ফুলের বিবাহ - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ফুলের বিবাহ
ফুলের বিবাহ

ফুলের বিবাহ
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বৈশাখ মাস বিবাহের মাস। আমি ১লা বৈশাখে নসী বাবুর ফুলবাগানে বসিয়া একটি বিবাহ দেখিলাম। ভবিষ্যৎ বরকন্যাদিগের শিক্ষার্থ লিখিয়া রাখিতেছি।

মল্লিকা ফুলের বিবাহ। বৈকাল-শৈশব অবসানপ্রায়, কলিকা-কন্যা বিবাহযোগ্যা হইয়া আসিল। কন্যার পিতা বড়োলোক নহে, ক্ষুদ্র বৃক্ষ, তাহাতে আবার অনেকগুলি কন্যাভারগ্রস্ত। সম্বন্ধের অনেক কথা হইতেছিল, কিন্তু কোনটা স্থির হয় নাই। উদ্যানের রাজা স্থলপদ্ম নির্দোষ পাত্র বটে, কিন্তু ঘর বড়ো উঁচু, স্থলপদ্ম অত দূর নামিল না। জবা এ বিবাহে অসম্মত ছিল না, কিন্তু জবা বড়ো রাগী, কন্যাকর্তা পিছাইলেন। গন্ধরাজ পাত্র ভালো, কিন্তু বড়ো দেমাগ, প্রায় তাঁহার বর পাওয়া যায় না। এইরূপ অব্যবস্থার সময়ে ভ্রমররাজ ঘটক হইয়া মল্লিকা-বৃক্ষসদনে উপস্থিত হইলেন। তিনি আসিয়া বলিলেন, ‘গুণ! গুণ! গুপ্ মেয়ে আছে?’

মল্লিকাবৃক্ষ পাতা নাড়িয়া সায় দিলেন, ‘আছে!’ ভ্রমর পত্রাসন গ্রহণ করিয়া বলিলেন, ‘গুণ গুণ গুণ! গুণ গুণাগুণ! মেয়ে দেখিব।’

বৃক্ষ, শাখা নত করিয়া মুদিতনয়না অবগুণ্ঠনবতী কন্যা দেখাইলেন।

ভ্রমর একবার বৃক্ষকে প্রদক্ষিণ করিয়া আসিয়া বলিলেন, ‘গুণ! গুণ! গুণ! গুণ দেখিতে চাই। ঘোমটা খোল।’

লজ্জাশীলা কন্যা কিছুতেই ঘোমটা খুলে না। বৃক্ষ বলিলেন, ‘আমার মেয়েগুলি বড়ো লাজুক। তুমি একটু অপেক্ষা কর, আমি মুখ দেখাইতেছি।’

ভ্রমর ভোঁ করিয়া স্থলপদ্মের বৈঠকখানায় গিয়া রাজপুত্রের সঙ্গে ইয়ারকি করিতে বসিলেন। এদিকে মল্লিকার সন্ধ্যাঠাকুরাণী-দিদি আসিয়া তাহাকে কত বুঝাইতে লাগিল- বলিল, ‘দিদি, একবার ঘোমটা খোল- নইলে, বর আসিবে না- লক্ষ্মী আমার, চাঁদ আমার, সোনা আমার, ইত্যাদি।’ কলিকা কতবার ঘাড় নাড়িল, কতবার রাগ করিয়া মুখ ঘুরাইল, কতবার বলিল, ‘ঠান্‌ন্দিদি, তুই যা।’ কিন্তু শেষে সন্ধ্যার স্নিগ্ধ স্বভাবে মুগ্ধ হইয়া মুখ খুলিল। তখন ঘটক মহাশয় ভোঁ করিয়া রাজবাড়ি হইতে নামিয়া আসিয়া ঘটকালিতে মন দিলেন। কন্যার পরিমলে মুগ্ধ হইয়া বলিলেন, ‘গুণ গুণ গুণ গুণ গুণাগুণ! কন্যা গুণবতী বটে। ঘরে মধু কত?’

কন্যাকর্তা বৃক্ষ বলিলেন, ‘ফর্দ দিবেন, কড়ায় গণ্ডায় বুঝাইয়া দিবে।’ ভ্রমর বলিলেন, ‘গুণ গুণ, আপনার অনেক গুণ ঘটকালিটা?’

কন্যাকর্তা শাখা নাড়িয়া সায় দিল, ‘তাও হবে।’

ভ্রমর- ‘বলি ঘটকালির কিছু আগাম দিলে হয় না? নগদ দান বড়ো গুণ-গুণ গুণ গুণ।’

ক্ষুদ্র বৃক্ষটি তখন বিরক্ত হইয়া, সকল শাখা নাড়িয়া বলিল, 'আগে বরের কথা বল- বর কে?'

ভ্রমর- ‘বর অতি সুপাত্র। তাঁর অনেক গুণ-৭-৭।’

এ সকল কথোপকথন মনুষ্যে শুনিতে পায় না, আমি কেবল দিব্য কর্ণ পাইয়াই এ সকল শুনিতেছিলাম। আমি শুনিতে লাগিলাম, কুলাচার্য মহাশয়, পাখা ঝাড়িয়া, ছয় পা ছড়াইয়া গোলাবের মহিমা কীর্তন করিতেছিলেন। বলিতেছিলেন যে, গোলাপ বংশ বড়ো কুলীন; কেন না, ইহারা 'ফুলে' মেল। যদি বল, সকল ফুলই ফুলে, তথাপি গোলাপের গৌরব অধিক; কেন না, ইহারা সাক্ষাৎ বাঞ্ছামালির সন্তান; তাহার স্বহস্তরোপিত। যদি বল, এ ফুলে কাঁটা আছে, কোন্ কুলে বা কোন্ ফুলে নাই?

যাহা হউক, ঘটকরাজ কোনরূপে সম্বন্ধ স্থির করিয়া, বোঁ করিয়া উড়িয়া গিয়া, গোলাব বাবুর বাড়িতে খবর দিলেন। গোলাব, তখন বাতাসের সঙ্গে নাচিয়া নাচিয়া, হাসিয়া হাসিয়া, লাফাইয়া লাফাইয়া খেলা করিতেছিল, বিবাহের নাম শুনিয়া আহাদিত হইয়া কন্যার বয়স জিজ্ঞাসা করিল। ভ্রমর বলিল, 'আজি কালি ফুটিবে।'

গোধূলিলগ্ন উপস্থিত, গোলাব বিবাহে যাত্রার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। উচ্চিঙ্গড়া নহবৎ বাজাইতে আরম্ভ করিল: মৌমাছি সানাইয়ের বায়না লইয়াছিল, কিন্তু রাতকানা বলিয়া সঙ্গে যাইতে পারিল না। খদ্যোতেরা ঝাড় ধরিল; আকাশে তারাবাজি হইতে লাগিল। কোকিল আগে আগে ফুকরাইতে লাগিল। অনেক বরযাত্রী চলিল; স্বয়ং রাজকুমার স্থলপদ্ম দিবাবসানে অসুস্থকর বলিয়া আসিতে পারিলেন না, কিন্তু জবাগোষ্ঠী শ্বেত জবা, রক্ত জবা, জরদ জবা প্রভৃতি সবংশে আসিয়াছিল। করবীদের দল, সেকেলে রাজাদিগের মতো বড়ো উচ্চ ডালে চড়িয়া আসিয়া উপস্থিত হইল। সেঁউতি নীতবর হইবে বলিয়া, সাজিয়া আসিয়া দুলিতে লাগিল। গরদের জোড় পরিয়া চাঁপা আসিয়া দাঁড়াইল উগ্র গন্ধ ছুটিতে লাগিল। গন্ধরাজেরা বড়ো বাহার দিয়া, দলে দলে আসিয়া, গন্ধ বিলাইয়া দেশ মাতাইতে লাগিল। অশোক নেশায় লাল হইয়া আসিয়া উপস্থিত; সঙ্গে একপাল পিঁপড়া মোসায়েব হইয়া আসিয়াছে; তাহাদের গুণের সঙ্গে সম্বন্ধ নাই, কিন্তু দাঁতের জ্বালা বড়ো-কোন বিবাহে না এরূপ বরযাত্রী জোটে, আর কোন বিবাহে না তাহারা হুল ফুটাইয়া বিবাদ বাধায়? কুরুবক কুটজ প্রভৃতি আরও অনেক বরযাত্রী আসিয়াছিলেন, ঘটক মহাশয়ের কাছে তাঁহাদের পরিচয় শুনিবেন। সর্বত্রই তিনি যাতায়াত করেন এবং কিছু কিছু মধু পাইয়া থাকেন।

আমারও নিমন্ত্রণ ছিল, আমিও গেলাম। দেখি, বরপক্ষের বড়ো বিপদ। বাতাস বাহকের বায়না লইয়াছিলেন; তখন হুঁ-হুম করিয়া অনেক মর্দানি করিয়াছিলেন, কিন্তু কাজের সময় কোথায় লুকাইলেন, কেহ খুঁজিয়া পায় না। দেখিলাম, বর বরযাত্রী, সকলে অবাক হইয়া স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া আছেন। মল্লিকাদিগের কুল যায় দেখিয়া, আমিই বাহকের কার্য স্বীকার করিলাম। বর, বরযাত্রী সকলকে তুলিয়া লইয়া মল্লিকাপুরে গেলাম।

সেখানে দেখিলাম, কন্যাকুল, সকল ভগিনী, আহাদে ঘোমটা খুলিয়া মুখ ফুটাইয়া, পরিমল ছুটাইয়া, সুখের হাসি হাসিতেছে। দেখিলাম, পাতায় পাতায় জড়াজড়ি, গন্ধের ভাণ্ডারে ছড়াছড়ি পড়িয়া গিয়াছে -রূপের ভারে সকলে ভাঙিয়া পড়িতেছে। যুথি, মালতী, বকুল, রজনীগন্ধা প্রভৃতি এয়োগণ স্ত্রী-আচার করিয়া বরণ করিল। দেখিলাম, পুরোহিত উপস্থিত; নসী বাবুর নবমবর্ষীয়া কন্যা (জীবন্ত কুসুমরূপিণী) কুসুমলতা সূচ সুতা লইয়া দাঁড়াইয়া আছে; কন্যাকর্তা কন্যা সম্প্রদান করিলেন; পুরোহিত মহাশয় দুইজনকে এক সুতায় গাঁথিয়া গাঁটছড়া বাঁধিয়া দিলেন।

তখন বরকে বাসর-ঘরে লইয়া গেল। কত যে রসময়ী মধুময়ী সুন্দরী সেখানে বরকে ঘিরিয়া বসিল, তাহা কি বলিব। প্রাচীনা ঠাকুরাণীদিদি টগর সাদা প্রাণে বাঁধা রসিকতা করিতে করিতে শুকাইয়া উঠিলেন। রঙ্গণের রাঙ্গামুখে হাসি ধরে না। যুঁই, কন্যের সই, কন্যের কাছে গিয়া শুইল: রজনীগন্ধাকে বর তাড়কা রাক্ষসী বলিয়া কতো তামাসা করিল; বকুল একে বালিকা, তাতে যত গুণ, তত রূপ নহে; এককোণে গিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল; আর ঝুষ্কা ফুল বড়ো মানুষের গৃহিণীর মতো মোটা নীল শাড়ি ছড়াইয়া জমকাইয়া বসিল। তখন-

‘কমলকাকা-ওঠ বাড়ি যাই- রাত হয়েছে, ও কি, চুলে পড়বে যে?’ কুসুমলতা এই কথা বলিয়া আমার গা ঠেলিতেছিল; চমক হইলে, দেখিলাম কিছুই নাই। সেই পুষ্পবাসর কোথায় মিশিল? মনে করিলাম, সংসার অনিত্যই বটে- এই আছে এই নাই। সে রম্য বাসর কোথায় গেল, সেই হাস্যমুখী শুভ্রস্মিতসুধাময়ী পুষ্পসুন্দরীসকল কোথায় গেল? যেখানে সব যাইবে, সেইখানে- স্মৃতির দর্পণতলে, ভূতসাগরগর্ভে। যেখানে রাজা প্রজা, পর্বত সমুদ্র, গ্রহ নক্ষত্রাদি গিয়াছে বা যাইবে, সেইখানে ধ্বংসপুরে। এই বিবাহের ন্যায় সব শূন্যে মিশাইবে, সব বাতাসে গলিয়া যাইবে।

কুসুম বলিল, ‘ওঠ না-কি কচ্চো?’

আমি বলিলাম, ‘দূর পাগলি, আমি বিয়ে দিচ্ছিলাম।’

কুসুম ঘেঁষে এসে, হেসে হেসে কাছে দাঁড়াইয়া আদর করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘কার বিয়ে, কাকা?’

আমি বলিলাম, ‘ফুলের বিয়ে।’

‘ওঃ পোড়া কপাল, ফুলের? আমি বলি কি! আমিও যে এই ফুলের বিয়ে দিয়েছি।’

‘কই?'

‘এই যে মালা গেঁথেছি।’ দেখিলাম, সেই মালায় আমার বর কন্যা রহিয়াছে।

উৎস নির্দেশ :

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লঘুরচনা কমলাকান্তের দপ্তর গ্রন্থের নবম সংখ্যক লেখা 'ফুলের বিবাহ'।


শব্দার্থ ও টীকা :

➠ কন্যাভারগ্রস্ত- বিবাহযোগ্যা কন্যা বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব বহনকারী অর্থে।
➠ সম্বন্ধের- বিয়ের।
➠ কন্যাকর্তা- কন্যার অভিভাবক।
➠ পত্রাসন- পাতার ওপর আসন।
➠ অবগুণ্ঠনবর্তী - ঘোমটা দেওয়া নারী।
➠ ইয়ারকি- রসিকতা; ফাজলামি।
➠ সন্ধ্যাঠাকুরাণী দিদি- এখানে সন্ধ্যাকালকে দিদি বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
➠ পরিমল- সুগন্ধ।
➠ গন্ধোপাধ্যায়- গন্ধের রাজা বোঝাতে।
➠ কুলাচার্য- কুলের আচার্য বা বংশের প্রধান পুরোহিত।
➠ বাঞ্ছামালি- যে মালি ইচ্ছামতো ফুল ফোটাতে পারে।
➠ খদ্যোত- জোনাকি পোকা।
➠ এয়োগণ- সধবা নারীরা।
➠ কমলকাকা- কমলাকান্তকে কাকা বলে সম্বোধন করা হয়েছে।


কর্ম-অনুশীলন :

১. পাঠটিতে যেসব ফুলের কথা বলা হয়েছে সেগুলোর নাম ও গন্ধের পরিচয় দিয়ে একটি ছক তৈরি করো।
২. ফুলের বহুবিধ ব্যবহার লিপিবদ্ধ করে শ্রেণি শিক্ষককে দেখাও।


পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব :

‘ফুলের বিবাহ’ রচনায় হাস্যরসের মাধ্যমে বিভিন্ন ফুলের নাম, সে ফুলগুলোর গন্ধের তারতম্য, বর্ণের রকমফের অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। কখন কোন ফুল ফোটে সে পর্যবেক্ষণও এই রচনায় পাওয়া যায়। বিয়ে-অনুষ্ঠান বাড়ির শিশু-কিশোর ও প্রতিবেশীদের মধ্যে অতীব আনন্দ নিয়ে আসে। এই অনুষ্ঠানে বর-কনে কেন্দ্রে থাকলেও বর-কনের মাতা-পিতা, কনের পড়শি নারীরা নানাভাবে সম্পৃক্ত থাকেন, ঘটকও থাকেন বিশেষভাবে যুক্ত। বিয়ে অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন এমন নানা ব্যক্তির পরিবর্তে বিভিন্ন ফুলের উল্লেখ করে অসাধারণ দক্ষতায় বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালির গার্হস্থ্য একটি অনুষ্ঠানকে আরও আনন্দদায়ক করে এখানে উপস্থাপন করেছেন। এখানে লেখক প্রকৃতিকে বাস্তব জীবনে উপস্থাপনে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘ফুলের বিবাহ’ গদ্যটি কৌতূহলী ও পর্যবেক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সহায়ক।


লেখক-পরিচিতি:

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ২৬শে জুন ১৮৩৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং সে বছরই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদে নিযুক্ত হন। তাঁর অসামান্য কৃতিত্ব প্রকাশ পেয়েছে পাশ্চাত্য ভাবাদর্শে বাংলা উপন্যাস রচনার পথিকৃৎ হিসেবে। ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম বাংলা উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী বাংলা কথাসাহিত্যে এক নবদিগন্ত উন্মোচন করে। তাঁর অন্যান্য উপন্যাস হলো: কপালকুণ্ডলা, মৃণালিনী, বিষবৃক্ষ, ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয়, রাধারানী, চন্দ্রশেখর, রজনী, কৃষ্ণকান্তের উইল, রাজসিংহ, আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরানী ও সীতারাম। প্রবন্ধ-সাহিত্যেও বঙ্কিমচন্দ্র কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। কমলাকান্তের দপ্তর, লোকরহস্য, কৃষ্ণচরিত্র ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালের ৮ই এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।।


বহুনির্বাচনি প্রশ্ন :

প্রশ্ন থেকে

অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন -এর মধ্যে!
যা


জ্ঞানমূলক প্রশ্ন :

১. কোন মাস বিবাহের মাস?
উত্তর: বৈশাখ মাস বিবাহের মাস।
২. উদ্যানের রাজা কে?
উত্তর: স্থলপদ্ম।
৩. মল্লিকা ফুলের বাবা কেমন ছিলেন?
উত্তর: তিনি ক্ষুদ্র বৃক্ষ, যার অনেক কন্যার ভার ছিল।
৪. ফুলের বিবাহ গল্পে ঘটক কে ছিল?
উত্তর: ভ্রমররাজ।
৫. মল্লিকা কন্যা প্রথমে মুখ খুলতে রাজি হয়নি কেন?
উত্তর: কারণ সে লজ্জাশীলা ও লাজুক ছিল।
৬. বর প্রথমে কন্যার সম্পর্কে কী জিজ্ঞাসা করেছিল?
উত্তর: কন্যার বয়স।
৭. বরযাত্রীর মধ্যে বাহকের দায়িত্ব কে পেয়েছিল?
উত্তর: বাতাস।
৮. বরযাত্রীদের মধ্যে কারা উপস্থিত ছিল?
উত্তর: জবা, করবী, গন্ধরাজ, চাঁপা, অশোক প্রভৃতি।
৯. পুরোহিত হিসেবে কে কাজ করেছেন?
উত্তর: নসী বাবুর নবমবর্ষীয়া কন্যা।
১০. বর ও কন্যাকে কী দিয়ে গাঁথা হয়েছিল?
উত্তর: কুসুমলতা সূচ-সুতা দিয়ে।
১১. বাসরে বকুলের আচরণ কেমন ছিল?
উত্তর: সে চুপ করে এককোণে বসে ছিল।
১২. বরযাত্রীদের মধ্যে রঙ্গণের আচরণ কেমন ছিল?
উত্তর: রঙ্গণের মুখে যেন হাসি ধরে না।
১৩. ঝুমকা ফুল কীভাবে বসেছিল?
উত্তর: বড়ো গৃহিণীর মতো মোটা নীল শাড়ি ছড়িয়ে।
১৪. কুসুম কী নিয়ে লেখককে জাগাল?
উত্তর: ফুলের মালা গেঁথে দেখানোর জন্য।
১৫. গল্পের শেষে মল্লিকা ফুল কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: কুসুমের গাঁথা মালায়।
১৬. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে কে ঘটকের দায়িত্ব পালন করে?
উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে ভ্রমর ঘটকের দায়িত্ব পালন করে। সে মল্লিকা ফুলের জন্য বর খুঁজে আনে এবং গোলাব ফুলের সঙ্গে মল্লিকার বিবাহের ব্যবস্থা করে।
১৭. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে লেখক কোন মাসে একটি বিয়ে দেখেছিলেন?
উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে লেখক বৈশাখ মাসে একটি বিয়ে দেখেছিলেন।
১৮. গোলাপের গৌরব অধিক কেন?
উত্তর: গোলাপের গৌরব অধিক কারণ, গোলাপ বাঞ্ছামালির সন্তান, স্বহস্তরোপিত।
১৯. ক্ষুদ্র বৃক্ষ ফুল ও ভ্রমরের কথোপকথন লেখক কীভাবে শুনেছিলেন?
উত্তর: ক্ষুদ্র বৃক্ষ ফুল ও ভ্রমরের কথোপকথন লেখক দিব্যকর্ণ পেয়ে শুনেছিলেন।
২০. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
২১. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পেশাগত জীবনে কী ছিলেন?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পেশাগত জীবনে ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন।
২২. ‘যত গুণ, তত রূপ নহে’ কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?
উত্তর: ‘যত গুণ, তত রূপ নহে’ বকুলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
২৩. নীল শাড়ি পরে বসেছিল কে?
উত্তর: নীল শাড়ি পরে বসেছিল ঝুমকো ফুল।
২৪. পত্রাসন অর্থ কী?
উত্তর: পত্রাসন অর্থ পাতার ওপর আসন।
২৫. এয়ো অর্থ কী?
উত্তর: এয়ো অর্থ সধবা নারী।


অনুধাবনমূলক প্রশ্ন :

১. ক্ষুদ্র বৃক্ষটি কেন বিরক্ত হয়েছিল?
উত্তর: ক্ষুদ্র বৃক্ষটি বিরক্ত হয়েছিল কারণ ভ্রমর ঘটকালির কাজে নগদ অর্থ বা মধু আগাম চাওয়ার মতো কথাবার্তা বলছিল।
➠ এছাড়া, ভ্রমর কন্যার গুণের পরিবর্তে নিজের লাভের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছিল, যা ক্ষুদ্র বৃক্ষের কাছে অযথা সময় নষ্টের মতো মনে হয়েছিল। এজন্য সে বিরক্ত হয়ে সরাসরি বরের বিষয়ে জানতে চায়।

২. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ফুলের বিবাহ’ কেন রচনা করেছেন? উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ভবিষ্যৎ বর-কন্যাদের জন্য ‘ফুলের বিবাহ’ রচনা করেছেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বৈশাখ মাসের একদিন নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে কল্পনায় নিমজ্জিত হন।
➠ কল্পনায় তিনি একটি মল্লিকা ফুলের বিবাহ দেখতে পান। সেই বিবাহের রীতিনীতি, প্রথা সকল কিছুই বাঙালি গার্হস্থ্য-জীবনের অনুরূপ। তিনি বিয়ের জন্য সুপাত্রের সন্ধান, ঘটকালি, পণপ্রথা, বিবাহযাত্রা, বিয়েবাড়ির অবস্থা, মেয়েলি আচার-অনুষ্ঠান সর্বোপরি বাঙালি সমাজের বিয়ের সমস্ত রীতিনীতি মল্লিকা ফুলের বিয়েকে কেন্দ্র করে হাস্যরসাত্মকভাবে তুলে ধরেছেন। বিয়ে বাঙালি সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রথা। বাঙালি সমাজের এই রীতি সম্পর্কে সকলকে জানানোর জন্য 'ভবিষ্যৎ বরকন্যাদিগের শিক্ষার্থে' ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পটি রচনা করেছেন।

৩. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে কন্যার পিতার অবস্থা সম্পর্কে লেখো।
উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে কন্যার পিতা কন্যাভারগ্রস্ত হওয়ায় চিন্তিত।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বিবাহের পাত্রী মল্লিকা। সে এখন কলি, আজকালের মধ্যেই ফুটবে। মল্লিকা ফুলের পিতা বড়োলোক নয়, ক্ষুদ্র বৃক্ষ। তাছাড়া অনেকগুলো কন্যার দায়ভারগ্রস্ত সে মল্লিকা ফুলের জন্য সুপাত্র খুঁজছে। কিন্তু কন্যার জন্য বর পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় ভ্রমররাজ ঘটকালি শুরু করে। মল্লিকাকে দেখে অপ্রাসঙ্গিক নানা কথা বলে। কিন্তু বরের প্রসঙ্গে বলে না। সে ঘটকালির পারিশ্রমিক দাবি করে বসলে কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ' বিরক্ত হয়ে ওঠে। কন্যার বিয়ে নিয়ে সে আসলে চিন্তিত।

৪. মল্লিকা ফুলের বিয়ের জন্য বর পাওয়া যাচ্ছিল না কেন?
উত্তর: পাত্রের দোষ-গুণ বাছাই করতে গিয়ে মল্লিকা ফুলের জন্য বর পাওয়া যাচ্ছিল না।
➠ উদ্যানের রাজা স্থলপদ্ম নির্দোষ পাত্র হলেও তার ঘর বড়ো উঁচু, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে স্থলপদ্ম নিচু জাতের মেয়েকে বিয়ে করতে পারে না। জবা ফুল বিয়েতে রাজি থাকলেও সে বড়ো রাগী। তাই কন্যার পিতা এ সম্বন্ধ থেকে পিছিয়ে আসেন। গন্ধরাজও পাত্র ভালো, তবে তার বড়ো দেমাক। এভাবে দোষ-গুণ বাছাই করতে গিয়ে মল্লিকা ফুলের জন্য বর পাওয়া যাচ্ছিল না।

৫. ‘ফর্দ দিবেন, কড়ায় গন্ডায় বুঝাইয়া দিবে’—ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটি কন্যার পিতার বরপক্ষের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বোঝাতে করা হয়েছে।
➠ কথাসাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে ফুলের বিবাহের রূপকে বাঙালি সমাজের বিয়ের রীতিনীতি প্রথা তুলে ধরা হয়েছে। মল্লিকা ফুলের জন্য যখন পাত্র পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন ভ্রমর ঘটক হয়ে হাজির হয়। মল্লিকাকে দেখে ভ্রমরের পছন্দ হয়। এক পর্যায়ে ভ্রমর ঘটক জানতে চায় ঘরে মধু কত? কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ জানায়—ফর্দ দিলেই কড়ায় গ-ায় বুঝিয়ে দেওয়া হবে। যেহেতু ফুলের বিয়ের রূপকে বাঙালি সমাজের বিবাহপ্রথা তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না এখানে বিয়ের পণ নিয়ে কথা হচ্ছে। অর্থাৎ পাত্রপক্ষের চাহিদামতো সব দিতে কন্যার পিতা প্রস্তুত।

৬. ‘বর অতি সুপাত্র।’—বরকে অতি সুপাত্র বলার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটি বর গ্রহণযোগ্য বা উপযুক্ত বোঝাতে করা হয়েছে।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে মল্লিকা ফুলের বিবাহ। তার জন্য ভ্রমররাজ পাত্র খুঁজে বের করেছে। ঘটক ভ্রমররাজের মতে বর অতি সুপাত্র। তার অনেক গুণ। বর হচ্ছে গোলাপ। গোলাপ বংশ বড়ো কুলীন। গোলাপের গৌরব অধিক। কারণ তারা বাঞ্ছামালির সন্তান, তার স্বহস্তরোপিত। এসব গুণের কারণে গোলাপকে অতি সুপাত্র বলা হয়েছে।

৭. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে মৌমাছি বরযাত্রীর সঙ্গে যেতে পারেনি কেন?
উত্তর: মৌমাছি রাতে চোখে দেখতে পায় না বলে বরযাত্রীদের সঙ্গে যেতে পারেনি।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বাঙালি সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বিবাহপ্রথার নিপুণ বিবরণ উঠে এসেছে। গল্পের একাংশে বিবাহযাত্রার আড়ম্বরপূর্ণ বিবরণ উঠে এসেছে। বিবাহযাত্রায় উচ্চিঙ্গড়া পোকা নহবৎ বা সানাই বাজাচ্ছিল। যদিও সানাইয়ের বায়না নিয়েছিল মৌমাছি। বিবাহযাত্রা ছিল গোধূলিলগ্নে। কিন্তু মৌমাছি রাতে চোখে দেখতে পায় না। তাই সে বরযাত্রীদের সঙ্গে যেতে পারেনি।

৮. রাজকুমার স্থলপদ্ম কেন বিবাহে আসতে পারেনি?
উত্তর: সূর্য ডুবে গেলে রাজকুমার স্থলপদ্ম অসুস্থ হয়ে পড়ে তাই বিবাহে আসতে পারেনি।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বাঙালি বিবাহের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে ফুলের বিবাহের রূপকে। গল্পে আড়ম্বরপূর্ণ বিবাহযাত্রার বর্ণনা এসেছে। বিবাহের পাত্র গোলাপ গোধূলিলগ্নে বিবাহযাত্রার উদযোগ করল। অনেকেই বরযাত্রীর সঙ্গে চলল। কিন্তু রাজকুমার স্থলপদ্ম সূর্য ডুবে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাই বিবাহে আসতে পারেনি।

৯. ‘কোন বিবাহে না এরূপ বরযাত্রী জোটে, আর কোন বিবাহে না তাহারা হুল ফুটাইয়া বিবাদ বাধায়?’ বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে বাঙালি সমাজের বিবাহের প্রথা তুলে ধরা হয়েছে।
➠ বাঙালি বিয়েবাড়িতে একশ্রেণির লোক থাকেই, যাদের মূল কাজ হচ্ছে বিয়েতে ঝামেলা বাধানো। চাটুকারিতা বা মোসাহেবি করে বিয়েতে এরা গ-গোল পাকায়। ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে এ কাজ করেছে পিপড়ার দল, যারা হুল ফুটিয়ে বিয়েতে বিবাদ বাধায়।

১০. ‘দেখিলাম, সেই মালায় আমার বর কন্যা রহিয়াছে’—ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে লেখক তাঁর কল্পনায় সৃষ্ট বিবাহের বর ও কন্যাকে বাস্তবে অর্থাৎ নসী বাবুর মেয়ের হাতের মালায় দেখার বিষয়টি বুঝিয়েছেন।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে যে বিবাহের বিবরণ দিয়েছেন, সেটি তাঁর কল্পনায় সৃষ্টি। সে বিবাহের বর ছিল গোলাপ আর কন্যা ছিল মল্লিকা। নসী বাবুর মেয়ের ডাকে লেখকের ঘোর ভেঙে যায়। তিনি দেখতে পান নসী বাবুর মেয়ে কুসুমলতা বাস্তবিকই মালা গেঁথেছে। সে মালায় গোলাপ-মল্লিকাও আছে। অর্থাৎ তিনি তাঁর কল্পনার সাথে বাস্তবের একটি যোগসূত্র খুঁজে পান।

১১. গোলাপের বিবাহযাত্রার বিবরণ দাও।
উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বিবাহের পাত্র গোলাপ। গোধূলিলগ্নে গোলাপ বিবাহযাত্রার উদ্‌যোগ করল।
➠ উচ্চিংড়া বা ঘুর্ঘর পোকা সানাই বাজাতে লাগল। আকাশে তারাবাজি হতে লাগল। কোকিল আগে আগে ফুকরাতে লাগল। অনেক বরযাত্রী চলল। সেঁউতি বা দেশি সাদা গোলাপ নীতবর হওয়ার জন্য সেজেগুজে এলো। গরদের জোড় পরে চাঁপা এলো। অশোক নেশায় লাল হয়ে উপস্থিত হলো। একপাল পিঁপড়া মোসাহেব হয়ে এলো। কুরুচি, ঝাঁটি ফুলসহ অনেকেই বরযাত্রী হিসেবে এলো।

১২. ‘বরপক্ষের বড়ো বিপদ’—বিপদটি কী এবং কেন?
উত্তর: বরযাত্রীদের বাহক বাতাস না আসায় বরপক্ষের বড়ো বিপদ।
➠ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বরযাত্রীদের বাহক অর্থাৎ কন্যার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল বাতাস। এজন্য বায়নাও নিয়েছিল। কিন্তু কাজের সময় বাতাস উপস্থিত হয়নি। ফলে বরযাত্রীরা বিপদে পড়ে। বরযাত্রী সকলে অবাক হয়ে স্থিরভাবে দাঁড়িয়েছিল। এই বিয়েতে নিমন্ত্রিত ছিলেন লেখকও। মল্লিকাদের কুল যায় দেখে শেষ পর্যন্ত লেখকই বাহকের কাজ করলেন। বরযাত্রীদের অন্তঃপুরে পৌঁছে দিলেন।

১৩. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বিবাহবাড়ির ভিতরের অবস্থা বর্ণনা করো।
উত্তর: ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পটি মূলত বাঙালি সমাজের বিবাহেরই রূপক।
➠ বাঙালি বিয়েবাড়িতে অন্দরমহলের অবস্থাই ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ভিতর বাড়িতে ফুটে উঠেছে। সেখানে কন্যা সম্প্রদায় হাসাহাসি করছে। পাতায় পাতায় জড়াজড়ি, গল্পের ভান্ডারে ছড়াছড়ি পড়ে গেছে। যূথী, মালতি, বকুল, রজনিগন্ধা প্রভৃতি এয়োগণ স্ত্রী আচার করে বরযাত্রী বরণ করল। পুরোহিত উপস্থিত। কন্যাকর্তা কন্যা সম্প্রদান করলেন। পুরোহিত দুজনকে এক সুতোয় গেঁথে গাঁটছড়া বেঁধে দিলেন।

১৪. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বর্ণিত বাসরঘরের বিবরণ দাও।
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বাঙালি বিবাহের আচার রীতিনীতি উপস্থাপিত হয়েছে ফুলের বিবাহের রূপকে।
➠ গল্পে বাসরঘরে বরকে সুন্দরীরা ঘিরে বসল। বয়স্ক ঠাকুরমা টগর রসিকতা করতে করতে শুকিয়ে উঠলেন। রঞ্জনের রাঙামুখে হাসি ধরে না। কন্যার সই জুঁই কন্যার সাথে শুয়ে পড়ল। রজনিগন্ধাকে বর তাড়কা রাক্ষসী বলে তামাসা করল। বকুল বালিকা এককোণে চুপ করে বসে রইল। আর ঝুমকো ফুল বড়ো মানুষের গৃহিণীর মতো। মোটা নীল শাড়ি ছড়িয়ে বসল।

১৫. চমক হইলে, দেখিলাম কিছুই নাই—ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে লেখকের কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে আসার অনুভূতিকে বোঝানো হয়েছে।
➠ কথাসাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ঘটনাটি একটি কাল্পনিক ঘটনা। একদিন নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে লেখক কল্পনায় একটি ফুলের বিবাহ দেখতে পান। তিনি দেখতে পান মল্লিকা ফুলের বিবাহ। এই বিবাহের রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, মাঙ্গলিক ব্রত—সবকিছুই বাস্তব জীবনের বাঙালি সমাজের বিয়ের অনুরূপ। লেখক যখন কল্পনায় নিমজ্জিত, তখন নসী বাবুর কন্যা কুসুমলতা তাকে ডাকলে তাঁর ঘোর ভেঙে যায়। কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে দেখেন কোথাও কিছুই নেই। অর্থাৎ তাঁর দেখা বিবাহটি ছিল কল্পনামাত্র।

১৬. ‘সংসার অনিত্যই বটে—এই আছে এই নাই।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, সংসার ক্ষণস্থায়ী ও পরিবর্তনশীল, এক মুহূর্তে যা আছে, পর মুহূর্তেই তা নাও থাকতে পারে।
➠ উদ্ধৃতাংশটুকুতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একটি দার্শনিক সত্যকে তুলে ধরেছেন। তিনি যেমন সমাজনিষ্ঠ, বিজ্ঞানমনস্ক লেখক, তেমনি তাঁর দর্শনজ্ঞানও প্রখর। তাঁর দর্শনচেতনারই প্রকাশ ঘটেছে আলোচ্য অংশে। গল্পের ঘটনাটি তাঁর ঘোরের মধ্যে সৃষ্ট। সেই ঘোর কেটে যায় বাস্তব জগতের অভিঘাতে নসী বাবুর কন্যার ডাকে। তখন তিনি বুঝতে পারেন, এতক্ষণ যা ঘটে গেছে তা স্থায়ী নয়। ফলে ‘সংসার অনিত্যই বটে—এই আছে এই নাই’ অর্থাৎ জগতের কোনো কিছুই স্থায়ী নয়—তিনি এই দার্শনিক সত্যটি উপলব্ধি করেন।

১৭. ‘এই বিবাহের ন্যায় সব শূন্যে মিশাইবে, সব বাতাসে গলিয়া যাইবে’—ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, সংসার ক্ষণস্থায়ী এবং একদিন সব বিলীন হয়ে যাবে।
➠ জগতের যেমন সৃষ্টি আছে, তেমনি বিনাশও আছে—এটি চিরন্তন দার্শনিক সত্য। এই দার্শনিক সত্যটিই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে উচ্চারণ করেছেন। নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে কল্পনায় ফুলের বিবাহের যে উৎসব-কোলাহল তিনি দেখতে পেয়েছেন, বাস্তবের অভিঘাতে তা ধ্বংস হয়ে গেছে। বাস্তবে ফিরে তিনি বুঝতে পারেন এভাবেই জগৎ-সংসারও একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে, সবকিছু শূন্যে মিলিয়ে যাবে।

১৮. মল্লিকা ঘোমটা খুলছিল না কেন?
উত্তর: মল্লিকা লজ্জায় ঘোমটা খুলছিল না।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের পাত্রী মল্লিকা। ঘটক ভ্রমরবাজ তাকে দেখতে চাইলে সে কিছুতেই ঘোমটা খোলে না। সন্ধ্যাঠাকুরাণী দিদি এসে অনেক বোঝানোর পর অনেক কালক্ষেপণ করে শেষ পর্যন্ত মল্লিকা ঘোমটা খুলল। লেখক আসলে 'ফুলের বিবাহের' রূপকে বাঙালি লৌকিক জীবনের বিবাহের আচারকেই তুলে ধরেছেন। বাঙালি সমাজে বিয়ের কন্যারা সাধারণত খুব লজ্জাবতী হয়। এ কারণেই মল্লিকা বাঙালি কনেদের মতো লজ্জায় ঘোমটা খুলতে চাইছিল না।

১৯. ‘বলি ঘটকালির কিছু আগাম দিলে হয় না?’ ‘নগদ দান বড়ো গুণ- গুণ গুণ গুণ।’—বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে ঘটকের আগাম পারিশ্রমিক চাওয়ার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে।
➠ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বাঙালি সমাজজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বিবাহের নানা আচার ও রীতিনীতি প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের সঙ্গে মিশিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাঙালি বিবাহে ঘটক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি বরপক্ষ এবং কন্যাপক্ষের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে থাকেন। বিনিময়ে তিনি বর-কন্যাপক্ষ থেকে অর্থ আদায় করেন, যাকে বরা হয় ঘটকালি। গল্পে মল্লিকা ফুলের বিবাহে ভ্রমররাজ ঘটকের দায়িত্ব পালন করেছে, বিনিময়ে কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষের কাছে ঘটকালির অগ্রিম অর্থ স্বরূপ মধু দাবি করেছে। উদ্ধৃত লাইনটি দ্বারা বিবাহের এই প্রথাকেই বোঝানো হয়েছে।

২০. ‘এ সকল কথোপকথন মনুষ্য শুনিতে পায় না, আমি কেবল দিব্যকর্ণ পাইয়াই এ সকল শুনিতেছিলাম।’—ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে লেখক তার বিশেষ অনুভূতি বা কল্পনাশক্তির মাধ্যমে প্রকৃতির কথোপকথন শুনতে পাওয়া বুঝিয়েছেন।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পটি কল্পনাসৃষ্ট। তিনি একদিন নসী বাবুর ফুলবাগানে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি বসেছিলেন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে তিনি ভাববিহ্বল হয়ে পড়েন। কল্পনায় তিনি ফুলের বিবাহ দেখতে পান। সেই বিবাহকে কেন্দ্র করে কন্যার পিতা ও ঘটকের কথোপকথন ও অন্য সকলের কথা লেখক শুনতে পান। বৃক্ষ, ফুল ও পতঙ্গের কথোপকথন সাধারণত মানুষের পক্ষে বোঝা দুষ্কর। কিন্তু লেখক দিব্যকর্ণ অর্থাৎ ঐশ্বরিক শ্রবণক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে এসব শুনতে পান। আসলে এই দিব্যকর্ণ প্রাপ্তির ব্যাপারটিও তার কল্পনাপ্রসূত। বাস্তবে যা কখনোই সম্ভব নয়, কল্পনায় তা অতি সহজেই ঘটে যায়।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ১:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
মৌরি একদিন বাবার কাছে বায়না ধরে বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াতে যাবে। বাবা একদিন ওকে নিয়ে বেড়াতে গেলে সে ভীষণ খুশি হয়। নানা জাতের ফুল-ফলের গাছের সমারোহ দেখে সে অভিভূত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন সে যেসব ফুল-ফলের নাম শুনেছে সেগুলো আজ নিজ চোখে দেখে খুবই আনন্দিত হয়। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয় বাড়ির আঙিনায় ছোট্ট একটা বাগান করবে।

ক. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে কে ঘটকের দায়িত্ব পালন করে?
খ. ক্ষুদ্র বৃক্ষটি কেন বিরক্ত হয়েছিল?
গ. উদ্দীপকের মৌরির ভালোলাগার বিষয়ের সঙ্গে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা কর।
ঘ. “মৌরির মাঝে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়াই যেন ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনা।”—যুক্তিসহ বুঝিয়ে লিখ।

ক. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে ভ্রমর ঘটকের দায়িত্ব পালন করে। সে মল্লিকা ফুলের জন্য বর খুঁজে আনে এবং গোলাব ফুলের সঙ্গে মল্লিকার বিবাহের ব্যবস্থা করে।
খ. ক্ষুদ্র বৃক্ষটি বিরক্ত হয়েছিল কারণ ভ্রমর ঘটকালির কাজে নগদ অর্থ বা মধু আগাম চাওয়ার মতো কথাবার্তা বলছিল।
➠ এছাড়া, ভ্রমর কন্যার গুণের পরিবর্তে নিজের লাভের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছিল, যা ক্ষুদ্র বৃক্ষের কাছে অযথা সময় নষ্টের মতো মনে হয়েছিল। এজন্য সে বিরক্ত হয়ে সরাসরি বরের বিষয়ে জানতে চায়।

গ. উদ্দীপকের মৌরি ফুল-ফলের গাছ দেখে অভিভূত হয়ে গভীর আনন্দ অনুভব করে।
➠ দীর্ঘদিন সে যেসব ফুল-ফলের নাম শুনেছে, সেগুলো বাস্তবে দেখে তার মনে প্রবল উচ্ছ্বাস জাগে। সে সিদ্ধান্ত নেয় বাড়ির আঙিনায় একটি ছোট্ট বাগান তৈরি করবে, যেখানে ফুল-ফল তার আনন্দের সঙ্গী হয়ে থাকবে। এটি তার প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, আকর্ষণ এবং সৃজনশীল মনোভাবের পরিচায়ক। ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পেও প্রকৃতি ও ফুলের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে। গল্পের কল্পিত বিবাহের মাধ্যমে ফুল, ভ্রমর, পাতা ও বাতাসকে জীবন্ত চরিত্রে পরিণত করা হয়েছে। এতে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে বর্ণনামূলকভাবে প্রাণবন্ত করা হয়েছে, যা পাঠকের মনে আনন্দ ও প্রকৃতির প্রতি গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি করে।
➠ উদ্দীপকের মৌরির ভালোলাগা ও গল্পের মধ্যে সাদৃশ্যপূর্ণ দিক হলো-উভয় ক্ষেত্রেই ফুল ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং মুগ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। উদ্দীপকে মৌরি ফুলের বাস্তব রূপ দেখে আনন্দ পায়, আর গল্পে ফুলের সৌন্দর্য কল্পনার রঙে রাঙিয়ে মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে। প্রকৃতির প্রতি এই অনুভূতি মানুষের মনকে শান্তি দেয় এবং তাকে সৃষ্টির প্রতি আকৃষ্ট করে।

ঘ. মৌরির মাঝে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়াই প্রকৃতপক্ষে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।
➠ মৌরি যখন বোটানিক্যাল গার্ডেনে বিভিন্ন ফুল-ফলের গাছ দেখে, তখন তার মনে আনন্দ ও মুগ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য তাকে এতটাই অনুপ্রাণিত করে যে, সে নিজের বাড়িতে একটি ছোট্ট বাগান করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ভালোলাগা এবং সৃজনশীল পরিকল্পনা প্রকৃতির প্রতি তার ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করে।
➠ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনা প্রকৃতির সৌন্দর্যকে জীবন্ত ও কল্পনার ছোঁয়ায় আরও মধুর করে তোলা। গল্পে দেখা যায়, ফুল, গাছ, ভ্রমর, বাতাস প্রভৃতি প্রকৃতির উপাদানগুলোকে জীবন্ত চরিত্রে রূপদান করা হয়েছে। গল্পটি প্রকৃতির রূপ-গুণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, যেখানে ফুলের রূপ, সৌন্দর্য এবং ঘ্রাণ নিয়ে একটি কল্পিত বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এটি প্রকৃতির প্রতি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এবং কল্পনার জগৎকে তুলে ধরে।
➠ মৌরির অভিজ্ঞতা এই চেতনাকেই বাস্তব রূপ দেয়। প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে এসে সে অনুভব করে প্রকৃতির বিশালত্ব ও মাধুর্য। এই আনন্দ তাকে নতুন কিছু সৃষ্টির অনুপ্রেরণা দেয়, যা প্রকৃতিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ভালোবাসার প্রতীক। তাই বলা যায়, মৌরির প্রতিক্রিয়া প্রকৃতি এবং ফুলের প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা এবং সৃষ্টিশীল মনোভাবের একটি বাস্তব চিত্র, যা ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কল্পনার চেতনাকেই জীবন্ত করে তোলে।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ২:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
এখন নিরুপমার বিবাহের প্রস্তাব চলিতেছে। তাহার পিতা রামসুন্দর মিত্র অনেক খোঁজ করেন কিন্তু পাত্র কিছুতেই মনের মতোন হয় না। অবশেষে মস্ত এক রায়বাহাদুরের ঘরের একমাত্র ছেলেকে সন্ধান করিয়া বাহির করিয়াছেন। উক্ত রায়বাহাদুরের পৈতৃক বিষয়-আশয় যদিও অনেক হ্রাস হইয়া আসিয়াছে কিন্তু বনেদি ঘর বটে। বরপক্ষ হইতে দশ হাজার টাকা পণ এবং বহুল দানসামগ্রী চাহিয়া বসিল। রামসুন্দর কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া তাহাতেই সম্মত হইলেন; এমন পাত্র কোনোমতে হাতছাড়া করা যায় না।

ক. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে লেখক কোন মাসে একটি বিয়ে দেখেছিলেন?
খ. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ফুলের বিবাহ’ কেন রচনা করেছেন?
গ. উদ্দীপকের সঙ্গে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সাদৃশ্য বর্ণনা করো।
ঘ. “উদ্দীপকে প্রতিফলিত ভাব ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সামগ্রিক ভাবকে নয়, বরং আংশিক ভাবকে ধারণ করেছে।”—তোমার মতামত তুলে ধরো।

ক. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে লেখক বৈশাখ মাসে একটি বিয়ে দেখেছিলেন।
খ. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ভবিষ্যৎ বর-কন্যাদের জন্য ‘ফুলের বিবাহ’ রচনা করেছেন।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বৈশাখ মাসের একদিন নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে কল্পনায় নিমজ্জিত হন। কল্পনায় তিনি একটি মল্লিকা ফুলের বিবাহ দেখতে পান। সেই বিবাহের রীতিনীতি, প্রথা সকল কিছুই বাঙালি গার্হস্থ্য-জীবনের অনুরূপ। তিনি বিয়ের জন্য সুপাত্রের সন্ধান, ঘটকালি, পণপ্রথা, বিবাহযাত্রা, বিয়েবাড়ির অবস্থা, মেয়েলি আচার-অনুষ্ঠান সর্বোপরি বাঙালি সমাজের বিয়ের সমস্ত রীতিনীতি মল্লিকা ফুলের বিয়েকে কেন্দ্র করে হাস্যরসাত্মকভাবে তুলে ধরেছেন। বিয়ে বাঙালি সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রথা। বাঙালি সমাজের এই রীতি সম্পর্কে সকলকে জানানোর জন্য 'ভবিষ্যৎ বরকন্যাদিগের শিক্ষার্থে' ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পটি রচনা করেছেন।

গ. উদ্দীপকের সঙ্গে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের পিতার কন্যাকে পাত্রস্থ করার প্রচেষ্টার দিকটির সাথে সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই নিরুপমার বিয়ের প্রস্তাব চলছে। তার পিতা রামসুন্দর মিত্র সুপাত্রের সন্ধান করছেন, কিন্তু মনের মতোন পাত্র খুঁজে পাচ্ছেন না। অবশেষে রায়বাহাদুরের ছেলেকে খুঁজে বের করেছেন। দশ হাজার টাকা পণ চাওয়া সত্ত্বেও রামসুন্দর মিত্র রাজি হয়ে গেলেন।
➠ অন্যদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পেও মল্লিকা ফুলের বিয়ের সম্বন্ধ চলছিল। কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজছিলেন কিন্তু পাচ্ছিল না। উদ্যানের রাজা স্থলপদ্ম উঁচু বংশের, তাই তার সাথে বিয়ের আলাপ এগোয়নি। জবার অসম্মতি ছিল না, তবে জবা বড়ো রাগী, গন্ধরাজ পাত্র ভালো হলেও দেমাকি। এভাবে কন্যার পিতা কেবল পিছিয়ে আসছিলেন ভ্রমরের ঘটকালিতে অবশেষে সুপাত্র গোলাপকে পাওয়া গেল। মধু পণ দিতেও কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষের আপত্তি ছিল না। অর্থাৎ পাত্র ভালো হওয়া চাই।

ঘ. উদ্দীপকে বাঙালি বিয়েতে কন্যার পিতার ত্যাগ, প্রচেষ্টা এবং বাঙালি বিয়ের একটি অংশ পণপ্রথার দিকটি ধারণ করেছে, ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সামগ্রিক ভাবকে নয়।
➠ উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই নিরুপমার বিয়ে প্রস্তাব চলছে। তাকে সুপাত্রে দান করার জন্য পিতা রামসুন্দর মিত্র বদ্ধপরিকর। অনেক অনুসন্ধান করে দশ হাজার টাকা পণ চাওয়া সত্ত্বেও বনেদি ঘরে কন্যার বিয়ে ঠিক করলেন। অর্থাৎ পাত্র সুপাত্র হওয়ায় পণ দেওয়াতেও তার আপত্তি নেই।
➠ অন্যদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পেও আমরা একই ব্যাপার লক্ষ করেছি। অনেক অনুসন্ধানের পর মল্লিকা ফুলের জন্য সুপাত্র পাওয়া গেল। পাত্র গোলাপ, বড়ো কুলীন বংশ। পাত্র ভালো হওয়া সাপেক্ষে কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ পণ দিতেও রাজি। তবে এটুকুই গল্পটির মূলভাব নয়। রচনাটিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কাল্পনিক ফুলের বিবাহকে অবলম্বন করে বাঙালি সমাজের বিয়ের নানা আচার, রীতিনীতি, মাঙ্গলিক ব্রত ইত্যাদি তুলে ধরেছেন। এসবের ক্ষুদ্র একটি অংশবিশেষ উদ্দীপকে ফুটে উঠেছে। এছাড়াও ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে লেখকের দার্শনিক চেতনাও যুক্ত হয়েছে বাস্তব কল্পনার সূত্রে।
➠ সুতরাং আমরা বলতে পারি, উদ্দীপকে প্রতিফলিত ভাব ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সামগ্রিক ভাবকে নয়, বরং আংশিক ভাবকে ধারণ করেছে।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৩:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিতেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না। তিনি দেখিলেন মেয়েটির বিবাহের বয়স পার হইয়া গিয়াছে কিন্তু আর কিছুদিন গেলে সেটাকে ভদ্র বা অভদ্র কোনো রকমে চাপা দিবার সময়টাও পার হইয়া যাইবে। মেয়ের বয়স অবৈধ রকমে বাড়িয়া গেছে বটে, কিন্তু পণের টাকার আপেক্ষিক গুরুত্ব এখনো তাহার চেয়ে কিঞ্চিৎ উপরে আছে, সেইজন্যই তাড়া।

ক. গোলাপের গৌরব অধিক কেন?
খ. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে কন্যার পিতার অবস্থা সম্পর্কে লেখো।
গ. উদ্দীপকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কোন দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে? বর্ণনা করো।
ঘ. উদ্দীপকের কন্যা ও ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মল্লিকা ফুলকে একসূত্রে গাঁথা যায় কি? যুক্তিসহ প্রমাণ করো।

ক. গোলাপের গৌরব অধিক কারণ, গোলাপ বাঞ্ছামালির সন্তান, স্বহস্তরোপিত।
খ. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে কন্যার পিতা কন্যাভারগ্রস্ত হওয়ায় চিন্তিত।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বিবাহের পাত্রী মল্লিকা। সে এখন কলি, আজকালের মধ্যেই ফুটবে। মল্লিকা ফুলের পিতা বড়োলোক নয়, ক্ষুদ্র বৃক্ষ। তাছাড়া অনেকগুলো কন্যার দায়ভারগ্রস্ত সে মল্লিকা ফুলের জন্য সুপাত্র খুঁজছে। কিন্তু কন্যার জন্য বর পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় ভ্রমররাজ ঘটকালি শুরু করে। মল্লিকাকে দেখে অপ্রাসঙ্গিক নানা কথা বলে। কিন্তু বরের প্রসঙ্গে বলে না। সে ঘটকালির পারিশ্রমিক দাবি করে বসলে কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ' বিরক্ত হয়ে ওঠে। কন্যার বিয়ে নিয়ে সে আসলে চিন্তিত।

গ. উদ্দীপকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের পণপ্রথা এবং মধ্যযুগীয় বাঙালি সমাজে প্রচলিত গৌরীদান প্রথার প্রভাবজাত মানসিকতা ফুটে উঠেছে।
➠ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে আমরা দেখতে পাই কন্যাদায়গ্রস্ত মল্লিকা ফুলের পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ চিন্তিত। কন্যার বয়স কলিকা অবস্থা, আজকালই ফুটবে। এ অবস্থায় তার জন্য সুপাত্র পাওয়া যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত ভ্রমররাজের ঘটকালিতে পাত্র পাওয়া গেল। ভ্রমররাজের প্রশ্ন ঘরে মধু কত?' অর্থাৎ বিয়েতে পণ কত দেওয়া হবে। কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষের জবাব ‘ফর্দ দিবেন, কড়ায় গ-ায় বুঝাইয়া দিবে’। অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী সবই দেওয়া হবে। এখানে বাঙালি সমাজের বিবাহে পণপ্রথার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আবার বিয়ের খবর জানামাত্রই পাত্র গোলাপ প্রথমেই পাত্রীর বয়স জানতে চেয়েছে। অর্থাৎ বাঙালি সমাজে বিয়েতে পাত্রীর বয়স যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিই এখানে ধরা পড়েছে।
➠ অন্যদিকে, উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, পণের লোভে কন্যার বয়স বেশি হওয়া সত্ত্বেও বরপক্ষ বিয়েতে রাজি হয়েছে এবং বিয়ের জন্য তাড়া দিচ্ছে। অর্থাৎ কন্যার বয়স বেশি হওয়ার দোষ আড়াল করতে হচ্ছে পণের টাকা বেশি দিয়ে।

ঘ. হ্যাঁ, পণপ্রথার শিকার এবং সমাজ নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে পাত্রস্থ হওয়ার বিষয়টির দিক থেকে উদ্দীপকের কন্যা ও স্কুলের বিবাহ গল্পের মল্লিকা ফুলকে একসূত্রে গাঁথা যায়।
➠ গৌরীদান বা অল্প বয়সে কন্যাকে পাত্রস্থ করার প্রথা সমাজের জন্য ভয়ংকর। যৌতুক প্রথার ফলে কন্যাসন্তানকে অনেকে বোঝা মনে করে। কন্যাসন্তান বাবা-মায়ের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মেয়েরা সামাজিক অবমাননার শিকার ও অসম্মানিত হয়।
➠ উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, পণের লোভে কন্যার বয়স বেশি হওয়া সত্ত্বেও বরপক্ষ বিয়েতে রাজি হয়েছে এবং বিয়েতে আগ্রহ দেখায়। যেন কন্যার বয়স বেশি হওয়াটা দোষের এবং সেই দোষ আড়াল করতেই অধিক পণ। আর পণের অধিক টাকার জন্য বরের বাবা সবুর করতে পারছে না। ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে দেখা যায়, কন্যাভারগ্রস্ত মল্লিকা ফুলের পিতা মল্লিকার বিয়ে নিয়ে চিন্তিত। মল্লিকার জন্য ভালো পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে মল্লিকার বয়সও বেড়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভ্রমররাজের ঘটকালিতে পাত্র পাওয়া গেলেও পণ হিসাবে মধুর দাবি করা হয়। মল্লিকার বাবা কন্যার বয়স বাড়ার ভয়ে মধু পণ দিয়েই বিয়েতে রাজি হয়।
➠ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মল্লিকা ফুল ও উদ্দীপকের কন্যা উভয়কেই বয়স বাড়ার কারণে মোটা পণ দিয়ে পাত্রস্থ হতে হয়েছে। উভয়েই পণপ্রথার শিকার এবং উভয়কে বয়সের কারণে সুপাত্র পেতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৪:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
একদিন ভোরবেলা শিউলি বাগানে ফুল তুলতে গিয়ে চিৎকার শুনতে পেল— ‘মরে গেলাম রে। আমাকে বাঁচাও!’ শিউলি জানতে চাইল, ‘তুমি কে?’ তখন শুনল, 'আমি তোমার পায়ের কাছে, ইটের নিচে চাপা পড়েছি।' শিউলি অবাক হয়ে দেখল, তার পায়ের কাছে সত্যিই ইটের স্তূপ। ইট সরাতেই বেরিয়ে এলো হলুদ পাতা আর মোটা শিকড়। শিউলি প্রথমে শিকড় ভাবলেও আসলে ওটা একটা গাছের চারা, বটগাছ। বয়স পঞ্চাশ বছর। ইটের নিচে চাপা পড়ে বড়ো হতে পারেনি। শিউলির কাছে গাছটি অনেক অভিযোগ করল। যেমন—গাছ কেটে কলকারখানা তৈরি হচ্ছে। শিউলি হঠাৎ মায়ের ডাক শুনে বুঝতে পারল এতক্ষণ সে গাছটির সাথে কল্পনায় কথা বলছিল।

ক. ক্ষুদ্র বৃক্ষ ফুল ও ভ্রমরের কথোপকথন লেখক কীভাবে শুনেছিলেন?
খ. মল্লিকা ফুলের বিয়ের জন্য বর পাওয়া যাচ্ছিল না কেন?
গ. উদ্দীপকের সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উদ্দীপকে প্রতিফলিত ভাবটিই ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনা— তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।

ক. ক্ষুদ্র বৃক্ষ ফুল ও ভ্রমরের কথোপকথন লেখক দিব্যকর্ণ পেয়ে শুনেছিলেন।
খ. পাত্রের দোষ-গুণ বাছাই করতে গিয়ে মল্লিকা ফুলের জন্য বর পাওয়া যাচ্ছিল না।
➠ উদ্যানের রাজা স্থলপদ্ম নির্দোষ পাত্র হলেও তার ঘর বড়ো উঁচু, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে স্থলপদ্ম নিচু জাতের মেয়েকে বিয়ে করতে পারে না। জবা ফুল বিয়েতে রাজি থাকলেও সে বড়ো রাগী। তাই কন্যার পিতা এ সম্বন্ধ থেকে পিছিয়ে আসেন। গন্ধরাজও পাত্র ভালো, তবে তার বড়ো দেমাক। এভাবে দোষ-গুণ বাছাই করতে গিয়ে মল্লিকা ফুলের জন্য বর পাওয়া যাচ্ছিল না।

গ. উদ্দীপকের সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের প্রকৃতিচেতনার দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে।
➠ উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, শিউলি বাগানে ফুল তুলতে গিয়ে একটি বটগাছের চারার সাথে কাল্পনিক কথোপকথনে লিপ্ত হয়। শিউলি একটি বটগাছের চারার আর্তনাদ শুনতে পায়। চারাটি ইটের নিচে চাপা পড়েছে। চারাটির সাথে কথোপকথনে শিউলি তার পরিণতির কারণ জানতে পারে যে, এর পিছনে মানুষই দায়ী।
➠ অন্যদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে আমরা দেখতে পাই, লেখক নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে ঘোরের মধ্যে ‘ফুলের বিবাহ’ দেখতে পান। সেই বিবাহে বাঙালি বিবাহের রীতি পালিত হয়েছে। ফুল, গাছ, কীট-পতঙ্গের কথোপকথন লেখক দিব্যকর্ণ প্রাপ্ত হয়ে শুনছিলেন। আসলে লেখক কল্পনায় নিমজ্জিত ছিলেন। আমরা বুঝতে পারি, শিউলি এবং লেখক, দুজনেই প্রাকৃতিক পরিবেশে কল্পনায় নিমজ্জিত হয়েছে। এটি ঘটেছে মূলত তাদের প্রকৃতি চেতনার ফলে।

ঘ. উদ্দীপকে প্রতিফলিত ভাবটিই ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনা— মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, শিউলি কল্পনায় গাছের সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হয়েছে। গাছের সাথে কথোপকথনে বৃক্ষ নিধন বা প্রকৃতি ধ্বংসের কারণ যে মানুষ সেটি জানতে পেরেছে। বস্তুত পুরো ব্যাপারটিই ঘটেছে শিউলির প্রকৃতিপ্রেম ও প্রকৃতি রক্ষার তাগিদ থেকে। শিউলি প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন বলেই তার কল্পনার বিষয়ও প্রকৃতি।
➠ অন্যদিকে, ‘ফুলের বিবাহ’ রচনায়ও আমরা দেখতে পাই, লেখক নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে ‘ফুলের বিবাহ’ দেখতে পান। এই বিবাহকে কেন্দ্র করে বাঙালি বিবাহের আচার-প্রথা লেখক তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে অবলম্বন করেছেন প্রকৃতি— ফুল, কীটপতঙ্গ, পাখি ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপাদানকে। পুরো ঘটনাটি ঘটেছে লেখকের মানসলোকে, অবচেতনে। বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশ তাকে প্রকৃতিমগ্ন করে তুলেছিল। ফলে তার গল্পের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে প্রকৃতি।
➠ উপরিউক্ত আলোচনা থেকে দেখা যায়, উদ্দীপকের শিউলি প্রকৃতিকে ভালোবেসে প্রকৃতির প্রতি আবেগ-আপ্লুত হয়ে প্রকৃতির সাথে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যায়, প্রকৃতির 'সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হয়। তার চেতনায় প্রকৃতিপ্রেম প্রকাশ পায়, যা ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনাকেই ধারণ করেছে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের প্রতিফলিত ভাবটিই ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনা।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৫:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
সেইদিন এই মাঠ স্তব্ধ হবে নাকো জানি—
এই নদী নক্ষত্রের তলে
সেদিনও দেখিবে স্বপ্ন-
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!
আমি চলে যাব বলে
চালতা ফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে
নরম গল্পের ঢেউয়ে?
লক্ষ্মীপেঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে?
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে।

ক. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
খ, ‘ফর্দ দিবেন, কড়ায় গন্ডায় বুঝাইয়া দিবে’—ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকটির সঙ্গে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের প্রাসঙ্গিক দিক কোনটি? বর্ণনা করো।
ঘ. উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হলেও ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সামগ্রিক ভাবকে ধারণ করতে পারেনি—মন্তব্যটি কতটুকু যৌক্তিক বিচার করো।

ক. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
খ. প্রশ্নোক্ত উক্তিটি কন্যার পিতার বরপক্ষের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বোঝাতে করা হয়েছে।
➠ কথাসাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে ফুলের বিবাহের রূপকে বাঙালি সমাজের বিয়ের রীতিনীতি প্রথা তুলে ধরা হয়েছে। মল্লিকা ফুলের জন্য যখন পাত্র পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন ভ্রমর ঘটক হয়ে হাজির হয়। মল্লিকাকে দেখে ভ্রমরের পছন্দ হয়। এক পর্যায়ে ভ্রমর ঘটক জানতে চায় ঘরে মধু কত? কন্যার পিতা ক্ষুদ্র বৃক্ষ জানায়— ফর্দ দিলেই কড়ায় গ-ায় বুঝিয়ে দেওয়া হবে। যেহেতু ফুলের বিয়ের রূপকে বাঙালি সমাজের বিবাহপ্রথা তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না এখানে বিয়ের পণ নিয়ে কথা হচ্ছে। অর্থাৎ পাত্রপক্ষের চাহিদামতো সব দিতে কন্যার পিতা প্রস্তুত।

গ. উদ্দীপকটির সঙ্গে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের প্রাসঙ্গিক দিক হলো— লেখকের মৃত্যুচেতনা বা দার্শনিক চেতনায়।
➠ উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, কবি মৃত্যুসচেতন। মৃত্যু সম্পর্কিত ভাবনা দার্শনিক ভাবনারই অংশ। কবি প্রকৃতির চিরন্তন সত্য মৃত্যুময়তা এবং সুন্দর প্রকৃতির প্রতি তার অনিবার্য আকর্ষণের কথা ব্যক্ত করেছেন কবিতাংশে। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক নানা অনুষঙ্গ যেমন—মাঠ, নদী, নক্ষত্র, চালতা ফুল, শিশিরের জল, লক্ষ্মী পেঁচা ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন, যা কবির প্রকৃতিপ্রেমেরও পরিচায়ক।
➠ অন্যদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে লেখক প্রাকৃতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে বাঙালি গার্হস্থ্য-জীবনের একটি রূপকে যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি দার্শনিক উপলব্ধিতে ও পৌঁছেছেন। লেখকের ঘোর ভাঙলে লেখক বুঝতে পারেন পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। অর্থাৎ তাঁর মধ্যেও মৃত্যুচেতনা বা দার্শনিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি, মৃত্যুচেতনা বা দার্শনিক চেতনার দিক দিয়ে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পটি উদ্দীপকের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।

ঘ. উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হলেও ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সামগ্রিক ভাবকে ধারণ করতে পারেনি— মন্তব্যটি পুরোপুরি যৌক্তিক।
➠ উদ্দীপকে কবির দার্শনিক চেতনা, মৃত্যুসচেতনতা, প্রকৃতিপ্রেম প্রকাশিত হয়েছে। আমরা দেখতে পাই, মৃত্যুসচেতন কবি প্রকৃতির প্রতি গভীর টান অনুভব করেন। যে কারণে শিশিরের জল থেকে শুরু করে চালতা ফুল, লক্ষ্মীপেঁচা, নদী তাঁর লেখার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
➠ অন্যদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ রচনায়ও প্রকৃতিচেতনা, দার্শনিক চেতনা এসেছে। তবে প্রকৃতিকে অবলম্বন করে সবচেয়ে বড়ো আকারে এসেছে বাঙালি গার্হস্থ্য-জীবন, বিবাহ ও বিবাহের সাথে যুক্ত নানা আচার, নিষ্ঠা ও ব্রত। মল্লিকা ফুলের সম্বন্ধ দেখা, ঘটকালি, পণপ্রথা, বরযাত্রী, বরবরণ, অন্দরমহলে মেয়েলি আচার, বাসরঘর ইত্যাদি খুঁটিনাটি ব্যাপার রচনায় ফুঠে উঠেছে। প্রকৃতিকে অবলম্বন করে এসব ব্যাপার কল্পনার। আবরণ পরেছে। যে কারণে বাস্তবতার অভিঘাতে লেখকের ঘোর ভেঙে যায় এবং পৃথিবীর কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়—এই দার্শনিক উপলব্ধিতে পৌঁছান।
➠ ‘ফুলের বিবাহ’ রচনায় উপস্থাপিত গার্হস্থ-জীবন উদ্দীপকে অনুপস্থিত বিধায় আমরা বলতে পারি, উদ্দীপকটি রচনাটির সামগ্রিক ভাবকে ধারণ করতে পারেনি।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৬:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
গায়েহলুদ অসম্ভব রকম ধুম করিয়া গেল। বাহক এত গেল যে তাহার আদমশুমারি করিতে হইলে কেরানি রাখিতে হয়। তাহাদিগের বিদায় করিতে অপরপক্ষকে যে নাকাল হইতে হইবে, সেই কথা স্মরণ করিয়া মামার সঙ্গে মা একযোগে বিস্তর হাসিলেন। ব্যান্ড, বাঁশি, শখের কন্সর্ট প্রভৃতি যেখানে যত প্রকার উচ্চ শব্দ আছে, সমস্ত একসঙ্গে মিশাইয়া বর্বর কোলাহলে মত্তহস্তী দ্বারা সংগীত সরস্বতীর পদ্মবন দলিত-বিদলিত করিয়া আমি তো বিবাহ বাড়িতে গিয়া উঠিলাম। আংটিতে হারেতে জরি জহরাতে আমার শরীর যেন গহনার দোকানে নিলামে চড়িয়াছে বলিয়া বোধ হইলো।

ক. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পেশাগত জীবনে কী ছিলেন?
খ. ‘বর অতি সুপাত্র।’—বরকে অতি সুপাত্র বলার কারণ ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের যে দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে তার বর্ণনা দাও।
ঘ. ‘উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূলভাবকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করতে পারেনি।’—মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

ক. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পেশাগত জীবনে ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন।
খ. প্রশ্নোক্ত উক্তিটি বর গ্রহণযোগ্য বা উপযুক্ত বোঝাতে করা হয়েছে।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে মল্লিকা ফুলের বিবাহ। তার জন্য ভ্রমররাজ পাত্র খুঁজে বের করেছে। ঘটক ভ্রমররাজের মতে বর অতি সুপাত্র। তার অনেক গুণ। বর হচ্ছে গোলাপ। গোলাপ বংশ বড়ো কুলীন। তারা ফুলের মেল। যদিও সকল ফুলই ফুলে, তবুও গোলাপের গৌরব অধিক। কারণ তারা বাঞ্ছামালির সন্তান, তার স্বহস্তরোপিত। এসব গুণের কারণে গোলাপকে অতি সুপাত্র বলা হয়েছে।

গ. উদ্দীপকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের আড়ম্বরপূর্ণ বিবাহযাত্রার দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
➠ উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই বর তার বিবাহযাত্রার বর্ণনা দিচ্ছে। মহাধুমধামের সাথে গায়েহলুদ হয়ে গিয়েছে। বিবাহযাত্রায় ব্যান্ড, শখের কন্সর্ট প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে হাতিতে চড়ে বর বিবাহ বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তার শরীর ভরা অলংকার।
➠ অন্যদিকে, ‘ফুলের বিবাহ’ রচনায় মল্লিকা ফুলের পাত্র গোলাপ। গোধূলিলগ্নে বিবাহযাত্রার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উচ্চিঙ্গড়া সানাই বাজাতে লাগল, জোনাক পোকা ঝাড়বাতি জ্বালিয়েছে, আকাশে তারাবাজি হচ্ছিল। কোকিল আগে আগে গান গেয়ে চলল। বরযাত্রীতে সমাগমও হলো অনেক। জবা সবংশে হাজির হয়েছে, রাজাদের মতো উঁচু ডালে চড়ে হাজির হয়েছে করবীদল, সেঁউতি নীতবর হওয়ার জন্য সেজেগুজে এসেছে। পিঁড়ার দলও এসেছে বিয়েবাড়িতে মোসাহেবি করতে। ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের গোলাপের বিবাহযাত্রার দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।

ঘ. “উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূলভাবকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করতে পারেনি’”—মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ উদ্দীপকে একটা বিবাহের বর্ণনা দেখা যায়। মহা ধুমধামের সাথে বরের গায়েহলুদ সম্পূর্ণ হয়েছে। বরযাত্রায় এত মানুষ যে তা গণনা করতে একজন কেরানি রাখতে হবে। বরযাত্রায় ব্যান্ড, বাঁশি, শখের কন্সর্ট প্রভৃতির উপস্থিতি রয়েছে। বরের শরীরে এত গহনা যে দেখলে মনে হবে কোনো গহনার দোকানে নিলামে চড়েছে।
➠ অন্যদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে লেখক নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘোরে আচ্ছন্ন হয়েছেন। প্রকৃতি তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করেছে যে লেখক কল্পনায় ফুলের বিবাহ দেখতে পান। সেই বিবাহটিতে অনুষঙ্গ হয়েছে প্রকৃতি ফুল, বৃক্ষ, কীটপতঙ্গ, পাখি ইত্যাদি। বাঙালি গার্হস্থ্য-জীবনে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান। ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে প্রাকৃতিক অনুষঙ্গোর ব্যবহারে বাঙালি বিবাহের রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠানও তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের শেষাংশে লেখক দার্শনিক উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন। নসী বাবুর মেয়ে কুসুমলতার ডাকে লেখকের ঘোর ভেঙে যায়। তখন বুঝতে পারেন এতক্ষণ তিনি যা দেখেছেন তা অনিত্য, জগৎ-সংসারে সবকিছুর বিনাশ আছে।
➠ উদ্দীপকে আমরা শুধু একটি বিবাহযাত্রার বর্ণনা পাই, যা ‘ফুলের বিবাহ’ রচনার ক্ষুদ্র একটি অংশবিশেষ। সুতরাং আমরা বলতে পারি, উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ রচনার ভাবকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৭:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
ওর ভাবে-ভোলা চোখটা কেবল যে উপরের দিকেই তা নয়, অনেক সময় দেখেছি, ও আমার বাগানে বেড়াচ্ছে মাটির দিকে কী খুঁজে খুঁজে। নতুন অঙ্কুরগুলো তাদের কোঁকড়ানো মাথাটুকু নিয়ে আলোতে ফুটে উঠেছে এই দেখতে তার ঔৎসুকের সীমা নেই। প্রতিদিন ঝুঁকে পড়ে পড়ে তাদেরকে যেন জিজ্ঞাসা করে, তার পরে? তার পরে? তার পরে? তারা ওর চির-অসমাপ্ত গল্প। সদ্য গজিয়ে ওঠা কচি কচি পাতা, তাদের সঙ্গে ওর কী যে একটা বয়স্যভাব তা ও কেমন করে প্রকাশ করবে? তারাও ওকে কী একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবার জন্য আঁকুপাঁকু করে। হয়তো বলে, ‘তোমার নাম কী?’ হয়তো বলে, ‘তোমার মা কোথায় গেল?’ বলাই মনে মনে উত্তর করে, ‘আমার মা তো নেই।’

ক. ‘যত গুণ, তত রূপ নহে’ কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?
খ. ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে মৌমাছি বরযাত্রীর সঙ্গে যেতে পারেনি কেন?
গ. উদ্দীপকের বলাইয়ের মনোভাবে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কোন দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘‘উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের যথার্থ প্রতিচ্ছবি নয়।’’ মন্তব্যটি সম্পর্কে তুমি কি একমত? তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।

ক. ‘যত গুণ, তত রূপ নহে’ বকুলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
খ. মৌমাছি রাতে চোখে দেখতে পায় না বলে বরযাত্রীদের সঙ্গে যেতে পারেনি।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বাঙালি সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বিবাহপ্রথার নিপুণ বিবরণ উঠে এসেছে। গল্পের একাংশে বিবাহযাত্রার আড়ম্বরপূর্ণ বিবরণ উঠে এসেছে। বিবাহযাত্রায় উচ্চিঙ্গড়া পোকা নহবৎ বা সানাই বাজাচ্ছিল। যদিও সানাইয়ের বায়না নিয়েছিল মৌমাছি। বিবাহযাত্রা ছিল গোধূলিলগ্নে। কিন্তু মৌমাছি রাতে চোখে দেখতে পায় না। তাই সে বরযাত্রীদের সঙ্গে যেতে পারেনি।

গ. উদ্দীপকের বলাইয়ের মনোভাবে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের গল্পকথক কমলাকান্ত অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও সংবেদনশীলতার দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
➠ উদ্দীপকে দেখা যায়, বলাই নতুন অঙ্কুরদের দিকে গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। তাদের বেড়ে ওঠা দেখে মুগ্ধ হয় এবং মনে মনে তাদের সাথে কথা বলে। সে মনে করে ছোটো অঙ্কুরগুলো তার বন্ধু, যারা তার মতোই প্রশ্ন করতে চায়, উত্তর খুঁজতে চায়।
➠ অন্যদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে দেখা যায়, গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র মাল্লিকা ফুলের বিবাহ যা পুরোটাই লেখকের কল্পনাসৃষ্ট। মূলত বৈশাখ মাসের একদিন লেখক নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে প্রকৃতি অবলোকন করতে করতে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যান। প্রকৃতির সান্নিধ্য তাকে এতটাই প্রভাবিত করে যে তিনি কল্পনায় ফুলের বিবাহ দেন। বাঙালি গার্হস্থ্য জীবনের বিয়ের নানা আচার, রীতিনীতি তুলে ধরেন মল্লিকা ফুলের বিয়ের মাধ্যমে। শুধু তা-ই নয়, লেখক তাঁর কল্পনাসৃষ্ট এই বিয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ফুলের সৌন্দর্য, রং, গন্ধ এবং তাদের একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কের রসিক বর্ণনা করেন; যা উদ্দীপকের বলাইয়ের প্রকৃতিপ্রেমী মনোভাবেরই প্রতিচ্ছবি। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের বলাইয়ের মনোভাব ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের গল্পকথক কমলাকান্ত অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও সংবেদনশীলতার দিকটিই প্রতিফলিত হয়েছে।

ঘ. “উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের যথার্থ প্রতিচ্ছবি নয়।”—মন্তব্যটি সম্পর্কে আমি একমত।
➠ উদ্দীপকে দেখা যায়, বলাই বাগানের নতুন অঙ্কুর ও গাছপালার দিকে উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে। 'সে প্রতিদিন গাছের ছোটো ছোটো পাতা ও নতুন অঙ্কুরগুলোর সাথে এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করে। তার মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়। 'তার পরে কী হবে?' গাছপালার সঙ্গে তার একটি মায়াময় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যেন তারা একে অপরকে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করছে।
➠ ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে দেখা যায়, গল্পকথক কমলাকান্ত অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বৈশাখ মাসের একদিন নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে কল্পনায় হারিয়ে যান। প্রকৃতির সান্নিধ্য তাঁকে এতটায় প্রভাবিত করে যে, তিনি কল্পনায় ফুলের বিবাহ দেন। এই বিবাহে তিনি বাংলার চিরচেনা সমাজভাবনা তুলে ধরেন। গল্পের কন্যা দায়ভারগ্রস্ত ক্ষুদ্র বৃক্ষকে বাঙালি পিতা, মল্লিকা ফুলকে বাঙালি লজ্জাশীলা কন্যা এবং বাঙালি বিয়ের বিভিন্ন আচার, রীতিনীতি, পণপ্রথা ও বাঙালি সমাজে প্রচলিত গৌরিদান প্রথা তুলে ধরেন ফুলের বিয়ের রূপকে।
➠ সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, উদ্দীপকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের গল্পকথকের প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগের বিষয়টি ফুটে উঠলেও গল্পের বাঙালি গার্হস্থ্য জীবন, বিবাহ ও বিবাহের সাথে যুক্ত নানা আচার, নিষ্ঠা, ব্রত ও রীতিনীতির বিষয় অনুপস্থিত। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত উদ্দীপকটি ফুলের বিবাহ গল্পের যথার্থ প্রতিচ্ছবি নয়।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৮:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
রিজেন্ট পার্ক লন্ডনের সেরা পার্ক। এ পার্কের গোলাপ-বাগানের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। বাগানটি রানি মেরির নামের সঙ্গে জড়ানো। জুন, জুলাই— এ দুমাস গোলাপফুলের। মেরির গোলাপ-বাগানের গোলাপেরা কেউ ফুটেছে— কেউ বা ফুটে রৌদ্র-স্নানরত নরনারীর চোখ জুড়াচ্ছে, মন ভোলাচ্ছে। নানা রঙের এতো গোলাপ একসঙ্গে পাশাপাশি ফুটতে দেখলে নিতান্ত বেরসিকের প্রাণও রসোচ্ছল হয়ে উঠবে তাতে বিচিত্র কী? রোদে ভরা ছুটির দিনগুলোতে রিজেন্ট পার্ক ও কিউ-গার্ডেনে এখানকার মালিকদের হাতে-গড়া গোলাপবাগের জান্নাতি পরিবেশ দেখে মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। অপরিমেয় ফুলের রঙে চোখে লাগছে নেশা আর ফুলেরই মনোরম স্নিগ্ধ গন্ধে বাতাস হয়েছে হয়েছে মোহকর।

ক. নীল শাড়ি পরে বসেছিল কে?
খ. রাজকুমার স্থলপদ্ম কেন বিবাহে আসতে পারেনি?
গ. উদ্দীপকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের যে দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘বিষয়বস্তুর বর্ণনায় উদ্দীপক ও ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সাদৃশ্য থাকলেও চেতনাগত পার্থক্য স্পষ্ট।’’—যৌক্তিক বিশ্লেষণ করো।

ক. নীল শাড়ি পরে বসেছিল ঝুমকো ফুল।
খ. সূর্য ডুবে গেলে রাজকুমার স্থলপদ্ম অসুস্থ হয়ে পড়ে তাই বিবাহে আসতে পারেনি।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে বাঙালি বিবাহের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে ফুলের বিবাহের রূপকে। গল্পে আড়ম্বরপূর্ণ বিবাহযাত্রার বর্ণনা এসেছে। বিবাহের পাত্র গোলাপ গোধূলিলগ্নে বিবাহযাত্রার উদযোগ করল। অনেকেই বরযাত্রীর সঙ্গে চলল। কিন্তু রাজকুমার স্থলপদ্ম সূর্য ডুবে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাই বিবাহে আসতে পারেনি।

গ. উদ্দীপকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ফুলের সৌন্দর্য ও সেই সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়ার দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
➠ উদ্দীপকে লন্ডনের রিজেন্ট পার্কের গোলাপ বাগানের সৌন্দর্য এবং তার মনোহর পরিবেশ উপস্থাপন করা হয়েছে। নানা রঙের গোলাপ ফুলের সৌন্দর্য, তাদের মিষ্টি গন্ধ এবং রৌদ্রে ঝলমল দৃশ্য মানুষের মনকে আকর্ষণীয় ও মনোযোগকে আরও জাগ্রত করে তুলছে। এখানে গোলাপ ফুলের রঙের রূপ ও গন্ধের সৌন্দর্য এবং সেই সৌন্দর্যে মানুষের বিমোহিত হওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে।
➠ অপরদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের গল্পকথক কমলাকান্ত অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গল্পে ফুলের সৌন্দর্য ও ফুলের সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। বৈশাখ মাসে একদিন তিনি নসী বাবুর ফুল বাগানে বসে ফুলের সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যান। তিনি ফুলের সৌন্দর্যে এতটাই বিমোহিত হন যে, কল্পনায় ফুলের বিয়ে পর্যন্ত দেন। এছাড়া তিনি হাস্যরসের মাধ্যমে বিভিন্ন ফুলের নাম, সে ফুলের গন্ধের তারতম্য, বর্ণের রকমফের অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে তুলে ধরেছেন। যা উদ্দীপকের বর্ণনায় দৃশ্যমান। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ফুলের সৌন্দর্য ও সেই সৌন্দর্য বিমোহিত হওয়ার দিকটিই প্রতিফলিত হয়েছে।

ঘ. “বিষয়বস্তুর বর্ণনায় উদ্দীপক ও ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের। গল্পের সাদৃশ্য থাকলেও চেতনাগত পার্থক্য স্পষ্ট।” মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ উদ্দীপকে লন্ডনের রিজেন্ট পার্কের গোলাপ-বাগানের সৌন্দর্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। এখানে প্রকৃতির মনোরম রূপ স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। নানা রঙের গোলাপ একসঙ্গে ফুটে আছে, যা দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসে এই বাগান গোলাপের সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। মানুষ গোলাপের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে যায়।
➠ অন্যদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে গল্পকথক কমলাকান্ত অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বৈশাখ মাসের একদিন নসী বাবুর বাগানে বসে ফুলের সৌন্দর্য অবলোকন করতে থাকেন। নসী বাবুর বাগানের নানা রকম ফুলের সৌন্দর্য তাঁকে এতটাই বিমোহিত করেন যে, তিনি কল্পনায় নিমজ্জিত হয়ে যায়। কল্পনায় তিনি মল্লিকা ফুলের বিয়ের আয়োজন করেন এবং বাঙালি গার্হস্থ্য আচার, রীতিনীতি অনুযায়ী গোলাপের সাথে বিয়ে সম্পন্ন করেন। মূলত লেখক ফুলের বিবাহের আড়ালে বাঙালি কন্যাভারগ্রস্ত পিতার ত্যাগ, প্রচেষ্টা, সমাজে প্রচলিত পণপ্রথা, গৌরিদান প্রথা ও বাঙালি বিয়ের আচার, রীতিনীতি, মাঙ্গলিক ব্রত ইত্যাদি তুলে ধরেছেন। সমাজের প্রচলিত বিবাহের এই রীতিনীতিই তাঁর চেতনায় স্পষ্ট হয়েছে।
➠ সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, উদ্দীপকের বর্ণনায় ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ফুলের সৌন্দর্য ও সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়ার বিষয়ের সাথে সাদৃশ্য থাকলেও গল্পের চেতনা অর্থাৎ বাঙালি গার্হস্থ্য জীবনের বিবাহ ও বিবাহের সাথে যুক্ত নানা বিষয়— আচার, নিষ্ঠা, ব্রত ও রীতিনীতির বিষয় অনুপস্থিত।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ৯:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
গাঁয়ের প্রতিটি বাড়িতে আনন্দ, কারণ কালোয়া গ্রামের কৃষক রমেশের মেয়ের বিয়ে, সকাল থেকেই গ্রামে প্যান্ডেল বাঁধা, আল্পনা আঁকা আর অতিথি আপ্যায়নের ধুম লেগেছে। পাত্র রাজু পাশের গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যার সঙ্গে এই বিয়েটা পারিবারিকভাবে ঠিক হয়েছে। সন্ধ্যায় শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মাঝে শুরু হলো বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। বর-কনে পিঁড়িতে বসতেই বড়োদের আশীর্বাদ আর সখীদের হাসিঠাট্টায় মেতে উঠল উঠোন। বিয়ের মূল আকর্ষণ ছিলো গাঁয়ের নিজস্ব রীতিতে পালিত গায়ে হলুদ আর পান খাওয়ানোর আয়োজন। রাতভর ঢাক-ঢোল আর বিয়ের গান গেয়ে গ্রামের মানুষ উৎসবে মেতে উঠল। পরের দিন সকালে কনেকে বিদায় দেওয়ার সময় সবার চোখে জল, তবে মুখে ছিল সুখী দাম্পত্য জীবনের শুভ কামনা।

ক. পত্রাসন অর্থ কী?
খ. ‘কোন বিবাহে না এরূপ বরযাত্রী জোটে, আর কোন বিবাহে না তাহারা হুল ফুটাইয়া বিবাদ বাধায়?’ বুঝিয়ে লেখো।
গ. উদ্দীপকের সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি— ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘‘উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনাকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করেছে।’’—যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করো।

ক. পত্রাসন অর্থ পাতার ওপর আসন।
খ. প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে বাঙালি সমাজের বিবাহের প্রথা তুলে ধরা হয়েছে।
➠ বাঙালি বিয়েবাড়িতে একশ্রেণির লোক থাকেই, যাদের মূল কাজ হচ্ছে বিয়েতে ঝামেলা বাধানো। চাটুকারিতা বা মোসাহেবি করে বিয়েতে এরা গ-গোল পাকায়। ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে এ কাজ করেছে পিপড়ার দল, যারা হুল ফুটিয়ে বিয়েতে বিবাদ বাধায়।

গ. উদ্দীপকের সাথে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সাদৃশ্যপূর্ণ দিক হলো বাংলার গ্রামীণ সমাজের বিবাহপ্রথা ও সামাজিক বন্ধন।
➠ উদ্দীপকে একটি গ্রামীণ বিয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রামের মানুষ উৎসবে মেতে উঠেছে। গায়ে হলুদ, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও পান খাওয়ানোর মতো রীতিগুলো বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। ঢাক-ঢোল বিয়ের গান ও অতিথি আপ্যায়নে সবার মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দিয়েছে। কন্যার বিদায়ের সময় আনন্দঘন পরিবেশ ও নবদম্পতির সুখী দাম্পত্য জীবনের কামনার মধ্যে বাঙালির বিবাহ প্রথা ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রকাশ ঘটেছে।
➠ অন্যদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পেও ফুলের বিয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালি গার্হস্থ্য বিয়ে অনুষ্ঠানকে উপস্থাপন করেছেন। বিয়ে অনুষ্ঠান বাড়ির শিশু-কিশোর ও প্রতিবেশীদের মধ্যে যে অতীব আনন্দ বয়ে আনে তা তুলে ধরেছেন। তাছাড়া বাঙালি বিয়ের রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠানও উঠে এসেছে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে। যা উদ্দীপকের বিয়ের প্রথা ও সামাজিক বন্ধনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. “উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনাকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করেছে।”—মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ উদ্দীপকে বাঙালির গ্রামীণ বিবাহপ্রথা ও সামাজিক বন্ধনের চিত্র দেখা যায়। দুটি মানুষের বিয়েকে কেন্দ্র করে মেতে উঠেছে পুরো গ্রামের মানুষ। নিজস্ব রীতি অনুযায়ী পালিত হয়েছে বিয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান। গায়ে হলুদ, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, পান খাওয়ানো, ঢাক-ঢোল ইত্যাদি বিয়ের রীতি-অনুষ্ঠানে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গ্রামে।
➠ অপরদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে গল্পকথক কমলাকান্ত অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একদিন নসী বাবুর ফুল বাগানে বসে কল্পনায় ফুলের বিবাহ দেখতে পান। এই বিবাহে উঠে এসেছে বাঙালি বিবাহের নানা আচার-প্রথা। গল্পের হাস্যরসের মাধ্যমে প্রকৃতির উপাদান ফুলকে বাস্তব জীবনে উপস্থাপন করে তাদের বিয়ের মাধ্যমে বাঙালি বিয়ে অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আচার-প্রথা, নিষ্ঠা, ব্রত ইত্যাদি তুলে ধরেছেন দক্ষতার সাথে। গল্পে কন্যা দায়ভারগ্রস্ত ক্ষুদ্র বৃক্ষকে বাঙালি পিতার প্রতীক, মল্লিকা ফুলকে বাঙালি লজ্জাশীলা নারীর রূপে উপস্থাপন করেছেন। গল্পের মূল উপাদান ফুল হলেও গল্পকার তাদের নাম, গন্ধ, বর্ণ ইত্যাদি পরিচিতির আড়ালে বাঙালি বিয়ের আচার-রীতি তুলে ধরেছেন।
➠ সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের মূল চেতনা বাঙালি গার্হস্থ্য জীবন, বিয়ে ও বিয়ের সাথে যুক্ত নানা আচার, প্রথা, নিষ্ঠা, ব্রত ইত্যাদি আনুষ্ঠানিকতা উদ্দীপকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করেছে। তাই প্রশ্নোক্ত উক্তিটি যথার্থ বলে মনে করি।


‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন- ১০:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
মে মাস ছিল টিউলিপ, উইলো আর ডেইজির। টিউলিপ আমাদের দেশের ধুতুরা ফুলের মতো। কেবল ফুলটুকু ছাড়া আর কিছুর সঙ্গে ওর সাদৃশ্য আঁকা যাবে না— পাতার সঙ্গে নয়, পাপড়ি বা দল কিছুরই সঙ্গে নয়। বাইরে কিছুটা সাদৃশ্য আছে, এতটুকু বলা যায়। আকারে টিউলিপ ধুতুরা ফুলের চেয়ে অনেক ছোটো। বলিহারি যাই টিউলিপের রং দেখে। কোনো জায়গায় দুধের চেয়েও সাদা। কোনোটা হলুদ। কোনোটায় থাকে প্রজাপতির গায়ের রেখাটানা বিচিত্র রঙের কারুচিত্র। থাকের পর থাক। টিউলিপে টিউলিপময়। ইংরেজজাত ফুলের যে কী ভক্ত এবং ফুলের রঙে যে এদের কী আনন্দ এ থেকে এ কথাই বারবার মনে পড়ে।

ক. এয়ো অর্থ কী?
খ. ‘দেখিলাম, সেই মালায় আমার বর কন্যা রহিয়াছে’—ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের কোন বিষয়টি ধারণ করে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সম্পূর্ণ ভাব ধারণ করতে পারেনি।’ মন্তব্যটি মূল্যায়ন করো।

ক. এয়ো অর্থ সধবা নারী।
খ. প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে লেখক তাঁর কল্পনায় সৃষ্ট বিবাহের বর ও কন্যাকে বাস্তবে অর্থাৎ নসী বাবুর মেয়ের হাতের মালায় দেখার বিষয়টি বুঝিয়েছেন।
➠ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে যে বিবাহের বিবরণ দিয়েছেন, সেটি তাঁর কল্পনায় সৃষ্টি। সে বিবাহের বর ছিল গোলাপ আর কন্যা ছিল মল্লিকা। নসী বাবুর মেয়ের ডাকে লেখকের ঘোর ভেঙে যায়। তিনি দেখতে পান নসী বাবুর মেয়ে কুসুমলতা বাস্তবিকই মালা গেঁথেছে। সে মালায় গোলাপ-মল্লিকাও আছে। অর্থাৎ তিনি তাঁর কল্পনার সাথে বাস্তবের একটি যোগসূত্র খুঁজে পান।

গ. উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ফুলের সৌন্দর্য এবং রং বৈচিত্র্যের বিষয়টি ধারণ করে।
➠ উদ্দীপকে বলা হয়েছে, টিউলিপ ফুল আকারে ধুতুরা ফুলের মতো হলেও রঙের মধ্যে অসংখ্য বৈচিত্র্য আছে, যেমন—সাদা, লাল, বেগুনি, হলুদ ইত্যাদি। এর রঙ এবং সৌন্দর্য এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেন ফুলটি এক ধরনের বিশেষ আনন্দ ও সৌন্দর্য দিয়ে ভরা। ফুলের প্রতি এখানে এক গভীর প্রশংসা প্রকাশ করা হয়েছে।
➠ অপরদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে লেখক হাস্যরসের মাধ্যমে বিভিন্ন ফুলের নাম, ফুলের গল্পের তারতম্য, বর্ণের রকমফের অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরেন। যেমন— গোলাপকে বলেছেন, এরা 'ফুলে' মেল। গৌরব অধিক, চাঁপার উগ্র গন্ধ, অশোক নেশায় লাল ইত্যাদি। এছাড়া কখন কোন ফুল ফোটে সে পর্যবেক্ষণও করেছেন লেখক; যা উদ্দীপকের টিউলিপ ফুলের সৌন্দর্য বর্ণনা এবং রং বৈচিত্র্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ঘ. “উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের সম্পূর্ণ ভাব ধারণ করতে পারেনি।”—মন্তব্যটি যথার্থ।
➠ উদ্দীপকে দেখা যায়, টিউলিপ ফুলের সৌন্দর্য ও রঙের বৈচিত্র্য বর্ণনা করা হয়েছে। উদ্দীপকে বলা হয়েছে, টিউলিপ আমাদের দেশের ধুতুরা ফুলের মতো হলেও তার আকার অনেক ছোটো এবং রঙের বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে— কিছু সাদা, কিছু লাল, কিছু হলুদ, কিছু বেগুনি আবার কিছুতে প্রজাপতির গায়ের মতো রেখাও দেখা যায়।
➠ অপরদিকে ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পে দেখা যায়, গল্পকথক কমলাকান্ত অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বৈশাখ মাসের একদিন নসী বাবুর ফুলবাগানে বসে ফুলের সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে কল্পনায় হারিয়ে যান। তিনি ফুলের সৌন্দর্যে এতটাই প্রভাবিত হন যে, হাস্যরসের মাধ্যমে বিভিন্ন ফুলের পরিচয়, গল্পের তারতম্য, বর্ণের রকমফের তুলে ধরেন। এমনকি তিনি প্রকৃতিকে বাস্তব জীবনে উপস্থাপনের মাধ্যমে ফুলের বিয়েও দেন। এই বিয়েতে বাঙালি সমাজের প্রচলিত বিয়ের যাবতীয় রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান সর্বোপরি বাঙালি গার্হস্থ্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরেন।
➠ সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনা থেকে দেখা যায়, উদ্দীপকটি ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের ফুলের সৌন্দর্য এবং রং বৈচিত্র্যের বিষয়টি ধারণ করলেও ‘ফুলের বিবাহ’ গল্পের বাঙালি গার্হস্থ্য জীবন, বিবাহ ও বিবাহের সাথে যুক্ত নানা আচার, নিষ্ঠা, ব্রত ও রীতিনীতির বিষয় অনুপস্থিত আছে। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত উক্তিটি যথার্থ।


তথ্যসূত্র :
১. বাংলা সাহিত্য: নবম-দশম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৫।
২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url