্বনিতে তাঁর স্মৃতি জাগ্রত হয়, যদিও মুয়াজ্জিন (আজানদাতা) তা জানেন না। আজানের তকবির ধ্বনি শোনামাত্রই কবি শয্যা থেকে চমকে উঠে বসেন এবং জানালার দিকে তাকিয়ে মরুভূমির আকাশে চাঁদ উঠেছে কি না দেখতে চান। তিনি ভাবেন-এই আজানের সুর কি শুধু সাধারণ পাখির (পাপিয়া) ডাক, না কি চকোর পাখির গান? নাকি মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে এটি উমর ফারুকেরই কোনো আহ্বান, যা তাঁকে ন্যায়, সত্য ও ইসলামের সোনালি যুগের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে।

আবার লুটায়ে পড়ি।
“সেদিন গিয়াছে”—শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি।
উমর! ফারুক! আখেরী নবির ওগো দক্ষিণ বাহু!
আহ্বান নয় রূপ ধরে এস গ্রাসে অন্ধতা—রাহু!
ইসলাম রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!
সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ!
শুধু আঙ্গুলি হেলনে শাসন করিতে এ জগতের
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি
আর একবার লোহিত সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি!
ইসলাম-সে তো পরশ মানিক তাকে কে পেয়েছে খুঁজি?
পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি।
আজ বুঝি কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর-
মোর পরে যদি নবি হত কেউ, হত সে এক উমর।

ব্যাখ্যা: কবি আবার শয্যায় শুয়ে পড়েন, কিন্তু কালের ঘড়ির শব্দ যেন তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয়-উমরের সেই স্বর্ণযুগ চলে গেছে। তিনি উমরকে সম্বোধন করে বলেন-আপনি ছিলেন শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ডান হাত, তাঁর দৃঢ় সহচর। আজ আবার সেই রূপে আসুন, কারণ অন্ধকারের ‘রাহু’ ইসলামকে গ্রাস করছে। ইসলাম ছিল সূর্যের মতো উজ্জ্বল, কিন্তু আজ তার আলো ক্ষীণ হয়ে গিয়েছে; সত্যের উজ্জ্বল আলো নিভে গিয়ে ক্ষুদ্র জোনাকির মতো ক্ষীণ আলোকচ্ছটা মাত্র আছে।
একসময় শুধু আঙুলের ইশারাতেই আপনি সমগ্র পৃথিবী শাসন করতেন এবং সেই ক্ষমতাকে উৎসর্গ করেছিলেন নবীজির পদতলে-তাঁর হাতে দিয়েছিলেন আপনার তরবারি (শমশের)। তাই কবি আহ্বান করছেন-ফিরদৌস (স্বর্গ) ছেড়ে আবার সেই তরবারি হাতে নেমে আসুন, লোহিত সাগরের যুদ্ধক্ষেত্রে আবার রক্তে ভিজে শহীদ হোন।
ইসলাম একটি ‘পরশ মানিক’—যার সংস্পর্শে সাধারণ মানুষও সোনার মতো মহৎ হয়ে ওঠে। কবি বলেন, বুঝতে পারছি কেন শেষ নবী বলেছিলেন—“আমার পরে যদি কোনো নবী হতো, তবে সে হতো উমর”-কারণ তাঁর চরিত্র, নীতি, সাহস ও নেতৃত্ব নবুওতের উচ্চতায় পৌঁছেছিল।

অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধূলার তখতে বসি
খেজুর পাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি
সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’নুয়ে
ঊর্ধ্বের যারা পড়েছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভূঁয়ে।
শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ
করেছে সালাম দূর হতে সব ছুঁইতে পারেনি পদ।
সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,
বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে।

ব্যাখ্যা: এ অংশে কবি হজরত উমর ফারুক (রাঃ)-এর শাসনকালীন সরল জীবনযাপন, আত্মসংযম ও বিনয়ের কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেও নিজেকে ধূলার তখতে (সাধারণ মাটির আসন) বসিয়ে রাখতেন। তাঁর বাসস্থান ছিল খেজুরপাতা দিয়ে তৈরি সাধারণ প্রাসাদ, যা সাইমুম (মরুর প্রচ- ঝড়) এ বারবার ভেঙে যেত। কিন্তু এই ঝড়ে তাঁর নীতি ও চরিত্র কখনো টলেনি-যারা পদমর্যাদা বা বিলাসে ডুবে গিয়েছিল, তিনি তাদের মতো পড়ে যাননি; বরং দৃঢ়ভাবে মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন।
ক্ষমতা, ধন, বিলাস, ঐশ্বর্যের প্রলোভন বারবার তাঁর দিকে হাত বাড়ালেও, সেগুলো কেবল দূর থেকে সালাম জানিয়ে ফিরে গিয়েছে; তাঁর পবিত্রতা ও সততার কাছে পৌঁছাতে পারেনি। তিনি ছিলেন এমন নেতা, যিনি সবার উপরে থেকে সকলকে উপরে তুলেছেন, কিন্তু নিজে বিনম্র হয়ে নীচে থেকেছেন-সবাইকে নিজের বুকে স্থান দিয়েছেন, আর নিজেকে পিছনে রেখেছেন।

হেরি পশ্চাতে চাহি—
তুমি চলিয়াছ রোদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি
জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি
বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি।
দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা বলেছে শত্রু শেষে-
উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে!
হায় রে, আধেক ধরার মালিক আমির-উল-মুমেনিন
শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন
সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু খানা শুকনো 'খবুজ' রুটি
একটি মশকে একটুকু পানি খোমা দু তিন মুঠি।
প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি
চলেছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি!
মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে,
সে আগুন তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে।
পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এইবার আমি যাই
উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে,
তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে।”

ব্যাখ্যা: এ অংশে কবি হজরত উমর ফারুক (রাঃ)-এর বিনয়, সরলতা ও দায়িত্ববোধকে এক ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে চিত্রিত করেছেন। কবি কল্পনায় দেখছেন-উমর ফারুক রোদের তাপে দগ্ধ মরুপথ ধরে হাঁটছেন। তখন জেরুজালেমের দুর্গ দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম বাহিনী অবরোধ করে রেখেছে। শত্রুরা অবশেষে আত্মসমর্পণে রাজি হয় এই শর্তে-শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করতে অবশ্যই উমরকে আসতে হবে।
এই খবর শোনার পর অর্ধেক পৃথিবীর শাসক আমির-উল-মুমেনিন উমর একাই উটে চড়ে সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিতে রওনা হন। তাঁর সঙ্গে নেই কোনো রাজকীয় প্রহরা, নেই বিলাসিতা-শুধু ঝুলিতে দুটি শুকনো ‘খবুজ’ রুটি, একটি মশকে সামান্য পানি এবং খেজুরের কয়েক মুঠি। সঙ্গী হিসেবে আছেন মাত্র একজন ভৃত্য, যিনি উটের রশি ধরে হাঁটছেন।
মরুর প্রখর সূর্য যেন আকাশ থেকে আগুন বর্ষণ করছে, আর সেই তাপে মরুর বালুকা খইয়ের মতো ফুটছে। কিছুদূর যাওয়ার পর উমর উট থেকে নেমে ভৃত্যকে বলেন—“ভাই, তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছ, এবার আমি উটের রশি ধরব, তুমি উটে উঠে বসো। আমার পা তপ্ত বালিতে হাঁটতে হাঁটতে রক্তাক্ত হয়ে গেছে।”

....ভৃত্য হস্ত চুমি
কাঁদিয়া কহিল, "উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি?
উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি
আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?

ব্যাখ্যা: ভৃত্যের আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভক্তি প্রকাশ পেয়েছে। যখন হজরত উমর (রাঃ) তাঁকে উটে বসতে এবং নিজে উটের রশি ধরে হাঁটতে বলেন, তখন ভৃত্য গভীর আবেগে আপত্তি জানায়।
ভৃত্য উমরের হাত চুম্বন করে কাঁদতে কাঁদতে বলে—“হে উমর! আপনি কেমন করে এমন আদেশ দিতে পারেন? আমি, একজন সাধারণ গোলাম, আরাম করে উটে বসে থাকব, আর আপনি-সমগ্র মুসলিম জগতের খলিফা-উটের রশি ধরে হেঁটে যাবেন?”
এখানে ভৃত্যের বিস্ময় ও আপত্তি থেকে বোঝা যায়, তিনি উমরের মহত্ত্ব ও মর্যাদার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল। তাঁর কাছে এটি অসম্ভব বলে মনে হয় যে, একজন খলিফা নিজের কষ্ট মেনে নিয়ে ভৃত্যকে আরাম দেবেন।

খলিফা হাসিয়া বলে,
‘তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে।
রোজ-কিয়ামতে আল্লাহ যে দিন কহিবে, “উমর! ওরে
করেনি খলিফা, মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে।

ব্যাখ্যা: হজরত উমর ফারুক (রাঃ) অত্যন্ত বিনয়ী ও নীতিবান শাসক হিসেবে তাঁর চিন্তাভাবনা প্রকাশ করছেন। ভৃত্যের আপত্তির জবাবে তিনি হাসিমুখে বলেন-তুমি যদি এখন উটে বসো, তাহলে পরে সবাই ভাববে তুমি আমাকে হারিয়ে বড় হয়ে গেছ, অর্থাৎ আমাকেই সেবা করেছ। কিন্তু কিয়ামতের দিনে যখন আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন—“হে উমর! তুমি কি খলিফা হয়ে নিজের আরামের জন্য ভৃত্যকে কষ্ট দিয়েছ?”—তখন আমি কী উত্তর দেব?
এখানে তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, তাঁর কাছে দুনিয়ার মর্যাদা বা বাহ্যিক বড়ত্ব কোনো গুরুত্ব রাখে না; বরং তিনি পরকালের জবাবদিহিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এজন্য তিনি চান না যে, তাঁর ভৃত্য কষ্ট পাক আর তিনি আরাম ভোগ করুন।

কী দিব জওয়াব কী করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই।
আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু। মোর অধিকার নাই।
আরাম সুখের, - মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা।
ইসলাম বলে, সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কেবা।
ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষেরে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী।

ব্যাখ্যা: হজরত উমর ফারুক (রাঃ) তাঁর শাসনদর্শন ও মানবিক মূল্যবোধের গভীরতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন—কিয়ামতের দিনে প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সামনে কী উত্তর দেব যদি মানুষের প্রতিনিধি হয়েও আমি নিজের আরামের জন্য অন্যকে কষ্ট দিই? তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, তিনি কেবল জনগণের প্রতিনিধি, নিজের জন্য কোনো বিশেষ অধিকার দাবি করেন না।
তিনি বলেন-মানুষ হয়ে মানুষের সেবা করাই আসল কর্তব্য, আর ইসলাম শিখিয়েছে যে, আল্লাহর দৃষ্টিতে সবাই সমান; এখানে বড় বা ছোট বলে কোনো ভেদাভেদ নেই।
শেষে দেখা যায়, ভৃত্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও উটে চড়ে বসে, আর খলিফা উমর নিজ হাতে উটের রশি ধরে হাঁটেন। কবি এই দৃশ্যকে উপমার মাধ্যমে বলেন—তিনি মানুষকে মর্যাদার স্বর্গে তুলে দিয়েছেন, কিন্তু নিজে সেই গৌরব ত্যাগ করে বিনয়ের ধূলায় অবস্থান করেছেন।

জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্প বৃষ্টি হইল কিনা,
কী গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দি বিশ্ববীণা।
জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব—
অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, জয় জয় হে মানব।

ব্যাখ্যা: কবি উমর ফারুক (রাঃ)-এর মানবিকতা ও বিনয়কে কাব্যিকভাবে মহিমান্বিত করেছেন। তিনি কল্পনা করছেন—যেদিন উমর নিজের আরামের চেয়ে ভৃত্যের আরামকে অগ্রাধিকার দিয়ে উটের রশি হাতে মরুভূমিতে হেঁটেছিলেন, সেদিনের সেই দৃশ্য হয়তো আকাশের ফেরেশতারাও বিস্ময়ে দেখেছিল।
কবি ভাবছেন—সেদিন হয়তো আকাশ থেকে ফুলের বৃষ্টি হয়েছিল, হয়তো মানুষ বিশ্ববীণায় (বিশ্বের হৃদয়তন্ত্রীতে) প্রশংসার গান গেয়েছিল। এমনকি ফেরেশতারাও হয়তো তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে স্তব গেয়েছিল। আর ভবিষ্যৎ ইতিহাসও সেই মহৎ ঘটনার জয়গান করবে—‘জয়, জয় হে মানব!’—কারণ তিনি মানবতার সেরা উদাহরণ হয়ে উঠেছিলেন।

তুমি নির্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনি ক' কারে ভয়
সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধৃত কয়।
মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষেরি অপমান,
তাই মহাবীর খালেদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান,
সিপাহ সালারে, ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা,
বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না।

ব্যাখ্যা: কবি উমর ফারুক (রাঃ)-এর নির্ভীকতা, সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়বোধকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি ছিলেন এমন একজন শাসক যিনি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারও ভয়ে মাথা নত করতেন না। সত্যের পথে অবিচল থাকার কারণে সবাই তাঁকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করত।
কবি বলছেন, উমর মানুষের মধ্যে থেকে মানুষকে পূজা করাকে অপমান হিসেবে দেখতেন। তাঁর মতে, মানুষকে অতি প্রশংসা বা পূজা করা উচিত নয়, কারণ সব মানুষ সমান। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বিশ্ববিজয়ী সাহসী সেনাপতি খালেদ বিন ওয়ালিদকে একটি ফরমান পাঠিয়ে সাধারণ সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেনাপতির পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সময় উমর একটুও দ্বিধা করেননি, যদিও খালেদ ছিলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনানায়ক। এটি প্রমাণ করে যে, উমর ন্যায়নীতি রক্ষায় কতটা দৃঢ় ছিলেন এবং কোনো ব্যক্তি বা খ্যাতিকে সত্য ও সমতার পথে বাধা হতে দেননি।

মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি,
মনে পড়ে তব মহত্ত্ব-কথা—সেদিন সে বিভাবরী
নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে
মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুধাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে
কাঁদিতেছে আর দুঃখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে হায়,
উনানে শূন্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকূলে চায়।
শুনিয়া সকল কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে
বায়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজ হাতে,
বলিলে, ‘এ সব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের’ পরে,
আমি লয়ে যাব বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে।
কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা,
বলিলে, 'বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা!
রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার?
মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার
প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি'-চলিলে নিশীথ রাতে
পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে!

ব্যাখ্যা: কবি উমর ফারুক (রাঃ)-এর মানবপ্রেম, দয়া ও দায়িত্ববোধের এক অসাধারণ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। একদিন রাতে তিনি নগরভ্রমণে বের হয়ে দূরে একটি দৃশ্য দেখলেন—এক দরিদ্র মা তার দুই ক্ষুধার্ত সন্তানকে কোলে নিয়ে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করছে। উনুনে শূন্য হাঁড়ি চড়ানো, কিন্তু তাতে কোনো খাবার নেই; মা শুধু সন্তানদের শান্ত করতে হাঁড়ি বসিয়ে রেখেছে। সন্তানরা ক্ষুধায় কাঁদছে আর মা অসহায়ভাবে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছে।
এই দৃশ্য দেখে উমর ফারুক (রাঃ) গভীরভাবে মর্মাহত হন। সঙ্গে সঙ্গে মদিনার বায়তুল-মালে গিয়ে নিজের হাতে ঘি, আটা ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী নিয়ে আসেন। তিনি অন্য কাউকে এই বোঝা বহন করতে দেননি। লোকেরা যখন সাহায্য করতে চাইল, তখন তিনি বলেন—‘বন্ধু, এই বোঝা আমারই বহন করা উচিত, কারণ কিয়ামতের দিনে আমারই জবাব দিতে হবে। আমার শাসনামলে এই শিশুদের ক্ষুধায় কাঁদতে হয়েছে—এটা আমারই অপরাধ, আর তার প্রায়শ্চিত্ত আমাকেই করতে হবে।’
তিনি রাতের অন্ধকারে নিজ কাঁধে খাদ্যসামগ্রী বহন করে সেই দরিদ্র মায়ের বাড়িতে পৌঁছে দেন। এই ঘটনা তাঁর শাসক হিসেবে দায়িত্ববোধ, সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নেওয়ার মনোভাবের এক বিরল উদাহরণ।

এত যে কোমল প্রাণ,
করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি কো অপমান!
মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে
মেরেছ দোর্রা, মরেছে পুত্র তোমার চোখের পরে!
ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাধি—
‘অপরাধ করে তোরি মত স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী।’

ব্যাখ্যা: কবি উমর ফারুক (রাঃ)-এর চরিত্রের আরেকটি দিক-ন্যায়পরায়ণতা ও দৃঢ়তা-প্রকাশ করেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ, মানুষের কষ্টে যিনি মর্মাহত হতেন। কিন্তু সেই কোমলতা কখনও ন্যায়ের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
একবার তাঁর নিজের প্রিয় পুত্র মদ্যপানের অপরাধ করেছিল। ইসলাম ধর্মে মদ্যপান একটি বড় গুনাহ, তাই আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া আবশ্যক। উমর (রাঃ) কোনো পক্ষপাত না করে নিজ হাতে পুত্রকে দোররা (চাবুক) মারেন। শাস্তির সময় পুত্র মারাত্মক আঘাত পেয়ে তাঁর সামনেই মৃত্যুবরণ করে।
পুত্র মৃত্যুর আগে ক্ষমা চাইলে, উমর (রাঃ) পাষাণ হৃদয়ে নয়, বরং ন্যায়ের দৃঢ়তা বজায় রেখে বলেন—‘অপরাধী অপরাধ করে যেমন কান্না করে, তুমিও তাই করেছ; কিন্তু ন্যায়ের বিধান রক্ষা করতেই হবে।’

আবু শাহমার গোরে
কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে
খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে,
‘কোথায় খলিফা' কেবলি প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে,
একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে,
রোদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে ।
হে খলিফাতুল মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট।
অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ,
মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই
তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই।

ব্যাখ্যা: কবি উমর ফারুক (রাঃ)-এর বিনয়, সাধারণ জীবনযাপন এবং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার চিত্র তুলে ধরেছেন।
প্রথমে বলা হয়েছে-কেউ আবু শাহমার কবরের কাছে কাঁদতে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ফিরে এসে উমর ফারুক (রাঃ)-কে সালাম জানান। এরপর দৃশ্যপট বদলে যায়-খলিফার দরবারে হাজারো মানুষের ভিড়, যারা অধীর আগ্রহে খলিফাকে দেখতে চাইছে। সবাই প্রশ্ন করছে-‘খলিফা কোথায়?’
তাদের অবাক করে দিয়ে দেখা গেল-খলিফা উমর কোনো রাজকীয় পোশাকে নয়, বরং সাধারণ একটি মাত্র পিরান (কাপড়) ধুয়ে রোদে শুকাচ্ছেন এবং আঙিনায় বসে আছেন। তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের সর্বশক্তিমান শাসক, অথচ এত সরল জীবনযাপন করতেন যে তাঁর পোশাকও ছিল সাধারণ মানুষের মতো।
কবি তাঁকে সম্বোধন করছেন-“হে খলিফাতুল মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট!”—অর্থাৎ মুসলিমদের নেতা ও দীর্ঘ পোশাক পরিহিত শাসক। কবি জানাচ্ছেন, আজ তাঁকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশংসাবাণী (নান্দী পাঠ) দিয়ে সম্মান জানানো হবে না, কারণ তাঁর আসল মহিমা ছিল মানুষের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি সবাইকে বন্ধু ও ভাই বলে সম্বোধন করতেন। সেই ভালোবাসার জন্যই মানুষ তাঁকে সর্বদা চোখের জলে স্মরণ করে।


‘উমর ফারুক’ কবিতার পাঠ-পরিচিতি:
‘উমর ফারুক’ কবিতাটিতে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা)-এর জীবনাদর্শ, চরিত্র-মাহাত্ম্য, মানবিকতা এবং সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। খলিফা উমর (রা) ছিলেন একজন মহৎ ব্যক্তিত্ব। তাঁর চরিত্রে একাধারে বীরত্ব, কোমলতা, নিষ্ঠা এবং সাম্যবাদী আদর্শের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হয়েও তিনি অতি সহজ, সরল, অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। নিজ ভৃত্যকেও তিনি তাঁর সঙ্গে সমান মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত হননি। ন্যায়ের আদর্শ সমুন্নত রাখতে তিনি আপন সন্তানকে কঠোরতম শাস্তি দিতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি ছিলেন আমির-উল-মুমেনিন। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে আদর্শবান ব্যক্তিত্ব বলে বিশ্বাস করেই বলেছিলেন, তাঁর পরে যদি কেউ নবি হতেন, তাহলে তিনি হতেন উমর। মহৎপ্রাণ ও আদর্শ মানব চরিত্র অর্জনের জন্য উমর ফারুককে কবি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে কবিতায় উপস্থাপন করেছেন।

‘উমর ফারুক’ কবিতার কবি পরিচিতি:
কাজী নজরুল ইসলাম ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ সালে (২৪শে মে ১৮৯৯) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছেলেবেলায় তিনি লেটো গানের দলে যোগ দেন। পরে বর্ধমান ও ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার দরিরামপুর হাই স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৯১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে করাচি যান। সেখানেই তাঁর সাহিত্য-জীবনের সূচনা ঘটে। তাঁর লেখায় তিনি সামাজিক অবিচার ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। এজন্য তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ বলা হয়। বাংলা সাহিত্য জগতে তাঁর আবির্ভাব এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি সাহিত্যের সকল শাখায় তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি গজল, খেয়াল ও রাগপ্রধান গান রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক ব্যবহার তাঁর কবিতাকে বিশিষ্টতা দান করেছে। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে কবি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর অসুস্থ কবিকে ঢাকায় আনা হয় এবং পরে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। তাঁর রচিত কাব্যগুলোর মধ্যে অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, ছায়ানট, প্রলয়শিখা, চক্রবাক, সিন্ধুহিন্দোল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, শিউলিমালা, মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা ইত্যাদি তাঁর রচিত গল্প ও উপন্যাস। যুগবাণী, দুর্দিনের যাত্রী ও রাজবন্দীর জবানবন্দী তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ।
২৯শে আগস্ট ১৯৭৬ সালে কবি ঢাকার পি.জি. হাসপাতালে (বর্তমান নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মসজিদ-সংলগ্ন প্রাঙ্গণে তাঁকে পরিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।।

‘উমর ফারুক’ কবিতার বহুনির্বাচনি প্রশ্ন :

প্রশ্ন থেকে

অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন -এর মধ্যে!
যা


‘উমর ফারুক’ কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন:

১। প্রিয়-হারা কান্নার মতো কীসের ধ্বনি কবির বুকে এসে বিঁধে?
উত্তর: আজানের ধ্বনি প্রিয়-হারা কান্নার মতো কবির বুকে এসে বিঁধে।
২। কবিতায় আমির-উল মুমেনিন বলা হয়েছে কাকে?
উত্তর: কবিতায় আমির-উল মুমেনিন বলা হয়েছে উমর ফারুক (রা.)-কে।
৩। কবিতায় ‘মরুর শশী’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কবিতায় ‘মরুর শশী’ বলতে বোঝানো হয়েছে উমর ফারুক (রা.)-কে।
৪। কবিতায় ‘আখেরি নবি’ বলে কাকে অভিহিত করা হয়েছে?
উত্তর: কবিতায় আখেরি নবি বলা হয়েছে হজরত মুহম্মদ (স.)-কে।
৫। কবি চকোরীর গান বলে অভিহিত করেছেন কোনটিকে?
উত্তর: কবি চকোরীর গান বলে অভিহিত করেছেন আজানের ধ্বনিকে।
৬। কবির মতে, কার অঙ্গুলি হেলনে একদা জগৎ শাসিত হতো?
উত্তর: কবির মতে হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর অঙ্গুলি হেলনে একদা জগৎ শাসিত হতো।
৭। কবিতায় কার অর্ধেক পৃথিবী শাসন করার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: কবিতায় হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর অর্ধেক পৃথিবী শাসন করার কথা বলা হয়েছে।
৮। কবিতায় মুসলিম সেনাদলের কী অবরোধ করে রাখার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: কবিতায় মুসলিম সেনাদলের জেরুজালেমের দুর্গ অবরোধ করে রাখার কথা বলা হয়েছে।
৯। সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করতে উমর ফারুক (রা.) কীসে চড়ে জেরুজালেম গিয়েছিলেন?
উত্তর: সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করতে উমর ফারুক (রা.) উষ্ট্রে চড়ে জেরুজালেম গিয়েছিলেন।
১০। জেরুজালেম যাওয়ার সময় হজরত উমর (রা.)-এর সাথে কে ছিল?
উত্তর: জেরুজালেম যাওয়ার সময় হজরত উমর (রা.)-এর সাথে মাত্র একজন ভুত্য ছিল।
১১। ‘উমর ফারুক’ কবিতার প্রধান চরিত্র কোনটি?
উত্তর: ‘উমর ফারুক’ কবিতার প্রধান চরিত্র হলো হজরত উমর ফারুক (রা.)।
১২। ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ‘বিভাবরী’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ‘বিভাবরী’ বলতে রাত্রিবেলা বোঝানো হয়েছে।
১৩। মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে হজরত উমর (রা.) নিজেকে কী ভাবতেন?
উত্তর: মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে হজরত উমর (রা.) নিজেকে প্রতিনিধি মাত্র ভাবতেন।
১৪। ক্ষুধাতুর শিশুদুটি কাকে ঘিরে কাঁদছিল?
উত্তর: ক্ষুধাতুর শিশুদুটি মাকে ঘিরে কাঁদছিল।
১৫। হজরত উমর (রা.) ক্ষুধায় ক্রন্দনরত শিশুদের খাবার না পাওয়ার অপরাধ নিজের মনে করেন কেন?
উত্তর: হজরত উমর (রা.) ক্ষুধায় ক্রন্দনরত শিশুদের খাবার না পাওয়ার অপরাধ নিজের মনে করেন দায়িত্ববোধের কারণে।
১৬। হজরত উমর (রা.)-এর পুত্রের নাম কী?
উত্তর: হজরত উমর (রা.)-এর পুত্রের নাম আবু শাহমা।
১৭। ‘আখেরি’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: ‘আখেরি’ শব্দের অর্থ—শেষ।
১৮। হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতের সময়কাল কত ছিল?
উত্তর: হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতের সময় ছিল দশ বছর।
১৯। ‘শমসের’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: ‘শমসের’ শব্দের অর্থ তলোয়ার।
২০। পানি বহনের জন্য ব্যবহৃত চামড়ার থলেকে কী বলা হয়?
উত্তর: পানি বহনের জন্য ব্যবহৃত চামড়ার থলেকে মশক বলা হয়।
২১। হজরত উমর ফারুক (রা.) ইসলামের কততম খলিফা ছিলেন।
উত্তর: হজরত উমর ফারুক (রা.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা।
২২। আজানকে কবি কিসের ডাকের সাথে তুলনা করেছেন?
উত্তর: কবি আজানকে পাপিয়ার ডাকের সাথে তুলনা করেছেন।
২৩। জেরুজালেমের কেল্লায় কারা অবরোধ ছিল?
উত্তর: বীর মুসলিম সেনাদল জেরুজালেমের কেল্লায় অবরুদ্ধ ছিল।
২৪। হজরত উমরের শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমা কত দূর বিস্তৃত ছিল?
উত্তর: হজরত উমরের শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্রের সীমা আরব সাম্রাজ্য থেকে মিশর ও তুর্কিস্তানের সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
২৫। মদ্যপানের অপরাধে আবু শাহমাকে উমর (রা) কয়টি বেত্রাঘাত করেন?
উত্তর: মদ্যপানের অপরাধে আবু শাহমাকে উমর (রা) ৮০টি বেত্রাঘাত করেন।
২৬। খালিদ ইবনে ওয়ালিদের উপাধি কী ছিল?
উত্তর: খালিদ ইবনে ওয়ালিদের উপাধি ছিল সায়ফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারি।
২৭। ‘উমর ফারুক’ কবিতা কোন কাব্য থেকে সংকলিত হয়েছে?
উত্তর: ‘উমর ফারুক’ কবিতা কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘জিঞ্জীর’ কাব্য থেকে সংকলিত হয়েছে।
২৮। ‘আমির-উল-মুমেনিন’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: ‘আমির-উল-মুমেনিন’ শব্দের অর্থ বিশ্বাসীদের নেতা।
২৯। ‘ফারুক’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: ‘ফারুক’ শব্দের অর্থ যিনি সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারেন।
৩০। জেরুজালেম শহরের প্রতিষ্ঠাতা কে?
উত্তর: জেরুজালেম শহরের প্রতিষ্ঠাতা হজরত সুলায়মান (আ)।
৩১। হজরত উমর (রা) কোথায় বসে অর্ধেক বিশ্ব শাসন করেছেন?
উত্তর: উমর ফারুক খেজুরপাতার চাটাইয়ে বসে অর্ধেক বিশ্ব শাসন করেছেন।
৩২। ইসলাম ধর্ম প্রচারের প্রথম দিকে মুসলমানদের কিবলা কী ছিল?
উত্তর: ইসলাম ধর্ম প্রচারের প্রথম দিকে ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ মুসলমানদের কিবলা ছিল।
৩৩। ‘মশক’ কী?
উত্তর: ‘মশক’ হলো পানি বহন করার চামড়ার থলে।
৩৪। ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ‘চীরধারী’ সম্রাট বলা হয়েছে কাকে?
উত্তর: ‘উমর ফারুক’ কবিতায় দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক (রা)-কে ‘চীরধারী সম্রাট’ বলা হয়েছে।


‘উমর ফারুক’ কবিতার অনুধাবনমূলক প্রশ্ন:

১. হজরত উমরকে ‘আমিরুল মুমেনিন’ বলার কারণ কী?
উত্তর: হজরত উমরকে ‘আমিরুল মুমেনিন’ (মুমিনদের নেতা) বলা হয়েছে কারণ তিনি ইসলামের ন্যায় ও নীতি অনুযায়ী শাসন করেছেন এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন।
➠ তার শাসন ছিল অত্যন্ত কঠোর, তবে ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক। তিনি একজন সৎ, মিতব্যয়ী নেতা ছিলেন এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য সঠিক পথপ্রদর্শক ছিলেন। তার বিচক্ষণ নেতৃত্বে ইসলামী সমাজ সুসংহত ও শান্তিপূর্ণ ছিল, এবং তার এই অসামান্য নেতৃত্বগুণের কারণেই তাকে ‘আমিরুল মুমেনিন’ বলা হয়।

২. “সাইমুম-ঝড়ে পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে”—বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: উক্তিটির মাধ্যমে কবি হজরত উমর (রা)-এর চরিত্রের দৃঢ়তা বোঝাতে চেয়েছেন।
➠ হজরত উমর (রা) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে অর্ধেক পৃথিবী শাসন করতেন, কিন্তু তাঁর জীবনে বিলাসিতার কোনো ছাপই ছিল না। তাঁর প্রাসাদ ও সিংহাসন দুটোই খেজুরপাতার তৈরি ছিল। অনেকবার ঝড়ে তার কুটির ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু তিনি কখনোই তার নীতি ও আদর্শ থেকে সরে আসেননি। কোনো প্রলোভন, ঐশ্বর্য তাঁর সততাকে টলাতে পারেনি। তিনি এসব বাধা-বিপত্তি, ঝড়-ঝাপটাকে অগ্রাহ্য করে চারিত্রিক দৃঢ়তা সমুন্নত রেখেছেন।

৩. ইসলামকে পরশমানিক বলা হয় কেন?
উত্তর: ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি নজরুল ইসলাম পবিত্র ইসলাম ধর্মকে ‘পরশমানিক’ বা পরশপাথর বলে উল্লেখ করেছেন।
➠ পরশপাথর ও ইসলামের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য বিচারেই মূলত কবি তাদের মাঝে সাদৃশ্য তুলে ধরেছেন। পরশপাথরের সংস্পর্শে এলে যেকোনো বস্তুই খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। অনুরূপভাবে ইসলামও মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। ইসলাম গ্রহণের ফলে মানুষ সত্য-সুন্দর ও কল্যাণের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তাই কবি পরশপাথর ও ইসলামের মাঝে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাননি বিধায় ইসলামকে ‘পরশমানিক’ বলে অভিহিত করেছেন।

৪. আবু শাহমাকে হজরত উমর কেন বেত্রাঘাত করছিলেন, তার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আবু শাহমাকে হজরত উমর (রা) মদ্যপানের অপরাধে বেত্রাঘাত করেছিলেন।
➠ হজরত উমর (রা) ছিলেন ন্যায়বান শাসক। তাঁর কাছে আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান। তিনি আইনের অসম্মান করেননি কখনো। তিনি একদিকে ছিলেন কোমল, অপরদিকে আইনের ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই কঠোর। তাই তিনি নিজ পুত্র আবু শাহমাকে মদ পান করার অভিযোগে বেত্রাঘাত করেছিলেন। ক্ষমা চাওয়ার পরেও তিনি তার পুত্রকে ক্ষমা করেননি। বেত্রাঘাতের ফলে আবু শাহমার মৃত্যু হয়েছিল।

৫. হজরত উমর (রা)-এর প্রাসাদ খসে গিয়েছিল কেন?
উত্তর: জীর্ণ ও পুরানো হওয়ার কারণে প্রাসাদ খসে গিয়েছিল।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর (রা)-এর জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। এখানে হজরত উমর অর্ধেক পৃথিবীর শাসক হয়েও খেজুরপাতার কুটিরে বাস করতেন। মরুভূমির সাইমুম ঝড়ে তার আশ্রয়ের কুটিরটি উড়ে গেছে। তারপরও হজরত উমরের মনোবল ভাঙেনি। আদর্শ ও মহানুভবতাকে গেঁথে রেখেছিলেন আজীবন।

৬. ‘অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখতে বসি’—এ পঙ্ক্তির মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: আলোচ্য উক্তির মাধ্যমে কবি হজরত উমর (রা)-এর সাধারণ জীবনযাপনকে নির্দেশ করেছেন।
➠ বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের খলিফা হজরত উমর (রা) রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন মদিনার মসজিদে একটি খেজুরপাতার চাটাইয়ে বসে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতরা এখানে এসেই তাঁর সাথে দেখা করতেন। এ সাধারণ ধূলি ধূসরিত চাটাইয়ে বসে তিনি রাজকার্য পরিচালনা করতেন বলে একেই বলা হয়েছে ধুলার তখত। মূলত এর মাধ্যমে হজরত উমর (রা)-এর অতি সাধারণ জীবনযাপনের মাধ্যমে অর্ধেক পৃথিবী শাসনের কৃতিত্ব চিত্রিত হয়েছে।

৭. ‘পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে’—এ চরণ দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ‘পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে’—এ চরণ দ্বারা কবি হজরত উমর (রা)-এর দৃঢ় মনোবলকে বুঝিয়েছেন।
➠ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা) বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের অধিপতি হয়েও বাস করতেন খেজুরপাতায় ছাওয়া পাথরের দেয়াল ঘেরা সামান্য গৃহে। মরুভূমির শুকনো উত্তপ্ত শ্বাসরোধকারী সাইমুম ঝড়ে তার আশ্রয়ের খেজুরপাতার প্রাসাদটি উড়ে গেছে। কিন্তু তার মনোবল এতটুকু ভাঙেনি। তিনি ইচ্ছে করলেই বিশাল অট্টালিকায় বাস করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। সৎ পথে তিনি ছিলেন অটল, অবিচল।

৮. ইসলামকে ‘পরশমানিক’ বলা হয়েছে কেন?
উত্তর: ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি নজরুল ইসলাম পবিত্র ইসলাম ধর্মকে ‘পরশমানিক’ বা পরশপাথর বলে উল্লেখ করেছেন।
➠ পরশপাথর ও ইসলামের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য বিচারেই মূলত কবি তাদের মাঝে সাদৃশ্য তুলে ধরেছেন। পরশপাথরের সংস্পর্শে এলে যে-কোনো বস্তুই খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। অনুরূপভাবে ইসলামও মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। ইসলাম গ্রহণের ফলে মানুষ সত্য-সুন্দর ও কল্যাণের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। কবি পরশপাথর ও ইসলামের মাঝে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাননি। তাই ইসলামকে ‘পরশমানিক’ বলে অভিহিত করেছেন।

৯. খলিফা হজরত উমর (রা.) কীরকম জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: খলিফা হজরত উমর (রা.) অত্যন্ত সাধারণ ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন।
➠ হজরত উমর (রা.) ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ ও আদর্শ একজন শাসক। তিনি ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। তা সত্ত্বেও নিজের ভোগবিলাসের দিকে না তাকিয়ে তিনি রাজ্যের সব সম্পত্তি প্রজাদের বলে বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। এ কারণে তার পরার মতো পর্যাপ্ত জামাকাপড় পর্যন্ত ছিল না। ফলে গোসল করার সময় পরনের কাপড়টি কেচে নিয়ে সেটি শুকানোর জন্য অপেক্ষা করতে হতো। অর্থাৎ তিনি অত্যন্ত সাধারণ ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন।

১০. ‘মোর পরে যদি নবি হত কেউ, হত সে এক উমর।’—হজরত মুহম্মদ (স.) এ কথা বলেছেন কেন? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: ইসলামের ইতিহাসে হজরত উমর (রা.)-এর গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে তাঁর সম্পর্কে মহানবি হজরত মুহম্মদ (সা.) প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছিলেন।
➠ হজরত উমর (রা.) ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ ও আদর্শ একজন শাসক। তিনি ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বীর। তা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। তাঁর এসকল মহৎ গুণ অবলোকন করেই হজরত মুহম্মদ (স.) বলেছিলেন যে, তাঁর পর যদি কারও নবি হওয়ার সুযোগ থাকত তবে তিনি হজরত উমর (রা.)-ই হতেন। তাঁর এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত হজরত উমর (রা.)-এর সুদৃঢ় ইমান, মহৎ আদর্শ ও মর্যাদারই প্রমাণ মেলে।

১১. আমির-উল-মুমেনিন, তোমার স্মৃতি যে আজানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন।—প্রশ্নোক্ত পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে কি বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: মুসলমানদের প্রকাশ্যে আজান দেওয়ার ক্ষেত্রে হজরত উমর (রা.)-এর ভূমিকার কথা যে আজকের অনেক মুয়াজ্জিনই জানে না—প্রশ্নোক্ত পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে এ কথাই বোঝানো হয়েছে।
➠ হজরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কোরেশদের ভয়ে মুসলমানরা প্রকাশ্যে আজান দিতে সাহস পেত না। কিন্তু তিনি ছিলেন কোরেশ বংশের শ্রেষ্ঠ বীর। তাই তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানদের প্রকাশ্যে আজান দেওয়ায় আর কোনো বাধা রইল না। এক্ষেত্রে আজানের সাথে যে তাঁর স্মৃতি বিজড়িত তা অনেক মুয়াজ্জিনেরই জানা নেই। প্রশ্নোক্ত পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে এ কথাই বোঝানো হয়েছে।

১২. ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি নজরুল ইসলাম ইসলাম ধর্মকে ‘পরশমানিক’ বা পরশপাথর বলে উল্লেখ করেছেন কেন?
উত্তর: ইসলাম মানুষকে ইতিবাচকভাবে আমূল বদলে দেয় বলে ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি নজরুল ইসলাম ইসলাম ধর্মকে ‘পরশমানিক’ বা পরশপাথর বলে উল্লেখ করেছেন।
➠ পরশপাথরের সংস্পর্শে এলে যে-কোনো বস্তুই খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। অনুরূপভাবে ইসলামও মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। ইসলাম গ্রহণের ফলে মানুষ সত্য-সুন্দর ও কল্যাণের চেতনায় উচ্ছ্বাসিত হয়ে ওঠে। কবি পরশপাথর ও ইসলামের মাঝে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাননি, তাই ইসলামকে ‘পরশমানিক’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।

১৩. ‘আর একবার লোহিত সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি।’—এ চরণটিতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: প্রশ্নোক্ত চরণটির মাধ্যমে কবি ইসলামের বিলীয়মান ঐতিহ্য পুনর্জাগরণের উদ্দেশ্যে রক্তক্ষয়ী এক সংগ্রামের প্রত্যাশা করেছেন।
➠ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা) ছিলেন অসামান্য বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও মহৎ হৃদয়ের অধিকারী। এ বীর ইসলামের সূর্যকে সমুজ্জ্বল রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। এজন্য সকল মুসলিমদের মাঝে আজও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। অথচ কালের বিবর্তনে সেই ইসলামের আজ বিমলিন অবস্থা। ইসলামের উজ্জ্বল রবি যেন আজ অস্ত যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আলোচ্য চরণটির মাধ্যমে কবি তাই ইসলামের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলেছেন।

১৪. ‘খেজুরপাতার প্রাসাদ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: খেজুরপাতার প্রাসাদ বলতে খেজুরপাতা দিয়ে ছাওয়া অনাড়ম্বর ঘরকে বোঝানো হয়েছে।
➠ বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হয়েও খলিফা উমর (রা) অতি সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। তিনি রাজ্য পরিচালনা করতেন মদিনার মসজিদে একটি খেজুরপাতার চাটাইয়ে বসে। তাঁর আবাস ছিল খেজুরপাতায় ছাওয়া এক সামান্য বাড়ি। মূলত মুসলিম জাহানের সর্বাধিনায়ক খলিফা উমর (রা)-এর সহজ-সরল জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরার জন্যই আলোচ্য কবিতাটিতে ‘খেজুরপাতার প্রাসাদ’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে।

১৫. ‘ইসলাম বলে, সকলে সমান, কে বড়ো ক্ষুদ্র কে বা’—চরণটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত চরণটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, ইসলামে সাম্যবাদিতা ও মানবতার স্থান অতুলনীয়।
➠ ইসলাম মানুষের জীবনকে সুন্দর করে, নির্মল ও শান্তিময় করে। তার বড়ো প্রমাণ আরব অঞ্চলে প্রাক-ইসলাম যুগের দুর্বিষহ পরিস্থিতির বিপরীতে ইসলাম পরবর্তী যুগের শান্তিময় পরিবেশ। সেখানকার জাহেলিয়াতের মানুষগুলো যখন ইসলামের স্পর্শ পেল, তখন তারা ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ যুগে প্রবেশ করল। হজরত উমর (রা) মুসলিমদের সেই নেতাদেরই একজন। তিনি ছোট-বড়ো, ধনী-গরিব সবাইকে সমান গুরুত্ব দিতেন, কখনো কাউকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতেন না। প্রশ্নোক্ত চরণটি দ্বারা এ বিষয়কেই বোঝানো হয়েছে।

১৬. ‘করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি ক অপমান।’—এ কথাটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রশ্নোক্ত চরণটি দ্বারা ন্যায়ের প্রশ্নে নিজ পুত্র আবু শাহমাকেও যে তিনি ক্ষমা করেননি, সে বিষয়টিকে বোঝানো হয়েছে।
➠ হজরত উমর (রা) ছিলেন ন্যায়ের আদর্শে উজ্জীবিত একজন উন্নত মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তার চরিত্রে সাম্য, ন্যায়, বীরত্ব, নেতৃত্বগুণ, সত্যবাদিতা এবং ধার্মিকতার মতো অনন্য সব গুণের সমন্বয় ঘটায় তিনি সবার কাছে শ্রদ্ধাশীল ও ভালোবাসার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। ন্যায়ের জন্য তিনি নিজ পুত্র আবু শাহমাকেও উপযুক্ত শাস্তি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। পিতা হয়ে নিজ হাতে পুত্রকে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রমাণ রাখার পাশাপাশি ন্যায়কেও অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। প্রশ্নোক্ত চরণটির মাধ্যমে এ বিষয়টিকেই বোঝানো হয়েছে।

১৭. ‘মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: খলিফা হিসেবে প্রজাদের ভালোমন্দ দেখার দায়ভার যে তাঁরই—প্রশ্নোক্ত পঙ্ক্তিটিতে হজরত উমরের উক্তিটির মাধ্যমে এ কথাই প্রকাশ পেয়েছে।
➠ হজরত উমর (রা.) একজন মহান শাসক ছিলেন। রাতের বেলায় ছদ্মবেশে একদিন প্রজাদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে দেখেন এক বাড়িতে খাবারের জন্য শিশুরা কাঁদছে। আর মা শুন্য হাড়ি উনুনে চাপিয়ে তাদের প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। খলিফা হিসেবে এ ঘটনাকে তিনি নিজের ত্রুটি হিসেবে দেখেন এবং প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে বায়তুল মাল থেকে নিজেই খাদ্যের বোঝা বয়ে তাদের কাছে পৌঁছে দেন। আলোচ্য পঙ্ক্তিটিতে এ ঘটনার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

১৮. ‘মানুষেরে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধূলায় নামিল শশী’—কথাটি বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত চরণটির মাধ্যমে হজরত উমর (রা.)-কে শশী অর্থাৎ চাঁদের সাথে তুলনা করে ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়ার সুযোগদানের বিষয়টিকে মাটির মানুষকে স্বর্গে তোলার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
➠ একবার জেরুজালেম যাওয়ার পথে হজরত উমর (রা.) রোদের মধ্যে ভৃত্যের উট টানতে কষ্ট হচ্ছে দেখে উটের পিঠ থেকে নেমে দাঁড়ান প এবং নিজে উটের রশি ধরে ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়ান। অর্ধ পৃথিবীর শাসক হয়েও তার মধ্যে ভৃত্যের প্রতি যে সহানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে, তা সত্যিকার অর্থেই অভাবনীয়। সংগত কারণেই আলোচ্য অংশে তাকে চাঁদের সাথে তুলনা করে ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়তে দেওয়াকে স্বর্গে তোলার সাথে তুলনা করা হয়েছে।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
কাজী পাড়ার চেয়ারম্যান আব্বাস আলী। একবার তার নির্বাচনি এলাকার অধিকাংশ মানুষ ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত হয়। কিন্তু বানভাসি মানুষ একদিনও চেয়ারম্যান সাহেবের দেখা পেলেন না। কারণ তিনি নাকি ঢাকায় জরুরি কাজে ব্যস্ত আছেন। অসহায় লোকগুলো খোলা আকাশের নিচে বোবা চাউনি মেলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায়। বন্যা শেষে একদিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চেয়ারম্যানের বাগানবাড়ি তল্লাশি করে ত্রাণের প্রচুর টিন ও খাদ্যসামগ্রী উদ্ধার করে।

ক. ‘উমর ফারুক’ কবিতা কোন কাব্য থেকে সংকলিত হয়েছে?
খ. হজরত উমরকে ‘আমিরুল মুমেনিন’ বলার কারণ কী?
গ. চেয়ারম্যান আব্বাস আলী যেদিক থেকে হজরত উমরের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. আব্বাস আলী চেয়ারম্যানকে উমরের মতো আদর্শ মানুষ হতে হলে কী কী করতে হবে ‘উমর ফারুক’ কবিতার আলোকে ব্যাখ্যা করো।

ক. ‘উমর ফারুক’ কবিতাটি ‘জিঞ্জীর’ কাব্য থেকে সংকলিত হয়েছে।
খ. হজরত উমর (রা)-কে ‘আমিরুল মুমেনিন’ বলার কারণ হলো তিনি ছিলেন সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণকারী, বিশ্বাসীদের নেতা।
➠ উমর ফারুক কবিতার হজরত উমর ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। তাঁর জীবনাদর্শ ও সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সবার কাছে দৃষ্টান্তস্বরূপ। তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিশ্বাসী। ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তিনি যেমন ছিলেন কঠোর, তেমনই মানুষের প্রতি করুণায় তিনি ছিলেন কোমলপ্রাণ। তিনি কখনই কোনো বিশ্বাস ভঙ্গ করেননি। মূলত তাঁর আদর্শবান ব্যক্তিত্বের কারণেই তাঁকে ‘আমিরুল মুমেনিন’ বলা হয়েছে।

গ. একজন আদর্শ ন্যায়বান শাসকের চরিত্রের দিক থেকে চেয়ারম্যান আব্বাস আলী হজরত উমরের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
➠ একজন শাসক মানে শুধু অন্যের ওপর কর্তৃত্ব করা নয়। একজন আদর্শ শাসক হতে হলে তাকে অনেক বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয়। শাসক যদি শাসিতদের দুঃখে সমান দুঃখী না হন তাহলে তিনি কখনো প্রজাবান্ধব শাসক হতে পারবেন না। ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর (রা)-এর জীবনাদর্শ, চরিত্র-মাহাত্ম্য, মানসিকতা এবং সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। উমর ফারুক ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তিনি নিজ পুত্রকে শাস্তি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। তিনি প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন।
➠ অন্যদিকে উদ্দীপকের চেয়ারম্যান আব্বাস আলী বন্যায় তার এলাকা দুর্দশাগ্রস্ত হলেও তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন। উপরন্তু তার ঘরে বন্যার ত্রাণসামগ্রী চুরি করে রাখতে দেখা যায়। এভাবেই একজন ন্যায়বান ও আদর্শ শাসকের চরিত্রের দিক থেকে চেয়ারম্যান আব্বাস আলী হজরত উমরের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. আব্বাস আলী চেয়ারম্যানকে উমরের মতো আদর্শ মানুষ হতে হলে একজন প্রকৃত শাসকের যেসব গুণ রয়েছে সেগুলো তাকে ধারণ করতে হবে।
➠ শাসক ও শাসিতের মধ্যে যদি সমঝোতার সম্পর্ক না থাকে তাহলে তিনি ভালো শাসক হতে পারেন না। একজন প্রকৃত শাসক সব সময় শাসিতদের দুঃখ-কষ্ট হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন। শাসিতদের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজন ভেবে কাজ করে যান।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি হজরত উমরের জীবনাদর্শ, চরিত্র-মাহাত্ম্য, মানবিকতা এবং সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। খলিফা উমর (রা) ছিলেন একজন মহৎ ব্যক্তিত্ব। তাঁর চরিত্রে একাধারে বীরত্ব, কোমলতা, নিষ্ঠা ও সাম্যবাদী আদর্শের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হয়েও তিনি অতি সহজ, সরল, অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। প্রজাদের প্রয়োজনে তিনি ছিলেন নিবেদিত। অন্যদিকে উদ্দীপকের আব্বাস আলী চেয়ারম্যানের চরিত্র ভিন্ন। তিনি গ্রামবাসীর বিশেষ প্রয়োজনের সময়ও শুধু নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেছেন।
➠ চেয়ারম্যান আব্বাস আলীকে উমরের মতো হতে হলে তার মধ্যে মানবিক দিক জাগ্রত করতে হবে। তার চরিত্রে হজরত উমরের মতো বীরত্ব, কোমলতা, নিষ্ঠা, সাম্যবাদিতা ও অন্যান্য আদর্শের সমন্বয় ঘটাতে হবে। সর্বোপরি গ্রামবাসীর দুঃখ-কষ্ট হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলে তবেই আব্বাস আলী চেয়ারম্যান হজরত উমরের মতো আদর্শ মানুষ হতে পারবেন।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ২:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
ঘটনা-১: জনাব রশিদ সাহেব একজন প্রধান শিক্ষক। স্কুল ছুটির পরে বাসায় যাচ্ছিলেন। পথে দেখলেন তাঁর একজন পিওন ট্রাক থেকে মাথায় করে বই নামাচ্ছে। তিনি দ্রুত তাঁর সাথে এ কাজে যোগ দিলেন এবং অল্প সময়ে বই নামানো শেষ হলো। তারপর দুজনই বাসায় গেলেন। ঘটনা-২: জনাব রশিদ সাহেব বাসায় এসে দেখেন বাসার সামনে পুলিশ ভ্যানে কয়েকজন পুলিশ বসে আছে। তাঁকে দেখতেই একজন পুলিশ এসে বলল, স্যার কাল এ পথে যে ছিনতাই হয়েছিল তাতে আপনার ছেলে জড়িত আছে। তিনি কিছু না বলে একজন পুলিশকে নিয়ে বাসার ভিতরে গেলেন এবং নিজের পুত্রকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন।

ক. ‘সাইমুম’ কী?
খ. ‘পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে’- বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের ঘটনা-২-এর সাথে ‘উমর ফারুক’ কবিতার কোন দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে তা বর্ণনা করো।
ঘ. উদ্দীপকের ঘটনা-১ ও ঘটনা-২-এর মাধ্যমে খলিফার চারিত্রিক মাহাত্ম্যের সমগ্র দিক প্রকাশ পায় কি? যৌক্তিক বিশ্লেষণ করো।

ক. সাইমুম হলো শুকনো উত্তপ্ত শ্বাসরোধকারী প্রবল হাওয়া।
খ. প্রশ্নোক্ত উক্তিটির মাধ্যমে কবি হজরত উমর (রা.)-এর চারিত্রিক দৃঢ়তা বুঝিয়েছেন।
➠ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) অর্ধ পৃথিবীর শাসক হয়েও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। খেজুরপাতার তৈরি প্রাসাদে বসে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন তিনি। মরুভূমির ঝড়ে তাঁর কুটির ধসে পড়লেও তিনি নিজে কখনোই নীতি ও আদর্শ থেকে এতটুকু টলেননি। শত প্রলোভন, বিলাস, ঐশ্বর্য কোনো কিছুই তাঁর সততাকে পরাজিত করতে পারেনি। জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও ঝড়ঝাপটাকে জয় করে চারিত্রিক দৃঢ়তায় তিনি ছিলেন সমুন্নত।

গ. উদ্দীপকের ঘটনা-২-এর সাথে ‘উমর ফারুক’ কবিতার ন্যায়বিচার দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর (রা.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। অন্য অনেক ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ন্যায়বিচারক হিসেবেও তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে। বিচারের ক্ষেত্রে তিনি অপরাধ বিবেচনা করতেন, ব্যক্তি নয়। এমনকি নিজের ছেলে আবু শাহমাকেও মদ্যপানের অপরাধে তিনি কঠিন শাস্তি দেন এবং সেই শাস্তির ফলে তাঁর ছেলে মৃত্যুবরণ করে।
➠ উদ্দীপকে জনাব রশিদ সাহেবের পুত্র অপরাধে জড়িত জেনে তিনি পিতা হিসেবে পক্ষপাত না করে ন্যায়বিচারের পথ বেছে নেন। নিজের পুত্রকে লুকিয়ে রাখার পরিবর্তে তিনি সত্যকে প্রাধান্য দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেন। ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর (রা.) কর্তৃক স্বীয় পুত্রকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার বর্ণনায় একইরকম ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত লক্ষ করা যায়।

ঘ. উদ্দীপকে শুধু মানবপ্রেম ও ন্যায়বিচারের দিকটি উঠে আসায় খলিফার চারিত্রিক মাহাত্ম্যের সমগ্র দিক প্রকাশ পায়নি।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতার খলিফা ফারুক (রা.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। একজন ন্যায়নিষ্ঠ, নির্ভীক ও গণতন্ত্রমনা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর খ্যাতি চির অম্লান। মুসলিম জাহানের খলিফা হয়েও তিনি সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি মানবপ্রেম, বীরত্ব, কোমলতাসহ অনেক বৈশিষ্ট্যের কথা 'উমর ফারুক' কবিতায় চমৎকার কাব্যভাষায় ফুটে উঠেছে।
➠ উদ্দীপকের ঘটনা-১-এ জনাব রশিদ একজন প্রধান শিক্ষক হয়েও পিওনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। এতে তাঁর বিনয় ও মানবিকতাবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। আবার ঘটনা-২-এ তিনি নিজের ছেলের অপরাধ না লুকিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। যার মধ্য দিয়ে তাঁর সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়বোধের পরিচয় ঘটেছে। ‘উমর ফারুক’ কবিতায় খলিফা হজরত উমরের সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, বীরত্ব, অনাড়ম্বর জীবনযাপন, ন্যায়পরায়ণ ও মানবপ্রেমসহ অনেক গুণের কথা বর্ণিত হয়েছে। যার মধ্যে থেকে উদ্দীপকের রশিদ সাহেবের চরিত্রে মানবপ্রেম ও ন্যায়পরায়ণতার গুণ দুটি প্রকাশ পেয়েছে। বাকি গুণগুলো তাঁর মাঝে অনুপস্থিত।
➠ তাই বলা যায়, উদ্দীপকের ঘটনা-১ ও ২-এর মাধ্যমে খলিফার মাহাত্ম্যের সমগ্র দিক প্রকাশ পায়নি।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৩:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
ইসলাম প্রচারের প্রথম দিকে নবিজি পৌত্তলিকদের দ্বারা চরম আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তবু তিনি কারো উপর অভিমান করেননি। একবার তায়েফে ইসলাম প্রচারে গেলে পৌত্তলিকরা একত্রিত হয়ে তাঁকে লক্ষ করে পাথর ছুঁড়েছে। পাথরের আঘাতে তাঁর গায়ের রক্ত রাস্তায় গড়িয়ে পড়েছে তবু তিনি তাদের অভিশাপ দেননি বরং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। ‘প্রভু এদের জ্ঞান দাও, প্রভু এদের ক্ষমা করো।’ নবিজির এমন মহান আদর্শ তাঁর সাহাবিদের চরিত্রকেও। আলোকিত, উদ্ভাসিত করে তুলেছিল।

ক. হিব্রু ভাষায় ‘জেরুজালেম’ শব্দের উচ্চারণ কী?
খ. ইসলামকে ‘পরশমানিক’ বলা হয়েছে কেন?
গ. উদ্দীপকে যে আদর্শবোধের পরিচয় পাওয়া যায় উমর ফারুক (রা)-এর চরিত্রে তার প্রতিফলন কীভাবে ঘটেছে? উদাহরণসহ লেখো।
ঘ. ‘মহানবীর আদর্শ তাঁর সাহাবিদের চরিত্রকেও আলোকিত করেছিল’-‘উমর ফারুক’ কবিতার আলোকে বক্তব্যটি মূল্যায়ন করো।

ক. হিব্রু ভাষায় ‘জেরুজালেম’ শব্দর অর্থ
খ. ইসলামের সংস্পর্শে অনেক বড়ো পাপীও সত্যপথের দিশা পেয়েছে বলে ইসলামকে ‘পরশমানিক’ বলা হয়েছে।
➠ ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম, সত্যপথের দিশা। এর সংস্পর্শে যাঁরা এসেছে তাঁরাই নিজের জীবনকে সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত করেছে। হজরত উমরও একদা ইসলামের শত্রু ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (স.)-কে হত্যা করতেও এসেছিলেন তিনি। অথচ, ইসলাম ধর্মে দাখিল হওয়ার পরই তিনি হয়ে ওঠেন অনন্যসাধারণ চরিত্রের অধিকারী। সে কারণেই কবি ইসলামকে ‘পরশমানিক’ বলেছেন।

গ. উদ্দীপকে মহানবি (স.)-এর ইসলামের জন্য নিভীক চরিত্রের আদর্শের পরিচয় পাওয়া যায় তা উমর ফারুক (রা.)-এর চরিত্রেও প্রতিফলন ঘটেছে।
➠ হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর চরিত্রে একাধারে বীরত্ব, কোমলতা, নিষ্ঠা এবং সাম্যবাদী আদর্শের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। তিনি রাসুল (স.)-এর দেখানো পথে ছিলেন অবিচল। জনগণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজে বেছে নিয়েছিলেন অনাড়ম্বর জীবনযাপন। রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে আদর্শবান ব্যক্তিত্ব বলে বিশ্বাস করেই বলেছিলেন, ‘তাঁর পরে যদি কেউ নবি হতেন তাহলে তিনি হতেন উমর।’
➠ উদ্দীপকে হজরত মুহম্মদ (স.)-এর আদর্শের কথা উঠে এসেছে। তাঁর জীবনের সমগ্রটাই ছিল মানবজাতির কল্যাণে নিয়োজিত। শত্রুর নির্মম অত্যাচারে জর্জরিত হয়েও তিনি অভিশাপ দেননি বরং পাপীদের ভালোবেসেন। ধৈর্য ও সহনশীলতায় তিনি ছিলেন অনন্য। হজরত উমর ফারুক (রা.) ছিলেন হজরত মুহম্মদ (স.)-এর অনুগত সাহাবি। নবিজির জীবনার্দশের অনুকরণেই তিনি তাঁর জীবনকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাঁদের দুজনেরই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীতে ইসলামের মাহাত্ম্য প্রচার এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ সাধন।

ঘ. ‘মহানবির আদর্শ তাঁর সাহাবিদের চরিত্রকেও আলোকিত করেছিল।’- মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর জীবনাদর্শ, চরিত্র-মাহাত্ম্য, মানবিকতা এবং সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর চরিত্রে একাধারে বীরত্ব, কোমলতা, নিষ্ঠা এবং সাম্যবাদী আদর্শের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। একজন ন্যায়নিষ্ঠ, নির্ভীক ও গণতন্ত্রমনা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর খ্যাতি চির অম্লান।
➠ উদ্দীপকে হজরত মুহম্মদ (স.)-এর মানবিক গুণাবলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মানুষের শ্রেষ্ঠ আদর্শ হিসেবে তিনি তার জীবন রূপায়িত করে তুলেছিলেন। মানুষের মঙ্গল সাধনায় তিনি আজীবন সচেষ্ট ছিলেন। মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি বারবার নির্যাতিত হয়েছেন। তবুও এই ন্যায়পরায়ণ আদর্শবান পুরুষ সারা জীবন মানবজাতির কল্যাণের জন্য নিয়োজিত ছিলেন।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতার খলিফা উমর ফারুক (রা.) একজন অসাধারণ শাসক ছিলেন। তিনি নিজের সন্তানকে অপরাধ করার কারণে শাস্তি দিয়েছেন। গরিবদের দুঃখ লাঘব করতে নিজের কাঁধে খাবার বহন করেছেন এমনকি নিজের সুখের বিনিময়ে জনকল্যাণ নিশ্চিত করেছেন। এসব গুণাবলি মূলত মহানবির কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণের ফল। সুতরাং বলা যায়, নবিজির মহান আদর্শ সাহাবিদের চরিত্রে আলোর মতো ছড়িয়ে পড়েছিল এবং উমর (রা.) তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৪:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ছিলেন একজন মহৎ ব্যক্তিত্ব। তাঁর চরিত্রে একাধারে বীরত্ব, কোমলতা, নিষ্ঠা, ন্যায়বিচার ও সাম্যবাদী আদর্শের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। তিনি সহজসরল জীবনযাপন করতেন। ভৃত্যকেও তিনি সমান মর্যাদা দিয়েছিলেন। আপন সন্তানকেও শাস্তি দিতে তিনি কুণ্ঠিত হননি। তিনি ছিলেন সমগ্র মানবের জন্য আদর্শবান ব্যক্তি।

ক. ইসলামের দ্বিতীয় খলিফার নাম কী?
খ. ‘আপন সন্তানকেও শাস্তি দিতে তিনি কুণ্ঠিত হননি।’- এই উক্তির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
গ. অনুচ্ছেদটিতে ভৃত্যকে সমান মর্যাদা দেওয়ার যে মানসিকতা ফুটে উঠেছে বর্তমান সমাজে তার কতটুকু প্রতিফলন লক্ষ করা যায়?
ঘ. উদ্দীপকের আলোকে খলিফা উমর (রা.)-এর চারিত্রিক মাহাত্ম্য বিশ্লেষণ করো।

ক. ইসলামের দ্বিতীয় খলিফার নাম হজরত উমর (রা.)।
খ. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মূর্ত প্রতীক উমর (রা.) নিজ পুত্র আবু শাহমাকে মদ্যপানের অপরাধে রাষ্ট্রীয় আইনানুযায়ী শাস্তি বিধান করেন। আপন সন্তানকেও শাস্তি দিতে কুণ্ঠিত হননি তিনি।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর (রা.)-এর ন্যায়বিচারের স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে। হজরত উমর (রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন, তিনি তাঁর নিজ পুত্রকেও ক্ষমা করেননি। পুত্র পিতার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেও সুশাসক পিতার অন্তরে অন্ধস্নেহের উদ্রেক হয়নি। বেত্রাঘাতে আবু শাহমা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে প্রাণ হারান। হজরত উমর (রা.) চরিত্রের অন্যতম গুণ ন্যায়বিচার ও শাসন সম্পর্কে উক্ত উক্তিটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।

গ. উদ্দীপকটিতে ভৃত্যকে সমান মর্যাদা দেওয়ার যে মানসিকতা ফুটে উঠেছে বর্তমান সমাজে তার সীমিত প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতার খলিফা হজরত উমর (রা.) ছিলেন মহৎ এক ব্যক্তিত্ব। তিনি দুর্গম মরুপথে তপ্ত বালুকার মধ্যে ভৃত্যকে উটের পিঠে তুলে দিয়ে নিজে রশি টেনেছেন। ভৃত্যকে এমন সম্মান ও মূল্য কেউ কোনোকালে দেয়নি।
➠ উদ্দীপকে হজরত উমর (রা.)-এর ভৃত্যের প্রতি সমান মর্যাদার দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। বর্তমান সমাজে এই মানসিকতা খুব কমই দেখা যায়। এখনো অনেকেই গৃহকর্মী বা শ্রমজীবীদের মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে কুণ্ঠিত হয়। হজরত উমর (রা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করলে সমাজে ন্যায়, মানবতা ও সাম্যের পরিবেশ গড়ে উঠবে। তবে আজকের যুগে তার দৃষ্টান্ত অনেকাংশে অনুপস্থিত।

ঘ. খলিফা উমর (রা.) ছিলেন ন্যায়, মানবতা ও সাম্যের জীবন্ত প্রতীক।
➠ হজরত উমর (রা.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। একজন ন্যায়নিষ্ঠ, নির্ভীক ও গণতন্ত্রমনা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর খ্যাতি চির অম্লান। মুসলিম জাহানের খলিফা হয়েও তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি মানবপ্রেম, বীরত্ব, কোমলতাসহ অনেক বৈশিষ্ট্যের কথা ‘উমর ফারুক’ কবিতায় চমৎকার কাব্যভাষায় ফুটে উঠেছে।
➠ উদ্দীপকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফার কথা বলা হয়েছে যিনি একজন মহৎ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি যেমন ছিলেন সাহসী তেমনই ছিলেন দয়ালু ও নিষ্ঠাবান। তাঁর জীবনযাপন ছিল সহজসরল। নিজের ভৃত্যকেও দিয়েছিলেন সমান মর্যাদা। এমনকি নিজ সন্তানকে শাস্তি দিতেও পিছপা হননি। তাই তিনি সকলের জন্য অনুসরণীয় ছিলেন।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতার খলিফা উমর ফারুক (রা.) ছিলেন একজন মহান শাসক। তাঁর চরিত্রে যেমন বীরত্ব ও দৃঢ়তা ছিল তেমনই ছিল বিনয়, কোমলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। উদ্দীপকেও খলিফা উমর (রা.)-এর চারিত্রিক গুণাবলি উঠে এসেছে যা তাঁকে অনন্য করে রেখেছে। এই চারিত্রিক গুণাবলি উমর (রা.)-কে একজন আদর্শ নেতা ও মানবতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৫:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
ঘটনা-১: উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রায়হান সাহেব বাড়ি ফেরার পথে এক রোগা বুড়ো লোককে মাল বোঝাই ঠ্যালাগাড়ি ঠেলতে দেখলেন। লোকটির কষ্ট দেখে তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে ঠ্যালাগাড়িতে হাত লাগালেন এবং গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন।
ঘটনা-২: অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এসে রায়হান সাহেব দেখেন তাঁর ছেলে অনেক অবৈধ মালামাল ঘরে এনে রেখেছে। তিনি কাল বিলম্ব না করে পুলিশ ডেকে হাতেনাতে ধরিয়ে দেন।

ক. ‘আমির-উল-মুমেনিন’ শব্দের অর্থ কী?
খ. ‘পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে’ বলতে কৰি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের ঘটনা-২-এর সাথে 'উমর ফারুক' কবিতার কোন দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে তা বর্ণনা করো।
ঘ. উদ্দীপকের ঘটনা-১ ও ঘটনা-২-এর মাধ্যমে খলিফার চারিত্রিক মাহাত্ম্যের সমগ্র দিক প্রকাশ পায় কি? যৌক্তিক বিশ্লেষণ করো।

ক. ‘আমির-উল-মুমেনিন’ শব্দের অর্থ- বিশ্বাসীদের নেতা।
খ. প্রশ্নোক্ত উক্তিটির মাধ্যমে কবি হজরত উমর (রা.)-এর চারিত্রিক দৃঢ়তা বুঝিয়েছেন।
➠ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) অর্ধ পৃথিবীর শাসক হয়েও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। খেজুরপাতার তৈরি প্রাসাদে বসে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন তিনি। মরুভূমির ঝড়ে তাঁর কুটির ধসে পড়লেও তিনি নিজে কখনোই নীতি ও আদর্শ থেকে এতটুকু টলেননি। শত প্রলোভন, বিলাস, ঐশ্বর্য কোনো কিছুই তাঁর সততাকে পরাজিত করতে পারেনি। জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও ঝড়ঝাপটাকে জয় করে চারিত্রিক দৃঢ়তায় তিনি ছিলেন সমুন্নত।

গ. উদ্দীপকের ঘটনা-২-এর সাথে 'উমর ফারুক' কবিতার নিজের সন্তান হলেও অন্যায়ের শাস্তিবিধানের দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর বিভিন্ন সুমহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। অন্যায়ের শাস্তি বিধান সেসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম। অন্যায়কারী যেই হোক না কেন, তার শান্তি প্রদানে হজরত উমর ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মদ্যপানের অপরাধে নিজের পুত্রকেও তিনি কোনোরূপ ক্ষমা-সহৃদয়তা দেখাননি; নিজহাতে কঠোর শাস্তি প্রদান করেছেন।
➠ উদ্দীপকের ঘটনা-২-এ দেখা যায়, রায়হান সাহেব অফিস থেকে ফিরে নিজের ছেলের আনা অবৈধ মালামাল দেখতে পান। তিনি কালবিলম্ব না করে পুলিশ ডেকে তাঁর ছেলেকে হাতেনাতে ধরিয়ে দেন। অপরাধীর শাস্তিবিধানে প্রায় একইধরনের তৎপরতা ‘উমর ফারুক’ কবিতায়ও বর্ণিত হয়েছে। হজরত উমর (রা.) অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হওয়া নিজের ছেলেকে নিজহাতে শাস্তি দিয়েছেন।

ঘ. পরোপকারিতা ও অন্যায়ের শাস্তিবিধান ছাড়া আরও বৈশিষ্ট্য হজরত উমর (রা.)-এর মধ্যে উপস্থিত থাকায় উদ্দীপকদ্বয়ের মাধ্যমে খলিফার চারিত্রিক মাহাত্মের সমগ্র দিক প্রকাশ পায়নি।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর বিভিন্ন ইতিবাচক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। প্রথম জীবনে মহানবি (স.)-এর ঘোর বিরোধী থাকলেও পরবর্তীতে তিনি ইসলামের মহান সেবকে পরিণত হন। প্রকাশ্যে আজান দিতে উদ্‌বুদ্ধ করা, সাম্যবাদী মনোভাব, মানবিকতাবোধ, অনাড়ম্বর জীবন, বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহায়তাসহ অনেক বৈশিষ্ট্যে তিনি অনন্য।
➠ উদ্দীপকের ঘটনা-১-এ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রায়হান সাহেব এক রোগা বুড়ো লোকের মালবোঝাই ঠ্যালাগাড়ি ঠেলতে কষ্ট দেখে তাকে সহযোগিতা করেন। ঘটনা-২-এ রায়হান সাহেব আবার নিজের ছেলের কাছে অবৈধ মালামাল দেখে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেন। দুটো ঘটনায় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর পরোপকারিতা এবং অন্যায়ের শাস্তিবিধানের বিষয়দুটো লক্ষ করা যাচ্ছে।
➠ উদ্দীপকের ঘটনাদ্বয় 'উমর ফারুক' কবিতায় ফুটে ওঠা হজরত উমর (রা.)-এর সুমহান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাঝে অন্যতম দুটি বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে। কিন্তু কবিতায় উমর (রা.)-এর আরও বেশকিছু বৈশিষ্ট্য, যেমন: সাম্যবাদী মনোভাব, অনাড়ম্বর জীবন, ইসলাম ধর্মের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা ইত্যাদি ফুটে উঠেছে, যা উদ্দীপকে অনুপস্থিত। তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকের ঘটনা দুটোতে হজরত উমর (রা.)-এর চারিত্রিক মাহাত্ম্যের সমগ্র দিক ফুটে ওঠেনি।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৬:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
আলম হোসেন কদমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। এলাকাবাসীর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তাঁর প্রচেস্টার শেষ নেই। তাঁর দানে এলাকায় গড়ে উঠেছে কয়েকটা দাতব্য প্রতিষ্ঠান। আবার অপরাধের শাস্তি দিতে তিনি কখনোই পিছপা নন। তাই তাঁর পুত্র রফিক গ্রামের মেয়েদের উত্ত্যক্ত করলে গ্রাম্য মজলিসে দোষী সাব্যস্ত করে নিজ হাতে তাকে পুলিশে সোপর্দ করেন। পিতার কাছে ক্ষমা চেয়েও শান্তি থেকে মুক্তি পায়নি সে। আলম হোসেনের আদর্শ হলো- সাম্য, সুবিচার ও মানবতা।

ক. ‘উমর ফারুক’ কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত?
খ. ‘সেদিন গিয়াছে’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
গ. উদ্দীপকে আলম হোসেনের চরিত্রে হজরত উমর (রা)-এর কোন চারিত্রিক গুণাবলি প্রকাশ ঘটেছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘আলম হোসেনের শাসনকার্যে উমর ফারুক (রা)-এর শাসনকার্যের প্রতিফলন ঘটেছে।’- উক্তিটি ‘উমর ফারুক’ কবিতাবলম্বনে বিশ্লেষণ করো।

ক. ‘উমর ফারুক’ কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘জিঞ্জীর’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।
খ. উমর ফারুকের মতো ন্যায়পরায়ণ শাসকের গৌরবময় শাসনকালের অবসান বোঝাতে কবি প্রশ্নোত্ত উক্তিটি করেছেন।
➠ উমর ফারুক (রা.)-এর শাসনামলে ন্যায়, সাম্য ও মানবতা ছিল সমাজের ভিত্তি। তাঁর মতো আদর্শবান শাসকের শাসনে ইসলামের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন সেই সত্যের পথে অটল থাকা শাসক নেই। আর সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে অন্ধকার, অবিচার ও দুর্নীতি। গৌরবময় ইতিহাস স্মরণ করে বর্তমান অবস্থা বোঝাতে কবি প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।

গ. উদ্দীপকে আলম হোসেনের চরিত্রে হজরত উমর (রা.)-এর চারিত্রিক গুণাবলি ন্যায়পরায়ণতার প্রকাশ ঘটেছে।
➠ উমর ফারুক কবিতায় হজরত উমর (রা.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। অন্য অনেক ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ন্যায়বিচারক হিসেবেও তার যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে। বিচারের ক্ষেত্রে তিনি অপরাধ বিবেচনা করতেন, ব্যক্তি নয়। এমনকি নিজের ছেলে আবু শাহমাকেও মদ্যপানের অপরাধে তিনি কঠিন শাস্তি দেন এবং সেই শাস্তির ফলে তাঁর ছেলে মৃত্যুবরণ করে।
➠ উদ্দীপকে আলম হোসেন শুধু একজন চেয়ারম্যান নন বরং তিনি ন্যায় ও সুবিচারের প্রতীক। তাঁর পুত্র রফিক গ্রামের মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অপরাধে তিনি নিজ হাতে তাকে পুলিশে সোপর্দ করেন। ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর (রা.) কর্তৃক স্বীয় পুত্রকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার বর্ণনায় একইরকম ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত লক্ষ করা যায়।

ঘ. অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে থাকায় আলম হোসেনের শাসনকার্যে উমর ফারুক (রা.)-এর শাসনকার্যের প্রতিফলন ঘটেছে।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর জীবনাদর্শ, চরিত্র মাহাত্ম্য, মানবিকতা এবং সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের খলিফা হয়েও তিনি নিজ ভৃত্যকে সমান মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত হননি। ন্যায়ের আদর্শ সমুন্নত রাখতে তিনি আপন সন্তানকেও কঠোরতম শাস্তি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি।
➠ উদ্দীপকে আলম হোসেন কদমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে সবার কল্যাণে কাজ করেন। তিনি এলাকায় দান করে অনেক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। আবার অপরাধের ব্যাপারে তিনি একদম কঠোর তাই নিজের ছেলের অপরাধকেও তিনি ছাড় দেননি।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর ফারুক (রা.) সর্বদা ন্যায়ের পথে ছিলেন এবং প্রজাদের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। উদ্দীপকের আলম হোসেনও ঠিক সেই পথ অনুসরণ করেছেন। তিনি এলাকার মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রেখেছেন। এমনকি নিজের ছেলের অপরাধকেও আড়াল করেননি। আলোচ্য কবিতার উমর ফারুক (রা.) যেমন ন্যায় ও মানবতার আদর্শ রক্ষা করেছিলেন তেমনই উদ্দীপকের আলম হোসেনও সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আপসহীন থেকেছেন। তাই বলা যায়, আলম হোসেনের শাসনকার্যে উমর ফারুক (রা.)-এর নীতির প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৭:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
পরপীড়া পরিহার, পূর্ণ পরিতোষ। সদানন্দে পরিপূর্ণ স্বভাবের কোষ। নাহি চায় আপনার পরিবার সুখ। রাজ্যের কুশলকার্যে সদা হাস্যমুখ। কেবল পরের হিতে প্রেম লাভ যার। মানুষ তারেই বলি, মানুষ কে আর?

ক. খলিফা উমর (রা) আবু শাহমাকে কয়টি বেত্রাঘাতের নির্দেশ দেন?
খ. “মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি।” কে মানবপ্রেমিক? ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকটি 'উমর ফারুক' কবিতার কোন দিকটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “জগতে প্রকৃত মানুষরাই মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসেন।”- উদ্দীপক ও কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ করো।

ক. খলিফা উমর (রা) আবু শাহমাকে আশিটি বেত্রাঘাতের নির্দেশ দেন।
খ. “মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি।”- এখানে মানবপ্রেমিক হলেন হজরত উমর ফারুক (রা)।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ফারুক (রা)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃঢ়তার বিষয়। তুলে ধরেছেন। এখানে তাঁর বিনয়, বীরত্ব, সাহস, সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিকতার প্রতিফলন ঘটেছে। বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হয়েও তিনি অতি সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন, করেছেন। তিনি কোনো রাজসিংহাসনে বসেননি। তিন রাজ্য পরিচালনা করেছেন খেজুরপাতার একটি চাটাইয়ে বসে। নিজ ভৃত্যকে তিনি তাঁর সঙ্গে সমান মর্যাদা দিয়েছেন। বায়তুলমাল থেকে খাদ্য বহন করে দুঃখিনী মায়ের গৃহে নিয়ে গিয়েছেন। এসব দিক বিচারে কবি তাঁকে মানবপ্রেমিক বলে অভিহিত করেছেন।

গ. উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতায় মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ ও মানবিক আদর্শের দিকটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। সমস্যা-সংকটে পড়ে মানুষ নানা জনের সাহায্য প্রার্থনা করে। সাহায্যপ্রার্থীদের দিকে করুণার নয়, দায়িত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রত্যেকের অবশ্য কর্তব্য।
➠ উদ্দীপকের কবিতাংশে নিজের এবং নিজের পরিবার তথা আত্মসুখের প্রত্যাশায় সময় নষ্ট না করে রাজ্যের সব মানুষের সুখ ও শান্তির জন্য কাজ করার কথা বলেছেন। কবির মতে যে মানুষ অন্য মানুষের কল্যাণ চিন্তা করে সেই প্রকৃত মানুষ।
➠ মানুষের এই বৈশিষ্ট্যের দিকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার উমর (রা)-এর সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিকতার দিকটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি সাম্যবাদী আদর্শ ও মানবিকতার মূর্তপ্রতীক ছিলেন। উত্তপ্ত মরুপথে জেরুজালেমে যাওয়ার সময় তিনি ভৃত্যকে উটের পিঠে বসিয়ে রশি টেনে নিয়ে হেঁটেছেন। ভৃত্যকে তাঁর সমান মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি নিজেকে মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের জন্য সুখ ও আনন্দের ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন। এভাবে উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ ও মানবিক আদর্শের দিকটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. “জগতে প্রকৃত মানুষরাই মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসেন।”- উদ্দীপক ও কবিতার আলোকে মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ আছে যারা সব সময় নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকে। আর একশ্রেণির মানুষ আছে যারা অন্যের কল্যাণ কামনায় জীবন উৎসর্গ করেন। অন্যের কল্যাণচিন্তা করা ব্যক্তিই প্রকৃত মানুষ।
➠ উদ্দীপকের কবিতাংশে পরপীড়া দূর করে মানুষকে পূর্ণ আনন্দ লাভ করার কথা বলা হয়েছে। পরোপকারীরা অন্যের সুখেই নিজেরা সুখী হয়। তারা রাজ্যের সব কাজ হাসিমুখে করে। পরের কল্যাণ করার মধ্য দিয়েই মানুষ প্রেম লাভ করে। কবি এ ধরনের মানুষকেই প্রকৃত মানুষ বলেছেন। কবির আকাঙ্ক্ষার এমন মানুষের সঙ্গে ‘উমর ফারুক’ কবিতার উমর ফারুক (রা)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কর্মকাণ্ড একসূত্রে গাঁথা। উমর ফারুকও মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক হয়েও তিনি নিজে অতি সহজ-সরল জীবনযাপন করতেন। নিজেকে সব সময় জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে ভেবেছেন। ধনী-দরিদ্র সব মুসলমানকে ভাই বলে সম্বোধন করেছেন।
➠ উদ্দীপকে পরপীড়া পরিহার করার যে কথা বলেছেন তা ‘উমর ফারুক’ কবিতার ক্ষুধার্ত শিশুদের জন্য বায়তুলমাল থেকে খাদ্য বহন করে উমরের নিজে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি জেরুজালেমে যাত্রাপথে চাকরকে ক্লান্ত হতে দেখে নিজে উট থেকে নেমে তাকে উল্টের পিঠে বসিয়ে রশি ধরে তপ্ত বালুকার ওপর দিয়ে হেঁটেছেন। এ দিক থেকে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৮:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
ঘটনা-১: উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রায়হান সাহেব বাড়ি ফেরার পথে এক রোগা বুড়ো লোককে মাল বোঝাই ঠেলা ঠেলতে দেখলেন। লোকটির কষ্ট দেখে তিনি মুহূর্ত দেরি না করে ঠেলাগাড়িতে হাত লাগালেন এবং গন্তব্যে পৌছে দিলেন।
ঘটনা-২: অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এসে রায়হান সাহেব দেখেন তাঁর ছেলে অনেক অবৈধ মালামাল ঘরে এনে রেখেছে। তিনি কালবিলম্ব না করে পুলিশ ডেকে হাতেনাতে ধরিয়ে দেন।

ক. ‘আমির-উল-মুমেনিন’ শব্দের অর্থ কী?
খ. “সাইমুম-ঝড়ে পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে” বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের ঘটনা-২-এর সঙ্গে ‘উমর ফারুক’ কবিতার কোন দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে তা বর্ণনা করো।
ঘ. উদ্দীপকের ঘটনা-১ ও ঘটনা-২-এর মাধ্যমে খলিফার চারিত্রিক মাহাত্ম্যের সমগ্র দিক প্রকাশ পায় কি? যৌক্তিক বিশ্লেষণ করো।

ক ‘আমির-উল-মুমেনিন’ শব্দের অর্থ হলো- বিশ্বাসীদের নেতা।
খ. “সাইমুম-ঝড়ে পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’নুয়ে” বলতে কবি খলিফা উমরের ঘর নুয়ে পড়লেও তিনি যে আদর্শচ্যুত হয়ে পড়েননি তা বুঝিয়েছেন।
➠ অর্ধ-পৃথিবীর শাসনকর্তা হজরত উমর (রা) ছিলেন ন্যায়ের প্রতি কুসুম-কোমল আর অন্যায়ের প্রতি বজ্রসম কঠিন। তাঁর দরবার ছিল সাধারণ কুটিরের মতো। মরুভূমির সাইমুম ঝড়ে তা ভূলুণ্ঠিত হলেও তাঁর ব্যক্তিত্ব সামান্য আদর্শচ্যুত কিংবা দুর্বল হয়নি বা নুয়ে পড়েনি। এখানে উমরের দৃঢ়চেতা মানসিকতাকে কবি রূপকাকারে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন।

গ. খলিফা উমরের (রা) চরিত্রের অন্যতম গুণ ছিল আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা যা উদ্দীপকের ঘটনা-২-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
➠ সত্যবাদীরা অন্যায়ের সঙ্গে কখনো কোনো আপস করেননি। তাঁরা সামাজিক অনাচার প্রতিহত করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। অপরাধী নিজের লোক হলেও তাকে শাস্তি থেকে মুক্তি দিতেন না। খলিফা উমর (রা) ছিলেন ন্যায়বান, সুশাসক। তিনি সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ দেখিয়েছেন। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি আপন-পর ভেদাভেদ করেননি। আর সে কারণে মদ্যপানের অপরাধে নিজ হাতে পুত্রকে বেত্রাঘাত করেছেন, মৃত্যু হয়েছে পুত্রের। কিন্তু তিনি আইনের অপমান করেননি।
➠ উদ্দীপকের ঘটনা-২-এর রায়হান সাহেব আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ায় বাড়িতে অবৈধ মালামাল রাখা যে ছেলের অপরাধ তা তিনি উপলব্ধি করে পুলিশ ডেকে ছেলেকে ধরিয়ে দেন। এভাবে রায়হান সাহেবের চরিত্রে হজরত উমর (রা) চরিত্রের আইনের শাসনের দিকটি সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঘ. উদ্দীপকের ঘটনা-১ ও ঘটনা-২-এর মাধ্যমে খলিফার চরিত্রের সামগ্রিক দিক প্রকাশ পায় না।
➠ তিনি অনেক গুণের অধিকারী। উদ্দীপকে কেবল খলিফার মানবতা ও আইনের শাসন এ দুটি বৈশিষ্ট্যেরই পরিচয় পাওয়া যায়। মহৎ ব্যক্তিদের চরিত্রে বীরত্ব, কোমলতা, নিষ্ঠা, মানবপ্রেম, ন্যায়বিচার ও সাম্যবাদী আদর্শের সমন্বয় ঘটে থাকে। তারা যুগে যুগে মানবকল্যাণ সাধনে ব্রতী হয়ে জগতের উন্নতি সাধন করে।
➠ উদ্দীপকের ঘটনা-১-এ উমর চরিত্রের মানবতার প্রতিফলন দেখা যায় এবং ঘটনা-২-এ দেখা যায়, রায়হান সাহেব তাঁর দুর্নীতিবাজ পুত্রকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেন যা আমরা 'উমর ফারুক' কবিতায় খলিফার চরিত্রে দেখতে পাই। খলিফা তাঁর মাদকাসক্ত পুত্রকে বেত্রাঘাতের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু এ দুটি বৈশিষ্ট্যই উমর চরিত্রকে মহিমান্বিত করেনি। তিনি একাধারে অনেক বৈশিষ্ট্যের আধিকারী ছিলেন।
➠ উদ্দীপকের ঘটনা-১ ও ঘটনা-২-এ খলিফার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মানবতাবোধ ও আইনের শাসন- এ দুটি রূপ দেখতে পাই। মূলত 'উমর ফারুক' কবিতায় এ দুটি রূপ ছাড়াও উমরের জীবনাদর্শ, চারিত্রিক-মাহাত্ম্য, সাম্যবাদ, বীরত্ব, কোমলতা, অনাড়ম্বর জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে।



‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ০৯:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
নিজ সুখ ভুলে গিয়ে ভাবিলে পরের কথা।
মুছালে পরের অশ্রু- ঘুচালে পরের ব্যথা।
আপনাকে বিলাইয়া দীনদুঃখীদের মাঝে
বিদূরিলে পর দুঃখ সকালে বিকালে সাঁঝে।
তবেই পাইবে সুখ আত্মার ভিতরে তুমি,
যা রুপিবে তাই পাবে, সংসার যে কর্মভূমি।

ক. জেরুজালেম কী?
খ. “তোমার স্মৃতি যে আজানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন।”- ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার কোন দিকটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “সাদৃশ্য থাকলেও উদ্দীপকের মূলভাব ‘উমর ফারুক’ কবিতার মূলভাবকে প্রতিফলিত করে না।”- মন্তব্যটি যথার্থতা প্রমাণ করো।

ক. জেরুজালেম হচ্ছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের একটি প্রাচীন শহর।
খ. “তোমার স্মৃতি যে আজানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন”- চরণটিতে নামাজের জন্য প্রকাশ্যে আজান দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে হজরত উমর (রা)-এর সঙ্গে জড়িত তা না জানার বিষয়কে বোঝানো হয়েছে।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক (রা)-এর জীবনাদর্শ, চরিত্র-মাহাত্ম্য, মানবিকতা, সাহসিকতা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। হজরত উমরের ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মুসলমানরা উচ্চ রবে আজান দিতেন না কোরেশদের ভয়ে। তখন উমর ছিলেন কোরেশদের শ্রেষ্ঠ বীর। তিনি যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন, তখন। থেকেই প্রকাশ্যে আজান দেওয়ার রীতি চালু হয়। মুসলমানদের প্রকাশ্যে আজানের দেওয়ার সঙ্গে উমরের স্মৃতি জড়িত, যা অনেক মুয়াজ্জিন জানেন না।

গ. উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার হজরত উমরের মানবিকতা ও মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগের দিকটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
➠ মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেকেই একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই সম্পর্কে বাইরে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে হৃদয়ের বন্ধন তার মধ্য দিয়েই পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মানের মনোভাব গড়ে ওঠে। উদ্দীপকে নিজের আনন্দ-সুখ ভুলে গিয়ে অন্যের মনের দুঃখ দূর করতে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কবি এখানে আত্মতৃপ্তি ও প্রকৃত সুখ লাভের জন্য সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা অর্থাৎ সব সময় দুঃখী মানুষের দুঃখ দূরীকরণে নিজেকে নিয়োজিত করতে বলেছেন। কবির মতে সংসারে সুখ পেতে চাইলে অন্যের দুঃখ দূর করতে হবে।
➠ উদ্দীপকের এ বিষয়টি ‘উমর ফারুক' কবিতায় প্রতিফলিত উমর ফারুক (রা)-এর মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগের দিকটিকে নির্দেশ করেছে। উমর (রা) মানুষের সুখের জন্য বায়তুলমাল থেকে খাদ্যসামগ্রী কাঁধে করে দরিদ্র মায়ের ঘরে নিয়ে গেছেন। মানবকল্যাণের জন্যই তিনি সাম্যবাদ, সাম্যনীতি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়েছিলেন।

ঘ. “সাদৃশ্য থাকলেও উদ্দীপকের মূলভাব ‘উমর ফারুক’ কবিতার মূলভাবকে প্রতিফলিত করে না।” মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ সাম্যবাদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর সব মানুষ সমান। সমাজে উঁচু-নিচু, ছোটো-বড়ো, ধনী-দরিদ্র, চাকর-মনিবের যে বিভেদ তা স্বার্থপর মানুষের নিজেদের স্বার্থের জন্য তৈরি। অথচ সাম্যবাদের চেতনা নিয়ে কাজ করলে সমাজে কল্যাণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় উমর (রা)-এর জীবনাদর্শ, চরিত্র-মাহাত্ম্য, মানবিকতা ও সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হয়েও তাঁর জীবন ছিল অতি সহজ, সরল, অনাড়ম্বর। নিজ ভৃত্যকেও তিনি তাঁর সঙ্গে সমান মর্যাদা দিয়েছেন। এসব বিষয় উদ্দীপকে প্রতিফলিত হয়নি। উদ্দীপকে পরোপকারে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে প্রকৃত সুখ লাভের যে কথা বলা হয়েছে তা ‘উমর ফারুক’ কবিতার উমর (রা)-এর ক্ষুধাতুর শিশুদের জন্য বায়তুলমাল থেকে নিজে খাদ্য বহন করে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় উমর ফারুক (রা) ছিলেন একজন মহৎ ব্যক্তিত্ব। তিনি জীবনে কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। উদ্দীপকে যে ভাবের প্রতিফলন ঘটেছে তা মহৎ মানুষের কর্মের বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত থাকলেও কবিতার উমর ফারুক (রা)-এর মতো নয়। এ দিক থেকে তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।



‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১০:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
হজরত আবু বকর (রা) ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা। আরব মরুর বুকে যখন অন্ধকারের ভাঁজে ভাঁজে শত্রুর আনাগোনা, তখন তিনি ছিলেন প্রহরীহীন রাজা। রাতের অন্ধকার কী দিনের আলো, দূরে কী কাছে, সর্বত্রই তাঁর শাসন ছিল নির্ভীক। বিশাল রাজ্যের এই রাজার আর্থিক অবস্থা ছিল দীনহীন। তিনি রাজ কোষাগার থেকে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না। অসত্যের শত প্রলোভন তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। ন্যায়বিচার আর সাম্য প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

ক. অর্ধ পৃথিবী কে শাসন করেছেন?
খ. “পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’নুয়ে।”- পঙ্ক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের সঙ্গে ‘উমর ফারুক’ কবিতার সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “তাৎপর্যগত দিক থেকে উদ্দীপকের হজরত আবু বকর (রা) ও কবিতার হজরত উমর একই আদর্শের ধারক”-উক্তিটির সার্থকতা যাচাই করো।

ক. হজরত উমর ফারুক (রা) অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছেন।
খ. “পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’নুয়ে।”- পঙ্ক্তিটি দ্বারা উমর ফারুক (রা)-এর রাজ্য শাসনের দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে।
➠ হজরত উমর (রা) অত্যন্ত ধার্মিক ও মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন। বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের খলিফা হয়েও তিনি কোনো রাজসিংহাসনে বসেননি। খেজুরপাতার আসনে বসে তিনি রাজ্য পরিচালনা করেছেন। তাঁর জীর্ণ কুটির সামান্য মরুঝড়েই হেলে পড়ত। তা সত্ত্বেও তিনি কখনই অন্যায়ের আশ্রয় নেননি। তিনি ইচ্ছা করলেই সীমাহীন ঐশ্বর্যের মালিক হতে পারতেন। অথচ তিনি তা করেননি। মূলত তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের জনগণের জন্য একজন নিবেদিতপ্রাণ শাসক। প্রশ্নোক্ত পঙ্ক্তিটি দ্বারা এটাই বোঝানো হয়েছে।

গ. উদ্দীপকের হজরত আবু বকর (রা)-এর সঙ্গে ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর ফারুক (রা)-এর সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ ইসলাম শান্তির ধর্ম। যুগে যুগে এ ধর্মের বাণী মানুষের মনে শান্তি এনে দিয়ে দিয়েছে। মানুষকে সত্য-ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করেছে। ইসলামের আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তি সৎ ও নিষ্ঠাবান হয়ে থাকেন।
➠ উদ্দীপকে হজরত আবু বকর (রা) একজন আদর্শ শাসক। তিনি ইসলামের প্রথম খলিফা ছিলেন। অসত্যের সামনে তিনি কখনো মাথা নত করেননি। তাঁর আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমরও অনুরূপ শাসক ছিলেন। তিনি একটি খেজুরপাতার চাটাইয়ে বসে রাজ্য পরিচালনা করতেন। শাসক হিসেবে তিনিও ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চেতা। মানুষের অধিকারের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। জেরুজালেম যাওয়ার সময় তিনি ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়িয়ে সাম্যবাদী মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ক্ষুধার্ত শিশুদের জন্য নিজের কাঁধে করে খাবার নিয়ে গেছেন। এভাবে উদ্দীপকের হজরত আবু বকর রা-এর সঙ্গে ‘উমর ফারুক’ কবিতার উমর (রা)-এর সাদৃশ্য বিদ্যমান।

ঘ. “তাৎপর্যগত দিক থেকে উদ্দীপকের হজরত আবু বকর (রা) ও কবিতার হজরত উমর (রা) একই আদর্শের ধারক”- উক্তিটি যথার্থ।
➠ খলিফা মানে প্রতিনিধি। জনগণের জীবনের নিরাপত্তা বিধান, অধিকারের নিশ্চয়তা, রাষ্ট্রের উন্নতি, নিরপেক্ষ বিচার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠাই হলো খলিফা তথা প্রতিনিধির কাজ। রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার কারণে খলিফা প্রভৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকেন।
➠ উদ্দীপকে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা)-এর শাসনব্যবস্থার স্বরূপ আলোচিত হয়েছে। তিনি ছিলেন প্রহরীহীন রাজা। কারণ সত্যের ধারক হওয়ায় তাঁকে ভয় গ্রাস করতে পারত না। একজন শাসক হিসেবে সব সময় জনগণের কথা ভাবতেন। তাঁর আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। তবু রাজ কোষাগার থেকে তিনি কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন না। তাঁর মধ্যে কোনো লোড় ছিল না। তাঁর এই আদর্শ হজরত উমর (রা)-এর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি হজরত উমর ফারুক (রা)-এর জীবনাচার ফুটিয়ে তুলেছেন। হজরত উমর ফারুক (রা) ছিলেন একজন প্রকৃত শাসক। অর্ধ পৃথিবীময় তাঁর রাজ্য বিস্তৃত ছিল। তিনি কখনো মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেননি। শত-সহস্র ঐশ্বর্যও তাঁর মনে প্রলোভন সৃষ্টি করতে পারেনি। তাঁর প্রধান কাজ ছিল প্রজাদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে আদায় করা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। এসব দিক বিচারে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।



‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১১:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
মুসলমানদের বিজয় পতাকা আজ ধুলায় লুণ্ঠিত। দিকে দিকে মার খাচ্ছে মুসলমান। অধিকারহীন হয়ে অবহেলায় পড়ে আছে পথের প্রান্তে। মিথ্যার দাপটে সত্যের তরবারি আজ স্তব্ধ, সংকীর্ণ হয়ে গেছে চওড়া রাজপথ। অথচ এখনও স্মৃতিতে ভাসে সোনালি দিনের সস্মৃতিচিত্র 'বিশ্বজুড়ে সত্যের জয়। জুলুমের কালো হাত কোথাও নেই। সর্বত্র শান্তির ময়ূর পেখম মেলে সাম্যের গান গায়। 'ধনী-গরিব সবাই রাজ্যে সমান ক্ষমতার অধিকারী। ফলে গরিব প্রজার মুখে অনাবিল হাসি। অনাবিল শান্তিতে ধরিত্রীর বুক যেন একখণ্ড বেহেশতি বাগান।' আর বর্তমানে সত্য কালো আঁধারে ঢেকে গেছে। তাই মুসলমানদের সোনালি উষার উদয় আবার ঘটাতে চাইলে এখন যোগ্য নেতার প্রয়োজন।

ক. আখেরি নবির দক্ষিণ বাহু কে?
খ. “ ‘সেদিন গিয়াছে’-শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি।”- ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকে ‘উমর ফারুক’ কবিতার কোন দিকটি প্রকাশ পেয়েছে?
ঘ. "উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার সমগ্র ভাবের ধারক নয়।"- মন্তব্যটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।

ক. আখেরি নবির দক্ষিণ বাহু হলেন হজরত উমর ফারুক (রা)।
খ. “‘সেদিন গিয়াছে'-শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি।”- পক্তি দ্বারা হজরত উমর ফারুক (রা)-এর শাসনব্যবস্থার সময়কে নির্দেশ করা হয়েছে।
➠ হজরত উমর ফারুক (রা)-এর শাসনকাল ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে শাসনব্যবস্থার সর্বোজ্জ্বল সময়। সেই সময় মানুষের মধ্যে শ্রেণিবৈষম্য ছিল না। রাজা-প্রজায় বিদ্বেষ ছিল না। সমাজে অন্যায়ের অবাধ বিচরণ ছিল না। মানুষ সহজেই নিজের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারত। কিন্তু বর্তমান সময় অন্ধকারাচ্ছন্ন, শ্রেণিবৈষম্য সমাজ আর রাষ্ট্রকে আঁকড়ে ধরেছে। রাজায়-প্রজায় চরম বিদ্বেষ। সাধারণ মানুষ সহজে কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। আলোচ্য পঙ্ক্তিটি দ্বারা এটাই বোঝানো হয়েছে।

গ. সমস্ত অত্যাচার আর অরাজকতার অবসান ঘটানোর জন্য ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি ব্যাকুল কণ্ঠে হজরত উমর ফারুক (রা)-কে আবার পৃথিবীতে আসার যে আহ্বান জানিয়েছেন সেই দিকটিই উদ্দীপকে প্রকাশ পেয়েছে।
➠ মুসলমানদের বিজয় পতাকা আজ ধুলায় লুণ্ঠিত। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অধিকারহীন হয়ে তারা ধুঁকে ধুঁকে মরছে। মিথ্যার হুংকারে সত্যের দাপট স্তিমিত হয়ে গেছে। মুসলমানদের এ অবস্থার উত্তরণে সর্বাগ্রে প্রয়োজন যোগ্য নেতার। উদ্দীপকে বর্তমান সময়ের মুসলমানদের দুরবস্থার কথা প্রকাশ পেয়েছে। তারা সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না। বারবার বিভ্রান্তিতে ডুবে মরছে। যোগ্য নেতার উন্নত দিকনির্দেশনা দ্বারা যদি মুসলমানরা আবার পরিচালিত হয়, তবে বিশ্বে মুসলমানদের পুনর্জাগরণ অনিবার্য।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি হজরত উমর ফারুক (রা)-কে আবার পৃথিবীতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ পৃথিবী রাহুর গ্রাসে আজ অন্ধপ্রায়। আর ইসলামের আলো যেন নিভে আসছে। চারদিকে শুধু হিংস্রতা আর অরাজকতা। অধিকারহীন হয়ে মানুষ যন্ত্রণাময় মৃত্যুর শিয়রে বসে কাঁদছে। ইসলামের এ করুণ অবস্থার উন্নতিকল্পে কবি হজরত উমর ফারুকের কাছে এ মিনতি জানিয়েছেন, যেন উমর ফারুক (রা) পৃথিবীতে আগমন করেন, মুসলমানদের হুংকারে লোহিত সাগরের পানি লালে লাল হয়ে ওঠে। ‘উমর ফারুক’ কবিতার এ দিকটিই উদ্দীপকে প্রকাশ পেয়েছে’।

ঘ. “উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার সমগ্র ভাবের ধারক নয়।”- মন্তব্যটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার আংশিক ভাবকে ধারণ করে।
➠ বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতার অপব্যবহারে অন্যায় বেড়েই চলছে। এর জন্য সর্বোচ্চ দায়ী হলো শাসকরা। অথচ পূর্বের ইসলাম ধর্মের শাসকরা ছিলেন প্রজাবৎসল ও ত্যাগী মনোভাবাপন্ন। তারা জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করতেন না। উদ্দীপকে বর্তমান সময়ের মুসলমানদের দুরবস্থা ও মুসলমানদের উন্নতিকল্পে যথাযোগ্য নেতার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ পেয়েছে। মুসলমানদের বিজয়। পতাকা আজ ধুলায় লুণ্ঠিত। তারা অধিকারহীন হয়ে পড়েছে। মিথ্যার দাপটের কাছে হেরে যাচ্ছে। সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবেই আজ তাদের এত করুণ অবস্থা। এই করুণ অবস্থার বিনাশ ঘটাতে চাইলে প্রয়োজন যোগ্য নেতার। যোগ্য নেতার আগমনে মুসলমানরা আবার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হয়ে উঠবে।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি হজরত উমর ফারুকের চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। হজরত উমর ফারুক ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। তিনি খেজুরপাতার কুটিরে বাস করতেন। তাঁর শাসনকালে মানবতার প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল। মদ্যপানের অপরাধে তিনি আপন পুত্রকে কঠোর শাস্তি দিয়েছিলেন। উদ্দীপকে এসব বিষয় নেই।
➠ এদিক বিচারে তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার সমগ্র ভাবের ধারক নয়।



‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১২:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। মানুষ যখন প্রয়োজনের বেশি ক্ষমতা পায়, তখন সেটা কিনে নেয় মনুষ্যত্বের দাম দিয়ে। ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় হিংস্রতার প্রতিমূর্তি। জগতের সবকিছুকে নিজের অধীন মনে করে। চাবুকের আঘাতে, গরিব প্রজার পিঠকে করে রক্তাক্ত। দরিদ্রের ঘাম আর রক্তের রং দিয়ে মসনদের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। এটা হলো বর্তমান সময়ের ক্ষমতাধরদের কথা। অথচ ইসলামের শাসকদের কথাও আমাদের অজানা নেই। দীনহীন সেই শাসকদের কুটিরে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলত না। তথাপি তাঁরা প্রজার হক দ্বারে দ্বারে গিয়ে পৌছে দিতেন। নিজেকে সমগ্র দেশের জনগণের প্রতিনিধি মনে করতেন।

ক. জেরুজালেমের কেল্লা কারা অবরোধ করে আছে?
খ. “এইবার আমি যাই উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে।”- পঙ্ক্তিটি বুঝিয়ে লেখো।
গ. ‘উমর ফারুক’ কবিতার হজরত উমর ফারুক (রা)-এর চরিত্রের সঙ্গে উদ্দীপকের বৈসাদৃশ্য দেখাও।
ঘ. “উদ্দীপকের আলোচিত বর্তমান ক্ষমতাধরদের চরিত্র পরিবর্তনে ‘উমর ফারুক’ কবিতার হজরত উমর ফারুক (রা) একজন আদর্শ হতে পারে।” উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।’

ক. কি জেরুজালেমের কেল্লা বীর মুসলিম সেনাদল অবরোধ করে আছে।
খ. “এইবার আমি যাই উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে”- পঙ্ক্তিটি হজরত উমর (রা) তাঁর ভৃত্যকে বলেছেন। কারণ জেরুজালেম গমন পথে তাঁরা দুজনেই পালাক্রমে উটের পিঠে আরোহণ করেছিলেন।
➠ রাষ্ট্রীয় কাজে হজরত উমর ফারুক (রা) তাঁর ভৃত্যকে নিয়ে উটে চড়ে জেরুজালেমে যাচ্ছিলেন। মনিব উটের পিঠে থাকবেন এবং ভৃত্য রশি ধরে সামনে হাঁটবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হজরত উমর ফারুক (রা) ছিলেন প্রকৃত মানবতাবাদী। তিনি উটের পিঠ থেকে নেমে তাঁর ভৃত্যকে উঠের পিঠে উঠিয়ে রশি ধরে হেঁটে চললেন। তাঁর মতে, সব মানুষই সমান। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। এভাবে তিনি ও তাঁর ভৃত্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর উটের পিঠে আরোহণ করেছেন। প্রশ্নোক্ত লাইনটি এ ঘটনাকেই নির্দেশ করে। সারকথা: হজরত উমর ফারুক (রা) ছিলেন প্রকৃত মানবতাবাদী। তাঁর কাছে মনিব-ভৃত্যের ভেদাভেদ ছিল না।

গ. ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর ফারুক (রা)-এর চরিত্রের সঙ্গে আদর্শগত দিক থেকে উদ্দীপকের বৈসাদৃশ্য রয়েছে। ক্ষমতা ও লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। নিজের জঘন্য ইচ্ছা চরিতার্থ করতে গিয়ে অনেকে অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়।
➠ গরিব প্রজাকে নির্মম আঘাত করে সে নিজের সিংহাসনের জৌলুস বৃদ্ধি করে, যা অত্যন্ত হীন কাজ। হজরত উমর ফারুক (রা) ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। তিনি ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। তাঁর রাজ্য ছিল অর্ধপৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত। অর্থাৎ তিনি প্রবল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ছিল। সত্য প্রতিষ্ঠা আর জনগণের প্রাপ্য সঠিকভাবে বণ্টন করাই তাঁর ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য। খেজুরপাতা নির্মিত কুঁড়েঘরে বসেই তিনি পৃথিবী শাসন করতেন, যা সামান্য মরুঝড়েই হেলে পড়ত। শত ঐশ্বর্যের হাতছানি তাঁকে কখনো সামান্যতম আদর্শচ্যুত করেনি। অন্যায়ের কাছে তিনি কখনই মাথা নত করেননি।
➠ এভাবে উদ্দীপকের বর্তমান ক্ষমতাধরদের সঙ্গে ‘উমর ফারুক’ কবিতার হজরত উমর ফারুক (রা)-এর চরিত্রের বৈসাদৃশ্য রয়েছে।

ঘ “উদ্দীপকের আলোচিত বর্তমান ক্ষমতাধরদের চরিত্র পরিবর্তনে ‘উমর ফারুক’ কবিতার হজরত উমর ফারুক (রা) একজন আদর্শ হতে পারে।’- উক্তিটি যথার্থ।
➠ বর্তমান সময়ের শাসকরা সাধারণত দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমতা লাভ করার লোভে। কারণ ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা নিজেদের জঘন্য ইচ্ছা ও লালসা চরিতার্থ করে থাকে। অথচ ইসলামি শাসকদের জীবনব্যবস্থা ও শাসনপদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা সৎ ও প্রজাবৎসল শাসক ছিলেন।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর ফারুক (রা)-কে একজন আদর্শ শাসক হিসেবে পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং প্রায় অর্ধপৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত ছিল তাঁর রাজ্য। সত্যের প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও জনগণের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর একমাত্র আদর্শ। শত ঐশ্বর্য তাঁকে কখনো সেই আদর্শচ্যুত করতে পারেনি এবং সঠিক বিচারকাজে তিনি কখনো আবেগের প্রশ্রয় নেননি। এমনকি নিজের ভৃত্য আর নিজের মধ্যে তিনি কোনো প্রভেদ করেননি। উদ্দীপকের ক্ষমতাধরদের বৈশিষ্ট্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
➠ উদ্দীপকে বর্তমান সময়ের ক্ষমতাধরদের কথা আলোচিত হয়েছে। লোভ মানুষকে মনুষ্যত্ব কেড়ে নিয়ে অন্ধ করে দেয়। বর্তমান সময়ের ক্ষমতাধররা তথা শাসকরা অত্যন্ত লোভী। তারা ক্ষমতার জন্য যেকোনো কাজ অনায়াসে করতে পারে। তারা আত্মসুখের জন্য জগতের সবকিছুকে নিজের অধীন মনে করে। তাদের এই ঘৃণ্য শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে ও লোভী মানসিকতার বিলোপ সাধনে হজরত উমর ফারুক (রা) একজন আদর্শ চরিত্র, হতে পারে। এদিক থেকে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।



‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৩:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
রাতের দ্বিতীয় প্রহর, দূরের গঞ্জ থেকে বাড়ি ফিরছেন সালাম সাহেব। গঞ্জে তার দুটো আড়ত আছে। অবস্থা বেশ সচ্ছল। একাগ্র মনে হাঁটছেন তিনি। ঝিঁঝি পোকা আর ব্যাঙের ডাক ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই প্রকৃতিতে। এমন সময় কান্নার আওয়াজ পান তিনি। কান পেতে শোনেন ভেসে আসা শব্দ। পাশের বাড়ি থেকেই কান্না আসছিল। তিনি গিয়ে বিনীতভাবে কান্নার কারণ জানতে চাইলেন। গৃহকর্ত্রী জানালেন তার ছেলের পরীক্ষা। তার ছেলের পরীক্ষার ফি-এর টাকা দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। আর ফি না দিলে পরীক্ষা দেওয়া যাবে না। তিনি ছেলেটার পরীক্ষার ফি গৃহকত্রীর হাতে দিয়ে রাতের আঁধারে বাড়ির পথ ধরলেন।

ক. ক্ষুধার্ত শিশু দুটিকে ভোলাতে মা কী করলেন?
খ. “এসব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের ’পরে।”- পঙ্ক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকের সালাম সাহেবের চরিত্রের সঙ্গে 'উমর ফারুক' কবিতার কোন চরিত্রের মিল রয়েছে?
ঘ. “উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার আংশিক ভাবের ধারক।”- যথার্থতা বিশ্লেষণ কর।

ক. ক্ষুধার্ত শিশু দুটিকে ভোলাতে মা উনুনে শূন্য হাঁড়ি চড়ালেন।
খ. “এসব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের ’পরে।”- পক্তিটি হজরত উমর ফারুক লোকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় উমর (রা) তাঁর ন্যায়-কর্মে অটল ছিলেন। একদিন তিনি দেখলেন, এক দুঃখিনী মায়ের ক্ষুধার্ত শিশুরা কাঁদছে আর মা সন্তানদের ফাঁকি দিয়ে উনুনে শূন্য হাঁড়ি চাপিয়ে কাঁদছেন। এ দৃশ্য দেখে হজরত উমর বায়তুলমালে গিয়ে লোকদের প্রয়োজনীয় খাদ্য তাঁর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। কারণ অভুক্ত পরিবারের ক্ষুধা নিবৃত্তিকল্পে নিজ কাঁধে খাদ্য বহন করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন। প্রশ্নোক্ত পঙ্ক্তিটি এটাই নির্দেশ করে।

গ. উদ্দীপকের সালাম সাহেবের চরিত্রের সঙ্গে ‘উমর ফারুক’ কবিতার উমর ফারুক (রা)-এর চরিত্রের মিল রয়েছে।
➠ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শাসকের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক নাগরিকের জীবনযাপন নির্বিঘ্ন করা। পাশাপাশি দেশের বিত্তবান মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে অসহায় গরিব মানুষদের কল্যাণে। সালাম সাহেব একজন অবস্থাপন্ন মানুষ। এক রাতে তিনি কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। পাশের বাড়ি থেকেই কান্নার শব্দ আসছিল। তিনি সেখানে গিয়ে বিনীতভাবে তাদের সমস্যা জানতে চাইলে গৃহিণী জানালেন যে, তার ছেলের পরীক্ষা। অথচ সেই পরীক্ষার ফি দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই। সালাম সাহেব গৃহিণীর হাতে পরীক্ষার ফি দিয়ে নিঃশব্দে চলে এলেন।
➠ এর দ্বারা উদ্দীপকের সালাম সাহেবের উন্নত মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়, যা ‘উমর ফারুক’ কবিতার হজরত উমর ফারুক (রা)-এর চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। উমর ফারুক (রা) ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। মানুষের দুঃখ মোচন করাই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। এক রাতে এক দুঃখী মাকে উনুনে শূন্য হাঁড়িকাপিয়ে কাঁদতে দেখে বায়তুলমাল থেকে খাদ্য বহন করে তিনি দিয়ে এসেছেন। এভাবে উদ্দীপকের সালাম সাহেবের চরিত্রের সঙ্গে উমর ফারুক (রা) কবিতার উমর ফারুক (রা)-এর চরিত্রের মিল রয়েছে।

ঘ ‘উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার আংশিক ভাবের ধারক।”- মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা মহৎ কাজ। কারও বিপদে যখন কেউ আন্তরিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তখনই মনুষ্যত্বের সত্যিকার প্রকাশ ঘটে। মহৎ চিত্তের অধিকারীরা মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক সাহায্য দ্বারা অন্যের উপকার সাধন করেন।
➠ উদ্দীপকের সালাম সাহেব একজন অবস্থাপন্ন মানুষ। গঞ্জে তার দুটো আড়ত আছে। এক রাতে বাড়ি ফেরার সময় তিনি পাশের বাড়ি থেকে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি কান্নার কারণ জানতে চাইলেন। ওই বাড়ির গৃহিণী জানালেন যে, তার ছেলের পরীক্ষার ফি দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই। ফলে তার ছেলের পরীক্ষা দেওয়া হবে না। এ কথা শুনে সালাম সাহেব তাকে পরীক্ষার ফি দিয়ে চলে এলেন। এই ঘটনায় সালাম সাহেবের মানবতাবাদী মনোভাবের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা কবিতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর ফারুকের মহানুভবতা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। তিনি ঐশ্বর্যের প্রতি বিমুখ ছিলেন। মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর শাসনতন্ত্রের মূলমন্ত্র। যেমন- তিনি একবার তাঁর ভৃত্যকে নিয়ে জেরুজালেম যাচ্ছিলেন। মরুভূমি পাড়ি দেওয়ার সময় তিনি যতটা সময় উটে চড়েছেন, তাঁর ভৃত্যকেও ততটা সময় চড়ার সুযোগ দিয়ে নিজে পায়ে হেঁটেছেন। বায়তুলমাল থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজ কাঁধে করে দুঃখী মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। এ দিক থেকে বলা যায় যে, উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার আংশিক ভাবের ধারক।



‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৪:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
স্কুলে একটা নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। যে ছেলে কোনো মেয়েকে উত্ত্যক্ত করবে, তাকে সকল ছাত্র-ছাত্রীর সামনে পঞ্চাশ বেত মারা হবে। ফলে সকল ছাত্রই এ ব্যাপারে সতর্ক হয়ে গেল। কারণ হেডস্যারকে সবাই প্রচণ্ড ভয় করত। প্রধান শিক্ষক আবদুর রহমান সাহেবের ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। সে ভেবেছে, তার বাবা প্রধান শিক্ষক। ফলে সকল আইনই তার জন্য শিথিল। একদিন সে নবম শ্রেণির একটি মেয়েকে চরম উত্ত্যক্ত করল। মেয়েটা ভয়ে ভয়ে হেডস্যারকে বলল। ক্লাসের ছাত্ররা ও শিক্ষকরা ভাবলেন- স্যার কি আর ছেলের বিচার করবেন? কিন্তু নীতির ব্যাপারে আবদুর রহমান সাহেব অটল। ছেলেকে সত্যিই সকল ছাত্র-ছাত্রীর সামনে তিনি পঞ্চাশ বেত মারলেন।

ক. খাস দরবার কীসে ভরল?
খ. “অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ।”- ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার কোন দিকটি নির্দেশ করে?
ঘ. “উদ্দীপকের আবদুর রহমান সাহেব ও ‘উমর ফারুক’ কবিতার উমর ফারুক একই আদর্শের অনুসারী।”- উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।

ক. খাস দরবার হাজার দেশের লোকে ভরল।
খ. “অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ।"- এ কথা কবি হজরত উমর ফারুককে উদ্দেশ করে বলেছেন। কবির দৃষ্টিতে হজরত উমর ফারুক (রা) এত বেশি মহানুভবতার অধিকারী ছিলেন, যা ছিল প্রশংসারও ঊর্ধ্বে।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় কবি হজরত উমর ফারুক (রা)-এর মহানুভবতার পরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি ছিলেন অর্ধ পৃথিবীর সম্রাট। অথচ তাঁর কোনো অহংকার ছিল না। অন্যায়ের সঙ্গে কখনই তিনি কোনো আপস করেননি। সত্য প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন পর্বতের মতো অটল। ঐশ্বর্যের হাতছানি তাঁকে কখনই সত্যচ্যুত করতে পারেনি। তাঁর শাসনামলে মানবতার দৃষ্টান্ত ছিল অতুলনীয়। এক কথায়, তাঁর মহানুভবতা ছিল আকাশচুম্বী। এ কারণে কবি প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন।

গ. উদ্দীপকটি ‘উমর ফারুক’ কবিতায় মদ্যপানের অপরাধে হজরত উমর ফারুক (রা)-এর পুত্র আবু শাহমাকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার দিকটিকে নির্দেশ করে।
➠ আইন সবার জন্যই সমান। কারণ সাম্যের দৃষ্টিতে পৃথিবীর সব মানুষ সমান। তাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। জগতের আদর্শ শাসকরা সব সময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
➠ উদ্দীপকে আবদুর রহমান সাহেবকে আইনের প্রতি প্রবল শ্রদ্ধা পোষণ করতে দেখা যায়। তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে একটা নিয়ম চালু করেন, যে ছাত্র কোনো ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করবে তাকে সবার সামনে পঞ্চাশটি বেত মারা হবে। তার ছেলে একদিন তার স্কুলে একটি মেয়েকে উত্ত্যক্ত করে। তিনি সকল ছাত্র-ছাত্রীর সামনে ছেলেকে শাস্তি দিয়ে নিয়ম যে সবার জন্যই সমান তা প্রমাণ করলেন। এ ঘটনাটি ‘উমর ফারুক’ কবিতার উমর ফারুক (রা)-এর বিচারের ঘটনার সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর ফারুক (রা) তাঁর শাসনামলে 'প্রকাশ্যে যে মদ্যপান করবে, তাকে আশিটি বেত মারার' আইন প্রতিষ্ঠা করেন। একদিন হজরত উমর ফারুক (রা)-এর ছেলে আবু শাহমা' প্রকাশ্যে মদ্যপান করে। আবু শাহমা তাঁর ছেলে হয়েও শাস্তির ক্ষেত্রে সামান্যতম ছাড় পায়নি। হজরত উমর ফারুক (রা) স্বহস্তে শাস্তি কার্যকর করেন। এতে একপর্যায়ে আবু শাহমা প্রাণ হারায়। কবিতার এ দিকটির প্রকাশই উদ্দীপকে ঘটেছে।

ঘ. “উদ্দীপকের আবদুর রহমান সাহেব ও ‘উমর ফারুক’ করিতার হজরত উমর ফারুক (রা) একই আদর্শের অনুসারী।”- উক্তিটি যথার্থ।
➠ আইনের যথার্থ প্রয়োগ অপরাধ দমনের পূর্বশর্ত। রাজা-প্রজা নির্বিশেষে সবাই আইনের আওতাধীন। এক্ষেত্রে অর্থের বা ক্ষমতার প্রভাবে কেউ যদি আইনের ব্যত্যয় ঘটায়, তবে সেটা আইনের প্রতি অবমাননার শামিল।
➠ উদ্দীপকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। একদিন তার ছেলে স্কুলের এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করলে তিনি তাকে নিয়মানুসারে সবার সামনে পঞ্চাশ বেত মারলেন। ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর ফারুকের চরিত্রেও এই আদর্শের প্রতিফলন পাওয়া যায়। হজরত উমর (রা) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। প্রকাশ্যে মদ্যপানের ব্যাপারে তিনি যে আইন চালু করলেন, তা হলো মদ্যপানকারীকে আশিটা বেত মারা হবে। এই আইন ভঙ্গ করলে তিনি নিজ পুত্রকে শাস্তি দেন।
➠ হজরত উমর (রা) ছিলেন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। নিয়ম অনুযায়ী অভিযুক্তকে শাস্তি দিয়েছেন। কে আপন কে পর তা বিবেচনা করেননি। উদ্দীপকের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহমানও তাই করেছেন। এ ক্ষেত্রে উদ্দীপকের আবদুর রহমান সাহেব ও ‘উমর ফারুক’ কবিতার উমর ফারুক (রা) একই আদর্শের অনুসারী।



‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৫:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
মদিনাকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য পরিখা খননের কাজ চলছে। নবিজি (স) স্বয়ং এ কাজে অংশগ্রহণ করতে চাইলে সাহাবিগণ আপত্তি তুললেন। কিন্তু নবিজি বললেন, “আমি তোমাদের মতোই মানুষ, তোমরা কজি করবে আর আমি বসে বসে দেখব- এটা হয় না।” তিনি মাটির ঝুড়ি মাথায় তুলে নিলেন। বলা বাহুল্য, নবিজির এমনই মহান আদর্শ তাঁর সাহাবিদের চরিত্রকেও আলোকিত, উদ্ভাসিত করে তুলেছিল।

ক. ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ‘চীরধারী সম্রাট’ বলা হয়েছে কাকে?
খ. ইসলামকে ‘পরশ-মানিক’ বলা হয়েছে কেন? ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকে ‘উমর ফারুক’ কবিতার কোন চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. “মহানবির আদর্শ তাঁর সাহাবিদের চরিত্রকেও আলোকিত করেছিল।”- ‘উমর ফারুক’ কবিতার আলোকে বক্তব্যের মূল্যায়ন কর।

ক. ‘উমর ফারুক’ কবিতায় হজরত উমর (রা)-কে ‘চীরধারী সম্রাট’ বলা হয়েছে।
খ. জনশ্রুতি আছে যে, পরশপাথরের স্পর্শে অতি তুচ্ছ বস্তুও স্বর্ণে পরিণত হয়। ইসলাম ধর্মেরও তেমন গুণ আছে।
➠ একসময় আরব দেশের লোকেরা জঘন্য কাজে লিপ্ত ছিল। ইসলাম ধর্মের সংস্পর্শে এসে তারা একে একে আদর্শবান মানুষে পরিণত হন। যেমন- হজরত উমর (রা) একসময় জঘন্য প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। আর ইসলাম গ্রহণের পর তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ আদর্শবান মানুষ হয়ে গেলেন। ইসলাম ধর্মের এ গুণের কারণে ইসলামকে ‘পরশ-মানিক’ বলা হয়েছে। ইসলাম এমন এক জীবনবিধান যার প্রভাবে অত্যন্ত হীন স্বভাবের মানুষও মহামানন্নে পরিণত হয়।

গ. উদ্দীপকে ‘উমর ফারুক’ কবিতার সাম্যবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে।
➠ ইসলাম সাম্যের ধর্ম। ইসলামের অনুসারীদের এ মহান আদর্শ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেনে চলা অবশ্য কর্তব্য। নবিজি (স.) এ আদর্শের প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাঁর সাহাবিরা তা অনুসরণ ও অনুশীলন করে গেছেন। তাঁর আদর্শ সত্য ও ন্যায়ের আদর্শ। 'উমর ফারুক' কবিতায় কবি হজরত উমরের (রা)-এর সত্য ও ন্যায়ের মানস সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। উমর (রা) সাম্যবাদী। একজন ভৃত্যকে সঙ্গে নিয়ে তিনি জেরুজালেমে যাত্রা করেন। সারা পথ তিনি উটের পিঠে আরাম করে বসে থাকবেন আর ভৃত্য উটের রশি ধরে টেনে নেবে- এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে উমর (রা) তা করলেন না। তিনি ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়ার নির্দেশ দিলেন এবং নিজে উটের রশি ধরে হাঁটতে শুরু করলেন।
➠ তাঁর এই সাম্যবাদী চেতনা উদ্দীপকেও প্রতিফলিত হয়েছে। উমর (রা) তাই পালা করে উটের পিঠে চড়ে জেরুজালেমে পৌছলেন। এভাবেই মহানবি (স.)-এর আদর্শকে উমর (রা) তাঁর ব্যক্তিজীবনে বাস্তবায়ন করেছেন।

ঘ. “মহানবির আদর্শ তাঁর সাহাবিদের চরিত্রেকেও আলোকিত করেছিল।”- মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ মানুষ মানুষের জন্য। মানবসেবাই বড় ধর্ম। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য অধীনদের সেবা করা অবশ্য কর্তব্য। আর তা করার মাধ্যমেই মানবকল্যাণ সাধিত হয়। মূলত ইসলাম ধর্ম শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসীরা মানুষের কল্যাণে আত্মনিবেদন করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। খালিদ সাইফুল্লাহ কৌশলী ও সাহসী সেনাপতি। তাঁর নেতৃত্বে মুসলমানরা অনেক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, যুদ্ধে জয়লাভকরেছে। তিনি ঘটনাক্রমে ইসলামের কিছুটা খেলাপ করে ফেললেন। আবার তাকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে বীর পূজার প্রচলন হতে যাচ্ছিল, তাই উমর (রা) বিশ্ববিজয়ী বীরকে শাসন করতে দ্বিধা করলেন না। নিজের ছেলে মদ্যপানের অপরাধে অপরাধী। দণ্ডদাতা তিনি নিজে। দণ্ড নিজের হাতে কার্যকর করতে গিয়ে ছেলের মৃত্যু হলো। প্রিয়জনের মৃত্যু হয় হোক, তবু আদর্শের মৃত্যু হতে দেননি তিনি। তিনি অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। ছেঁড়া জামা পরিধান করেছেন, খেজুরপাতার চাটাইয়ে বসে শাসনকাজ পরিচালনা করেছেন।
➠ ‘উমর ফারুক’ কবিতায় উমর (রা) জীবনে যা কিছু করেছেন তার সবটাতেই মহানবি (স)-এর আদর্শের ছায়াপাত ঘটেছে। মহানবি (স) আল্লাহর নির্দেশিত যে আদর্শ রেখেছেন তারই পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করে তাঁরা বিখ্যাত হয়েছেন। উমর (রা) ছিলেন আদর্শ প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এজন্য নবিজি মন্তব্য করেছেন যে, তাঁর পরে নবি হওয়ার বিধান থাকলে উমরই তার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন। কারণ আদর্শের ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপসহীন। আদর্শের পরিপূর্ণ অনুসরণই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৬:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
আহসান সাহেব শহরের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। অনেক অর্থসম্পদ থাকার পরও তিনি প্রয়োজনের বেশি খরচ করা পছন্দ করেন না। তার বাড়িতে আসবাবপত্র অত্যন্ত সীমিত। জামাকাপড় ও চলাফেরা অত্যন্ত সাধারণ। পাড়ার সাধারণ মানুষদের সাথে খুব সহজেই তিনি মিশে যান এবং তাদের দুঃখকষ্টের কথা শুনেন।

ক. কাজী নজরুল ইসলাম কত সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন?
খ. কবি আবু শাহমার কবরে গিয়ে হজরত উমরকে সালাম করে চলে আসেন কেন?
গ. উদ্দীপকে ‘উমর ফারুক’ কবিতার কোন দিকটি ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “সাব্বির সাহেব হজরত উমর (রা.)-এর সাথে আংশিক সাদৃশ্যপূর্ণ।”- বিশ্লেষণ করো।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৭:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
সুফিয়া ১০ বছর ধরে বিশ্বস্ততার সাথে সিরাজ সাহেবের বাসায় কাজ করে। কিছুদিন আগে সিরাজ সাহেব জানতে পারেন। সুফিয়া সুযোগ পেলেই বাসা থেকে টাকাপয়সা চুরি করে। চুরির প্রমাণ পেয়ে সিরাজ সাহেব সুফিয়াকে এককালীন কিছু টাকা দিয়ে চাকরি থেকে বাদ দিয়ে দেন।

ক. উমর (রা.) নগর ভ্রমণে বের হয়ে কী দেখতে পান?
খ, ‘সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’নুয়ে’- বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের সাথে ‘উমর ফারুক’ কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “কিছুটা মিল থাকলেও ‘উমর ফারুক’ কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনাটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন।”- মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৮:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
আলম হোসেন কদমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। এলাকাবাসীর স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তাঁর প্রচেষ্টার শেষ নেই। তাঁর দানে এলাকায় গড়ে উঠেছে কয়েকটা দাতব্য প্রতিষ্ঠান। আবার অপরাধের শাস্তি দিতে তিনি কখনোই পিছপা নন। তাই তাঁর পুত্র রফিক গ্রামের মেয়েদের উত্ত্যক্ত করলে গ্রাম্য মজলিসে দোষী সাব্যস্ত করে নিজ হাতে তাকে পুলিশে সোপর্দ করেন পিতার কাছে ক্ষমা চেয়েও শাস্তি থেকে মুক্তি পায়নি সে। আলম হোসেনের আদর্শ হলো- সাম্য, সুবিচার ও মানবতা।

ক. ‘উমর ফারুক’ কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত?
খ. ‘সেদিন গিয়াছে’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
গ. উদ্দীপকে আলম হোসেনের চরিত্রে হজরত উমর (রা)-এর কোন চারিত্রিক গুণাবলি প্রকাশ ঘটেছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘আলম হোসেনের শাসনকার্যে উমর ফারুক (রা)-এর শাসনকার্যের প্রতিফলন ঘটেছে।’- উক্তিটি ‘উমর ফারুক’ কবিতাবলম্বনে বিশ্লেষণ করো।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১৯:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
আহসান সাহেব শহরের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। অনেক অর্থসম্পদ থাকার পরও তিনি প্রয়োজনের বেশি খরচ করা পছন্দ করেন না। তার বাড়িতে আসবাবপত্র অত্যন্ত সীমিত। জামাকাপড় ও চলাফেরা অত্যন্ত সাধারণ। পাড়ার সাধারণ মানুষদের সাথে খুব সহজেই তিনি মিশে যান এবং তাদের দুঃখকষ্টের কথা শুনেন।

ক. কাজী নজরুল ইসলাম কত সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন?
খ. কবি আবু শাহমার কবরে গিয়ে হজরত উমরকে সালাম করে চলে আসেন কেন?
গ. উদ্দীপকে ‘উমর ফারুক’ কবিতার কোন দিকটি ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. "সাব্বির সাহেব হজরত উমর (রা.)-এর সাথে আংশিক সাদৃশ্যপূর্ণ।”- বিশ্লেষণ করো।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ২০:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
সুফিয়া ১০ বছর ধরে বিশ্বস্ততার সাথে সিরাজ সাহেবের বাসায় কাজ করে। কিছুদিন আগে সিরাজ সাহেব জানতে পারেন সুফিয়া সুযোগ পেলেই বাসা থেকে টাকাপয়সা চুরি করে। চুরির প্রমাণ পেয়ে সিরাজ সাহেব সুফিয়াকে এককালীন কিছু টাকা দিয়ে চাকরি থেকে বাদ দিয়ে দেন।

ক. উমর (রা.) নগর ভ্রমণে বের হয়ে কী দেখতে পান?
খ. ‘সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক’ নুয়ে’- বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের সাথে ‘উমর ফারুক’ কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “কিছুটা মিল থাকলেও ‘উমর ফারুক’ কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনাটির প্রেক্ষাপট ভিন্ন।”- মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ২১:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
উদ্দীপক-১: আর্থিকভাবে ততটা সচ্ছল না হলেও বরকত সাহেব গরিব, অসহায় পাড়া-প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নিতে কখনো ভোলেন না বরং নিজের খাবার ক্ষুধার্ত, নিরন্ন মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন।
উদ্দীপক-২: পাড়ার বখাটে ছেলে মিলন স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করত। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে সে ১২-১৩ বছরের কিশোরীর মুখে এসিড ছুড়ে মারে। এতে পাড়ার লোকজন বিচারের দাবি জানালে ছেলেটির বাবা নিজ হাতে ছেলেটিকে র‍্যাবের হাতে তুলে দেন।

ক. হজরত উমর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কী ছিলেন?
খ. ‘অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধূলার তখতে বসি’- পঙক্তিটির মাধ্যমে কী বোঝানো হয়েছে?
গ. উদ্দীপক-১-এ বরকত সাহেবের ব্যবহারে হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর চরিত্রের কোন গুণটি উদ্ভাসিত তা বর্ণনা করো।
ঘ. ‘উদ্দীপক-১ ও উদ্দীপক-২ হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর চরিত্রের আংশিক প্রতিচ্ছবি।’- ‘উমর ফারুক’ কবিতা অনুসারে উক্তিটির যথাযথ মূল্যায়ন করো।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ২২:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সুবিদ আলীর ছোটো ভাই রহমত আলী তাঁরই অফিসে কর্মরত। ঘটনাক্রমে সুবিদ আলী জানতে পারলেন রহমত আলী অফিসে অনৈতিক কাজে জড়িত। সুবিদ আলী রহমতের এ অসৎ কাজে অসন্তুষ্ট হন। রহমত আলীর অপরাধের শাস্তিস্বরূপ তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। অপরাধী তার অসৎ কাজের জন্য শাস্তি পাবে এটাই নিয়ম। তিনি জানেন আইনের চোখে সকলেই সমান।

ক. ‘পরশমণি’ শব্দটির অর্থ কী?
খ. আবু শাহমা কে ছিলেন? তার শাস্তির কারণ ব্যাখ্যা করো
গ. অপরাধীকে শাস্তিদানের ক্ষেত্রে সুবিদ আলীর মনোভাবের যে দৃঢ়তা ফুটে উঠেছে তা ‘উমর ফারুক’ কবিতার আলোকে ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “আইনের চোখে সকলেই সমান। সুবিদ আলীর এ উক্তি ‘উমর ফারুক’ কবিতার খলিফা উমরের মানসিকতাকেই সমর্থন করে।”- ‘উমর ফারুক’ কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ করো।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ২৩:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
বিকালবেলা স্কুলের বারান্দা ঝাড় দিচ্ছিল হরিজন মথুয়া। একটু দূরে তার পাঁচ বছরের মেয়ে বনিয়া খেলছিল। স্টাফরুমে বসে পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন আলম সাহেব। হঠাৎ পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে মথুয়া। কেবল এটুকু বোঝা যাচ্ছে- 'হামার মেইয়ে, হামার মেইয়ে....। স্টাফরুম থেকে বের হয়ে আলম সাহেব দেখেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মেয়েকে নিয়ে মথুয়া কারো সহযোগিতা চাচ্ছে। নিজের অবস্থান চিন্তা না করেই আলম সাহেব মেয়েটিকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটেন।

ক. জেরুজালেম শহরের প্রতিষ্ঠাতা কে?
খ. ইসলামকে ‘পরশ-মানিক’ বলা হয়েছে কেন? বুঝিয়ে লেখো।
গ. উদ্দীপকের আলম সাহেবের মাঝে হজরত উমর (রা.)-এর কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “উদ্দীপকে ‘উমর ফারুক’ কবিতায় উমর (রা.)-এর চরিত্রের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য ছাড়াও আরও অনেক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে।”- মূল্যায়ন করো।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ২৪:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
শিমুল শাহবাগের মোড়ে এসে গাড়ি থেকে নামল। এমন সময় দেখল একজন বৃদ্ধা বাসে ওঠার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাসে ওঠার সিঁড়িটা উঁচুতে ছিল বলে উঠতে পারছিলেন না। শিমুল বৃদ্ধাকে বাসে তুলে একটি সিটে বসিয়ে দিলো। বৃদ্ধা অশ্রুসিক্ত নয়নে শিমুলকে আশীর্বাদ করলেন।

ক. হজরত উমর (রা.) কোন মরুভূমি পার হয়ে জেরুজালেম পৌঁছেন?
খ. ‘তুমি নির্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনিক’ কারে ভয়।’- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো
গ. উদ্দীপকের শিমুলের আচরণ ‘উমর ফারুক’ কবিতার উমর (রা.)-এর চরিত্রের কোন দিকটি নির্দেশ করে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “উদ্দীপকের বিষয়বস্তু ‘উমর ফারুক’ কবিতার একটি মাত্র দিকের প্রতিনিধিত্ব করে।”- বিশ্লেষণ করো।


‘উমর ফারুক’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ২৫:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
প্রজাদরদি জমিদার মোয়াজ্জেম হোসেন সাম্যনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলমান সকলকেই সমান চোখে দেখতেন। জমিদার হিসেবে তাঁর বাড়িতে পাঁচ-ছয়জন ভৃত্য কাজ করত। কিন্তু ভৃত্যের সঙ্গে তিনি কোনোরকম আলাদা জীবনব্যবস্থা আরোপ করতেন না। খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে সবদিকেই তাঁর নজর ছিল। শুধু ভৃত্যকে দিয়ে কঠিন ও জটিল কাজগুলো তিনি করাতেন না, প্রয়োজন হলে তাদের কাজেও মোয়াজ্জেম সাহেব সাহায্য করতেন। এতে রাজ্যে দিনের পর দিন শান্তি-শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং প্রজাদরদি জমিদার হিসেবে মোয়াজ্জেম হোসেন দিদিগন্তে প্রশংসিত হতে থাকেন।

ক. ইসলামকে কবি কীসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
খ. আবু শাহমার মৃত্যুবরণ করার কারণ ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের প্রজাদরদি মোয়াজ্জেম হোসেন চরিত্রটিতে ‘উমর ফারুক’ কবিতার কোন চরিত্রটির সাদৃশ্য রয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উদ্দীপকের বিষয়বস্তু ‘উমর ফারুক’ কবিতার বিষয়বস্তুকে কি স্পর্শ করতে পেরেছে? বিশ্লেষণ করো।


তথ্যসূত্র :
১. বাংলা সাহিত্য : নবম-দশম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৫।
২. নজরুলের কবিতাসমগ্র: কবি নজরুল ইনসটিটিউট, তৃতীয় সংস্করণ, নভেম্বর ২০১৯।
৩. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৪. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।


মূল কবিতা

উমর ফারুক
কাজী নজরুল ইসলাম

তিমির রাত্রি-এশার আজান শুনি দূর মসজিদে,
প্রিয়-হারা কার কান্নার মত এ-বুকে আসিয়া বিঁধে!
আমির-উল্-মুমেনিন,
তোমার স্মৃতি যে আজানের ধ্বনি-জানে না মুয়াজ্জিন!

তকবির শুনি শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি,
বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি রে গগনে মরুর শশী?
ও-আজান ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান?
মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহ্বান?

আবার লুটায়ে পড়ি!
‘সে দিন গিয়াছে’-শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি!
উমর! ফারুক! আখেরি নরির ওগো দক্ষিণ-বাহু!
আহ্বান নয়-রূপ ধরে এসো! গ্রাসে অন্ধতা-রাহু
ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!
সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ!
শুধু অঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের,
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি,
আর একবার লোহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি!
নওশার বেশে সাজাও বন্ধু মোদেরে পুনর্বার
খুনের সেহেরা পরাইয়া দাও হাতে বাঁধি হাতিয়ার!
দেখাইয়া দাও-মৃত্যু যথায় রাঙা দুলহিন-সাজে
করে প্রতিক্ষা আমাদের তরে রাঙা রণ-ভূমি মাঝে!
মোদের ললাট-রক্তে রাঙিবে রিক্ত সিঁথি তাহার,
দুলাব তাহার গলায় মোদের লোহু-রাঙা তরবার!

সেনানী! চাই হুকুম!
সাত সমুদ্র তের নদী পারে মৃত্যু-বধূর ঘুম
টুটিয়াছে ঐ যক্ষ-কারায়, সহে নাকো আর দেরি,
নকিব কণ্ঠে শুনিব কখন নব অভিযান ভেরি!...
নাই তুমি নাই, তাই সয়ে যায় জামানার অভিশাপ,
তোমার তখতে বসিয়া করিছে শয়তান ইন্‌স্সাফ!
মোরা ‘আসহাব-কাহাফে’র মতো দিবানিশা দিই ঘুম,
‘এশা’র আজান কেঁদে যায় শুধু-নিঃঝুম নিঃঝুম।

কত কথা মনে জাগে,
চড়ি কল্পনা-বোৱাকে যাই তের শ’ বছর আগে
যেদিন তোমার প্রথম উদয় রাঙা মরু-ভাস্কর,
আরব যে দিন হলো আরাস্তা, মরীচিকা সুন্দর।
গোষ্ঠে বসিয়া বালক রাখাল মুহম্মদ সেদিন
বারে বারে কেন হয়েছে উতলা! কোথা বেহেশতি বীণ
বাজিতেছে যেন। কে যেন আসিয়া দাঁড়ায়েছে তাঁর পিছে,
বন্ধু বলিয়া গলা জড়াইয়া কে যেন সম্ভাষিছে!

মানসে ভাসিছে ছবি-
হয়ত সেদিন বাজাইয়া বেণু মোদের বালক নবী
অকারণ সুখে নাচিয়া ফিরেছে মেষ-চারণের মাঠে!
খেলায়েছে খেলা বাজাইয়া বাঁশি মক্কার মরু-বাটে!
খাইয়াছে চুমা দুম্বা-শিশুরে জড়াইয়া ধরি বুকে,
উড়ায়ে দিয়েছে কবুতরগুলি আকাশে অজানা সুখে!
সূর্য যেন গো দেখিয়াছে-তার পিছনের অমারাতি
রৌশন-রাঙা করিছে কে যেন জ্বালায়ে চাঁদের বাতি।

উঠেছিল রবি আমাদের নবী, সে মহা-সৌরলোকে,
উমর, একাকী তুমি পেয়েছিলে সে আলো তোমার চোখে!
কে বুঝিবে লীলা-রসিকের খেলা! বুঝি ইঙ্গিতে তার
বেহেশত-সাথী খেলিতে আসিলে ধরায় পুনর্বার।
তোমার রাখাল-দোন্তের মেষ চরিত সুদূর গোঠে,
হেথা ‘আজান’-ময়দানে তব পরান ব্যথিয়া ওঠে!
কেন কার তরে এ প্রাণ-পোড়ানি নিজেই জান না বুঝি,
তোমার মাঠের উটেরা হারায়, তুমি তা দেখ না খুঁজি।
ইহারই মাঝে বা হয়তো কখন দুই দোঁহা দেখেছিলে,
খেজুর-মেতির গল-হার যেন বদল করিয়া নিলে,
হইলে বন্ধু মেষ-চারণের ময়দানে নিরালয়,
চকিত দেখায় চিনিল হৃদয় চির-চেনা আপনায়!

খেলার প্রভাত কাটিল কখন, ক্রমে বেলা বেড়ে চলে,
প্রভাতের মালা শুকায়ে ঝরিল খর মরু-বালুতলে।
দীপ্ত জীবন-মধ্যাহ্নের রৌদ্র-তপ্ত পথে
প্রভাতের সখা শত্রুর বেশে আসিলে রক্ত-রথে।
আরবে সেদিন ডাকিয়াছে বান, সেদিন ভুবন জুড়ি,
‘হেরা’-গুহা হতে ঠিকরিয়া ছুটি মহাজ্যোতি বিচ্ছুরি!
প্রতীক্ষমান তাপসী ধরণী সেদিন শুদ্ধস্নাতা
উদাত্ত স্বরে গাহিতেছিল গো কোরানের সাম-গাথা!
পাষাণের তলে ছিল এত জল, মরুভূমে এত ঢল?
সপ্ত সাগর সাতশত হয়ে করে যেন টলমল!
খোদার হাবিব এসেছে আজিকে হইয়া মানব-মিতা,
পুণ্য-প্রভায় ঝলমল করে ধরা পাপ-শঙ্কিতা।
সেদিন পাথারে উঠিল যে মৌজ তাহারে শাসন-হেতু
নির্ভীক যুবা দাঁড়াইলে আসি ধরি বিদ্রোহ-কেতু!
উদ্ধত রোষে তরবারি তব ঊর্ধ্বে আন্দোলিয়া
বলিলে, ‘রাঙাবে এ তেগ মুসলমানের রক্ত দিয়া!’
উন্মাদ বেগে চলিলে ছুটিয়া!-এ কার এ কি ওঠে গান?
এ কোন লোকের অমৃত মন্ত্র? কার মহা-আহ্বান?
ফাতেমা-তোমার সহোদরা-গাহে কোরান-অমিয়-গাথা,
এ কোন মন্ত্রে চোখে আসে জল, হায় তুমি জান না তা!
উন্মাদ-সম কেঁদে কও, ওরে, শোনা পুনঃ সেই বাণী!
কে শিখাল তোরে এ গান সে কোন বেহেশত হতে আনি
এ কি হল মোর? অভিনব এই গীতি শুনি হায় কেন
সকল অঙ্গ শিথিল হইয়া আসিছে আবেশে যেন!
কি যেন পুলক কি যেন আবেগে কেঁপে উঠি বারে বারে,
মানুষের দুখে এমন করিয়া কে কাঁদিছে কোন্ পারে?
‘আশহাদু আন্-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলি
কহিল ফাতেমা-'এই সে কোরান, খোদার কালাম গলি
নেমেছে ভুবনে মুহম্মদের অমর কণ্ঠে, ভাই!
এই ইসলাম, আমরা ইহারি বন্যায় ভেসে যাই!'...

উমর আনিল ইমান। -গরজি গরজি উঠিল স্বর
গগন পবন মন্থন করি-'আল্লাহু আকবর!'
সম্ভ্রমে-নত বিশ্ব সেদিন গাহিল তোমার স্তব-
'এসেছেন নবী, এত দিনে এল ধরায় মহামানব!'

পয়গম্বর নবী ও রসুল-এঁরা তো খোদার দান!
তুমি রাখিয়াছ, হে অতি-মানুষ, মানুষের সম্মান!
কোরান এনেছে সত্যের বাণী, সত্যে দিয়াছে প্রাণ,
তুমি রূপ-তব মাঝে সে সত্য হয়েছে অধিষ্ঠান।
ইসলাম দিল কি দান বেদনা-পীড়িত এ ধরণীরে,
কোন্ নব বাণী শুনাইতে খোদা পাঠাল শেষ নবীরে,-
তোমারে হেরিয়া পেয়েছি জওয়াব সে-সব জিজ্ঞাসার!
কী যে ইসলাম, হয়তো বুঝিনি, এইটুকু বুঝি তার
উমর সৃজিতে পারে যে ধর্ম, আছে তার প্রয়োজন!
ওগো, মানুষের কল্যাণ লাগি তারি শুভ আগমন
প্রতীক্ষায় এ দুঃখিনী ধরা জাগিয়াছে নিশিদিন
জরা-জর্জর সন্তানে ধরি বক্ষে শান্তিহীন!
তপস্বিনীর মত
তাহারি আশায় সেধেছে ধরণী অশেষ দুখের ব্রত।

ইসলাম-সে তো পরশ-মানিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি!
পরশ তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি।
আজ বুঝি-কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর-
‘মোর পরে যদি নবী হতো কেউ, হতো সে এক উমর!’
পাওনি কো 'ওহি', হওনি কো নবী, তাই ত পরান ভরি
বন্ধু ডাকিয়া আপনার বলি বক্ষে জড়ায়ে ধরি!
খোদারে আমরা করি গো সেজদা, রসুলে করি সালাম,
ওঁরা ঊর্ধ্বের, পবিত্র হয়ে নিই তাঁহাদের নাম,
তোমারে স্মরিতে ঠেকাই না কর ললাটে ও চোখে-মুখে,
প্রিয় হয়ে তুমি আছো হতমান মানুষ জাতির বুকে।
করেছ শাসন অপরাধীদের তুমি করনি কো ক্ষমা,
করেছ বিনাশ অসুন্দরের। বলনি কো মনোরমা
মিথ্যাময়ীরে। বাঁধনি কো বাসা মাটির ঊর্ধ্বে উঠি।
তুমি খাইয়াছ দুঃখীর সাথে ভিক্ষার ক্ষুদ খুঁটি!

অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধূলার তখতে বসি
খেজুর পাতার প্রাসাদ তোমার বারেবারে গেছে খসি
সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি কো নুয়ে,
ঊর্ধ্বের যারা-পড়েছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভুঁয়ে!
শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ
করেছে সালাম দূর হতে সব, ছুঁইতে পারেনি পদ।
সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,
বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে!

হেরি পশ্চাতে চাহি-
তুমি চলিয়াছ রৌদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি
জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি
বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি।
দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা, বলেছে শত্রু শেষে-
উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে।
হায় রে আধেক ধরার মালিক আমিরুল-মুমেনিন
শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন
সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দুখানা শুকনো ‘খবুজ’ রুটি,
একটি মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু-তিন মুঠি!
প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি
চলেছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি।
মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে,
সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে।
কিছুদূর যেতে উট হতে নামি কহিলে ভৃত্যে, ‘ভাই,
পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এইবার আমি যাই
উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে;
তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে!’

...ভৃত্য দপ্ত চুমি
কাঁদিয়া কহিল, ‘উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি?
উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি
আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?’

খলিফা হাসিয়া বলে,
‘তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে!
রোজ-কিয়ামতে আল্লা যেদিন কহিবে, 'উমর! ওরে,
করেনি খলিফা মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে!'
কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই?
আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু! মোর অধিকার নাই
আরাম সুখের, মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা!
ইসলাম বলে সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কে-বা!
ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধূলায় নামিল শশী!
জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্পবৃষ্টি হইল কি-না,
কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দি বিশ্ববীণা!
জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব,-
অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, 'জয় জয় হে মানব!'...

আসিলে প্যালেস্টাইন, পারায়ে দুস্তর মরুভূমি,
ভৃত্য তখন উটের উপরে, রশি ধরে চল তুমি!
জর্ডন নদী হও যবে পার, শত্রুরা কহে হাঁকি-
'যার নামে কাঁপে অর্ধ পৃথিবী, এই সে উমর নাকি?'
খুলিল রুদ্ধ দুর্গ-দুয়ার। শত্রুরা সম্ভ্রমে
কহিল-'খলিফা আসেনি, এসেছে মানুষ জেরুজালমে।'
সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করি শত্রু-গির্জা-ঘরে
বলিলে, 'বাহিরে যাইতে হইবে এবার নামাজ তরে।'
কহে পুরোহিত, 'আমাদের এই আঙিনায় গির্জায়,
পড়িলে নামাজ হবে না কবুল আল্লার দরগায়?'
হাসিয়া বলিলে, 'তার তরে নয়, আমি যদি হেথা আজ
নামাজ আদায় করি, তবে কাল অন্ধ লোকসমাজ
ভাবিবে-খলিফা করেছে ইশারা হেথায় নামাজ পড়ি
আজ হতে যেন এই গির্জারে মোরা মসজিদ করি!
ইসলামের এ নহে কো ধর্ম, নহে খোদার বিধান,
কারো মন্দিরে গির্জারে করে ম'জিদে মুসলমান!'
কেঁদে কহে যত ঈসাই ইহুদি অশ্রু-সিক্ত আঁখি-
'এই যদি হয় ইসলাম-তবে কেহ রহিবে না বাকি,
সকলে আসিবে ফিরে
গণতন্ত্রের ন্যায় সাম্যের শুভ্র এ মন্দিরে!'

তুমি নির্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনিকো কারে ভয়,
সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধত কয়।
মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষেরি অপমান,
তাই মহাবীর খালেদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান
সিপাহ-সালারে ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা,
বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না।

ধরাধাম ছাড়ি শেষ নবী যবে করিল মহাপ্রয়াণ,
কে হবে খলিফা-হয়নি তখনো কলহের অবসান,
নবী-নন্দিনী বিবি ফাতেমার মহলে আসিয়া সবে
করিতে লাগিল জটলা-ইহার পরে কে খলিফা হবে!
বজ্রকণ্ঠে তুমিই সেদিন বলিতে পারিয়াছিলে-
‘নবিসূতা! তব মহল জ্বালাব, এ সভা ভেঙে না দিলে!’
মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি,
মনে পড়ে যত মহত্ত্ব-কথা-সেদিন সে বিভাবরী
নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে
মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুধাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে
কাঁদিতেছে আর দুঃখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে, হায়,
উনানে শূন্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকূলে চায়!
শুনিয়া সকল-কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে
বয়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজে হাতে,
বলিলে, 'এ সব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের পরে,
আমি লয়ে বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে!'
কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা,
বলিলে, 'বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা!
রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার?
মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার
প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি!'- চলিলে নিশীথ রাতে
পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে।

এত যে কোমল প্রাণ,
করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি কো অপমান!
মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে
মেরেছ দোরা, মরেছে পুত্র তোমার চোখের পরে।
ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি-
'অপরাধ করে তোরি মত স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী!'

আবু শাহার গোরে
কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে।

খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে,
'কোথায় খলিফা' কেবলি প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে,
একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে
রৌদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে!

...হে খলিফাতুল-মুসলেমিন। হে চীরধারী সম্রাট।
অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ,
মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই
তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই!
বন্ধু গো, প্রিয়, এ হাত তোমারে সালাম করিতে গিয়া
ওঠে না ঊর্ধ্বে, বক্ষে তোমারে ধরে শুধু জড়াইয়া!...

মাহিনা মোহরম-
হাসেন হোসেন হয়েছে শহীদ, জানে শুধু হায় কৌম্,
শহিদি বাদশা! মোহরমে যে তুমিও গিয়াছ চলি
খুনের দরিয়া সাঁতারি-এ জাতি গিয়াছে গো তাহা ভুলি।
মোরা ভুলিয়াছি, তুমি তো ভোলোনি! আজো আজানের মাঝে
মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে বন্ধু, তোমারি কাঁদন বাজে!
বন্ধু গো জানি, আমাদের প্রেমে আজো ও গোরের বুকে
তেমনি করিয়া কাঁদিছ হয়তো কত না গভীর দুখে!
ফিরদৌস হতে ডাকিছে বৃথাই নবী পয়গম্বর,
মাটির দুলাল মানুষের সাথে ঘুমাও মাটির 'পর!
হে শহিদ! বীর! এই দোয়া করো আরশের পায়া ধরি-
তোমারি মতন মরি যেন হেসে খুনের সেহেরা পরি!

মৃত্যুর হাতে মরিতে চাহি না, মানুষের প্রিয় করে
আঘাত খাইয়া যেন গো আমার শেষ নিঃশ্বাস পড়ে!

কলিকাতা
১৬ই পৌষ ১৩৩৪
উমর ফারুক-দ্বিতীয় খলিফা। এঁরি নির্দেশক্রমে আজানের প্রচলন হয়। এশা-রাত্রির নামাজ। আমিরুল-মুমেনিন-বিশ্বাসীদের শ্রেষ্ঠ।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url