মানসিংহ ও ঈসা খাঁ
নাটক: মানসিংহ ও ঈসা খাঁ
ইব্রাহীম খাঁ
[স্থান: এগারোসিন্ধুর পরপারে মহারাজ মানসিংহের শিবির।
চরিত্র: মানসিংহ, দুর্জয়সিংহ ও দূত]
মানসিংহ: শোনা যায়, একদা এক অসুররাজ গোষ্পদে ডুবে মরেছিল। একথা বিশ্বাস করো, দুর্জয়সিংহ?
দুর্জয়সিংহ: এ পুরাণের কাহিনিমাত্র। বিশ্বাস করি না!
মানসিংহ: আমিও আগে বিশ্বাস করতাম না, দুর্জয়সিংহ, কিন্তু এখন বিশ্বাস করি।
মানসিংহ: সত্যি বিশ্বাস করেন, মহারাজ?
দুর্জয়সিংহ: চোখের সামনে যা ঘটে গেল, দুর্জয়সিংহ, তাতে বিশ্বাস না-করি কেমনে, তাই বলো। নইলে বাংলার এক অজ্ঞাতনামা ক্ষুদ্র পাঠানসর্দার ঈসা খাঁ, তারই তলোয়ারতলে মারা যায় ক্ষত্র-বীর মানসিংহের আপন জামাতা?
দুর্জয়সিংহ: আশ্চর্যই বটে!
মানসিংহ: মানুষ হয়ে জন্মেছিল, একদিন তো সে মরতই-না-হয় দুদিন আগে মরেছে। কিন্তু রাজপুতনার মরুসিংহ মারা গেল বাংলার বকরির হাতে-এ দুঃখ রাখবার স্থান কোথায়, দুর্জয়সিংহ?
দুর্জয়সিংহ: মহারাজ, এ দুঃখ করতে পারেন।
মানসিংহ: জামাতা নিহত হয়েছে, কিন্তু তারও চেয়ে বড়ো দুঃখ যে, এই কাহিনি শুনে রাজপুতনার নারীরা হাসবে, শত্রুরা উপহাস করে রটনা করবে, আমি নিজে ভয় পেয়ে ঈসা খাঁর সামনে আমার জামাতাকে পাঠিয়েছিলাম। অনেকে ভাববে, আমরা কাপুরুষ।
দুর্জয়সিংহ: এ বিধাতার বিধান, মহারাজ, সয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় কী?
মানসিংহ: না। আমি প্রতিশোধ গ্রহণ করব-আমি ঈসা খাঁকে হত্যা করব।
দুর্জয়সিংহ: কিন্তু সে কী করে সম্ভব হবে?
মানসিংহ: ঈসা খাঁ আমাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করেছিল, পাঠিয়েছিলাম আমার জামাতাকে। আমার জামাতাকে হত্যা করে ভেবেছে, সে বুঝি মানসিংহকেই হত্যা করেছে। আমি তাকে জানিয়েছি, ঈসা খাঁর মুণ্ডপাত করার জন্য মানসিংহ এখনও জীবিত রয়েছেন। এবার দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান গিয়েছে আমার তরফ থেকেই।
দুর্জয়সিংহ: কোনো উত্তর পেয়েছেন?
মানসিংহ: না, তবে এক্ষুনি পাব। জানি না; সে কাপুরুষ পুনরায় দ্বন্দ্বযুদ্ধে রাজি হবে কিনা।
দূত: (প্রবেশান্তে কুর্নিশ করিয়া) মহারাজের জয় হোক!
মানসিংহ: কি সংবাদ, দূত?
দূত: সংবাদ শুভ। মহারাজকে হত্যা করেছে ভেবে তারা উৎসব করছিল; এমন সময় আপনার আহ্বান নিয়ে আমি হাজির। তবে ঈসা খাঁ এ আহ্বান গ্রহণ করেছেন।
মানসিংহ: গ্রহণ করেছেন? অনেকক্ষণ পরে নিশ্চয়ই?
দূত: না মহারাজ! তক্ষুনি গ্রহণ করেছেন।
মানসিংহ: তক্ষুনি? আচ্ছা, তা বেশ। কোনো জবাব এনেছ?
