তিরন্দাজ

 তিরন্দাজ
তিরন্দাজ

তিরন্দাজ
যোগীন্দ্রনাথ সরকার

সেকালে দিল্লির কাছে হস্তিনা নামে এক নগর ছিল। শান্তনু সেই হস্তিনায় রাজত্ব করিতেন। একদিন শান্তনু যমুনার তীরে বেড়াইতে গিয়া অপরূপ সুন্দরী একটি কন্যা দেখিতে পাইলেন। এই কন্যার নাম সত্যবতী। শিশুকাল হইতে এক ধীবর তাঁহাকে পালন করিয়াছিল। রাজা ধীবরের কাছে গিয়া তাঁহার পালিত কন্যাটিকে বিবাহ করিতে চাহিলেন।

ধীবর বলিল, ‘মহারাজ, আপনার দেবব্রতের মতো সোনার চাঁদ ছেলে থাকিতে সত্যবতীর ছেলের রাজ্য পাইবার কোনোই সম্ভাবনা নাই, কাজেই এই বিবাহে আমি মত দিতে পারি না।’ দেবব্রত একদিন ধীবরের কাছে গিয়া বলিলেন, ‘আমার পিতার সহিত আপনার কন্যার বিবাহ দিন। ভবিষ্যতে তাঁহার পুত্রই রাজা হইবেন। প্রতিজ্ঞা করিতেছি, আমি কখনো সিংহাসন দাবি করিব না।’

ধীবর বলিল, ‘কুমার, এ প্রতিজ্ঞা আপনারই যোগ্য বটে; কিন্তু সিংহাসন লইয়া পরে আপনার পুত্রেরা যে গোলযোগ করিবেন না, তাহার নিশ্চয়তা কী?’ তখন দেব্রত বলিলেন, ‘আচ্ছা, আবার প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আমি বিবাহও করিব না।’ দেবব্রতের এই ভীষণ প্রতিজ্ঞার জন্য তাঁহার নাম হইল ভীষ্ম।

মহাসমারোহে রাজা শান্তনু ও সত্যবতীর বিবাহ হইয়া গেল। তারপর যথাক্রমে তাঁহাদের চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য নামে দুই পুত্র হইল। ভীষ্ম রাজ্যের সকল অধিকার ত্যাগ করিয়াও রাজকার্যের সমস্ত ভার আনন্দের সহিত বহন করিতে লাগিলেন। বিচিত্রবীর্য বড়ো হইলে অম্বিকা ও অম্বালিকার সহিত তাঁহার বিবাহ হয়। কালক্রমে এই দুই কন্যার দুইটি পুত্র হইল। অম্বিকার পুত্রের নাম হইল ধৃতরাষ্ট্র, তিনি ছিলেন জন্মান্ধ। আর অম্বালিকার পুত্রের নাম পাণ্ডু।

অন্ধ ছিলেন বলে ধৃতরাষ্ট্র পিতার মৃত্যুর পর রাজা হইতে পারিলেন না। দেশের লোক পাণ্ডুকেই সিংহাসনে বসাইল। ইহাতে ধৃতরাষ্ট্র খুবই দুঃখিত হইলেন। পাণ্ডুর বড়ো ছেলের নাম যুধিষ্ঠির। ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব নামে তাঁহার আরও চারি পুত্র ছিলেন। ধৃতরাষ্ট্রের দুর্যোধন, দুঃশাসন প্রভৃতি একশত ছেলে আর দুঃশলা নামে একটি মেয়ে ছিল। পাণ্ডু কুরুবংশের রাজা হইলেও তাঁহার ছেলেগুলিকে লোকে ‘পাণ্ডব’ বলিত আর ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেদের বলিত ‘কৌরব’।

বড়ো হইলে যুধিষ্ঠির হস্তিনার সিংহাসনে বসিবেন, এ দুঃখ কি আর দুর্যোধন প্রভৃতির সহ্য হয়! ছেলেবেলা হইতেই পাণ্ডবদের প্রতি হিংসায় তাহাদের বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। এদিকে পাণ্ডুর ছেলেদের সরল মিষ্ট ব্যবহারে সকলেই সুখী হইত। কিন্তু পাণ্ডবদের সুখের দিন দেখিতে দেখিতে ফুরাইয়া গেল। অতি শিশুকালেই তাহারা পিতৃহীন হইলেন। তখন যুধিষ্ঠির, ভীম প্রভৃতি পাঁচ ভাই ধৃতরাষ্ট্রের একশত ছেলের সহিত একসঙ্গে বাস করিতে লাগিলেন। দুর্যোধন প্রভৃতির অন্তর যে কত কুটিল, পাণ্ডবেরা তাহা বেশ বুঝিতে পারিয়াছিলেন এবং সেই জন্য তাঁহারা বিশেষ সতর্ক হইয়া চলিতে লাগিলেন।

ক্ষত্রিয়ের ছেলেরা শাস্ত্রপাঠের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধবিদ্যাও শিখিতে আরম্ভ করে। রাজকুমারগণ কৃপাচার্য নামে একজন শিক্ষকের নিকট ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা করিতেন। ভীষ্মের কিন্তু বরাবর এই ইচ্ছা যে, ভরদ্বাজ মুনির পুত্র সুবিখ্যাত দ্রোণাচার্যের ওপর ছেলেদের অস্ত্রশিক্ষার ভার দেন।

ঘটনাক্রমে একদিন দ্রোণ নিজেই হস্তিনায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

শহরের বাহিরে পৌঁছিয়াই দ্রোণ দেখিলেন, রাজবাড়ির ছেলেরা উৎসাহের সহিত একটা লোহার গোলা লইয়া খেলা করিতেছে। খেলিতে খেলিতে গোলাটা হঠাৎ এক কুয়ার মধ্যে পড়িয়া গেল। তখন সকলেই উহা উঠাইয়া আনিবার চেষ্টা করিতে লাগিল বটে, কিন্তু কেহই কৃতকার্য হইল না। আচার্য এই ব্যাপার দেখিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলেন, ‘ছি ছি! ক্ষত্রিয়ের ছেলে হইয়া তোমরা এই সামান্য কাজটা পারিলে না! এই দেখ, আমি গোলা তুলিয়া দিতেছি’-এই বলিয়া তিনি একটা শর লইয়া ওই গোলাতে বিদ্ধ করিলেন। তারপর শরের পেছনে শর, তার পেছনে আর একটা শর-পরে পরে এইভাবে বিদ্ধ করিয়া শেষের শরটি ধরিয়া অক্লেশেই গোলা টানিয়া তুলিলেন। গোলা উঠান হইলে ব্রাহ্মণ কুয়ার মধ্যে নিজের আংটি ফেলিয়া তাহাও ওইরূপ কৌশলে উঠাইয়া আনিলেন। ব্যাপার দেখিয়া সকলে তো অবাক!

দেখিতে দেখিতে এ খবর চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। ব্রাহ্মণের আশ্চর্য শক্তির কথা শুনিয়া ভীষ্মের বুঝিতে বাকি রহিল না যে, স্বয়ং দ্রোণাচার্য আসিয়াছেন। কেননা, এ কাজ আর কাহারও দ্বারা সম্ভব হইতে পারে না। তিনি মনে মনে এতদিন যাহা চাহিতেছিলেন, তাহাই হইল-দ্রোণ নিজেই আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

ইহার পর আচার্যকে যথেষ্ট আদর-অভ্যর্থনা করিয়া লইয়া ভীষ্ম তাঁহার ওপর ছেলেদের অস্ত্রশিক্ষার ভার দিলেন। এরূপ আদর-যত্ন এবং হঠাৎ এতগুলি শিষ্য পাইয়া দ্রোণের তখন কী আনন্দ! তিনি বলিলেন, ‘বৎসগণ, আমি তোমাদিগকে এমন করিয়া যুদ্ধবিদ্যা শিখাইব যে লোকের তাক লাগিয়া যাইবে। শেষে কিন্তু আমার একটি কাজ করিয়া দিতে হইবে।’

আচার্যের কথা শুনিয়া আর সকলেই চুপ করিয়া রহিলেন। কেবল অর্জুন বলিলেন, ‘বলুন কী করতে হবে? আপনার আদেশ কখনও অমান্য করিব না।’

অর্জুনের কথায় প্রীত হইয়া দ্রোণ তাঁহাকে বুকে টানিয়া লইয়া আদর করিলেন। তারপর চোখের জল মুছিতে মুছিতে বলিলেন, ‘সে কথা পরে বলিব।’ সেইদিন হইতে আচার্য অর্জুনকে ঠিক নিজের ছেলের মতো ভালোবাসিতে লাগিলেন।

যথারীতি ছেলেদের অস্ত্রশিক্ষা আরম্ভ হইল। রাজকুমারদের সহিত আর যাহারা দ্রোণের নিকট শিক্ষা পাইত, তাহাদের মধ্যে কর্ণই প্রধান। এই কর্ণকে লোকে অধিরথ সারথির ছেলে বলিয়া জানিত। কিন্তু বাস্তবিক সে যুধিষ্ঠিরের সহোদর-কুন্তীর জ্যেষ্ঠপুত্র। কর্ণের জন্মের পর কুন্তী তাহাকে পরিত্যাগ করেন। কুন্তী যে কর্ণের মা, এ কথা আর কেহই জানিত না। কর্ণ নিজেও এ কথা অনেককাল পর্যন্ত জানিতে পারে নাই।

দ্রোণের শিক্ষাগুণে কয়েক মাসের মধ্যে সকলেরই খুব উন্নতি হইল। ধনুর্বিদ্যায় অর্জুন একজন অদ্বিতীয় বীর হইয়া উঠিলেন। গদায় দুর্যোধন ও ভীম এবং খড়গে নকুল ও সহদেব খুব নাম কিনিলেন। আচার্যের মুখে অর্জুনের প্রশংসা আর ধরে না। তিনি মনে করিলেন, ‘এই প্রিয় শিষ্যটিকে এমন-সকল কৌশল শিখাইব যে, পৃথিবীতে কেহই যেন ইহার সহিত আঁটিয়া উঠিতে না পারে।’ আর সত্যই, কাজেও তিনি তাহা করিলেন।

অর্জুনের আদর দেখিয়া হিংসায় দুর্যোধন আর বাঁচে না। কর্ণ বরাবরই অর্জুনকে ঘৃণা করিত। এখন হইতে সেও দুর্যোধনের দলে যোগ দিয়া কথায় কথায় পাণ্ডবদের অপমান করিতে লাগিল।

এই সময় একদিন দ্রোণ কুমারগণের পরীক্ষার জন্য একটি নীলরঙের পাখি প্রস্তুত করিয়া গাছের ডালে বসাইয়া দিলেন। তারপর সকলকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ওই যে পাখিটি দেখিতেছ, উহার মাথা লক্ষ্য করিয়া তির ছুড়িতে হইবে। মাথাটি কাটিয়া ফেলিতে পারিলে বুঝিব আমার পরিশ্রম সার্থক হইয়াছে।’

এ কথায় চারিদিকেই উৎসাহের স্রোত বহিতে লাগিল। ক্রমে রাজকুমারগণ তির-ধনুক লইয়া প্রস্তুত হইলেন। তখন দ্রোণ যুধিষ্ঠিরকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘বল দেখি তুমি কী দেখিতেছ?’ যুধিষ্ঠির বলিলেন, ‘একটা পাখি দেখিতেছি।’ দ্রোণ পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আর কী দেখিতেছ?’ যুধিষ্ঠির বলিলেন, 'গাছের ডালপালা সবই দেখিতেছি, আপনাদের সকলকেও দেখিতেছি।’

এরূপ উত্তরে দ্রোণ সন্তুষ্ট হইতে পারিলেন না; বলিলেন, ‘না বাপু, এখনও তোমার নজরই ঠিক হয় নাই।’

ইহার পর তিনি এক-এক করিয়া প্রায় সকলকেই ডাকিলেন, কিন্তু কেহই তাঁহার মনের মতো উত্তর দিতে পারিল না। শেষে অর্জুনকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি বলো দেখি কী দেখিতেছ?' অর্জুন বলিলেন, 'আমি শুধু পাখির মাথা দেখিতেছি, আর কিছুই না।’ এইবার দ্রোণের মুখ প্রফুল্ল হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন, ‘আচ্ছা, মাথাটি কাট দেখি।’ আচার্যের মুখের কথা না-ফুরাইতেই অর্জুনের বাণে পাখির কাটা-মাথা মাটিতে লুটাইয়া পড়িল।

আর একদিন দ্রোণকে কুমিরে ধরিয়াছিল। তিনি ইচ্ছা করিলেই কুমিরকে মারিতে পারিতেন, কিন্তু তাহা না-করিয়া যেন মহাবিপদেই পড়িয়াছেন, এইরূপ ভান করিয়া চিৎকার করিতে লাগিলেন। কুমারেরা ভয়ে একেবারে জড়সড়, কিন্তু অর্জুনের মনে ভয়ের লেশমাত্র নেই। তিনি তখনই কয়েকটা বাণ মারিয়া কুমিরকে খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিলেন।

ইহাতে দ্রোণ যে কীরূপ সন্তুষ্ট হইলেন, তাহা আর কী বলিব! তিনি অর্জুনকে আশীর্বাদ করিয়া ‘ব্রহ্মশিরা’ নামে এক অস্ত্র পুরস্কার দিলেন। সে অতি ভয়ানক অস্ত্র। তাহার তেজে স্বর্গ-মর্ত্য কাঁপিয়া ওঠে। মানুষের ওপর সে অস্ত্র ছাড়িতে আচার্য কিন্তু অর্জুনকে নিষেধ করিয়া দিলেন।

ইহার পর আরও কিছুদিন চলিয়া গেল। ক্রমে সকলেই এক-একজন বীর হইয়া উঠিলেন। এইবার দশজনের সাক্ষাতে কুমারদের রণকৌশল প্রদর্শনের সময় উপস্থিত। দ্রোণের পরামর্শে অন্ধরাজ প্রকাণ্ড এক রঙ্গভূমি প্রস্তুত করাইলেন। উহার মাঝখানে খেলিবার স্থান এবং চারিদিকে রাজা-রাজড়া ও বড়ো বড়ো বীরদিগের বসিবার জন্য সুন্দর সুন্দর মঞ্চ। মহিলাগণের জন্য স্বতন্ত্র আসন। বিচিত্র পত্র-পুষ্পে, নিশান-ঝালরে সমুদয় রঙ্গভূমি ঝলমল করিতে লাগিল।

আগেই দেশে দেশে ঢোল পিটাইয়া এ সংবাদ ঘোষণা করা হইয়াছিল। পরীক্ষার দিন রঙ্গভূমি একেবারে লোকে লোকারণ্য। তাহাদের কোলাহলে ও বাদ্যের শব্দে সারা দেশ মাতিয়া উঠিল।

যথাসময়ে ধৃতরাষ্ট্র এবং ভীষ্ম, কূপ, বিদুর প্রমুখ সভায় প্রবেশ করিলেন। তারপর মান্য ব্যক্তিগণের অভ্যর্থনা চলিতে লাগিল। ক্রমে মহিলাগণ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। শেষে দেশ-বিদেশের ছোটো-বড়ো কেহই আর আসিতে বাকি থাকিল না। সকলে আপন আপন আসন গ্রহণ করিলে, আচার্য দ্রোণ শ্বেতবসনভূষণে সজ্জিত হইয়া রঙ্গভূমিতে প্রবেশ করিলেন।

কুমারগণ সারি বাঁধিয়া দলে দলে দেখা দিতে লাগিলেন। তাঁহাদের সাজসজ্জা আর অস্ত্রের চাকচিক্যে চারিদিকে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। জয়ধ্বনি ও বাদ্য-কোলাহল থামিলে দুর্যোধন আর ভীম গদাহস্তে অগ্রসর হইলেন। তাঁহাদের চালচলন ও যুদ্ধের কৌশল কী সুন্দর! কিন্তু কিছুক্ষণ খেলিতে খেলিতে উভয়ে এমন উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন যে, দ্রোণাচার্য ভয় পাইয়া তাঁহাদিগকে থামাইয়া দিতে বাধ্য হইলেন।

গদা-খেলার পর কুমারগণ দুই দলে বিভক্ত হইয়া নকল যুদ্ধের অভিনয় দেখাইয়া সকলকে চমৎকৃত করিলেন।

শেষে আসিলেন অর্জুন। যেমন বীরের ন্যায় চেহারা, তেমনি তাঁহার হাতের কায়দা। তিনি অগ্নিবাণে চারিদিকে আগুন জ্বালাইয়া, বরুবাণে তখনই আবার তাহা নিভাইয়া ফেলিলেন; এক বাণে আকাশে বায়ু ও মেঘের সৃষ্টি করিলেন, এক বাণে বিশাল পর্বত গড়িলেন, এক বাণে নিজেই ভূমিতে প্রবেশ করিয়া পর-মুহূর্তেই আবার বাহিরে আসিলেন। তাঁহার বাণে কখনও রৌদ্র, কখনও মেঘ, কখনও বৃষ্টি-যেন বাজিকরের ভেলকি! লোকের চোখে ধাঁধা লাগিয়া গেল। শেষে অর্জুন এক বাণে আপনাকে এমন করিয়া লুকাইলেন যে, কেহ আর তাহাকে দেখিতে পাইল না। আশ্চর্য শিক্ষা!

অর্জুনের জয়ধ্বনিতে চারিদিক ভরিয়া উঠিল।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের উৎস নির্দেশ:
‘তিরন্দাজ’ গল্পাংশটি ছোটোদের জন্য লেখা মহাভারতের ‘আদিপর্ব’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

‘তিরন্দাজ’ গল্পের শব্দার্থ ও টীকা:
➠ তিরন্দাজ- তির ছুড়ে যে।
➠ দ্রোণাচার্য- মহাভারতের কুরুবংশের গুরু বা শিক্ষক। ইনি অস্ত্রশিক্ষা দিতেন। অন্যনাম, দ্রোণ।
➠ অস্ত্রশিক্ষা- অস্ত্র চালানোর বিদ্যা বা জ্ঞান।
➠ ক্ষত্রিয়- জাতি বিশেষ। হিন্দু বর্ণভেদ অনুযায়ী চার বর্ণের দ্বিতীয় বর্ণ বা জাতি।
➠ ধনুর্বিদ্যা- ধনুক চালানোর বিদ্যা বা জ্ঞান।
➠ আঁটিয়া- পেরে ওঠা।
➠ মুনি- ঋষি। যারা ধ্যানে মগ্ন থাকেন।
➠ হস্তিনা- কৌরবদের রাজধানী।
➠ গোলা- লোহা দিয়ে বানানো গোল আকৃতির এক ধরনের অস্ত্র। কামান বা বন্দুক থেকে তা নিক্ষেপ করা হয়।
➠ ভীষ্ম- মহাভারতের কৌরব ও পাণ্ডবদের পিতামহ বা দাদা।
➠ আচার্য- শিক্ষক। যিনি শাস্ত্র অনুযায়ী শিক্ষা দেন।
➠ সারথি- রথচালক।
➠ কুন্তী- পাণ্ডবদের মা।
➠ গদা- এক ধরনের অস্ত্র। শক্ত ও মোটা লাঠি, মুগুর।
➠ খড়ুগ- কাটা যায় এমন ভারি ও ধারালো শস্ত্র; খাঁড়া।
➠ বাণ- ধনুক থেকে ছোড়ার এক ধরনের অস্ত্র। তির, শর।
➠ রঙ্গভূমি- অভিনয়ক্ষেত্র, মঞ্চ।
➠ লোকারণ্য- লোকে ভরপুর। প্রচুর লোকসমাগম হয় যেখানে।
➠ শ্বেতবসনভূষণ- সাদা রঙের পোশাকে সজ্জিত।
➠ কূপ- কুরুপাণ্ডবদের শিক্ষাগুরু। অন্য নাম কৃপাচার্য।
➠ বিদুর- মহাভারতের রাজা ধৃতরাষ্ট্রের ভাই।
➠ বরুণবাণ- এক ধরনের অস্ত্র। পানি দিয়ে তৈরি অস্ত্র।
➠ বাজিকর- জাদুকর।

‘তিরন্দাজ’ গল্পের পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব:
‘তিরন্দাজ’ গল্পের মূল বিষয় পাণ্ডু ও কুরুর সন্তানদের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সম্পর্ক এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা প্রদর্শন। অস্ত্রবিদ্যার গুরু দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুর এলে ভীষ্ম তাঁকে রাজকুমারদের শিক্ষক হিসেবে সাদরে গ্রহণ করেন। দ্রোণাচার্যও ততোধিক স্নেহ ও সযত্নে কুমারদের যুদ্ধবিদ্যা শেখালেন। রাজকুমার অর্জুন তার কাছে সর্বাধিক প্রিয় হয়ে ওঠেন। এতে কর্ণ ও দুর্যোধনরা পাণ্ডবদের প্রতি রুষ্ট হন। অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে অর্জুনের পারদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে আশীর্বাদ হিসেবে দ্রোণাচার্য তাঁকে ‘ব্রহ্মশিরা’‘অস্ত্র পুরস্কার দেন। এক পর্যায়ে প্রকাশ্যে রণক্ষেত্রে রাজকুমারদের রণকৌশল প্রদর্শনী হলে সবাই যুদ্ধবিদ্যা দেখিয়ে সকলকে মুগ্ধ করেন। অর্জুনের রণকৌশল সর্বাধিক প্রশংসিত হয়। আগ্রহ, চর্চা, নিষ্ঠা ও গুরুভক্তি মানুষকে যেকোনো কঠিন কাজে যে পারদর্শী করে তুলতে পারে, এখানে তা-ই ফুটে উঠেছে।

‘তিরন্দাজ’ গল্পের লেখক পরিচিতি:
যোগীন্দ্রনাথ সরকার ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পেশায় ছিলেন শিক্ষক ও প্রকাশক, কিন্তু শিশুসাহিত্য রচনা ছিল তাঁর সারা জীবনের লক্ষ্য। তরুণ বয়সেই ‘সখা’, ‘সখী’, ‘মুকুল’, ‘বালকবন্ধু’, ‘বালক’ প্রভৃতি শিশুপত্রিকায় লিখে খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর উদ্ভট বিষয়বস্তুর ছড়াগুলো ছোটোদের আনন্দের জন্য অসাধারণ সৃষ্টি। তাঁর রচিত সচিত্র ‘হাসি ও খেলা’ বইটি বাংলায় প্রথম শিশুতোষ বই। যোগীন্দ্রনাথের অপর উল্লেখযোগ্য রচনা হচ্ছে ‘খুকুমণির ছড়া’, ‘ছবি ও গল্প’, ‘রাঙা ছবি’, ‘হাসিখুশি’, ‘হাসিরাশি’, ‘বনে জঙ্গলে’, ‘পশুপক্ষী’ ‘ছোটোদের মহাভারত’ প্রভৃতি।
যোগীন্দ্রনাথ সরকার ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ১:

১। ক. ‘পাণ্ডবদের সুখের দিন দেখিতে দেখিতে ফুরাইয়া গেল কেন?’ ব্যাখ্যা করো।
খ. আগ্রহ, চর্চা, নিষ্ঠা ও গুরুভক্তি মানুষকে যেকোনো কাজে পারদর্শী করে তোলে- মন্তব্যটি ‘তিরন্দাজ’ গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২:

২। ক. ভীষ্ম কীভাবে বুঝতে পারলেন স্বয়ং দ্রেণাচার্থ এসেছেন? বুঝিয়ে লেখো।
খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পের শিরোনাম ‘তিরন্দাজ’ রাখাটা কতটা সার্থক হয়েছে বলে মনে করো? উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- :

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. দ্রোণাচার্য অর্জুনের জন্য কীভাবে বিশেষ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করেছিলেন? তার প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পের আলোকে অর্জুনের মধ্যে দ্রোণাচার্যের শিক্ষার প্রতি একনিষ্ঠতার পরিচয় কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে?

ক. দ্রোণাচার্য অর্জুনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করেছিলেন, যা ছিল অত্যন্ত লক্ষ্যভেদী এবং কঠোর। তিনি অর্জুনকে ধনুর্বিদ্যার সবচেয়ে নিখুঁত এবং অদ্বিতীয় কৌশল শিখানোর জন্য নিজে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত ছিলেন। দ্রোণাচার্যের উদ্দেশ্য ছিল, অর্জুনকে এমন এক তীরন্দাজ বানানো, যে তার মতো তীরন্দাজ আর কেউ হবে না। তিনি অর্জুনকে এমন প্রশিক্ষণ দেন, যা সাধারণত কেউ নিতে পারবে না-বিশেষভাবে তিনি অর্জুনের উপর মনোযোগ দেন এবং তাঁর মধ্যে এমন একটি বিশেষ দক্ষতা তৈরি করেন, যাতে অর্জুন একদিন পৃথিবীজুড়ে এক অদ্বিতীয় বীর হিসেবে পরিচিতি পাবে। দ্রোণাচার্যের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অর্জুনকে এক দক্ষ যোদ্ধা হিসেবে তৈরি করা, যে যুদ্ধের মাঠে অপ্রতিহত এবং নিখুঁত হবে। তিনি অর্জুনের মধ্যে তীর-ধনুকের ক্ষেত্রে এক বিশাল দক্ষতা এবং তার নিজস্ব কৌশল প্রয়োগের ক্ষমতা তৈরি করার জন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি।

খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পে অর্জুনের মধ্যে দ্রোণাচার্যের শিক্ষার প্রতি একনিষ্ঠতার পরিচয় সবচেয়ে ভালভাবে প্রতিফলিত হয় তাঁর মনোযোগ, ধৈর্য এবং শৃঙ্খলায়। যখন দ্রোণাচার্য পাখির মাথাকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করেন, তখন তিনি রাজকুমারদের প্রত্যেককে পাখির মাথার দিকে তীর ছোঁড়ার চ্যালেঞ্জ দেন। কিন্তু অন্যরা গাছের ডালপালা, পাখি এবং পরিবেশের অন্যান্য দিকের দিকে তাকিয়ে তাদের উত্তর দেন। তাদের চোখের সামনে যে কিছু অবশিষ্ট ছিল, তা তাদের অসাবধানতা এবং অসতর্কতার পরিচয় দেয়।
কিন্তু অর্জুন, যিনি শিষ্য হিসেবে তাঁর গুরু দ্রোণাচার্যের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস রাখতেন, শুধু পাখির মাথাই দেখেছিলেন এবং সব কিছু ভুলে গিয়ে সেই একটিই লক্ষ্যবস্তু নিয়েই মনোযোগী হন। তাঁর উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু পাখির মাথা দেখিতেছি, আর কিছুই না।’ এটি ছিল দ্রোণাচার্যের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠ শ্রদ্ধা এবং শৃঙ্খলা অনুসরণের ফলস্বরূপ।
এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো-অর্জুনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রতি তাঁর একাগ্রতা। তিনি কোনো কিছু না দেখে শুধুমাত্র গুরুর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছিলেন। তাঁর মধ্যে সেই পরিশ্রম, সময় ও একনিষ্ঠতা ছিল, যা প্রতিটি শিষ্যের মধ্যেই থাকা উচিত যখন সে কোন গুরু-শিক্ষা গ্রহণ করে।
এছাড়া, অর্জুনের এই মনোযোগ এবং নিষ্ঠা পরবর্তীতে তাঁর দক্ষতায় পরিণত হয় এবং দ্রোণাচার্যও তাঁর প্রিয় শিষ্যকে প্রশংসিত করেন। এই একনিষ্ঠতা অর্জুনকে শুধু তীরন্দাজির ক্ষেত্রে নয়, পুরো জীবনেই অদ্বিতীয় করে তোলে।/p>


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- :

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. অর্জুনের তীরন্দাজির দক্ষতার প্রশংসা কারা করেছিলেন এবং কেন?
খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পের মাধ্যমে অর্জুনের একাগ্রতা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব কীভাবে ফুটে ওঠে?

ক. অর্জুনের তীরন্দাজির দক্ষতার প্রশংসা প্রথমে তাঁর শিক্ষক দ্রোণাচার্য করেছিলেন। দ্রোণাচার্য তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্জুনের প্রতিভা এবং দক্ষতা উপলব্ধি করে, কারণ তিনি তাঁর শিক্ষার মাধ্যমে অর্জুনকে এমন দক্ষতা অর্জন করতে সাহায্য করেছিলেন যা অন্যান্যদের কাছে ছিল না। যখন দ্রোণাচার্য রাজকুমারদের পরীক্ষা নিতে পাখির মাথায় তীর ছোঁড়ার চ্যালেঞ্জ দেন, তখন অর্জুন একমাত্র শিষ্য হিসেবে শুধুমাত্র পাখির মাথা লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে সক্ষম হন।
এ ছাড়া, অর্জুনের তীরন্দাজির দক্ষতা পরে আরও অনেক বীর এবং সমরবিদ বিশেষ করে রাজা, বিদুর, ভীষ্ম এবং কৃপাচার্য থেকেও প্রশংসিত হয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল, অর্জুনের তীরন্দাজি ছিল অসাধারণ এবং তাঁকে একজন অদ্বিতীয় বীর হিসেবে দেখা হতো, যিনি যুদ্ধের ময়দানে সঠিক লক্ষ্যবস্তুতে তীর ছুঁড়তে পারতেন। তাঁর দক্ষতা শুধু যুদ্ধের ক্ষেত্রে নয়, কৌশল এবং একাগ্রতা নিয়েও প্রশংসিত হয়েছিল।

খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পের মধ্যে অর্জুনের একাগ্রতা এবং শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্বকভাবে ফুটে উঠেছে। দ্রোণাচার্য রাজকুমারদের একটি পরীক্ষা নিয়েছিলেন, যেখানে তিনি সকলকে একটি পাখির মাথায় তীর ছুঁড়তে বলেছিলেন। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল, কে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী এবং একাগ্রভাবে লক্ষ্য স্থির করতে পারে। যখন দ্রোণাচার্য একে একে রাজকুমারদের প্রশ্ন করেন, তখন তাঁরা সবাই পাখির মাথাকে লক্ষ্য করে তীর ছোঁড়ার বদলে পাখি বা অন্যান্য অবজেক্টের দিকে চোখ রাখেন, যার ফলে তীরটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
অর্জুন একমাত্র রাজকুমার ছিলেন, যিনি শুধুমাত্র পাখির মাথাকেই লক্ষ্য করে তীর ছুড়েছিলেন এবং সফল হয়েছেন। দ্রোণাচার্য যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন, “তুমি কি অন্য কিছু দেখছো?”, তখন অর্জুন উত্তর দেন, “না, আমি শুধু পাখির মাথা দেখছি, আর কিছুই দেখছি না।” এই একাগ্রতা এবং ফোকাস অর্জুনের মধ্যে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
এটি অর্জুনের শৃঙ্খলা এবং তীব্র মনোযোগের প্রমাণ ছিল। তিনি জানতেন যে, কোনও কাজকে সম্পূর্ণভাবে সফল করতে হলে, তার জন্য শুধুমাত্র কঠোর পরিশ্রম নয়, বরং মনোযোগও প্রয়োজন। তাঁকে কোনও বিভ্রান্তি বা বাধা গ্রহণ করতে হবে না, এবং একমাত্র লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।
অর্জুনের এই একাগ্রতা শুধু যুদ্ধের কৌশল এবং শাস্ত্রশিক্ষায় নয়, জীবনের প্রতিটি দিকেই প্রতিফলিত হয়েছিল। এই দৃশ্যটি আমাদেরও শেখায় যে, জীবনে সফল হওয়ার জন্য নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করে তাতে একাগ্রতার সঙ্গে মনোযোগী হতে হয়। তার শৃঙ্খলাও অর্জুনের তীরন্দাজির সাফল্যের মূল উপাদান ছিল, কারণ তিনি তার প্রশিক্ষণে সর্বদা মনোযোগী ছিলেন এবং একমাত্র লক্ষ্যেই আস্থা রেখেছিলেন।
এভাবে, অর্জুনের একাগ্রতা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব 'তিরন্দাজ' গল্পের মাধ্যমে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, যা আমাদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুসরণীয় হতে পারে।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৫:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. দ্রোণাচার্যের তীরন্দাজি শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতির মধ্যে কী বিশেষত্ব ছিল?
খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পের মূলভাব আলোচনা করো।

ক. দ্রোণাচার্যের তীরন্দাজি শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতির মধ্যে একটি বিশেষ দৃষ্টি ছিল যে, তিনি তাঁর শিষ্যদের শুধু শারীরিক দক্ষতা নয়, বরং মানসিক এবং মনোযোগী দক্ষতাও শিখাতেন। দ্রোণাচার্য রাজকুমারদের একটি পরীক্ষা দেন, যেখানে তিনি তাদের লক্ষ্য স্থির করতে বলেন। তাঁর বিশেষ পদ্ধতি ছিল, শুধুমাত্র পাখির মাথাকেই লক্ষ্য করে তীর ছোঁড়া, অন্য কিছু দেখা বা মনোযোগ দেওয়ার অনুমতি ছিল না। দ্রোণাচার্যের এই পদ্ধতির মধ্যে ছিল:
➠ একাগ্রতা ও মনোযোগ: তিনি শিষ্যদের শেখাতে চেয়েছিলেন যে, তারা যখন কোনও লক্ষ্য স্থির করবে, তখন তাদের পুরো মনোযোগ সেই লক্ষ্যেই নিবদ্ধ করতে হবে। বিভ্রান্তি বা অন্য কিছু দেখলে সফলতা সম্ভব নয়।
➠ শৃঙ্খলা: দ্রোণাচার্য এই শিক্ষা পদ্ধতিতে শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর শিষ্যদের কখনও কোনো প্রকারের অস্থিরতা বা অবহেলা গ্রহণযোগ্য ছিল না।
➠ দৃঢ়তা ও ধৈর্য: এ ধরনের তীরন্দাজি শিক্ষা শিষ্যদের মধ্যে মানসিক দৃঢ়তা এবং ধৈর্য তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।
এই বিশেষ পদ্ধতিই দ্রোণাচার্যকে একজন সফল অস্ত্রশিক্ষক এবং আচার্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পটি মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র, অর্জুনের তীরন্দাজি দক্ষতা এবং একাগ্রতার কাহিনি। এই গল্পের প্রেক্ষাপট হল হস্তিনাপুরের রাজকুমারদের তীরন্দাজি শিক্ষা। দ্রোণাচার্য, যিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্রশিক্ষক, রাজকুমারদের তীরন্দাজি শেখাতে এসে তাঁদের একটি পরীক্ষা নেন।
গল্পে দ্রোণাচার্য রাজকুমারদের একের পর এক প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কী দেখছ?’ প্রথমে যুধিষ্ঠিরসহ সকল রাজকুমাররা বলেন, ‘পাখি দেখছি।’ কিন্তু তারা শুধু পাখিই দেখছিল না, গাছের ডালপালা, পরিবেশ এবং অন্য সকল কিছু তারা দেখছিল। দ্রোণাচার্য তখন তাঁদের কঠোরভাবে জানান যে, তাঁরা লক্ষ্যস্থির করতে পারেননি এবং তাই তাঁর কাছ থেকে পুরস্কৃত হতে পারবেন না।
অবশেষে, তিনি অর্জুনকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কী দেখছ?’ অর্জুন একদৃষ্টিতে বলে, ‘আমি শুধু পাখির মাথা দেখছি, আর কিছুই দেখছি না।’ দ্রোণাচার্য তাঁর উত্তরে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে পাখির মাথায় তীর ছোঁড়ার নির্দেশ দেন। অর্জুন এক নিখুঁত তীর ছুড়ে পাখির মাথা কেটে ফেলেন। দ্রোণাচার্য অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বলেন, ‘তুমি একমাত্র সেই ব্যক্তি, যিনি লক্ষ্যস্থির করতে শিখেছ।’
গল্পটির মূল বার্তা হলো একাগ্রতা, মনোযোগ এবং কঠোর পরিশ্রমের গুরুত্ব। অর্জুনের মধ্যে যে একাগ্রতার গুণ ছিল, সেটিই তাঁর সফলতার মূল কারণ। তিনি একমাত্র পাখির মাথাকেই লক্ষ্য করে তীর ছুড়েছিলেন, অন্য কিছু তাঁর চোখে পড়েনি। তাঁর শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাসই তাঁকে সফল করেছে। এই গল্প আমাদের শেখায় যে, কোন কাজেই সফল হতে হলে আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ সেই কাজের প্রতি নিবদ্ধ করতে হবে এবং লক্ষ্যস্থির করতে হবে।
এছাড়া, গল্পের মাধ্যমে আমরা শিখি যে, শুধুমাত্র কঠোর প্রশিক্ষণ নয়, সত্যিকারের দক্ষতা অর্জনের জন্য একাগ্রতা এবং সম্পূর্ণ মনোযোগ প্রয়োজন। অর্জুনের এই একাগ্রতা তাঁর সাফল্যের পথে অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল, যা তাঁকে তীরন্দাজির মতো বিশেষজ্ঞ করে তুলেছিল।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ৬:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. দেবব্রতের নাম কীভাবে ভীষ্ম হয়ে উঠেল? ব্যাখ্যা কর।
খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পটির মূল বিষয়বস্তু তোমার নিজের ভাষায় উপস্থাপন কর।

