আসমানিরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানিরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক’খান হাড়,
সাক্ষী দেছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি,
থাপড়েতে নিবিয়ে গেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গার বরনের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয়নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানিদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে,
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল-বিল-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না খাওয়া আসমানিদের চলে।
পেটটি তাহার ফুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।
‘আসমানি’ কবিতার উৎস নির্দেশ:
--
‘আসমানি’ কবিতার শব্দার্থ ও টীকা:
➠ ভেন্না পাতা- ভেন্না এক ধরনের গাছ। গরিব মানুষ এ গাছের পাতা ঘরের ছাউনি
হিসেবে ব্যবহার করে।
➠ সাক্ষী- কোনো ঘটনা যে সামনে থেকে দেখে এবং দরকারি জায়গায় প্রকাশ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী।
➠ দেছে- ‘দিয়েছে’ শব্দের আঞ্চলিক রূপ।
➠ অনাহারে- আহার বা খাবার-ছাড়া। না খেয়ে বা অভুক্ত থাকা।
➠ হাসির প্রদীপ-রাশি- প্রদীপ যেমন আলো ছড়ায়, তেমনি হাসি
মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল করে। আনন্দময় অনুভূতি প্রকাশ করে।
➠ বাস- পোশাক। জামা।
➠ গার- গায়ের। শরীরের।
➠ বরনের- রঙের।
➠ উপহাস- ঠাট্টা।
➠ মশক- মশা।
➠ পিলে- প্লীহা। Spleen। পাকস্থলীর বাম পাশের একটি অংগ। এ অংগের অসুখ হলে
পেট ফুলে ওঠে।
➠ নিতুই- নিত্য বা প্রতিদিন। রোজ। এটি একটি কাব্যিক পদ।
➠ বৈদ্য- কবিরাজ। গ্রাম্য চিকিৎসক।
‘আসমানি’ কবিতার পাঠের উদ্দেশ্য :
মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও সামাজিক দায়বোধ জাগ্রত করা।
‘আসমানি’ কবিতার পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব:
‘আসমানি’ কবিতায় সাধারণ মানুষের প্রতি, বিশেষত গ্রামের শিশুদের
দুঃখ-কষ্টময় জীবনের প্রতি মমতাময় অনুভূতির নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছে।
আসমানি গরিব, তাদের বাসা পাখির বাসার মতো হালকা। একটু বৃষ্টিতেও তাদের
বাসা নড়বড় করে। ঠিক মতো খেতে পায় না বলে অসুখে ভোগে। পোশাক তার ছেঁড়া।
মুখে তার হাসি নেই, কন্ঠে নেই গান। তাদের বাড়ির আশপাশ অস্বাস্থ্যকর।
আসমানির জীবনে আনন্দ নেই।
অনেক দরদ দিয়ে কবি আসমানির জীবনের যে চিত্র এঁকেছেন, তা আমাদের সহানুভূতি
এবং সামাজিক দায়বোধ জাগিয়ে তোলে।
‘আসমানি’ কবিতার কবি পরিচিতি :
জসীমউদ্দীন ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে
জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর কবিতা রচনা শুরু। তিনি যখন কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখনই তাঁর কবর কবিতা প্রবেশিকা শ্রেণির
বাংলা সংকলনে স্থান পায়। তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলার জীবন ও প্রকৃতির ছবি
ফুটে উঠেছে সহজ-সরল ভাষা ও সাবলীল ছন্দে।
জসীমউদ্দীনের প্রধান কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে
নক্সী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, রাখালী, বালুচর, ধানখেত,
সুচয়নী
ইত্যাদি। এ ছাড়া তিনি ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, নাটক, সঙ্গীত ও প্রবন্ধের
বই রচনা করেছেন। শিশুদের জন্য লেখা ডালিম কুমার তাঁর অনবদ্য রচনা।
জসীমউদ্দীনের কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে,
পরে তিনি দীর্ঘ দিন কাজ করেন সরকারের প্রচার বিভাগে।
১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
‘আসমানি’ কবিতার কর্ম-অনুশীলন:
১। ছুটিতে গ্রামে গিয়ে কবিতায় বর্ণিত জীবনের সঙ্গে মেলে এমন পরিবারের
ঘরদোর, পোশাক, খাবার ইত্যাদির একটি তালিকা প্রস্তুত করো।
২। উক্ত তালিকার ভিত্তিতে গরিব মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বর্ণনা দাও।
‘আসমানি’ কবিতার বহুনির্বাচনি প্রশ্ন:
প্রশ্ন থেকে
অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন
-এর মধ্যে!
যা
‘আসমানি’ কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন:
প্রশ্ন ॥ ১ ॥ ‘নিতুই’ শব্দটির অর্থ কী?
উত্তর : ‘নিতুই’ শব্দটির অর্থ প্রতিদিন।
প্রশ্ন ॥ ২ ॥ ‘উপহাস’ শব্দটির অর্থ কী?
উত্তর : ‘উপহাস’ শব্দটির অর্থ ঠাট্টা।
প্রশ্ন ॥ ৩ ॥ রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি কোথায়?
উত্তর : রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে।
প্রশ্ন ॥ ৪ ॥ আসমানিদের পোশাক কেমন?