দূত: এনেছি, মহারাজ! তবে দেখাতে সাহস হয় না।
মানসিংহ: তোমাকে অভয় দিচ্ছি, দূত।
দূত: মহারাজ, ঈসা খাঁ লোকটা, নিতান্ত... নিতান্ত... এই নিতান্ত...
মানসিংহ: নিতান্ত কী?
দূত: আজ্ঞে, নিতান্ত গোঁয়ার। কারণ মহারাজের আহ্বানপত্র পেয়েই অমনি তলোয়ার খুললেন, তারপর নিজের হাত কেটে তারই রক্তে তলোয়ারের ডগা দিয়ে উত্তর লিখলেন-'বহুত আচ্ছা'।
২.
[স্থান: লড়াইয়ের ময়দান। একদিকে পাঠান শিবির, অন্যদিকে মোগল শিবির। অদূরে
এগারোসিন্ধুর কেল্লা-ময়দানের মাঝখানে ঈসা খাঁ ও মানসিংহ সামনাসামনি দাঁড়িয়ে।।
ঈসা খাঁ: নমস্কার, মহারাজ।
মানসিংহ: আদাব, খাঁ সাহেব।
ঈসা খাঁ: এত তকলিফ করে এখানে না-এসে মহারাজ যদি আদেশ করতেন, তবে দিল্লিতে গিয়েই মহারাজের সঙ্গে আমি একহাত লড়ে আসতাম।
মানসিংহ: বাংলার ঝোপে-জঙ্গলে আপনারা কেমন আছেন, একটু দেখতে শখ হলো, খাঁ সাহেব।
ঈসা খাঁ: রাজপুতনার মরু-পর্বতের কোন অন্ধকার গুহায় মহারাজ কীরূপে থাকেন, তা দেখবার কৌতূহলও তো এ বান্দার হতে পারত!
মানসিংহ: পাঠানেরা দেখছি ইদানীং কথা বলতে শিখেছে।
ঈসা খাঁ: এ আপনাদের মতো কথা-সর্বস্বদের সঙ্গে থাকার ফল। আগে পাঠানেরা কথা বলত না; কথা বলত কেবল তাদের তির আর তলোয়ার।
মানসিংহ: ইদানীং বুঝি তাহলে পাঠানদের তির-তলোয়ার ভোঁতা হয়ে পড়েছে!
ঈসা খাঁ: শাহি ফৌজের ওপর ক্রমাগত ব্যবহারে একটু ভোঁতা হয়েছে বৈকি!
মানসিংহ: তাহলে এখন তলোয়ার ছেড়ে কাবুলি মেওয়ার কারবার শুরু করলে হয় না, খাঁ সাহেব?
ঈসা খাঁ: কিন্তু কাবুলি মেওয়া এখানে খাবে কে? মহারাজের তো বাজরার খিচুড়ি আর ঘাসের রুটি খেয়ে খেয়ে পেট এমনি হয়েছে যে, কাবুলি আঙুরের গন্ধেই বমি আসে।
মানসিংহ: কিন্তু খাঁ সাহেব কি কেবল কথার যুদ্ধের জন্যই তৈয়ার হয়ে এসেছেন, না আরও কোনো মতলব আছে?
ঈসা খাঁ: সে সম্পূর্ণ মহারাজের অভিরুচি। ঈসা খাঁ যে কোনো সময়ে যে কোনো স্থানে যে কোনো অস্ত্রে যে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত।
মানসিংহ: মনে হচ্ছে, শাহবাজ খাঁকে পরাজিত করে ঈসা খাঁর অহংকার বেড়েছে। কিন্তু ঈসা খাঁ কেবল ঘুঘু দেখেছেন, ফাঁদ দেখেন নাই।
ঈসা খাঁ: কিন্তু ফাঁদের সঙ্গে যে এ বান্দার কিঞ্চিৎ পরিচয় ঘটেছে-এই মাত্র সেদিন-সে তো মহারাজের অজানা থাকবার কথা নয়।
মানসিংহ: সে কথা জানি, কাপুরুষ। আমার জামাতা-এক অনভিজ্ঞ তরুণ যুবক-বাগে পেয়ে তাকে তুমি হত্যা করেছ।
ঈসা খাঁ: খবরদার মানসিংহ। ঈসা খাঁকে 'কাপুরুষ' বলে কেউ কোনোদিন রেহাই পায় নাই। আর ঈসা খাঁ নিজে পর্দার আড়ালে থেকে জামাতাকে কখনও লড়াইয়ে পাঠায় নাই। কিন্তু আজ তোমাকে ক্ষমা করছি-সেই মহান যুবকের নামে, যিনি বীরের মতো যুদ্ধ করে সমর শয্যা গ্রহণ করেছেন।
মানসিংহ: ভূতের মুখে রাম নাম! কিন্তু আত্মরক্ষা করো, ঈসা খাঁ।
ঈসা খাঁ: তুমিও আত্মরক্ষা করো মানসিংহ।
[যুদ্ধ শুরু হইল লড়িতে লড়িতে ঈসা খাঁর তলোয়ারের আঘাতে মানসিংহের তলোয়ার
ভাঙিয়া পড়িয়া গেল-নিরস্ত্র মানসিংহ ভীতভাবে দাঁড়াইয়া রহিলেন।]
ঈসা খাঁ: এখন মহারাজকে রক্ষা করবে কে?