ক. দেবব্রত, যিনি পরবর্তী সময়ে ভীষ্ম নামে পরিচিত হন, তাঁর নাম পরিবর্তনের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রয়েছে। দেবব্রত তার পিতার সিংহাসন লাভের জন্য প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি কখনো রাজসিংহাসন দাবি করবেন না এবং তিনি কখনো বিবাহও করবেন না।
এ ঘটনা শুরু হয় যখন রাজা শান্তনু সত্যবতী নামক এক সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করতে চান। তবে সত্যবতীর বাবা, ধীবর, রাজি হননি কারণ তাঁর মেয়ের পুত্ররা সিংহাসন লাভ করতে পারবেন না। তখন দেবব্রত, যিনি শান্তনুর পুত্র, নিজে এই সমস্যা সমাধান করতে এগিয়ে আসেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি কখনো রাজসিংহাসন দাবি করবেন না এবং তিনি নিজে বিবাহ করবেন না, যাতে সত্যবতীর সন্তানরা রাজসিংহাসনে বসতে পারে।
দেবব্রতের এই কঠোর প্রতিজ্ঞা এবং নিষ্ঠা দেখে সবাই তাঁকে 'ভীষ্ম' নামে অভিহিত করেন, যার অর্থ হল ‘একান্ত ও কঠোর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ব্যক্তি’। তাঁর এই কঠোর প্রতিজ্ঞা এবং নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া তাঁকে ভীষ্মের মর্যাদা দেয় এবং তাঁর নাম ইতিহাসে ভীষ্ম হিসেবে পরিচিত হয়। এই ঘটনা তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল, যা তাঁকে এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত করে তোলে।

খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পটি একটি মহাকাব্যিক কাহিনী, যা মহাভারতের পটভূমিতে রচিত। গল্পটির প্রধান বিষয়বস্তু হলো দ্রোণাচার্যের কাছে কুমারদের অস্ত্রশিক্ষার প্রক্রিয়া এবং অর্জুনের অসাধারণ তীরন্দাজি দক্ষতার পরিচয়। এই গল্পের মাধ্যমে শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য যে কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা এবং মনোযোগের প্রয়োজন, তা ফুটে ওঠে।
গল্পের শুরুতে, দ্রোণাচার্য, যিনি এক মহান অস্ত্রশিক্ষক, হস্তিনায় আসেন এবং রাজকুমারদের তীরন্দাজি শেখাতে শুরু করেন। তিনি শিষ্যদের একটি কঠিন পরীক্ষা দেন, যেখানে পাখির মাথা লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে হবে। অন্যান্য কুমাররা, যেমন যুধিষ্ঠির, ভীম, দুর্যোধন, সহ অন্যান্যরা, এই পরীক্ষায় অংশ নিলেও তারা যথাযথভাবে লক্ষ্যস্থির করতে পারেনি। তাদের চোখে শুধু পাখি কিংবা গাছপালা এবং অন্যান্য পরিবেশ ছিল, কিন্তু অর্জুন একমাত্র শুধুমাত্র পাখির মাথাকেই লক্ষ্য করেছিলেন এবং সফলভাবে সেই মাথাটি লক্ষ্য করে তীর ছুড়ে পাখির মাথা কেটে ফেলেন।
এই ঘটনা থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে—প্রথমত, অর্জুনের একনিষ্ঠতা এবং লক্ষ্য স্থির রাখার ক্ষমতা। তিনি কোনো কিছু চিন্তা না করে শুধু পাখির মাথাকেই লক্ষ্য করেন এবং তা অর্জন করেন। দ্বিতীয়ত, দ্রোণাচার্যের শিক্ষার গুরুত্ব এবং তাঁর সঠিক পরামর্শের মাধ্যমে অর্জুনের দক্ষতা আরো বাড়ে। অর্জুনের তীরন্দাজি দক্ষতা তাকে শিষ্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং দ্রোণাচার্য তাঁকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেন।
গল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দ্রোণাচার্যের তাঁর শিষ্য অর্জুনের প্রতি এক অদ্ভুত ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা, যা পরবর্তী সময়ে অর্জুনকে একটি শক্তিশালী অস্ত্র ‘ব্রহ্মশিরা’ উপহার দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। এই অস্ত্র অর্জুনের বীরত্বের আরো একটি দিক উন্মোচন করে এবং তার ভবিষ্যতের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই গল্পটি শুধু যুদ্ধবিদ্যার শিক্ষা নয়, বরং জীবনে লক্ষ্য স্থির রেখে পরিশ্রম, একাগ্রতা, এবং মনোযোগের মাধ্যমে যে সফলতা অর্জিত হয়, তার অনুপ্রেরণাও দেয়। 'তিরন্দাজ' গল্পটি আমাদের শেখায় যে, যে কোনো ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য শুধু প্রাকটিস নয়, বরং সঠিক লক্ষ্য ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা প্রয়োজন।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- :

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. কৌরব ও পান্ডবদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধর।
খ. অর্জুন কীভাবে দ্রোণাচার্যের মন জয় করেছিলেন? 'তিরন্দাজ' গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ কর।

ক. কৌরব ও পান্ডবরা মহাভারতের দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবারের সদস্য। কৌরবরা ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র, আর পান্ডবরা ছিলেন পা-ুর পুত্র।
ক্স কৌরব: কৌরবদের প্রধান ব্যক্তি ছিলেন দুর্যোধন, যিনি ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের প্রথম পুত্র। ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন জন্মান্ধ, এবং তাঁর পুত্রদের মধ্যে দুর্যোধন ছিলেন সবচেয়ে শক্তিশালী এবং উচ্চাকাক্সক্ষী। দুর্যোধন ও তার ভাইদের মধ্যে একশত জন কৌরব ছিলেন, এবং তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিলেন দুর্যোধন, দুঃশাসন, ও দুঃশালা। কৌরবদের মন্দ উদ্দেশ্য ছিল পান্ডবদের প্রতি শত্রুতা ও হিংসা, বিশেষত দুর্যোধন যুধিষ্ঠিরকে রাজা হতে দেখতে পারতেন না।
ক্স পা-ব: পান্ডবরা ছিলেন পা-ুর পুত্র, এবং তাঁরা পাঁচ ভাই-যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, এবং সহদেব। পা-ুর মৃত্যুর পর, পান্ডবরা কৌরবদের সাথে একসঙ্গে বসবাস করতেন, তবে কৌরবদের হিংসা ও শত্রুতা তাদের সুখের দিনগুলোতে ছেদ ঘটাতে থাকে। পান্ডবরা ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, সত্যপরায়ণ এবং তাদের শৃঙ্খলা ও আদর্শের জন্য খ্যাত। তাঁদের মধ্যে অর্জুন ছিলেন সবচেয়ে দক্ষ তীরন্দাজ এবং যুদ্ধে বিশেষভাবে শক্তিশালী।

খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পে অর্জুনের বীরত্ব এবং দ্রোণাচার্যের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বিষয়টি উঠে আসে। দ্রোণাচার্য যখন কুমারদের তীরন্দাজি শিখাচ্ছিলেন, তখন তিনি একটি কঠিন পরীক্ষা দেন—পাখির মাথা লক্ষ্য করে তীর ছুড়ে তা কেটে ফেলা।
অর্জুন এই পরীক্ষায় একমাত্র শিষ্য ছিলেন, যিনি শুধু পাখির মাথাকেই লক্ষ্য করেছিলেন এবং সফলভাবে তীর ছুঁড়ে পাখির মাথাটি কেটে ফেলেন। অন্য শিষ্যরা গাছের ডালপালা বা অন্য কোনো কিছু লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়েছিল, কিন্তু তারা কেউ পাখির মাথায় লক্ষ্য স্থির করতে পারেনি।
এখানে অর্জুনের মনোযোগ, লক্ষ্য স্থির রাখার ক্ষমতা এবং তার একাগ্রতার পরিচয় পাওয়া যায়। দ্রোণাচার্য তাঁর শিষ্যদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখেছিলেন অর্জুনের কাছ থেকে। দ্রোণাচার্য এর পর অর্জুনকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেন এবং তাঁকে ভবিষ্যতের জন্য এক অনন্য তীরন্দাজ হিসেবে চিন্তা করতে থাকেন। দ্রোণাচার্য এর মাধ্যমে অর্জুনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা আরও গভীর হয়।
অর্জুনের মন জয় করার পিছনে দ্রোণাচার্যের শিক্ষা এবং অর্জুনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দ্রোণের বিশ্বাস ছিল যে অর্জুনের মধ্যে এক বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে, এবং তাঁর শিক্ষা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জুন দুর্দান্ত তীরন্দাজে পরিণত হতে পারে। ‘তিরন্দাজ’ গল্পের মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অর্জুন শুধুমাত্র তার শারীরিক দক্ষতায় নয়, বরং তার মানসিক শক্তি, নিষ্ঠা, এবং একাগ্রতায় দ্রোণাচার্যের মন জয় করেছিলেন।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- :

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. অর্জুনকে কারা হিংসা করত? কেন করত? ব্যাখ্যা কর।
খ. মানুষকে যেকোনো কঠিন কাজে পারদর্শী করে তুলতে আগ্রহ, চর্চা ও গুরুভক্তি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ তা ‘তিরন্দাজ’ গল্পের আলোকে তুলে ধর।

ক. অর্জুনকে প্রধানত দুর্যোধন ও কর্ণ হিংসা করত। এর কারণ ছিল-অর্জুনের অসাধারণ তীরন্দাজি ক্ষমতা ও যুদ্ধকৌশল, যা তাকে মহাকবি এবং মহাযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত করে তুলেছিল।
ক্স দুর্যোধন: দুর্যোধন ছিলেন কৌরবদের প্রধান এবং পা-বদের প্রতিপক্ষ। তিনি যুধিষ্ঠিরের সিংহাসনে বসার সম্ভাবনা দেখতে না পেয়ে অর্জুনের প্রতি গভীর হিংসা পোষণ করতেন। দুর্যোধন জানতেন যে, অর্জুন এক অসাধারণ তীরন্দাজ এবং যুদ্ধে যেকোনো মুহূর্তে তার নিজের সিংহাসন এবং রাজত্বের জন্য হুমকি হতে পারে। তাই, দুর্যোধন সবসময় অর্জুনের সফলতাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করতেন এবং তার জনপ্রিয়তাকে নষ্ট করতে চাইতেন।
ক্স কর্ণ: কর্ণ, যিনি দ্রোণাচার্যের শিষ্য ছিলেন এবং যুধিষ্ঠিরের সহোদর কুস্তীর জ্যেষ্ঠ পুত্র, তাঁরও অর্জুনের প্রতি হিংসা ছিল। কর্ণ এবং অর্জুনের মধ্যে এক গভীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, বিশেষত তীরন্দাজি ক্ষেত্রে। কর্ণ জানতেন যে, অর্জুনের মতো দক্ষ তীরন্দাজকে মোকাবিলা করা কঠিন। এর ফলে কর্ণের মধ্যে নিজের অবমূল্যায়ন এবং অর্জুনের সাফল্যকে মেনে নেওয়ার আগ্রহ ছিল না। কর্ণের হিংসার মূল কারণ ছিল তার গর্ব এবং তার যুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অর্জুনকে নিজের চেয়ে বেশি সক্ষম মনে করা।
অর্জুনের তীরন্দাজি দক্ষতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তার অসামান্য দক্ষতার প্রতি এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর হিংসা ছিল একেবারে ব্যক্তিগত। তারা কখনও তার সাথে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতেন, কখনও বা তাঁর খ্যাতি বা সাফল্যকে ম্লান করতে চাইতেন।

খ. ‘তিরন্দাজ’ গল্পটি মূলত আগ্রহ, চর্চা, এবং গুরুভক্তির গুরুত্বকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরে। এই গল্পে অর্জুন তার শিক্ষক দ্রোণাচার্য থেকে তীরন্দাজির শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে একাগ্রতা, নিষ্ঠা এবং গুরুভক্তির মাধ্যমে অদ্বিতীয় দক্ষতায় পরিণত হয়েছিল।
ক্স আগ্রহ: অর্জুনের মধ্যে তীরন্দাজি শিখতে এক গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি শুরু থেকেই জানতেন যে, তীরন্দাজি তার শক্তির মূল এবং এটি তাঁর ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর আগ্রহ তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে প্রেরণা দেয় এবং তিনি নিরলসভাবে তার লক্ষ্যকে হাসিল করতে চেষ্টা করেন।
ক্স চর্চা: অর্জুন প্রতিদিন কঠোর চর্চা করতেন, এমনকি তার শত্রুদের চেয়ে ভালো করতে তিনি আরও বেশি চেষ্টা করতেন। দ্রোণাচার্য যখন পরীক্ষায় পাখির মাথাকে লক্ষ্য করার নির্দেশ দেন, তখন অর্জুন একমাত্র শিষ্য ছিলেন, যিনি শুধু পাখির মাথাকেই লক্ষ্য করেছিলেন এবং সফলভাবে তীর ছুড়ে পাখির মাথা কেটে ফেলেন। তার চর্চা ও কঠোর পরিশ্রমই তাকে এই সাফল্য এনে দেয়।
ক্স গুরুভক্তি: অর্জুনের গুরুভক্তি ছিল অটুট। দ্রোণাচার্যের প্রতি তাঁর পূর্ণ আস্থা এবং শ্রদ্ধা ছিল, যা তাকে এমন অসাধারণ কৌশল শিখতে সাহায্য করেছিল। দ্রোণাচার্যও অর্জুনকে তাঁর বিশেষ শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাকে সবকিছু শিখিয়ে গেছেন। গুরুভক্তির মাধ্যমে অর্জুন তার শিক্ষা থেকে সর্বোচ্চ লাভ পেয়ে, যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন।
গল্পটির মাধ্যমে একত্রে এই তিনটি গুণ-আগ্রহ, চর্চা এবং গুরুভক্তি-মানুষকে যেকোনো কঠিন কাজে পারদর্শী করে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্জুনের উদাহরণ আমাদের শেখায় যে, যে কোনো কঠিন লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিজের আগ্রহ থাকতে হবে, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর চর্চা করতে হবে, এবং একজন ভাল শিক্ষক বা গুরু থেকে শিখে তার পথ অনুসরণ করতে হবে। এই তিনটি উপাদান মিলেই একজন মানুষের অসাধারণ দক্ষতা তৈরি হতে পারে।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- :

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ‘ভীষ্ম কার ওপর ছেলেদের অস্ত্র শিক্ষার ভার দিয়েছিলেন? কেন দিয়েছিলেন? দ্রোণাচার্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা কর।
খ. কীভাবে অর্জুনের জয়ধ্বনিতে চারদিক ভরে উঠল? 'তিরন্দাজ' গল্পের আলোকে অর্জুনের বীরত্বের পরিচয় তুলে ধর।

ক. ভীষ্ম ছেলেদের অস্ত্রশিক্ষার ভার দ্রোণাচার্যের ওপর দিয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন যে দ্রোণাচার্য ছিলেন একজন অতি দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক। দ্রোণাচার্য ছিলেন একজন মহাবীর, যিনি কেবল তীরন্দাজি নয়, সমস্ত রকম যুদ্ধবিদ্যায় নিখুঁত ছিলেন। তাঁর হাতে অস্ত্রশিক্ষা নিতে পারলে রাজকুমাররা যুদ্ধের ক্ষেত্রে দক্ষ হতে পারত এবং রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারত। দ্রোণাচার্য ছিলেন এমন এক শিক্ষক, যিনি কেবল কৌশল শিখাতেন না, তাঁর শিষ্যদের মধ্যে যুদ্ধের নৈতিকতা এবং শৃঙ্খলা গড়ে তুলতেন। এজন্য ভীষ্ম তাঁকে ছেলেদের অস্ত্রশিক্ষার দায়িত্ব দিলেন।
দ্রোণাচার্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অসাধারণ দক্ষতা এবং শিষ্যদের প্রতি গভীর স্নেহ। তিনি শিষ্যদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যুদ্ধবিদ্যায় নিখুঁত দক্ষতা অর্জন করাতেন, আর তাঁদের নৈতিক দিক থেকেও উন্নত করতেন। দ্রোণাচার্য সবসময় তাঁর শিষ্যদের উদাহরণ হিসেবে তাঁর নিজের শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধ দেখাতেন। তিনি একদিকে ছিলেন কঠোর শিক্ষক, অন্যদিকে ছিলেন শিষ্যদের কাছে এক মহান পিতা। বিশেষ করে অর্জুনকে তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং তাঁর মধ্যে এক বিশেষ ধরনের দীক্ষা প্রদান করেছিলেন, যার ফলে অর্জুন হয়ে উঠেছিলেন তীরন্দাজে বিশ্বমানের এক বীর।

খ. অর্জুনের জয়ধ্বনি চারিদিকে ভরে উঠেছিল কারণ তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ তীরন্দাজ, যিনি কোনো পরীক্ষাতেই পরাজিত হতে জানতেন না। 'তিরন্দাজ' গল্পের আলোকে অর্জুনের বীরত্বের পরিচয় পাওয়া যায় বিশেষত যখন দ্রোণাচার্য একটি পরীক্ষার আয়োজন করেছিলেন, যেখানে রাজকুমারদের লক্ষ্য ছিল এক পাখির মাথায় তীর ছুড়তে। অন্যান্য রাজকুমারেরা গাছের ডালপালা, একে অপরকে, এবং পাখির মাথার বাইরে অন্য কিছু দেখছিলেন, কিন্তু অর্জুন একমাত্র পাখির মাথাকে লক্ষ্য করে তীর ছুড়েছিলেন। তাঁর এই নিখুঁত লক্ষ্য এবং দক্ষতা সবার কাছে বিস্ময়কর ছিল। দ্রোণাচার্য তখনই তাঁকে প্রশংসা করে বলেন, ‘এটা হলো আদর্শ তীরন্দাজ।’
এছাড়া, অর্জুনের বীরত্ব আরও প্রকাশ পায় যখন তিনি কুমিরের সঙ্গে লড়াইয়ের পরীক্ষায় অংশ নেন। দ্রোণাচার্য ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরকে ধরা দিয়ে এটি একটি বিপদজনক পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে রাজকুমাররা তা দেখে এবং শিখে। অন্যরা ভয় পেয়ে যায়, কিন্তু অর্জুন কোনো ভয় না পেয়ে তার তীর দিয়ে কুমিরকে আঘাত করেন এবং সে বিপদ থেকে মুক্ত করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অর্জুনের সাহস এবং দক্ষতা আরও একবার প্রমাণিত হয়। দ্রোণাচার্য তাঁকে 'ব্রহ্মশিরা' নামে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র প্রদান করেন, যা অর্জুনের ক্ষমতার আরও এক বিশেষ নিদর্শন।
অর্জুনের বীরত্ব শুধু যুদ্ধের কৌশলে নয়, তাঁর অসাধারণ কৌশল প্রদর্শনেও প্রতিভাত হয়েছিল। তিনি এমন সব অস্ত্র ব্যবহার করতে পারতেন, যা আকাশে বায়ু ও মেঘ সৃষ্টি করতে, পাহাড় গড়তে, বৃষ্টি এবং সূর্যগতি পরিবর্তন করতে সক্ষম ছিল। এসব কৌশল একদিকে যেমন ভয়ঙ্কর ছিল, তেমনি তা তাঁর বিরল ক্ষমতার প্রমাণ ছিল। এই সব কৌশল এবং তাঁর অসীম শক্তির প্রদর্শনী অর্জুনকে শুধু তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে নয়, চারিদিকে এক কিংবদন্তি রূপে প্রতিষ্ঠিত করে।
অর্জুনের এই সমস্ত কীর্তি ও বীরত্বের ফলে, যখন তিনি যুদ্ধের কৌশল প্রদর্শন করতে শুরু করেন, তখন তাঁর জয়ধ্বনি শুনে চারদিক প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। তাঁর তীরন্দাজি, যুদ্ধ কৌশল, এবং অত্যন্ত অদ্ভুত শক্তির মাধ্যমে অর্জুন সবার কাছে এক অপ্রতিরোধ্য বীর হয়ে ওঠেন।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- :

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ‘তিরন্দাজ’ ছোটোগল্পটির সারসংক্ষেপ তুলে ধরো।
খ. “যেকোনো কঠিন কাজে পারদর্শী হতে আগ্রহ, চর্চা, নিষ্ঠা এবং গুরুভক্তি প্রধাদসহায়ক হিসেবে কাজ করে।” ‘তিরন্দাজ’ গল্পের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

ক. উনিশ শতকের অন্যতম গল্পকার যোগীন্দ্রনাথ সরকার মহাভারতের ‘আদিপর্ব’ থেকে কাহিনি গ্রহণ করে ‘তিরন্দাজ’ গল্পটি রচনা করেছেন।
‘তিরন্দাজ’ গল্পটির মূলবিষয় পাড়– ও কুরুর সন্তানদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা প্রদর্শন। রাজা ভীষ্ম তাঁর সন্তানদের জন্য অস্ত্রবিদ্যার গুরু দ্রোণাচার্যকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। রাজা ভীষ্ম ছিলেন দিল্লির হস্তিনাপুরের রাজা। নিয়োজিত হওয়ার পর গুরু দ্রোণাচার্য রাজকুমারদেরকে সযতেœ ও স্নেহপরায়ণ ভাবে যুদ্ধবিদ্যা শেখান। সকল রাজকুমারের মধ্যে একমাত্র অর্জুন গুরুর প্রিয় হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। এতে কর্ণ ও দুর্যোধনরা অর্জুন তথা পা-বদের প্রতি রুষ্ট হয়ে উঠে। অস্ত্রবিদ্যায় মুগ্ধ হয়ে আশীর্বাদ হিসেব গুরু দ্রোণাচার্য তাঁকে ‘ব্রক্ষ্মশিরা’ু অসূত্র পুরসকার দেন। অতঃপর আর্জুনের রণকৌশল সর্বাধিক প্রশংসিত হয়েছিলো যখন প্রকাশ্যে রণক্ষেত্রে রাজকুমারদের রণকৌশল প্রদর্শনী করা হয়। মূলত ‘তিরন্দাজ’ গল্পে অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পিছনে রয়েছে তাঁর একান্ত সাধনা, পরিশ্রম করার মানসিকতা, অসস্ত্রবিদ্যা শেখার প্রবল আগ্রহ, চর্চা করার প্রবণতা এবং গুরুকে ভক্তি করার মতো মানসিকতা; যা অর্জুনকে গুরুরপ্রিয়পাত্র এবং অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

খ. ‘তিরন্দাজ’ গন্ধে অর্জুন আগ্রহ, চর্চা এবং গুরুভক্তির ফলে গুরুর প্রিয়ভাজন ব্যক্তি এবং অসাধারণ রণকৌশল অর্জন করতে। সক্ষম হয়েছিলো। মানুষকে জীবনের বিভিন্ন ধাপে ছোটো-বড়ো, সহজ-কঠিন বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। কোনো ছোটো-কিংবা সহজ বলে তা সহজেই করে ফেলা আবার কোনো কাজ বড়ো কিংবা কঠিন বলে তা এড়িয়ে চলা আমাদের মোটেই। কাম্য নয়। জীবনের তাগিদে যদি কোনো কঠিন বা জটিল কাজের সম্মুখীন হতে হয় এবং সেই কাজ যদি একাকী করা সম্ভব না হয় তাহলে অবশ্যই অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা নিতে হবে। প্রয়োজন হলে গুরু কিংবা শিক্ষকের শরণাপন্ন হতে হবে। গুরু বা শিক্ষকের ছায়াতলে থেকে ধৈর্য ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করা, শিক্ষকের উপদেশমতো নিবিড়ভাবে কাজ করে যাওয়া ও গুরুভক্তির মাধ্যমে কাজে পারদর্শী, হওয়া সঞ্চব।
মহাভারতের ‘আদিপর্ব’ অনুসৃত ছোটগল্প ‘তিরন্দাজ’ গল্পে এমন নিষ্ঠাবান চরিত্র হলো অর্জুন। প্রসঙ্গত, দিল্লির হস্তিনাপুরের রাজা ছিলেন ভীষ্ম। তাঁর সন্তানরা, পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি এক শিক্ষকের নিকট ধনুর্বিদ্যা শিখতেন। কিন্তু, রাজা ভীষ্মের ইচ্ছা ছিলো তাঁর সন্তানদের অসত্রবিদ্যায় দ্রোণাচার্যকে নিয়োগ করবেন। পরবর্তীতে, অস্ত্রবিদ্যার গুরু দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুর এলে ভীষ্ম তাকে মহাসাদরে গ্রহণ করেন এবং রাজকুমারদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত করেন। গুরু দ্রোণাচার্যও ততোধিক স্নেহ ও সযতেœ কুমারদের যুদ্ধবিদ্যা শেখালেন। কিন্তু, সবার মধ্যে শুধু রাজকুমার অর্জুন সর্বাধিক প্রিয় হয়ে ওঠেন। এতে কর্ণ ও দুর্যোধনরা পা-বদের প্রতি রুষ্ট হন। অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষালাভের ক্ষেত্রেও অর্জুনের পারদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে গুরু দ্রোণাচার্য তাঁকে ‘ব্রক্ষ্মাশিরা’ নামক অস্যা পুরসকার দেন। প্রকাশ্য রণক্ষেত্রেও অর্জুন অসাধারণ কৃতিত্ব দেখান। অর্জুনের রণকৌশল সর্বাধিক প্রশংসিত হয়। তাই দেখা যায়, আগ্রহ, চর্চা, নিষ্ঠা ও গুরুভক্তি মানুষকে যেকোনো কঠিন কাজে পারদর্শী করে তুলতে পারে।
‘তিরন্দাজ’ গল্পে অর্জুন চরিত্রের মাধ্যমে তা স্পষ্টভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে। সকল মানুষের লক্ষ্য অর্জনের প্রতি অর্জুনের মতো দৃঢ়তাপূর্ণ সংকল্প থাকাই উচিত।


‘তিরন্দাজ’ গল্পের বর্ণনামূলক প্রশ্ন- ২:

নিচের ক ও খ প্রশ্ন দুটির উত্তর দাও:
ক. ‘তিরন্দাজ’ গল্পের আলোকে অর্জুনের বীরত্ব, সাহস ও রণকৌশল ব্যাখ্যা করো।
খ. ‘দ্রোণ এবং রাজকুমারদের মধ্যে সম্পর্ক, অস্ত্রবিদ্যা, শিক্ষাঅর্জন, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি তোমার দৃষ্টিতে আলোকপাত করো।

ক. যোগীন্দ্রনাথ সরকার রচিত ‘তিরন্দাজ’ গল্পটির প্রধান চরিত্র হলো অর্জুন।
গল্পটি মূলত মহাভারতের 'আদিপর্ব' অংশ থোকে চয়ন করা হয়েছে। পাড়– ও কুরুর সন্তানদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শীতা প্রদর্শন এই গল্পের প্রতিপাদ্য বিষয়। কথিত আছে, ক্ষত্রিয়দের ছেলেদের শান্ত্রণাঠের পাশাপাশি অস্ত্রবিদ্যাও শিখতে হয়। রাজা ভীষ্ম ছিলেন তৎকালীন হস্তিনাপুরের রাজা এবং তিনি চাইতেন অস্ত্রবিদ্যার গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে তাঁর সন্তানদের অস্ত্রবিদ্যা শিখাতে। অতঃপর অস্ত্রবিদ্যার গুরু দ্রোণাচার্য নিজেই হসিচনাপুর এলে রাজা ভীষ্ম দ্রোণাচার্যকে খুব সমাদরে গ্রহণ করেন এবং রাজকুমারদের অসন্ত্রবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। যথারীতি অস্ত্রবিদ্যা শেখানো চলতে থাকে। রাজকুমার কর্ণ, ভীম, দুর্যোধনদের চেয়ে অর্জুন গুরুর কাছে সর্বাধিক প্রিয় হয়ে ওঠেন। অর্জুনের সাহস আগ্রহ, চর্চা করার মানসিকতা তাঁকে উন্নতির শিখড়ে পৌছে দিয়েছে।
একদা দ্রোণাচার্য পাখির প্রসঙ্গ এনে রাজকুমারদের প্রশ্ন করে কারও উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারেননি, কিন্তু অর্জুনের উত্তরে খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। আবার, দ্রোণকে একবার কুমির আক্রমণ করলে অর্জুন কয়েকটি বাণ নিক্ষেপ করে কুমিরকে ঘড় খ- করে ফেলেন। প্রকাশ্যে রণকৌশলেও সর্বাধিক প্রশংসিত হয় অর্জুন এভাবে, অর্জুন চরিত্রে বীরত্ব সাহস এবং রণকৌশল পারদর্শিতা প্রভৃতি গুণ ফুটে উঠেছে।

খ. মহাভারতের ‘আদিপব’ অংশ থেকে যোগীন্দ্রনাথ সরকার কাহিনি অনুসৃত করায় সব চরিত্র মহাভারতেই রয়েছে। অন্যতম চরিত্র দ্রোণাচার্য ছিলেন মহাভারতের কুরুবংশের গুরু বা শিক্ষক। তিনি কুরুবংশের সন্তানদের তথা রাজকুমারদের অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা দিতেন। আবার কোথাও কোথাও দ্রোণাচার্যকে শুধু দ্রোণ বলেও সম্বোধন করা হয়েছে। ভীষ্ম হলেন মহাভারতের কৌরব ও পা-বদের দাদা বা পিতামহ। তিনি চাইতেন রাজকুমার দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রবিদ্যা অর্জন করুক। প্রথম দ্রোণাচার্য যখন হস্তিনাপুরে এলেন তখন তিনি দেখলেন রাজকুমারগণ একটি লোহার গোলা নিয়ে খেলা করছিলো এবং একপর্যায়ে তা কুয়োর পড়ে গেলে রাজকুমাররা সেটি তুলতে ব্যর্থ হয়। এসময় দ্রোণাচার্য ঠাট্টার ছলে বলেছিলেন ক্ষত্রিয়ের ছেলে হয়েও সামান্য কাজ করতে পারলেনা এভাবেই প্রথম পরিচয় হয়। অতঃপর হস্তিনাপুরের রাজার দরবারে দ্রোণাচার্য সাদরে গৃহিত হন। শুধু করেন রাজকুমারদের অস্ত্রবিদ্যাসহ অন্যানা বিষয়েরও শিক্ষাদানের। তিনি সকল কুমারকে স্নেহও সযতেœ যুদ্ধবিদ্যা শেখালেন। কিন্তু, নিষ্ঠতা, মনোযোগে ও সাহসিকতায় শুধু অর্জুন দ্রোণাচার্যের সর্বাধিক প্রিয় হয়ে উঠেন। এতে করে অন্যরা অর্থাৎ কর্ণ ও দুর্যোধনরা পান্ডবদের প্রতি রুষ্ট হন।
অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে অর্জুনের পারদর্শিতার মুখ হয়ে তাঁর গুরু দ্রোণচার্য আশীর্বাদ হিসেবে তাঁকে 'ব্রস্তুশিরা' অস্ত্র পুরস্কার দেন। অতি ভয়ানক সে অসূত্র। কথিত আছে, ‘ব্রক্ষ্মশিরা’ অস্ত্রের তেজে স্বর্ণ-মত্য কেঁপে উঠে। অস্ত্রের ভয়ানকতায় স্পর্শ হয়ে দ্রোণাচার্য অর্জুনকে মানুষের ওপর এ অস্ত্রের ব্যবহার করতে নিষেধ করেছিলেন। বস্তুত, অর্জুন শিষ্য হয়ে গুরু দ্রোণাচার্যের মন জয় করতে পেরেছিলেন।
বিদ্যাশিক্ষার একপর্যায়ে যখন প্রকাশ্যে রণক্ষেত্রে রাজকুমারদের রণকৌশল প্রদর্শনী করা হয়, তখনও অর্জুন যুদ্ধবিদ্যা দেখিয়ে সকলকে মুখ করেন। অর্জুনের রণকৌশল সর্বাধিক প্রশংসিত হয়েছিলো। সৎসাহস, নিষ্ঠা, অগ্রহ, প্রভৃতি গুণের অধিকারী অর্জুন প্রবল গুরুভক্তির মাধ্যমে পারদর্শী হয়েছিলেন; যা আমাদের সকলের জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।


তথ্যসূত্র:
১. আনন্দপাঠ: অষ্টম শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৬।
২. ‘ছোটোদের মহাভারত’:যোগীন্দ্রনাথ সরকার
৩. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৪. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।
Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url