আসমানি- জসীমউদদীন

আসমানি
আসমানী

আসমানি
জসীমউদদীন

আসমানিরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানিরা থাকে বছর ভরে।

পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক’খান হাড়,
সাক্ষী দেছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি,
থাপড়েতে নিবিয়ে গেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গার বরনের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয়নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।

আসমানিদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে,
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল-বিল-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না খাওয়া আসমানিদের চলে।
পেটটি তাহার ফুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।

‘আসমানি’ কবিতার উৎস নির্দেশ:
--

‘আসমানি’ কবিতার শব্দার্থ ও টীকা:
➠ ভেন্না পাতা- ভেন্না এক ধরনের গাছ। গরিব মানুষ এ গাছের পাতা ঘরের ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করে।
➠ সাক্ষী- কোনো ঘটনা যে সামনে থেকে দেখে এবং দরকারি জায়গায় প্রকাশ করে। প্রত্যক্ষদর্শী।
➠ দেছে- ‘দিয়েছে’ শব্দের আঞ্চলিক রূপ।
➠ অনাহারে- আহার বা খাবার-ছাড়া। না খেয়ে বা অভুক্ত থাকা।
হাসির প্রদীপ-রাশি- প্রদীপ যেমন আলো ছড়ায়, তেমনি হাসি মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল করে। আনন্দময় অনুভূতি প্রকাশ করে।
➠ বাস- পোশাক। জামা।
➠ গার- গায়ের। শরীরের।
➠ বরনের- রঙের।
➠ উপহাস- ঠাট্টা।
➠ মশক- মশা।
➠ পিলে- প্লীহা। Spleen। পাকস্থলীর বাম পাশের একটি অংগ। এ অংগের অসুখ হলে পেট ফুলে ওঠে।
➠ নিতুই- নিত্য বা প্রতিদিন। রোজ। এটি একটি কাব্যিক পদ।
➠ বৈদ্য- কবিরাজ। গ্রাম্য চিকিৎসক।

‘আসমানি’ কবিতার পাঠের উদ্দেশ্য :
মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও সামাজিক দায়বোধ জাগ্রত করা।

‘আসমানি’ কবিতার পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব:
‘আসমানি’ কবিতায় সাধারণ মানুষের প্রতি, বিশেষত গ্রামের শিশুদের দুঃখ-কষ্টময় জীবনের প্রতি মমতাময় অনুভূতির নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছে।
আসমানি গরিব, তাদের বাসা পাখির বাসার মতো হালকা। একটু বৃষ্টিতেও তাদের বাসা নড়বড় করে। ঠিক মতো খেতে পায় না বলে অসুখে ভোগে। পোশাক তার ছেঁড়া। মুখে তার হাসি নেই, কন্ঠে নেই গান। তাদের বাড়ির আশপাশ অস্বাস্থ্যকর। আসমানির জীবনে আনন্দ নেই।
অনেক দরদ দিয়ে কবি আসমানির জীবনের যে চিত্র এঁকেছেন, তা আমাদের সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বোধ জাগিয়ে তোলে।

‘আসমানি’ কবিতার কবি পরিচিতি :
জসীমউদ্‌দীন ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর কবিতা রচনা শুরু। তিনি যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখনই তাঁর কবর কবিতা প্রবেশিকা শ্রেণির বাংলা সংকলনে স্থান পায়। তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলার জীবন ও প্রকৃতির ছবি ফুটে উঠেছে সহজ-সরল ভাষা ও সাবলীল ছন্দে।
জসীমউদ্‌দীনের প্রধান কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নক্সী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, রাখালী, বালুচর, ধানখেত, সুচয়নী ইত্যাদি। এ ছাড়া তিনি ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, নাটক, সঙ্গীত ও প্রবন্ধের বই রচনা করেছেন। শিশুদের জন্য লেখা ডালিম কুমার তাঁর অনবদ্য রচনা। জসীমউদ্‌দীনের কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে, পরে তিনি দীর্ঘ দিন কাজ করেন সরকারের প্রচার বিভাগে।
১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

‘আসমানি’ কবিতার কর্ম-অনুশীলন:
১। ছুটিতে গ্রামে গিয়ে কবিতায় বর্ণিত জীবনের সঙ্গে মেলে এমন পরিবারের ঘরদোর, পোশাক, খাবার ইত্যাদির একটি তালিকা প্রস্তুত করো।
২। উক্ত তালিকার ভিত্তিতে গরিব মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বর্ণনা দাও।

‘আসমানি’ কবিতার বহুনির্বাচনি প্রশ্ন:

প্রশ্ন থেকে

অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন -এর মধ্যে!
যা


জ্ঞানমূলক প্রশ্ন :

অনুধাবনমূলক প্রশ্ন :

সৃজনশীল প্রশ্ন- :


সৃজনশীল প্রশ্ন- :


তথ্যসূত্র :
১. সাহিত্য পাঠ: একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৫।
২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url