মানসিংহ: কেউ না; তুমি আমাকে হত্যা করো, ঈসা খাঁ।
ঈসা খাঁ: না, মহারাজ, সে হয় না। নিরন্ত্রের ওপর ঈসা খাঁ ওয়ার করে না।
মানসিংহ: তবে আমাকে বন্দি করো, আমি তোমার অনুগ্রহ চাই না।
ঈসা খাঁ: তাও হয় না মহারাজ। আপনার মতো
সাহসী যোদ্ধাকে বাগে পেয়ে আমি বন্দি করব না। এই নিন আমার তলোয়ার-যুদ্ধ
করুন।
[নিজ তলোয়ার মানসিংহের হাতে তুলিয়া দিয়া বাম কটি হইতে অন্য তলোয়ার খুলিয়া
দাঁড়াইলেন।]
মানসিংহ: [একটু ভাবিয়া তলোয়ার ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন। আমি লড়ব না।]
ঈসা খাঁ: কেন, মহারাজ?
মানসিংহ: আপনার সঙ্গে আমার যুদ্ধ নাই।
ঈসা খাঁ: বটে।
ঈসা খাঁ: ঈসা খাঁ, চমৎকার। দূর হতে তোমার কত নিন্দাই শুনেছি, ভাই কাছে এসেও এতদিন তোমাকে চিনতে পারি নাই। আজ তোমার সঙ্গে সত্যিকার পরিচয় হলো, এই-ই আমার পরম লাভ! তোমাকে চিনবার আগে মরলে মানসিংহের জীবনে একটা মস্ত ফাঁক থেকে যেত।
ঈসা খাঁ: মহারাজ-ভাই-তোমার হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে আমিও ধন্য।
মানসিংহ: তবে, এসো ভাই! [আলিঙ্গন] আমাদের এই আলিঙ্গনের ভিতর দিয়ে মোগল-পাঠানের বন্ধুত্ব হোক, ভারতের হিন্দু-মুসলমানের মিলন হোক আর কখনো আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির পবিত্র বক্ষ কলঙ্কিত করব না।
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের উৎস নির্দেশ: |
|---|
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের শব্দার্থ ও টীকা: |
|---|
|
➠ এগারোসিন্ধু- কিশোরগঞ্জের একটি নদী। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব: |
|---|
|
ইব্রাহীম খাঁ এই নাট্যাংশে হাজির করেছেন ঈসা খাঁ ও রাজপুত বীর মানসিংহের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও মহানুভবতার কাহিনি। বাংলার পাঠান বীর ঈসা খাঁ দ্বন্দ্বযুদ্ধে হত্যা করেন মানসিংহের বীর জামাতাকে। প্রতিশোধ নিতে মানসিংহ এগারোসিন্ধু ময়দানে ঈসা খাঁকে যুদ্ধে আহ্বান করেন। ঈসা খাঁ বীরত্বের সঙ্গে তা গ্রহণও করেন। যুদ্ধ চলাকালে হঠাৎ মানসিংহের তলোয়ার ভেঙে গেলে তিনি ভীত হয়ে পড়েন। কিন্তু ঈসা খাঁ নিরস্ত্র মানসিংহকে আঘাত না করে তাঁর হাতে অপর একটি তলোয়ার তুলে দেন। ঈসা খাঁর বীরত্ব ও ঔদার্যে মানসিংহ বিস্মিত হয়ে তলোয়ার ছুড়ে ফেলে জানান, ঈসা খাঁর সঙ্গে তাঁর কোনো যুদ্ধ নেই। তারপর দুই বীর পরস্পরের সঙ্গে আলিঙ্গনে আবদ্ধ হন। দুজনেই ভারতের মোগল-পাঠান আর হিন্দু-মুসলমানের বন্ধুত্ব ও মিলনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। নাট্যাংশটিতে মোগল-ভারত আমলের বীরত্ব, মহানুভবতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের পরিচয় ফুটে উঠেছে। প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের উদারতা ও মহানুভবতা। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের লেখক পরিচিতি: |
|---|
|
ইব্রাহীম খাঁ-র জন্ম ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে টাঙ্গাইলের এক কৃষক পরিবারে।
তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। সারা বাংলায় তিনি
প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ নামে পরিচিত। অসাধারণ অনেক ছোটোগল্প,
প্রবন্ধ, নাটক, ভ্রমণ-কাহিনি ও শিশুসাহিত্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যে
বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘কামাল পাশা‘,
‘আনোয়ার পাশা’ প্রভৃতি; নাটক: ‘আলু বোখরা’, ‘দাদুর আসর’; গল্পগ্রন্থ:
‘ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র’ ভ্রমণ-কাহিনি। বাংলা নাটকে বিশেষ অবদানের
জন্য তিনি ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ০১: |
|---|
|
ক. 'আমি প্রতিশোধ গ্রহণ করব- আমি ঈসা খাঁকে হত্যা করব- মানসিংহ
কেন এ কথা বললেন? ব্যাখ্যা করো। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ০২: |
|---|
|
ক. 'পাঠানেরা দেখছি ইদানীং কথা বলতে শিখেছে'- কথাটি ব্যাখ্যা
করো। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ০৩: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও : |
|
ক. মানসিংহের এই উক্তিটি তাঁর বিশ্বাসের পরিবর্তন এবং ঘটনার বিস্ময়কর
পরিণতির প্রতি তাঁর প্রতিক্রিয়া নির্দেশ করে। মানসিংহ শুরুতে ঈসা
খাঁর ক্ষমতা ও তলোয়ারের প্রতি তেমন শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না। তিনি ভাবতেন
যে, তিনি শক্তিশালী এবং ঈসা খাঁ কোনোভাবেই তার সমকক্ষ নয়। কিন্তু যখন
মানসিংহ দেখলেন যে, ঈসা খাঁয়ের হাতে তার জামাতা নিহত হল, তখন তার
বিশ্বব্যাপী ধারণা বদলে যায়। এই ঘটনা তাকে ভেঙে দেয়, কারণ তার
বিশ্বাস ছিল যে, রাজপুতনা ও মোগলরা শক্তিশালী, পরস্পর পরস্পরের
শত্রু, এবং সেই শত্রুদের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়। কিন্তু
জামাতার মৃত্যু মানে ছিল যে, অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
খ. ঈসা খাঁ নাটকে একটি বীর, উদার, এবং নৈতিক চরিত্র হিসেবে ফুটে
উঠেছে। তার চরিত্রের মধ্যে শক্তি, সাহস, মানবিকতা এবং সম্মান একসাথে
মিশে রয়েছে। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ০৪: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও : |
|
ক. এই উক্তিটি মানসিংহ বলেছেন। তিনি এই কথা বলেছেন কারণ ঈসা খাঁর হাতে তার জামাতা নিহত হওয়ার ঘটনা তার কাছে অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং অপমানজনক ছিল। মানসিংহ, যিনি রাজপুত সমাজের অংশ, তার জন্য এ ধরনের ঘটনা ছিল পরিবার এবং তার নিজের সম্মানের জন্য একটা বড় ধাক্কা। জামাতা একজন দক্ষ এবং সাহসী যোদ্ধা ছিল, কিন্তু তার মৃত্যু যেভাবে ঘটল, তাতে মানসিংহের ব্যক্তিগত সম্মান ও রাজপুত পরিবারের সম্মান ক্ষুণœ হয়েছিল। মানসিংহের ভয় ছিল যে, এই ঘটনা জানার পর রাজপুতনার নারীরা হাসবে এবং শত্রুরা তাদের দুর্বলতা ও পরাজয়কে উপহাস করবে। এর ফলে রাজপুতদের কাছে তিনি এক ধরনের অবমাননা বোধ করেছিলেন, যা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। রাজপুত পরিবারের মর্যাদার কারণে মানসিংহের মনে হচ্ছিল যে, তার জামাতার মৃত্যুর কাহিনী হয়তো রাজপুতদের কাছে একটি হাস্যকর বিষয় হয়ে দাঁড়াবে, যা তার নিজের পক্ষে খুব অপমানজনক হবে।
খ. নাটকের শেষে মানসিংহ ও ঈসা খাঁর মধ্যে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক
গড়ে ওঠে, তা মানবিক সম্পর্কের একটি অনন্য উদাহরণ। তারা প্রথমে
পরস্পরের শত্রু ছিলেন, এবং তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। তবে যুদ্ধের
