অন্ধবধূ- যতীন্দ্রমোহন বাগচী

অন্ধবধূ
অন্ধবধূ

অন্ধবধূ
যতীন্দ্রমোহন বাগচী

পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী!
আস্তে একটু চল না ঠাকুরঝি-
ওমা, এ যে ঝরা-বকুল! নয়?
তাইতো বলি, বসে দোরের পাশে,
রাত্তিরে কাল- মধুমদির বাসে
আকাশ-পাতাল- কতই মনে হয়।

জ্যৈষ্ঠ আসতে ক-দিন দেরি ভাই-
আমের গায়ে বরণ দেখা যায়?

- অনেক দেরি? কেমন করে হবে।
কোকিল-ডাকা শুনেছি সেই কবে,
দখিন হাওয়া বন্ধ কবে ভাই;
দীঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগে -
শ্যাওলা-পিছল এমনি শঙ্কা লাগে,
পা-পিছলিয়ে তলিয়ে যদি যাই!

মন্দ নেহাত হয় না কিন্তু তায়-
অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যায়।

দুঃখ নাইকো সত্যি কথা শোন,
অন্ধ গেলে কী আর হবে বোন?
বাঁচবি তোরা দাদা তো তোর আগে?
এই আষাঢ়েই আবার বিয়ে হবে,
বাড়ি আসার পথ খুঁজে না পাবে-
দেখবি তখন প্রবাস কেমন লাগে?

‘চোখ গেল’ ওই চেঁচিয়ে হলো সারা।
আচ্ছা দিদি, কী করবে ভাই তারা-

জন্ম লাগি গিয়েছে যার চোখ!
কাঁদার সুখ যে বারণ তাহার ছাই!

কাঁদতে পেলে বাঁচত সে যে ভাই,
কতক তবু কমত যে তার শোক।

‘চোখ গেল’- তার ভরসা তবু আছে-
চক্ষুহীনার কী কথা কার কাছে!

টানিস কেন? কিসের তাড়াতাড়ি-
সেই তো ফিরে যাব আবার বাড়ি,
একলা-থাকা- সেই তো গৃহকোণ-
তার চেয়ে এই স্নিগ্ধ শীতল জলে
দুটো যেন প্রাণের কথা বলে-
দরদ-ভরা দুখের আলাপন;

পরশ তাহার মায়ের স্নেহের মতো
ভুলায় খানিক মনের ব্যথা যত!

‘অন্ধবধূ’ কবিতার উৎস নির্দেশ:
--

‘অন্ধবধূ’ কবিতার শব্দার্থ ও টীকা:
ঠাকুরঝি- ননদ, স্বামীর বোন, শ্বশুরকন্যা।
মধুমদির বাসে- মধুর গন্ধে মোহময় সুগন্ধে আচ্ছন্ন।
আকাশ-পাতাল- নানা বিষয়, নানান ভাবনা-অনুভাবনা অর্থে ব্যবহৃত।
জ্যৈষ্ঠ আসতে ক-দিন দেরি ভাই..- একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অনুভবের অসাধারণ এক জগৎ আলোচ্য অংশে ব্যক্ত হয়েছে। প্রকৃতির বিচিত্র রঙের ধারণা ও অনুভবে এই অন্ধবধূ সমৃদ্ধ। সেই জ্ঞান ও অনুভব থেকে সে জেনে নিতে চায় ঋতুর বিবর্তন।
অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব ঢুকে যাক- অন্ধবধূ অনুভবঋদ্ধ মানুষ অর্থাৎ তার অনুভূতি শক্তি প্রখর। আত্মমর্যাদা বোধেও সে সমৃদ্ধ। কিন্তু সে অন্ধ। এই অন্ধত্বের কষ্ট সে গভীরভাবে অনুভব করে। দীঘির ঘাটে যখন শেওলা পড়া পিছল সিঁড়ি জাগে, তখন সে পিছল খেয়ে জলে পড়ে ডুবে মরার আশঙ্কা প্রকাশ করে। সে এও অনুভব করে যে, ডুবে মরলে অন্ধত্বের অভিশাপ ঘুচত। কিন্তু কবিতাটির চেতনা থেকে মনে হয়, অন্ধবধূ নৈরাশ্যবাদী মানুষ নয়। জীবনের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধ আছে।
চোখ গেল- পাখি বিশেষ। এই পাখির ডাক ‘চোখ গেল’ শব্দের মতো মনে হয়।
কাঁদার সুখ- মানুষ দুঃখে কাঁদে, শোকে কাঁদে। কিন্তু কান্নার মধ্য দিয়ে তার দুঃখ-শোকের লাঘব ঘটে।

‘অন্ধবধূ’ কবিতার পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব:
সমাজ দৃষ্টিহীনদের অবজ্ঞা করে। দৃষ্টিহীনেরা নিজেরাও নিজেদের অসহায় ভাবে। কিন্তু ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে এই প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব। পায়ের নিচে নরম বস্তুর অস্তিত্ব, কোকিলের ডাক শুনে নতুন ঋতুর আগমন অনুমান করা, শ্যাওলায় পা রেখে নতুন সিঁড়ি জেগে ওঠার কথা বোঝা দৃষ্টিহীন হয়েও সম্ভবপর। তাই দৃষ্টিহীন হলেই নিজেকে অসহায় না ভেবে, শুধুই ঘরের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে আপন অন্তর্দৃষ্টিকে প্রসারিত করা প্রয়োজন। বধূটি চোখে দেখতে পায় না। কিন্তু অনুভবে সে জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। কবিতাটিতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা সংবেদনশীল ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।

‘অন্ধবধূ’ কবিতার কবি পরিচিতি:
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর জন্ম ১৮৭৮ সালের ২৭শে নভেম্বর নদীয়া জেলার জামশেদপুর গ্রামে।
পল্লি-প্রীতি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কবিমানসের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য। নিসর্গ-সৌন্দর্যে চিত্ররূপময়। রচনায় গ্রামবাংলার শ্যামল স্নিগ্ধ রূপ উন্মোচনে তিনি প্রয়াসী হয়েছেন। গ্রাম-জীবনের অতি সাধারণ বিষয় ও সুখ-দুঃখ তিনি সহজ-সরল ভাষায় সহৃদয়তার সঙ্গে তাৎপর্যমণ্ডিত করে প্রকাশ করেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থসমূহের মধ্যে আছে: লেখা, রেখা, অপরাজিতা, নাগকেশর, বন্ধুর দান, জাগরণী, নীহারিকা ও মহাভারতী।
১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।।

‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কর্ম-অনুশীলন:
১। তোমার জানা কোনো দৃষ্টিহীন মানুষের বিবরণ দাও।
২। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত বলে তুমি মনে কর?

‘অন্ধবধূ’ কবিতার বহুনির্বাচনি প্রশ্ন:

প্রশ্ন থেকে

অভিনন্দন!
আপনি পেয়েছেন -এর মধ্যে!
যা


‘অন্ধবধূ’ কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন:
১. ‘অন্ধবন্ধূ’ কবিতাটির রচয়িতা কে?
উত্তর: ‘অন্ধবধূ’ কবিতাটির রচয়িতা যতীন্দ্রমোহন বাগচী।
২. যতীন্দ্রমোহন বাগচী কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: যতীন্দ্রমোহন বাগচী ১৮৭৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
৩. যতীন্দ্রমোহন বাগচী কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: যতীন্দ্রমোহন বাগচী নদীয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
৪. যতীন্দ্রমোহন বাগচী কত সালে মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: যতীন্দ্রমোহন বাগচী ১৯৪৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
৫. ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় দিঘির ঘাটে কী জাগে?
উত্তর: ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগে।
৬. কে চেঁচিয়ে সারা হলো?
উত্তর: ‘চোখ গেল’ পাখি চেঁচিয়ে সারা হলো।
৭. ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কার অনুভূতিশক্তি প্রখর?
উত্তর: ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর অনুভূতিশক্তি প্রখর।
৮. দৃষ্টিহীনদের কী দিয়ে প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব?
উত্তর: দৃষ্টিহীনদের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব।
৯. অন্ধবধূ কাকে আমের গায়ে বরণ দেখার কথা জিজ্ঞেস করে?
উত্তর: অন্ধবধূ তার ননদকে আমের গায়ে বরণ দেখার কথা জিজ্ঞেস করে।
১০. অন্ধবধূ অনেক দিন আগে কিসের ডাক শুনেছে?
উত্তর: অন্ধবধূ অনেক দিন আগে কোকিলের ডাক শুনেছে।
১১. ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কে নৈরাশ্যবাদী মানুষ নয়?
উত্তর: ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূ নৈরাশ্যবাদী মানুষ নয়।
১২. অন্ধবধূ কিসের গায়ে বরণ দেখার কথা বলেছে?
উত্তর: অন্ধবধূ আমের গায়ে বরণ দেখার কথা বলেছে।
১৩. ‘মধুমদির বাসে’ কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: ‘মধুমদির বাসে’ কথাটির অর্থ হলো—মধুর সুগন্ধে ভরা পরিবেশ।
১৪. সমাজ কাদের অবজ্ঞা করে?
উত্তর: সমাজ দৃষ্টিহীনদের অবজ্ঞা করে।
১৫. অন্ধবধূ কোথায় বসে মধুমদির গন্ধে আচ্ছন্ন হয়?
উত্তর: অন্ধবধূ দোরের পাশে বসে মধুমদির গন্ধে আচ্ছন্ন হয়।
১৬. সমাজ কাদের অবজ্ঞা করে?
উত্তর: সমাজ দৃষ্টিহীনদের অবজ্ঞা করে।
১৭. পায়ের তলায় নরম কী ঠেকেছিল?
উত্তর: পায়ের তলায় নরম ঝরা বকুল ঠেকেছিল।
১৮. অন্ধবধূ কাকে আস্তে চলতে বলে?
উত্তর: অন্ধবধূ তার ঠাকুরঝিকে আস্তে চলতে বলে।
১৯. কখন আবার বিয়ে হবে?
উত্তর: আষাঢ় মাসে আবার বিয়ে হবে।
২০. ‘কাঁদতে পেলে বাঁচত সে যে ভাই,/কতক তবু কমত যে তার শোক’। বাক্যটিতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: বাক্যটিতে অন্ধত্বের গভীর কষ্ট বোঝানো হয়েছে।
২১. কোথায় অন্ধবধূ একলা থাকে?
উত্তর: অন্ধবধূ গৃহকোণে একলা থাকে।
২২. অন্ধবধূ ঠাকুরঝির কাছে জ্যৈষ্ঠ আসতে কত দিন দেরি বলে জানতে পারে?
উত্তর: অন্ধবধূ ঠাকুরঝির কাছে জ্যৈষ্ঠ আসতে অনেকদিন দেরি বলে জানতে পারে।
২৩. অন্ধবধূ জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে কীভাবে?
উত্তর: অনুভূতি শক্তি দ্বারা অন্ধবধূ জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে।

‘অন্ধবধূ’ কবিতার অনুধাবনমূলক প্রশ্ন:

১. অন্ধবধূর আকাশ-পাতাল মনে হয় কেন?
উত্তর: রাতে ফুলের মোহময় সুগন্ধে অন্ধবধূর আকাশ-পাতাল মনে হয়।
অন্ধবধূ একজন অনুভবঋদ্ধ মানুষ। সে অন্ধ হলেও অনুভবে প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় উপলব্ধি করতে পারে। সেই উপলব্ধিতে তার মনে নানা প্রশ্ন, নানা শঙ্কা জাগে। আবেগ-অনুভূতি সবই তার অনুভবের জগৎকে ঘিরে। তার এই চিন্তার জগতে নতুন উদ্দীপনা জাগায় ফুলের মধুমদির সুগন্ধ। এই গন্ধেই তার আকাশ-পাতাল মনে হয়।

২. “দেখবি তখন- প্রবাস কেমন লাগে?”—অন্ধবধূ একথা বলেছে কেন?
উত্তর: স্বামীর প্রতি অভিমানে অন্ধবধূ আলোচ্য কথাটি বলেছে।
অন্ধবধূর স্বামী প্রবাসী। অন্ধবধূ তার জন্য দিনের পর দিন প্রতীক্ষায় থাকে। সে কোকিলের ডাক শুনে, দিঘির ঘাটের নতুন সিঁড়ির অনুভবে ঋতু বদল বুঝতে পারে। এভাবে ঋতুর পর ঋতু চলে গেলেও প্রবাসী স্বামী অন্ধবধূর সান্নিধ্যে আসেনি। বধূটি ভাবে সে মারা গেলে স্বামী নিশ্চয়ই দ্রুত ঘরে নতুন বউ আনবে। তখন প্রবাসের জীবন তার আর ভালো লাগবে না।

৩. অন্ধবধূ কীভাবে ঋতুর বিবর্তন জেনে নিতে চায়?
উত্তর: অন্ধবধূ তার ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে ঋতুর বিবর্তন জেনে নিতে চায়।
অন্ধবধূ একজন ইন্দ্রিয়সচেতন মানুষ। সে অনুভবে জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। তার সেই জ্ঞানের আলোকে কোকিলের ডাক শুনে সে বসন্তের আগমন বোঝে, দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগায় গ্রীষ্মের আগমন বোঝে। এভাবেই গভীর ইন্দ্রিয়সচেতনতা ও জ্ঞান দিয়ে অন্ধবধূ ঋতুর বিবর্তন বুঝে নিতে চায়।

৪. দৃষ্টিহীনদের প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব কীভাবে? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে দৃষ্টিহীনদের প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব।
দৃষ্টিহীনেরা নিজেদের অসহায় মনে করে। কিন্তু নিজেদের অসহায় মনে না করে নিজের অন্তর্দৃষ্টিকে প্রসারিত করলে দৃষ্টিহীন হলেও প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় অনুভব করা যায়। প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। আর এভাবে দৃষ্টিহীনেরা ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে নিজেদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারে।

৫. অন্ধবধূ দিঘির জলে তলিয়ে গেলে মন্দ হতো না বলে কেন?
উত্তর: অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য অন্ধবধূ দিঘির জলে তলিয়ে গেলে মন্দ হতো না বলে।
অন্ধবধূ অন্ধত্বের কষ্ট গভীরভাবে অনুধাবন করে। সবাই অবজ্ঞা করে বলে নিজেকে সে বড় অসহায় মনে করে। তাই অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি খুঁজে পেতে চায়। পা পিছলিয়ে দিঘির জলে তলিয়ে গেলে মন্দ হতো না বলে সে মনে করে।

৬. “বাঁচবি তোরা-দাদা তো তোর আগে?”—অন্ধবধূ এ কথা বলেছে কেন?
উত্তর: অন্ধবধূ নিজেকে অসহায় এবং পরিবারের বোঝা মনে করে প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছে।
অন্ধবধূ তার পরিবারে নিগৃহীত। স্বামীর কাছ থেকে পায় অবজ্ঞা। অন্ধবধূ তাই অন্ধত্বকে নিজের অভিশাপ মনে করে। মনে করে অন্ধত্বের কারণে সে পরিবারের বোঝা। এই কারণে মরে গিয়ে অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে পরিবারকে মুক্তি দিতে চায়। আর এজন্যই সে ঠাকুরঝিকে বলে, “বাঁচবি তোরা- দাদা তো তোর আগে?”

৭. ‘কোকিল-ডাকা শুনেছি সেই কবে’—পঙ্ক্তিটি দ্বারা প্রকৃতির কোন রূপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়?
উত্তর: ‘কোকিল ডাকা শুনেছি সেই কবে' পঙ্ক্তিটি থেকে বোঝা যায় যে বসন্ত ঋতু বিদায় নিয়েছে।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অনন্য অনুভূতির জগৎ তুলে ধরা হয়েছে। অন্ধবধূ তার স্পর্শ ও অনুভূতির মাধ্যমে প্রকৃতির সৌন্দর্য বুঝতে সক্ষম। কোকিলের ডাক শুনে সে ঋতুর পরিবর্তন উপলব্ধি করতে পারে। যেহেতু কোকিল সাধারণত বসন্তকালে ডাকতে শুরু করে, তাই এই উক্তির মাধ্যমে অন্ধবধূ ইঙ্গিত দিয়েছে যে বসন্ত অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।

৮. ‘বাঁচবি তোরা দাদা তো তার আগে?’—অন্ধবধূ একথা বলেছে কেন?
উত্তর: অন্ধবধূ মনে করে অন্ধ বলে সে সকলের নিকট বোঝা। তাই মনের দুঃখে সে আলোচ্য উক্তিটি করেছে।
সমাজে ও সংসারে দৃষ্টিহীন বলে অন্ধবধূ নিজেকে খুব অসহায় মনে করে। তার ধারণা যে নিজের সংসারেও সে উপেক্ষিত। সে নিজেকে সংসারে একটি বোঝা বলে মনে করে। তার ধারণা সে মরে গেলে তার স্বামী, ঠাকুরঝি সবাই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। এসব কথা মনে করে সে ঠাকুরঝির উদ্দেশ্যে উক্তিটি করেছে।

৯. অন্ধবধূ অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যাওয়ার কথা বলেছে কেন?
উত্তর: অন্ধবধূ অসহায়ভাবে জীবনযাপন করার চেয়ে মরে গেলে অন্ধত্বের অভিশাপ ঘুচবে মনে করে অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যাক বলেছে।
অন্ধত্বের কারণে অন্ধবধূ সবার কাছে অবহেলিত। তাই সে নিজেকে পরিবারের জন্য বোঝা ভাবতে থাকে। তাই মরে গেলে এই অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলত বলে মনে করে। এজন্য অন্ধবধূ অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যাওয়ার কথা বলেছে।

১০. ‘দিঘীর ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগে’—কথাটি বুঝিয়ে বলো।
উত্তর: অন্ধবধূ তার প্রখর অনুভূতিশক্তি দ্বারা দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগার কথা বুঝেছে।
অন্ধবধূ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও সে একজন ইন্দ্রিয়সচেতন মানুষ। এই ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে সে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছে। দিঘির ঘাটের শ্যাওলা পড়া সিঁড়ির অস্তিত্ব টের পেয়েছে। দিঘির পানি কমে গেছে। অনুভবে সে নতুন সিঁড়ি জাগার কথা বুঝেছে।

১১. বধূটির ঘরে ফিরে যাওয়ার তাড়া ছিল না কেন?
উত্তর: ঘরের কোণে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজ ছিল না বলে অন্ধবধূর ঘরে ফিরে যাওয়ার তাড়া ছিল না।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় অন্ধবধূ স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন। ঘরের কোণে তার একাকী সময় কাটতে চায় না। মনের ব্যথা ভুলতে প্রকৃতির সাথে যে মিশে যেতে চায়। দিঘির স্নিগ্ধ শীতল জলে সে মায়ের ভালোবাসার পরশ খুঁজে পায়। অন্ধবধূ দিঘির শীতল জলের সাথে নিজের একাকিত্বের দুঃখ ভাগাভাগি করতে চায়। এজন্য অন্ধবধূ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চায় না।

১২. অন্ধবধূ কীভাবে বুঝতে পারে পায়ের তলায় ঝরা বকুল পড়েছে?
উত্তর: অন্ধবধূ তার অনুভূতিশক্তির দ্বারা বুঝতে পারে পায়ের তলায় ঝরা-বকুল পড়েছে।
দৃষ্টিহীনদের অনুভূতিশক্তি হয় প্রখর। তারা জগতের সকল কিছু তাদের অনুভবে বুঝতে চেষ্টা করে। অন্তর্দৃষ্টিকে প্রসারিত করে বিভিন্ন বস্তুর সম্পর্কে দৃষ্টিহীনরা জ্ঞান রাখে। অন্ধবধূ তার অনুভবে জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। এর মাধ্যমেই সে পায়ের তলায় ঝরা-বকুলের উপস্থিতি টের পায়।

১৩. কীসের পরশ অন্ধবধূর নিকট মায়ের স্নেহের ন্যায়?
উত্তর: দিঘির শীতল জলের পরশ অন্ধবধূর নিকট মায়ের স্নেহের ন্যায়।
বন্দিত্ব ও নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে অন্ধবধূর জীবন কাটে। বন্দী ও নিঃসঙ্গ জীবন থেকে কিছুটা সময়ের জন্য মুক্তি মেলে স্নান উপলক্ষে দিঘির ঘাটে গমন করলে। মায়ের স্নেহ যেমন সন্তানের সকল দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেয়, তেমনি দিঘির শীতল জলও অন্ধবধূর নিকট মাতৃস্নেহের ন্যায় মনে হয়।

১৪. অন্ধবধূ তার স্বামীকে কীভাবে বাঁচাতে চায়?
উত্তর: দিঘির ঘাটে জেগে ওঠা শ্যাওলাপড়া সিঁড়িতে পিছলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর মাধ্যমে অন্ধবধূ তার স্বামীকে বাঁচাতে চায়।
‘অন্ধবধূ’ কবিতার বধূ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তার ইন্দ্রিয় শক্তি প্রখর। তাই স্নান করতে দিঘির পাড়ে এসে শ্যাওলাপড়া সিঁড়িতে পা দিয়েই সে বিপদের আশঙ্কা করে। আবার ভাবে, যদি সিঁড়ি থেকে পড়ে দিঘির পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়, তাহলে সবাই শান্তি পাবে এবং স্বামীও বেঁচে যাবে।

১৫. কোন পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে অন্ধবধূ অন্তরের যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘মন্দ নেহাত হয় না কিন্তু তায়—/অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব ঢুকে যায়।’ এ পঙ্িক্তটির মাধ্যমেই অন্ধবধূ তার অন্তরের যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন। অন্ধবধূ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তার রয়েছে সূক্ষ্ম অনুভূতি শক্তি। যার সাহায্যে সে তার চারপাশের প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের অন্তর্জগৎকে বোঝার চেষ্টা করে। সে উপলব্ধি করে তার অন্ধত্ব সকলের নিকট কতটা অসহনীয়। কোনো ব্যাপারে নিশ্চিত হতে কাউকে কোনো প্রশ্ন করলে তার উত্তর দিতেও যেন তাদের কষ্ট হয়। তাই সে ঠাকুরঝিকে জানিয়ে দেয়—শ্যাওলা ধরা পিচ্ছিল সিঁড়িতে পা পিছলে জলে পড়ে তার মৃত্যু হলে মন্দ হতো না।

১৬. ‘দেখবি তখন—প্রবাস কেমন লাগে?’—অন্ধবধূ একথা বলেছেন কেন?
উত্তর: স্বামীর প্রতি দারুণ অভিমান থেকে অন্ধবধূ আলোচ্য কথাটি বলেছে।
অন্ধবধূর স্বামী প্রবাসী। অন্ধবধূ তার জন্য দিনের পর দিন প্রতীক্ষায় থাকে। সে কোকিলের ডাক শুনে, দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ির অনুভবে ঋতু বদল বুঝতে পারে। এভাবে ঋতুর পর ঋতু চলে গেলেও প্রবাসী স্বামী অন্ধবধূর সান্নিধ্যে আসেনি। বধূটি ভাবে সে মারা গেলে স্বামী নিশ্চয় দ্রুত ঘরে নতুন বউ আনবে। তখন প্রবাসের জীবন তার আর ভালো লাগবে না। মূলত আলোচ্য উক্তিটির মধ্য দিয়ে স্বামী পরিত্যক্ত অন্ধবধূর স্বামীর প্রতি দারুণ ক্ষোভ ও অভিমান পরিস্ফুটিত।

১৭. অন্ধবধূ কীভাবে বুঝতে পারে পায়ের তলায় ঝরা-বকুল পড়েছে?
উত্তর: অন্ধবধূ তার প্রখর অনুভূতি শক্তি দ্বারা বুঝতে পারে তার পায়ের তলায় ঝরা-বকুল পড়েছে।
দৃষ্টিহীনদের অনুভূতিশক্তি হয় প্রখর। তারা জগতকে দৃষ্টি দ্বারা প্রত্যক্ষ করতে না পারলেও অনুভবে বুঝতে চেষ্টা করে জগতের রূপ-রস-গন্ধ। মূলত অন্তরদৃষ্টিকে প্রসারিত করে বিভিন্ন বস্তুর সম্পর্কে দৃষ্টিহীনেরা জ্ঞান রাখে। ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূটিও অনুভবঋদ্ধ মানুষ। তার প্রখর অনুভূতি শক্তি দ্বারাই সে জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। এই অনুভূতি শক্তিতেই সে পায়ের তলায় ঝরা-বকুলের উপস্থিতিটের পায়।

১৮. ‘একলা থাকা-সেই তো গৃহকোণ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রশ্নোক্ত পঙ্ক্তিটি দ্বারা অন্ধবধূর একলা ঘরে আবদ্ধ থাকার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে।
অন্ধবধূ দৃষ্টিহীন হলেও অনুভবে সবকিছু বুঝতে পারে, তাই তো সে পুকুরপাড়ের শ্যাওলা, নতুন ঋতুর আগমন সবই উপলব্ধি করে। কিন্তু তার ননদ এই প্রকৃতি থেকে সরিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। তখন অন্ধবধূ ঘরে নিজের আবদ্ধ থাকার বিষয়টি ব্যক্ত করে।

১৯. ‘বাঁচবি তোরা-দাদা তো তোর আগে?’—অন্ধবন্ধু একথা বলেছে কেন?
উত্তর: অন্ধবধূ মনে করে অন্ধ বলে সে সকলের নিকট বোঝা। তাই মনের দুঃখে আলোচ্য উক্তিটি করে।
সমাজে দৃষ্টিহীন বলে অন্ধবধূ নিজেকে খুব অসহায় মনে করে। তার ধারণা নিজের সংসারেও সে উপেক্ষিত। সে নিজেকে সংসারের একটি বোঝা মনে করে। তার ধারণা সে মরে গেলে তার স্বামী, ঠাকুরঝি সবাই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। এসব কথা ভেবেই সে ঠাকুরঝির উদ্দেশ্যে উক্তিটি করেছে।

২০. ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় বধূটির ঘরে ফিরে যাওয়ার তাড়া ছিল না কেন?
উত্তর: ঘরের কোণে বসে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ নেই বলে অন্ধবধূর ঘরে ফিরে যাওয়ার তাড়া ছিল না।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় অন্ধবধূ স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন। ঘরের কোণে তাকে একাকী সময় কাটাতে হয়। কিন্তু এমন জীবন সে চায় না। এজন্য প্রকৃতির সাতেই তার সখ্যতা দিঘির জলে খুঁজে পায় মায়ের ভালোবাসার পরশ। মূলত অন্ধবধূ দিঘির শীতল জলে নিজের একাকিত্বের দুঃখ ভুলতে চায়। এজন্য অন্ধবধূ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চায় না।

২১. ‘অন্ধবধূ’ কবিতার বন্ধুটি অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব ঢুকে যাওয়ার কথা বলেছেন কেন?
উত্তর: ‘অন্ধবধূ’ কবিতা বধূটি অন্ধত্বের কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জলে ডুবে মরে অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যাওয়ার কথা বলেছে।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় বধূটি অন্ধ। এই অন্ধত্বের কারণে সে সবার কাছে অবহেলিত। পরিবারের কাছে অপাঙ্কের, বোঝা তুল্য। একারণেই মরে গিয়ে সে অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চায়। এজন্য অন্ধবধূ অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যাওয়ার কথা বলেছেন।

২২. অন্ধবধূর আকাশ পাতাল মনে হয় কেন?
উত্তর: রাতের ফুলের মোহময় সুগন্ধে অন্ধবধূর আকাশ-পাতাল মনে হয়।
অন্ধবধূ একজন অনুভবঋদ্ধ মানুষ। সে অন্ধ হলেও অনুভবে প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় উপলব্ধি করতে পারে। সেই উপলব্ধিতে তার মনে নানা প্রশ্ন, নানা শঙ্কা জাগে। আবেগ-অনুভূতি সবই তার অনুভবের জগতকে ঘিরে। তার এই চিন্তার জগতে নতুন উদ্দীপনা জাগায় ফুলের মধুমদির সুগন্ধ। এই গন্ধেই তার আকাশ-পাতাল মনে হয়।

২৩. অন্ধবধূ কীভাবে ঋতুর বিবর্তন জেনে নিতে চায়?
উত্তর: অন্ধবধূ তার ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে ঋতুর বিবর্তন জেনে নিতে চায়।
অন্ধবধূ একজন ইন্দ্রিয়সচেতন মানুষ। সে অনুভবে জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। আর সেই জ্ঞানের আলোকে কোকিলের ডাক শুনে সে বসন্তের আগমণ বোঝে, দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগা অনুভব করে গ্রীষ্মের আগমণ বোঝে। এভাবেই গভীর ইন্দ্রিয়সচেতনতা ও জ্ঞান দিয়ে অন্ধবধূ ঋতুর বিবর্তন বুঝে নিতে চায়।

২৪. ‘অন্ধবধূ’ কবিতার বধূটির বর্ণনা দাও?
উত্তর: ‘অন্ধবধূ’ কবিতার বধূটি অন্ধ, কিন্তু অনুভবঋদ্ধ মানুষ অর্থাৎ তার অনুভূতি শক্তি প্রখর। এই অনুভব শক্তি দ্বারাই সে পায়ের নিচে নরম।
বস্তুর অস্তিত্ব, কোকিলের ডাক শুনে নতুন ঋতুর আগমন অনুমান করে। শ্যাওলায় পা রেখে নতুন সিঁড়ি জেগে ওঠা অনুভব করে। কবিতায় বধূটি অন্ধ হলেও প্রবল আত্মমর্যাদা বোধে সমৃদ্ধ। স্বামী সংসার কর্তৃক চরম অবহেলিত অন্ধবধূ জলে ডুবে অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি প্রত্যাশী হলেও সে নৈরাশ্যবাদী নয়। জীবনের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধ বিদ্যমান। নিষ্ঠুর সমাজে অবহেলিত অন্ধবধূ প্রকৃতিকে করেছে ব্যথা ভুলানোর একমাত্র অবলম্বন।

২৫. জ্যৈষ্ঠ আসতে ক-দিন দেরি ভাই-
আমের গায়ে বরণ দেখা যায়—
পঙ্ক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অনুভবের অসাধারণ এক জগৎ আলোচ্য অংশে ব্যক্ত হয়েছে।
প্রকৃতির বিচিত্র রঙের ধারণা ও অনুভবে অন্ধবধূ সমৃদ্ধ। সেই জ্ঞান ও অনুভবে সে জেনে নিতে চায় ঋতুর পরিবর্তন। প্রখর অনুভূতির শক্তিতে আমের গায়ের বরণ থেকে সে বুঝে নেয় নতুন ঋতুর আগমণ। আলোচ্য পঙ্ক্তিটি মূলত দৃষ্টিহীনের প্রবল ইন্দ্রিয়সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ।

২৬. ‘অন্ধ গেলে কী আর হবে বোন?’—আলোচ্য পঙ্ক্তিটিতে কী প্রতিফলিত হয়েছে?
উত্তর: অন্ধলোকের অন্ধত্বের যে গভীর মনকষ্ঠ আলোচ্য পঙ্ক্তিতে তাই প্রতিফলিত হয়েছে।
সমাজ দৃষ্টিহীনদের অবজ্ঞা করে। তাদেরকে অবহেলার চোখে দেখে। একজন অন্ধব্যক্তি সমাজে অপাঙ্গেয় হিসেবে পরিগণিত। তারা যেন সমাজ সংসারের বোঝা। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূ তার অন্ধত্বের কারণে স্বামী সংসারে চরম অবহেলিত। সংসারের সে অনেকটা-বোঝা স্বরূপ। তাই তার মৃত্যুতে কারও তেমন কিছু যায় আসবে না। বরং তার মৃত্যু যেন সকলকে অন্ধত্বে অভিশাপ থেকে মুক্তি দিবে। অন্ধবধূর উপর্যুক্ত উক্তির মধ্য দিয়ে মূলত অন্ধ লোকের অসহায়ত্ব এবং গভীর মনঃকষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে।

২৭. অন্ধবধূর প্রতি স্বামীর মনোভাব ব্যক্ত করো?
উত্তর: অন্ধবধূ স্বামী কর্তৃক উপেক্ষিত। কবিতায় স্বামীর বিবরণ বিশদ ভাবে না থাকলেও অন্ধবধূর বক্তব্যে জানা যায় তার স্বামী প্রবাসী।
অন্ধবধূ তার প্রতিক্ষায় দিন অতিবাহিত করলে ও সে আসে না। একারণে অন্ধবধূ স্বামীর প্রতি চরম ক্ষোভ ও অভিমান থেকে মৃত্যু কামনা করে। তার মৃত্যুতেই স্বামী বন্ধন মুক্ত হবে, আষাঢ় মাসে আবার বিয়ে করবে। তখন আর সে সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে একাকী ফেলে প্রবাসে অবস্থান করতে পারবে না। স্বামী সম্পর্কে অন্ধবধূর এরূপ বক্তব্যে তার প্রতি স্বামীর চরম অবজ্ঞা, অবহেলার দিকটি পরিস্ফুটিত।

২৮. ‘বাঁচবি তোরা - দাদা তো তোর আগে’—উক্তিটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা অন্ধবধূর মৃত্যুতে সবার রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে।
আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধীরা নানা অবহেলার শিকার হয়। তাদের প্রতি সবাই হীনদৃষ্টি প্রদর্শন করে। কবিতায় অন্ধবধূর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সে মরলে যেন সবাই তার হাত থেকে রক্ষা পায়।

২৯ ‘এই আষাঢ়েই আবার বিয়ে হবে’—এখানে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা অন্ধবধূর মনের আক্ষেপ প্রকাশ পেয়েছে।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবন্ধীদের প্রতিনিয়ত নানা শঙ্কার মুখে পড়তে হয়। তেমনি অন্ধবধূকেও তার স্বামীর করুণার পাত্র হয়ে থাকতে হয়। সে মরলে যেন তার স্বামী রক্ষা পায়। ঘরে নতুন বউ এনে নতুন করে সংসার সাজাতে পারে।

৩০. ‘প্রবাসজীবন কেমন লাগে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রবাসজীবন কেমন লাগে বলতে অপেক্ষার বিষয়টি বোঝানো হয়েছে।
পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের কাজ হলো কারও জন্য অপেক্ষা করা। অন্ধবধূ তার অনুভব শক্তি দিয়ে এ বিষয়টি বুঝতে পারে, তাই সে বিরহকাতর হয়ে পড়ে। মূলত অপেক্ষার বিষয়টি বোঝাতে অন্ধবধূ প্রবাসজীবনের কথা উল্লেখ করে।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। জীবনের এই স্বল্প সময়ের সমগ্র হিসাব চুকিয়ে, সব সম্পর্ক ছিন্ন করে পরপারে চলে যেতে হয়। গৃহবধূ সুদীপা মাঝে মাঝে দুঃখ করে বলেন, ‘সুন্দর এই পৃথিবী, ঝি ঝি ডাকা সন্ধ্যা, জোছনা ভরা রাত সব ছেড়ে আমাদের বিদায় নিতে হবে।

ক. ‘মধুমদির বাসে’ কথাটির অর্থ কী?
খ. ‘কোকিল-ডাকা শুনেছি সেই কবে’—পঙ্ক্তিটি দ্বারা প্রকৃতির কোন রূপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়?
গ. ‘উদ্দীপকের বক্তব্য ‘অন্ধবধূ’ কবিতার যে বিশেষ দিকটিকে আলোকপাত করেছে তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. ‘উদ্দীপকের বক্তব্যে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার সমগ্র ভাবের প্রতিফলন ঘটেনি’—বিশ্লেষণ কর।

ক. ‘মধুমদির বাসে’ কথাটির অর্থ হলো—মধুর সুগন্ধে ভরা পরিবেশ।
খ. ‘কোকিল ডাকা শুনেছি সেই কবে' পঙ্ক্তিটি থেকে বোঝা যায় যে বসন্ত ঋতু বিদায় নিয়েছে।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অনন্য অনুভূতির জগৎ তুলে ধরা হয়েছে। অন্ধবধূ তার স্পর্শ ও অনুভূতির মাধ্যমে প্রকৃতির সৌন্দর্য বুঝতে সক্ষম। কোকিলের ডাক শুনে সে ঋতুর পরিবর্তন উপলব্ধি করতে পারে। যেহেতু কোকিল সাধারণত বসন্তকালে ডাকতে শুরু করে, তাই এই উক্তির মাধ্যমে অন্ধবধূ ইঙ্গিত দিয়েছে যে বসন্ত অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।

গ. উদ্দীপকের বক্তব্য ‘মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী’ এবং ‘সব সম্পর্ক ছিন্ন করে পরপারে চলে যেতে হয়’—এই চিন্তাধারা ‘অন্ধবধূ’ কবিতার মূলভাবের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কবিতার বধূ একজন অন্ধ নারী, যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি মানসিক ও আবেগিক কষ্টও বহন করে চলেছে। সে অনুভব করে, পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে না পারলেও জীবনের প্রতি তার টান আছে। কিন্তু সে জানে, একসময় এই জীবন ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে, যেমন সবাইকেই একদিন চলে যেতে হয়। উদ্দীপকের গৃহবধূ সুদীপা যেমন ঝি ঝি পোকার ডাক, জোছনার আলো, প্রকৃতির সৌন্দর্য ছেড়ে যেতে কষ্ট পান, তেমনই 'অন্ধবধূ' কবিতার বধূও অনুভব করে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও বিচ্ছেদের বেদনা। সে উপলব্ধি করে, তার দুঃখের ভাগ নেওয়ার কেউ নেই, তার একাকীত্ব তাকে তীব্র কষ্ট দেয়। তবুও সে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব মেনে নিয়ে সামনের পথে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কবিতায় একদিকে যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্যের উল্লেখ রয়েছে—ঝরা বকুল, কোকিলের ডাক, দীঘির ঘাট, স্নিগ্ধ শীতল জল, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে বিচ্ছেদ, মৃত্যু ও অন্ধকার জীবনের যন্ত্রণা। কবিতার বধূ বুঝতে পারে, তার মতো অন্ধ মানুষের দুঃখ কেউ বোঝে না, ঠিক যেমন মৃত্যুর পর পৃথিবী কাউকে মনে রাখে না। এইভাবে, উদ্দীপকের বক্তব্য 'অন্ধবধূ' কবিতার জীবনের অনিত্যতা, দুঃখ এবং বিচ্ছেদের ভাবনাকে প্রতিফলিত করে। কবিতার মূল ভাবনার সঙ্গে এটি একেবারে সঙ্গতিপূর্ণ, কারণ এখানে একইসঙ্গে জীবনের সৌন্দর্য, তার ক্ষণস্থায়িত্ব ও অনিবার্য বিদায়ের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।

ঘ. ‘উদ্দীপকের বক্তব্যে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার সমগ্র ভাবের প্রতিফলন ঘটেনি’—বক্তব্যটি যথার্থ। উদ্দীপকের বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। জীবনের এই স্বল্প সময়ের সমগ্র হিসাব চুকিয়ে, সব সম্পর্ক ছিন্ন করে পরপারে চলে যেতে হয়।’ এতে মূলত জীবনের অনিত্যতা ও মৃত্যুর অনিবার্যতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ‘অন্ধবধূ’ কবিতার ভাব কেবল জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব বা মৃত্যুর অনিবার্যতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে এক অন্ধ নারীর বেদনা, একাকীত্ব, সামাজিক বঞ্চনা এবং অন্তরের গভীর আবেগও প্রকাশ পেয়েছে। কবিতার অন্ধ গৃহবধূ বুঝতে পারে যে একদিন তাকে এই জীবন ছেড়ে যেতে হবে। কিন্তু কবিতাটি শুধুমাত্র মৃত্যুর বেদনা নিয়ে নয়, বরং জীবনের চলমান কষ্ট ও সংগ্রামের প্রতিচিত্রও তুলে ধরে। অন্ধবধূ কেবল মৃত্যুর চিন্তায় বিভোর নয়, বরং সে অনুভব করে তার দুঃখের ভাগ নেওয়ার কেউ নেই, তার অন্ধত্ব তাকে আরও বেশি একাকীত্বের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। সে বোঝে, দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষকে সমাজ প্রায় ভুলেই যায়, যেমন ভবিষ্যতে প্রবাসী স্বামী তাকে ভুলে যেতে পারে। কিন্তু উদ্দীপকের বক্তব্যে এই দুঃখ বা সমাজের অবহেলার প্রসঙ্গ নেই। এছাড়াও কবিতায় ঝরা বকুল, কোকিলের ডাক, দীঘির ঘাট, শীতল জল ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতি এক বিশেষ অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। অন্ধ গৃহবধূ স্পর্শ ও গন্ধের মাধ্যমে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপলব্ধি করে এবং এতে সে সাময়িক সান্ত¡না খোঁজে। কিন্তু উদ্দীপকের বক্তব্যে এই প্রকৃতির রূপ-রস বা জীবনের প্রতি টানের কোনো উল্লেখ নেই। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের বক্তব্য 'অন্ধবধূ' কবিতার ভাবের কেবল একটি অংশকে প্রতিফলিত করেছে, সমগ্র ভাবকে নয়। এটি মূলত জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও মৃত্যুর অনিবার্যতার দিকটি তুলে ধরেছে, কিন্তু কবিতার গভীর বেদনা, একাকীত্ব, সামাজিক বঞ্চনা ও প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণের অনুভূতিগুলো প্রতিফলিত হয়নি।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ২:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
আমাদের সমাজ ও সংসারে প্রতিবন্ধীদেরকে ছোট করে দেখা হয়, মনে করা হয় তারা বোঝা। এটা করা উচিত নয়, কেননা তারাও মানুষ। প্রতিবন্ধী মানুষকে অবজ্ঞা করলে তাদের দুঃখ আরো বেড়ে যায়। আমাদের উচিত তাদের ভালোবাসা, তাদের যথোপযুক্ত মূল্য দেয়া। নির্মল পরিবেশ পেলে তারাও মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে। এমনকি তারা হয়ে উঠতে পারে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব। একটি সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য তাদের সঙ্গে আমাদের ভালোবাসা ও মমত্বময় সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ক. সমাজ কাদের অবজ্ঞা করে?
খ. ‘বাঁচবি তোরা দাদা তো তার আগে?’—অন্ধবধূ একথা বলেছে কেন?
গ. উদ্দীপকের সঙ্গে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার সাদৃশ্য কিংবা বৈসাদৃশ্য আপনার নিজের ভাষায় তুলে ধরো।
ঘ. ‘উদ্দীপকটি ‘অন্ধবধূ’ কবিতার আংশিক ভাব ধারণ করেছে।’ মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

ক. সমাজ দৃষ্টিহীনদের অবজ্ঞা করে।
খ. অন্ধবধূ মনে করে অন্ধ বলে সে সকলের নিকট বোঝা। তাই মনের দুঃখে সে আলোচ্য উক্তিটি করেছে।
সমাজে ও সংসারে দৃষ্টিহীন বলে অন্ধবধূ নিজেকে খুব অসহায় মনে করে। তার ধারণা যে নিজের সংসারেও সে উপেক্ষিত। সে নিজেকে সংসারে একটি বোঝা বলে মনে করে। তার ধারণা সে মরে গেলে তার স্বামী, ঠাকুরঝি সবাই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। এসব কথা মনে করে সে ঠাকুরঝির উদ্দেশ্যে উক্তিটি করেছে।

গ. উদ্দীপকের সঙ্গে 'অন্ধবধূ' কবিতার সাদৃশ্য নয়, বৈসাদৃশ্য রয়েছে। অন্ধবধূর প্রতিবন্ধকতা জয় করতে না পারার বিষয়টিই উদ্দীপকের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ হয়েছে।
প্রতিবন্ধীরা আমাদের সমাজে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ। সমাজে চলতে গেলে তাদের অন্যান্য মানুষের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনীয় সুযোগ এবং যথেষ্ট পরিমাণ সহায়তা পেলে তারাও প্রতিবন্ধী অবস্থা কাটিয়ে সমাজের অন্য কর্মক্ষম মানুষের মতো হয়ে উঠতে পারে। আমাদের আলোচ্য 'অন্ধবধূ' কবিতায় অন্ধবধূ একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলেও সে প্রকৃতিপ্রেমী। সে তার অনুভবের সাহায্যে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত। কিন্তু সে সমাজের একজন কর্মক্ষম মানুষ নয়। নিজের প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে সে সমাজের স্বাভাবিক মানুষের মত সক্ষম বা ব্যস্ত হয়ে উঠতে পারে নি। অন্যদিকে উদ্দীপকটিতে এর বিপরীত চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবন্ধীরা যথাযথ মনোযোগ ও সহায়তা পেলে দুঃখের অন্ধকার ছেড়ে আলোকিত জীবনের অধিকারী হতে পারে। এমনকি তারা হয়ে উঠতে পারে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব। সে কথাও রয়েছে উদ্দীপকে। তাই বলা যায় 'অন্ধবধূ' কবিতায় অন্ধবধূর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে না পারার ব্যর্থতাটাই উদ্দীপকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয় নি।

ঘ. সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিবন্ধীরা পর্যাপ্ত সুযোগ পেলে নিজেদের স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত করে তুলতে পারে।
সমাজে প্রতিবন্ধীরা স্বাভাবিক মানুষের মতো নয়। তাদেরকে অবহেলা না করে আমাদের বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা উচিত। কেননা সকলের সহযোগিতা পেলে এই বিশেষ ধরনের মানুষগুলো নিজেদের মেলে ধরতে পারে। তারাও দুঃখের অন্ধকার ছেড়ে আলোকিত জীবনের অধিকারী হতে পারে।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূ জন্ম থেকেই অন্ধ। আবার সে পল্লিগ্রামে মানুষ। অবশ্য অন্ধবধূ যথেষ্ট অনুভূতি সম্পন্ন মানুষ। তবু তার জীবন স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয় নি। ফলে সে স্বনির্ভর নয়। তার জীবন দুঃখ-কষ্টে পরিপূর্ণ। স্বামীর প্রতীক্ষা, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা কিংবা গৃহকোণ তার জীবনের অনুষঙ্গ। অন্যদিকে উদ্দীপকটিতে ফুটে উঠেছে 'অন্ধবধূ' কবিতার বিপরীত দিকগুলো। উদ্দীপকে বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধীদের মূল্যায়ন করতে হবে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তারাও মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে। আর আমাদের উচিত হবে প্রতিবন্ধীদের প্রতি ভালোবাসা আর সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া।
প্রতিবন্ধীদের অবজ্ঞার চোখে দেখা উচিত নয়। তারাও অন্যদের মতো বিকশিত হয়ে উঠতে পারে। সে জন্য প্রয়োজন প্রতিবন্ধীদের প্রতি বেশি করে ইতিবাচক মনোভাব দেখানো। উপরিউক্ত আলোচনা শেষে তাই বলা যায়, ‘অন্ধবধূ' কবিতাটি উদ্দীপকের আংশিক চেতনা ধারণ করেছে।’ মন্তব্যটি যথার্থ।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৩:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
“ও যার চোখ নাই
তার চোখের জলের
কীই বা আছে দাম”

ক. অন্ধবধূ কোথায় বসে মধুমদির গন্ধে আচ্ছন্ন হয়?
খ. অন্ধবধূ অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যাওয়ার কথা বলেছে কেন?
গ. উদ্দীপকটি ‘অন্ধবধূ’ কবিতাতে অন্ধবধূর হৃদয়ের প্রতিধ্বনি যেভাবে পাওয়া যায় তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উদ্দীপকটি ‘অন্ধবধূ’ কবিতার পূর্ণ প্রতিফলন কি? বিশ্লেষণী মতামত দাও।

ক. অন্ধবধূ দোরের পাশে বসে মধুমদির গন্ধে আচ্ছন্ন হয়।
খ. অন্ধবধূ অসহায়ভাবে জীবনযাপন করার চেয়ে মরে গেলে অন্ধত্বের অভিশাপ ঘুচবে মনে করে অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যাক বলেছে।
অন্ধত্বের কারণে অন্ধবধূ সবার কাছে অবহেলিত। তাই সে নিজেকে পরিবারের জন্য বোঝা ভাবতে থাকে। তাই মরে গেলে এই অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলত বলে মনে করে। এজন্য অন্ধবধূ অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যাওয়ার কথা বলেছে।

গ. উদ্দীপকটিতে ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় বর্ণিত অন্ধবধূর হৃদয়ের করুণ অভিব্যক্তিই প্রকাশিত হয়েছে।
‘অন্ধবধূ’ কবিতাটিতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী একজন নারীর হৃদয়ের হাহাকার প্রকাশিত হয়েছে। অন্ধ হওয়ার কারণে সে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অন্ধবধূ অন্ধত্বের কষ্ট গভীরভাবে অনুভব করে। দিঘির জলে ডুবে মরলে তার অন্ধত্ব চিরতরে ঘুচে যেত এমন খেদোক্তিও ব্যক্ত করে সে। জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থাকা সত্ত্বেও সে প্রেম-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। প্রবাসী স্বামীর প্রতি তাই তার অনেক অভিমান। উদ্দীপকে প্রকাশিত হয়েছে মানবজীবনের এক করুণ অভিব্যক্তি। সমাজে অন্ধ ব্যক্তি অনেকটাই অবহেলা ও করুণার পাত্র হয়ে থাকে। অন্ধ মানুষও যে সাধারণ মানুষের মতো স্নেহ ভালোবাসা মায়া মমতা পাওয়ার অধিকারী সেটি আমরা ভেবে দেখি না। তারও যে বেদনা আছে দুঃখবোধ আছে সেটিও বিবেচনা করি না। আর সে কারণেই বলা হয়ে থাকে তার চোখের জলের কোনো মূল্য নেই। ঠিক একইভাবে কবিতায় উল্লেখ রয়েছে “চক্ষুহীনার কী কথা কার কাছে”। কাজে কাজেই উদ্দীপকের বক্তব্য অন্ধবধূ কবিতার অন্ধবধূর হৃদয়ের যথার্থ প্রতিধ্বনি।

ঘ. ‘অন্ধবধূ’ কবিতার মূল প্রতিপাদ্য হলো দৃষ্টিহীনদের সহানুভূতি জানানো। সেই বিষয় বিবেচনায় উদ্দীপকটি ‘অন্ধবধূ’ কবিতার পূর্ণ প্রতিফলন।
‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূ রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষ। পৃথিবীর সৌন্দর্য দুচোখ মেলে তারও তাকিয়ে দেখার কথা ছিল। তারও ভালোবাসা স্নেহ পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস সে এসবের কিছুই পায়নি। পৃথিবীটা তার কাছে শুধুই কেবলই নিকষ কালো অন্ধকার। তার মনের দুঃখ বোঝে না কেউ। অন্ধবধূ তাই দিঘির জলে ডুবে মরার কথা বলেছে। অন্ধবধূ যদিও তার তীক্ষè অনুভূতি ও ইন্দ্রিয় দিয়ে সব কিছু জয় করার চেষ্টা করেছে তবু তার হৃদয়ে ক্ষণে ক্ষণে বেজে উঠেছে বেদনার সুর।
আলোচ্য উদ্দীপকটি সংক্ষিপ্ত হলেও এর মধ্য দিয়ে বঞ্চিত মানবহৃদয়ের করুণ অভিব্যক্তি বর্ণিত হয়েছে। মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে তার দুটি চোখ। এই চোখ দিয়ে সে পৃথিবীকে অবলোকন করে। প্রিয়জনকে দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হয়। পৃথিবীর রূপ-সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়। অথচ দুটো চোখই যার অন্ধ তার কাছে পুরো পৃথিবীটা ধূসর, বিবর্ণ। অন্ধ মানুষের এই দুঃখ কেউই যেন বুঝতে পারে না।
উদ্দীপক ও ‘অন্ধবধূ’ কবিতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় উভয়টিতে রয়েছে যেন বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর গভীরতা। সমাজে দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষের আবেগ অনুভূতির কোনো মূল্য নেই। এই নিয়ে তাদের মন যন্ত্রণায় পোড়ে। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় বর্ণিত বধূটিও একা একা সব কষ্ট সহ্য করে। স্বামীর দীর্ঘদিন প্রবাস যাপন তার বেদনাকে বাড়িয়ে তোলে। জীবনটা তাই তার কাছে অর্থহীন। সংবেদনশীল কবি হয়তো অন্ধবধূর মর্মবেদনা অনেকটাই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তাঁর কবিতা আমাদের কাছে হয়ে উঠেছে বাস্তব ও জীবনধর্মী। উদ্দীপকেও একইভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের হৃদয়ের যাতনা উপস্থাপিত হয়েছে।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৪:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুলবানুর ইচ্ছে ছিল লেখাপড়া শিখে স্বনির্ভর হওয়ার। বাবার সহযোগিতায় সে ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়া শেখে পরবর্তীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে অন্ধত্বের অভিশাপ। ক. সমাজ কাদের অবজ্ঞা করে? খ. ‘দিঘীর ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগে’—কথাটি বুঝিয়ে বলো। গ. উদ্দীপকের সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার কোন অংশটি সাদৃশ্যপূর্ণ—ব্যাখ্যা করো। ঘ. “উদ্দীপকের ফুলবানু এবং অন্ধবধূ চরিত্রের ভাব সম্পূর্ণ আলাদা”—মূল্যায়ন করো।

ক. সমাজ দৃষ্টিহীনদের অবজ্ঞা করে। খ. অন্ধবধূ তার প্রখর অনুভূতিশক্তি দ্বারা দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগার কথা বুঝেছে। অন্ধবধূ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও সে একজন ইন্দ্রিয়সচেতন মানুষ। এই ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে সে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছে। দিঘির ঘাটের শ্যাওলা পড়া সিঁড়ির অস্তিত্ব টের পেয়েছে। দিঘির পানি কমে গেছে। অনুভবে সে নতুন সিঁড়ি জাগার কথা বুঝেছে।

গ. অন্ধত্বের প্রতিবন্ধকতা দূর করে জীবনকে উপভোগ করার আকাক্সক্ষার দিকটি উদ্দীপকের সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার সাদৃশ্য রচনা করেছে। সমাজ দৃষ্টিহীনদের অবজ্ঞা করে। ফলে দৃষ্টিহীনেরা নিজেদের অসহায় ভাবে। কিন্তু ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে অন্ধদের এই প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী অন্ধবধূর জীবনকে উপভোগের এই আকাক্সক্ষার স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। অন্ধবধূ নিজের ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করে। পায়ের তলায় নরম শিউলি ফুলের অস্তিত্ব, পাখির ডাকে ঋতু পরিবর্তনের অনুভূতি সবই সে নিজের চেষ্টায় বুঝতে পারে। উদ্দীপকের ফুলবানুরও নিজের অন্ধত্বের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রবল। সে দৃষ্টিহীন হলেও আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো বেঁচে থাকার বাসনা মনের মধ্যে পোষণ করে। তার এই বাসনা ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর আকাক্সক্ষার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অন্ধবধূও ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে দৃষ্টিহীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চায়।

ঘ. উদ্দীপকের ফুলবানু অদম্য ইচ্ছায় প্রতিবন্ধকতা জয় করলেও ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূটি অসহায়ত্বের নিগড়ে বন্দি। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অসহায়ত্ব বোঝাতে চেয়েছেন। কবিতার ‘অন্ধবধূ’ সমাজে অবজ্ঞার শিকার হওয়ায় নিজেকে অসহায় মনে করে। অন্ধত্বের অভিশাপে সে হতাশা ব্যক্ত করে। এই হতাশা তাকে শেষ পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হয়। প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে বধূটি সান্ত¦না খুঁজে নিতে চায়। উদ্দীপকের ফুলবানু দৃষ্টিহীন হলেও অন্ধত্বের অভিশাপকে জয় করেছে। ফলে তার ভেতর হতাশা নেই বরং অসহায়ত্বকে জয় করার গৌরব আছে। অবশ্য পরিবার তাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূ পরিবারের কাছে অসহায়ত্ব থেকে উত্তরণে কোনো সহযোগিতা পায়নি বরং অবহেলিত হয়েছে। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূটি পরিবারের মানুষের অবহেলার কারণে হতাশা প্রকাশ করেছে। কিন্তু উদ্দীপকে ফুলবানু পরিবারের সহায়তায় হতাশা থেকে মুক্তি পেয়েছে। ফলে উদ্দীপকের ফুলবানুর ক্ষেত্রে সফলতার আনন্দ থাকলেও অন্ধবধূর মাঝে রয়েছে অসহায়ত্বের বেদনা। তাদের দুজনের জীবনের অভিজ্ঞতার মাঝে ভিন্নতা লক্ষণীয়। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের ফুলবানু এবং অন্ধবধূ চরিত্রের ভাব সম্পূর্ণ আলাদা।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৫:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
নিশাতের সাথে ভালোবেসে বিয়ে হয় তৌহিদের। একদিন তৌহিদ স্ত্রীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে শহর থেকে বাড়ি ফেরার পথে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়। দুজনে প্রাণে বেঁচে গেলেও নিশাত দুইটি পা হারিয়ে চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। তৌহিদ ও পরিবারের অন্য সদস্যরা নিশাতের দৈনন্দিন কাজে যত্ন নিতে থাকে। নিশাত এখন আর নিজেকে অসহায় ভাবে না।

ক. পায়ের তলায় নরম কী ঠেকেছিল?
খ. বধূটির ঘরে ফিরে যাওয়ার তাড়া ছিল না কেন?
গ. উদ্দীপকে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার যে বিপরীত সত্তার পরিচয় পাওয়া যায় তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘অন্ধবধূর প্রবাসী স্বামী যদি তৌহিদের মতো হতো তবে অন্ধবধূকে এত বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না।’—উক্তিটির যথার্থতা বিচার করো।

ক. পায়ের তলায় নরম ঝরা বকুল ঠেকেছিল।
খ. ঘরের কোণে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজ ছিল না বলে অন্ধবধূর ঘরে ফিরে যাওয়ার তাড়া ছিল না।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় অন্ধবধূ স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন। ঘরের কোণে তার একাকী সময় কাটতে চায় না। মনের ব্যথা ভুলতে প্রকৃতির সাথে যে মিশে যেতে চায়। দিঘির স্নিগ্ধ শীতল জলে সে মায়ের ভালোবাসার পরশ খুঁজে পায়। অন্ধবধূ দিঘির শীতল জলের সাথে নিজের একাকিত্বের দুঃখ ভাগাভাগি করতে চায়। এজন্য অন্ধবধূ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চায় না।

গ. ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় প্রতিবন্ধিতার শিকার অন্ধবধূ নিজেকে অবহেলিত ভাবার দিক বিবেচনায় তার সাথে উদ্দীপকের নিশাতের বৈসাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী রচিত ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীর কথা তুলে ধরা হয়েছে। শারীরিক অক্ষমতার কারণে সে সবার কাছে অবহেলিত। নিজের স্বামীও তার প্রতি যথাযথ যত্ন নেয় না। এসব কারণে অন্ধবধূ নিজেকে ভাগ্যহীনা মনে করে। তার মনে হয় পুকুরে ডুবে মরলে অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে সে মুক্তি পেত।
উদ্দীপকের নিশাত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পা দুটি হারায়। কিন্তু তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে অমর্যাদা করেনি। বরং সবার ভালোবাসা তাকে নতুনভাবে বাঁচার প্রেরণা জোগায়। নিশাতের মাঝে যে মানসিক শক্তির উদ্ভব হয়েছে, তা অন্ধবধূর ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।

ঘ. অন্ধবধূর প্রবাসী স্বামী উদ্দীপকের নিশাতের স্বামী তৌহিদের মতো সহানুভূতিশীল হলে অন্ধবধূর জীবনটা অনেক সুন্দর হতো।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় যতীন্দ্রমোহন বাগচী একজন দৃষ্টিহীন নারীর দুর্ভাগ্যের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। দৃষ্টিহীন হলেও অন্ধবধূ তার ইন্দ্রিয়ের শক্তিতে প্রকৃতির নানা রূপ-রস-গন্ধ অনুভব করে। কিন্তু অন্ধবধূর মনে অনেক দুঃখ। প্রবাসী স্বামী তার খোঁজ রাখে না। অন্ধবধূ তাই নিজেকে বঞ্চিত মনে করে।
উদ্দীপকের নিশাতের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। দুটি পা হারিয়ে সে পঙ্গু হয়ে যায়। তার এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায় স্বামী তৌহিদ। তৌহিদের ভালোবাসায় তার দুঃখ দূর হয়ে যায়। অন্ধবধূর স্বামী উদ্দীপকের তৌহিদের মতো যত্নশীল হলে অন্ধবধূও দুঃখ ভুলে হাসতে পারত।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিতটি পারস্পরিক ভালোবাসা, মমতা ও যতেœ নির্মিত। উদ্দীপকের তৌহিদ ও নিশাতের মাঝে তার দেখা পাওয়া যায়। নিশাত ভালোবেসে বিয়ে করে তৌহিদকে। সড়ক দুর্ঘটনা নিশাতকে শারীরিক প্রতিবন্ধীতে পরিণত করলেও নিশাতের প্রতি তৌহিদের ভালোবাসা কমে যায়নি। বরং তৌহিদের ভালোবাসাই নিশাতকে কষ্ট ভুলে বাঁচতে শিখিয়েছে। অন্যদিকে অন্ধবধূর স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি সহমর্মী নয়। প্রবাসে গিয়ে দীর্ঘদিন সে স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে থাকে। ফলে অন্ধবধূ নিজেকে খুব অসহায় মনে করে। স্বামীর এই অবজ্ঞার চেয়ে মৃত্যুকেই সে শ্রেয় মনে করে। উদ্দীপকের তৌহিদের মতো অন্ধবধূর স্বামী তাকে মমতা ও মর্যাদা দিলে অন্ধবধূর মনে কোনো বেদনা থাকত না।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৬:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন
ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে?
কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে
কভু আশী বিষে দংশেনি যারে?

ক. অন্ধবধূ কাকে আস্তে চলতে বলে?
খ. অন্ধবধূ কীভাবে বুঝতে পারে পায়ের তলায় ঝরা বকুল পড়েছে?
গ. ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর মানসিক যাতনার আলোকে উদ্দীপকটি ভাবটি ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উদ্দীপকটির ‘অন্ধবধূ’ কবিতার আংশিক প্রতিফলন মাত্র—বিশ্লেষণ করো।

ক. অন্ধবধূ তার ঠাকুরঝিকে আস্তে চলতে বলে।
খ. অন্ধবধূ তার অনুভূতিশক্তির দ্বারা বুঝতে পারে পায়ের তলায় ঝরা-বকুল পড়েছে।
দৃষ্টিহীনদের অনুভূতিশক্তি হয় প্রখর। তারা জগতের সকল কিছু তাদের অনুভবে বুঝতে চেষ্টা করে। অন্তর্দৃষ্টিকে প্রসারিত করে বিভিন্ন বস্তুর সম্পর্কে দৃষ্টিহীনরা জ্ঞান রাখে। অন্ধবধূ তার অনুভবে জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। এর মাধ্যমেই সে পায়ের তলায় ঝরা-বকুলের উপস্থিতি টের পায়।

গ. উদ্দীপকের ব্যথিতের বেদন কেউ যেমন কেউ বুঝতে পারে না তেমনি ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় বর্ণিত বধূর মানসিক যাতনাও কেউ বুঝতে পারেনি।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী এক দৃষ্টিহীন নারীর গভীর মর্মবেদনার দিকটি তুলে ধরেছেন। অন্ধবধূ দৃষ্টিহীন হওয়ার কারণে সুন্দর প্রকৃতিকে দেখতে পায় না। দিন কাটে ঘরের কোণে বসে। অন্ধবধূ তাই তার মনের খেদোক্তি ব্যক্ত করেছে। পা-পিছলে যদি দিঘির জলে ডুবে যায় তবে যেন অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যায়। তার দুখের আলাপন শোনার যেন কেউ নেই। অন্ধবধূর ব্যথা যেন কেউ বোঝে না।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, একজন সুখী মানুষ কখনও ব্যথিতের বেদন বা কষ্ট বুঝতে পারে না। অথবা যাকে কোনো দিন সাপে দংশন করেনি সেও দংশনের জ্বালা বুঝতে পারবে না। আলোচ্য অন্ধবধূর বিষয়টাও অনুরূপ। যার চোখ নেই তার কষ্ট ও দুঃখ দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা বুঝতে পারে না।

ঘ. ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর মানসিক যাতনাসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হলেও উদ্দীপকে কেবল মানসিক যাতনার দিকটি আলোচিত হয়েছে। উদ্দীপকটি তাই কবিতার খ-াংশের ধারক।
‘অন্ধবধূ’ কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর এক অনবদ্য কবিতা। কবিতায় তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক গৃহবধূর গভীর মর্মবেদনা নিপুণভাবে অংকন করেছেন। অন্ধবধূর স্মৃতিশক্তি ও অনুভূতি অত্যন্ত প্রখর। যা দিয়ে সে তার আশপাশের পরিবেশকে বুঝতে পারে। এই অসহায় নারীর স্বামী থাকে প্রবাসে। তার মনের যন্ত্রণাকে ভাগাভাগি করারও উপায় ছিল না। তাই মনঃকষ্টে সে দিঘির জলে ডুবে গিয়ে সকল যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে চেয়েছে। আবার দীঘির স্নিগ্ধ জলের পরশে সে দেহ ও মনকে জুড়াতে চেয়েছে।
আলোচ্য উদ্দীপকের বক্তব্য কালজয়ী। সব যুগ সব সময়ের জন্য তা সত্য। পৃথিবীতে মানুষ তার কষ্ট একাই বহন করে। একজনের কষ্ট কখনই আরেকজন তার মতো করে বুঝতে পারে না। যাকে কোনো দিন সাপে দংশন করেনি এর তীব্র যাতনা সে কখনোই বুঝতে পারে না। একজন সুখী মানুষও দুঃখী মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে না। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় এ বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি অন্ধবধূর মানসিকতার নানা দিক উঠে এসেছে। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কবি অন্ধবধূর বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে নানা বিষয়ের অবতারণা করেছেন। দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও অন্ধবধূর অন্তর্দৃষ্টি প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ এড়ায়নি। জীবন সম্পর্কে প্রতিবন্ধী মানুষের গভীর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায় কবিতায়। কিন্তু উদ্দীপকে কেবল একটি বিষয় তথা মানসিক যাতনার দিকটি ফুটে উঠেছে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকটি ‘অন্ধবধূ’ কবিতার আংশিক প্রতিফলন মাত্র।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৭:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
মোহনডাঙ্গার শিল্পী জন্মান্ধ। হাতের স্পর্শের সাহায্যে, পায়ের কদম মেপে মেপে চলাফেরা করে গৃহের অনেক কাজ সে করে থাকে। সে কানের সাহায্যে শব্দ বা আওয়াজ শুনে কুকুর-বিড়াল চিনতে পারে। কে যদু, কে মধু, কে রূপালি, কে পারুলি—সে কথা শুনেই বোঝে। আমের বউলের গন্ধে সে অনায়াসে বসন্ত ঋতুর আগমন ঠাহর করে।

ক. কখন আবার বিয়ে হবে?
খ. কীসের পরশ অন্ধবধূর নিকট মায়ের স্নেহের ন্যায়?
গ. উদ্দীপকের শিল্পীর সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর কোন ধরনের সাদৃশ্য রয়েছে বর্ণনা করো।
ঘ. উদ্দীপকটিতে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর যে বিশেষ দিকটির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তা মূল্যায়ন করো।

ক. আষাঢ় মাসে আবার বিয়ে হবে।
খ. দিঘির শীতল জলের পরশ অন্ধবধূর নিকট মায়ের স্নেহের ন্যায়।
বন্দিত্ব ও নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে অন্ধবধূর জীবন কাটে। বন্দী ও নিঃসঙ্গ জীবন থেকে কিছুটা সময়ের জন্য মুক্তি মেলে স্নান উপলক্ষে দিঘির ঘাটে গমন করলে। মায়ের স্নেহ যেমন সন্তানের সকল দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেয়, তেমনি দিঘির শীতল জলও অন্ধবধূর নিকট মাতৃস্নেহের ন্যায় মনে হয়।

গ. উদ্দীপকের শিল্পীর সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর দৃষ্টিহীনতার পাশাপাশি প্রকৃতি চেতনার সাদৃশ্য রয়েছে।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় পল্লিগ্রামের একজন অন্ধবধূর জীবনের উপলব্ধিজাত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। সেখানে ‘অন্ধবধূ’ নানা রকম স্পর্শ, শব্দ, গন্ধের অনুভূতি দ্বারা পরিবারের কাজ ও ঋতু প্রকৃতির আগমন-বিদায় ঠাহর করতে সক্ষম। জীবনে তার দুঃখবোধ আছে, বেঁচে থাকার উদ্দীপনা আছে। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে ভব-সংসারে সে জীবনের রথ চালিয়ে নিতে অভ্যস্ত। এমনকি পায়ের তলায় নরম বস্তুর অবস্থান ঠাহর করে বকুল ফুল সম্পর্কে ধারণা দেয়। তাতে সে বসন্ত ঋতুর আগমন ও তার পরিবেশ সম্পর্কে স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করে। উদ্দীপকের জন্মান্ধ শিল্পীর সাথে তার অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। বিশেষত প্রকৃতি চেতনার দিক থেকে।
উদ্দীপকের শিল্পী অন্ধ নারী। জন্ম থেকে সে অন্ধ। নানারকম ইন্দ্রিয়চেতনার সাহায্যে সে গৃহের অনেক কাজকর্ম করে থাকে। কখনো হাতের স্পর্শ, কখনো পায়ের কদম মেপে গৃহে চলাফেরা করে। আবার আওয়াজ শুনে মানুষ, পশুপাখি চিনতে পারে। এমনকি গন্ধের মধ্য দিয়ে বসন্তের আগমন আন্দাজ করতে পারে। জগতের প্রতিবন্ধী মানুষের প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা তার মধ্যে লক্ষ করা যায়। উদ্দীপকের জন্মান্ধ শিল্পীর সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। বিশেষত চেতনার দিক থেকে।

ঘ. উদ্দীপকটিতে ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর ইন্দ্রিয় সচেতনতার মাধ্যমে পৃথিবীর ঋতুবৈচিত্রে‍্যর শনাক্তকরণের দিকটির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
‘অন্ধবধূ’ যতীন্দ্রমোহন বাগচীর একজন অন্ধবধূর জীবনানুভূতির বেদনা মধুর ছন্দবদ্ধ প্রকাশ। এ কবিতার অন্ধবধূ দুঃখবোধ সম্পর্কে তার প্রগাঢ় ধারণা, আবার জীবন সম্পর্কেও আশাবাদী। অন্ধ মানুষের দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহে যে বাধাবিঘœ কীভাবে মোকাবিলা করে জীবনের রথ চালাতে হয়। তা তার কাছে অজানা নয়। সে এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর সংকট মোকাবিলা করেছে তার ইন্দ্রিয় সচেতনতার হাত দিয়ে। সে পায়ের নিচে নরম বস্তুর অনুভূতিতে বকুল ফুল চিনতে পারে, সন্ধ্যাকালের ফুলের মধুর গন্ধে বসন্ত আসার লক্ষণ অনুভব করে। যেমনটি আলোচ্য উদ্দীপকের জন্মান্ধ শিল্পীর মধ্যে দেখা যায়।
আলোচ্য উদ্দীপকের শিল্পী অন্ধ নারী। জন্ম থেকে সে অন্ধ। নানা রকম ইন্দ্রিয়চেতনার সাহায্যে সে গৃহের অনেক কাজকর্ম করে থাকে। কখনো হাতের স্পর্শে, কখনো পায়ের কদম মেপে গৃহে চলাফেরা করে। অনেক সময় আওয়াজ শুনে মানুষ পশুপাখি চিনতে পারে। এমনকি গন্ধের মধ্য দিয়ে বসন্ত ঋতুর আগমন আন্দাজ করতে পারে। জগতের প্রতিবন্ধী মানুষের প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা তার মধ্যে দেখা যায়। বিশেষত প্রকৃতিচেতনার দিক থেকে মূলত উদ্দীপকটিতে ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর ইন্দ্রিয়চেতনার মাধ্যমে ঋতুবৈচিত্র‍্যরে শনাক্তকরণের দিকটির গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে।
উপর্যুক্ত আলোচনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উদ্দীপকটিতে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর গল্পের মাধ্যমে পৃথিবীর ঋতুবৈচিত্র‍্যরে শনাক্তকরণের বৈশিষ্ট্যের দিকটির প্রতি গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৮:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
কচুয়া গ্রামের তছিরের বউ মমতাজ অন্ধ মহিলা। হাত-পা লাঠির সাহায্যে অনুভূতির প্রজ্ঞা দিয়ে বাড়ির কাজ করে। গৃহকাজে কলসি নিয়ে পানি তুলতে পুকুরঘাটে গেলে বাধে বিড়ম্বনা। পুরাতন দিঘির শ্যাওলা পড়া সিঁড়িতে পা রাখলে পিছল খেয়ে পড়ে পানিতে ডুবে মরার শঙ্কা জাগে তার মনে।

ক. ‘কাঁদতে পেলে বাঁচত সে যে ভাই,/কতক তবু কমত যে তার শোক’। বাক্যটিতে কী বোঝানো হয়েছে?
খ. অন্ধবধূ তার স্বামীকে কীভাবে বাঁচাতে চায়?
গ. উদ্দীপকের সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার কোন অংশের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “উদ্দীপকের বক্তব্যে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর খ-িত জীবনচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়”—মন্তব্যটি বিচার করো।

ক. বাক্যটিতে অন্ধত্বের গভীর কষ্ট বোঝানো হয়েছে।
খ. দিঘির ঘাটে জেগে ওঠা শ্যাওলাপড়া সিঁড়িতে পিছলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর মাধ্যমে অন্ধবধূ তার স্বামীকে বাঁচাতে চায়।
‘অন্ধবধূ’ কবিতার বধূ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তার ইন্দ্রিয় শক্তি প্রখর। তাই স্নান করতে দিঘির পাড়ে এসে শ্যাওলাপড়া সিঁড়িতে পা দিয়েই সে বিপদের আশঙ্কা করে। আবার ভাবে, যদি সিঁড়ি থেকে পড়ে দিঘির পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়, তাহলে সবাই শান্তি পাবে এবং স্বামীও বেঁচে যাবে।

গ. উদ্দীপকের সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগলে শ্যাওলা পড়া পিছল সিঁড়িতে পা পিছলে তলিয়ে মারা যাওয়ার শঙ্কা অংশটির সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূ প্রকৃতি চেতনা ও অনুভবে সমৃদ্ধ একজন মানুষ। আত্মমর্যাদাও তার যথেষ্ট প্রখর। অন্ধত্বের কষ্ট সে গভীরভাবে অনুভব করে। দিঘির পাড়ে যখন শ্যাওলাপড়া পিছল সিঁড়ি জেগে ওঠে, তখন তাতে সে পিছল খেয়ে জলে পড়ে ডুবে মরার আশঙ্কা ব্যক্ত করে, আর এও ভাবে যে, সে যদি ডুবে মারা যেত তাহলে তার অন্ধত্বের অভিশাপ ঘুচত। এটা তার মনের কথা নয়। কারণ সে নৈরাশ্যবাদী মানুষ নয়, জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ লক্ষণীয়। অন্যপক্ষে উদ্দীপকের তছিরের বউ মমতাজের পুকুরঘাটে পিছল খেয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং পানিতে ডুবে মরার আতঙ্ক মনে জাগা সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়।
উদ্দীপকের অন্ধ বউ মমতাজ হাত-পা-লাঠির সাহায্যে অনুভূতির প্রজ্ঞা দিয়ে গৃহের কাজ করে। সে কলসি নিয়ে পুকুরঘাটে পানি তুলতে গিয়ে শ্যাওলা পড়া পিছল সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পানিতে ডুবে মরার শঙ্কা জাগায়। তার সাথে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর দিঘিতে পা ফসকে পানিতে ডুবে মরার শঙ্কা পাওয়ার অংশের সাদৃশ্য ফুটে উঠেছে। তাই উদ্দীপকের সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার আলোচিত অংশের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।

ঘ. “উদ্দীপকের বক্তব্যে ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর খ-িত জীবনচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়”—উক্তিটি যৌক্তিক বলা যায়।
যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূ একজন অন্ধ মানুষ হলেও আত্মসম্মানবোধে জাগ্রত মানুষ। সমাজে অন্ধ মানুষেরা নানারকম অবজ্ঞা ও অবহেলার শিকার হয়। প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ সে ইন্দ্রিয়চেতনা দ্বারা উপলব্ধি করে। পায়ের নরম বস্তুর অস্তিত্ব, কোকিলের ডাক শুনে নতুন ঋতুর আগমন অনুমান করে, শ্যাওলা পড়া পিছল পুকুরঘাটে পা পিছলে পড়ে পানিতে ডুবে মরার শঙ্কা তার মনে জাগে। অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে সে হয়তো মুক্তি পাবে বলে ধারণা করে। কিন্তু সেটা তার মনের আসল কথা নয়। সে অনুভূতির দৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অভিলাষী একজন মানুষ। তার অনুভবে একজন অন্ধ মানুষের বিস্তর অভিজ্ঞতার বর্ণনা কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের কচুয়া গ্রামের তছিরের বউ মমতাজ অন্ধ। সে হাত-পা ও লাঠির সাহায্যে গৃহের কাজ করে। সে কলসি নিয়ে পুকুরে পানি আনতে গেলে তার পা ফসকে পুকুরের পানিতে ডুবে মরার আশঙ্কা প্রকাশ পায়। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর সাথে উদ্দীপকের এই অংশের সাদৃশ্য লক্ষণীয়। তাই অন্ধবধূর জীবনচেতনার সাথে উদ্দীপকের মমতাজের পুরো জীবনচেতনার মিল নেই; বরং তা খ-িত জীবনচেতনার পরিচয় বহন করে। সুতরাং উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, উদ্দীপকের বক্তব্যে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর খন্ডিত জীবনচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়—উক্তিটি সত্য।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ৯:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
জেসমিনের স্বামী চাকরির জন্য বিদেশে থাকে। তার স্বামী অনেক দিন বাড়ি আসে না। মাঝে মাঝে চিঠিপত্র দেয়। অন্যদের স্বামী বছরে দু’বার বাড়ি আসে। কেবল তার স্বামীই যেন খানিকটা আলাদা। জেসমিনের স্বামীর জন্য মন পোড়ে, হৃদয় বিরহকাতর হয়ে উঠলে সে কলসি নিয়ে পুকুরঘাটে যায়। পুকুরের শীতল পানিতে ডুব দিয়ে মনের ব্যথা ভোলার চেষ্টা করে।

ক. কোথায় অন্ধবধূ একলা থাকে?
খ. কোন পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে অন্ধবধূ অন্তরের যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন? ব্যাখ্যা করো।
গ. উদ্দীপকের জেসমিনের সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার যে সাদৃশ্যের পরিচয় পাওয়া যায় তা বর্ণনা করো।
ঘ. উদ্দীপক ও ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় দুজন বিরহকাতর নারীর হৃদয়ের আর্তি ফুটে উঠেছে—মন্তব্যটি বিচার করো।

ক. অন্ধবধূ গৃহকোণে একলা থাকে।
খ. ‘মন্দ নেহাত হয় না কিন্তু তায়—/অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব ঢুকে যায়।’ এ পঙ্িক্তটির মাধ্যমেই অন্ধবধূ তার অন্তরের যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন।
অন্ধবধূ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তার রয়েছে সূক্ষ্ম অনুভূতি শক্তি। যার সাহায্যে সে তার চারপাশের প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের অন্তর্জগৎকে বোঝার চেষ্টা করে। সে উপলব্ধি করে তার অন্ধত্ব সকলের নিকট কতটা অসহনীয়। কোনো ব্যাপারে নিশ্চিত হতে কাউকে কোনো প্রশ্ন করলে তার উত্তর দিতেও যেন তাদের কষ্ট হয়। তাই সে ঠাকুরঝিকে জানিয়ে দেয়—শ্যাওলা ধরা পিচ্ছিল সিঁড়িতে পা পিছলে জলে পড়ে তার মৃত্যু হলে মন্দ হতো না।

গ. উদ্দীপকের জেসমিনের সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর স্বামীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার সাদৃশ্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূ একজন দৃষ্টিহীন নারী। সে প্রকৃতি থেকে অনুভূতির আলোকে পাঠ গ্রহণ করে। পৃথিবীর নানা রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছে। মাঝে মাঝে সে জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু পরমুহূর্তে সে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে। জীবনবাদী অন্ধবধূ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আশাবাদী। জীবনের প্রতি তার সুগভীর মমত্ববোধ দেখা যায়। স্বামীর প্রতি হৃদয়ের প্রগাঢ় ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। সে তার প্রবাসী স্বামীকে স্মরণ করে কাছে পেতে চায়। উদ্দীপকের জেসমিনের চরিত্রের মধ্যেও স্বামীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার আসক্তি লক্ষ করা যায়।
উদ্দীপকের গৃহবধূ জেসমিন বাড়িতে থাকে। আর তার স্বামী চাকরির সুবাদে অবস্থান করে প্রবাসে। সে স্বামীকে দারুণভাবে কাছে পেতে চায়। স্বামীকে কাছে না পাওয়ার বেদনা তার স্বামীর প্রতি ভালোবাসার নামান্তর। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূও তেমনি প্রবাসী স্বামীর প্রতি মনের দুর্বলতা ব্যক্ত করেছে। সেজন্য উভয় নারীর চরিত্রে একটি সাদৃশ্য লক্ষণীয়। তাই উদ্দীপকের জেসমিনের সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর স্বামীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার অনুভূতির সাদৃশ্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

ঘ. উদ্দীপক ও ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় দুজন বিরহকাতর নারীর হৃদয়ের আর্তি ফুটে উঠেছে—মন্তব্যটি যথার্থ।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী অন্ধবধূর জীবনের নানা দিক বর্ণনা করেছেন। অন্ধবধূ একজন অনুভূতিজাত অভিজ্ঞতাসমূদ্ধ নারী। জগতের প্রতি তার ভালোবাসার কমতি নেই। মাঝে মাঝে তার দৃষ্টিহীন জীবনের বোঝা তাকে ভারাক্রান্ত করতে দেখা গেলেও তাকে প্রকৃতির নানা দিক বারবার আকর্ষণ করেছে লক্ষ করা যায়। অন্ধবধূ তার প্রবাসী স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি পীড়াদায়ক মনে করে। অন্ধ স্ত্রী ঘরে রেখে হয়তো তার স্বামী বাড়ি আসতে চায় কম। আর সে যদি মারা যায়, তবে সে-ই আগে মুক্তি পাবে, আর তার স্বামী চটজলদি আবার বিয়ে করে ঘর বাঁধবে। তখন তার স্বামী বাড়ি আসতে চাইবে। কিন্তু বাড়ি আসার পথ খুঁজে পাবে না। এ কথার মধ্য দিয়ে তার প্রবাসী স্বামীর প্রতি বিরক্তিকর আর্তি ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকের গৃহবধূ জেসমিন বাড়িতে থাকে, তার স্বামী চাকরির সুবাদে অবস্থান করে প্রবাসে। সে স্বামীকে দারুণভাবে কাছে পেতে চায়। স্বামীকে কাছে না পাওয়ার বেদনা তার স্বামীর প্রতি ভালোবাসার নামান্তর। অন্যদিকে ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূর প্রবাসী স্বামীর প্রতি তার হৃদয়ের নিখাদ ভালোবাসার পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। তাই উদ্দীপকের কাহিনির স্বল্প পরিসরে জেসমিনের দৃষ্টিতে তেমনি সাদৃশ্যপূর্ণ ও বেদনাঘন প্রবাসী স্বামীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা ফুটে উঠেছে।
তাই উদ্দীপক ও ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় দুজন বিরহকাতর নারীর হৃদয়ের আর্তি ফুটে উঠেছে—মন্তব্যটি যথার্থ।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১০:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
জীবন সত্যিই ক্ষণস্থায়ী। মানুষের এই স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে, কিন্তু এক সময় সবকিছু শেষ হয়ে যায়। একদিন সমস্ত হিসাব মিটিয়ে, সব সম্পর্ক ছিন্ন করে আমাদের পরপারে চলে যেতে হয়। ইরফান মাঝেমধ্যে গভীরভাবে ভাবেন, 'এত সুন্দর এই পৃথিবী, ঝিঁঝি ডাকা সন্ধ্যা, চাঁদের আলোর মূর্ছনায় ভরা রাত—এসব ছেড়ে একদিন আমাদের চলে যেতে হবে।'

ক. অন্ধবধূ ঠাকুরঝির কাছে জ্যৈষ্ঠ আসতে কত দিন দেরি বলে জানতে পারে?
খ. ‘দেখবি তখন—প্রবাস কেমন লাগে?’—অন্ধবধূ একথা বলেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকের বক্তব্যে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার যে বিশেষ দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “উদ্দীপকের বক্তব্যে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার সমগ্র ভাবের প্রতিফলন ঘটেনি।”—মন্তব্যটি মূল্যায়ন করো।

ক. অন্ধবধূ ঠাকুরঝির কাছে জ্যৈষ্ঠ আসতে অনেকদিন দেরি বলে জানতে পারে।
খ. স্বামীর প্রতি দারুণ অভিমান থেকে অন্ধবধূ আলোচ্য কথাটি বলেছে।
অন্ধবধূর স্বামী প্রবাসী। অন্ধবধূ তার জন্য দিনের পর দিন প্রতীক্ষায় থাকে। সে কোকিলের ডাক শুনে, দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ির অনুভবে ঋতু বদল বুঝতে পারে। এভাবে ঋতুর পর ঋতু চলে গেলেও প্রবাসী স্বামী অন্ধবধূর সান্নিধ্যে আসেনি। বধূটি ভাবে সে মারা গেলে স্বামী নিশ্চয় দ্রুত ঘরে নতুন বউ আনবে। তখন প্রবাসের জীবন তার আর ভালো লাগবে না। মূলত আলোচ্য উক্তিটির মধ্য দিয়ে স্বামী পরিত্যক্ত অন্ধবধূর স্বামীর প্রতি দারুণ ক্ষোভ ও অভিমান পরিস্ফুটিত।

গ. উদ্দীপকের বক্তব্যে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর মৃত্যুচিন্তার দিকটির সাথে সাদৃশ্য রয়েছে।
অন্ধবধূ তার অন্ধত্বের জন্য গভীর মর্মবেদনা অনুভব করে। দুঃখ-কষ্ট-অভিমানে সে অনেক কথাই মনে মনে ভাবে। দিঘির ঘাটে শ্যাওলা পিছল সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে পানিতে তলিয়ে মরে যাওয়ার কথাও সে ভেবেছে। তার মতে, এতে তার অন্ধ চোখের দ্বন্দ্ব চুকে যাবে। প্রকৃতপক্ষে অন্ধবধূ আর দশটা মানুষের মতোই বাঁচতে চেয়েছিল। সে জোছনা, কোকিলের ডাক, সন্ধ্যার স্নিগ্ধতা উপভোগ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার প্রতি মানুষের অবহেলা সে সহ্য করতে পারেনি। তাই সে ভেবেছে দিঘির জলে তলিয়ে গিয়ে মৃত্যু হলে ভালোই হতো।
পৃথিবী নশ্বর ও জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা মানুষের চিরন্তর। উদ্দীপকের ইরফানের মাঝেও এমন অভিব্যক্তি আমরা লক্ষ্য করি। ঝিঝি ডাকা সন্ধ্যা, জ্যোৎস্না ভরা রাত কার না ভালো লাগে। তার এ সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার কথায় বেদনা অনুভব হয়। তাই বলা যায়, অন্ধবধূর মৃত্যুচিন্তার সাথে উদ্দীপকের ইরফানের মৃত্যুচিন্তার দিকটি একই সূত্রে গাঁথা।

ঘ. ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় শারীরিক প্রতিবন্ধী একজন মানুষের মনোজাগতিক নানা বিষয় উঠে এলেও উদ্দীপকে তেমনটা হয়নি। উদ্দীপকটিতে কেবল মৃত্যুচিন্তার দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে। তাই উদ্দীপকটি ‘অন্ধবধূ’ কবিতার সমগ্র ভাবের ধারক নয়।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় একজন অন্ধবধূর গভীর মর্মযাতনার দিক প্রকাশ পেয়েছে। অন্ধ হওয়ার কারণে সে প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে প্রবাসী স্বামীর অবহেলায় তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তারপরও সে তার অনুভূতি দিয়ে ঋতুর পরিবর্তন, ফুলের গন্ধ, পাখির ডাকসহ প্রকৃতির সবকিছুই উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেছে। তার প্রতি সমাজ সংসার স্বামীর অবহেলা সে যেন সহ্য করতে পারছিল না। ক্ষোভে দুঃখে সে দিঘির জলে ডুবে মরে অন্ধত্বের অভিশাপ ঘুচাতে চেয়েছে। মূলত অন্ধবধূ দিঘির স্নিগ্ধ শীতল জলে তার মনের ব্যথা খানিকটা উপশম করতে চেষ্টা করেছে।
উদ্দীপকে ব্যক্ত হয়েছে মানুষের জীবনের চিরন্তন সত্য মৃত্যুচিন্তা। এই পৃথিবীর সৌন্দর্য অসীম। এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে কারও মন চায় না পরপারে চলে যেতে। ইরফানের মধ্যেও সেই অনুভূতি কাজ করেছে। সে শান্ত স্নিগ্ধ ঝিঁঝি ডাকা সন্ধ্যা, জ্যোৎস্না ভরা রাত এসব ছেড়ে চলে যেতে চায় না। ইরফানের মাঝে মায়া-মমতা ভরা পৃথিবীর মাঝে বেঁচে থাকার চিরন্তন আবেগ কাজ করেছে।
‘অন্ধবধূ’ কবিতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কবিতায় অন্ধবধূর জীবনের বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। অন্যদিকে উদ্দীপকে শুধু মৃত্যুচিন্তা ও পৃথিবী ছেড়ে না যাওয়ার আকুতি ব্যক্ত হয়েছে। ‘অন্ধবধূ’ কবিতার মতো প্রতিবন্ধী মানুষের মর্মবেদনার স্বরূপ উন্মোচিত হয়নি উদ্দীপকে। সেদিক থেকে উদ্দীপকের বক্তব্যে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার সমগ্র ভাবের প্রতিফলন ঘটেনি বরং আংশিক ভাব প্রতিফলিত হয়েছে মাত্র।


‘অন্ধবধূ’ কবিতার সৃজনশীল প্রশ্ন- ১১:

নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
রসুলপুর গ্রামের পরীবাণু একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও পরীবাণুর ইচ্ছে ছিল লেখা পড়া শিখে স্বনির্ভর হওয়ার। বাবার সহযোগিতায় সে ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়া শেখে এবং পরবর্তীতে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও পরীবাণুর অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে অন্ধত্বের অভিশাপ।

ক. অন্ধবধূ জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে কীভাবে?
খ. অন্ধবধূ কীভাবে বুঝতে পারে পায়ের তলায় ঝরা-বকুল পড়েছে?
গ. উদ্দীপকের সাথে অন্ধবধূ কবিতার কোন অংশটি সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “উদ্দীপকের পরীবাণু এবং অন্ধবধূ চরিত্রের ভাব সম্পূর্ণ আলাদা।”—মূল্যায়ন করো।

ক. অনুভূতি শক্তি দ্বারা অন্ধবধূ জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে।
খ. অন্ধবধূ তার প্রখর অনুভূতি শক্তি দ্বারা বুঝতে পারে তার পায়ের তলায় ঝরা-বকুল পড়েছে।
দৃষ্টিহীনদের অনুভূতিশক্তি হয় প্রখর। তারা জগতকে দৃষ্টি দ্বারা প্রত্যক্ষ করতে না পারলেও অনুভবে বুঝতে চেষ্টা করে জগতের রূপ-রস-গন্ধ। মূলত অন্তরদৃষ্টিকে প্রসারিত করে বিভিন্ন বস্তুর সম্পর্কে দৃষ্টিহীনেরা জ্ঞান রাখে। ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূটিও অনুভবঋদ্ধ মানুষ। তার প্রখর অনুভূতি শক্তি দ্বারাই সে জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। এই অনুভূতি শক্তিতেই সে পায়ের তলায় ঝরা-বকুলের উপস্থিতিটের পায়।

গ. অন্ধত্বের প্রতিবন্ধকতা দূর করে জীবনকে উপভোগ করার আকাক্সক্ষার দিকটি উদ্দীপকের সাথে ‘অন্ধবধূ’ কবিতার সাদৃশ্য রচনা করেছে।
সমাজ দৃষ্টিহীনদের অবজ্ঞা করে। ফলে দৃষ্টিহীনেরা নিজেদের অসহায় ভাবে। কিন্তু ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে অন্ধদের এই প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব। ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী প্রবল অনুভব এবং অনুভূতি শক্তি দ্বারা প্রকৃতিকে উপভোগের স্বরূপে বর্ণনা করেছেন। অন্ধবধূ নিজের ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করে। পায়ের তলায় নরম শিউলি ফুলের অস্তিত্ব, কোকিলের ডাকে ঋতু পরিবর্তন সবই সে নিজের অনুভূতি শক্তির দ্বারা বুঝতে পারে।
উদ্দীপকের পরীবাণুর মধ্যেও নিজের অন্ধত্বের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা লক্ষণীয়। সে দৃষ্টিহীন হলেও আর দশটা মানুষের মতো বেঁচে থাকার বাসনা মনের মধ্যে পোষণ করে। তার এই বাসনা ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর প্রকৃতি অনুভবের আকাক্সক্ষার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অন্ধবধূও ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে দৃষ্টিহীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চায়।

ঘ. উদ্দীপকের পরীবাণু অদম্য ইচ্ছায় প্রতিবন্ধকতা জয় করলেও ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূটি অসহায়ত্বের নিগড়ে বন্দি।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অসহায়ত্বকে তুলে ধরেছেন। কবিতায় অন্ধবধূ সমাজে অবজ্ঞার শিকার হওয়ায় নিজেকে অসহায় মনে করে। স্বামী-সংসারে উপেক্ষিত অন্ধবধূর মধ্যে চরম হতাশা ও অসহায়ত্ব কাজ করে। তাইতো সে-জলে ডুবে মরে অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চায়।
অন্যদিকে উদ্দীপকের পরীবাণু দৃষ্টিহীন হলেও অন্ধত্বের অভিশাপকে জয় করেছে। ফলে তার ভেতর হতাশা নেই বরং অসহায়ত্বকে জয় করার গৌরব আছে। অবশ্য পরিবার তাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু ‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূ পরিবারের কাছে অসহায়ত্ব থেকে উত্তরণের কোনো সহযোগিতা পায়নি বরং অবহেলিত হয়েছে।
‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূটি পরিবারের মানুষের অবহেলার কারণে হতাশা প্রকাশ করেছে। কিন্তু উদ্দীপকের পরীবাণু পরিবারের সহায়তায় হতাশা থেকে মুক্তি পেয়েছে। ফলে উদ্দীপকের পরীবাণুর ক্ষেত্রে সফলতার আনন্দ থাকলেও অন্ধবধূর মাঝে রয়েছে অসহায়ত্বের বেদনা। এখানেই দু’জনের জীবন অভিজ্ঞতার ভিন্নতা পরিলক্ষিত। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের পরীবাণু এবং অন্ধবধূ চরিত্রের ভাব সম্পূর্ণ আলাদা।


তথ্যসূত্র:
১. চারুপাঠ: ষষ্ঠ শ্রেণি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, ২০২৫।
২. আধুনিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, এপ্রিল, ২০১৮।
৩. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি, ১৮তম, ২০১৫।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url