উত্তর : আসমানিদের পোশাক ছেঁড়া।
প্রশ্ন ॥ ৫ ॥ কবি জসীমউদ্দীন কত খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর : কবি জসীমউদ্দীন ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রশ্ন ॥ ৬ ॥ কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জসীমউদ্দীনের কর্মজীবন শুরু হয়?
উত্তর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জসীমউদ্দীনের কর্মজীবন শুরু হয়।
প্রশ্ন ॥ ৭ ॥ কবি জসীমউদ্দীনের শিশুদের জন্য অনবদ্য রচনা কোনটি?
উত্তর : কবি জসীমউদ্দীনের শিশুদের জন্য অনবদ্য রচনা ডালিমকুমার।
প্রশ্ন ॥ ৮ ॥ একটুখানি হাওয়া দিলেই আসমানিদের কী নড়বড় করে?
উত্তর : একটুখানি হাওয়া দিলেই আসমানিদের ঘর নড়বড় করে।
প্রশ্ন ॥ ৯ ॥ আসমানিদের ভোমর কালো চোখ দুটিতে কী নাই?
উত্তর : আসমানিদের ভোমর কালো চোখ দুটিতে কৌতুক হাসি নেই।
প্রশ্ন ॥ ১০ ॥ ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কী করে?
উত্তর : ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল-বিল করে।
প্রশ্ন ॥ ১১ ॥ আসমানির গায়ের বরণ কেমন?
উত্তর : আসমানির গায়ের বরণ সোনালি।
প্রশ্ন ॥ ১২ ॥ কেমন জলে আসমানিদের রান্না খাওয়া চলে?
উত্তর : ম্যালেরিয়া মশক যে জলে বিষ ঢালে সে জলে আসমানিদের রান্না খাওয়া চলে।
প্রশ্ন ॥ ১৩ ॥ আসমানিদের জীবনে কী নেই?
উত্তর : আসমানিদের জীবনে আনন্দ নেই।
প্রশ্ন ॥ ১৪ ॥ কবি জসীমউদ্দীন ছাত্রজীবন থেকেই কী লেখা শুরু করেন?
উত্তর : কবি জসীমউদ্দীন ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন।
প্রশ্ন ॥ ১৫ ॥ আসমানিদের বাড়ির আশপাশের অবস্থা কেমন?
উত্তর : আসমানিদের বাড়ির আশপাশের অবস্থা অস্বাস্থ্যকর।
প্রশ্ন ॥ ১৬ ॥ কত খ্রিষ্টাব্দে কবি জসীমউদ্দীন মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর : ১৯৭৬ সালে কবি জসীমউদ্দীন মৃত্যুবরণ করেন।
প্রশ্ন ॥ ১৭ ॥ কবি জসীমউদ্দীন কোথায় মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর : কবি জসীমউদ্দীন ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
‘আসমানি’ কবিতার অনুধাবনমূলক প্রশ্ন:
প্রশ্ন ॥ ১ ॥ একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে- বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর : ‘আসমানি’ কবিতায় কবি জসীমউদ্দীন আসমানি নামের অসহায় মেয়েটির করুণ জীবন চিত্র ফুটে তুলেছেন।
তার বাড়ি ঘর খুবই নড়বড়ে। একটুখানি বৃষ্টি এলে পানি গড়িয়ে পড়ে। সামান্য হাওয়া হলেই সেটা পড়ে যেতে পারে, পাখির বাসার মতো জীর্ণশীর্ণ। মানুষের মৌলিক চাহিদার সামান্যতমও যে পূরণ হয়নি সেটাই প্রকাশিত হয়েছে উক্ত চরণটির মধ্য দিয়ে।
প্রশ্ন ॥ ২ ॥ ‘বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হলো তাই কেঁদে।’ এ চরণটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে। ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তার কেঁদে’- এ চরণটি দ্বারা আসমানিদের দারিদ্র্যের করুণ অবস্থা বোঝানো হয়েছে।
কিন্তু তার শরীরের সৌন্দর্য ও প্রকৃতি প্রদত্ত ক্ষমতা অবহেলায়, সুযোগের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আসমানির গলার সুর বাঁশির মতো মধুর। কিন্তু কখনো গান শেখার সুযোগ হয়নি তার। বরং খাদ্য বস্ত্রের জন্য কেঁদে কেঁদে জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ যেন প্রকৃতির দারুণ উপহাস।
প্রশ্ন ॥ ৩ ॥ ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল-বিল করে কেন?
উত্তর : আসমানি দারিদ্র্যের কারণে পুকুরের যত্ন নিতে না পারায় সেখানে শ্যাওলা ও পোকা কিল-বিল করে।
‘আসমানি’ কবিতার দরিদ্র মেয়ে আসমানিদের বাড়ি পদ্মপুকুরের ধারে। পদ্মপুকুর সৌন্দর্যের আধার। পদ্মপুকুরে ভাসমান পদ্মফুল সৌন্দর্য প্রকাশ করে। কিন্তু নিদারুণ দারিদ্র্য ও অসীম অসহায়ত্ব তাদের সেই পুকুরটাকে সুন্দর রাখতে পারেনি। পরিষ্কার করার অভাবে সেখানে শ্যাওলা জন্মেছে। কীট ও জীবাণু সেখানে কিল-বিল করে। এটা আসমানিদের অসহায়ত্বের প্রকাশ।
প্রশ্ন ॥ ৪ ॥ আসমানির পেট ফুলেছে কেন?
উত্তর : প্লিহা রোগে আক্রান্ত হয়ে আসমানির পেট ফুলেছে।
আসমানি সমাজের অতি দরিদ্র্য একটা মেয়ের প্রতিচিত্র। তার সামর্থ্য খুবই নগণ্য। নিজের দারিদ্র্য আর অভাব তাকে কোনোমতেই সুস্থ রাখেনি। ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু ভর্তি পুকুরের নোংরা পানি পান করে তার শরীর অসুস্থ। তখন তার প্রতিদিন জ্বর আসে। প্লিহায় তার পেটটি ফুলে গেছে।
প্রশ্ন ॥ ৫ ॥ ‘বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর’ চরণটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : অর্থাভাবে চিকিৎসকের সেবা না নিতে পারায় বিষয়টি উপযুক্ত চরণে প্রকাশিত হয়েছে।
আসমানি দরিদ্র ও অসুস্থ একটি মেয়ে। কবিতায় তার অসীম দারিদ্র্যের কথা প্রকাশিত হয়েছে। অনাহার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস আর জীবাণুযুক্ত পানি পানে সে অসুস্থ। নিজের অসুস্থ শরীরটানে সুস্থ করতে চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসার জন্য যাবে সে সামর্থ্যও তার নেই। সমাজের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ব্যবস্থায় প্রতিফলন আসমানি।
‘আসমানি’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
গ্রামের দরিদ্র কৃষক লালচাঁন মিয়া। বিঘে তিনেক জমি বর্গা চাষ করে। পর-পর দুবছর বন্যা ও খরায় সে জমিতে ফসল ফলেনি। পরিবারকে দু-বেলা পেট ভরে খেতে দিতে পারে না। না খেতে পেয়ে সন্তানদের চোখ কোটরে ঢুকে গেছে, বুকের পাজর গোনা যায়। একটি মাত্র মাটির ঘর, তারও আবার ছাউনি নষ্ট হওয়ার উপক্রম। বৃষ্টি বাদলার রাতে ঘরের কোণে বসে রাত কাটাতে হয়। লালচাঁন মিয়ার মতো মানুষগুলোর অভাব যেন পিছু ছাড়ে না।
ক. আসমানিদের গ্রামের নাম কী?
খ. মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি, থাপড়েতে নিবিয়ে গেছে দারুণ অভাব আসি।- এই চরণ দুটি দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে?
গ. আসমানিদের ঘরের সাথে লালচাঁন মিয়ার ঘরটির সাদৃশ্য ব্যাখ্যা কর।
ঘ. ‘লালচাঁন মিয়ার মতো মানুষগুলোর অভাব যেন পিছু ছাড়ে না’- আসমানি কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ কর।
ক আসমানিদের গ্রামের নাম রসুলপুর।
খ প্রশ্নোক্ত চরণ দুটি দ্বারা দারিদ্র্যের কষাঘাতে আসমানির মিষ্টি মুখের হাসিটি নিভে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অভাব আর দুঃখ কষ্টে জর্জরিত আসমানির মুখে আর হাসি নেই। প্রদীপের মতোই তা নিভে গেছে। চেহারায় মলিনতা তার হৃদয়ে গভীর বেদনা নিয়েই সে বেঁচে আছে।
গ জরাজীর্ণতার দিক দিয়ে আসমানিদের ঘরের সাথে লালচাঁন মিয়ার ঘরটির সাদৃশ্য রয়েছে।
কবি জসীমউদ্দীন তার ‘আসমানি’ কবিতার দরিদ্র দশায় নিপতিত আসমানিদের পরিবারের করুণ চিত্র অঙ্কন করেছেন। আসমানিদের বাড়ি যেন বাড়ি না-পাখির বাসা। ভেন্না পাতা দিয়ে যার ছাউনি দেওয়া হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি গড়িয়ে পড়ে। একটুখানি হাওয়াতে ঘরটি নড়বড় করে। এমনি একটি ভাঙাচোরা ঘরে আসমানিরা সারা বছর থাকে।
উদ্দীপকের লালচাঁন দরিদ্র কৃষক। তার পরিবার দুবেলা পেট পুরে খেতে পায় না। একটি মাত্র ঘর তাদের। ঘরের ছাউনি নষ্ট হওয়ার উপক্রম। বৃষ্টি বাদলায় রাতে ঘরের কোণে বসে তাদের রাত কাটাতে হয়। এখানে ‘আসমানি’ কবিতার আসমানিদের ঘরের সাথে লালচাঁন মিয়ার ঘরটি সাদৃশ্যপূর্ণ। কারণ উভয়ের ঘরই জরাজীর্ণ। সামান্য বৃষ্টিপাতে ঘরের ভেতর পানি জমে যায়। তারা উভয়ে অনিরাপদ ঘরে বাস করে। দুর্বল ভঙ্গুর এই ঘরটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
ঘ বন্যা ও খরার ফসলহানি ও অর্থাভাবে লালচাঁন মিয়ার মতো মানুষগুলোর অভাব যেন পিছু ছাড়ে না।
খ্যাতিমান কবি জসীমউদ্দীনের ‘আসমানি’ কবিতার আসমানিরা অত্যন্ত গরিব। তাদের বসবাসের ঘরটি পাখির বাসার মতো হালকা। একটু বৃষ্টিতে তাদের ঘরে পানি পড়ে। সামান্য বাতাসে ঘর নড়বড় করে। বুকের কখানা হাড় দেখলে বোঝা যায় কদিন সে না খেয়ে আছে। কষ্ট আর বেদনায় মুখে হাসি নেই। অর্থাভাবেই তাদের এ দুরবস্থা।
উদ্দীপকের লালচাঁন মিয়া দরিদ্র কৃষক। বিঘে তিনেক জমি বর্গা চাষ করে। পর পর দুবছর বন্যা ও খরার সে জমিতে ফসল ফলেনি। দুবেলা পেট ভরে খেতে পারে না। ক্ষুধার তাড়নায় সন্তানদের চোখ কোটরের কোটরের ভেতরে ঢুকে গেছে। বুকের হাড়গুলো গোনা যায়। জরাজীর্ণ শোবার ঘরে পানি পড়ে। বৃষ্টি বাদলায় ঘরের কোণে বসে রাত কাটাতে হয়।
উদ্দীপক ও ‘আসমানি’ কবিতা পর্যালোচনা করে আমরা বলতে পারি- আসমানিরা জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। দারিদ্র্য তাদের এতটাই গ্রাস করেছে যে কোনোমতে কেবল মৃত্যুটাকেই ঠেকিয়ে রেখেছে তারা। জীবন থেকে তাদের হাসি-আনন্দ বিদায় নিয়েছে। দুঃখকষ্ট বেদনাই তাদের জীবনসঙ্গী। অন্যদিকে কৃষক লালচাঁনের পরপর দু বছর ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সে অসহায় হয়ে পড়েছে। সংসারের ঘানি টানা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অন্নবস্ত্রহীন সন্তানদের করুণ চাহনি তাকে আরো বেদনাহত করে। ক্ষুধা-দারিদ্র্যের কষাঘাতে তার পরিবার জর্জরিত। আর সে কারণেই বলা হয়েছে লালচাঁন মিয়ার মতো মানুষগুলোর অভাব যেন পিছু ছাড়ে না।
‘আসমানি’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ২:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
মামুন বেড়িবাঁধের বস্তিতে ছোট একটি ঝুলন্ত টিনের ঘরে থাকে। ঘরের নিচে বদ্ধ পানিতে বেড়ে ওঠা কচুরিপানায় অসংখ্য মশা, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো অসুখ সর্বদা লেগেই থাকে। নেই নিরাপদ পায়খানা। ঝুলন্ত পায়খানা থেকে ধেয়ে আসা দুর্গন্ধে মাঝে মাঝে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মামুন স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে সে তার বাবা মাকে নিয়ে একটি সুন্দর পরিবেশে থাকবে।
ক. আসমানিদের বাড়ির ধারের পুকুরে কী বাস করে?
খ. ‘সাক্ষী দেছে অনাহারে কদিন গেছে তার-’ এই চরণটি দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে?
গ. উদ্দীপকের মামুনের জীবনাচরণের সাথে আসমানির জীবনের সাদৃশ্য দেখাও।
ঘ. মামুনের স্বপ্নের প্রতিফলন ‘আসমানি’ কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে কি? তোমার মতামত দাও।
ক আসমানিদের বাড়ির ধারের পুকুরে ম্যালেরিয়ার মশক বাস করে।
খ ‘সাক্ষী দেছে অনাহারে কদিন গেছে তার।’ চরণটি দ্বারা আসমানির ক্ষুধার সীমাহীন কষ্টকে বোঝানো হয়েছে।’
পেট পুরে খেতে না পেরে আসমানির দেহ কঙ্কালসার হয়ে পড়েছে। তাই তার বুকের হাড় সাক্ষী দিচ্ছে সে কদিন ধরে না খেয়ে আছে।
গ উদ্দীপকের মানুষের জীবনাচরণের সাথে আসমানির জীবনের সাদৃশ্য রয়েছে।
‘আসমানি’ কবিতার আসমানি একটি হতদরিদ্র শ্রেণির প্রতিনিধি। তাদের জীবনমান বলতে কিছুই নেই। একদিকে বস্ত্রহীন ও ক্ষুধার জ্বালা অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বসবাস করে সে। বাড়ির পাশের পদ্ম-পুকুরে, ব্যাঙের ছানা, শ্যাওলা-পানা কিলবিল করে। প্রতিনিয়ত ম্যালেরিয়ার মশক তাতে বিষ গুলিয়ে দিচ্ছে। এমন নোংরা ও বিষাক্ত পানি দিয়েই তাদের রান্না খাওয়া চলে। আর এভাবেই রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে সে।
উদ্দীপকের মামুনও বাস করে বস্তিতে, ঝুলন্ত টিনের ঘরে। ঘরের নিচে বদ্ধ পানিতে বেড়ে ওঠা কচুরিপানায় অসংখ্য মশা, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো অসুখ সর্বদা লেগেই থাকে। নেই নিরাপদ পায়খানা। দুর্গন্ধময়, পরিবেশে শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। এমনি মানবেতর পরিবেশ তাদের দিন কাটে। ‘আসমানি’ কবিতায়ও আমরা দেখি আসমানি কতটা পুঁতি-দুর্গন্দময় পরিবেশে জীবনধারণ করে। সুন্দর-সুস্থ-মুক্ত-সাবলীল জীবন যাপন তাদের ধারণারও বাইরে। তাই দেখা যায় উদ্দীপকের মামুনের জীবনাচরণের সাথে আসমানির জীবনের ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে।
ঘ একটি সুন্দর পরিবেশে বসবাসের যে স্বপ্ন উদ্দীপকের মামুন দেখে তার প্রতিফলন আসমানি কবিতায় ঘটেনি।
আসমানি কবিতায় কবি জসীমউদ্দীন দুঃখ কষ্টময় জীবনের প্রতি মানবিকতাবোধের এক নান্দনিক প্রকাশ ঘটিয়েছন। কবিতাটি সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কবি দারিদ্র্যপীড়িত অসহায় আসমানি চরিত্রের এক রূপকল্প অঙ্কন করেছেন। যেখানে আসমানির দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের চরম অসহায় বর্ণনা রয়েছে। শুধু তাই নয় বাঁশির মতো গানের গলাও কেঁদে কেঁদে ক্ষয় হয়ে গেছে। কবিতাটির আগাগোড়া দুঃখ কষ্টের কথা কিন্তু কোথাও ভবিষ্যৎ সুখ-স্বপ্নের কথা বলা হয়নি।
উদ্দীপকের মামুন বস্তির নোংরা পরিবেশে মানবেতর জীবনযাপন করলেও সে ভবিষ্যৎ সুখ-স্বপ্নের নেশায় বিভোর। সে স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে তার বাবা মাকে নিয়ে একটি সুন্দর পরিবেশে থাকবে। সুন্দর পরিবেশে বসবাস করা একটি সুস্থ পরিবেশ মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা। মামুন তার জীবনে সেই চাহিদাটুকু পূরণ করতে আগ্রহী।
‘আসমানি’ কবিতায় আসমানির কোনো ভবিষ্যৎ সুখের সম্ভাবনা বা স্বপ্নের কথা বলা হয়নি। কবিতায় শুধু আসমানির দুঃখের আখ্যান বর্ণনা করা হয়েছে। উদ্দীপকের মামুনের স্বপ্ন তার পিতামাতাকে নিয়ে সুন্দর ও ভালো পরিবেশে থাকবে। তাই উল্লিখিত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় মামুনের স্বপ্নের প্রতিফলন ‘আসমানি’ কবিতায় প্রতিফলিত হয়নি।
‘আসমানি’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৩:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
হে সূর্য, তুমি তো জানো,
আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব!
সাধারণত খড়কুটো জ্বালিয়ে,
এক-টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে
কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই!
ক. আসমানি কে?
খ. আসমানিদের বাড়িকে পাখির বাসা বলা হয়েছে কেন?
গ. উদ্দীপকের কবিতাংশের সাথে ‘আসমানি’ কবিতার সাদৃশ্য আছে কী- ব্যাখ্যা কর।
ঘ. ‘আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব।’ উদ্দীপকের এই পঙ্ক্তিতে যে অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়েছে ‘আসমানি’ কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ কর।
ক রসুলপুর গ্রামের রহিমুদ্দির মেয়ে আসমানি।
খ পাখির বাসার মতো নড়বড়ে বলে আসমানিদের বাড়িকে পাখির বাসার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
যে বাড়ি বা ঘরের চাল ভেন্নাপাতা দিয়ে ছাওয়া, সামান্য বাতাসেই নড়বড় করে, একটু বৃষ্টি হলেই পানি গড়িয়ে পড়ে। এমন জীর্ণশীর্ণ ঘরকে কবি জসীমউদ্দীন পাখির বাসার সাথে তুলনা করেছেন।
গ বিষয়বস্তুর দিক থেকে আসমানি কবিতার সাথে উদ্দীপকের কবিতাংশের সাদৃশ্য রয়েছে।
পল্লিকবি জসীমউদ্দীন ‘আসমানি’ কবিতার দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের এক করুণ চিত্র বর্ণনা করেছেন। জীর্ণশীর্ণ, নড়বড়ে ঘরে আসমানিদের বসবাস। বুকের ক’খান হাড় দেখলে বোঝা যায় কদিন ধরে অনাহারে আছে। অভাব তার সুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে। পরনের ছেঁড়া কাপড় যেন তাকে উপহাস করে। বাড়ির ধারের পদ্মপুকুর যেখানে ম্যালেরিয়ার মশক অনবরত বিষ বা জীবাণু ছড়ায়, সেই জলেই তাদের রান্নাবান্না চলে। জ্বর অসুখ লেগেই আছে নিত্যদিন কিন্তু বৈদ্য ডেকে ওষুধ করার পয়সা তার নেই। এমনই অসহায় অবস্থায় দিন কাটে আসমানিদের।
উদ্দীপকে শীতার্ত মানুষ একটু উত্তাপের জন্য সূর্যের কাছে প্রার্থনা জানায়। অসহায় মানুষ সূর্যের কাছে মিনতি জানায়, তাদের গরম কাপড়ের কত অভাব। তারা সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে একটুকরো কাপড়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করে। গরম কাপড়ের অভাবে তারা শীতে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে থাকে। তাদের এই কষ্টের কথা সূর্যকে বলা ছাড়া যেন কোনো উপায় নেই। উদ্দীপকের এই অসহায় মানুষের গভীর আর্তির সাথে ‘আসমানি’ কবিতার যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। দারিদ্র্যদশা থেকে এদের যেন মুক্তি নেই।
ঘ ‘আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব’ উদ্দীপকের এই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে অসহায় মানুষের এক করুণ অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে।
‘আসমানি’ কবিতাটি পল্লিকবির এক অনবদ্য সৃষ্টি। কবি এক অপরিসীম দক্ষতায় দুর্দশাগ্রস্ত, অনাহারক্লিষ্ট মানুষের দিনলিপি তুলে ধরেছেন। শতেক তালি ছেঁড়া পরনের কাপড়। অভাব তার জীবনের হাসিটুকু নির্বাপিত করে দিয়ে গেছে। নিদারুণ কষ্টে চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। রোগ-শোক ব্যাধির সাথে তার বসবাস। ডাক্তার কিংবা বৈদ্য ডেকে ওষুধ খাওয়ার পয়সা নেই। এমন দুঃখ ভরা জীবন দিনের পর দিন বেদনায় নীল হয়ে উঠছে আসমানিদের।
উদ্দীপকে তেমনি অসহায় মানুষের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যারা তীব্র শীতে গরম কাপড়ে জড়িয়ে শীত নিবারণ করতেও পারে না। খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করে। বস্ত্রহীন মানুষের এমন করে শীত আটকাবার চেষ্টা যে কত কষ্টের, কত বেদনার তা উদ্দীপকের কয়েকটি লাইনে প্রকাশিত হয়েছে।
অন্নবস্ত্র, বাসস্থান চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও বহু মানুষ আছে যারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে যুদ্ধ করে। ‘আসমানি’ কবিতার যেমন অসহায় জীবনের করুণ অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। উদ্দীপকেও তেমনি বস্ত্রহীন শীতার্ত মানুষের গভীর আর্তি ফুটে উঠেছে। আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব! এ আর্তিটি একেবারে ভেতরগত। চরম অসহায়ত্বের এই উক্তি আমাদের বোধ ও চেতনা জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট।
‘আসমানি’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৪:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
নাই কি রে সুখ? নাই কি রে সুখ?
এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?
যাতনে জ্বলিয়া, কাঁদিয়া মরিতে
কেবলি কি নর জনম লয়?
ক. আসমানির গায়ের বরণ কী?
খ. ‘আসমানির পরনে, শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস’-এ চরণটি- ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের সাথে ‘আসমানি’ কবিতার কোন দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে- ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?’ উক্তিটির এই পঙ্ক্তিতে যে অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়েছে ‘আসমানি’ কবিতার আলোকে তা বিশ্লেষণ করো।
ক আসমানির গায়ের বরণ সোনালি।
খ আসমানির পরনে, শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস এ চরণটি দ্বারা নতুন কোনো কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই- তাই আসমানির পরনে শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস। আসমানিকর আর্থিক দৈন্যতা এতটাই যে সে পেটপুরে খেতে পায় না। সেখানে পরনের বস্ত্র কেনার অবকাশ তাদের নেই।
গ দুঃখ ভারাক্রান্ত মানুষের করুণ অভিব্যক্তি প্রকাশের দিক দিয়ে উদ্দীপক ও ‘আসমানি’ কবিতার ভাববস্তুর সাদৃশ্য বিদ্যমান।
কবি জসীমউদ্দীন গভীর মমতার সৃষ্টি করেছেন আসমানি চরিত্র। মানুষের জীবন যে এতটা নিরস, প্রাণহীন ও বেদনাবিধুর হতে পারে তিনি তা আসমানি চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। আসমানি বসবাস করে ভেন্নাপাতার ছাউনি দিয়ে গড়া জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে। ঠিকমতো দুমুঠো আহার জোটে না। সে ধীরে ধীরে রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। চোখের জলে তার বুক ভাসে। চরম অভাবে এক দুর্বিষহ জীবন সে বয়ে বেড়াচ্ছে।
মানবজীবনের এক কঠিন সত্যকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উদ্দীপকের কবি। কবির প্রশ্ন কোথাও কী সুখ নেই? এই পৃথিবীটা কী শুধুই বিষাদময়? জীবনের এতো জ্বালাযন্ত্রণা সহ্য করে কেঁদে মরার জন্য কী মানুষের জন্ম হয়? জীবনে যদি সুখ-আনন্দ নাই থাকল তবে এ জীবনের অর্থ কী? প্রশ্নগুলো খুবই সঙ্গত। উদ্দীপকের এই কবিতাংশের মধ্য দিয়ে ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস প্রকাশিত হয়েছে। ‘আসমানি’ কবিতায় আসমানি চরিত্রের মধ্য দিয়ে সেই সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে। জীবনে আসমানিরা শুধু কষ্টই ভোগ করে। আসমানিদের দুঃখকষ্ট যেন শেষই হয় না। দুঃখকষ্ট তাদের জীবনসঙ্গী। তাই বলা যায় উদ্দীপকের সাথে ‘আসমানি’ কবিতার ভাববস্তুর সাদৃশ্য রয়েছে।
ঘ এ ধরা কি শুধু বিষাদময়? উক্তিটি দ্বারা মানুষের জীবনের গভীর আকুতির প্রকাশ ঘটেছে।
আলোচ্য ‘আসমানি’ কবিতায় আসমানির দুঃখভরা জীবনের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করা হয়েছে। আসমানি গরিব। ভাঙাঘরে থাকে, পেটপুরে খেতে পায় না। চরম দুঃখ কষ্টে তার জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। আর্থিক দৈন্য সহ্য করতে না পেরে কেঁদে কেঁদে সে বুক ভাষায়। জীবনের দুঃখভার বইবার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে। গ্লানিময় এ জীবনের ভার সে সহ্য করতে পারছে না।
উদ্দীপকে ব্যথা-বেদনাময় জীবনের কথা বলা হয়েছে। বহু মানুষ আছে বিভিন্ন কারণে তাদের জীবনে দুঃখ কষ্টটাই প্রধান হয়ে উঠেছে। সুন্দর পৃথিবীতে মানুষ হেসে খেলে জীবনযাপন করতে চায়। কিন্তু নানা সমস্যা বিপদাপদ ও দুর্বিপাকে পড়ে মানুষের জীবন দুঃখময় হয়ে ওঠে তাই কবি বলতে চেয়েছেন। পৃথিবীতে কি কোনো সুখ নেই, এটি কি কেবলই বিষাদময়?
‘আসমানি’ কবিতা ও উদ্দীপক বিবেচনা করলে আমরা পাই, এসব পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত মানুষের একান্ত মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। দুঃখ ছাড়া সুখ লাভ হয় না। কিন্তু কারো কারো জীবন কেবলি দুঃখময়। সুখ তাদের কাছে ধরা দেয় না। তাদের চোখে কেবলি অশ্রু ঝরে। তাদের চোখ মোছাবার কেউ নেই। এ ধরা কি শুধু বিষাদময়? এ পঙ্ক্তির দ্বারা না বলা অনেক কথাই করুণ রাগিণীতে বেজে উঠেছে।
‘আসমানি’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৪:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
ধনধান্যে পরিপূর্ণ একটি সচ্ছল পরিবার
ক. আসমানির ভ্রমর-কালো চোখ দুটিতে কী নেই?
খ. আসমানির চোখ দিয়ে কেন রাশি রাশি অশ্রু গড়িয়ে পড়ে?
গ. উদ্দীপকের সাথে আসমানির ছোট বাড়ির বৈসাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘আসমানির জীবন কুয়াশাচ্ছন্ন হলেও উদ্দীপকের নারীর জীবন স্বপ্নময়’- উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।
ক আসমানির ভ্রমর-কালো চোখের দৃষ্টিতে কৌতুক-হাসি নেই।
খ মনের দুঃখ ও গভীর বেদনায় আসমানির চোখ দিয়ে রাশি রাশি অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
দারিদ্র্যের কষাঘাতে আসমানি জর্জরিত। অনাহারে অর্ধাহারে তার প্রাণ ওষ্ঠগিত। তাই দুঃখ সইতে না পেরে তার চোখ দিয়ে রাশি রাশি অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
গ অবস্থানগত দিক থেকে উদ্দীপকের সাথে আসমানির ছোট বাড়ির বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
‘আসমানি’ কবিতায় আসমানির ছোট্ট বাড়ির উল্লেখ রয়েছে। যে বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে ভেন্না পাতার ছাউনি দিয়ে। বৃষ্টি হলেই তার ভেতরে পানি পড়ে। একটুখানি বাতাস এলেই ঘর নড়বড় করে। আসমানিরা এমনই একটি জরাজীর্ণ ঘরে বাস করে।
উদ্দীপকের বাড়িটির ঘরগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ঘরের বেড়া ও চালা টিনের তৈরি। সুন্দর সাজানো গোছানো। শক্ত মজবুত। কোথাও এতটুকু জরাজীর্ণতার চিহ্নমাত্র নেই। কারণ এটি একটি সচ্ছল পরিবারের ঘর। অন্যদিকে আসমানির ঘর কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। নামমাত্র ঘর বলে এটি ঘরের চাহিদা পূরণ করে না। ঘর সাধারণত রোদ বৃষ্টি ঝড় থেকে মানুষকে রক্ষা করে কিন্তু আসমানিদের ঘর তা করতে পারে না। তাই উদ্দীপকের সাথে আসমানির ছোট বাড়ির ব্যাপক বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান।
ঘ আসমানির জীবন কুয়াশাচ্ছন্ন হলেও উদ্দীপকের নারীর জীবন স্বপ্নময়- উক্তিটি যথার্থ।
‘আসমানি’ কবিতায় আসমানি এক অসহায় গ্রাম্য কিশোরীর প্রতিচ্ছবি। সোনালি গায়ের বর্ণের এই কিশোরীর বাঁশির মতো গলার সুর ছিল। অন্য দশটি মেয়ের মতো তারও হাসি খুশি জীবনযাপন করার স্বপ্ন ছিল কিন্তু দারিদ্র্য তার জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিয়েছে। দুঃখকষ্টে ভারাক্রান্ত আসমানির চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে রাশি রাশি অশ্রু। তার মলিন মুখে আর কোনোদিন হাসির রেখা ফুটে উঠবে কি না তা কেউ বলতে পারে না।
উদ্দীপকের চিত্রটি একটি সচ্ছল পরিবারের। সেখানে একজন নারী তার কর্মব্যস্ততা দিয়ে একটি সংসারকে সাজিয়ে তুলেছে। যেখানে ক্ষুধা দারিদ্র্য কখনো প্রকট হয়ে ওঠেনি। মনের আনন্দে ও পরম যতেœ গৃহিণী তার শস্য ঘরে তুলছেন। গৃহপালিত পশুপাখিরা খড় বিচালি কিংবা শস্যকণা খেয়ে চলছে। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট নদীর স্বচ্ছ জল। সীমাহীন মায়া-মমতা দিয়ে নারীটি সংসারটিকে আগলে রেখেছে। তার খাওয়া পড়ার কোনো অভাব নেই।
‘আসমানি’ কবিতার আসমানির দারিদ্র্যপীড়িত জীবন আমাদের বেদনাহত করে। আর জীবনটা যেন শুধু দুঃখেই গড়া। দমকা হাওয়া যেমন একটি বাতিকে নিভিয়ে দেয়- অভাব তার হাসির প্রদীপ তেমনি নিভিয়ে দিয়ে গেছে। দুঃখকষ্টের ভার যেন আর বইতে পারছে না। তার সামনে কোনো আলো নেই। তার জীবন হয়ে উঠেছে কুয়াশাচ্ছন্ন ও চরমভাবে অনিশ্চিত। অন্যদিকে উদ্দীপকে নারী একজন প্রাণোচ্ছল গৃহিণী। তার সাজানো সংসারে সে মধ্যমণি। তার জীবন শুধুই স্বপ্নময়।
‘আসমানি’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৫:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
কাঙালী পুকুর হইতে আঁচাইয়া আসিয়া দেখিল তাহার পাতের ভুক্তাবশেষ মা একটি মাটির পাত্রে ঢাকিয়া রাখিয়াছে, আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, তুই খেলি নে মা?
বেলা গড়িয়ে গেছে বাবা, এখন আর ক্ষিদে নেই। ছেলে বিশ্বাস করিল না, বলিল, না ক্ষিদে নেই বৈকি! কৈ, দেখি তোর হাঁড়ি?
ক. ‘বাস’ শব্দটির অর্থ কী?
খ. ‘সাক্ষী দেছে অনাহারে কদিন গেছে তার।’-এ চরণটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
গ. উদ্দীপকটিতে ‘আসমানি’ কবিতার কোন দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে- ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উদ্দীপকটি ‘আসমানি’ কবিতার মূল বিষয়টিকে ধারণ করে কি? তোমার মতামত দাও।
ক ‘বাস’ শব্দটির অর্থ- পোশাক।
খ মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি
থাপড়েতে নিবিয়ে গেছে দারুণ অভাবে আসি।
চরণ দুটি দ্বারা দারিদ্র্যের কষাঘাতে আসমানির মিষ্টি মুখের হাসিটি নিভে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অভাব আর দুঃখ কষ্টে জর্জরিত আসমানির মুখে আর হাসি নেই। প্রদীপের মতোই তা নিভে গেছে। চেহারায় মলিনতা তার হৃদয়ে গভীর বেদনা নিয়েই সে বেঁচে আছে।
গ ‘আসমানি’ কবিতার দারিদ্র্যের স্বরূপ ব্যাখ্যা করো।
ঘ ‘আসমানি’ কবিতার মূল বক্তব্য লেখো।
‘আসমানি’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৬:
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
প্রচণ্ড শীতের রাত্রে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখলাম কিছু অসহায় ছিন্নমূল শিশু প্লাটফর্মের উপরে জড়সড় হয়ে শুয়ে আছে। ছিন্নবস্ত্র গায়ে দিয়ে তারা শীত নিবারণের বৃথা চেষ্টা করছে।
ক. কবি জসীমউদ্দীন দীর্ঘদিন সরকারের কোন বিভাগে চাকরি করেন?
খ. ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক হাসি- এ চরণটি দ্বারা কী বোঝাতে চেয়েছেন? ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকটিতে বর্ণিত দৃশ্যটি ‘আসমানি’ কবিতার যে দিকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উদ্দীপকের সামগ্রিক বক্তব্য কি ‘আসমানি’ কবিতার অনুরূপ? যুক্তিসহ আলোচনা করো।
ক কবি জসীমউদ্দীন দীর্ঘদিন সরকারের প্রচার বিভাগে চাকরি করেন।
খ উক্ত চরণটি দ্বারা কবি বোঝাতে আসমানিদের দারিদ্র্যের অবস্থা।
আসমানি কবিতার আসমানিরা ঠিকমতো খেতে না পারায় অসুখে ভোগে তাদের কণ্ঠে গান নেই। মুখে হাসি নেই, জীবনে আনন্দ নেই। চরণটি দ্বারা কবি আসমানিদের অনাহারের বিষয়টিকে বোঝাতে চেয়েছেন।
গ উদ্দীপকটিতে ‘আসমানি কবিতার মানবেতর জীবনযাপনের স্বরূপ ব্যাখ্যা করো।
ঘ ‘আসমানি’ কবিতার সারসংক্ষেপ বিশ্লেষণ করো।
তথ্যসূত্র:
১. চারুপাঠ: ষষ্ঠ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক
বোর্ড, ঢাকা, ২০২৫।
২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।