ময়দানে একে অপরের সম্মান প্রদর্শন এবং সাহসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে
তারা একে অপরের প্রতি গভীর সম্মান এবং মানবিকতা প্রদর্শন করেন।
মানসিংহ যখন ঈসা খাঁকে “কাপুরুষ” বলে তিরস্কার করেছিলেন, তখন ঈসা খাঁ
তাকে সম্মান দিয়ে খোলামনে উত্তর দিয়েছিলেন, এবং পরে মানসিংহকে শত্রু
হিসেবে বিবেচনা না করে, বরং তার প্রশংসা করেন। তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব
গড়ে ওঠে, যখন তারা একে অপরকে বিশ্বস্ত ভাইয়ের মতো আলিঙ্গন করেন, যা
প্রমাণ করে যে, শক্তি ও শত্রুতা চিরস্থায়ী নয়, এবং সবচেয়ে বড় শক্তি
হলো মানুষের মধ্যে একে অপরের প্রতি মর্যাদা, উদারতা ও শ্রদ্ধা। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ০৫: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও : |
|
ক. ঈসা খাঁ ‘বহুত আচ্ছা’ এই দুটি শব্দের মাধ্যমে তার চরিত্রের একটি
গভীর এবং বেশ বৈশিষ্ট্যমূলক দিক প্রকাশ করেছেন। যখন তিনি মানসিংহের
দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান গ্রহণের পর এই শব্দ দুটি বলেন, তখন তিনি আসলে
তার অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী, সোজাসাপ্টা এবং কিছুটা বিদ্রুপপূর্ণ
মনোভাব প্রকাশ করছেন। ঈসা খাঁ এই কথাটি বলেছেন যেন তার শত্রুর প্রতি
তার পূর্ণ আত্মবিশ্বাস এবং নির্ভীকতা প্রকাশ পায়। "বহুত আচ্ছা" বলার
মাধ্যমে ঈসা খাঁ এক ধরনের রসিকতা, ঠাট্টা এবং উদাসীনতা প্রকাশ
করেছেন, যা দেখায় যে, তিনি তার শত্রু মানসিংহের প্রতি মোটেও ভয়
পাচ্ছেন না। তিনি মনে করছেন, দ্বন্দ্বযুদ্ধের ফলাফল তার পক্ষে হবে,
তাই তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই এ কথা বলেছেন। এই কথার মধ্যে ঈসা খাঁর
বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস, সাহসিকতা এবং ঠাট্টা তার চরিত্রের একটি
গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে ফুটে ওঠে।
খ. ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও, এর
শিক্ষা এবং বার্তা আজকের সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নাটকের
প্রধান থিম-শত্রুতা, প্রতিশোধ, এবং মানবিক সম্পর্কের পরিবর্তন—এখনও
সমাজে বিদ্যমান অনেক দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ এবং সামাজিক বিভেদের চিত্রকে
প্রতিফলিত করে। নাটকটির মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে প্রতিশোধের
আগুনে পুড়ে গিয়ে মানুষ একে অপরের প্রতি হিংস্র হতে পারে, কিন্তু
শেষমেশ মানবিক সম্পর্কের উন্নতির মাধ্যমে শত্রুতাকে শান্তিতে পরিণত
করা সম্ভব। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ০৬: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও : |
|
ক. নাটকে দেখা যায়, মানসিংহ শুরুতে ঈসা খাঁকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন
এবং তাকে ছোটখাটো পাঠান নেতা বলে মনে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে
একজন রাজপুত যোদ্ধার পক্ষে ঈসা খাঁকে পরাজিত করা খুব সহজ হবে। কিন্তু
যুদ্ধের ময়দানে ঈসা খাঁর অসাধারণ বীরত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং
ন্যায়পরায়ণতা দেখে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।
খ. ঈসা খাঁ কেবল একজন দক্ষ ও বীর যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন
মহৎ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি কৌশল, শক্তি ও মহানুভবতার সমন্বয়ে
মানসিংহের মন জয় করেন। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ০৭: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও : |
|
ক. “অনেকে ভাববে, আমরা কাপুরুষ।” কথাটি বলেছেন মহারাজ মানসিংহ। তিনি
এটি বলেছেন তার জামাতার মৃত্যুর পর, যখন তিনি অনুভব করেন যে তার
সিদ্ধান্তের কারণে রাজপুত যোদ্ধাদের মানহানি হতে পারে।
খ. নাটক ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’-এর প্রথম অংশে মূলত মোগল সেনাপতি
মানসিংহ এবং বাংলার স্বাধীনচেতা পাঠান নেতা ঈসা খাঁর মধ্যকার
দ্বন্দ্ব, আত্মমর্যাদা রক্ষা, প্রতিশোধস্পৃহা এবং বীরত্বের
প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এই অংশে দেখানো হয়েছে, কীভাবে রাজনৈতিক ও
ব্যক্তিগত কারণে দুই শক্তিশালী যোদ্ধার মধ্যে সংঘর্ষের আবহ সৃষ্টি
হয়। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ০৮: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও : |
|
ক. ‘আগে পাঠানেরা কথা বলত না, কথা বলত কেবল তাদের তির আর তলোয়ার।’
কথাটি ঈসা খাঁ বলেছেন। তিনি এই কথা বলেছেন মানসিংহের সঙ্গে কথোপকথনের
সময়, যেখানে তারা নিজেদের শক্তি, ইতিহাস এবং বীরত্ব নিয়ে পরস্পরকে
খোঁচা দিচ্ছিলেন।
খ. ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকটি মূলত বাংলা অঞ্চলের স্বাধীনতা রক্ষার
সংগ্রাম, বীরত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চিত্র
তুলে ধরে। এই নাটকের মূল উপজীব্য হলো শক্তির সংঘর্ষ, আত্মসম্মান
রক্ষা, বীরত্বের পরীক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও
বন্ধুত্বের প্রতিষ্ঠা। এটি শুধু দুটি বীরের যুদ্ধ নয়, বরং একটি
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক ও নৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। |
| ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ০৯: |
|---|
|
নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও : |
|
ক. ‘নিরস্ত্রের ওপর ঈসা খাঁ ওয়ার করে না।’—এই কথাটি বলেছেন ঈসা খাঁ।
তিনি এই কথা বলেন তখন, যখন যুদ্ধের একপর্যায়ে ঈসা খাঁর আঘাতে
মানসিংহের তলোয়ার ভেঙে পড়ে এবং তিনি নিরস্ত্র হয়ে যান। সেই মুহূর্তে
মানসিংহ বুঝতে পারেন যে, তিনি আর আত্মরক্ষা করতে পারবেন না, তাই ঈসা
খাঁকে তাকে হত্যা করতে বলেন। কিন্তু ঈসা খাঁ তা করেন না।
খ. ‘মানসিংহ ও ঈসা খাঁ’ নাটকটি কেবলমাত্র যুদ্ধের কাহিনি নয়, এটি
উদারতা, নৈতিকতা এবং মহানুভবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নাটকের প্রধান
দুই চরিত্র-মানসিংহ ও ঈসা খাঁ-প্রথমে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও শেষে একে
অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন এবং পরস্পরের গুণাবলি উপলব্ধি করেন। |
| তথ্যসূত্র: |
|---|
|
১. আনন্দপাঠ: অষ্টম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড,
ঢাকা, ২০২৬। ২. ৩. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮। ৪. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫। |
